ছোট গল্প চিরশ্রী দেবনাথ



চিরশ্রী দেবনাথ



হস্তান্তর 


 ব্যালকনিতে বসে আছি। রাত নটা বাজে।  

রাত খুব একা হয়, জিনিসটি ফিল করছি 

নতুন করে, যদিও বরাবর একাই রেখে ছিলাম নিজেকে, এটা আমার স্বভাব। 

মা না ফেরার দেশে চলে গেলেন বি এস সি পড়ার সময়। ভালোই ছিলেন মা আমার, ছোটবেলা থেকে আমি একরোখা আবেগহীন মানুষ। শিশুবয়স থেকেই আমার মধ্যে রয়েছে আশ্চর্য এক নিরাসক্ত মনোভাব। বুঝলাম টিকে থাকতে হলে পড়াশোনা করতে হবে। মনোযোগ দিয়ে তাই করতাম । এতে মা বাবার মনে হলো, আমি তাদের বাধ্য ছেলে। মা সাধ্যানুসারে ভালো মন্দ রেঁধে খাওয়াতেন। ছেলেকে যত্ন করার চেষ্টা, তবে আমার মনে হতো টাকা রোজগার করলে এসব খাবার কিনেই খাওয়া যায়, আরো ভালো মানের, তাই তেমন কোনো আহ্লাদ আসতো না মনে। মা মারা যাবার পর বাবা আরো বেশ কিছু বছর বেঁচেছিলেন, আমাকে  কয়েকটি কোর্স করালেন, চাকরির পরীক্ষায় সামিল করলেন, একটি বাইক কিনে দিলেন এবং চাকরি পাওয়ার পর আমার জন্য মেয়ে ঠিক করে বিয়ে দিয়ে দিলেন। তারপর বোধহয় কিছুদিন অপেক্ষা করেছিলেন নাতি নাতনির মুখ দেখার জন্য, কিন্তু এই ব্যাপারে আমি ওনার সাধ পূর্ণ করতে পারলাম না। যদিও আমরা, মানে আমি আর আমার বউ খুব সাবলীল ভাবেই একটি সন্তান উৎপাদনের চেষ্টা করে ছিলাম, কিন্তু হলো না। পুরনো বাড়িকে আমি নতুন করে রঙ টঙ করে নিলাম । বউয়ের নাম চিঠি, এরকম নাম কেনো ওর মা বাবা রেখেছিলেন,জানিনা। ডাকতে খুব অসুবিধে হতো, আমার আবার নাম ধরে ডাকার অভ্যেস, হ্যাঁ গো, তুমি গো বলতে পারি না, যাই হোক আস্তে আস্তে মানিয়ে নিলাম। তারপর বংশধর না পাওয়ার দুঃখ নিয়েই বাবা মারা গেলেন, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক। এখন শুধু চিঠি ও আমি। আমি অফিসে যাই, চিঠি রান্নাবান্না করে, ঘর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে, মাঝে মধ্যে বেড়াতেও যাই এখানে সেখানে। আনন্দে আছি কী দুঃখে আছি আমি আলাদা করে কিছু ফিল করতে পারতাম না। তবে চিঠির মনে খুব আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি সন্তানের জন্য। আমি এসবে বিশেষ পাত্তা দিতাম না, সন্তান থাকলেই বা কী, না থাকলেই তা কতটা দুঃসহ, তা আমার ব্যক্তিগত ইস্যু হয়ে কখনোই ওঠেনি। আস্তে আস্তে মহামারীর দিন এলো। আমাদের  শহরেও  ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত, এ বিষয়ে অবশ্য খুব সাবধানতা অবলম্বন করেছিলাম। এই প্রথম  অনুভব  করলাম  নিজেকে  ভালোবাসি । এই যে রেস্তোরাঁয়  খাওয়াদাওয়ার সুখ, কাজ থেকে ফিরে এ সি চালিয়ে আরামসে টিভিতে খেলা দেখার সুখ, নিশ্চিন্তে তোফা ঘুম দেবার সুখ, মরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব শেষ হয়ে যাবে ! তাই টিভির খবরে, হোয়াটস্ এপে আসা নানারকম কোভিড সতর্কতা,  মেনে চলার চেষ্টা করতাম। চিঠিকেও তটস্থ রাখতাম এই ব্যাপারে, কারণ রোগটা একা আসে না, স্পর্শবাহিত। 

  ফলটল খেতে লাগলাম খুব বেশি করে, অ্যালকোহল ও সামান্য ধূপপানের অভ্যাস বাদ দিয়ে যোগাসন, প্রাণায়াম, হাঁটা এসবে মন দিলাম। তবুও রক্ষা হলো না, কোভিড  আক্রমণ করল চিঠিকে। প্রথমে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতেই চিকিৎসা চলল, কিন্তু কমল না, জ্বর বাড়তে লাগল, শ্বাসকষ্ট শুরু হলো, আসলে ওর ভেতর প্রবল ডিপ্রেশন ছিল, বেঁচে ওঠার ইচ্ছেটাই চিঠির মধ্যে মরে গিয়েছিল। হাসপাতালে এডমিট করতে হলো ওকে। 

ফ্রিজ খুলে দেখলাম, প্রচুর খাবার নষ্ট হচ্ছে, সে কিছুই খেতো না তেমন।  চিঠি বাঁচল না।

কোভিড আক্রান্ত ডেডবডি বাড়িতেও  আনা হলো না। সবকিছু হাসপাতালের দায়িত্বেই শেষ হয়ে গেলো। 

আমার মনে হতে লাগল, মা বাবার পর স্ত্রীও চলে গেলো, এই প্রথম সম্পূর্ণ একা থাকার অনূভূতি । আসলে মা বাবাকেও আমার তেমন অত্যাবশ্যক মনে হয়নি। চিঠিকেও প্রথম প্রথম মনে হলো না। এখন রোজ অফিসে যেতে হয় না, রোস্টার ডিউটি চলছে। আস্তে আস্তে ঘরের কাজ করার অভ্যাস করছি। কিছুদিন যাবার পর ভাবলাম কাজ  কমিয়ে ফেলতে হবে। অধিকাংশ বাসনকোসন ও কাপড়চোপড় তুলে রাখলাম । তিনটে ঘর বন্ধ করে দিলাম । কোনোদিন রাঁধি, কখনো  হোম ডেলিভারি, যেদিন অফিস নেই ঘর পরিষ্কার করি। তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে চিঠি থাকলে একটি কমিউনিকেশন চলত বাড়িতে,এখন তা নেই। একদম নিরুদ্রপ। ব্যালকনিতে অনেকক্ষণ বসে থাকলেও কোনো ডাকাডাকি নেই।  

আমার শারীরিক সুস্থতা এবং ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের জন্য খুব নিশ্চিন্ত বোধ করি। কিন্তু আজকাল আমাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে প্রচুর সময়, পৃথিবীর অসুস্থতা শেষ হতে হয়তো আরো কিছুদিন লাগবে, তারপরই আমি  বেরিয়ে পড়ব ঘুরতে। কয়েকদিন ধরে   মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়, রাতের অবশিষ্ট সময়টুকু কাটানো মুশকিল। আগে দিনরাত খেলার  চ্যানেল নিয়ে পড়ে থাকতাম। আজকাল  টানছে না তেমন। একটি পুলিশের গাড়ি গেলো,  টহল দিচ্ছে।  আমার বাড়িতে কতকাল কেউ আসে না। মা থাকতে পাড়ার কয়েকজন মহিলা আসত, মা  মারা যাওয়ার পর তারা আর আসেনি, বাবার  কিছু বন্ধু ছিল, একসময় এসে গল্প গুজব করত, চিঠির তেমন কোন পরিচিত জন ছিল না বোধহয়,  তবে চিঠি বিষয়ে আমার কোনো স্বচ্ছ ধারণা গড়ে ওঠেনি, ওর বন্ধুবান্ধব, ব্যক্তিগত ভালোলাগা সেও কখনো বলেনি, আর আমিও জানতে চাইনি। 

 আচ্ছা আমার কি কোনো বন্ধু স্কুলের পর দীর্ঘদিনের মধ্যে এসেছে এ বাড়িতে? 

কয়েকজন ক্লাসমেটের  নাম্বার সেইভ  করা ছিল, মনে মনে ভাবলাম, কাল দিনের বেলা একটু ফোন করে দেখব তো। ভোরের দিকে ঘুম এলো,  কিন্তু গভীর ঘুম হলো না, সকালবেলা নিজের কাজকর্ম গুছোচ্ছি, চা টোস্ট খেলাম, ভাত করলাম রাইসকুকারে, ফ্রিজে মাছ ছিল, আলু পেঁয়াজ কেটে ঝোল করে নিলাম আর ডিমসেদ্ধ, যথেষ্ট রান্নাবান্না হলো, এখন ক্লিনিং।  কলিং বেলের শব্দে একটু আশ্চর্য হলাম, দরজা খুুুলে দেখি ডেলিভারি বয়, একটি প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, প্যাকেটটি চিঠির নামে, বেশ কিছুদিন আগের অর্ডার, লকডাউনের জন্য পৌঁছুতে দেরি, টাকাও দেওয়া আছে। একবার ভাবলাম রিটার্ন করে দিই, যে দিয়েছে সেতো আর এই জগতে নেই।  তারপর মনে হলো থাক,  রেখে দিই।  প্যাকেটের ওপরে স্প্রে করে, বাইরে রোদে রাখলাম।   বিকেলে অফিস থেকে ফিরে খেয়াল  হলো প্যাকেটটি সম্পর্কে , কাচি দিয়ে সন্তর্পণে কাটলাম,  একটি সিল্কের শাড়ি, ভায়োলেট  কালারের।  চিঠি ছিল শ্যামবর্ণা, কী মনে করে এই রঙ অর্ডার দিয়েছিল কে জানে, যাক গে। রিটার্ন করে দেবো। এইসময় হঠাৎ ফোন এলো,  অফিস থেকে, কথা বলতে বলতে ভুলে গিয়েছি, সেদিন আর রিটার্ন  দেওয়া হলো না, তাছাড়া এজন্য আমাকে চিঠির মোবাইল ঘাঁটতে হবে , দূর, তখনই কী জিনিস জিজ্ঞেস করে ফেরত দিয়ে দিলে হতো। টাকা ফেরত না পেলেও হতো আমার। পরদিনও নানা কাজে কেবলি ভুলে যাচ্ছি। বিকেলের দিকে গেটে শুনলাম কেউ শব্দ করছে, গ্রিলটা ঝাঁকাচ্ছে ।  সন্ধ্যা ছ'টা থেকেই কার্ফু শুরু হয়ে যায়, তাই আমি অফিস থেকে ফিরেই লক করে রাখি সব।

 সোয়া পাঁচটা বাজে। 

 একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে, চিঠির মতোই বয়স হবে বা আরো কম, কী ব্যাপার? মেয়েটি গেটের বাইরে থেকে সংক্ষেপে যা বলল, তা হলো, এ পাড়াতেই ওদের বাড়ি , চিঠির সঙ্গে দেখা করতে আমার বাড়িতে দুপুরের দিকে মাঝে মাঝে আসত, চিঠিও যেতো, চিঠি ওর হয়ে একটি শাড়ির অর্ডার দিয়েছিল, টাকাও চিঠি দিয়েছিল, যদি শাড়িটি এসে থাকে, তবে সে আমার কাছে টাকা দিয়ে শাড়িটি নিয়ে যেতে চায়। চিঠির মৃত্যুতে সে এবং তার পরিবারের সবাই খুব দুঃখিত, তাদের কাছে আমার বউ ছিল একজন ভীষণ প্রিয় মানুষ, আর শাড়িটির রঙ হল, ভায়োলেট। 

আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে শাড়িটি এনে ওকে দিয়ে দিলাম, মেয়েটি কিন্তু গেলো না, আমার দিকে টাকা এগিয়ে দিল, আমার কেনো যেন মনে হলো, টাকাটা নেওয়া উচিত হবে না, তাই আমি না করলাম, ও শুনল না, জোর করে হাতে গুঁজে দিলো, আমার নাম্বার নিলো, ওর নাম্বারও দিলো,  বার বার বলল ওদের বাড়িতে যেতে, কোনো অসুবিধে হলে বলতে। আমি এসব বিশেষ পাত্তা দিলাম না।

দু তিনদিন পর আবারও আর একজন, এক বৃদ্ধা, তাকে নাকি চিঠি প্রায়ই খাওয়াতো, পুরনো কাপড় দিতো। সে'ও এসে খুব দুঃখ করতে লাগল। এই আসা কিন্তু শেষ হলো না, একমাসের মধ্যে বহু লোক এলো, তারা  খুব আহামরি কেউ নয়, পাড়া এবং আশেপাশের নানান লোক, প্রত্যেকের সঙ্গেই চিঠি কোনো না কোনোভাবে নিজেকে জুড়ে রেখেছিল, সবাই যেন তার বন্ধু, আমার বিরক্ত লাগলেও কথা বলতে হলো, তবে এই ব্যাপারটিতে আমিও আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হলাম, সবাই যে সাহায্যপ্রার্থী, তা নয়, কেউ কেউ আমার জন্য শাক সব্জিও নিয়ে এলেন, আমি অবশ্য এগুলো প্রত্যাখ্যান করলাম, তবে চিঠির সূত্রে এখন আমার বাড়ির কলিং বেল প্রায়ই বেজে ওঠে, আমি তাদের সবাইকেই মাঝে মাঝে আসতে বললাম। তারমধ্যে একদিন রান্নাঘরের জানলায় দেখলাম, দুটো বুলবুলি পাখি, কী মনে হতে জানলার বাইরে উঁকি দিয়ে দেখি দুটো বাটি রাখা।  

বুঝে গেলাম, কিছু চাল আর জল রাখলাম দুই বাটিতে। আজকাল মনে হতে লাগল, আমি যেন চিঠির পরিবারে বাস করছি। একদিন ভাবলাম ঐ মেয়েটির বাড়ি যাই, যে শাড়ি নিতে এসেছিল, দেখি গিয়ে ।  রিং করলাম। মেয়েটি জানালো ওর নাম  চুমকি, খুব খুশি হলো। জীবনে প্রথম আমি আমার পাড়ার কারো বাড়িতে গেলাম। ওরা চা, মিষ্টি  খেতে দিলো, আসতে বলল। চুমকির  মা বাবা খুবই স্নেহপ্রবণ, আমার মা বাবাকেও চিনতেন,  আর চিঠি বিষয়ে তারা এতো বললেন, আমার কেনো জানি খুব লজ্জা করতে লাগল । ফিরে এলাম  চিঠির সংসারে,  দীর্ঘ দীর্ঘ সময়গুলো  কীভাবে  কাটাবো  আমি ? আবার নতুন করে  শুরু করবো? কিন্তু কেমন করে জীবন শুরু করে ?  

দেখলাম রান্নাঘরের জানলায় দুটো বুলবুলি নিশ্চিন্ত মনে আমার দেওয়া চাল খাচ্ছে, আসলে আমার না, অভ্যাস করিয়েছিল অন্য কেউ, তাকে চিনিনি আমি।

খুব জোরে চিৎকার করলাম, বাইরে আওয়াজ এলো না, ভেতরেই রইল, প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আমার অস্থিমজ্জায়।

 বলতে পারেন আমার মতো মানুষগুলোকে কেন পৃথিবীতে পাঠানো হয়, যারা আমাকে বড় করেছিল, তারা কোথায়? খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলি, কিন্তু খোলসটা রেখে  আজ তারা অনেক দূরে।

দিনগুলো কাটছে যেমন তেমন ভাবে। 

একদিন কয়েকটি ছেলে এলো আমার কাছে, কোভিড  রিলিফ ফান্ড, শ্রমজীবীদের সাহায্য করার জন্য এবং অসহায় কোভিড পেশেন্টদের জন্য। টাকা নেওয়ার ফন্দি নয়তো?  তবুও এড়িয়ে গেলাম না, কেমন করে যেন জুড়ে গেলাম ওদের সঙ্গে,  প্রাণ বাঁচানোর ভয়টা আর আমার নেই। 

দুদিন ধরে  খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, রাতে বুঝলাম  জ্বর আসছে প্রবল, চুমকিকে ফোনে কী বলেছিলাম জানিনা, তারপর জ্ঞান হারালাম। 

যখন আবছা চোখে আবার দেখতে শুরু করলাম সবকিছু, মনে হলো নিজের বাড়িই, কিছু ছেলে মেয়ে আমার চারপাশে, অবশ্যই সবার মুখে মাস্ক, একজন পি পি ই কিট পরা, সে আমাকে ফলের রস জাতীয় কিছু খাওয়াচ্ছে। তার মানে বেঁচে গেছি।

পনের কুড়িদিন ধরে দুর্বলতার বিভিন্ন ধাপ পেরোচ্ছি, নানা জনের বাড়ি থেকে খাবার আসছে। 

আজ প্রখর গ্রীষ্মের এক বিকেলে চুমকিকে বললাম, ভায়োলেট কালারের সিল্কের শাড়িটা একদিন পরে আসবে?

চুমকি হাসতে হাসতে বলল, কাকে দেখতে চান, আমাকে না চিঠি দিদিকে?

আমি আস্তে আস্তে বললাম, বলতে পারো চুমকি এটা কি কোনও প্র্যাকটিকেল গেম ছিল?   যার মধ্যে আমাকে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে চিঠি !




Chirasree Debnath

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি পর্ব নয়

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 


পর্ব নয়


গান ভালোবাসো ? স্লো মিউজিক চালালেন তিনি।

ঈরার এখন মনে হচ্ছে সে কেন এসেছে এই নির্জন বাংলোয় অচেনা একজন পুরুষের সঙ্গে।

আরষ্ট হয়ে বসে আছে। কিছু বলার নেই। আগে মনে হয়েছিল খুব ভালো লাগবে । উন্মুখ কোন মুহূর্ত তার জন্য অপেক্ষা করছে। 

স্যার আপনার মিসেস আর ছেলেমেয়ে?

আমি কখন থেকে অপেক্ষা করছি হোয়েন ই্যয়ু আস্কড দ্য কোয়েশ্চন। ফাইনেলি জিজ্ঞেস করলে তুমি, যা থেকে বুঝলাম তুমিও গড়পড়তা বাঙালি মেয়ের মতো , যার মধ্যে কোন অ্যাডভেঞ্চার নেই।

করো । ভালো করে পি এইচ ডি করো। মা বাবার গুড গার্ল মেয়ে ।

কি অ্যাডভেঞ্চার?  

তুমি কি কিছুই বোঝ না ঈরা  ?  কেন এলে এখানে?  তবে স্যান্ডুইচ ইজ গুড। খেতে পারো।

জল খাও। চাইলে হালকা ড্রিংকও নিতে পারো। আমি নেবো একটা।

ঈরা উঠে গিয়ে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালো, পাহাড়গুলোর ওপর জনবসতি রয়েছে।  জায়গাটায় কেন জানি  এখনো কুয়াশা জাঁকিয়ে পড়েনি, এই পর্বতশ্রেণি গ্রেটার হিমালয় পর্বতমালারই অংশ। বাড়িঘরগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। পাইনগাছগুলোর মাথায় মাথায় সূর্যাস্তের প্রস্তুতি।  গোধূলির হালকা হালকা আলো লেগে আছে। চারদিক অপূর্ব সুন্দর।

ঈরা যে এই মানুষটাকে কিছু না ভেবে ভালোবেসে ফেলল,  ভালোবাসা তো কিছু না ভেবেই হয়,   এখন কি তার একটি ব্যক্তিগত সেতার হবে যা  শুধু ব্যথার সুর বাজাবে । 

কেয়ারটেকার ট্রেতে করে কিছু একটা নিয়ে এসেছে,  ঈরা পেছন ফিরে তাকালো না,  খুব সম্ভবত ড্রিংক ।

 নিজেকে অদ্ভুত লাগছে , একজন আদর্শ শিক্ষক পরিবারের মেয়ে হয়ে সে এরকম ভুলভাল প্রেমে কেন পড়ল ? শিক্ষককে তো শ্রদ্ধা করতে হয় ,  এটাই ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছে সে। অবশ্য স্যার তো জানেন না যে ঈরা ওনাকে অন্যচোখে দেখে , ভাগ্যিস মনের ভেতরটা কেউ দেখতে পায় না।

কি দেখছ?  কী সুন্দর না এই সন্ধ্যার সময়টা,  আস্তে করে আমাদের জীবন থেকে একটি দিন চলে যায়,  আর ফিরে আসে না,  তুমি এতো চুপচাপ কেন ঈরা ? ভয় পাচ্ছো আমাকে?

না,  না স্যার ভয় পাবো কেনো?  খুব ভালো লাগছে ।

তোমার একটুও ভালো লাগছে না,  আমি জানি।

তোমাকে দুটো প্রশ্ন করি,  শুধু সত্য কথাটাই বলবে ।


করুন। 


তুমি  আমাকে ভালোবাসো ? যদি ভালোবাসো তবে কেন? উত্তর দিতে হবে।

ঈরা থমকে গেলো। এভাবে ধরা পরে যাবে এটা সে আগে ভাবেনি ।

দাও উত্তর দাও এবার। মৌনতা আমি পছন্দ করি না।

তিনি দুহাত দিয়ে ঈরাকে নিজের দিকে ফেরালেন।

ঈরার সামনে এখন বছর চুয়াল্লিশ পঁয়তাল্লিশের একজন ঝকঝকে মেধাবী দীর্ঘকায় তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। তাকে ভালো না বাসলে ঈরার মতো মেয়ে আর কাকে ভালোবাসবে  ?

চোখ বন্ধ করে অস্ফুট স্বরে ঈরা বলে ফেলল ,

হ্যাঁ বাসি ।খুব ভালোবাসি ।

তাই?

বহুদিন আগে আমি যখন তোমার মতো বয়সী ছিলাম,  আরো একটি মেয়ে এই কথা বলেছিল আমাকে। তারপর … সেই মেয়েটাকে আমি আজো হারাতে পারিনি, কিন্তু ভালোবাসা হারিয়ে

গেছে। 

আচ্ছা পি এইচ ডির সুবিধার জন্য ভালোবাসো নাতো?

না স্যার,  আমি এমনি ভালোবাসি । শুধু ভালোবাসি , আমাকে কিছু দিতে হবে না।

তাহলে কেমন করে হলো?  ভালোবাসা মানে দেওয়া আর নেওয়া। শুষ্ক নদীতে যদি জলই না এনে দিতে পারলে তবে ভালোবাসব কেন তোমাকে?

আসলে জানো ঈরা , আমি খুব সেলফিস আমার প্রফেসনে। নিজের চেয়ে মেধাবী কাউকে আমি সহ্য করতে পারি না।

বহুকাল আগের সেই মেয়েটিও কি আপনার চেয়ে মেধাবী ছিল?

এই মেয়ে , তুমি প্রশ্ন করলেই আমি উত্তর দেবো নাকি?  হু ? 

চলো তোমাকে বাংলোটা দেখাই। মাঝে মাঝে আসবে তো? কথা বলব । রাজি তো? 

কিন্তু স্যার!

যা ভেবেছিলাম , আসলে তুমি ভালোবাসা কি জানো না। সময় দিতে হয়,  একজন আর একজনকে সময় দিয়ে কিছুক্ষণ হাত ধরে বসতে হয়। ভালোবাসা শুরু হওয়া মানে কাছে আসা। আমার ইমোশন খুব তীব্র। লঘু আবেগ  পছন্দ নয়। আর তার চাইতেও অপছন্দ করি ন্যাকামি।

তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম,  তুমি হ্যাঁ বলেছো । না বললেই তো ল্যাঠা চুকে যেতো তোমার। হোক মিথ্যে , আমি কিছু বলতাম না। কিন্তু তুমি হ্যাঁ বলেছো ,তার মানে শুরু,  এগিয়ে যাওয়া কোন একটা পথে। 

চলুন বাংলোটা দেখি।

কথা ঘোরাচ্ছো। তোমার মতো বুদ্ধিমতী মেয়েদের এইজন্য আমি পছন্দ করিনা। তোমরা দাবার ছকের মতো ভাবো । এই অঞ্চলের 

পাহাড়ি মেয়েদের দেখেছো?  উৎসবের রাতে তারা উদ্দাম মানবমানবী। পরের দিন সকালে কেউ এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করে না।

তোমাদের মধ্যে এতো দ্বিধা কেন। একদিনের জন্য হলেও তো আলাদা কোন সত্তা হতে পারো!


সেটা তো ভোগ হলো তাই না?


তাই বুঝি ?


হ্যাঁ, এতো দ্রুত কি সব হয়?


 কি হয়?  কি হয় বলো ঈরা , বলো ঈরা ! 

আমাকে কি তুমি এইমাত্র ভলোবাসলে ? 

অনেকটা দিন ধরে তোমার মনের মধ্যে এটা চলছিল,   আজ সুন্দর একটা মুহূর্তে বের হলো,  তাহলে কম্প্লিট প্রসেসটা তো  ছোট নয়?

ঈরার মনে হলো সে এখন একটা খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে, না বলার শক্তি নেই,  হ্যাঁ বলার সাহস নেই। আজকের দিনটা তাকে একটা

অনাবিষ্কৃত ওয়েবলেংথে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।


চলো ঈরা , তোমাকে ক্যাম্পাসে নিয়ে যাই। এখন না রওনা দিলে রাত হয়ে যাবে। আমি চাইনা আমার সঙ্গে তোমার নাম জড়িয়ে কিছু একটা প্রচার হোক। আমি তোমাকে বাজারে নামিয়ে দেবো। তুমি সেখান থেকে হেঁটে চলে যাবে।

অন্য কোন সময় আমরা আবার আসব এখানে।

আসবে তো তুমি? 


হ্যাঁ।


তিনি হাসলেন। দেখা যাক। 


বাংলোর সীমানা ছাড়িয়ে গাড়ি অনেক দূরে চলে এসেছে। রাস্তা নির্জন। পাহাড়ি বাঁকগুলোকে লক্ষ্য রেখে খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে মিঃ অনিকেত মুখার্জিকে । এখন দূর থেকে নিচের পাহাড়ে বাজারের দোকানপাটের আলো দেখা যাচ্ছে। আর অনেকগুলো ফ্লাড লাইটের আলোয় যেন ঝলমল করছে  EIMS এর ক্যাম্পাস।


 তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরি ?

চমকে উঠল ঈরা ।

হঠাৎই গাড়ি ব্রেক কষল।

 

ঈরা কিছু বলার সুযোগ পেল না । তিনি জড়িয়ে ধরলেন ঈরাকে । অজস্র চুম্বনে ঈরা যেন হারিয়ে গেলো মুহূর্তে । একসময় দুটো পেলব হাত আস্তে করে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিলো অনিকেতকে। একটি নরম কবুতরের মতো ঈরা দুটো শক্ত বাহুতে নিজেকে সমর্পন করে দিলো।

প্রবল আশ্লেষে ঈরার বুকে নাভিতে চুমু খেতে লাগলেন তিনি। কতক্ষণ এভাবে কেটেছে জানে না ঈরা । চরাচর কি এইসময় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোন গাড়ি আসেনি এই পথে  কিংবা দু একজন পথচারী ?

আধঘন্টা , পৌনে এক ঘন্টা ,  এটা কি কোনও সৌরঝড়? 

ঈরার উন্মুক্ত স্তনাগ্রে মাথা রেখে একসময় অনিকেত মৃদুকন্ঠে  বললেন তোমার মেধার মতোই তুমি সুন্দর , আমাকে এরপর থেকে কি তুমি শুধুই ঘৃণা করবে ঈরা ?


হোস্টেলে নিজের রুমে এসে ঈরা দেখল কুহু রুম সিফ্ট করে নিয়েছে। ওর দুটো সুটকেস আর বইপত্রগুলো নেই। মেট্রনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল ঈরা । কুহু জয়ীর রুমে সিফ্ট হয়েছে,  জয়ী প্রথম থেকেই একা থাকত। আপাতত সে কুহুর সঙ্গে রুম শেয়ার করতে রাজি।

ঈরা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল । কাউকে সঙ্গে নিয়ে থাকতে তার দমবন্ধ হয়ে আসছিল আজকাল।

দরজা লক করে বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল সে। আজকের দিনটি তাকে ঈশ্বর দিয়েছেন । এরপর আর কিছু চাওয়ার নেই। একটিমাত্র স্পর্শ লেগে থাক এই দেহ চরাচরে।

পৃথিবীর কাউকে সে বলবে না কিছু , অচেনা পথের বাঁকে নির্জন পাহাড় জানে শুধু কিছু উন্মত্ততা , আর পাহাড় তো চিরকালই মৌন ।





সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , চিরশ্রী দেবনাথ


সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , দশম পর্ব,  চিরশ্রী দেবনাথ


পর্ব দশ



অনন্তনাগের কাঠের ছোট্ট দোতলা বাড়িটির জানলা খুললেই গম্ভীর পাহাড়ের সারি। ঝুলন্ত বারান্দা পেরিয়ে ঘরের ভেতর  ছোট্ট পড়ার টেবিল। হিম ভেঙে আসা কয়েকটুকরো দুর্লভ রোদ সেখানে ছায়ার. সঙ্গে  গোপন আঁতাত তৈরি করে। 

জাহানারার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মধ্যম জাহানারা,  যার গোলাপি মসৃণ ত্বকে ঝকঝক করছে তারুণ্যের দীপ্তি। ঠোঁটদুটো কোন রঙ ছাড়াই কেমন যেন রক্তাভ লাল. মাথায় ওড়নার আবরণ ঠেলে প্রায়ই বাইরে বেরিয়ে আসে কিছু অবাধ্য রেশমি চুল। জাহানারা উচ্ছ্বল তরুণী নয়।  গভীর চিন্তায় ডুবে থাকে সারাক্ষণ।  চারটি লেটার নিয়ে টেন পাশ করেছে, রহমত মহম্মদের  ছেলেমেয়েদের মধ্যে দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্যক্রমে মেয়েটিই সবচেয়ে পড়ায় ভালো । জাহানারার পরিবারের সবাই চায় সে মেডিকেলে যাক। এই শহরের মেয়ে ডাক্তারি পাশ করে এখানেই ডাক্তার হয়ে ফিরে আসুক,  এরকম একটা গর্বের স্বপ্ন দেখতে দেখতে জাহানারার মা শাকিনা বেগম ঘুমোয়।

মার্চমাসে স্বর্গের মতো হয়ে ওঠে এই ঝিলম নদীর উপত্যকা,  লিডার নদীর অববাহিকা।

আমন্ড বাদামের ফুলে ফুলে ছাওয়া গোলাপি বসন্ত , বরফাবৃত হিমালয়ের শৃঙ্গ, আরো অজস্র ফুলের সমারোহে যখন মাঝেমধ্যেই গর্জে ওঠে বন্দুক , কোথাও আচমকাই জ্বলে ওঠে বিস্ফোরণের আগুন,  পুলওমার সীমান্তে চলতে থাকে গোলাগুলি তখনই আবার রাতের অন্ধকারে কারা যেন খাবার দেওয়ার হুকুম দেয় ।  জাহানারাকে বাইরে বেরোতে দেওয়া হয় না। ভাইদেরও লুকিয়ে রাখা হয় ঘরে। আম্মু নিভে যাওয়া কাঠের উনুন আবার ধরায়, মোটা মোটা নরম রুটি আর ভেড়ার মাংস রান্না করে, জমিয়ে রাখা দুধের সরের খোঁজ পড়ে,  কাঁপা কাঁপা হাতে শাকিনা বেগম টিফিন কৌটো বের করে,  বাচ্চাদের জন্য জমানো,  কি আর করা। 

ওপরের ছোট্ট জানলাটা একটু ফাঁক করে জাহানারা বশির দেখে বন্দুক নামিয়ে লোক 

গুলো খাচ্ছে,   হিংস্র লাল চোখগুলো বলে দেয় তারা ভারতবর্ষকে ভালোবাসে না। উঠোনের আপেল গাছটা থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে নেয় আপেলগুলো,  ডালপালা ভেঙে যায়, ঝুড়ির মধ্যে রাখা ভুট্টা গাজর হামলে পড়ে নিয়ে নেয় ব্যাগে তারপর ভোরের আলো ফোটার আগেই বের হয়ে যায়। দু একজন ঘাড় উঁচু করে অনেকক্ষণ ধরে দেখতে থাকে দোতলার ঘরটিকে,  আম্মা বলে রাখে হালকা আলোও যেন না জ্বলে তবুও ফয়জল নামের একটি ছেলে জানে ঐ ঘরটিতে জাহানারা বলে কেউ আছে যে খুব ভালো অংক কষতে পারে।

হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে জাহানারা বশির । অনন্তনাগ জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর পায়। ম্যাথসে একশতে একশ। সাংবাদিকরা বার বার বলতে থাকে সংখ্যালঘু ফ্যামিলি থেকে উঠে আসা এক গণিতপ্রিয়ার নাম। টিভির পর্দায় নিজের নাম শুনে কেমন যেন কুঁকড়ে থাকে জাহানারা। 

আপেল গাছ আর অ্যামন্ড বাদামের ফুলে ছাওয়া তার ছোট্ট বাড়িটিকে যেন জাহানারা হিমালয়ের রুপোলি কুয়াশা দিয়ে ঢেকে রাখতে চায়। সে চায় না তাকে কেউ চিনুক। তার ভাইদের কেউ দেখুক। তারা যেন নিঃশব্দে বড় হয়ে চলে যেতে পারে কোন শান্তির জায়গায়, বড়ো শহরে যেখানে রাত হলে গুলির আওয়াজ আসে না , 

আর্মিদের বুটের আওয়াজে মচ মচ করে ওঠে না চিনার গাছের পাতা ঝরানো বসন্তপথ ।

কিন্তু মেধা অনেকটা সুগন্ধের মতো । তাকে চেপে রাখা যায় না। যে খবর প্রতিবেশি জানেনা তা পৌঁছে যায় ভারতবাসীর কাছ। 

 খবরের কাগজে নাম ওঠে । আজ তক চ্যানেল থেকে সাংবাদিক আসে। জাহানারার ছবির মতো বাড়ি সংবাদপাঠিকার চিৎকারে কেমন যেন ভয়ার্ত হয়ে ওঠে ।

হিজাবে ঢাকা মুখ , অনুরোধেও মুখ দেখাতে চায় না জাহানারা,  মেধাবী মেয়ের আম্মার মুখও ক্যামেরার আলোর সামনে ঝলসাতে চায় না।

গভীর রাতে অংক কষা মেয়েটি নিভৃত সংখ্যার কাছে শুধু নিজেকে সমর্পন করতে চায়। 

মেডিকেল পড়তে হবে। সবাই ধরে নিয়েছে জাহানারা বশির ডাক্তার হবে।

কিন্ত মেয়েটি কলেজে ভর্তি হয় নন মেডিকেল কোর্সে,  বি এস সি ম্যাথস মেজর রেখে।

শাকিনা বেগম হতাশ , শাকিনার বাবা ভাবতে থাকেন এ কোন বিপদে পড়লাম। মেয়ে কী না অংক করবে। বংশে একজনই এসেছে পড়ায় ভালো  , এত্তো বড়ো সুযোগটা হেলায় সরিয়ে দিলো জাহানারা !

অনন্তনাগের সরকারি মহিলা কলেজ জাহানারার জন্য যেন মুক্তির প্রথম জানালা। যুদ্ধক্ষেত্রের মতো সময়ের মধ্যে একটি নিঃশব্দ আশ্রয়।  সংখ্যার  নিখুঁত  যুক্তি, আর জ্যামিতির ভেতরের সৌন্দর্য , গ্রুপ থিয়োরি  তাকে টানত এক রহস্যময়তার দিকে। জাহানারার আব্বা তখন আর তার পেছনে টাকা খরচ করতে চাইতেন না,  স্কলারশিপই ছিল ওর ভরসা ।


অংকের সমাধান   মিলে গেলে , জাহানারার চোখে ভেসে উঠত শান্তির ছবি—যেন গোলাগুলির শব্দের বাইরে, হিমালয়ের পায়ের তলায় সে একা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে বিজয়মাল্য।

এভাবে যদি কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করা যেত। 


কিন্তু গবেষণায় আগ্রহ জন্মায় একদিন ক্লাসে একটি বিষয় শেখার সময়। অধ্যাপক বলছিলেন ইলিপটিক কার্ভ ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে যা ফিউচারের কমিউনিকেশনের নিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে এবং আজ যারা অংক নিয়ে পড়াশোনা করছে ভবিষ্যতে তাদের কাছে হবে এটা একটা চ্যালেঞ্জিং বিষয় , এই ব্যাপারে গবেষণা করতে পারলে প্রচুর সুযোগ রয়েছে কাজের। ডিজিটাল পৃথিবীর বর্ম হবে এ সংক্রান্ত কাজ। তখন থেকেই জাহানারার ভেতরে সুপ্ত ইচ্ছে জেগে ওঠে সে মনে মনে ভাবত —“আমি এগুলো নিয়েই কাজ করতে চাই।"

এদিকে ধীরে ধীরে আম্মা আব্বা জাহানারার পাশ থেকে সরে যাচ্ছে,  এইসব বিষয়ে পড়াশোনা করে তো জাহানারা টিচারও হতে পারবে না এই ছিল তাদের ধারণা। কিন্তু সংখ্যালঘু ছাত্রী ও মেধার জোরে জাহানারা নিয়মিত স্টাইপেন্ড পাচ্ছে পাশাপাশি সে নানা কোচিং সেন্টারে অংক করিয়ে ভালোভাবেই পড়ার খরচ চালাচ্ছিল।

জাহানারার লক্ষ্য ছিল কাশ্মীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া। ভূস্বর্গ নয় এ যেন এক জেলখানা। মাঝে মাঝে তার ইচ্ছে করত নাম বদলে কোন নিউট্রাল নাম নিতে। নিজের জাতি,  জন্মস্থান,  আব্বা আম্মা সবার থেকে দূরে গিয়ে জাহানারা হয়ে উঠতে চাইছিল অন্য পৃথিবীর মানুষ ।

পরিবার থেকে একরকম অভিমান করেই জাহানারা ভর্তি হলো  কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে । এ  তার দ্বিতীয় মুক্তি ।

শ্রীনগরে হজরতবাল ইউনিভার্সিটিতে-এ এমএসসি শুরু করার পর, জাহানারা আরও একধাপ কাছে যায়  স্বপ্নের দিকে। সেই ক্যাম্পাসে আধুনিক লাইব্রেরি ছিল, আর ছিল স্বাধীনতা। সে ক্রিপ্টোগ্রাফির বিখ্যাত কিছু জার্নাল পড়তে শুরু করে—RSA, Diffie-Hellman, Symmetric Key vs Asymmetric Key ইত্যাদি নিয়ে। 

তার M.Sc-র দ্বিতীয় বর্ষে একদিন প্রফেসর দানিশ হোসেইনি ক্লাস নিতে এসেছিলেন—তিনি কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি প্রফেসর হিসেবে এসেছিলেন সেই সময়। তার লেকচারের বিষয় ছিল  "Mathematics beyond Numbers: An Introduction to Post-Quantum Cryptography." 

ক্লাসের শেষে জাহানারার প্রশ্ন শুনে তিনি থমকে গিয়েছিলেন—

“স্যার, তাহলে কি আজকের সবচেয়ে জনপ্রিয় encryption systems—RSA বা ECC—একদিন কোয়ান্টাম কম্পিউটারে পুরোপুরি অকেজো হয়ে যাবে?”


প্রফেসর দানিশ হেসে বলেছিলেন, “তুমি যদি এই প্রশ্নটা করতে পারো, তাহলে তুমি EIMS-এ আমার সঙ্গে কাজ করতে পার। কী বলো, জাহানারা বশির?”

সেই মুহূর্তেই জাহানারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

কিন্তু কাশ্মীরে যারা জন্ম নেয় তাদের পায়ে এক অদৃশ্য আগ্নেয় শিকল থাকে যা জন্মদাগের মতো সারা জীবন ধাওয়া করে পেছন পেছন  । জাহানারা যখন নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে আর তখনই অচেনা এক সুতো তাকে টেনে নিয়ে আসছে অতল গহ্বরের দিকে। 


তুম্ ক্রিপ্টোসিস্টেম মে ইন্টারেস্ট রাখতি হো?


চমকে উঠল জাহানারা।   বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পুরনো এক টেবিলে বসে সে একমনে পড়ছিল নাম্বার থিয়োরি ইন ক্রিপ্টোগ্রাফি , সেই রহস্য থেকে বর্তমানে ফিরে আসতে  একটু সময় লাগল ,  বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখল  তার সামনে এক অচেনা ছেলে,  চোখে বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি,  মুখে হালকা দাড়ি , হাতে একটি বই , দ্য কোড বুক বাই সাইমন সিং।


ছেলেটি আবার বলল ,

তুম ক্রিপ্টোসিস্টেম পর কাম কর রহি হো?



জাহানারা বিরক্ত বোধ করলেও  মাথা নাড়ল। যদিও জাহানারার কথা বলার একদমই ইচ্ছে নেই তবুও বলল ,



ঔর আপ?


মেরা নাম ফয়জল হ্যায়। ম্যায় হিস্ট্রি মে মাস্টার্স কর রাহা হুঁ। লেকিন কোডিং মুঝে বহুত আকর্ষিত করতা হ্যায়।

তুম জানতি হো? হার এক অ্যালগরিদম আসলে এক শাসনব্যবস্থা হোতা হ্যায়।"



নাহি, জানতি নেহি হুঁ। অভি মুঝে পড়নে দো, প্লিজ।


ওকে, ম্যায় কোই ডিস্টার্ব করনেওয়ালা লড়কা নেহি হুঁ।

তুম তো ফেমাস গার্ল হো। পেপার মে তুমহারি ফটো আঈ থি,তব সে জানতা হুঁ তুমহে।

ম্যায় তুমহারা আশপাশ হুঁ, লেকিন তুমকো কভি পাতা নেহি চলা।

তুম এক খোয়ি হুয়ি লড়কি হো — ইসিলিয়ে শায়দ মেরা দিল তুমহারি তরফ খিঁচতা হ্যায়।


লেকিন মুঝে খিঁচতা নেহি।


ফয়জল হালকা হেসে বলেছিল


তো?


জাহানারা এড়াতে পারেনি ফয়জলকে। এক অদ্ভুত কথোপকথনের মধ্যে ফেঁসে যায় সে, তবে বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তার জন্য ফয়জলকে তার ভালো লাগত তাছাড়া সে এইসময় ছিল অনেকটাই নিঃসঙ্গ , পরিবার থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ।

 মাঝে মাঝেই ক্যাফেটেরিয়ায়, লাইব্রেরির করিডোরে দেখা হত তাদের। ফয়জল তাকে RSA-র পলিটিক্যাল ইমপ্লিকেশন নিয়ে প্রশ্ন করত, বলত— “Cryptography isn’t just mathematics. It’s about control. যারা এনক্রিপশন বোঝে, তারাই নিয়ন্ত্রণ করে তথ্য।”

জাহানারার মধ্যে দ্বিধা জন্মাতে থাকে —সে বুঝতে পারে না, ফয়জল কী বলতে চায় ।


একদিন সন্ধ্যাবেলায় তারা দু’জন হাঁটছিল ডাল লেকের পাড় ধরে। ফয়জল হঠাৎ বলে বসে—


তুম জানতি হো, কুছ লোগ তুম্পে নজর রাখ রাহে হ্যায়। তুম কি ইয়কিন সে কহ্ সকতি হো কি সিরফ রিসার্চ হি কর রহি হো?"


তুম কয়া ইশারা দে রাহে হো?


কুছ অ্যালগরিদম অ্যায়সে জগহ পে কাম করতে হ্যাঁ, জাহাঁ তুম সোস ভি নেহি সকতে।

তুম জো সোসতি হো, উসসে কাই জ্যায়দা ইম্পরট্যান্ট বনতি জা রাহি হো।


সে রাতেই জাহানারা তার ল্যাপটপের ব্রাউজিং হিস্ট্রি চেক করে। অদ্ভুত কিছু আইপি, অজানা লগ... যেন কেউ সত্যিই চোখ রেখে চলেছে।

জাহানারা ফয়জলকে ভয় পেতে শুরু করে। তার মনে হয় যত দ্রুত সম্ভব তাকে কাশ্মীর ছাড়তে হবে। এম এস সির লাস্ট সেমিস্টারেই জাহানারা জে আর এফ কোয়ালিফাই করে । আর তারপর  জাহানারা পায় Eastern Institute of Mathematical Sciences (EIMS) থেকে অফার লেটার।

PhD in Cryptographic Systems—এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হলো জাহানারার জীবনে।

 ফয়জল যেন  আর না আসে তার কাছে ।

 ব্লক , ব্লক , ব্লক । একমাত্র আম্মা আব্বা ছাড়া কাশ্মীরের সবার নাম্বার সে ব্লক করল। কেউ যাতে তার খোঁজ না পায়। কেবল সংখ্যা দিয়ে আঁকা  হোক জাহানারার শরীর।


ডাল লেকের শিকারাতে এক সন্ধ্যায় ফয়জল তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল , 


হম দোনে মিলকে এক দারুন কাম কর সকতে হ্যাঁ — জাহাঁ পয়সা ভি হোগা অউর পওয়ার ভি।



মুঝে নেহি চাহিয়ে। ম্যায় তো খুলি হাওয়া মে উড়না চাহতি হুঁ।



মগর তুম কাশ্মীর সে হো। কুছ ভি নেহি করোগি তুম কাশ্মীর কে লিয়ে?



করুঙ্গি তো মেরি দেশ কে লিয়ে। কাশ্মীর কো আলাগ কিউ সমঝতে হ্যো? ও ভি তো হিন্দ হ্যি হ্যাঁ।


 জোর করে কাছে টেনেছিল ফয়জল। জাহানারার হিজাব সরিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল ,

ইয়ে হোঁট মেরা হ্যাঁ… মেরা হি বলেগা।


হুলের মতো লেগেছিল ফয়জলের প্রথম চুম্বন। 












সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , পর্ব আট

চিরশ্রী দেবনাথ



সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 


পর্ব আট


ঈরা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল। মন প্রাণ দিয়ে সে এরকমই কিছুসময় চাইছিল। যে স্বপ্ন এবং কল্পনার জগত তৈরি হয়েছে তার মনের মধ্যে সেখানে অংক ছাড়াও রয়েছে অন্য একজন মানুয ।এই চব্বিশ বছরের জীবনে ঈরার প্রথম অবাস্তব ভালোলাগা । যার সঙ্গে তার বয়সের পার্থক্য কম করেও কুড়ি থেকে পঁচিশ বছর । কী অদ্ভুত তাই না। আজ যদি ঈরার সঙ্গে আবির বা সৌমিতাভ কারো ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠত স্বাভাবিক ছিল,  কিন্তু এমন একতরফা ভালোবাসায় ঈরা ডুবে আছে যেখান থেকে কেউ তাকে টেনে তুলতে পারবে না,  যার কোনো পরিনতি নেই,  তবুও তো ভালোবাসা মানেই সুন্দর।


তোমাকে যে কাজগুলো দিয়েছিলাম সেসব কতদূর এগোচ্ছে?


করিনি স্যার।


করোনি মানে ? তোমাকে অন্যমনস্ক দেখছি আজকাল ?


হ্যাঁ স্যার অন্যমনস্ক। খুব যেন অন্যমনস্ক হয়েই উত্তর দিল ঈরা ।


এভাবে তো চলবে না। সিরিয়াস ছিলে এখন কি এসব আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ছ নাকি?


না স্যার। ঈরা ভেতরের ঝড়কে চাপা দিচ্ছিল।  ঈরার চারপাশে এখন কোন আন্দোলন নেই, একটি লাল সতর্কতা জারি শুধু , মনসুনের বারিধারা ।


গাড়ির গতি একটু ধীর হয় , পাহাড়ের ছায়া পড়েছে , সেইসঙ্গে একটুকরো রোদ স্যারের চশমার কাচে ঝলসে উঠল  । তিনি  ঈরার দিকে তাকালেন ,

আচ্ছা, কাজের কথায় আসি। তুমি বলেছিলে, তুমি Kyber নিয়ে কাজ করছ, ঠিক? এর মধ্যে কীভাবে IND-CCA2 security নিশ্চিত করো?


ঈরা চোখ ফেরায় জানালা থেকে, গলা একটু গম্ভীর , সে তো আপনি জানেন।


সবকিছু জানিনা,  আমি তো টপিকটা শুধু ধরিয়ে দিই,  বাকি কাজ তোমাদের।

হঠাৎ ঈরার মনে হলো,  টপিকটা রেডি হতে ওর এখনো অনেক বাকি বিক্ষিপ্তভাবে দেখছিল শুধু পৃথিবীর কোথায় কোথায় এই বিষয় নিয়ে কাজ হয়েছে।  



তুমি কি জানো ঈরা, তোমার থিসিসের এখন পর্যন্ত প্রগ্রেসটা  আমি দু’বার পড়ে ফেলেছি। একবার একজন সুপারভাইজার হিসেবে, আর একবার একজন সাধারণ পাঠকের চোখ দিয়ে। খুব ভালো হয়েছে, কিন্তু আমি চাই তুমি একটা জিনিস একটু সহজ করে বলো—Kyber আর Fujisaki–Okamoto নিয়ে তুমি যা লিখেছো, সেটা যারা এই পেশায় থাকবে বুঝবে  কিন্তু জটিল  অংকের মানুষ নয় তারাও  যেন অনুভব করতে পারে ।

 স্যার, আমি সবসময় ভাবি—ক্রিপ্টোগ্রাফি আসলে একটা বিশ্বাসের গল্প। আপনি কাউকে এমন কিছু দিচ্ছেন, যেটা সে খুলতে পারবে, কিন্তু মাঝপথে কেউ যেন সেটা না খুলে ফেলে।



হুম বুঝলাম , আর Kyber?


Kyber একটা তালা। খুব শক্তপোক্ত। এমন একটি তালা, যেটা এমনকি কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়েও খোলা কঠিন। সাধারণ তালা যেমন এক চাবি দিয়ে খোলা যায়, এটাও তেমনি কিন্তু চাবিটা একটা জাদু চাবি। একবার কেউ সেটি ঠিকভাবে ব্যবহার করলেই, একটা সুরক্ষিত যোগাযোগ তৈরি হয়।



আর Fujisaki–Okamoto?


ঈরার চোখেমুখে আলো জ্বলে উঠল,  এসব সে জানে। গড়গড় করে বলতে লাগল ,

—Fujisaki–Okamoto হলো  অতিরিক্ত নিরাপত্তা বলয়। ধরুন কেউ চিঠি চুরি করল, বা এমন একটা ভুয়া চিঠি পাঠাল যাতে আমি বিভ্রান্ত হই—Fujisaki–Okamoto সেই প্রতারণার সুযোগটাই বন্ধ করে দেবে  ,

এটা Kyber-কে এমন একটা ঢাল দেয়, যেন কেউ বুঝতেই না পারে ভেতরে আসল কী আছে, এমনকি আসল আছে কিনা সেটাও না।


—তাহলে তুমি বলছো, এটি শুধু প্রযুক্তি নয়, এটা যেন আমাদের তথ্যের উপর মানুষের আস্থা রক্ষার নতুন কোন পথ। 


—ঠিক তাই স্যার। আমি চাই, এমন একটা পদ্ধতি তৈরি হোক যেখানে তথ্য শুধু গোপন নয়,  বিশ্বাসকেও রক্ষা করা যায় । 


—একটা জিনিস খুব ভালো লাগে ,  তুমি  এই জায়গাগুলো খুব lucidly ধরতে পারো। নিজের কাজের প্রতি এই clarity টা রেখো কিন্তু ঈরা ।

কি রাখবে তো?  

—মিঃ মুখার্জি সোজা তাকালেন ঈরার দিকে।

এক মুহূর্তের জন্য সেই দৃষ্টির সামনে  থমকে গেলেও , ঈরা সামলে নিল নিজেকে,  তারপর একটু ধীরে ধীরে বলল ,


“স্যার, এই কাজটা আমি শুধু থিসিস হিসেবে দেখছি না… এটা অনেকটা যুদ্ধের মতো । মেশিন আর মানুষের মধ্যে, তথ্যের মালিকানা আর নিরাপত্তার মধ্যে ।


—তোমার কথায় একটা অতিরিক্ত মাত্রা থাকে,ঈরা । যা আমি পছন্দ করিনা।   coding-এর মধ্যে কবিতা লুকিয়ে আছে নাকি?  গলে যাও কেন এতো। আবেগ রাখবে না,  ভাবো শুধু। 



“হয়তো তাই হওয়া উচিত।  আসলে কিছু ই্যকুয়েশন যেন জীবন্ত মনে হয় আমার, তারা শুধু ম্যাথস নয় , অন্য কিছু ..


—তাই?  তরুণ বয়সে আমারো তাই মনে হতো । 

বাই দ্য ওয়ে ,আমার কাছে এতো কম আসো কেন তুমি? 


মুখার্জি স্যার ঈরার দিকে তাকিয়ে বললেন ।


ঈরা চমকে উঠল একটু। 


—তুমি এখনো অনেকটাই অপরিনত,  পড়ার দিকে নয়,  তোমার আবেগের কথা বলছি ।

  কিন্তু এটা মানছি ঈরা , তুমি বিপজ্জনক মেধাবী ,  সামলে রেখো নিজেকে। ভুল দিকের আকর্ষণে যেন হেলে  না যাও। 


ঈরা মনে মনে বলল ,

—আমি যতটা নিজের মধ্যে, স্যার… ততটাই কারও ছায়ায়। এটাও একটা asymmetry ,   কাকে বোঝাই ? 


গাড়ির ভেতরে আবারো নিস্তব্ধতা। শুধু  ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ।  বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে কি  অল্প অল্প ?


বাইরে আলো আর ছায়ার খেলা।  কোথাও কোথাও নিচের উপত্যকায় জোনাকির মতো আলো জ্বলে উঠছে। পাহাড়ে কুয়াশা নামতে শুরু করলেই সন্ধ্যার আবহ তৈরি হয়ে যায়। 


—আজ যে আমার আরো কিছু সময় তোমার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছে,  থাকবে তুমি?


ঈরা অবাক হলো,  আশ্চর্য আনন্দ যেন ওকে খেয়ে ফেলছে। শেষ বিকেলের এই সূর্যটা তবে তারই।  কিন্তু ঝটপট রাজি হয়ে গেলে স্যার যদি ভাবেন সে তরল মেয়ে , অথচ মন বলছে আমি যে আরো বহু সময় আপনার সঙ্গে থাকতে চাই।


কিছুদূর গেলে একটি চার্চ আর বাংলো আছে,  ওখানে সন্ধ্যায় প্রার্থনা হয়,  আর বাংলোটি আমার আংশিক ব্যক্তিগত । ক্লান্ত হয়ে যাই যখন

এখানে এসে থাকি কয়েক ঘন্টা কখনো সারা রাত। তোমাদের মিছিলের দিনও সারাদিন ওখানে ছিলাম,  বিকেলে ফিরেছি। কেন জানি ইচ্ছে করছে তুমি কিছু সময়ের জন্য আসো ওখানে । আসবে কি?

ঈরার ভেতরের সব হিসেবনিকেশ এখন বিপর্যস্ত । যদি কেউ দেখে ফেলে,  স্যারের স্ত্রী বা ছেলেমেয়ে?  নিশ্চয়ই তারা এ পৃথিবীতে আছে কোথাও অথবা স্যার কি বিয়ে করেননি? 

জানেনা কিছুই সে। তবুও চুপ করে রইল।

ধরে নিচ্ছি তোমার নীরবতা সম্মতি,  জানি দ্বিধা আছে,  তবুও আমরা এখন সেখানে যাচ্ছি। 


গাড়ি বাঁক নেয়, মেইন রোড থেকে অন্য একটি রাস্তায় যায়, কিছুদূর যাওয়ার পর সামনে খোলা পথের পাশে একটি  পাহাড়ি বাংলো ছবির মতো ফুটে ওঠে যেন  ।  লাল নীল আলো জ্বলা চার্চ। কয়েকটি বাচ্চা খেলা করছে। 

ঈরা জানালায় ভর দিয়ে তাকিয়ে থাকে । তবে যে অন্বেষা ম্যাডাম কি একটা ইঙ্গিত করেছিলেন স্যারকে নিয়ে। সে কি ভুল পথে যাচ্ছে?  কিন্তু এখন তো ফেরা যাবে না।

কই এসো। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নাও। গাড়ির বাইরে খুব ঠান্ডা।

এই কেয়ারটুকু ঈরার ভীষণ ভালো লাগল । 

তিনি চার্চের দিকে গেলেন না। বাংলোর গেট ঠেলে ঢুকলেন। একজন কেয়ারটেকার জাতীয় লোক বেরিয়ে এলো। 

—আমাদের কফি আর স্যান্ডুইচ দাও। ডিম সেদ্ধ দিও কিন্তু।

তোমার পছন্দ না জেনে অনেকটা ব্রেকফাস্ট টাইপ অর্ডার দিলাম , তুমি কি পকোড়া জাতীয় কিছু খাবে?  তাহলে আনিয়ে দিতে বলব চার্চের পাশে একটা ছোট্ট দোকান বসে এইসময়।

নাহ্।

জানি তুমি কিছুই বলবে না। স্যার একটু হাসলেন।

এসো।

পা দুটো যেন ভারী হয়ে আসছে ঈরার । এমন সময় ফোন বেজে উঠল , বাবা , আশ্চর্য ঠিক এসময়ই!

“হ্যালো বাবা ,  গলাটা কেমন কেঁপে উঠল ঈরার ।

তুই ভালো আছিস তো? হোস্টেলে নাকি?  বেরিয়েছিস একটু? আজ ওখানে বৃষ্টি আছে?”


—না বাবা বৃষ্টি এখনো নামেনি।

 আমি একটু বাইরে বেরিয়েছি বাবা । হোস্টেলে গিয়ে ফোন করব তোমাকে।


ঈরা পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। 

একটা পুরনো দিনের সাহেবি প্যাটার্নের নির্জন বাংলোয় একজন অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে কেন চলে এলো ঈরা ? 

বড় সোফা। পাশে কাঠের ফুলদানিতে শুকনো ফুলের স্টিক।

বসো এখানে। কালচে কাঠের বড়ো বড়ো দুটো

বইয়ের আলমারিতে বহু বই রাখা। 

একমাত্র এই বইগুলোই আশ্বস্ত করল ঈরাকে , বইপড়া মানুষেরা ভালো হয় । ভয় নেই এখানে।

পছন্দের একজন মানুষের গা ঘেঁষে বসতে পারার নির্দোষ লোভ আছে শুধু , মিথ্যে কথা বলা তো এর চেয়েও বড়ো পাপ তাই না? 




#বাংলাউপন্যাস

#নভেল

#SerialNovel

#BengaliNovel

#ModernBengaliNovel

#মনস্তাত্ত্বিকউপন্যাস

#PsychologicalNovel

#অসমপ্রেম

#নিষিদ্ধভালোবাসা

#MathAndLove

#CryptographyStory

#চিরশ্রীদেবনাথ

#ChirasreeDebnath






সংখ্যার শরীরে মৌমাছি


সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

চিরশ্রী দেবনাথ

পর্ব সাত

কুহু ফিরে এসেছে। এতোদিন ঈরা ঘরটাতে আর রুমমেট নেয়নি। পুরো চার্জটাই নিজে শেয়ার করেছে। এই কুহু আগের কুহু নয়। ওর বিয়ে হয়ে গেছে,  তবে বর নিউইয়র্কে কোন একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করে,  ওখানেই  থাকে,  সেখানে এখনি কুহু যেতে পারবে না, বেশ কিছুদিন পর যেতে হবে,  পাসপোর্ট,  ভিসা এসব তৈরি করতেও সময় লাগবে ,  তাছাড়া বউকে নিয়ে যাওয়া আপাতত সম্ভব নয়। 

তবে বিয়ে করলে কেন?

কুহু বলল , উপায় ছিল না। বাবা রিটায়ার করেছে,  ছেলে উচ্চশিক্ষিত,  রোজগেরে,  মা বাবা দুজনেই বলল বিয়ে করে নিতে,  ওদের বাড়ি থেকেও খুব চাপ দিচ্ছিল।

এখন জোর করে এসেছি পড়তে,  জানো ঈরা আমি আমার হাজবেন্ডকে বিশ্বাস করতে পারছি না ঠিক,  তবে বলেছে মাসে মাসে টাকা পাঠাবে,  

আমি হ্যাঁ না কিছুই বললাম না,  আমার তো স্কলারশিপটা রয়েছে এখনো,  নষ্ট হতে দেবো না। লেগে পড়ি , তোমরা অনেকদূর এগিয়ে গেছো তাই না ঈরা ?

না কুহু,  আমি এগোতে পারছি না , আসলে,  নাহ্ থাক। ঈরা সাবধানি হলো, যে কল্পনায় ও বাস করে তার থেকে এক বিন্দুও যাতে না ছলকায়।

আমাকে একটু সাহায্য করো ঈরা , কিভাবে কোথা থেকে শুরু করব?

মিঃ কুলকার্নি তোমার স্যার ক্যালিফোর্নিয়া গেছেন,  আজ তো রবিবার। তুমি ফোন করোনি আসার আগে বা তুমি যে আবার আসছ?

করেছি ,  মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডামকে । বলেছেন আসতে । কাল ওনাদের সঙ্গে দেখা করব। আমাকে পারতেই হবে ঈরা । নাহলে এতোদিনের পরিশ্রমের কোনো দাম রইল না।


তাহলে, হুট করে বিয়েটা করে নিজেকে বেঁধে ফেললে কেন?

কোথায় বাঁধলাম , সায়ক নেয়নি আমাকে,  তাতে তো সুযোগও পেলাম পড়ার,  এখন দেখা যাক কি হয়,  মা বাবার টেনশনও দূর হলো  , সব কিছু কি জীবনে ইচ্ছেমতো হবে ঈরা ? আমার পরে আরো এক বোন ও ছোট ভাই আছে। এজন্য মা বাবার খুব টেনশন ছিল আমাকে নিয়ে।


টেনশন!!  তুমি কি সাধারণ গ্র্যাজুয়েট মেয়ে নাকি,  যার জন্য মা বাবা ছেলে খুৃৃঁজছে , তুমি এম এস সি করে নেট ক্লিয়ার করে এখানে পড়ার জন্য স্কলারশিপ পেয়েছো,  তারপর বিয়ের অজুহাত দিচ্ছো,  অনেকটা জাহানারা বশিরের মতো লাগছে কথাগুলো।  এখনই সরকারি কলেজ  না হোক বেসরকারি কলেজেই  চাকরি পেতে পারতে আর তোমার মা বাবা কিনা বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগে গেলেন , কুহু সমস্ত ব্যাপারটা কেমন যেন লাগছে । বাই দ্য ওয়ে , তোমার পার্সোনাল ম্যাটার । কিন্তু  এই কিছুদিন একা থাকতে থাকতে কমফোর্টেবল হয়ে গেছি , তাই আমি পুরো চার্জ দিয়ে একাই থাকতে চাইছি। এ ব্যাপারে মেট্রনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

ও মাই গড!  আজই এলাম আমি, আর তুমি একথা বলছ ! কেন ঈরা ? আমি কি রুম পেয়ে যাবো বললেই ?  থিতু হতে দাও. তো।

পাবে। রুম আছে,  এখানে ততটা ভিড় নেই। তুমি এখন ম্যারিড ওম্যান । হাজবেন্ডের সঙ্গে ফোনে কথা টথা বলবে , ভি ডি ও কল করবে,  আমার অসুবিধে আছে কুহু। আমি পারব না,  সরি। ধরে নাও কিছুটা স্বার্থপরও।

মেট্রন রুমে নেই। নিমা আন্টি  মেট্রনের ঘরের জিনিস পত্র মোছমুছি করছিলো , বলল মেট্রন নাকি বাড়িতে গেছে,  কাল সকালে আসবে।  যেতেই পারেন,  হয়তো কাছাকাছি কোন গ্রামে বাড়ি । নিমা আন্টির টাইটেল ভুটিয়া ,  নেপালি ও বাংলা দুই ভাষাতেই কথা বলতে পারে তাই একদিন জিজ্ঞেস করেছিল ঈরা । সকালে চা ব্রেকফাস্ট পরিবেশন করা  আরো নানা দেখভালের কাজে নিমা আন্টি ব্যস্ত থাকে,  কপালে বড় লাল টিপ পরে  , হাসিখুশি,  বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও খুব সুস্বাস্থ্য , ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে স্নেহমাখা সুরে কথা বলে , সবার দিকেই একটা খেয়াল আছে বোঝা যায় অবশ্য সে একা স্টাফ নয় আরো অনেক আছে  , প্রত্যেকেই ভালো বলে মনে হয় ঈরার ।


রবিবার হলেও ক্যাম্পাস একদম বন্ধ নেই। লাইব্রেরি আর সাইবার ক্যাফে খোলাই আছে , বেশ কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, অনেক স্টুডেন্টদেরই  নানা কাজে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে,  হয়তো লাইব্রেরিতে বা সাইবার ক্যাফেতেও  আছে কেউ কেউ।  

কী জানি হঠাৎ মনে হলো ঈরার , যাই আজ একটু ক্যাম্পাসের বাইরেটা ঘুরে আসি। শিব মন্দিরটাতে গেলে কেমন হয়?  কত দূর?  একা যাওয়া কি ঠিক হবে? দেখা যাক বাজারে গিয়ে,  নাহলে এমনিই খানিকটা ঘুরে আসবে। ব্যাগে এই হাজার খানেক টাকা আছে, গুগল পে কাজ না করলেও অসুবিধে নেই,  পাহাড়ি জায়গায় সবসময় হাতে কিছু নগদ টাকা রাখতে হয় , ক্যাম্পাসের বাইরে নেট দুর্লভ বস্তু ।   আর রুমে থাকতে ভালো লাগছে না। 

সেদিন মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা দূর এসেছিল আজ একা হাঁটছে। হাঁটা ম্যাটার না , আসলে সবার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইছে ঈরা , শান্ত মন নিয়ে পড়ার কাছে ফিরে আসবে , আগেও বড় পরীক্ষাগুলোর সময় সে এরকম অশান্ত হলে নিজের মতো করে কোন ব্রেক নিত। 


এ জায়গাটা বোধহয় এলাকার মোটরস্ট্যান্ড জাতীয়। একটি বাস ও কয়েকটি ছোট গাড়ি   দাঁড়িয়েছিল, পানের দোকানে বক্স বাজছে 

হাম তো ঠেহরে পরদেশি,  এখনও দালের মেহেন্দি শোনে মানুষ !  ঈরা  নাহয় পুরনো গানের ফ্যান। 

একটি গাড়িতে কয়েকজন লোক বসেছিল  । বোধহয় আরো প্যাসেঞ্জারের অপেক্ষা করছে, 

ঈরা একটু জোরেই বলল —

“শিব টেম্পল পে জানে বালা কউন সা গাড়ি হে?”

ঐ গাড়িটির ড্রাইভার চিল্লিয়ে বলল ,

“আইয়ে ম্যাডামজী, হম উধার হি যা রহে হ্যায়।”

  ঈরা এখন লক্ষ্য করল ঐ লোকগুলোর হাতে পুজো দেবার জন্য কিছু ফল,বেলপাতা ,ধূপকাঠি মোম ইত্যাদি মিলিয়ে ছোট ডালা রয়েছে। ঈরা উঠে পড়ল গাড়িতে।  সূর্য মধ্যগগনে । অনেকটা দিন এখনো বাকি , তাছাড়া আবহাওয়াও ভালো , বৃষ্টি নামেনি,  যদি নামে দেখা যাবে,  ছোট্ট একটা ছাতা আজ ঈরার ব্যাগে আছে। গাড়িটা দু তিনটে বাঁক নিতেই ঈরা দেখতে পেল ওদের পুরো ক্যাম্পাসটাকে। শ্রীনিবাস রামানুজন লাইব্রেরি , 

Gauss Hall, সবচেয়ে উঁচু জায়গায় ওদের সাইবার ক্যাফে Cybernode , গার্লস হোস্টেল,  বয়েজ হোস্টেল, ক্যাফেটেরিয়া,  আরো অন্যান্য হলগুলো,  কোয়ার্টার, শপিং মল  সবকিছুই সামান্যসময়ের জন্য চোখে পড়ল। এখন গাড়িটা ওপরে উঠছে, বেশ উঁচুতে আছে তো মন্দিরটা ! ঈরা ভেবেছিল ক্যাম্পাসের উচ্চতাতেই হবে,  শুধু বিপরীত দিকের  পাহাড়ে,  এখন বুঝতে পারছে তা নয়।  একটু ভয়ই লাগছে । গাড়িতে একটা ফ্যামিলি যাচ্ছে,   স্থানীয় ভাষায় কথা বলছে , একদম মশগুল । ঈরা ভাবছে গাড়িটা থামিয়ে এখানেই নামবে কিনা। ফিরে যাবে অন্য কিছুতে করে  । মন থেকে তৈরি হওয়া উৎসাহ ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে,  কী হবে শিবমন্দিরে গিয়ে,  পুজো তো কোনকালেই দেয়নি, ওখানে গিয়ে পুজো দেবার মতো ভক্তিও নেই,  কষ্ট করতেও ইচ্ছে করছে না। বলবে নাকি ড্রাইভারকে ? এসব ভাবতে ভাবতেই ব্রেক কষে গাড়িটা থেমে গেল। কি ব্যাপার?  

সবাই নেমে গেল,  ঈরাও নামল। গাড়ি আর যাবে না,  মন্দিরে যেতে অনেকটা পায়ে হাঁটা পথ, দর্শন করে আসা অব্দি গাড়ি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।

ঈরা দেখলো একটা সর্পিল পথ ,  মাটির সিঁড়ি কাটা, বেশ ওপরে উঠে গেছে,  পাহাড়ি ফ্যামিলিটি সেদিকেই যাচ্ছে।

ঈরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল । এখানে কিছু সময় দাঁড়িয়ে একটু নির্জনতা উপভোগ করে তারপর ওরা ঠাকুর পুজো দিয়ে ফিরে এলে চলে গেলেই হবে। 

. "ম্যাডামজী, আপ নেহি জাওগি কিয়া?"

ড্রাইভারটি জিজ্ঞেস করল। 


"নেহি, চক্কর আতা হ্যাঁ।"


"তো ফির বহুত দের রুকনা পরেগা “


 "রুকুঙ্গা, ইধর-উধর ঘুম লেঙ্গে থোড়া।"


“উধার এক ছাঁও হ্যাঁ, বেঠ ভি সক্তে হ্যাঁ।"


ঈরা দেখল রাস্তা থেকে একটু দূরে টিনের ছাউনি দেওয়া বসার জায়গা। আসলে পাহাড়ি এলাকায় উন্মত্ত বৃষ্টির জন্য রাস্তার ধারে এইসব ব্যবস্থা করে রাখা ।

বেশ ভালো তো,  বসা যাবে।

থেঙ্ক ইউ ভাইয়া ।

কিন্তু ঈরাকে বসতে হলো না।

ঈরার সামনে একটি গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়ালো।

দরজা খুলে নামলেন ডঃ মুখার্জি স্যার

আর ইউ ঈরা ? দ্য ব্রিলিয়ান্ট গার্ল,   ওয়ান অব মাই ফেভারিট স্টুডেন্টস !  কি করছ একা একা এই পাহাড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে? 

এসো আমার গাড়িতে ।

স্যার আমি এই ছোট গাড়িটাতে এসেছি,  একটু পরে ফিরে যাবো।

আমি বলছি এসো আমার সঙ্গে।

সম্মোহিতের মতো ঈরা স্যারের পাশে গিয়ে বসলো , তিনিই গাড়ি চালাচ্ছিলেন আজ ।















  




সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , চিরশ্রী দেবনাথ

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

চিরশ্রী দেবনাথ



পর্ব ছয়


সকালের ব্রেকফাস্টে ছিল উপমা, চা , একটি কমলা ও এক মুঠো ড্রাই ফ্রুটস । এতোটা একসঙ্গে খেতে পারে না ঈরা , ফল আর ড্রাই ফ্রুটসগুলো রেখে দেয়,  পরে খিদে পেলে খায়। 

হোস্টেলের খাওয়াদাওয়া খুব ভালো লাগে ঈরার ।মোটামুটি একটা ব্যালেন্সড ডায়েট মেন্টেন করে ওরা । শিলচরে নিজের বাড়িতেও ঈরা এতোটা সুন্দরভাবে খাওয়া দাওয়া করত না আর তারপর আরো হোস্টেল ও মেসে কেটেছে এতগুলো বছর , সেখানেও খাবারের তেমন নির্দিষ্ট মেনু ছিল না,  যাকে বলে হেলদি ফুড। আসলে হেলদি খাবার সুস্থভাবে পড়াশোনা করার জন্য খুব দরকার।

আর জি কর নিয়ে কয়েকদিন একটা চাপান উতোর থাকবে,   এড়িয়ে যাওয়া যাবেনা , সেটা চায়ও না ঈরা , কিন্তু খুব বেশি ঢুকবেও না এসবে।

কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি,  যে সব পেপারগুলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে জমা দিতে হবে,  যেগুলোর ওপর সেমিনার রয়েছে কোনটাই তো তেমন এগোচ্ছে না। স্যার তৈরি করতে বলেছেন , সে চেষ্টা করছে,  সংখ্যার জটিলতা বা কখনো কখনো আলোর ঝলকানির মতো সারল্য দুটোই ঈরাকে মুগ্ধ ও মগ্ন করে রাখে। 

মাসে একদিন বা দুদিন স্যার ডেট দেন ব্যক্তিগতভাবে বসার জন্য। সেই হিসেবে নেক্সট উইকে ঈরার ডেট তার টপিকের কাজ কতদুর এগিয়েছে এই নিয়ে কথা বলার বা প্রবলেমগুলো ডিসকাস করার।  রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের সারি দেখতে দেখতে  ঈরা খুব গভীরভাবে সারাদিনের কাজগুলো গোছাচ্ছিল মনে মনে । প্রথমেই লাইব্রেরি তারপর ক্লাশ আর সবশেষে সোজা হোস্টেল ।

রেডি?

চমকে উঠল ঈরা , দরজায় উঁকি দিয়ে যার মুখটি দেখা যাচ্ছে সে হলো জয়ী ঘোষ। কলকাতার,  পড়াশোনায় তুখোড় আবার খুব রাজনৈতিক কথাবার্তা বলে সবসময়,  অনেকেই এড়িয়ে চলে,  ঈরার খারাপ লাগে না,  বুদ্ধিমানদের পাশাপাশি চুপচাপ হাঁটলেও অনেককিছু জানা যায়। জয়ী কবিতা লেখে, গানও গায়, স্লোগানও ভালোই বানায় মনে হল।


এই তো রেডি,  চলো।

দরজা নক করে ঈরা জয়ীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। 

মাঝে মাঝে মতবিরোধ হলেও ঈরা জয়ীর আইডিয়াগুলোকে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেনা। 

কেমন চলছে পড়াশোনা?  জয়ী জিজ্ঞেস করল?

হু,  চলছে।

বলবে না,  আমি যদি জেনে ফেলি তাইতো?  হাসল জয়ী। 

না না,  সেরকম কিছু নয়,  কাল রাতের কথা ভাবছিলাম ।

কোনটা আর জি কর?


নাতো,  তোমার আর জি কর নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। ইনফ্যাক্ট কারোরই নেই,  সবই লোক দেখানো। না হলে বৃষ্টি এলো বলে এভাবে পালিয়ে আসতে?

পালিয়ে?  নাতো। আমার সাইনাসের দোষ আছে,  জ্বর এলে ভুগব তাই চলে এসেছি?

আর জাহানারা?  কাশ্মীরকি কলি?  সারাক্ষণ যার বিয়ের গল্প,  আর ফাইট করে এখানে আসার গল্প আমাদের শুনতে হয়।

গল্প থাকতেই পারে,  যার যার নিজস্ব গল্প। তোমার ভালো না লাগলে শোনো না। 

আর জয়ী পি এন পি সি আমার পছন্দ নয়,  তোমাকে একটু অন্যরকম ভাবতাম , এখন তো দেখছি আলাদা কিছু নও।

কে বলেছিল অন্যরকম ভাবতে ?.ওহ্ তোমরা তো আবার নর্থ ইস্ট, কথায় কথায় নিজেদের অনুন্নত জায়গার বলে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট নাও সরকার থেকে।

জয়ীর কথাগুলো ঈরাকে খোঁচাখুঁচি করার চেষ্টা হলেও ঈরা রাগ দেখালো না। সাতসকালে মুড খারাপ হলে সারাদিনের পড়াশোনা শেষ।


আচ্ছা আসি,  তোমার তো এখন ক্লাশ,  আমি লাইব্রেরি যাবো। 

জয়ীকে টা টা করে ঈরা লাইব্রেরির দিকে চলে গেল। 

ঈরা ভাবছিল এই সুন্দর দেশটা কেমন যেন হয়ে গেছে, সাধারনভাবে কারো সঙ্গে মেশা যায় না। প্রত্যেকের ভেতরে একটা চুল্লি,  গনগনে আগুনে নিজেরাই  নিজেদের পোড়াচ্ছে, কেন এরকম হলো?  


লাইব্রেরি যেন একটা নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপ। এখানে ঢুকলে ঈরার মনে হয়, সে এখন সব পারবে। স্যারের দেওয়া টপিকগুলোকে সে সংখ্যা দিয়ে সাজিয়ে তৈরি করে ফেলতে পারবে দুর্ভেদ্য  গাণিতিক কোড। তার পেপারটাই সেরা হবে। স্যারের চোখ থেকে ঈরার জন্য ঝরবে প্রশংসা ও গর্ব।

এখানে কেউ কারো তেমন বন্ধু হয়তো নেই,তবুও কীরকম করে যেন একটা গ্রুপ তৈরিই হয়ে যায়। মতানৈক্য বা একজন আর একজনকে পিন করলেও কেমন করে জড়িয়ে যায় অনুভবে ও মননে ।

আবির,  জাহানারা,  সৌমিতাভ,  ঈরা , সুহানি, জয়ী,   তারাও কোন এক অলিখিত নিয়মে জড়িয়ে গেছে হয়তো টপিকগুলোর মধ্যে মিল থাকায়। এখানে ঈর্ষা ও দ্বন্দের মাঝখানে দু একটি নিয়মভাঙা ভালোবাসাও গড়ে ওঠে যাদের

মিলতে হবে এরকম দিব্যি কেউ দেয়নি,  তবে ভেঙেচুড়ে দেবেনা এই নিশ্চয়তাও নেই।

ঈরা দূর থেকে দেখল একটি টেবিলে আবির আর সুহানিকে । ওরা পড়ছে , পড়ুক।

ঈরা সেদিকে গেলো না।

প্রয়োজনীয় সব বইপত্র নিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসে গেল।  লাইব্রেরির এই দিকটায় বড় বড় কাচের জানলা,  খোলা হয় না,  ওপরে ভেন্টিলেটার দিয়েই  বেশ বাতাস আসে  ,  রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে  কাচ ঠিকরে অবারিত আলোয় ঝলমল করে ভেতরটা আর কুয়াশার দিনের জন্য প্রচুর লাইট তো রয়েছেই,  পুরো ইনস্টিটিউশনটা সোলার সিস্টেমে চলে  ,  এখন রোদ  আসছে, সারি সারি টেবিল , আর জানলার ওপারে চোখ দিলেই পাহাড়ের গায়ে পাহাড়  , ছোট ছোট জনপদ, হরেক রঙের পতাকা পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় উড়ছে। এগুলো মানুষ কেন দেয় ঈরা এখনো জানে না। দূরের মন্দিরটাও দেখা যায় কুয়াশা না থাকলে। এটা শিবমন্দির,  এতোদিনে ঈরার জানা হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষদের কাছে খুব আদরের শিবজী ।

  ঈরা  বাইরের দিকে তাকালো, আকাশটা বেশ নীল আজ,  কী অপূর্ব লাগছে সব, এক অদ্ভুত কল্পনা ঈরাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল,  সেখানে অন্য কেউ স্বপ্নের মতো ।

অনেকক্ষণ পর হঠাৎ সুহানির ডাকে সম্বিৎ ফিরল ঈরার । ক্লাশে যাবে না?

হ্যাঁ,  তোমরা যাও,  আসছি আমি।

আমি তো যাব না,  এলিনর ম্যাডামের ক্লাশ তোমাদের,  একটা জিনিস খুবই কনফিউজড ছিলাম, আবির হেল্প করল,  আসি, তোমরা যাও। 

ভীষণ লজ্জা আর রাগ হলো ঈরার নিজের ওপর । কিছুই তো পড়া হলো না। সুহানি তো দিব্যি নিজের কাজ করে নিল, আসলে কি সুহানি ততটা ইমোশোনাল নয়? 

ব্যাগ গুছিয়ে,  বইশুলো যথাস্থানে রেখে ঈরাও বেরিয়ে এলো লাইব্রেরি থেকে ।


ঈরার গবেষণা আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফির একটি ট্র্যানজিশন পিরিয়ডে — Post-Quantum Cryptography (PQC)— গড়ে উঠছে , কোয়ান্টাম কম্পিউটার এসেছে,  RSA, ECC-র মতো প্রচলিত পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে না শুধু পড়ছে । তাই ভবিষ্যতের নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন অ্যালগরিদম নিয়ে গবেষণা চলছে সবজায়গায় ।

ঈরা কাজ করছে lattice-based cryptography নিয়ে, যা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় post-quantum approach বলে ধরা হয় ।


এখন  এলিনর ম্যাডামের ক্লাস । ওনার ক্লাসগুলো পর পর দেওয়া হচ্ছে,  মনে হয় উনি চলে যাবেন , হয়তো আরো কিছু মাস পর আবার আসবেন,  এমনও হতে পারে অনলাইন ক্লাস নিলেন। তবুও এতো উন্নত প্রযুক্তির মধ্যেও ঈরার কেন জানি মনে হয় স্যার ম্যাডামদের সঙ্গে সামনা সামনি ক্লাস করার মধ্যে যে উষ্ণতা ছড়িয়ে পরে, অনলাইনে তা পাওয়াই যায় না।


এলিনর ম্যাডামের ক্লাসও Gauss Lecture হলে। তিনি একটি নরম বাদামি রঙের ওভারকোট পরে এসেছেন,  হালকা নীল স্কার্ফ আর চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্বের মিশেলে খুব সুন্দর লাগছে ওনাকে ।

তিনি ধীরে কথা বলেন । এক্সপ্লেইন করার সময় একটু থামেন,  সামনে বসা ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকান। প্রায় সব ছাত্রছাত্রীই বিভিন্ন ভাষাভাষী ভারতীয় , তিনি জার্মানির,  একমাত্র অংকই দুইয়ের মধ্যকার সেতু ।

 প্রত্যেকদিনের মূল টপিক শুরু করার আগে  Post-Quantum Cryptography (PQC) এবং Public Key Cryptography-এর বিষয়টার জটিলতা ও সম্ভাবনা নিয়ে  একটু বলেন , আজও বলছেন । বোর্ডে লিখলেন ,

 “The Unseen War of Numbers” 

আজ বৃষ্টি নেই। উজ্জ্বল রোদ বাইরে আর ভেতরে পিন পড়লেও শোনা যাবে এমন নিস্তব্ধতা।


Before I start, let me ask—how many of you believe that your WhatsApp chats are safe?


আবির হাত তুলল,  কিন্তু ম্যাডাম ওর কাছে কিছু জানতে চাইলেন না , তিনি নিজেই বলতে লাগলেন, 

"Public Key Cryptography—RSA, Elliptic Curve—they've served us well for decades. The concept is elegant: one key to lock, one key to unlock. But..." একটু থেমে আবার বললেন "quantum computers are coming. And with them, everything you thought was secure might vanish like fog."


সামনের সারিতে ঈরা মাথা নিচু করে বসে আছে,   নোট খাতা খোলা । জাহানারা চোখ কুঁচকে বোর্ডের দিকে  তাকিয়ে আছে, যেন এখনি সে পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে। 


জয়ী মেধাবী , কিন্তু এতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসেও তার মাথায় অনাবশ্যক জিনিস ঘোরাফেরা করে। 

 সে  ফিসফিস করে কিছু বলল সৌমিতাভকে , একবার ঈরার দিকেও ইশারা করল। 


এলিনর  বোর্ডে লিখলেন 


Public Key Cryptography: Two keys – Public & Private


RSA/ECC Vulnerability: Shor’s Algorithm on Quantum Computer


Post-Quantum Cryptography: Lattice-based, Code-based, Hash-based schemes


তিনি হাত দিয়ে বোর্ডে ল্যাটিস আঁকলেন ,

"Imagine a multidimensional maze. Now hide a password inside. That’s the world of lattice-based encryption. It's complex, resistant, but not unbreakable. Just... not breakable yet."


ঈরা  হাত তোলে, জিজ্ঞেস করে,

"Ma’am, are we trying to hide the key better, or change the whole lock?"



এলিনরের চোখে একটু যেন প্রশংসা দেখতে পেল ঈরা,


"Very good question, Ira. We’re doing both. We are redesigning what a 'lock' means in a post-quantum world."


সৌমিতাভ ফিসফিস করে জয়ীকে বলল বুঝলি, লক তোদের WhatsApp-এর, চাবি এখন কিউবিটে ঢুকে যাবে , একটু হাসির প্রলেপ পড়ল  ক্লাসে।


এলিনরও হাসলেন ওদের হাসি দেখে,  তারপর  বললেন ,In this new war, the battlefield is invisible, the weapons are algorithms, and the soldiers—are researchers like you.


জাহানারা একটু গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল, 

Miss, does that mean even medical data can be hacked in future?


"Yes, my dear. That's why we need ethical cryptographers—minds with not just logic, but conscience."


পেছনে জানালার কাচে এখন  বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, কখন রোদের পাট চুকে বৃষ্টি নেমেছে কেউ লক্ষ্যই  করেনি। 

ক্লাসে নিঃশব্দতার প্রতিধ্বনি বাজছে যেন।  ঈরা মনে মনে ভাবে—এই সময়েই তাকে প্রস্তুত হতে হবে, আগামীতে হয়তো  নিঃশব্দ  যুদ্ধ

হবে  যেখানে অস্ত্র শুধুই  অংক আর  কোড । 









সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , চিরশ্রী দেবনাথ



সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

চিরশ্রী দেবনাথ

পর্ব পাঁচ



বিকেল থেকে শুরু হয়েছে টিপ টিপ বৃষ্টি , আকাশ মেঘলা , বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। রুমে বইপত্র , ল্যাপটপ আর গরম চা নিয়ে বসে থাকার উপযুক্ত সময় এটা। কিন্তু নিজেকে এভাবে আলাদা রাখাটাও ঠিক নয়। কান ও  মাথা একটা কালো স্টোল দিয়ে ঢেকে ঈরা রুম লক করে ক্যাম্পাস চত্বরে চলে এলো। ছেলে মেয়ে সবাই এসেছে,  শুধু তাই নয় প্রফেসর অন্বেষা চৌধুরী ছাড়াও আরো অন্যান্য প্রফেসররাও এসেছেন যারা যারা  কোয়ার্টারে রেসিডেন্ট হিসেবে থাকেন। এখানে কোনো মঞ্চ তৈরি হয়নি,  বিশাল  ফেস্টুন তৈরি হয়েছে যেখানে একটি মেয়ের চোখ বাঁধা , মেয়েটির দুই কাঁধে দুটো ডানা আঁকা , নিচের দিকে মুখ ,

মুষ্টিবদ্ধ দুটো হাত , সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে রক্ত । ঈরা  একজন সঙ্গী খুঁজছে যার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কিছুসময় কথা বলা যায়। বহুজনের মাঝখানে এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকাটা খুবই অড লুকিং । 

লোকাল নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকরাও এসেছেন,  ওরা সবকিছু ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত , এই প্রতিবাদের আওয়াজটা সবজায়গায় পৌঁছে যেতে হবে তো।

ঈরার হঠাৎ নিচের দিকে চোখ গেল,  স্ট্রিট লাইটের জোরালো আলোতে এই বিশাল ক্যাম্পাস এরিয়া আলোয় আলোকিত হয়েই থাকে সন্ধ্যার পর থেকে,  যে  পিচরাস্তাটি এঁকেবেঁকে উঠেছে , সেই পথে একটি কালো গাড়ি আসছে,  যে গাড়িটি ঈরার খুব চেনা,  মুখার্জি স্যারের গাড়ি। 


প্রথমে অভয়ার জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হল।  

তারপর বলার পালা,  ঈরা বুঝতে পারছিল না এরা কি বলবে ? এতোটা নৃশংসতাকে কি বর্ণনা করা যায় ?

যেহেতু এটা একটা সভার মতোই হচ্ছে এবং প্রথম থেকেই সুহানি পুরো ব্যাপারটা পরিচালনা করছে , তাই সুহানি অন্বেষা ম্যাডামকেই বলল কিছু বলতে ।

অন্বেষা ম্যাডাম কিন্তু ঘটনার বিবরণে গেলেন না,  

তিনি মূলত এই ঘটনাটিকেই ছুঁলেন না। খুব সোজা সাপটা কোথায় বললেন দেখুন ছেলেমেয়েরা,  অনেক পরিশ্রম করে তোমরা এতোটা অব্দি এসেছো,   তোমাদের আবেগকে কারো হাতে তুলে দিয়ে তাকে অস্ত্র বানাতে সাহায্য করো না। তোমরা সবাই বুদ্ধিমতী , আর এটা ঠিক জাতীয় স্তরের শিক্ষাকেন্দ্রও নয়,  আন্তর্জাতিক স্তরেরও বটে , কোথাও যেন এর নাম কোনভাবে অনুজ্জল না হয়। তোমাদের যেকোন সমস্যার কথা আমাকে বলতে পারো,  আমি নিশ্চয়ই তা সমাধান করার চেষ্টা করব।


আরো অনেকেই কথা বলছে , ঈরা ভাবছে এখানেও সমস্যা?  

মিঃ মুখার্জীর গাড়ি এসে থামল। তিনি নামলেন,   

মৃদু হাসলেন তারপর চিৎকার করে  বললেন বহু কষ্টে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সমস্তরকম রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি,  নষ্ট করে দিচ্ছো তুমি অন্বেষা ম্যাডাম । ছাত্রছাত্রীদের কে সাহস দিলো ওদের অমূল্য সময় অপচয় করে এইসব হাবিজাবি ব্যাপারে মাথা ঘামাতে ?

ডঃ অন্বেষা চৌধুরী কিন্তু চিৎকার করলেন না। তিনি থামলেন। এগিয়ে গেলেন মিঃ মুখার্জির কাছে,  তারপর যেভাবে বললেন সেটা অনেকের কানেই পৌঁছুলো না। 

 তাই নাকি মিঃ অনিকেত? পড়াশোনার সময় মাঝে মাঝে নষ্ট করতে হয় বৈকি ? নাহলে তো পড়াশোনা শেষ করাটাও একসময় কঠিন হয়ে পড়ে বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। আর প্রতিষ্ঠানের মালিক তুমি নও,  সেটা গড়েও তোলোনি। আমি আর তুমি এখানে পড়াই,  হয়তো আরো কিছু বাড়তি দায়িত্ব পালন করি। আর আজকের এই জমায়েত কিন্তু ততটা হেলার নয়,  একটি উচ্চশিক্ষিত মেয়ে তার নিজের কাজের জায়গায়  মেডিকেল কলেজের মধ্যে ধর্ষিতা ও খুন হয়েছে,  সবকিছু পচে গেলে সেখানে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করা যায় না।

অবশ্য তোমার সঙ্গে এসব কি বলছি , তুমি তো…

থামলে কেন?

থামিনি অনিকেত।

আমার লাইফস্টাইল আমার,  সেখানে আছে মেধা আর সাকসেস,  এই একটাই ছক,

ছকের বাইরে যে থাকতে চাইবে সেই তো আউট তাই না  , তুমি কিন্তু পারোনি,  আমিই তার প্রমাণ , অনিকেত। 


ছাত্রছাত্রীরা ঠিক বুঝতে পারছিল না মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডাম কি কথা বলছে , কারণ তারা একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল , আর চারদিকে নানা হইচই। 


ঈরা এখন এসে জাহানারার কাছে দাঁড়ালো। জাহানারা কাশ্মীরি মেয়ে । ঈরার মতোই একটু চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে,  আজকে সেও এখানে এসে যেন কি করবে বুঝতে পারছিল না,   একটু পরে আবির এলো,  ওদেরকে দেখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। এটা ঈরার  ভালো লাগল , সেদিন  বেশিই খারাপভাবে কথা বলেছিল সে,  সরি বলাটা দরকার। কিন্তু এখন বললে  খুব ড্রামাটিক হবে।  ঈরা কিছু বলল না। আপাতত তারা মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডামের কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে ।কারণ স্যার প্রতিবাদ , জমায়েত এগুলোর বিপক্ষে বোঝাই যাচ্ছে। এমনসময় প্রফেসর এলিনর মরটিনকে ওদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখল ওরা ।  

এই মধ্যবয়সী জার্মান মহিলা, ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটেসনের গেস্ট লেকচারার হিসেবে এসেছেন।

খুব সুন্দর করে আস্তে আস্তে কথা বলেন , 

হঠাৎ তিনি সুহানির কাছ থেকে মাইক্রোফোন নিলেন,  তারপর বললেন


“Where I come from, we believe silence can be complicated. And today, I refuse to be complicit.”

“This isn't politics, Professor Mukherjee. This is mathematics of conscience. One wrong variable in a proof, and the theorem collapses.” 


মুখার্জি স্যার একটু চমকে উঠলেন, একটু হাসলেন এবং কেটে কেটে বললেন ওকে , গো এ হেড,  তবে রাত নটার সঙ্গে সঙ্গে ফেস্টুনসহ চত্বর খালি হওয়া চাই।  গাড়িতে করে তিনি নিজের কোয়ার্টারের দিকে চলে গেলেন। 

ঈরার  মনটা খারাপ হয়ে গেল,  দুর সবকিছুই  এখন যেন আলুনি লাগছে , তবে প্রফেসর এলিনরের কথাটাও খুব ভালো লেগেছে , সত্যিই তো তাই ।

প্রফেসর এলিনরের লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। ধূসর-নীল চোখ, হালকা বাদামি চুল সবসময় পিছনে জড়ানো থাকে। পরনে থাকে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা কুর্তা জাতীয় ঢিলেঢালা পোশাক—ভারতীয় পোশাকের সঙ্গে তিনি নিজের পোশাকের একটু মিল রাখেন সবসময়ই , তিনি স্পষ্টভাষী, অনুভবপ্রবণ কিন্তু আবেগপ্রবণ নন। ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের যুক্তিসম্মত প্রশ্ন করতে শেখান, 'blind memorization' একদম সহ্য করেন না , আজ তো  ঈরা ও সুহানি তাঁর কথায় মুগ্ধ ।


জাহানারা ঈরাকে বলছে ,

এই শোনো... ফির সে ছুটি পড়েগা না? ওয়াল্লাহ, মই না অ্যাবল টু গো ব্যাক কাশ্মীর রাইট নাও। ইট ওয়াজ হেল লাইক ফাইটিং উইথ মাই পেরেন্টস টু কম হিয়ার। জানো ঈরা, মাই বড়া চাচা তো অলরেডি মাই ম্যারেজ ফিক্স করচুকা থা... বাট মই বলি, 'নেহি, মই পড়েগি, দূর তাক পড়েগি!'

হামারে ফ্যামিলি মে কোই গার্ল এত দূর নাহি গেয়ি থি পড়নে, আর ইফ ইট ওয়াজ ফর এম.বি.বি.এস. না, দে উড হ্যাভ অ্যাক্সেপ্টেড। বাট ইটস ম্যাথস! আর ম্যাথস কে লিয়ে কে জিদ করনা, ইট ওয়াজ লাইক অ্যা রেবেলিয়ন।



অন্বেষা ম্যাডাম এগিয়ে আসছেন, ওদের জটলাটার দিকে তাকালেন মনে হলো, 

আবির হঠাৎ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল , 

আচ্ছা  কনটেক্সট না বুঝে থিওরেম দাঁড়ায় না , তাহলে এই ঘটনার প্রসঙ্গ থেকে নিজেকে আলাদা করাটা কি ঠিক? তোমরাই বলো ?


ম্যাডাম একটু হাসলেন। ওয়েল সেইড। আমাকে শুনিয়ে বলছ নাকি আবির?


না ম্যাডাম । এমনি বললাম ।


ভালোই বাংলা বলছ আজকাল , আবির বর ঠাকুর ! ম্যাডাম হাসলেন সামান্য। 


ভিড় ঠেলে তিনি একটু উঁচুতে দাঁড়িয়ে বললেন এটা কিন্তু মানতেই হবে , নটা পর্যন্ত সময়। চলো মিছিল শুরু হোক এবার। 


ঈরা মৃদু গলায় বলল, 

“এই ক্যাম্পাস আমাদের শেখায় প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিতে। তাহলে এইখানেই যদি কণ্ঠরোধ হয়, তাহলে আমরা কি সত্যিই গবেষক? কোথাও যেন অংক তৈরি হচ্ছে, তাই না? 


অন্বেষা ম্যাডাম বলছেন,


“তোমরা কেউ ভুল করছ না। যেটা ভুল, সেটা হলো—ভয় দেখিয়ে, চুপ করিয়ে রাখা। আমরা মেধাবী বলেই প্রতিবাদ করি। কারণ যে মানুষ যুক্তি জানে, সে অন্যায়কে চুপচাপ মেনে নিতে পারে না ,

আমাদের মিছিল ক্যাম্পাসের বাইরে সামনের ছোট বাজারটা পর্যন্ত যাবে এবং ঘুরে আবার এখানে এসে শেষ হবে,  সুহানির সঙ্গে স্লোগানে আমাদের সবার গলা যেন শোনা যায়, 

 we want justice. 


মিছিল শুরু হলো,  সেই সঙ্গে মেঘও ডাকতে লাগল আকাশে, ঠান্ডা হাওয়া বইছে । প্রত্যেকেই হালকা শীতের পোশাক পরে আছে,  কারণ এখানে সকাল এবং রাতে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডাই থাকে সারাবছর ধরে। 


সুহানি , ঈশা আর জয়ীর  কাছে তিনটে মাইক , প্রত্যেকটা স্লোগানের পর বলতে হবে we want justice , 


অনেকগুলো পোস্টার ছাত্রছাত্রীদের হাতে হাতে,  কোথাও লেখা 

"হসপিটাল নয় , মৃত্যুপুরী কেন?",  "যেখানে বিচার নেই, সেখানে বিদ্রোহ জন্মায়!",

 "Naari pe hinsa, bandh karo yeh tamasha!",  "Justice delayed is justice denied!", "হাম ন্যায় চাহতেঁ হ্যায়, রহম নয়!"

"Say her name – Avhaya! We won’t forget!"

 "চুপ করে বসে থাকলে, পরেরটা তুমিও হতে পারো!" এইসব।

ঈরার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে,  মেয়েটা তীব্র পাশবিক অত্যাচার সহ্য করেছে, এই কদিনে এটা স্পষ্ট সে কিছু একটার প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল,  তাই এভাবে চলে যেতে হয়েছে। ছেলে হলেও হতো এটা,  শুধু সেখানে ধর্ষণটা হয়তো থাকত না। মেয়ে মানেই শরীর , শরীরটাকে ছাড় দেওয়া যাবেনা।

পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে মিছিল এখন মেইন রাস্তায়,  দুপাশের বাড়িঘর থেকে কয়েকটি নিরুত্তাপ মুখ একটু উঁকিঝুৃঁকি দিচ্ছে,  রান্না বসিয়েছে লোকজন , ধোঁয়া বেরোচ্ছে , শুকনো মাছ রান্নার তীব্র গন্ধ নাকে এলো কয়েকবার। ছোট্ট বাজারটাতে এসে একটু সময় থামা হলো,  স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সেখানে উপস্থিত ছিলেন,  ঈরা অবাক হলো,  সুহানি , জয়ী , ঈশা এতোসব করার সময় পেলো কখন,  করেই বা কি হবে?  ঈশা , সৃজনী অবশ্য পি এইচ ডির স্টুডেন্ট নয় ওরা এম এস সি করছে। 

গ্রামপ্রধান স্থানীয় ভাষায় ভাষণ টাইপের কিছু বললেন , পঞ্চায়েতের লোকেরাও ছিল,  প্রায় জনা পঞ্চাশ এলাকার লোকজন  । এদিকে বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে, পাহাড়ি ঠান্ডা খুব ভয়ঙ্কর ব্যাপার , অসুস্থ হলে দেখতে হবেনা আর।

সবাই ছাতা আনেনি বলে যারা এনেছিল তারাও খুলতে পারছে না,   এই যাহ্ জোর বৃষ্টি ।

কোনরকমে দ্রুত হেঁটে হোস্টেলে চলে এলো ঈরা আর জাহানারা।

নটার আগেই সব শেষ। শান্ত রাত। গভীর কুয়াশা। বহুদূরে একটি মেয়েকে দুঃসহ যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে ।

In this time mathematics is unable to explain.