উপন্যাস

৫:৩৪ PM চিরশ্রী দেবনাথ 0 Comments

উপন্যাস

চিরশ্রী দেবনাথ

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

পর্ব এক

কোন কোন দিন পৃথিবীকে খুব সুন্দর লাগে ।
আজ এমনই একটি দিন।
হঠাৎ করে গুলমোহর গাছগুলোর মনে হয়েছে ফুল দিয়ে রাস্তার ধুলো ঢেকে দিতে হবে।
ফুল সরিয়ে তাই হাঁটতে হচ্ছে ।
 খুব ভালো লাগছে ।
ঈরার কাঁধের ব্যাগ খুব ভারী , এক সপ্তাহ ধরে পরে থাকার জন্য ওর ধূসর রঙের জিন্স একটু ব্ল্যাকিস হয়ে গেছে তবে কুর্তিটা বেশ ঝলমলে এই মুহূর্তের মনটার মতোই ।
জটিল সমস্যার উত্তর যখন দূর আকাশে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে তখন হয়তো এমনিই লাগে, এখনই একবার স্যারের কোয়ার্টারে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করছে।
কিন্তু যাওয়া যাবেনা। 
আজ ঈরাকে স্যার সময় দেননি। নতুন দুজন তরুণ গবেষক ওখানে থাকবে। স্যারের সঙ্গে তাদের প্রথম সাক্ষাৎ।
তিনি কি আরোও বেশি ইম্পপরট্যান্ট বিষয় ওদের জন্য ভেবে রেখেছেন যা ঈরাকে দেননি।
নাহ তা হতে পারেনা। ঈরার দুর্দান্ত ভালো রেজাল্ট আর এম এস সির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তো জে আর এফ । 

ঈরা এখন যে পথে  হাঁটছে  তা এই বিশাল ইনস্টিটিউশনটির দ্বিতীয় প্রবেশপথ,  এদিকেই লেডিজ হোস্টেলের রাস্তা, বাঁদিকে পাহাড়ের ঢালু অংশ অনেক দূর অব্দি নেমে গেছে, নানারকমের বুনো ফুল ফুটে আছে ,  ঈরা এখানে এসেছে প্রায় তিনমাস হতে চলল,  এই তিন মাসের মধ্যে ফুলের রঙ যেন কয়েকবার করে বদলে গেছে
 ,  ফুলগুলো থেকে একটু ঝিম ধরানো গন্ধ বের হয়,  মাঝে মাঝে কেয়ারটেকাররা  এসে এগুলো 
কেটে একদম পরিষ্কার করে দেয় , উচ্চতার কারণে এখানে   অনেকক্ষণ কুয়াশার নরম আস্তরণে ঢেকে থাকে সমস্ত উপত্যকা, তারপর হঠাৎই ঝিলিক দেয় উজ্জ্বল রোদ, আবার
 দুপুর তিনটের পর থেকেই রোদ মরে আসতে থাকে , ঈরা প্রত্যেকদিন এই ঢালটার সামনে এসে একটু সময় দাঁড়ায়, এখান থেকে দেখা যায় উল্টোদিকের দূর পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে থাকা দুটো অপূর্ব ঝর্ণাকে,  বৃষ্টি হলে জল বেড়ে যায় তখন খরস্রোতা ঝর্ণার ঝরঝর শব্দও কানে আসে,  তবে গত এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হচ্ছে না,  তাই আজ সেই শব্দটা নেই,  কেমন যেন নিস্তব্ধতা চারপাশে,  হঠাৎ কানে এলো ঢং ঢং , মনে হয় কাছে পিঠে কোথাও মন্দির আছে,  পূন্যার্থীরা পুজো দিতে এসে ঘণ্টা বাজায় , সেই শব্দই প্রতিধ্বনিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে,  কি দেবতা অথবা দেবী?  আসলে ঈরার ক্যাম্পাস থেকে বের হবার তেমন কোন দরকারই পড়েনি,  ছোটখাটো শপিংমল থেকে শুরু করে সিনেমা হল এবং ডে নাইট ক্যান্টিন রয়েছে স্টুডেন্টদের সুবিধার জন্য। পুরো সময়টা নিজের স্টাডির জন্য দিতে পেরে ঈরার খুবই ভালো লাগছে। সকাল থেকে রেগুলার ক্লাস তারপর লাইব্রেরি  , বহির্জগতের সঙ্গে এখন শুধু নেটের মাধ্যমেই জুড়ে আছে , ছোট্ট এয়ারপোর্টটা থেকে গাড়িতে করে  ক্যাম্পাসে  ঢোকার পর আজ পর্যন্ত আর বাইরে যাওয়া হয়ে ওঠেনি , তবে পুরো সিস্টেমটার সঙ্গে এডজাস্ট প্রায় হয়ে এসেছে,  এখন একদিন শহরটিতে ঘুরে আসতে হবে,  এই যেমন মন্দিরটা দেখে আসবে বা দূর পাহাড়ের ঝর্ণাটাকে খুব কাছ থেকে দেখবে । ঐ যে পাকদণ্ডী পথটা অনেক নিচে চলে গেছে সেই পথটা দিয়ে নামলেই বোধহয় ওখানে পৌঁছুনো যাবে। 

 East Indian Institute of Mathematical Sciences (EIIMS) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল
 1983 তে পাহাড়ে ঘেরা এই ছোট্ট শহরে, 
মোট ছাত্রসংখ্যা: ~500 (PG এবং PhD) সহ , সঙ্গে রয়েছেন প্রফেসররা আর অজস্র কর্মচারী যারা প্রতিষ্ঠানের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ অব্দি সব ম্যানেজ করেন। সংস্থাটির ফান্ডিং আসে মূলত NBHM (National Board of Higher Mathematics), CSIR, DRDO, এবং আন্তর্জাতিক অন্যান্য  গবেষণা সংস্থা থেকে  

EIIMS এর মূল  প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট গণিতবিদ ডঃ শচীন্দ্রনাথ মিত্র, যিনি কেমব্রিজ থেকে ফিরে এসে ভারতীয় পিওর ম্যাথেম্যাটিক্সে গবেষণার আন্তর্জাতিক মান গড়তে চেয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির মিশন ছিল "Mathematics for Truth and Transformation"। ধীরে ধীরে এটি স্বাধীনতার পরবর্তী প্রজন্মের মেধাবীদের  গবেষণার জন্য একটি  নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে। ম্যাথমেটিক্সের  অনেকগুলো বিভাগের মধ্যে EIIMS এর অন্যতম একটি প্রধান বিভাগ হলো ,  Department of Algebra & Number Theory,যেখানে প্রধানত যে বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করা হয় সেগুলো হলো – এলিপটিক কার্ভ, গ্যালোয়া থিওরি, ক্রিপ্টোগ্রাফি ইত্যাদি । ঈরার বিষয় হলো ক্রিপ্টোগ্রাফি। 
শুধুমাত্র এই বিষয়েই এখানে রয়েছে Cryptography Research Wing (CRW): DRDO-এর সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত সাইবার সিকিউরিটি গবেষণা শাখা । ছোট থেকেই অংক ছিল ঈরার নেশা, সংখ্যার জগতে একবার ঢুকে যেতে পারলে সে যেন নিজেও একটি সংখ্যা হয়ে যেত। ঈরার বাবা বিজিত রায় স্বনামধন্য স্কুল শিক্ষক, ওনার বিষয় পদার্থবিদ্যা, তবে মেয়ের অংক নিয়ে এই আগ্রহকে যে একটি বৃক্ষে পরিনত করতে হবে সেই স্বপ্ন তিনি ছোট থেকেই ঈরার মধ্যে বপন করতে পেরেছিলেন, আর দুরন্ত মেধাবী ঈরার স্বপ্ন ছিল একটু চ্যালেঞ্জিং বিষয় নিয়ে গবেষণা করবে। ক্রিপ্টোগ্রাফি  তথ্যকে নিরাপদভাবে আদানপ্রদান করার বিজ্ঞান, যা আজকের ডিজিটাল যুগে – বিশেষ করে অনলাইন লেনদেন, সাইবার নিরাপত্তা, এবং মিলিটারি কমিউনিকেশন – এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আসা যাওয়ার পথে বিভিন্ন ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গে দেখা হয়,  কারো কারো সঙ্গে শুধু মুখ চেনা আর
কয়েকজন আছে যাদের সঙ্গে মাত্রই কথা বলা শুরু হয়েছে ।
হোস্টেলে পৌঁছে ব্যাগটা টেবিলে রেখে একটু টানটান হয়ে শুতেই বাবার ফোন,  হ্যালো বলতেই বাবা হাউমাউ করে উঠল,  কলকাতার আর জি কর মেডিকেল হাসপাতালে রাতের বেলায় একজন পি জি স্টুডেন্টকে কে বা কারা ওন ডিউটি নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুন করেছে,  মোবাইলে নিউজফিডে এ বি পি আনন্দের খবরে এটা সকালবেলায় দেখেছিল ঈরা , তখন ততটা গুরুত্ব দেয়নি,  ক্লাশ শুরু হয়ে যাবে তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছিল, বাবার গলার স্বরে প্রচুর টেনশন এবং উত্তেজনা,  সাবধানে থাকিস মামণি , ঘরের দরজা ভালো করে আটকে ঘুমাস,  ঈরা সবকিছুতেই হ্যাঁ বলে বাবাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল,  কিন্তু এক অজানা ভয়  শিরশির করে ঈরার মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে পায়ের পাতা অব্দি  পৌঁছে গেল। থম মেরে বসে রইল বিছানায় ,   লাইট পর্যন্ত জ্বালাতে ভুলে গেল ।
ফেসবুকে ঈরার একটি একাউন্ট আছে বটে তবে ফ্রেন্ডলিস্ট খুবই ব্যক্তিগত পরিসরে আবদ্ধ,  সেখানে কয়েকজন স্কুল কলেজের ক্লাসমেট ও আত্মীয় স্বজন ছাড়া ঈরার ফ্রেন্ডলিস্টে আর কেউ নেই । প্রোফাইলটিও লক করা,  ঈরার কিশোরীবেলার একটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি ছাড়া আর কোনো ছবি নেই প্রোফাইলে। পড়াশোনায় ডুবে থাকায় ঈরা অনেককিছু থেকেই নিজেকে সরিয়ে রাখে,  ডিনারের পর কয়েক ঘন্টা নিবিড় পড়াশোনা করে তারপর ঈরা ঘুমোতে যায়। আজ মোবাইল খুলতেই সেখানে শুধু আর জি কর,  কিছুক্ষণ পর ঈরা নিজেকে ফেসবুক থেকে লগ আউট করল। 
হোস্টেলের ঘরে ঘরে এখন লাইট জ্বলছে,  সবাই পড়তে বসেছে , ঈরার ঘরটি দুজনের জন্য,  কিন্তু রুমমেট মেয়েটি  একমাসের মতো থেকেই চলে গেছে বাড়িতে , ওর নাকি বিয়ের কথাবার্তা চলছে , এতো ভালো পি এইচ ডি ‘র সুযোগ ছেড়ে কেউ বিয়ে করে? গুয়াহাটি থেকে আসা নিতান্তই অপরিচিত মেয়েটিকে ঈরা  খুব করে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল , মেয়েটির স্তব্ধতা ঈরাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল কোথাও একটা অপারগতা আছে,  তবে যাওয়ার দিন ঈরাকে জড়িয়ে কুহু নামের মেয়েটি কেঁদেছে খুব , তারপর বলেছে দেখো আমি আবার আসব। যদিও কুহু এখনো আসেনি। ঈরা মনেপ্রাণে চাইছে কুহু ফিরে আসুক,  দেরি হয়ে যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসগুলো চলে যাচ্ছে,  তাছাড়া কুহুর সাবজেক্ট এক্সপার্ট মিঃ কুলকার্নি স্যার নাকি ক্যালিফোর্নিয়া চলে যাচ্ছেন কোন একটি সেমিনারে যোগ দেবার জন্য,  প্রায় দুই থেকে তিনমাস থাকবেন সেখানে,  ঈরার বিষয়ের সঙ্গেও তিনি খানিকটা জড়িত তাই ওনার ক্লাশগুলো আজকাল রোজ হচ্ছে। কুহুর ফোন নং আছে ঈরার কাছে, দুদিন ফোন করেছিল,  কুহু ধরেনি। 

মন বসছে না,  খুব স্বাভাবিক। ঈরা জানলার পাশে এসে দাঁড়ালো। এখান থেকে ক্যাম্পাস লেকটা স্পষ্ট দেখা যায়, এতো উঁচুতেও এই লেকে জল থাকে,  কিছুটা কৃত্রিম উপায়েও মেন্টেন করা হয়। একটি ফ্লাড লাইট সারা রাত জ্বলে,  তাই জায়গাটি আলোকিত,  দুজন ভদ্রলোক লেইকের কিনারে বেঞ্চিতে বসে আছে,  এখনো রাত নটা বাজেনি , নটার পর ক্যাম্পাসে স্টুডেন্টদের ঘোরাঘুরি করা নিষিদ্ধ । তারা বোধহয় স্টুডেন্ট,  ভারী জ্যাকেট ও টুপি থাকায় চেহারা একদমই অস্পষ্ট।
ম্যাথমেটিক্স কী খুব বোরিং ? লেকের পাশে একটি সাইনবোর্ড। সেখানে একটি মজার লাইন লেখা আছে। রাতের বেলাতেও লেজার লাইটের জন্য লাইনগুলো দূর থেকে দেখা যায়
 ‘∑(Love) = Undefined’

ঈরা মনে মনে ভাবছে , সিগমা (∑) দিয়ে আমি শুধু সংখ্যার যোগফল নয়, যন্ত্রণাও গুনে দেখি। Discrete হয়েও তো জীবন একটা Series।

0 মন্তব্য(গুলি):