পাঠ করো নিভৃতে, চিরশ্রী দেবনাথ

কাব্যগ্রন্থ    



'পাঠ করো নিভৃতে '



রচনাকাল ...২০১৯--২০২১





চিরশ্রী দেবনাথ











ভূমিকা 



এই বইয়ের লেখাগুলো পড়তেই হবে পাঠককে সে দাবি আমার নেই,  এগুলো লিখতে  আমার  ভালো  লাগছিল  তাই লিখছিলাম, লেখাগুলোর বিষয়বস্তুর মধ্যে পুনরাবৃত্তি রয়েছে,  পুনরাবৃত্তি সরাবার প্রচেষ্টাও নেই, যদি কারো ভালো লাগে, পাঠ করবেন নিভৃতে। 

















নির্জন নিমগাছ এবং ...





একজন অসফল মানুষ বলেই হয়তো, 

ব্যর্থ, বিষণ্ণ মানুষগুলোকে আমার খুব ভালো লাগে। 

আমার জন্য এবং তাদের জন্য আমি ভেবে রেখেছি, 

অলস নদী,  নির্জন নিমগাছ, কাঠের বাড়ি, টানা বারান্দা

সেখানে বসে আমরা সফল মানুষদের যাওয়া আসা দেখি। 

তাদের সুখ, ব্যস্ততা, ইগো প্রবলেম  ইত্যাদি।

আর দেখি আমাদের চেয়েও  দ্রুত তারা  চলে যাচ্ছে নিঝুম কোটরে...









 ঝিনুকের স্তব



কিছু মানুষ আছে, 

যারা কোনোদিন কাউকে ভালোবাসার কথা বলতে পারেনি

তারা খুব ভালো মানুষ,  গায়ে মেঘের জামা

অথচ সেখান থেকে বৃষ্টি গড়ায়নি ভুল করেও কোন মুহূর্তে

তাদের ভেতরে অসংখ্য স্তব জমে গেছে, পুড়ে গেছে

তারা কিভাবে ভালোবাসতে চেয়েছিল, কখনো জানেনি কেউ...









যত্নে রেখেছি



এই কান্নাটি আমার তোমার কাছেই  কাঁদতে হবে

আর কারো কাছে গেলে সে ঝরবে না অঝোরে

তা সম্ভব নয়।  চাই না। 

এই কান্নাটি দিয়ে  কি করবো আমি?

কেনো এলো সে আমার কাছে অযথা, অসময়ে? 

কীভাবে যত্ন করি, কোথায় রাখি, যাতে ভেঙেচুরে নষ্ট না হয়ে যায় ...













কবির হাত





অনেক ভিড়ের মধ্যে একখানি শীর্ণ হাত

দীর্ঘ দীর্ঘ  আঙুল, সাদা সরু নখ

 নীল শিরা শরীর বেয়ে  নখের গোড়ায়  থেমে গেছে

 সেখানে জমকালো সূর্যাস্ত হচ্ছে তখন

তির তির রক্তদানা  নিয়ে কাঁপছে পাতলা চামড়া। 



চিনেছো ঠিকই তুমি, এ যে কবির হাত। 

 জাপটে ধরে আছে কিছু প্রতিবাদ ও হারানো ভালোবাসা। 



 চিনবেই ।



 কারণ সেটা তোমারই সেই হারানো হাত,



গিয়েছিলে কোনো একদিন কবিতার কাছে 

নষ্ট হয়ে, রিক্ত হয়ে, এসেছো ফিরে অভিমানে













সায়াহ্নে



এটা হলো একটি বেলাভূমি

সমুদ্র শান্ত, কোন ঝড় আসবে না

তেমন কোন আবহাওয়া সংবাদ নেই

আমাদের মাথার রোদের ছাতা উড়ে গেছে

দীর্ঘ ঝাউগাছ ছায়া হয়ে নেমে আসছে

দূরে যে দু চারটি মানুষ দেখা যাচ্ছে`^

তারা আমাদের সম্পর্কে কৌতুহলী নয়

তাই আমরা নিশ্চিন্তে হাত রাখলাম, পায়ের পাতা ছড়িয়ে দিলাম

সমুদ্র চিল এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত বলে,

আমরা আরো একা হয়ে গেলাম

তারপর সূর্যাস্ত দেখলাম, যুগান্তর ঘটে যাচ্ছে

অথচ কত নির্বিকার ভাবে আমরা ভালোবেসে যাচ্ছি ক্রমাগত







খেয়া ঘাট



আমার কবিতায় কেবলি প্রেমিকের কথা

তারা কারা? আমি দেখেছি কখনো ভালো করে? 

কেমন তাদের চোখের পলক, নিজস্ব সংবাদ

আরো তো মানুষ আছে আমাদের 

দিদি, ছোটোবোন,  ভাই  কিংবা কোনও অতিথি

কিন্তু কবিতা মানেই যেন  শূন্যে ভাসা রেলিং, নীল সমুদ্র, 

যেখান থেকে শুধুই অগম্য ভালোবাসাদের কথা বলাবলি







নিঃসৃতময়



আমাদের একটি ঘর থাক দুজনের

চারটে দেয়াল, চারটে মহাসাগর 

দিনরাত ঢেউ, নীল বেলাভূমি বিছানায়

কিছু না, টুকটাক কথা দুজনের ব্যক্তিগত দিনশেষে

হতে পারে একশ টাকার  হিসেব বা শাহরুখ খানের বুড়ো হয়ে যাওয়া 

একটি টি ভি অকারণ, বাজে সিরিয়েল, 

বদলে দিয়ে খুব গাল দিলাম, ঘুরে ফিরে চ্যানেল বদলে চলে এলাম সেখানেই

ততক্ষণে চার দেয়ালের সমুদ্রে জোয়ার এসেছে, চাঁদ উঁকি দিচ্ছে প্রবলভাবে

নৌকোটৌকা গুলোকে সামাল দিয়ে তুমি ফিরে এলে

টিভির খবরে

আমার পা তখন তোমার পায়ে জড়িয়ে আছে ঝগড়া করবে বলে



আসলে তখন আমরা মিথ্যে মিথ্যে প্ল্যান করছিলাম কোথাও বেড়াতে যাওয়ার

জঙ্গলমহল, মহুয়া গাছ, গির অরণ্য, কেশরবান সিংহ



তারপরই হাসি, 

তুমি বললে এই ভালো 

আমি বললাম কি?

তুমি বললে এই তো চারদেয়াল। 

আমি বললাম কোথায় সেই চার দেয়াল? 



"একটি ব্যক্তিগত দিনের শেষে যেখানে দুজন পাশাপাশি "







চুম্বন



পাহাড়ের গায়ে ঠোঁট রাখলাম    

পাহাড় জানিয়ে দিলো ভেতরে আগ্নেয়গিরি



ঝর্ণার শরীরে ঠোঁট রাখলাম    

ঝর্ণা জানিয়ে দিলো জল নয় অম্লধারা



মাটিতে ঠোঁট রাখলাম

মাটি জানিয়ে দিলো ভেতরে ভূমিকম্পের ভাঙন



শুকনো ঠোঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছি

দুহাতে সরাচ্ছি ম্লান রাজনৈতিক অধিকার





 ঠোঁট রাখলাম পাথরে 

ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে যাবতীয় শুষ্কতা

সামুদ্রিক শোঁ শোঁ কোথায় যেন অন্দরমহলে ধীরে, 



ফিরে এসেছে মন্থর দান অতিক্রম শেষে, 

ফিরে এসেছি আমি ...





















ভাঙা রোদ



তুমি আমাকে ছাতা খুঁজে দিতে বলো

অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে থাকি দূরে, রোদে ভেসে যাচ্ছে সব, 

রঙীন ছাতায় চড়ে কবে চলে গেছে  আমাদের শৈশব

কোথা থেকে খুঁজে এনে দিই হারানো মার্বেল

পৃথিবীময় আরো কত হারিয়ে যাওয়া জিনিস

সেখানে  কি করছে যেন তোমার ছাতাটি, 

এসব আমাকে  বলে কী লাভ? 

আমার মুখে স্যাঁতসেঁতে রাস্তা, ছপছপে জল 

একটু সামলেসুমলে হেঁটে গেলেই তো পারো ! 













সুন্দর  এসে ফিরে যায়

       



তোমার অভিমান

আমার অসম্মতি





তোমার অসম্মতি

আমার অভিমান



পৃথিবীর হৃদয়ে এর চাইতে বেশি 

বেদনানির্ভর চলাচল আর নেই



আমাদের যৌথ বাহুতে যুদ্ধের ষড়যন্ত্রকে হারিয়ে, 

এভাবে কখনো কখনো সাদা ফুলের মতো জেগে ওঠে 

কিছু কিছু ক্ষয়িত সন্ধ্যা











অবিন্যস্ত 



যা যা বলছ সব  মেনে নিচ্ছি    

খাটাচ্ছি না জোর, যেন ছিল সুপ্ত ঋণ

এরমধ্যেই ঘটে যায় বিচ্ছেদ

পত্রপুষ্পপূর্ণ বৃক্ষতলে একদম একা কোনদিন



পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি

বড় জোর হাঁটতে পারে দু মাইল

গলা শুকিয়ে গেলে খেয়ে নেয় আপোষ

পেছন ফিরতে ফিরতে বিকেল

তুমুল হেরেছে আজ আকাশ

ঝলমলে হয়ে আছে ব্যস্ত নীল

যে কান্না ঝরে গেছে কোনোখানে

বালিশে বা বালুচরে, শক্তমুখে

তাকে বলি ' দাঁড়াও ',

 আমার কাছে গুমরে উঠছে ঝাপসা রুমাল  

শুধু ক্লান্তি না এলে অনায়াসে করে দিতে পারি পাটিগণিত

মধুপুরগামী ট্রেনকে বলি থামো, বেমানান গ্রাম্য চিৎকার

সময় শেষ হয়ে এলেও, কেউ তো দেবে পরীক্ষা? 

ঢং ঢং বাজবে বাকি থাকা পাঁচ মিনিট    

আমি যা লিখছি, মাঝে মাঝে

এঁফোড় ওঁফোড় করে দিচ্ছে দাবার বিব্রত অশ্বচাল

কখনো নিঃশেষ হতে হয়, আক্রোশ জমা দিয়েছি কার কাছে যেন...

সে তো রাজা নয়, রাজপাটহীন নক্ষত্র  

স্মৃতিশক্তি নিয়ে সব ঠাট্টা, অসুখ বলে জানি

গোপনে আমি অভিনয় জমা দিয়ে খালি ঠোঁটে

চেয়ে থাকি।





স্পর্শে যেন জাগো  



মানুষ যখন কথা থাকে না

তখন জিজ্ঞেস করে বৃষ্টির সংবাদ

আর কথা জমে গেলে তারা ভিজতে থাকে

আমাদের কথা জমে আছে

ঝরটর, শিলাবৃষ্টি, উপচানো জলাশয় হয়তো

এখন আমরা অভিযোগ করবো ইত্যাদি 

তারচাইতে আগে চলো আদর করে নিই

তারপর যা হবার হোক









নির্ভার  হতে চাই



যারা যারা লেখা দিতে বলেছিল

তারা চলে গেছে, পত্রিকা বেরিয়ে গেছে

আমি দিইনি, এরকম তো কখনো হয়নি  আগে

শুধু কথা বলেছি, এক অনন্ত পরিভ্রমণ

ভেবেছি লিখবো কোনদিন এই পূর্ণগ্রাস

স্তিমিত ঝড়কে ক্ষমা করে দিয়ে, খুলেছি সফেদ রঙ



পাত্র ভরে গেছে কাণায় কাণায়, তৃপ্তি অসীম

সেই আনন্দে মনে হয়, " এসো হে মৃত্যু "

ঘরবাড়ি হোক অন্য কারো, সাজাক তারা 



প্রতিটি প্রিয় ম়ৃত্যু আমাকে দিয়ে যাচ্ছে রুপোলি আঙরাখা,  

ভয়,  অস্থিরতা আর  বহুগামী রেখাপথ...ক্ষমা করো। 









দু বিন্দু দুর্যোগ



কয়েকটি সময় এমনি খালি  চলে যায়

জ্বর ছেড়ে গেলে যেমন কবিতা চলে যায়

নিরন্তর অসুখও তো তেমন ভালো কিছু নয়

 ভেষজ গাছ আনমনে দিয়েছে বল্কল ও  নিরাময়

পরিধেয় বস্ত্র হয়েছে, হৃদয়ের সমৃদ্ধি

আনাচ কানাচ থেকে পড়ে গিয়েছে রক্তবিন্দু দল 

এখন ক্লান্ত হয়ে বসে থাকি কিছুদিন তোমার পাশে

সময় দিতে হবে  না, এমন  কী  কথাবার্তাও

আরো দুখানা পর পর বৃষ্টির মাস, এমনই তো হয়

নির্জন দুর্যোগ শেষ হলে আবার মুখরতা কিছুকাল







দ্বিধা



পুতুলের দোকানে এখন ভিড় কম    

কয়েকটি বার্বি ডল, মিকিমাউস, টেডি বিয়ার সাজিয়ে 

লোকটি অপেক্ষা করছিল কারো জন্মদিনের

ভীষণ রাগ হয়, ভারতীয় পুতুল নেই?

দোকানি সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে এলো ছোটা ভীম   

বার  তিনেক তুলনা করে, বার্বি ডলই কিনলাম

জন্মদিনের বাচ্চাটির হয়তো ভীম আছে, 

তাকে বলা হয় ভীমের শরীরে খুব  জোর 

বার্বি ডলের শরীরে জোর নেই, সৌন্দর্য আছে

ছেলে বাচ্চাটি দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হোক, 

জোর ও সৌন্দর্য, নারী ও জোর, যুদ্ধ ও সৌন্দর্য

 







যেতে দাও বসন্তে     



সমস্ত শহর জুড়ে বইছে বসন্তের শান্ত চলে যাওয়া

মাটির গভীরে যেন জীবন্ত পতঙ্গের একটানা এস্রাজ

এ মধু অনুসঙ্গ  সাহায্য করেছে ছিঁড়ে দিতে বন্ধন

পাতায় পাতায়  সংঘর্ষের জেরে চালু থাক পতনের শব্দ

কোথা থেকে আলো কুড়িয়ে বলো জ্বেলে রাখি রঙঘর

পুকুরের পার থেকে গল্পগাঁছা নিয়ে চলে গেছে যে নারী

সন্ধ্যার গৃহে তার হৃদয়ে শান্ত মল্লিকাবন, ফুলসৌরভ

বসন্তে প্রত্যাখ্যাত হওয়া প্রস্তাব, অশরীরী সে চিরদিন

যত দূরে যাও, অনন্তে প্রোথিত যে, বৃন্দাবনধাম 

সহস্রসুখে তোমাকে ছেড়ে যাবে না সে, অনন্তনাগ

আমিও চিনেছি তাকে,অমৃতের পাত্র ঢেলে গোপন স্নান















বেড়ানো



যেসমস্ত জায়গা গুলো বেড়াবো বলে 

ঠিক করেছিলাম,

ঝিলম নদীর ধার বরাবর একটু খানি হাঁটা

তখন কি খুব হাওয়া দেবে, ঠান্ডা! 

আমাদের আবার ঠাণ্ডা লাগার দোষ



পাঞ্জাবের হলুদ সর্ষে ক্ষেতে ঝলসে দেবো চোখ

আমাদের আবার খুব রোদ সহ্য হয় না, মাথা ব্যথার দোষ,

তবুও না হয় চা খেতাম, ঝকঝকে স্টীলে চলকে যেতো ঠোঁট



" রাজার বাড়ি " নামে একটি গ্রাম আছে

সব গরিব লোক থাকে সেখানে, নীলচে রঙের গীর্জা

সুরকি দেওয়া রাস্তা গেছে অনেক দূর , সূর্য যেন নিশানা

ছোট্ট বেঞ্চ, সেখানে বসব বলেই আসা 



আমাদের আবার হতাশ হওয়ার খুব ঝোঁক

আগে থেকেই শতভাগ অনুমান মিলে যাওয়ার ক্ষোভ



তবুও বুকিং শেষ কবেই, 

আমরাই প্রথম নিসর্গ দূত সব সিজনে

কোনদিন কয়লা খাদান দেখবো, এও ভেবেছি কবে

আমাদের আবার  ভুলে যাওয়ার  দোষ  

নরম অন্ধকারে আঁকা আমাদের নির্জন নোটবুক 









'ক্লান্তি ' এসো না তুমি 





হঠাৎ করে খুব ক্লান্ত লাগছে

মনে হয় একজন আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে আরো ক্লান্ত হয়েছে 



তাকে ভালোবেসে এসব বলতে বলতে

আসল রহস্যময় দ্বীপ ছেড়ে এসেছি 



সামনে নিতান্তই নদীবারান্দা, নৌকাবাটি

এখানে আমার সকল অহংকার শেষ করেছি, এমনকি গন্তব্যও 

যা কিছু আড়ম্বরহীন, তাই দিচ্ছি, স্বঅভিমানে







 চৈত্র



তুমি যাকে ভালবাসলে

আর তাকে দিতে চাইলে তোমার ' না পাওয়া 

অবাক হয়ে দেখলে তার কাছে আছে শুধু 'হাহাকার '

বাধ্য হয়ে তুমিও কুড়িয়ে নিলে সেই  ' হাহাকার '

তারপর খাদের পাশে দাঁড়িয়ে দুজনে

কী ভয় ! কী ভয় ! 

যদি ফিরে আসে আরো বিকট শূন্যতা, 

ভীতু পাখির মতো নামানো চোখ শুধু বলে যাচ্ছে , "নিঃশর্ত, নিঃশর্ত "!











বৈশাখ 

......... 



বৈশাখ এসেছে, দ্বারে দাঁড়িয়েছে

রাস্তা গিলে এসেছে, গিলে এসেছে চৈত্রের প্রতিবাদ। 

মাংস রান্না হচ্ছে, চন্দন সুবাস। 

একটি মেঘকুঞ্জ জমছে, জমছে অনেক জায়গায়,

শহরে , গ্রামে  অক্ষম  হস্তীর বৃংহণে।



আষাঢ় মাসে বছরের গায়ে জল জমবে, কাদা, ক্লেদ, মাঠ ভরে প্রসূতির মেলা,

সব পেটে যাবে, গর্ভে লুটোপুটি খাবে, স্থুল তারা, অনাবৃষ্টির ছায়া কোলে দিয়ে যাবে! 

ভালোবাসো কী তারে? 

উদ্ধত বক্ষ কেটে ফেলেছে সে, 

শাণিত লুন্ঠন এক আগাপাশতলা। 



বৈশাখ এসেছে,

এসেছে বৈশাখ।  

দ্বারে দাঁড়িয়েছে,

রাস্তা ছুঁয়ে এসেছে, ছুঁয়ে এসেছে ঝড়, মেঘের দ্বৈরথ।



পেয়েছে একটি ঘর, অবেলার।  

ঐ যে সে, গালে হাত দিয়ে বসেছে, চূর্ণ ঠোঁটে রাগ দেখাচ্ছে। 

কারণ ছাড়া কাঁপছে কেউ, যেন পৃৃথিবী আমার যুগলবাহুতে।

এই অধিকার যেন কার, আরো কার কার?  

যার চোখে বন্ধক রাখা চক্ষুজোড়া, যার পকেটে খয়েরি চাবি,

সোনালি  জং  ধরা ...







আট মার্চ



 বসন্ত এসেছে, পলাশ জ্বলছে।  

কিছু উড়ন্ত পংক্তি মেঘ হয়ে নেমে আসছে

নীচে ধুলো ঝড় গিলতে থাকা কোনো মেয়ে

আগুন খেতে খেতে উজ্জ্বল হয়েছে ত্বক

নিঃসঙ্গ গোলাপের পাঁপড়ি তার জিনসের পকেটে

আলাদা দিবস হিসেবে সে কিনেছে

পি সি চন্দ্র জুয়েলার্সের সরু চুড়ি আর    

আপোষহীন একান্ত সময়।    

নিজের মৌতাতে মগ্ন হয়ে বিরহ ভুলেছে,

আরো দুটো জিনিস হেলায় উড়িয়েছে, 

' অপ্রাপ্তি ও অপেক্ষা '। 




চিরশ্রী দেবনাথ



বাংলা আমার ভাষা

...................



বাংলায় কথা বলি... তাই ,   

আমরা খুব সহজেই অন্যভাষায় কথা বলতে পারি

আমাদের লেখায় ছড়িয়ে পড়ে ভারতের রঙ

বাংলায় কথা বলি, তাই সবাইকে ডেকে আনি, 

আমাদের হিংসে হয় না, রাগ হয় না,

অন্যভাষার টুঁটি আমরা চেপে ধরতে জানি না

বাংলায় গান গাই, তাই অন্য ভাষার গান এতো ভালোবাসি

আমাদের রান্নায় ভাষার সুবাস

তাই বাংলার মতো নরম আমাদের ক্ষত

রক্তিম রেখায় সেখানে ফুটে ওঠে সকল মাতৃভাষার বিষাদ

 রুক্ষ পাহাড় যে বাংলাকে দিয়েছে প্রান্তিক সুর ...

সেই বাংলা আরো মিঠে, পোড়া আলুর নোনা স্বাদ

আর নির্জন অহংকার বলে যদি কিছু থাকে, 

তবে তা ভাঙাচোরা উদ্বাস্তুর দৃপ্ত বাংলা, বাউলের গড়া তাজা মাটির দেউল।





যাতায়াত





আবার অপেক্ষা করছি প্রেমের

আস্তে আস্তে কেমন করে সে হয়ে যায় অপ্রেম অপেক্ষা করছি তারও। 

মজা সেখানেই, ক্লান্তি সেখানেই, 

পাশে রাখা এক কিবোর্ড, চলাচল ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে শুধু। 

ক্যালেন্ডার থেকে নীচে পরে যাচ্ছে কিছু সরকারি ছুটির দিন, 

এইসকল ছুটির দিনে, 

আমরা কখনো সখনো আধখানা গান শুনেছি 

তারপর কেউ এসেছে, গল্প করেছে দেশের বেকার সমস্যা নিয়ে, 

আমি শুনতে শুনতে ভাবতে থাকি

এখনো কি কোথাও আছে সেই ডাকবাক্স,

যেখানে নিভৃতে শুয়ে আছে কিছু বিশেষ ঘোষণা, ব্যথা আর ব্যর্থতার   ... 







শঙ্খজল



একদিন আপনাকে হারিয়ে ফেলব আমি

একটি ভুলভাল সংলাপের খেসারত হয়তো দেবো

আপনি চলে যাবেন অভিমান করে



আমি কোনো কোনো কবিতা পাঠের আসরে যাবো

মেয়ে তখন অনেক বড় হয়ে গেছে

পুরীর সমুদ্রধার থেকে পুরাতন মায়ের জন্য কিনে এনেছে শঙ্খমালা,

সেটাই পরেছি আমি

কবিতা পড়ছি, চশমার বাড়তি পাওয়ারের নীচ থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে কবিতার রঙ

আমি অনেকদিন আগে আপনার সেই চলে যাওয়াকে বলছি ...

কবিতায় যুদ্ধ নেই, বিপ্লব নেই, অসহায় মানুষের কথা নেই

শুধু চলে যাওয়ার অস্ফুট কিছু কথা আছে ...









পুরোনো জানিয়া



একটি আশ্চর্য অনুভব  হলো আজ

ভেবেছিলাম আমরা পুরনো হয়ে গেছি



আমাদের সন্ধ্যাকাল আর অন্যান্য সময় নতুন  কিছু নয় আর 



কিন্তু যেই না এক  বিকেলে আমরা খুব কাজে বেরোলাম দুজনে

মোষের গায়ের রঙের মতো কিছু মেঘ তখন আকাশে

আশ্চর্য কি ভালোই না লাগছিল হাঁটতে

অথচ কথা হচ্ছিল করোনা ভাইরাস, জিনিসপত্রের দাম ইত্যাদি নিয়ে

তবুও অনেক ভালো লাগছিল ...রাতের চেয়েও যেন কিছু বেশি







মৈথুন



হঠাৎ করে বিকেল নেমে এলো

যেন বহুদিন এরকম বিকেল আসেনি তোমার কাছে

তুমি কী করবে ভেবে পাচ্ছো না তাকে নিয়ে

একটি পাহাড়ি পথ গোপনে রেখেছো আজো বিভাজিকায় 

সেখান দিয়ে সোজা হেঁটে গেলেই বন

না হয় একাই পথিক হলে, 

আরোহন শেষে খুলে রাখলে নির্মল স্বেদ...   







তরুণী কবির প্রতি



সমস্ত নিরাপদ লাইন থেকে নির্বাসিত

মেঠোপথে আছে তোমার অস্থিরতা

আলো আবছায়া হয়ে  হেঁটে যাওয়া

সংসারে থেকে অসংসারী মন, উদোম হাওয়া

মাছের মতো পিচ্ছিল সব বসন্তকাল 



হে নতুন কবিতা লিখতে আসা মেয়ে

মিলিয়ে নিও আমার সঙ্গে তোমার অবিকল ধারাপাত    









 জন্মান্তরে

................

ম্যাপ খুলে বসেছি দুজনে, 

একসঙ্গে আঙুলে আঙুল লাগিয়ে

খুঁজছি আজ , 

যেখানে হবে মধুযামিনী জন্মান্তরে, 

চোখ বন্ধ করে, আঙুল হাঁটতে থাকে,

কোথাও থামতে দিই না আমি ভয়ে, 

যদি হয় আগ্নেয়প্রপাত, সাগরখাদ,

 শ্বেতমরু, অথবা শ্বাপদ অরণ্য! 

  

একসময়, তুমি বলে ওঠো স্টপ ইট্ !

চোখ খুলে ফেলি দুজনেই ভাঙামুহুর্তে, 

দেখি এক ঝর্ণা ঘর! 

স্নান শেষের  গন্ধে ভরে আছে ধূসর দেয়াল,

 

সব সময় পুড়ে গেছে 

ঋতুতে ঋতুতে  শীতের মাঠে মাঠে,

তারা কোন জন্মান্তর রেখে যায়নি। 











হে কবি



আপনি খুব বড়ো কবি 

 ভীষণ বিখ্যাত, জলদ গম্ভীর

দূর থেকে বেশ লাগে দেখতে 

ঐ দীর্ঘ ঋজু দেহ এবং দেহাতীত সেই আঙুলগুলো ! 

আমি আঙুল দেখি, 

জানি এই আঙুলেই আপনি আঁকেন, 

যক্ষ নারীদের ছবি, ক্ষুধা, লোভ আর বালিহৃদয় 

অন্তস্থল থেকে সেই ফর্সা শীর্ণ আঙুলে জমে ওঠে একটু রক্তাভ অনার্য ইতিহাস

আপনাকে দেখি না, শুধু আপনার  বাক্যবন্ধগুলো   আমার চোখের চারপাশে দীর্ঘ পায়চারি করে, 

 এতটুকু পড়ে ভাবছেন 'কে তিনি '

ধরে নিন রবীন্দ্রনাথ, রাত বাড়লে তিনি নিবিড় কবি হোন, 

সকাল বেলায় আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলি...গার্হস্থ্যের । 









একাকী সুখে



একাতিত্ব আজকাল কোলাহলমুখর 

সব নিবেদন লেখা আছে গহনে, যেন হস্তীযূথ, মুখরিত অরণ্য 

একটি সংক্ষিপ্ত জীবন হোক মল্লিকা বনে

ভ্রমরের দংশন হোক আত্মার নিবিড় চরাচরে

এ পর্যন্ত লিখে, আমি চলে গেলাম স্নানে



স্নানঘর ঘিরে আছে পদ্মনাভি, সুরভিত কাম 

আজ আর ফিরবো না অন্য কোন মুহূর্তে 



কবি জয়দেব লিখে দিও, দু পংক্তি অসম সাহসী, 

আমার খোলা পাতায়,

আমি যে  তোমাকে দেখি পৃথিবীর পথে একাকী সুখে। 













প্রাণ 



দহন, দাহ, দগ্ধ ...কারা করে সেখানে বসবাস?

গভীরে নির্জনে সন্ধ্যার ব্যালকনিতে,

 তাদের দেহ ঠান্ডা হয়ে আসে, বহিরঙ্গে সংসার, ঢিঁমে আঁচে, 

আজন্ম কবিতায় তিনটি শ্বাস

 হোক আমার, হোক আমার,  বার বার 







তৃপ্তি



মনে হয় কুড়িয়ে আনি ডালপালা    

দুধর্ষ আগুন জ্বেলে দিই...রান্না হোক

পাট পাট করে গুছিয়ে রাখি আলোর ঘর

তোমাকে  নতুন করে খুব ভালোবাসি, 

যেমন করে বাসা হয়নি আগে

তাহলে কী তৃপ্তি আসবে ! পুড়ে যাবে অনুতপ্ত সময়? 

অস্থিরতাময় এইসব লাইন লিখতে লিখতে

আমার পিপাসা মরে যেতে লাগল, 

শান্ত পাখির মতো ঠোঁটে জমাতে লাগলাম ফলের বীজ, 

আসলে লেখা ছাড়া আর কোনো তৃপ্তি নেই    







  বাবা 



হাফ হাতা সাদা ঘেঁষা শার্ট, বগলে ব্যাগ, ছাতা

আমাদের কারো কারো  বাবা এমনিই  ছিলেন

কালো অথবা ফর্সার কাছ থেকে ফিরে আসা 

 বাবার খুলে রাখা চশমা খাপে মেলাতে গিয়ে দেখি

কাচে লেগে আছে আস্ত এক নদী অববাহিকা,

স্বপ্নের ঘরবাড়ি আঁকা সেখানে, আমার গন্ধে ভরা।









গরাদ 

........



কোথাও  যেতে যেতে দেখি

দেড়কাঠামতো এক টিনের বাড়ি, উঠোন সমেত,



 পেছনে কি আছে ছোট্ট কোন পুকুর, যার ঘাটের জলবালিতে একটি কড়াই রাখা 



দু এক আঁজলা ধোঁয়া বেরোচ্ছে পশ্চিমের একচালা থেকে,

শেষ বিকেলে আহা, কেউ এলো বোধহয় অতিথি হঠাৎ...

অথচ খাওয়া শেষ হলো কি বউটির?

 ভাবতে ভাবতে পেরিয়ে এসেছি কতদূর, একটানা খেজুর গাছ, এলানো রাস্তা, 

সন্ধ্যা হতে হতে এসবই কবিতা বলে তুলে রাখি আজকাল  ...









প্রধানমন্ত্রী 



ধরা যাক একটা লোক। খুব সাধারণ।

তাকে তার মাও ভালো বেসেছিল অভ্যাসের বশে,

একদিন তাকে কেউ জড়িয়ে ধরল

সত্যিকারের জড়িয়ে ধরা

মানে ভেঙে যাচ্ছে পাহাড়, সমুদ্রে ঢেউ উঠছে

আন্দামান বলছে বিপদসীমা পেরিয়ে গেছে, সুনামি নিশ্চিত

দু একটি আগ্নেয়গিরি কার্বন মনো অক্সাইডের  ভয় দেখাচ্ছে

আমি নিশ্চিত লোকটা তখনও নির্বিকার থাকবে। 

ভালোবাসা না পেতে পেতে তারা খুব পাথর হয়, নিষ্ঠুর হয়, 

অনেকটা ঠিক কোনো কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো। 















শীতলপাটি 



আমি বলি, আমাদের  বন্ধুত্বটা অসম

তাই বলেছি " কিছু চাই না "

যদি মনে হয় লাভ লোকসান, দেওয়া নেওয়া  ইত্যাদি 

আশ্রয় চাইনি বলে তুমিও হতাশ, আমিও বর্ষাহীন কদমগাছ 

ভুলভাল কিছু আবহাওয়া সংবাদ, হয়তো আমাকে বদলাতে পারে

তখন কিছু দিও না হয়, হোক না তার পাতালঘেঁষা দাম

এতটুকু তো গভীর হতেই হবে বলো   ! 

এ তো আর দৈনন্দিন নয়,

শখ করে খেলতে আসা বিপজ্জনক আদিম খেলা

সঙ্গীটিও মেধাবী, বহুকিছুই তার  রীতিমতো শেখা  অনেক আগেই





রেইনকোট



আসলে তো কেউ ফিরিয়ে দেয়নি

প্রতিটি মাঝপথ ওনাকে  দ্বিধায় ফেলেছে

অন্যরা বলেছিল তিনি নাকি বামপন্থায় বিশ্বাসী

মৃত্যুর কিছুদিন আগে বুঝেছিলেন

তিনিও আদর্শহীন আসলে, রক্তে মেশাতে পারেননি কিছুই

উপর থেকে ঘাম চেটে কিছু মিছিল করেছেন

শ্লোগানের কথা পরিবারেও ঢুকতে দেননি

তিনি আসলে চামচা হয়েছিলেন, কমিউনিজম এতটা সহজ নয়

তাই ব্যাপক দলবদলেও আজ তার আর নিন্দে করতে ইচ্ছে হয় না

কারণ প্রতিদিন মিছিল মিটিং সেরে ঘামে ভেজা জামা বাইরে রেখে তিনিও ঘরে ঢুকতেন

কাছে আসা মৃত্যুকেও তার তাই ঘোলা মনে হয় আজকাল।











ছায়াসেতু



ছোট ছোট ঘরবাড়ির জঙ্গল পেরিয়ে

এক সেতু, মাঝ বরাবর

আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকেও! 

পা ঝুলিয়ে বসে আছি পুরনো কাঠের ওপর

নীচে জল আর অজস্র ভুল



আমি আসলে বাসি না, বাসতে জানি না

জলের নীচে যেন বাস্তিলদুর্গ

কোন একদিন বিপ্লবী চিন্তাধারা ছিল বেশ

আজ নেতা দেখি না

এই দেখো কেমন করে চলে আসছি রাজনীতির দিকে

তুমি বলছো আমি সুবিধা বাদী



আমি আসলে একটা কিছু বিশ্বাস করতে চাই,

যা বদলে যায় না

সেটা ভালোবাসা বা আদর্শ জাতীয় কিছু হতে পারে



এই তো আবার কেমন নতুন কোন ঝড়বৃষ্টির সাজ,  ভাঙা নক্ষত্রের ঝকমকানি ...

তোমরা বোধহয় নতুন কোন পরিকল্পনা করছো তাই না!  

 এই    অসমাপ্ত বাদলা দিনের, খোলা জানালার? 











বৃত্ত



এগুলো লিখে কী লাভ

তার চাইতে যে লোকটা রাস্তা বানায়, সে অনেক দামি

মনখারাপের বাড়ির সঙ্গে কেমন করে 

জুড়ে দেয় নতুন কোনো বন্ধুর ব্যালকনি

তারা  জল আলো ফেরি করে, জনপদ বানায়

আমি দারুণ আলস্য নিয়ে  প্রলাপ লিখি

কী হয়, কী হয়?

কিছু না! কিছুই না।

তবুও কে যেন বলল সেদিন

এইসব লেখায় পৃথিবীর উষ্ণতা আধাআধি হয়, 

  শীতকাল খুলে ফেলে সামরিক সাজ, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা থেমে যায়

অথচ আমি জানি কবিতা সবসময় লেখা হয় যুদ্ধ লাগার পরে,

লাশ, ধ্বংস, আগুন দেখে দেখে দূরের শহরের সেই ব্যালকনিতে বসে ...













শিল্পী



খুব দ্রুতলয়ে যখন রাগিণী বাজে 

উচ্চাঙ্গসংগীতের শিল্পী ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যান

এই তান, ঝংকার, যন্ত্রানুসঙ্গতা আসলে তার নয় 

সুরের শরীরে শুয়ে থাকা কঠিন স্তম্ভ,

 মাঝে মাঝে, তারা দেখে যায় হলের ভিড়

সুর বয়ে যায় অনেক নীচ দিয়ে, ক্ষীণ জলধারা...

শেষরাতের মতো 











নির্বাসিত লেখকদের জন্য 

...........

আমি সেসব নির্বাসিত লেখকদের জানি

যাদের হৃদয়ে মাটি  সীমান্তহীন

মধ্যরাতে তাদের খোলা চশমার কাচে দু ফোঁটা জন্মভূমি। 

যে ফুলদান রাখা, চুরুটের পাশে,

চলে যাওয়া নারীর দস্তানার মতো বিগত সুগন্ধে ভরা। 

কোন দেশ নেই তার, আছে শুধু  লেখার চোরাবালি, 

ডুবন্ত সুখ।

সব বই  সবুজাভ ঈর্ষায় তুমুল জনপ্রিয়, 

তবে কী উড়ে বেড়ায় কোন অনিকেত শঙ্খচিল, 

বিদেশি জানালায় ভোরের বেলায়? 

সংঘাতে জ্বলেছিল শব্দ, বিয়ারের বুদবুদ, রাতপোশাকে ফসফরাসের ঢেউ, 

আসলে তারা লেখার শরীর, 

আমরণ পাপ ... সেখানে নিরন্তর ফসলের শিষ। 









মনসা 



পাঁচশ টাকা দিয়ে মনসা মূর্তি কিনে এনেছে যূথিকাবালা

তার পনের বছরের মেয়ে বলে, মা, মূর্তির দেখি দুই চোখ ভালা? 

অথচ পদ্মপুরাণে কয় মনসা বলে কানা  ...

মা কয়,  চুপ চুপ,  দেবতা ! দেবতা ! 

রাতের বেলা মাইয়াটা কালি দিয়া করল এক চোখ কানা, 

মনসা হাসে, ঘুমায়

কত আন্দোলন করছে, এখন তাঁর শরীরভরা ক্লান্তি

আসলে তো ছোবলেরও শক্তি নেই, চক্ষুতে নাই বিষ

শ্রাবণের ভরা নদীর মতো খোলা মন আজকাল 

কী যেন নাম তাঁর... অনার্য দেবী... চ্যাং মুড়ি কানি। 









সানন্দা 



 অবসাদ একটি গভীর অসুখ

বলে যায় সানন্দার দশ নম্বর পাতা

পরের পাতায় স্বাদু খাবার, ব্রণ ওঠা কিশোরী 

তারপর ঝড় আসে, উড়ে যায় পাতার পর পাতা। 

শুকিয়ে গেছে পুরো পরিবার চরম বিষাদে জনবহুল

শহরের ফ্ল্যাটে

জীবন্ত কোমায় চোখের নীচে জমেছিল তাদের নোনা পাথর

কী হয়েছিল তারপর, দেখিনি নিউজ, রাখিনি আর খবর। 

শেষ পাতায় কাটাকুটি ছক, ইচ্ছে করে হারিয়েছি পথ ...পাখার রঙ ধূসর















সোনালি টিকেটঘর 





কৈলাসহরে একদিন ছোট্ট একটি রেলস্টেশন হবে

তার নাম হবে  'ঊনকোটি '  

শহরের অস্থির মানুষগুলো বসন্তের বিকেলে, 

স্টেশনের দিকে হাঁটতে চলে যাবে।

রাস্তার দুধারে নবীন গাছের সারি, 

হাওয়ায় ভাসছে ভালোবাসার গুঞ্জন,

প্ল্যাটফর্মের সিমেন্টের চেয়ারে বসে 

কোনো দম্পতি অপেক্ষা করবে প্রবাসী সন্তানের 

রেলস্টেশন মানে  জীবনের মৌতাত

ভারতবর্ষের রেল মানচিত্রে এ কোনো জংশন নয়, 

অল্প তেল দিয়ে মাখা সামান্য ঝালমুড়ি,

ধূসর শাল গায়ে, একদিন শেষবিকেলে আমিও পৌঁছে যাবো সেখানে, 

ঝরা ফুল কুড়িয়ে ভাবব, স্টেশন মানে হোক শুধু ফিরে আসার গল্প।  

 







উড়ান



মাঝে মাঝে  নিজের কাছে পরিযায়ী হই 

দূর থেকে দেখি আমার  ভেতর

 দূষিত মাংস প্রাচীর এবং  রূপনারায়ণ নদী পাশাপাশি মাখামাখি 

একা ধমণী বয়ে নিয়ে যায় সব ফাঁকি এবং সুধা, 

অসুস্থতা, দুঃস্বপ্ন, বিপন্ন ভোর, সুগন্ধি সকাল ছড়িয়ে পড়েছে কেমন করে মধ্যবেলায়

কোথা থেকে উড়ে আসে  কৌশুলী বিহঙ্গ এক ,

 অবাধ্য মাধবীলতার গুচ্ছ লাল, সংকেত মিথ্যার

তারপর ঋতু বদলে যায়, শীতকাল চারিদিকে, 

উড়ান শেষ হয়, দেহের ভেতর ফিরে আসি। 







শেষ 



নিজেকে লিখি

দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনে উদ্বাস্তু আমি

ফুটনোটে সতেজ ব্যর্থতা, ভুল সারি সারি

এ জমি অনাবাদী, ব্যর্থ শ্রমের চাষ 

দীর্ঘ পথে দুরন্ত কর্কট ছুঁয়ে দিও দ্বিপ্রহরেই, 

সন্ধ্যাকাল শুধু মনখারাপ আনে, শঙ্খ বাজানো শিখিনি...ভজনে অনীহা, সুরহীন। 





















ঘৃণা পাওয়ার পর 



খুব কষ্ট  হলে, মানুষ কী করে

কেউ  কাঁদে, কেউ জ্বলে, কেউ মরে, কেউ পাথর

তখন... তারপর,  কত ঢেউ এসে ফিরে যায়

কষ্ট আর মুখ ফিরিয়েও দেখে না

তার কাছে অকিঞ্চিৎকর দুই একটি খড়কুটো সবসময়ই থাকে...বেঁচে থাকার জন্য।







যখন সময় বৃষ্টিহীন



কোনো একদিন আমি এসব লেখালেখি ছেড়ে দেবো

একটি কবিতা বা তার মতো কিছু আমার আর লিখতে ইচ্ছে হবে না

কালো কালো অক্ষরগুলোকে মনে হবে মেথি দানার মতো তেঁতো

আমি তখন ছোট ছোট টবে হালকা ফুল গাছ লাগাবো, 

নরম পাতা বাহার

আজ দুপুরে যেমন বৃষ্টির বাতাস বইছিলো, তেমনই বইবে তখন

ছোট ছোট কাঠি গাছগুলোর পাশে লাগিয়ে দিতে দিতে বলবো,

জড়িয়ে থাকো তোমরা

আমার কাছে তখন না লেখার সুখ, চেয়ে চেয়ে দেখার আনন্দ

মনে মনে ভাবছি , 

অনেক আগে দিনরাত আমি লিখতাম  যাবতীয় সমারোহ ...









নোনাবালি



 ভালোবাসায় তুমুল থাকতে থাকতে

আমি ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা লিখতে থাকি

আমার শূন্যতা গুলো কীভাবে বাড়বে 

সেই ভয়গুলো আমাকে একটু একটু গিলে ফেলতে থাকে

আমি যা লিখি তখন তা দুরন্ত প্রলাপ, ধ্বংস লেগে থাকে গায়ে 

যা রঙ টঙ করি ধুয়ে মুছে ক্ষীণ বিষাদের মতো সুন্দর হয়ে ওঠে, 

তখন মনে হয়, কেউ যেন তার পরিত্যক্ত নির্জনতা আমাকে  দিয়ে যাচ্ছে সেতারের মতো...









জলের ধারে ডাহুকির পদছাপ 



 ভালোবাসা  খুব স্বার্থপর

সে স্পর্শ চায় না, চায় না ধ্বনির গুঞ্জন,

কেবল শর্ত এবং আরো কিছু শর্ত

হয়তো তবুও ভালোবাসা কখনো চায়

 বৃষ্টির মত স্বচ্ছ আলিঙ্গন

এই কল্পনাকে আমি মধুরঙ দিই একাই

মনে মনে বলি হে মধুকর ভাসাও, ভাসাও    

 

ভালোবাসলে যা যা হয় সব আছে

নীরবতা, শূন্যতা, ভয়, আশংকা, পূর্বাভাস ইত্যাদি

শুধু সন্দেহ রাখিনি, সে আমার বিষয় নয়

এভাবে প্রতিধ্বনির মতো আমি আছি তোমার কাছে

আমাদের মুকুট নেই, ঝরাপাতার পোশাক, ধুলো মন। 

তোমাকে  কষ্ট দিই আড়ম্বরে,  

সেখানে কখনো পেনডেমিকের কথা, 

কখনো ত্রিপুরার লুপ্তপ্রায় বন জঙ্গল, ডাহুকির ডাক 

মৃতপ্রায় পূর্ণিমা রাতে রাবার গাছের ফোঁটা ফোঁটা সাদা রক্ত... যেন বিরহ ঝরছে মন্দ মন্থরে।





তব পাশে 



কবির হাত পুড়ে যাচ্ছে

পা পুড়ে যাচ্ছে

তার সমস্ত হৃদয়ে ছেয়ে যাচ্ছে... আগুন আগুন

চিৎকার হচ্ছে, কী যন্ত্রণা! আহ্!

কবিতা হচ্ছে, কবিতা চলছে নিরন্তর অশ্রু বিনিময়ে। 





কান্না



যখন কাঁদতে চেয়েছি

তখন কাঁদতে দিও হে পুরনো মন্দির 

তোমার সঙ্গে দেখা হলে মনে হয় চরণামৃতের বাটি ভরে গেছে জ্যোৎস্নার কান্নায় 

এখনি তো কাঁদার সময়, 

বৃষ্টি ক্রমাগত ছুঁয়ে যাচ্ছে ফুলের দেহে প্রজাপতির সংঘাত

এই পৃথিবীতে এতো কান্না বয়ে বয়ে যায়

কত বিরহ, মৃত্যু, যন্ত্রণা আর পাপ, কান্না হয়ে গলে গলে যায়

অন্ধকার গভীর হয়ে শ্মশানের পাশ থেকে নিয়ে যায় ঘৃত পোড়া গন্ধ, মৃতের দেহের বাঁশরীর সুর

পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ে কান্না,

 গলাজলে ডুবে গেছে গৃহস্থালি, 

দু এক খন্ড চন্দনকাঠ, গৃহদেবতার আশ্বাস

তবুও নতুন করে যেন কান্নাকে খুঁজে নিতে আসি 

এই কান্নার কাছে হাঁটু মুড়ে না বসলে, অহং এর কাছ থেকে ফেরা যায় না 







জলাভূমি 



মানসভ্রমণে যাচ্ছি পৃথিবীর প্রিয় জায়গা গুলোতে

কথা বলছি অনর্গল, মুক্তহাসি, চোরা টান প্রথম বেলার মতো

যদিও আমাদের জানা জানি শেষ, 

 সব জায়গায় মহামারীর ফেলে যাওয়া ভয়    

তবুও আমি খোস মেজাজে, এ জীবন আমার এরকমই

মেনে নিয়েছি, পাহাড়ের খোঁজ আর করি না অনেকদিন ...    

কিন্তু এইসব ভ্রমণে কার সঙ্গে যাচ্ছি, কে আমার পাশে

বুঝতে পারি না, তার সঙ্গে কথা বলছি শুধু

আমার সকল কথার শেষে কিছু ভালো লাগা জন্ম নিচ্ছে

হয়তো একাই আছি অথবা কারো সাথে নয় 







মেয়েরা যেভাবে কবিতা লিখে

……………


মেয়েরা একটু অন্যরকমভাবে কবিতা লেখে

এ আমার অনুমান

যখন তারা মশলার গুঁড়ো নেয়

খুব ধীরলয়ে ঢুকে পরে হলুদ মরিচের ক্ষেতে

সন্ধ্যা হওয়া দেখে নরম পায়ে  ফিরে আসে

এই ফিরে আসাটাই তাদের কবিতা,

স্নান করতে করতে মুঠোতে ফেনা নিয়ে  চলে যায় সমুদ্রে

ভাসাভাসি আর ঝিনুকদানা কলের জলেই উপচে পড়ে

তখন দেহ জুড়ে যে কাটাকাটি হয়

সেটাকেই তারা পরবর্তীতে কবিতা বলে চালিয়ে দেয়

ঘর গোছাতে গোছাতে  অরণ্যে চলে যায়

শাল সেগুন ইত্যাদি পর্ণমোচী বৃক্ষকে সাবধান করে দিয়ে আসে দাবানল থেকে

হরিণকে সখা করে উপহার চায় মৃগনাভি লকেট

রাতের বেলা এইসব অরণ্য পদছাপ কুড়িয়ে লিখে ফেলে সমূহ উষ্ণ অক্ষর

এজন্য অনেক সময় মেয়েদের কবিতা ঠিক কবিতার মতো হয় না

অন্যমনস্ক ভাঁজ থেকে বালির মতো ঝরে যায় শুধু আবেগ

ঠিকঠাক কবিতা খুঁজতে হয়তো ততক্ষণে সে আবার আগুন জ্বালাতে বসেছে

ফিনকি দিয়ে ছুটছে রুটি পোড়া গন্ধ, নাহ্ এবারও কবিতা হলো না 

কলমকে শান দিতে গিয়ে দু এক দাগ কম হিমোগ্লোবিনে, 

আস্তে আস্তে সে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে,

ঘরের আনাচ কানাচে রোগা রোগা মেধা ধুলোর মতো জমে উঠছে ...













আলোকযানে করে





আলোর  মতো সেজে উঠল দেহ

চন্দনগন্ধে ভরে যাচ্ছে রাতের সমূহ ছিদ্র

আলো ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে জঙ্গমে

নাচ উঠেছে কোথাও, কে গান গায়? এখন বাউলের সুর ! 

মেতেছে জন্মতিল, সুডোল রূপবাক্সে, হুলের মতো আঘাত, লয়হীন পাগলের মতো 

দুটো আলো মিশে যাচ্ছে রাতের জংশনে

শব্দ হলো না, নিঃসাড়ে, নিস্তব্ধে আলো জ্বলেছে এক পাত্র 















পুনর্বার    


যত সব দুঃখদুয়ারী মেয়েরা 

আমি তাদের মধ্যে নেই

কত হাজার সংগ্রামে যাদের কেটেছে পা

আমি তাদের মধ্যে নেই

পুরুষ হাত রাখেনি হাতে

বলে যাদের অভিমান

আমি তাদের মধ্যে নেই

ভালোবাসা নিংড়ে যারা 

পুড়ে গেছে কোনো এক সকালে

আমি তাদের মধ্যে নেই 



সব শর্ত নিজের কাছে বাজি রেখে

একে একে হেরে গেছি সবখানে

কেউ দেখে ফেলার আগে

উন্মুক্ত হৃদয় ভরে গেছে পরাজয়ের সুখে

দোপাট্টা উড়িয়ে পেতেছি হাত আবারো নিখাদ

হে খোদা... হে ঈশ্বর ইনতেজার ফরমাও, আতশ জ্বালাও,

আসমান... এই খোলা আসমান আমার, 

ভুলে গেছি বাকি সব অগ্নিভ প্রতিবাদ



মিছিলে হেঁটে যারা কেড়ে নিয়েছে

অধিকার, আমি তাদের ক্লান্ত পা

ঘরে ফিরে হেঁটে গেছি আধখানা রাত 

বিছানায় যেতে যেতে মেখেছি ক্রিম

 বলিরেখার নীচে আঙুল চালিয়ে

কেড়ে নিতে চেয়েছি দুপুরের রোদ

তারপর বলেছি এই দুরন্ত ভ্রমণে,

 আবারো মেয়ে হতে চাই 

তোমাদের তৃষ্ণার্ত মুখে এঁকে দিতে অরণ্য, 

মেয়ে হয়ে বার বার ডুবে যেতে চাই। 











মোহনায়



দুজন দুদিক থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেললে

আঁচ কমে আসে, নিভন্ত সকাল বিকেল দুপুর

একসময় ঝড়ের পূর্বাভাস আসাও বন্ধ  হয়ে যায়

মনে হয় জড়িয়ে ধরতে হবে প্রাণপনে এই সায়াহ্ন,

দু এক বিন্দু কান্নাকাটি, একটা সময় সব থেমে যায়

তখন দোষারোপ করে, আবার নতুন সিরিজ শুরু করা যায় কিন্তু ! 







 

কৃষ্ণপক্ষ



মনে হয় হাজার হাজার পাখি বসেছিল একদিন আমার শরীরে

অজস্র কথা লিখিয়েছে তারা অবান্তর, 

অনাগ্রহ এসেছে যখন, উড়ে গেছে তারা

খুব কিচিরমিচির দরকার আমার এইমাত্র    

সেই তো নিঃশব্দে খুন করলাম সেদিনও

চিৎকার উঠেছিল , গাছের যেমন হয়

অশ্রান্ত ঢেউয়ের ডাকে আমার অস্থিরতা শুধু বেড়ে যাচ্ছে, ভাসাচ্ছে, পাগল পাগল !

হোক অসম্পূর্ণ, এপর্যন্তই থাক এটা।  দু একটি ঘোর কৃষ্ণপক্ষ নিজস্ব। 





বদল



আমি কোথাও যাইনি, সে এসেছিল, চলেও গেছে কবে কোনসময় যেন,

মুহূর্তকিছু পেয়েছি, বিশ্বাস ভরেছি খোলা বাতাসে

তারপর থেকে অনেককিছু বদলে গেছে

কিছু কিছু থাকা হয়ে গেছে, না থাকার মতো







অনুপস্থিতে



ডেকে গেলাম। 

ছিলেন না।

ফিরে এসে এসব লিখলাম। 

ভালো হয়নি।

গাঢ় হয়ে দাগ পড়ছে না।

 মুন্ডমালা থেকে রক্তপাত ক্ষীণ হয়ে আসছে।

অমাবস্যা হারাচ্ছে নিকষ,

ফ্যাকাশে সূর্যভূমি আমাকে ডাকছে। কী হবে জানি না।





শ্বেতপত্র



মাঝে মাঝে রাত কাতর নাছোড়

ঘৃণা থেকে ঘুরে এসে শরীরে মেখেছে আতর

মনে হয় কিছু ছেঁড়া পাতা , পরে আছে ধুলো মাখা 

মনে হয় নেড়েচেড়ে দেখি আধখানা তরবারি



আকাশ থেকে পড়ছে  বৃষ্টি আচমকা,

 এ কেমন অগ্নিরথ বাইছি একা

এ কেমন জলসা ঘর, সরস্বতী নিবিড় একা

এ কেমন ফেব্রুয়ারি শ্বেতপত্র দেয়নি জমা



আরো যদি বলো দিতে পারি লিখে

পারমানবিক যুদ্ধ শেষে অন্তহীন তেজস্ক্রিয়তা

যখন আঠারো উঠছে কেঁপে দিগন্তে ডুবছে ভয়

আমার হাতে নীলাভ সময়,  নামানো মুখ উরুসন্ধিতে, 

আবহ গোত্রান্তরের,

একই গোধূলি ফেলে রাখা ঠোঁটে

মেলাতে হবে এমন কোন কথা নেই

অমিল যার নক্ষত্রের নক্সা, যক্ষ্মাহূতি অনিবার 













রূপসাগরে 



ভালোবাসা যখন মানুষকে ছেড়ে চলে যায়

তার মনে খুব দুঃখ আর শান্তি আসে

অস্থিরতা ও তাগিদ চলে যায়

নিশ্চিন্ত হয়ে বহুদিন পর ফিরে আসে পৃথিবীর কাছে

খুব গরম পড়েছে হয়তো, 

রাত বারোটায় ভাত ভিজে উঠেছে,

তরকারিতে একটু টক টক ভাব 

খেতে খেতে সেই শান্ত মানুষটা ভাবে 

এক টুকরো গন্ধরাজ লেবু হলেই হয়ে যেতো খাওয়াটা,

নির্বিকারতম মানুষ সে তখন, 

বিষণ্ণতার খোলসে হয়তো ফাটল  ধরেছে তার  







শ্লাঘা



কবিদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি যাবতীয় আস্কারা

আমাদের দহনের ভাষ্য 

আমাদের ক্ষরণের নদী

রিরংসার উপপাদ্য

বিরহের স্তুতি

প্রেমের শ্লাঘা

যৌনতার সৌন্দর্য্যায়ন

ক্ষমা চেয়ো নিভৃতে তার অপমানের কাছে  









অভিমান নেই



যে কথা গুলো বলা হয়েছে, সেগুলো না বললেও চলত

আমি যা বলেছি, গিলে ফেলা ভালো ছিল

তবুও বলেছি কম, সাহস ছেড়ে গেছে কবে আমাকে

এখন ভঙ্গুর সময়, সব সংঘর্ষ থাক অপঠিত,

ধুলোমাখা বিকেলের ভীতু ইতিবৃত্ত 

হয়তো কিছু গুমরাহ, কিছু মাথা নীচু

আত্মসম্মানই তো শেষপর্যন্ত সবচেয়ে বড়

আর যা কিছু পোড়ামাটির মন্দির, অনাদৃতা কেউ

কখনো মুছে দিয়েছি পর পর সেতারের শব্দ

তারপর আর মুছিনি, ছড়ে যাওয়ার কষ্ট ভালো লাগে

যাবতীয় লিংক, কপিরাইট দু এক টুকরো অঙ্গারের মতো

কোনো হিংসে হয় না আমার, 

চলে যাওয়ার সময় হলে নীরব থাকা ভালো 

গ্রামের পাশের নিরীহ ধানক্ষেত এমনই হয়

দূর থেকে দেখে... একান্ন পীঠের অভিমান তার জন্মগত, 

যজ্ঞসমিধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর, উন্মুক্ত হয়েছে ঠোঁট, 

 জ্বালিয়ে  রেখেছি কিছু  ক্ষুধা আর আলো ...ভেবে নিতে পারো এটাই দীর্ঘতম







ভোরে 



খুব ভোরে তোমার ঘুমন্ত মুখের সঙ্গে দেখা হয়

তখন রাত নিভে গেছে, ভোর ছড়ানো চারপাশে

এই সময়টি পৃথিবীর বাইরে,

প্রতিদিন অজান্তে ছুটে আসে আমার কাছে 

তাই তাকে পেতে হলে, রাত জাগতে হয়,

প্লেটে দুচামচ গ্রীষ্ম রেখে, বলি,  আমি অচেনা কেউ,

আজ দরজায় বাজুক কলিং বেল, পাখির সুর, 

এখানে এখন থেমে আছে সময়। 







অজানা 



গভীরে তোমাকে আমি সাঁওতাল তরুণ ভাবি

দীর্ঘ এক শাল্মলী তরু, পাহাড় চুড়োতে দাঁড়িয়ে

আছো একা,

আমিও সেজেছি বনজ্যোৎস্নায়

কালো রঙে ছেয়ে আছি, কী রূপ আমার!

তোমার কাছে যাবো বলে,

ধূসর হরিণ শিশুর সাথে সারা রাত পথ হারালাম

দেখেছিলাম তোমাকে, তবুও ফিরে এলাম একা একা,

ঠিক কতটা ভালোবাসলে, যেতে হয় কাছে, জানা নেই এখনো ...। 









সোনালি নেউল 





এখানে চুম্বিত হবার কথা ছিল    

তাই বিষণ্ণ ফ্যাকাশে সবুজ ঘাসে একটি প্রজাপতি

ভালোবাসা হবার কথা ছিল দুজন জীর্ণ মানুষের   

সাগর থেকে এসেছিল নোনা হাওয়া

এতো আয়োজন শেষে, গভীর অন্ধকার হলো

মানুষ ও মানুষী জেগে উঠল ধীরে, উদ্ধত তাদের ডানা    

অনেকদিন পর, কেউ কুড়িয়ে পেল সেই সোনালি মাটি

ভালোবাসার চিহ্নে ভরা, ছুঁতে গেলেই কেঁপে ওঠে শরীর 

ভয় জাগে, বলে শুদ্ধ হও আগে, আকাশে জ্বলুক ধ্রুবতারা











      একাকী মধুর 



এখুনি আমার জন্ম হলো

সেগুন বৃক্ষের মেয়ে, মা বহু দূর থেকে আসা চেরিগাছের বীজ, 

লতিয়ে উঠেছিল কাণ্ড, ভাদ্রের রাতে

ধৈবতে ভাসছিল লাল রশ্মি

জন্মমাত্র, হাঁটতে শিখেছি

কচি চারা, আস্তে মেলেছি ডালপালা 

সবুজ শরীর হয়েছে, নীল চোখ, কেন কে জানে? 

তাতে সন্দেহ হয় পড়শী গাছের

তাদের গুঞ্জন হেলায় উড়িয়ে আমি তরুণী হলাম, মধুর ভৈরবী, অন্য গাছের সৌরভ  পেতে...বৃষ্টিকে আহ্বান করি,

 জঠরে বীজের দহন শুরু হলে গিলে ফেলি

মাটির জঙ্ঘা ছিঁড়ে বেরুতে চাইলে,  চাপা দিই শিকড়, 

এই বনে একাকী অপরূপা আমি, নীল আঁখি, 

পর পর ঝড়  আসে ক্রমাগত,

 স্থির করে দিয়ে যায় আমার মসৃণ কোমরের মায়াবী  মাপ। 









খন্ডিত মুহূর্তে



পৃথিবীর বুকে প্রত্যেকদিন একটি সময়ের জন্ম  হয়। 

খুন , বন্ধুত্বের ভাঙন কিংবা ক্ষুধার মিছিলেও,  তার শরীরে  সুগন্ধির পবিত্র আকুতি

যে পায়নি,  সে পায়নি।  

যে পেয়েছে সে শাহজাদা, আলোর তাজ। 

আমি তাকে দেখতে চাই, সে কী তখন ভুলেছিল গালাগাল দেওয়া

তারপর, "ভালোবাসা হওয়ার" মুহূর্ত থেকে আস্তে করে গড়িয়ে গেছে অপাপবিদ্ধতা। 

রক্তনালী থেকে জন্ম নিয়েছে বিসর্জন,  দুঃখের সম্ভার

ফিরে আসার পথে, দোকান থেকে কিনেছে দাবদাহ

নিজের কাছে ফিরতে চেয়ে, আজ চুপ করে বসে আছে 

শরতের নীল মেঘ, তাকে ঢেকে দিচ্ছে ... ফিরে এসো মুশাফির। 









স্মৃতি 



পুজো এলে মা বাবার কথা মনে হয়

পুজো এলে মনে হয় ভেতরে খুলে গেছে হাট

যারা ছেড়ে চলে গেছে, তাদের শরীরে আমার হাত

জনহীন রাস্তায় মৌন ঢাকিদের আস্তে পথচলা

ঝরে পড়ছে শিউলি, বোঁটা ছেঁড়া কমলা রঙ

বাড়ি ফেরা, বাড়ি থেকে যাওয়া,  গুলিয়ে গেছে সব

কবিতা পড়তে পড়তে, মুগ্ধতা হারিয়েছে হৃদয়ের মাঠ

গান গাইছে অচেনা লোক, যেন পাখা মেলেছে মুগ্ধ শ্লোক

গোটা রাস্তা ও কিছু গর্ত বুকের ভেতর ঢুকে গেছে, 

গাছের ছায়া, নিবিড় নক্ষত্র, কুয়াশাভেজা তৃণদল। 

পতঙ্গের মতো আহুতি শিখতে হবে, উর্ণনাভ ধৈর্য 

 তাই জ্বেলেছি শেষরাতের আগুন পর্বতপদপ্রান্তে

পরিক্রমা শেষে ফিরে যাচ্ছি সুখবিমুখ গাজন সন্ন্যাসী। 









আবাহন





প্রতিদিন ব্যথা নিয়ে যে আনন্দ জেগে ওঠে তাকে প্রণাম। 

ছেড়ে আসতে আসতে প্রলম্বিত হয়েছে প্রেম 

অন্ধকারে নির্ভীক হয়ে ছুঁয়ে এসেছি পরিক্রমা ও পুজো

প্রসাদের মতো কেটে রাখা আছে আত্মরঙ, অগুরু ছড়ানো। 

ঘর থেকে প্রণত আহ্বানে, পুরুষ ফিরিয়ে দিয়েছে যুদ্ধের তরবারি ! 

পাখির ছায়া কুড়িয়ে অবশেষে জেগে উঠেছে চেনা গৃহস্থালি। 









শহরের বিষাদ



  

এইমাত্র শহরটির গায়ে জ্বর এলো, একশ ডিগ্রি তার বিষণ্ণতা, 

কোথাও কেউ কেঁদে মরছে, দুঃখে পুড়ে যাচ্ছে অহংকার, 

ছবিওলা আঁকতে পারছে না, কবি লিখতে পারছে না, 

স্তব্ধ হয়ে গেছে আগুনের নিমন্ত্রণ, অপমানের গাঢ় দাগ 

 পাথর থেকে ঠান্ডা কুড়িয়ে কপালে রেখেছি অভিমান  

রসদ খুঁজতে বেরিয়েছি,স্বপ্নসম্ভবা অন্ধকার , স্রোত ও শব্দ 

উন্মাদের কাছ থেকে ধার নিয়েছি অবাস্তব, পকেট ভর্তি নুড়ি। 

হারিয়ে ফেলেছি কবির বাড়ি, পথ ডুবে গেছে মৃত লেখায়...







মা



মা মরে গেলে 

মেয়েরা খুব একা হয়ে যায়

গরম ভাতে মেয়েটি কি ভালোবাসত

সেটা মনে রাখার শেষ মানুষটি তখন নক্ষত্রের পাশে

তারপর থেকে মেয়েরা একা একা ভাত খায় 

অনেক খাবারের সামনেও তারা একাই থাকে বাকি জীবন



























সমৃদ্ধি 

..................



এটা কিন্তু আলাদা সিরিজ

আগেরটার  সঙ্গে এটাকে মিলিও না

আলাদা বারান্দা, আলাদা রান্নাঘর। 

রোদের চাষ করছি, রাত এখন দেড়টা, শুক্রবার। 

প্রবল বৃষ্টিতে ফলন নষ্ট হয়ে গেছে, 

শিশুর মতো ধান হোক, হাতে রূপোর কৌটা নিয়ে কেউ আসুক

আলপথে, নদীর পাশ দিয়ে দিয়ে। 











হৃদয়ে 

.........

মেয়েরা রোগা মোটা হলে সহজেই বোঝা যায় 

ব্লাউজের হাতা ছোটবড়ো হয় 

তখন সেলাই করি ক্ষয়ে যাওয়া মেদ অথবা জমে ওঠা

সোহাগ 

যেন তারা নিশ্চিত প্রতিবেদন লিখে দেয় বাস্তুগন্ধে  ভরা এই পুরনো ক্ষেতের 

আমি কি জানতাম তখন এখানেই  গুলমার্গ, 

 রেইনট্রি বারোমাস ও দখিনা বাতাস 

 গভীরতম ফ্রিজে গোপনে জমা করি  সুস্বাদু নরম ভ্যানিলা আইসক্রিম,  স্বাদহীন বরফও থাকে পাশাপাশি,

হঠাৎ পাওয়া ব্যথায় চেপে ধরে তার ঠান্ডা অথচ সবল হাত ...













৯১.২৭ দ্রাঘিমাংশকে 

....................



নেট সার্চ করে এবং যারা জম্পুই ঘুরে এসে ফটো দিয়েছে, 

সবকিছু ভালো করে দেখে,

একটি নিঃসঙ্গ অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশে বসলাম



কুয়াশা, পাহাড় আর লুসাই সুন্দরীদের সঙ্গে মিলেমিশে 

দিব্য এক গন্ধ পেলাম, লালাভ পরমান্নসুলভ 

ঘাম ঝরানো জৈবিক, হলদে তরকারির রসা

ভেতরে বুনো সঙ্গীত আছে, গিটারের ছররা



ছেচল্লিশ কিলোমিটার দূরে বসে আমি জম্পুইের লিঙ্গ নির্ধারণ করি

মনে হয় নারী হলে বেশি খুশি হতাম

নির্দ্বিধায় বাহুলগ্না হতাম, খুমপুই ফুলের সই আমরা, 

ভাগ করে  এসেছি হরিদ্রাভ আঙরাখা গত একশ বছর 



কিন্তু  পুরুষালি মেঘ এমনভাবে নেমে আসে চার্চের রাস্তায়

মনে হয় আর না গেলেও চলে সেখানে, 

যদি হয় ভাইরাল ফিভার, জ্বরো বাতাস বেপরোয়া !



শুনেছি, জম্পুই হিলে এক সোনালি স্কার্টের মেয়ে ক্যাকটাসের বাগান করেছে,

সেখানেই উদ্ধত হচ্ছে নাকি পাহাড়ি পশম ...

ঐ ঠিকানাটাই শুধু আমার গোপন প্যাপিরাস, বাকি সব অলিগলি সহজ রহস্যে ভরা ...









জুলাই  মাস

..........

জুলাই মাসের শহর, মন ভেঙে ডুবছে আজ,  

 উন্মুক্ত পায়ের মতো  দুই রাস্তা, নদীর দিকে, দগদগে ঘা

ঝরে পড়ে আছে কৃষ্ণচূড়া থোকা থোকা 

 মুখ ঢেকে আছে শহর,  খুুব কান্না পেয়েছে তার, ভীষণ কান্না

তিনটি মেয়ে গিয়েছে একটু আগে, জীবিত নয় মৃত ...

একদল লোক কাঁধে করে নিয়ে গেছে শ্মশানের দিকে













ফেরারি 

..........

বহুকাল হলো আমার কোন ফেরা নেই

ফিরতে চাইছি,

ডানে সমুদ্র বাঁয়ে পাহাড়, ঝাউয়ের  বসত 

পদচিহ্ন  নেই,  আঙুলের নির্দেশনা নেই

অমাবস্যা জমেছে বালির শরীরে

হাত পা মুখ আর হৃদয় গুঁজে  

আমি সকল " ফিরে আসা " হারিয়ে ফেলেছি

আমাকে কেউ  গালি দাও

চিৎকার করে বলো, এদিকে পথ, এখানে অবসর

যাতে আমি খুলে ফেলতে পারি চিবুকের সকল দ্যোতনা

এই ফিরে আসার পর আমার মুখে শক্ত মাটি দিও, 

প্রাসাদ উঠবে সেখানে,

আমি ফিরে এসেছি, থাকছো কিন্তু তুমিও, 

আয়ুধহীন গৃহযূথ যেন মিশে যাচ্ছি শর্তহীন  আত্মসমর্পণে। 









যাত্রা

......



স্বনির্ভর।

ছোট দোকান ছিল মেয়েটির।

সেদিন দেখলাম শাঁখা সিঁদুর হঠাৎই !

হেসে বললাম, আরে!  কবে, কোথায়? 

বহুদিন আগে কচি ছাপ পেরিয়ে যাওয়া মুখে উত্তর এলো

"দশদা, কাঞ্চনপুর ",দোকান ছেড়ে দেবো

এই শহর থেকে চলে যাবো।

কেউ নেই এখানে ... মা.. বাবা, 

 আর ভাইয়েরা গনগনে ।

বললাম, "ভালো থেকো "

চোখ না উঠিয়ে হাসলো

সে হাসির, তিন চার রকম অর্থ হয়

এই হাসি মাঘের শীত মুঠোতে নিয়ে উষ্ণতা দিতে জানে

অথবা, 

এই হাসি আমাদের মধ্যে চলতে থাকা অপপ্রচারিত উদাসীন হেমন্ত











দ্বৈত শীত

...............

আজকাল যখন আমি দুজন হই 

একমাত্র তখনই লিখতে পারি 

এভাবে ক্রমাগত আত্মপ্রতারক হয়ে যাচ্ছি

জল মেশাচ্ছি দুহাতে সব সন্ধিগভীরে

ফেনা লেগে থাকা দুহাতে আরেকজনকে ছুঁয়ে দেখি

তার চোখ নেই, বুকভরা খনি নেই, খননশিল্পী নেই

দুরন্ত সকাল.. লেখার অন্ধকার দেয় না, দেয় না সঘন কামপ্রভা

 

তাহলে সেই আরেকজন কে সে? 

কেন তাঁর কাছে বন্ধক রেখেছি সুখের অসুস্থতা

আছি আছি নেই নেই, হাতে হাত রাখে কৃত্তিকা রোহিণী     

খুব কাছে যেন অন্যমনস্ক কৃষ্ণদেহ, ক্ষতহীন, গোলাপি রক্ত 

দাহ হয় অন্য কেউ কোথাও কোনখানে , আমি লিখি ধর্মান্তর,  তরুণী শীত,  রূপসী পাহাড়   । 













পৌষ সংক্রান্তির সকালে 

.......................

ট্রেনে যেতে যেতে মানুষের উঠোন দেখি

অস্থির এক নিমগাছ ফেলেছে ছায়া

ছায়াটুকু কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে তুলে রাখছে অবিবাহিতা মেয়েটি 

তেতো লেগে আছে তার মুখে ও দেহে

মনে তার হিংসে খুব, মিথ্যেও বলতে পারে বেশ

শুধু ভালোবাসা পেলেই সে বদলে যাবে

পৌষের হিম তুলে নিয়ে আসবে মাঠ থেকে

জানলা খুলে পিঠে বানাতে বসবে, 

ধিকি ধিকি রোদ ঢুকছে তখন আগুনের বেশে, 

তার পাশে  বসে খেয়ে নিচ্ছে নরম আঙুল

খোল করতাল বেজে উঠল অসময়ে

পরিচ্ছন্ন রাস্তায় পৌষ বিদায় নিল এইমাত্র...ই। 



















নিষাদের কাছাকাছি 

.........



মৃত্যু আসার আগে 

 বলব আসতে, বলব দেখে যেতে হবে

ততদিনে হেরে গেছে যশইচ্ছা, কুটোকাটা মনখারাপ 

নিঃশর্ত হয়েছি  সব শর্তে

বৃষ্টির মতো নেমে আসা সেইসব লাইন 

পুনর্লিখিত হোক, চুরি হোক খুব

গ্রীবার কাছ থেকে চুল সরিয়ে

লিখে ফেলুক অন্য কেউ

আত্মার আচ্ছন্নকাল দিয়ে দিতে চাই তাকে নির্জনে, 

তেমন প্রসারিত হাতই খুঁজেছি জাঁহাপনা

আজানের সময় শুকতারাকে  বিদেয় দিয়ে

ভোরের রঙে লোভ করেছি  

আড়ম্বর দেখে সরেছে কলম, 

নিষাদের মতো নিষ্ঠুর হয়েছে সে, ক্ষতের কাছে ফেলে গেছে তির ধনুক  ...











ডোম    



জ্যোৎস্নাবন্ধু দেবকান্ত, বি এস সি পাশ

ডোমের চাকরি পেয়েছে।  অস্থায়ী।  এপ্লিকেশন দিয়েছিল। 

ইলেকট্রিক চুল্লি হলে আর ডোমেরও দরকার নেই

বিদ্যুৎ ছোবলে চিরবির করে জ্বলে যাবে দেহসৌধ প্রত্নময়

আপাতত জ্যোৎস্নাবন্ধু দেবকান্ত, কাঠ ঠেলে ঠেলে দেয়

মৃতদেহ পোড়া গন্ধ খুব প্রিয় তার 

চর্বিসহ অম্লবিধুর শরীরের দহন দেখতে দেখতে 

তার মধ্যে বায়োলজিক্যাল মিথোস্ক্রিয়া হয়,

সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ডোমের ডিগ্রীর নাম 'আগুন '...







বোধন

...........



কবি মারা গেছেন। 

তিনি বেঁচে উঠছেন। 

লোহা গলে গলে মিশে যাচ্ছে আগুনের সঙ্গে

একমুঠো শিশির এখনো তার হাতের মুঠোয়, 

...বাস্প হচ্ছে না, প্রিয় মানুষের ছায়া নিয়ে

টলটল করছে ছেড়ে যাওয়া পৃথিবীর মুখ

একদিন সে ভালোবেসেছিল

একদিন সে অপমান সয়েছিল

একদিন সে চুপ হয়ে গিয়েছিল

তারপরও যেতে পারেনি, সরাতে পারেনি নিঃশ্বাস

কবি চলে যেতে যেতে  না লেখা শ্রেষ্ঠ কবিতাটি  

ছিঁড়ে ছিঁড়ে দিচ্ছেন তাকে

শীতের বনে তারা ছড়িয়ে পড়ছে ট্রাম লাইনের মতো, 

আর  বিকল হৃদযন্ত্র শেষবার চুমু খাবার লোভে

আটকে রাখছে ঘন বাতাস। 











সকল ক্ষতিতে এসো 

...........

চুলগুলো শনের মতো, 

ছবির গায়ে শীত মেঘ , তুষারপাতের সম্ভাবনাও  আছে 

অথচ বিখ্যাত শিল্পী হাঁটুমুড়ে বসে, চোখ নামিয়ে 

 সাধারণ ছবি আঁকতে মন চায়

সন্ধ্যা নামের একটি নদী, সূর্য , বাঁশের ঘর, বেড়া, রাস্তা 

তুলিতে কবেই হারিয়ে গেছে এইসব সাধারণীরা

ঘুরে ঘুরে বিমূর্ততা আসে

আলাদা আলাদা হয়ে ছড়িয়ে পরে কারোর শরীর 

হৃদয় খুঁজে পাওয়া যায় না

ওটাকেই আঁকতে হবে,  মনে হয় সব রঙ শেষ

এতো কথা বলতে বলতে তারা উবে গেছে 

 মনোরমের সমাবেশ কই,  যক্ষিণী বলে " আমাকে আঁকো "

তাকেও  তো রুক্ষ  চুলের আবহে , গালে আদর করে,  ঠোঁটে হিংস্রতা এঁকে প্রাণ দিতে হবে

আজ থেকে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত এই তবে অন্ধকার, এই তবে শেষ ছবি 

ফিরে যেতে হবে, ফিরে যেতে হবে মূলে, সকল ক্ষতিতে

বাগানের  সাদা গোলাপ  নিয়ে একক মিছিল, শবের কাছে কোলাহলে 

যাবতীয় পদচিহ্ন মুছে দিতে  মেঘেরা এসো তখন  মাটিতে,

প্রস্তাব ও প্রত্যাখ্যানচূর্ণের ধূপে বিদ্যুৎ স্পর্শ দিও   । 

     











ইলিশ 



রুপোলি  ইলিশ এক মহালয়ার সকালে

একটুখানি রক্ত কানকো ছুঁয়ে ভাসছে 

শরীর জোড়া পদ্মা, আর এক বুক মেঘনা ...চর্বি ও মাংসে 

উঠোনে শিউলি পড়ে আছে,

তেলে ইলিশ কমলা আর লালে, বাইরে পাতলা কুয়াশা মরছে

অজস্র জল সাঁতরে, নদীর গভীরে চাঁদের ভেঙে পড়া দেখতে দেখতে,

কত নিমগ্ন অভিসার হয়েছে, আঁশ ছোঁয়া কথোপকথন

ঝাঁকে ঝাঁকে জালে উঠেছিল তারা, মৃত্যুও তৎক্ষণাৎ 

রাঁধুনি ভাজছে, মনে মনে ভাবছে সে একজন যমদূতি

নরকের কড়াইতে নাকি পাপীদের এরকম সাজা হয় ! 

কি পাপ করেছিল এই  মাছ তবে?

গভীর জলে ছিল ডুবে যাওয়া জাহাজ,  ভাঙা মাস্তুল

সেখানেই খেলেছে তারা শৈশব, 

মাছেদের ঘরবাড়ি।  শৈবাল ও ঝিনুকে জড়িয়ে।  ভালোবেসে। 

মাছেদের বহুগামী ভালোবাসা পাপ হয়ে উঠে এসেছে

মানুষের ঘরে, এইসব গৃহরচিত দিনে। 









ট্র্যাপিজের মেয়ে

..............

ট্র্যাপিজের খেলায় 

মেয়েটি ঠিক যে মুহূর্তে শূন্যে ভাসছিল

নীচে ঠিক তখুনি অগুনতি নক্ষত্র, বৃষ্টি মেঘ। 

বেঁচে থাকার যাবতীয় হাততালি জড়ো করে, একটি নির্লিপ্ত হাসি

দুহাত বাড়িয়ে দেয় সঙ্গী যুবক

দড়ির ওঠানামায় গাঢ়তম জীবন

 মধু, মাংস আর ভাতের চকিত বিস্ময়

কোনোদিন হাত ছেড়ে দিও বন্ধু

নীচের অবারিত জীবনে  পিচ্ছিল হয়ে উড়বো আমি 

নেশার মতো হাসি ঢাকতে থাকে মেয়েটিকে

 গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সাহসী স্বেদ

...সবুজ আলো আর হাততালিতে

শীতের সকালে  কুয়াশার  দড়ি বেয়ে এভাবেই 

হেঁটে যায় পৃথিবীর শুদ্ধতম তরুণীরা ...









জলমাটি



মনে হলো চার লাইন লিখি 

দেখি বৃষ্টিতে চুপসে গেছে দারি, কমা 

বিরতি মুহূর্ত খুঁজতে গিয়ে আমি কোন হ্রদের ধারে এসে পৌঁছেছি

এক চা ওয়ালা হাত বাড়িয়ে এক গ্লাস দিল, ধূসর গরম ভাঁপ

দেশি হ্রদ, পাটগাছে ভরে আছে জল জল মাটি

দু কথা ভেবেছি মাত্র,  কালো মেঘ থরথর

চারপাশের গ্রাম থেকে চলে যাচ্ছে সেই " নব বিবাহিতা "

আশ্চর্য ! 

নৌকো করে আজও কত পারাপার হয় অনিচ্ছুক জনপদে, 

ছইয়ের ভেতর থেকে একটু হলুদ লাল আঁচল জলদস্যুর মতো বেপরোয়া চাহনি দেয় ...









গুলবাহার

..........

একটা কার্পেট কেনা হলো আজ সকালে, হঠাৎই !

নীল হলুদ রঙ, ডিপ ব্রাউন কারুকার্য অনেকটা ঠিক অভিমানী মানুষের মতো । 

দীর্ঘকায় লোকটি নিয়ে এসেছিল,  গলার স্বর খুব  ভারী,

আমি মনে মনে বলি ' কাশ্মীর ... কাশ্মীর '

 বাড়ি তার বানিহালের কাছে, লাল সূর্য গলছে যেখানে 

যাবার সময় হেসেছে সে, সাদা কালো দাড়ির ফাঁকে

একটি ঠিকানাও দিয়েছে, বলেছে যেতে

তিন সারি রেইনট্রি, দুখানা আপেল বাগান

তারপরই রোজউড কাঠের ঘর তার, ঠিক চিনে নেওয়া যায় 

যদি থাকে ইচ্ছা, খুবসুরত দিল ওউর শান্ত নিগাহ্ 

কার্পেটটি পেতেছি বিকেলে

তখন থেকে বরফ পড়ছে ঘরে    

সার সার গ্রাম, দূরে দূরে সেনা কনভয় যাচ্ছে যাচ্ছে আর যাচ্ছে

অনেক খানি সময় নিয়ে নিয়ে ফিরে ফিরে আসে গুলির শব্দ 

কত দূরে যুদ্ধ হচ্ছে, জানি না ঠিক কতই বা রাত এখন ! 

আমরা তো চিরকাল নিঃশব্দ। 

দু পা হাঁটি, কার্পেটের শরীরে শরীরে 

মনে হলো ডাললেক চুপ করে আছে এ সিজনে

জাফরান ফুলগুলো সাবধানে মাথা তুলছে ... তুলতে হয়

না হলে কাঁদে জাফরানচাষীর মেয়ে 

রোজিনা নাম তার, গরমকাল এলেই নিকাহ্

ভিনদেশি জওয়ান, তাকেই পছন্দ অবশেষে স্নিগ্ধ রোদের দিনে

এতো যুদ্ধময়, এতো বারুদক্লান্ত ভূমি

এতো যে ফোটে টিউলিপ, এতো কান্না তার, 

সবকিছু কন্ঠে নিয়ে,

কাশ্মীরী কবি কবিতা পড়তে এসেছে দিল্লি

বলেছে সে দেশকে ভালোবাসি,

বলেছে সে কাশ্মীরে গরীব খুব

পর্যটক কাবাব খেলে, তাদের খুশি হয়    

বাড়িতে আমাদের  শাক আর মোটা রুটি, 

অল্পস্বল্প প্যায়ার এরমধ্যেই গুটিশুটি। 

আর জানালায়  ক্ষুধা নিয়ে  চেয়ে থাকা বহুদশকের ক্ষিপ্র রাত, এই তো মোটামুটি। 

অথচ জানো কি? 

মরে যাচ্ছে শালের দোকান, ক্ষীণ সূচ ফুল তুলতে পারে না আর। 

নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে শিকারা ঘর, একা একা নির্জনে মাউথ অর্গান বাজাচ্ছে গাইড, 

পৃথিবীর মানুষেরা এসো,

এই গুলবাহার, গুলচিস্তান খুঁশিয়ো কা ভিখ্ মাঙতে আয়ে হে সঁদিও সে। 

পড়তে পড়তে কাশ্মীরী কবি কেঁদে ফেলে

ভুলে যায় হলঘর, হাসিন রাত, আর মেহমান    

ফিসফিস করে বলে, 

তোমাদের শহর এতো শান্ত কেন? 

গুমগুম করে  বলে, 

তোমাদের স্কুল কি বন্ধ হয় না যুদ্ধের জন্য?

হিস হিস করে বলে, 

তোমাদের বিবাহমাস মুবারক   !

হামকো ভি জন্নত দিলাও ! 

এক খিলতি হুঁয়ি শ্যাম, এক গভীর ঘুমে শুয়ে থাকা রাত   । 

পেরিয়ে এসেছি কার্পেটের শরীর, ভয়ে ভয়ে, 

কী জানি কী হয়, যদি কাশ্মীর এসে যায় আমার ঘরে ! 

মার্জিনের বাইরে এসে দেখছি দূর থেকে, নিরাপদে, 

'কাশ্মীর... কাশ্মীর '। 









আছি

.........

আজ কত তারিখ? 

রঙখেলা নাকি, চৈত্রমাস ! দোলপুজো? 

শুনেছি আবির শেষ হয়ে গেছে দোকানে দোকানে

কাল রাতেই কিনে নিয়ে গেছে রাজনীতির লোকেরা 

কিছু কিশোর কিশোরী মুখে নেশার গন্ধ নিয়ে

চষে ফেলছে শহরের মাতাল বাতাস, মনে প্রেম নেই, কেমন হিংস্রতা জেগে উঠেছে তাদের শরীরে। 

এদিকে নহবত বসিয়েছে কোকিলের দল, 

আমের মুকুল, লেবুর ফুল হারিয়ে দিচ্ছে মনখারাপের গন্ধ, 

এতো জোড়ে মাইক বাজছিল সরস্বতী পুজোয় ফেব্রুয়ারি মাসে ! 

পুজোর বেদীতে কেঁপে উঠছিল কলমের হৃদয় , ভীতু ভীতু কালির বিন্দু, 

এইসব রঙখেলা, সরস্বতী পুজো, ভালোবাসার দিন সব মিলেমিশে আমি তোমাকে ভাবি ...

অবয়ব নয়, হৃদয় নয়,

 আমার বেঁচে থাকার মুদিখানায় ভীষণ অনিবার্য, দুজন পাশাপাশি আছি, চলে যাচ্ছে,  এই ভাবনাটুকু।











কন্ঠীবদল

.............

শ্যামলীরাই বোষ্টমী। জেলা উত্তর ত্রিপুরা। গ্রাম "পলাশকুঞ্জ "।

সাড়ে কুড়ি বছরে কন্ঠীবদল।

তখন ফাগুনমাস। বেহায়া বাতাস। দুজোড়া ধুতি চাদর।

পলাশফুল পড়ে পড়ে পিছল হয়ে থাকে আখড়ার প্রাঙ্গন।

তিলক মুছে তিনবার মাছ খাওয়া হয়েছে।

দুবার মুরগীর ঝোল। তিনখানা হিন্দি ফিল্ম। নাচ গান।

এটুকুই অবৈধ বসন্ত। বাকি সব কীর্তন। সপ্তমীর জ্যোৎস্না।

শিউলি, কাঞ্চন, রঙহীন জবা তুলে তুলে নারায়ণের চরণে।

দোলের দিন সবুজ রঙ, গোলাপি আবির, সঙ্গীর পুরাতন মুখে 

ভিক্ষাকষ্ট  শুধু। 

পুন্যের মাস। কার্তিকের কুয়াশা মেখে মেখে শহরের অলিগলি ঘোরা হয়। 

একজন মরল, দ্বিতীয়জনের লগে কন্ঠীবদল। 

শ্যামলীরাই হাসে না। নামগান করে।

তৃতীয়জন এলেই বা কী। বয়স তার এখন সাঁইত্রিশ। 

ভরা হাতে মাছ কাটতে ইচ্ছা হয়। রক্ত ধুয়ে তেলে হলুদে জমিয়ে গন্ধ ছাড়তে ইচ্ছা হয়।

না হয় সন্ধ্যাবেলা একটু তুলসীতলা। বাকি মাছভাত আর রমণ।

সে হবার জো নেই।

 অথচ ভক্তি নেই। 

ঘোর সংসার বুকের ভেতর। 

ঘরবাড়ি উঠোন চুলা আর পুকুরঘাট সমেত।

গাছভর্তি আমের বোল। কষা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে ফাগুন চৈত্র মাসে, আর পুকুরের জলে গা ধুতে ধুতে লাক্স সাবানের ফেনায় ফেনায় ধুয়ে যাচ্ছে বোষ্টমী রঙ। 

তিলকের মারপ্যাঁচ,  তুলসীমালার বৈরাগ্য।

ট্রেনে কইরা আসাম যাওয়ার সময় দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা।

ভরা যৌবন।

 বিবাহের রঙ নাই কপালে। কিন্তু বোঝা যায় মাংস ছুঁয়েছে তারা। কই কন্ঠীবদল তো হয় নাই।

জীবন্ত স্বাধীন। শ্যামলীরাই কীর্তনের সুর তোলে। দশটাকা, দশটাকা দেয় দুজনে।

কয় আশীর্বাদ করো যেন  আজ রোজগার হয়, আমরাও বোষ্টমী, ঘর আছে,  ঘর নাই। বাইরে বেরুলেই  টাকা।

বাড়ি ফিরলে জিগায় টাকা আনছো নি?

তবুও তোমাদের  তো ভণিতা নাই, শ্যামলীরাই তর্ক করে।

হি হি ! ভণিতা ! ছুরির মতো হাসি। নাহ্ ভণিতা নাই, রঙখেলার দিন কৃষ্ণ আসে খেলতে।

তার চোখে দেখা যায় এই  বসন্তকাল।

গোপী মেয়েদের ব্যথা।

কত কত রঙ নিয়ে আমরা পদাবলী লিখে যাই।

`মানুষ ভুল করে ভাবে ধর্মের গান, অথচ এসব

আসলে নাড়ি ছেঁড়া অশৌচ কাল। 













বসন্ত এলো বলে



ফুলকপির কেজি কুড়িটাকা, বাঁধাকপি দশটাকা। 

আরো কুড়ি বছর পর কেউ যদি এই লেখাটি পড়েন,

দামটা আরো একটু বাড়িয়ে দেবেন অনুগ্রহ করে। 

এইভাবে ফাল্গুনমাস প্রবেশ করে কৃষকের ঘরে

শিশির তখন ঝরে যাচ্ছে অভিমানের মতো 

বসন্তকাল তাই শুধু কৃষকবধূর ভাঙা নথ, ধূসর স্বপ্ন।    

 এইসময়  বিবাহের  চিঠি এলে মনখারাপ হয়

সানাই বাজলে, মনে হয়  পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিষাদ

বসন্তের দুহাতে কে যেন দিয়ে গেছে শুধু বিদায়ের অভিশাপ

তার সারা শরীরে পলাশের জমাট বাঁধা কালো রক্ত

প্রেম চলে গেলে মানুষ যেমন ম্লান হয়ে যায়

বসন্ত সেই হেরে যাওয়া বিরহী প্রেমিক, 

গাঢ় ধুলো  যার শরীরে সহস্র শতাব্দী ধরে

মিথ্যে বললাম বোধহয়, বসন্ত এলে মনে হয়, 

পৃথিবী কোথায় লুকিয়ে রাখে তার বিচ্ছেদ, 

আজন্ম  আনন্দ কেনো এই ঋতুর দোহারে, 

অবিরাম পরাগসংযোগে তার ক্লান্তি নেই 

মৃতশরীরের রন্ধ্র থেকে বেজে ওঠে  পৃথিবীর সুর ,   

 শুকনো পাতা ঝরে পরে মাটির দুরন্ত আলিঙ্গনে    

বসন্ত এলো ...তাই তোমার পুরনো চোখে হারিয়ে গেছে

আমার পুরনো চোখ।









ভারবাহী

......

রাজিয়া সুলতানা , নূরজাহান, লক্ষ্মীবাঈ, আরোও কত সম্রাজ্ঞীরা 

আছেন, যুদ্ধে ও শাসনে, তখনও এবং এই সায়াহ্নেও

উড়ছে আতর, রঙের গুঁড়ো তাদের প্রাসাদে

ভগ্নপ্রায় আলোর তলায় আমার কৌতুক রাখি 

 সেইসব স্তিমিত অধরগুচ্ছে যেন বিদ্যুৎ চমকালো 

প্রত্যেকেই ক্ষমতায়নের পর  ভালোবাসার অপেক্ষায় বসে আছে









মুজিবকে বাদশাহি গোলাপ 

....................

একটি  স্বাধীন হওয়া দেশ কে আবার জেগে উঠতে হলে, স্বপ্ন বদলাতে হয়।

হে মুজিব ...

আপনার মতো সরল স্বপ্ন দেখা, 

আমরা বাংলাদেশের যুবক রা ছেড়ে দিয়েছি। 

মুক্তিযুদ্ধের নামে আমরা দিন দিন পরাধীন হয়ে যাচ্ছিলাম

তাঁহাদের কথা, তাঁহাদের গান, তাঁহাদের স্মারকগ্রন্থ

একটি একা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আজকাল যুবকেরা ঘুমোয়

তাদের বুকের মাঝে একটি বাংলাদেশ, ভারতসীমান্ত আর কিছু বিদ্বেষ।

তথাপি মধ্যাহ্নে ভারতীয় যুবকের সঙ্গে দেখা হয়

দুজনের করমর্দন হয়, তারা রকেট বানায়, নতুন গ্রহে যায়, 

যেখানে বেকারত্ব নাই ...বাদশাহি গোলাপের বিলাসিতা আছে। 





২৯/০৬/২০২০, সোমবার, রাত ৯: ৪৫









ভালোবাসার বাড়িতে

.......

ভালোবাসা খুব একা হয়,

যারা ভালোবাসা ভেবে গোলাপ দিচ্ছে    

তারা এখনো জানে না, গোলাপের নীচে নীরবতার সাম্রাজ্য

আগামীতে তারা একা হেঁটে যাবে বলে

তৈরি হচ্ছে শহর, পার্ক, ফুলের দোকান    

এ পথে আমি যখন যাবো, তখন তুমি হেলায় ওড়াচ্ছ স্মৃতি

শীতের ধুলোলাগা পাতার মতো সেসব স্মৃতিস্মারক আমার অসুস্থতা, 

তবুও আমি এখন খুব নিশ্চিন্ত,

হারিয়ে ফেলার পর আর ভালোবাসা হারানোর ভয় থাকে না

আমরা আর একে অপরকে দিব্যি দিই না

আমাদের কল্পনার বাতাসবাড়িতে 

এখন অজস্র দোয়েলপাখির মেলা বসেছে, গানের জলসা

 গোলকধাঁধায় পড়ে, সেই বাড়ি ছেড়ে এসেছি দুজনেই

তাতে হিমেল বাতাস বইছে , রোদের আহ্লাদ

তুমি বন্ধুর কাছে গল্প করছো, প্রেম হলো 'ন্যাকামো '

তাই এসবে হাসি পায়, তার চাইতে অনেক ভালো আছো এখন। 

আমি বন্ধুর কাছে গল্প করছি, ভালোবাসা বলে কিছু হয় না

পুরোটাই  ' ইগোসেন্টার্ড '। 

আসলে ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাচ্ছি দুজনে

সেই ভাঙন ঢাকতে, আমরা আত্মহত্যার ঘটনাকে হেরে যাওয়ার গল্প বলে ঘেন্না করি, 

পৃথিবীতে কেউ চলে গেলে, তাকে ছাড়াও আছে বেঁচে থাকার অজস্র জলঠিকানা,

একথা আমি কোথায় যেন এইমাত্র বলে এলাম উল্লাসে। 

আমাকে ঢাকতে আমি উজ্জ্বল পোশাক পরছি

তোমাকে বিস্মৃত হতে ভ্রমণে যাচ্ছি পাহাড়ে সমুদ্রে

আমার  আংটির নীলাভ পাথর থেকে গড়িয়ে যাচ্ছে তোমার রঙ

তাতে চুম্বন নেই, শ্রাবণ নেই, নেই চোখের ওপর চোখ রাখার অমোঘ তুর্যনাদ

কিন্তু গোপনে খোঁজ রাখছি তোমার

তোমার দেহে কী তেমনি ধাতব ঔজ্জ্বল্য 

চশমার পাওয়ার বেড়ে, চোখ হয়েছে আরোও আবেদনময়

কারা কারা তোমার জন্য মুগ্ধ হয়? সেইসব শুকনো নদীতে কী তবে আমার ছেড়ে আসা জোয়ার?

একসময় আমরা ক্লান্ত হই

প্রতিটি দিনের মধ্যে যে গভীর একটি দিন আছে, সেখানে এসে দাঁড়াই।

কোথাও কেউ নেই, আমাদের ছেড়ে চলে গেছে পৃথিবী। 

আমরা মৌন বিষাদের মতো নিজেদের গিলছি

অথচ আমাদের বাতাসবাড়িতে ভালোবাসার উৎসব হচ্ছে ...

সেখানে তোমার ও আমার নামে আসেনি কোনো আমন্ত্রণ। 









অকিঞ্চিৎকর 

..........

আমাদের কথাবার্তা রইল এখানেই

কাগজকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার এইসব দুঃসময়ে

তারা আর বই হবে না

শুধু আমরা চলে গেলে,

 আলতো করে উঠিয়ে নিয়ে যাবে কোনো লোক এই সমস্ত অতীত, 

হয়তো   "নিন্দে" হবে,  হয়তো নিতান্তই  " অকিঞ্চিৎ "

তবু তারা বই হবে না, বৃক্ষের ছালে আমরা কোনকালেই কিছু লিখবো না

এইটুকু প্রতিশ্রুতি, বাকিটা মহামান্য সরকার জানে। 









পেট্রোল 



ছোট শহরের ছোটখাটো কবিতা পাঠের আসর শেষ হয়,

 মনে হল আমার জন্যেই দাঁড়িয়ে তারা  

 দুইটি তরুণ... 'যুবক' হবে বলে ' অপেক্ষা'

 রেখেছে যেন  রোমশ সন্ধিতে, 

আমি দাঁড়ালাম,

রুক্ষ পাহাড়ের প্রতিধ্বনি তরুণের গলায় 

"আপনাকে শুনবো বলে শেষ পর্যন্ত বসেছিলাম "

ফিরছি, পথের ধুলোর কাছে খুব কষ্টে অহংকারটুকু দিয়ে দিলাম

   ডেনিমের শার্ট আর ছেঁড়া জিনসের  ফাঁক দিয়ে 

বেড়িয়ে আছে সাদা সাদা প্রজাপতির পাখা 

পেট্রোলের দাম শুধু  বাড়ছে জেনেও 

এই সব দেবদূতেরা গন্তব্যহীন ভেজা রাস্তায়  বাইক 

নিয়ে  হারিয়ে যায় যখন তখন ...





দ্বাদশশ্রেণী 

..................

জয়েন্টর  রেজাল্ট বেরুলে

কিছু তরুণের মাথা ঝুঁকে যায়

ঘর অন্ধকার করে তাদের বাবারা বসে থাকে

 বিপর্যস্ত মার্কশীট অজস্র রিংকলস্ এঁকে দেয় মার চোখে একরাতেই

ছেলেটি কিন্তু জানতো কেমিস্ট্রি তার নয়, সে তো 

অন্য ফুলের মালী

কিংবা ফিজিক্স, তার কাছে রেখে গেছে মৃত পাখির শব

ম্যাথমেটিক্স  ডুবিয়েছে তাকে, আসলে বাজতে চেয়েছিলো অন্য সেতার হৃদয় কেটে

এই  তরুণেরা অসময়ে নির্ভুল ভালোবেসেছিল কাউকে

হারিয়েছে সময় বাই সাইকেলে আর খাতার পেছনে, 

দ্বাদশশ্রেণী বড়ো ভুল করে, প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে আনমনে শুধু অ্যাসিড ঢালে ...

কেয়া দিদিমণি তুমি সবুজ শাড়ি আর পরে এসো না। 













দোলযাত্রা



দোলযাত্রায় বসন্ত নিয়ে আসে রাত নাম্নী মেয়েকে 

 দিনশেষে রাত একটু বিশ্রাম, বিনিময় ভালোবাসার

দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে চায়ের দোকানি উনুনে জ্বেলেছে  ঘুমহীন রাত

অন্ধকার সরে গেলে পাতলা কুয়াশায় দুধ গুলবে, গোলাপি দিন

মিছিল শেষ করে যুবকেরা ফিরে গেছে, হাত ভর্তি  গুলাল

রাতের আড়ালে তারা  হাতে তোলেনি নেশার গ্লাস, 

কৃষকের প্রলাপ আর অম্লজল জমা করেছে  বুকে 

জন্ম নিচ্ছে শরীরে তাদের দূরাগত খারিফ শস্যের খেত , 

খেলার মাঠ থেকে পকেটভর্তি ধুলো নিয়ে বাড়ি গেছে এক তরুণ, 

কাল আবির মিশবে ধুলোতে,

 ঘামে চিনে নেবে তাকে একান্ত তরুণী...এই বিশ্বাস তার 

গভীরে ভিজবো বলে, 

মৃত মানুষদের  দাঁড়াতে বলেছি স্নানঘরের দরজায় 

আমার আসতে একটু দেরি, দুপুরের রোদ এইমাত্র দিয়ে গেলো দুধওয়ালা

 পুড়ছে ভেতরে কিছু , রক্তহীন ঠোঁট,

 দৈন্য ধুতে দীর্ঘ স্নান হবে ...দীর্ঘতম জলপ্রপাত

আমি কী চিনেছি রঙ, চিনেছি রঙের তফাৎ, মিশ্রণের অসহায়তা 

বন নেই বলে হৃদয়ে, কাঠুরিয়া হেঁটে গেছে, সৈকতে ধূপের গাছ 













শর্ত রেখেছি বসন্তে 



পলাশ একটি  রাজনৈতিক ফুল  , 

পলাশ ফুটলে মনে  হয় গনতান্ত্রিক এই দেশ। 

পলাশ ফুটলে মনে হয়, 

আমিও চিৎকার করি, স্লোগান বলা শিখি

পলাশের সঙ্গে মিশে যায় মিছিলের রুক্ষ পথ    

 তোমার গলায় আজ নকল পলাশের মালা ,

অথচ তুমি কোনোদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে ! 

আরে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি নয়, 

অথবা প্রেম ট্রেম, চুমু টুমু

প্রতিশ্রুতি মানে আমার সকল মৌলিক অধিকার,

তুমি বা তোমরা, কে হও আসলে জানি না

শুধু জানি, প্রতিশ্রুতি মানে, আমার দেশকে ভালো রাখা । 









দীপা...দ্য অলিম্পিয়ান 

.............................



দীপা... একটি গভীর আশার নাম

নাগেশ্বর ফুলের গন্ধে ডুবিয়ে রাখা শস্যনীড় 

 প্রদুনোভা ভল্টে হয়ত ঝলসাবে স্বর্ণশোভা হয়তো বা না

থাকবে একটি অক্লান্ত পেরিয়ে যাওয়া 

থাকবে স্রোতের মুখে জ্বালিয়ে রাখা সবুজাভ আগুন

সেখানে পা রাখবে কচি গাছের দল

একটি পদক, স্বার্থপরের মতো চাওয়া,

ঘাম জেদে মাখামাখি,  এখানে নেই ধাতবস্পর্শ

জেগে জেগে ওঠে  শেষপর্যন্ত শুধু একটি মেয়েরই ঘুমহীন রাত

পদকের পথে গড়িয়ে পড়েছে  কত অপমানের অভিধান

বিলিয়ন ভারতের চোখে মরুজ্যোস্না 

উত্তরপূর্ব ভারতের এই একফোঁটা বৃষ্টি ঝরবে কি?

দীপা ...যদি না ওড়ে ত্রিবর্ণ রঙীন ,

 যদি না বাজে সিন্ধুসঙ্গীত...রিও র আকাশে 

আমরা শুধু জানবো, 

তুমি সেদিন  ঝরেছিলে সবটুকু দিয়ে। 





( রচনাকাল -- 6/12/2016)















কাল্পনিক





ইংরেজী সে জানে ভালো

তুখোড় একদম, যেন সহজাত

শুধু কাঁদতে এলেই, বাংলায় কাঁদে

আমাকে সে বাংলায় ভালোবাসে



হিন্দিতে তার খিস্তি খুব

শুধু অভিমান হলে নীচের দিকে চোখ    

আমাকে দেয় হলদেটে লাইন

ঋতুময় বিষাদ আর শান্ত চোখ 





তার সঙ্গে সংঘাত হয়, ইংরেজিতে গালি,

তারপরই মুখ চেপে ধরা আর নীলচে জামদানি,

চোরাগলিতে ঢুকে পড়ে রাঙা ধুলো বালি    

আমরা বাংলায় মুছে দিই আমাদের জেদ 

ঘনিয়ে আসে বিকেলবেলা, গোধূলির ছাই

তার সঙ্গে পাগলামো হয়, বিষাক্ত শর্তাবলী

সবকিছুই লেখা হয় যেন অন্য ভাষায়

যে ভাষায় তাকে চিনি না আমি

তারপর জল কাদায় মাখামাখি 

বাজে বর্ষা, গরম, মশা মাছি

পলাশের মতো আলো জ্বলে ওঠে

বাংলায় আলপনা দিতে বসি, 

ঠারেঠোরে অপরাধ ভুলি

জানান দিই আমি তাকে

 বাংলায় ভালোবাসি, বাংলাতেই এই মাখামাখি। 













ঝুলন পূর্ণিমা

...............

এই দেখো কেমন আঘাত? 

আমরা তো নিতেই পারি আঘাত। 

এই দেখো কেমন শোক? 

আমরা তো নিতেই পারি ছিন্ন বিজুরি, 

ঘোর যামিনী, নিশীথ নূপুর, কালো ওড়নি 

চলে এসো সখী, বিরহ মন্দ্রিত হোক ধীরে

তারপরে চলে যাবো গেহে, সম্ভ্রান্ত শয়নে

 এ উচ্ছলতা ছাড়া সবই পবিত্র আছে, ছুঁয়ে দেখেছি নিজেকে















রবিপ্রণাম 

............



আমি ফিরে আসি প্রতিদিন তাঁর কাছে

যাবতীয় ভুল, অপমানসূত্রতা কাঁধে নিয়ে

সায়াহ্নে  রূপসাগরের জল ছুৃঁয়েছে ব্যর্থতা

যেন কিছু নয়, যেন কিছু নয়, যেন আকাশ আমার বিষয় নয়

রৌদ্র, শুষ্কপত্ররাজি ক্লান্ত বাতাস কোনটাই আমার  ভাষ্য নয়, 

 কোথাও জমছে খনি, জমছে বারুদ, তৈরি হচ্ছে বিরুদ্ধ প্রাচীর

আমি কী তবে লিখবো  বাতিল অসহায়তা

কোথা থেকে আনবো ঈশ্বর, চোখের জল, সুরাসুর সমাগম

এই যে লিখি অন্ধকারের সমাপতন

লিখতে লিখতে বার বার বদলে যাই

তোমাকে দেখি রবি... রবিকে দেখি

দীর্ঘ,  দীর্ঘতর, ঋষির মতো, বিনয়ের মতো, ঔদ্ধত্যের মতো

যেন রেখেছো হাত আমার সকল তুচ্ছতায়

তব প্রাণে মিশে যেতে যেতে ভাবি

অক্ষরে অক্ষরে ফুলশোভিত যুদ্ধক্ষেত্র, দৃপ্ত আলিঙ্গন, ঝড়ের জানালা সব রেখে গেছো

এখানেই দুটো ভাত বেড়ে খাই, একমুঠো বৃক্ষ জ্বলে, এক সহস্র জলে আমার ধৃষ্টতা মাথা নত করে থাকে।









অসমাপ্ত মেয়েটি



ঠিকঠাক সংসারী হওয়া গেলো না 

মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাই করার অক্ষমতা জন্মগত দূর্বলতা

গ্রীষ্মের কাঁচাফলে হলুদ লবন লাগিয়ে সঠিক রোদে মাপতে পারি না 

খুব গরমের নেশাগ্রস্ত দুপুরে প্রায় বিলুপ্ত ঘুঘু পাখির অপেক্ষা করি

এই পাখিটির ডাক নষ্টালজিক কৈশোরের মতো, 

আজীবন পুরনোকেই সুন্দর বলে, যেন আমি রুদ্ধদুয়ার নবাবের মেয়ে

এ পাড়ার ক্ষণজন্মা বউটিকে ভুলতে পারি না,

আমাদের গায়ে কি এখন সে গুল্মলতা হবে! 

মেখে নেবে অসমাপ্ত, হাবিজাবি সাংসারিক পথ্য, ফাঁক

দিয়ে গলে পড়া ঝুলনের জ্যোৎস্না ...









হেমন্তের পাখি

..............



বিবাহের চিঠিরা একটি একটি হেমন্তের পাখি

শীতের বেলায় তারা নাম ও গোত্রের বাহক

গৃহস্থের ঘরে নিয়ে আসে আমৃত্যু নিমন্ত্রণের সম্ভাবনা

এ পথে কিছু ভুল লেখা থাকে সোনালি অক্ষরে

সামুদ্রিক সানাই যেন আনমনে ফেলে গেছে 

 অচেনা উদ্ভিদের বীজ, 

উচ্ছ্বাস আছে বটে চিঠিতে, মাঘের বৃষ্টি, খনার বচন

আর হিম কেটে নিয়ে আসা একটুখানি যৌথ অরণ্য। 

বিকেলবেলায় অজস্র পাখির কিচিরমিচির শুনেছিলাম    

রেকর্ড করিনি, ছবি তুলিনি, তাই বোধহয় এখনও কানে বাজছে

'হেমন্তগোধূলিবিহঙ্গ ',অবাক হয়ো না ...















লাভা 



যে মেয়েটির সঙ্গে আমার বেশ ভাব,  নামটাও ঠিক জানি না তার। পান খায় খুব।

ব্রাউন রঙের লিপস্টিক লাগায়, একটু ধেবড়ে থাকে।

 চুল সামান্য একটু কোঁকড়ানো, ঘড়ি পরে, গোল্ডেন চেন। 

খসখসে আঙুল, রঙ লাগানো নখ, দ্রুত ফলস লাগায় আমার শাড়ির।  

নাম দিয়েছি তার দ্রাঘিমা, বিয়ে করেনি বা হয়নি। 

চালাক। বুদ্ধি খুব   ।

তাকে আমি পছন্দ করি না ।

 কিন্তু ভাব আছে, কথাও বলি না, কিন্তু ভাব আছে। 

কারণ, ওর ভেতর জমে আছে স্বর্ণাভ লাভা ,  

আগ্নেয়গিরিটিও চেনা আমার, একই লাভায় হাত দিই,

 সুপ্ত, কী ভীষণ ভয়ঙ্কর এই নীরবতা ! 

মেয়েটিকে আমি পছন্দ করি না।

যদিও তার সঙ্গে খুব আধাআধি আমার।

আগ্নেয়গিরি দিয়েই আমাদের পরিচয় আর সর্বশান্ত হওয়া।











প্লাবন, ২০১৮





কাঁচির মতো চাঁদ যেদিন উঠবে বলে  নিশ্চিত ছিল আকাশ, 

সেদিন কোন কারণে তা ওঠেনি    

প্রচুর বৃষ্টিপাত  এবং  মেঘপ্রবাহে    

কেরালায় শুরু হলো বন্যা, অসীম তার শক্তি, ভগবানকে খুন  করে দেয়ার ক্ষমতা 

তবুও তার পরের দিন  ঝকঝকে ধারালো

একটি বাঁকানো চাঁদ উঠেছিল পশ্চিমঘাট পর্বতমালার আকাশে

তাই দেখে ইমাম ঘোষণা  দিলেন আজ 'ঈদ '

এবং জলমগ্ন সেদিন মসজিদ। 

মন্দিরপ্রাঙ্গনটি একটু উঁচু হওয়ায়, হিন্দুরা বলল

আজ এখানেই তবে হোক "ঈদের নামাজ "

এমন ভালো নিউজ হেডলাইন পেয়ে,

তরুণী সাংবাদিক বন্যার ভুল খবর পড়তে থাকে বার বার।    

তরুণ আবহাওয়াবিদ দেয় ক্রমাগত নিম্নচাপের ভুল সংবাদ 

দুজনেরই  চাকরি গেছে    আজ ...তা যাক্

তাঁরা এখন দুরন্ত বাজ, ভারত মহাসাগরের তীরে ঝড় গিলে খায় ...

















 কাঠের গোলাপ 



লক্ষ্মী ছড়ার ব্রিজ থেকে কাল রাতে কেউ ঝাঁপ দিয়েছিল, 

নীচে পড়েনি,

দুজন পরী কাছেই ছিল,  একা  অভিসারে 

যুবকের দুপাশে জুড়ে দিলো ডানা, নাম বদলে গেলো তার মেঘের নিয়মে। 

এখন  সে সূর্যকেতু গন্ধর্ব

যে দু একজন মদখোর এই দৃশ্য দেখেছিল

তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি

পালকের মতো শরীর নিয়ে সূর্যকেতু উড়ে বেড়ায়

চাকরির আর দরকার নেই তার

আকাশ থেকে নক্ষত্রের জল পান করে, পরীদের হাত থেকে ফুলের পাপড়ি খায়  

কিন্তু কারো গলার স্বর শুনতে পায় না , নেশাগ্রস্তদের একান্ত সুর, অথচ  যুবকটি ছিল সঙ্গীতপ্রিয় । 

কোন চাহিদা নেই এখন, শুধু  একদিন শুনতে চায় শেষবারের মতো... মরু বেহাগ...ওস্তাদ  রশিদ  খান। 



তারপর উড়বে না, ডানা ভেঙে দেবে , মরবে, যাতে দেহ ভেসে  ওঠে  আষাঢ়ের জলে 



মর্গে তার মৃতদেহ সনাক্ত করতে আসবে বন্ধুর ছেড়ে দেওয়া  প্রেমিকা ,  মেয়েটি প্রিয় ছিল তাঁর,  তিন পূর্ণ চাঁদ আগে। 

অথচ দেখো সুগন্ধা কাঠগোলাপ  ফুল এনেছে এখন... কেমন  শোকহীন চোখে   ?

খুব বেশি দেরি হয়ে গেলো নাতো আরেক বার বাঁচার কাছ থেকে ফিরে আসতে !  









মায়াবী রাস



নেমেছে দুপুর, আজ জন্মাষ্টমীর পর চতুর্থ দিন

রাস্তা শুনশান, নির্মোহ  ক্ষয়িত ভাদ্র

একটু আগে এ পথে হেঁটে গেছেন মদনমোহন 

কোনো কোনো জানালায় ছেয়ে আছে বিষণ্ণমুখ, দিব্য দৃষ্টি হেনেছেন তিনি বেশ

অথচ নতুন সময়ের মেয়েরা বিষাদ দিয়ে বাঁশি চায় না,

 চায় অন্যকিছু এ পৃথিবীর থেকে, এই জন্ম থেকে, এ শয্যা এবং বাকি সবকিছু থেকে

 তাই কেবল অসুখ আর অসুখ 

চিৎকার করে করে আমরা সমস্ত অসুস্থতা নিজেদের করে নিচ্ছি ...

কিন্তু কিছু ঝরে সত্যি সত্যিই, যুক্তিহীন, তর্কহীন, 

সেসবে করতল ভরে গেলে আমি খুব শান্ত হয়ে যাই অনেক আগের মতো







পৃথিবীর হৃদয় 



আমাজনের আশি শতাংশ অরণ্য পুড়ে গেছে আর

দেড় লক্ষ পশুপাখি, 

গবাদি পশুর খামার হবে  সেখানে। 

বেশ !  বেশ ! 

এখন নাকি বৃষ্টি নেমেছে, জলীয়বাস্প আর গরম ধোঁয়া, 

স্মোকড্ মাটন খেতে খেতে নিজেকে ভাবছি আমাজনের আদিবাসী

মৃত্যু উপত্যকার কাছাকাছি চলে এসেছি,

এ আগুনের পাশে দাঁড়াও বন্ধু , কদিনই আর বাঁচবো বলো?

ত্বক পুড়ে গেছে তো !   লাগছে দেখি এক আমাদের ! 

কী হে তুমি ইন্ডিয়া আর আমি কিন্তু ব্রাজিল 

আমরা বিজ্ঞান শিখে ডিগ্রী নিয়ে বনের পাশে রান্নার দোকান খুলেছি

জঙ্গলের স্যুপ, পাখির কান্না আর বৃংহনে বৃংহনে ভালোবাসার জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করছি 













 

বাড়ি



বাড়ি এক অনারোগ্য রোগ

ফেলে আসা অনেকদিনের থাকা সেই ঘর, বারান্দা, ঘাট, জল ...ক্ষতচিহ্নের মতো মনে হয়

একটি একটি ইট জড়ো করে মানুষ, 

শরীর আর মনের গুটিবসন্তের যন্ত্রণা তাতে, শখ পুড়ে পুড়ে রঙ লাগানো 

সমস্ত  মলম মেখে , রোমান্টিকতা খেয়ে নিয়ে

 নির্বাক, নিথর হয়ে দাঁড়ায় অবশেষে একটি বাড়ি,

লবন ভেসে ভেসে ওঠে সস্তার সিমেন্ট প্রলেপের ওপর 

একজোড়া মানুষ মানুষী তখন সেই সমুদ্রদ্বীপে

বাটিতে জমা হয়েছে সমস্ত অমিল আর বিশ্রামমুখর কিছু সন্ধ্যা

আগে ঘরের দেয়ালে রঙ না  আলমারি ! 

কত তর্ক গেছে দিনভর, রাগারাগি

এখন পুরনো কড়িকাঠ, শ্মশানযাত্রীদের মতো। 

অন্য মানুষেরা সন্ধ্যা দেয়, হঠাৎ বৃষ্টিতে নিভে যায় তাদের শেষ মোমবাতি, 

তবু বেঁচে থাকা শেষ হয় না,

 কোচিং ফেরত একটি ছেলে ক্লান্তমুখে আসে হঠাৎ,  

হাতে জামের ডাল, ভিজে উঠেছে তার শস্যক্ষেতের মতো বুক, ঘন আঁখিপল্লব ...













ভাদ্রপদী 



কেন লিখে দিতে বলো গদ্যের হাত পা, চুরান্ত মৃদঙ্গ বোল

আমি ঘুরে ফিরে প্রিয় কিশোরকে নিয়ে দুই এক অক্ষরের কাছে বসি, ক্লান্ত কবিতা তোমাকেই ভালোবাসি

এখানেই রেখে দিতে পারি নীরব মাধুর্য, অস্পষ্ট গোপনে 

এক অসময়ের বিকেল আমার আত্মার কাছে,   

বিপুল বৈভব তার, তবু দীনহীন, শিখর চ্যুত ব্যসন যেন অজ্ঞাত ভাদ্র রাতে

মনে হয় তাকে রাখি নীরবে কাঠের বাড়িতে, জানা জতুগৃহে

বাইরে সবল বর্ষা বহুক, ডাহুক ডাকুক

কোনদিন বলব না তো, বুঝে নিতে হবে, না হলে মুছে মুছে যাক সকল অসময়ের বৃন্দ ছন্দ,

কাল থেকে ভেবেছি শুধু উন্মোচন, স্বপ্নের মধ্যে ছুঁয়ে গেছে আমাকে,

স্পর্শ করে এসেছি, জানতেও পারোনি, এমনি বোকা এক সময়খন্ড ভরে ফেলেছি  ঝিনুকে

পাঠাবো ! যে ঠিকানায় কখনো কোন কিছু যায়নি সেখানে। 






বিনীত


পৃথিবী শান্ত হয়ে যাক, বাজুক মুগ্ধ দোতারা

তুমিও চিনেছো আমাকে, আমিও তোমাকে

জেগে উঠেছে বিস্ময়, সবুজ সন্ধ্যা ও শহর

তুমিও কি বিশ্বাসপ্রবণ... ভালোবাসার মতো? 

যারা ঠকে গেছে বলে আফসোস করে

তাদের দিলাম বাগান, আগাছা আর জলের কুঠার

রক্ত থেকে উষ্ণতা চলে গেলে মানুষ নীচু হয়

কুড়োতে শেখে, দেখে পথে পড়ে রয়েছে তার ঔদ্ধত্য

যারা যারা চলে গেছে ধুলোপথে, রেখে গেছে ঝিনুক

তাতে পা কেটে গেলে, ভেতরে সূর্যাস্ত শুধু নীরব, কাতর
















কবিতা তোমার জন্য 



অযত্নের গাছেও ফুটেছে ফুল, আমিও জাগছি নির্নিমেষ

বিরহী ধানের ক্ষেত ছেড়ে চলে যাচ্ছে পলাতক জ্যোৎস্না

যা কিছু নিঃশব্দ মনে হয়, হয়তো সুরহীন পাখির মৌনতা

বন্ধুর ছেড়ে দেওয়া হাতের মতো দুঃখ নেই    

অশনিসংকেতে বুঝতে পারি অনাগত নিঃসঙ্গতা 

যারা গভীর আনন্দে ভ্রমণে বেরিয়েছে মরুপথে

শ্রমহীন ক্লান্তিতে তাদের দেখি আধবোজা চোখে

তুমিও কি ভাবো কবিতা মানেই তোমার কথা বলছি, 

যেখানে আমার মনখারাপ, সেখানেই তার ভাঙা শরীর 









লেখক পরিচিতি



.... চিরশ্রী দেবনাথের, জন্ম 1979 এর 12 ফেব্রুয়ারি উত্তরপূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার।  দুজনেই প্রয়াত।  তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করেন। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি।  বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন। পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প

প্রথম পুরস্কার, স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার, ত্রিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ  প্রতিযোগিতায় প্রথম  পুরস্কার।  

২০১৯ এ, সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মান পেয়েছেন। তার লেখা, ছোটগল্প, "ব্যারনফিল্ড " অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সর্ট ফিল্ম। তৈরি করেছেন কলকাতার  রত্নদীপ রায়। যা নাইজেরিয়ার  ইন শর্ট চলচিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।

এছাড়া  "কীর্ণকাল "নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন চারবছর ধরে। তিনি বিশ্বাস করেন কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না। 



এখন পর্যন্ত প্রকাশিত  বইগুলোর নাম, 



কাব্যগ্রন্থ .........

 "জলবিকেলে মেঘের ছায়া "( ২০১৬), 

"ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় "(২০১৬),

 "প্রেমে সন্ত্রাসে "(২০১৭), 

 "শুভ দ্বিপ্রহর " (২০১৮), 

"ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স "(২০১৮)  , 

 "উড়িয়ে দিও "(২০১৯),  

"বিশ্বাসের কাছে  নতজানু "( ২০১৯  ),

 কুুুুুড়িটি ছোটগল্প নিয়ে একটি গল্প সংকলন,  "মায়ারাণী "(২০১৯), 

একান্নটি অণুগল্প নিয়ে, অণুগল্প সংকলন ( ২০২০), 

"সোমবার সন্ধ্যায় " (কথোপকথন) 

 "যে জীবন কবিতাগামী "( কবিতাবিষয়ক যৌথ গ্রন্থ )।


নিকটবর্তী রূপকথা ( ছাব্বিশটি ছোট গল্প )

সূর্যছক, উপন্যাস 

মারমেডের শহর থেকে , উপন্যাস

ঝিলমারির কাণ্ডকারখানা ,  কিশোর উপন্যাস 

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , উপন্যাস

নিঃস্বরের করতলে,  ( দীর্ঘ কবিতা) 



মুঠোভাষ : 9402143011

ই মেইল : chirasree.debbath@gmail.com












ঝিলমারির কাণ্ড কারখানা

কিশোর উপন্যাস 





উৎসর্গ


অদ্রিতা, সুজাতা, শুভশ্রী, সুকন্যা এবং সুবর্ণরেখাকে 





চিরশ্রী দেবনাথ


ঝিলমারি 'র কাণ্ডকারখানা  





পাহাড়ের সারি তিনদিকে, একদিকে সুন্দর একটি নদী। নদীর নাম চিত্রা , শহরের নাম ঝিলমারি। রেলস্টেশনের নাম জানা কথাই ঝিলমারি  স্টেশন।  পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে রেলপথ চলে গেছে। পাহাড়ি জায়গা। ছোট ছোট বাড়ি। ইট, কাঠ মিশিয়ে। বাঁশের বাড়িও আছে। তবুও এটা শহর। কারণ এখানকার লোকদের বেশ দেখনাই আছে। শহরে কলেজ আছে, অফিস, কোর্ট, খেলার মাঠ, টাউন হল, কেকের দোকান, রেস্টুরেন্ট, পার্ক অনেককিছুই আছে। শহর ছাড়িয়ে একটু গেলেই গ্রাম, খামার বাড়ি, শাক সব্জির ক্ষেত, ধান গমের সবুজ প্রান্তর।  লোকজন ভালো। শহরের পরিচিত চোর গুণ্ডারাও ভালো। একটু আধটু দুষ্টুমি ছাড়া তাদের আর কোন খারাপ গুণ নেই। পুলিশরাও তাদের চেনে।

কোচিং ক্লাস থেকে ফিরছে রিমঝিম, কবির, নিশা, ব্রজ, যীশু, টিনটিন  । আজ অনেকেই আসে নি। হোলির পরের দিন। রঙ খেলার রেশ কাটেনি কোনদিন। 

রিমঝিম তারা বেশ বড়লোক। দুটো কুকুর আছে তাদের। এজন্যই রিমঝিমকে বড়লোক মনে হয় ব্রজ 'র। কারণ সে একদিন রিমঝিমের বাড়িতে গিয়েছিল। তখন দেখেছে বড় বড় দুটো চিনেমাটির বাটিতে দুধ খাচ্ছে দুটো কুকুর। কুকুরকে দুধ খেতে দেখতে পাওয়া ব্রজের কাছে খুব আশ্চর্যজনক কিছু। মায়ের দুধ তিন চার বছর পর্যন্ত খাওয়ার পর সে কোনদিন আজপর্যন্ত গ্লাসে করে দুধ খায়নি।

ব্রজর বাবা ইটভাট্টায় ছোটখাটো কাজ করে । তিনজন ভাইবোন তারা। কোচিং এর অংক স্যার নিতাইবাবু ওকে বিনে পয়সাতেই পড়ান। কারণ ব্রজ খুব ভালো অংক বোঝে। নিতাই বাবুর ধারণা ব্রজের মতো এতো ভালো অংক বোঝা ছেলে পৃথিবীতে ভুল করে মাঝে মাঝে আসে।

ব্রজ অবশ্য এসব কিছুই পাত্তা দেয় না। 

যেকোন অংকই তার কাছে খুব সহজ মনে হয়, তার মাথায় এসব যেন আগে থেকেই সেট করা। প্রতিভা বা জিনিয়াস জিনিসটা আসলে কি? সে তো জানে তার খুব খিদে পায়, তখন খুব ভালো ভালো খাবার কল্পনা করে খেতে হয় ফ্যান সহ ভাত, কখনো সব্জি বা ডাল সেদ্ধ।

কালে ভদ্রে ছোট্ট এক পিস মাছ। কখনো কখনো দেশি মুরগির মাংস আর এক টুকরো বড় আলু এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্বাদের খাবার তার জন্য। ব্রজ চায় তার খুব টাকা পয়সা হোক। সে চায় পৃথিবীটা জয় করতে। এরোপ্লেনে চড়ে সব দেশ ঘুরে বেড়াতে।

ঝিলমারির ছোট্ট শহরে কোনোমতে বেঁচে থাকার মধ্যে তার কোনো আনন্দ নেই।

রিমঝিম ওরা কী গল্প করে কে জানে। টি ভি সিরিয়েলের ভুয়ো গল্প। হঠাৎ ব্রজের মাথাটা চিলিক দিয়ে উঠল। এই রে এখনি তাকে অংকে পেলো। ব্রজের মনে হয় তার মাথায় কেউ যেন সিগনাল পাঠায়, আর তাকে তখন অংক করতে হয়। এটা মাস খানেক ধরে হচ্ছে। কাউকে বললে কি বিশ্বাস করবে? তখন তাকে খাতা কলম বের করে  বাধ্য হয়ে বসে পড়তে হয়। অসংখ্য যোগ আর বিয়োগ শুধু, একটি গ্রাফ আঁকা শুরু হয়ে যায় যেন নিজে থেকেই তার হাত দিয়ে । মাঝে মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাম সেই গ্রাফের পয়েন্ট গুলোর মধ্যে ভাসতে থাকে। নাহ্ কাল নিতাই স্যার কে বলতেই হবে সব। 


রিমঝিম ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। কী সুন্দর লাগছে এই ঝিলমারি শহরটাকে। তাদের বাড়িটি দোতালা, তারপর সিঁড়ি আছে, আর একটি ছাদ বারান্দা, অনেকটা তিনতলার মতো। চারদিকে রেলিং, বসার জায়গা। রিমঝিমের বাবা আকাশ দেখতে ভালোবাসেন, তাই তিনি শখ করে এইভাবে বানিয়েছেন। এখানে বসে খোলা আকাশ আর চারপাশের দৃশ্যগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে। এখন সন্ধ্যে সাতটা হবে। আর একটু পড়ে রিমঝিম পড়তে বসবে। কিছু দূরের ইটভাট্টা থেকে বড় বড় লোহার নল থেকে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আগুনে ঝলসে যাচ্ছে ইট। ব্রজ র বাবা সেখানে কাজ করে। ব্রজ অংকে খুব ভালো। ওকে সবাই জিনিয়াস ডাকে। রিমঝিম অংক পারে না। তার প্রিয় বিষয় ইংরেজি। সে ইংরেজি গল্পের বই পড়তে পড়তে নিজেকে ব্রিটিশ ভাবে কখনো কখনো। তার ইচ্ছে করে ইউরোপের বরফাচ্ছিদত প্রান্তরে একটি মজবুত গাড়ি করে ঘুরে বেড়াতে। তার চুলগুলো হবে সোনালি সিল্কের মতো নরম, গর্জিয়াস। একমনে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল রিমঝিম। হঠাৎই মনে হলো একটি খুব তীব্র নীল আলো যেন  ওদের ঝিলমারির ওপর সার্চ লাইটের মতো ঘুরে গেলো। খুব সামান্য সময়ের জন্য। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই শেষ।



কবিরের বাবা ডাক্তার। ক্লাস এইটে পড়া কবির মনোযোগ দিয়ে টিভির খবর শুনছিল। মাথায় গিজগিজ করছে প্রোফেসর শঙ্কু সমগ্রের গল্পগুলো। টিভি দেখা আর অজস্র গল্পের বই পড়ার ফাঁকে যে সামান্য সময় পাওয়া যায় তারই অবসরে সে একটু স্কুলের বই পড়ে। সেই যে ছোট্ট একটি বলের মতো জিনিস প্রোফেসর শঙ্কু কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, যা ছিল আসলে জীবাণুদের গ্রহ, উঃ কি মারাত্মক চিন্তা, ভাবা যায়! পৃথিবীর বুকে ভিন গ্রহের কেউ যদি সত্যিই এমন একটি গ্রহ ফেলে দেয় বা একবাক্স জীবাণু, কি হবে তাদের। খবরে দেখাচ্ছিল চীনে দিন দিন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। ডিসেম্বর থেকে এই অজানা ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে চীনের বাণিজ্য নগরীতে। তাদের ঝিলমারি থেকে চীন কতদূরে? ভয় লাগছে ভীষণ। তারাও কি মরে যাবে?

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে ঢুকলো কবির। সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন পশু বাজার দেখাচ্ছে। রাশি রাশি মৃত পশু ঝোলানো। চামড়া নেই কোনো কোনোটির। কী বীভৎস লাগছে । টি ভি বন্ধ করে কবির বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বাবা আসছে। ঝিলমারি সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার তিনি। আসার সময় হেঁটে হেঁটে আসেন। এটাই নাকি ওনার এক্সারসাইজ। এইসময় ঝিলমারির মুক্ত হাওয়া শ্বাসে টেনে নিতে তার খুব ভালো লাগে। কবিরদের বাড়ির সামনে ছোট্ট লন। মাঝখানে রাবিশ দিয়ে রাস্তা। তারপর তাদের একতলা সাদা রঙের বাড়ি। ওর বাবা হেসে বললেন, কি ইয়ং মাস্টার, কেমন কাটল আজকের দিন। বাবা বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কবির কথা বলতে শুরু করে। আজ মাথায় ভাইরাস গিজ গিজ করছে। কবিরের বাবা হাত মুখ ধুতে ধুতে, খেতে খেতে কবিরের সব কথা মন দিয়ে শোনেন। আজও শুনছেন। ভাইরাসের কথা জিজ্ঞেস করতেই, কবিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাদের খুব সাবধান হতে হবে। হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যে বদলে যাবে পৃথিবী। 



গভীর রাত। নেশার ঘোরে ব্রজ বেরিয়ে এসেছে তাদের কলোনি থেকে। চাঁদনি রাত। হাওয়া বইছে। ঝিলমারি শহর যেন চাঁদের মেয়ে। একটি উঁচু পাথর আছে বুড়ো গাছতলায়। সেখানে এসে বসেছে সে। হাতে খাতা কলম। নির্বিচারে হিসেব কষছে। একসময় সব লেখা মুছে গেলো, নিচে ভেসে উঠল, দ্য আর্থ উইল বি ফিনিশড । 

অংক শেষ হলো। ভূতে পাওয়া মানুষের মতো ব্রজ আবার ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। 


প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে টেকটোনিক প্লেট গুলো সরে সরে যাচ্ছে। যদিও এই সরে যাওয়া খুব ধীর গতিতে ঘটছে। সাধারণ মানুষদের বোধগম্যের বাইরে এইসব ভৌগলিক বিবর্তন। কিন্তু ভূবিজ্ঞানীরা খবর রাখেন। পৃথিবীর প্রতিটি কম্পন তাদের গবেষণার বিষয়। একটি বিশাল ভূমিকম্প পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে একটি দেশ, অথবা জন্ম দিতে পারে নতুন একটি দেশের।

সবসময় এইসব খবর দেখতে দেখতে আজকাল কবির টের পাচ্ছে সে কেমন বদলে যাচ্ছে। কাল রাতে স্বপ্ন দেখলো, একটি রাসায়নিক বিস্ফোরণ ঘটেছে পুরো পৃথিবীতে, সব মানুষ গাছ হয়ে যাচ্ছে। তার মাথা থেকেও বেরুচ্ছে কচি কচি পাতা। ধরমরিয়ে উঠে দেখল, অথচ সে তার ঘরেই নিশ্চিন্ত মনে শুয়েছিল। কী কাণ্ড!


নিশা, ব্রজের বন্ধু, কারণ নিশার বাড়ি ব্রজদের বাড়ির খুব কাছে। নিশার মা নেই। বাবা একটি রেস্টুরেন্ট চালায়। এগরোল, লুচি,  ঘুঘনি,  চপ এবং চা কফি। দোকানে দুজন কর্মচারি আছে, নিশাও বাবাকে সাহায্য করে, ক্যাশে বসে। ব্রজদের কলোনির লোকেরা এখানে এসে চা খায়, আড্ডা দেয়। ব্রজ মাঝে মধ্যে আসে। নিশা তাকে খাবার খাওয়াতে চায়। ব্রজ খুব ইতস্তত করে খায়। তার কাছে টাকা থাকে না। আর নিশার বাবা হিসেবি খুব। তবু বলে খাও ব্রজ খাও। আজকাল ব্রজের চেহারা উদভ্রান্তের মতো। সে পাগল হয়ে যাচ্ছে যেন। অংক তাকে খেয়ে ফেলছে। গুঁড়ো গুঁড়ো পোকার মতো তার সারা শরীরে কিলবিল করছে ডিজিট আর ডিজিট।


নিশা বলল, কি রে তোর কি হয়েছে। পুরি খা। নাহ্। 

জানিস পৃথিবীর খুব বিপদ। নিশা অবাক হয়ে বলে, কি বিপদ। ব্রজ বলে, পৃথিবী থেকে মানুষ হারিয়ে যাবে আর কিছুদিনের মধ্যে। কোথাও অংক কষা হচ্ছে। অন্য গ্রহে, অন্য কোনোখানে। নিশা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ব্রজের দিকে। ব্রজ বিড়বিড় করতে করতে চলে যায়।


দুজন হারিয়ে গেলো ঝিলমারি থেকে। ব্রজ এবং কবির। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও তাদের। আজ একমাস হলো। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এক অজানা ভাইরাস, সংক্রমিত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। বড় বড় সিটি গুলোতে সব লক ডাউন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে প্লেগ রোগ ছড়িয়েছিল সারা পৃথিবীতে, এর মতোই এই রোগটিও। ইতি মধ্যেই কয়েক লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে মৃত্যু সংখ্যা।

ব্রজ ওরা তিন ভাইবোন। এক ছেলে হারিয়েছে। গরিবের সংসার। খিদের বোঝা টানতে গিয়ে ছেলের কথাও ভুলে যাচ্ছেন ব্রজের বাবা। মা শুধু রাত বাড়লে শ্রান্ত মুখে ব্রজের ফেলে রাখা খাতা পত্তর গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিছুই বোঝেন না তিনি। খাতার পর খাতা জুড়ে শুধু শত শত সংখ্যা।

কবিরের মা স্তব্ধ হয়ে গেছেন। কবিরের বাবা ঝিলমারিকে নিয়ে ব্যস্ত। নতুন হাসপাতাল হয়েছে, কোভিড- ১৯ রোগীদের রাখার জন্য। দিন রাত কাজ আর কাজ। কয়েকঘন্টা আগে একটি খবর শুনেছেন, নিতাই মাস্টার, যার কাছে কবির ওরা পড়ত, তাকেও কাল রাত থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ডাক্তারি পেশার এই হলো চ্যালেঞ্জ। তিনি সৌভাগ্যবান একটি পেনডেমিকের সঙ্গে যুদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছেন, শুধু বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে ছেলেটার জন্য। পুলিশ তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে, খুঁজে যাচ্ছে, লোকাল টিভি চ্যানেল থেকে শুরু করে ন্যাশনাল টিভি চ্যানেল, পত্রপত্রিকা কোনো কিছুই বাদ রাখেননি তিনি। 

শুধু মন বলছে  কবির,  ব্রজ, নিতাই মাস্টার কারো তেমন কিছু বিপদ হয়নি, নিঁখোজ হয়েছে শুধু । এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা যোগ রয়েছে, নিবিড় যোগ ।

হঠাৎ তার মোবাইল বেজে উঠল, ফোনটা ধরতেই একটি মিষ্টি গলা, এই গলাটাকে চেনেন তিনি। কবিরদের সঙ্গে পড়ে মেয়েটি। নাম তার রিমঝিম। স্কুল বন্ধ। অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে সব। আরো কয়েকবার মেয়েটি ফোন করে তার কাছে কবিরের কথা জানতে চেয়েছে। আজ কোন ভূমিকা না করে মেয়েটি বলল, কাকু একদিন হঠাৎ রাতের আকাশ থেকে জোরালো একটি নীল আলো কে আমি সার্চ লাইটের মতো ঝিলমারির ওপর ঘুরে বেড়াতে দেখেছিলাম। খুব অল্প সময়ের জন্য। কেন যেন মনে হচ্ছে এটা কোনো একটা রহস্য। এই নীল আলোটির সঙ্গে কবিরদের হারিয়ে যাওয়ার একটি মিল রয়েছে। রিমঝিম বলছে, আমি ওদের খুঁজে বের করবো, দেখবেন কাকু। কবিরের বাবা আঁতকে উঠলেন। না না। তুমিও হারিয়ে যাবে তাহলে। এসব যা করার পুলিশের গোয়েন্দারাই করবে। তুমি কিছু করতে যেও না। রিমঝিম বলল, এভাবে হবে না কাকু। ওরা কোনো সহজ জায়গায় হারিয়ে যায়নি। ওদেরকে দিয়ে কোনো কাজ করানো হচ্ছে। ব্রজ কয়েকমাস ধরে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। ওর এই পাগলামো খুব আশ্চর্যজনক কিছু। এপর্যন্ত বলে রিমঝিম ফোন রেখে দিল। রিমঝিমের বাবার ফোন নং ছিল কবিরের বাবা ডঃ অতনু ঘোষের কাছে। তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে রিমঝিমের বাবাকে বললেন, মেয়ের ওপর নজর রাখতে।

একজন বাবা হয়ে আর একজন বাবাকে সাবধান করলেন। আপাতত ওনার ডিউটি শেষ। কিন্তু তিনি হাসপাতালের বিশেষ কোয়ার্টারে থাকবেন। বাড়ি যাওয়া নিষেধ তার, কোভিড হাসপাতালে আছেন তিনি। নিজের রুমে ঢুকে স্নান টান করে  মোবাইলটা খুললেন। একটি হোয়াটস্ এপ মেসেজ। রিমঝিম করেছে, ওনাকে এড করেছে একটি গ্রুপে। কবিরদের স্কুলের আরো কয়েকজন আছে সেখানে। কেউ বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে না। বাড়িতে বসে তারা কীভাবে খোঁজ করবে, সেটাই তিনি বুঝতে পারছিলেন না! পড়ে বাকিদেরও বিপদ হতে পারে। কী যে হচ্ছে সব! 



অপূর্ব সুন্দর একটি জায়গা। পৃথিবীর মধ্যে, কিন্তু পৃথিবীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। দূর দূর পর্যন্ত তারা ঘুরে দেখেছে কোথাও  মানুষ নেই। শুধু কিছু বন্যপ্রানী আছে, তাও পৃথিবীর মতো দেখতে নয়, কিছু অমিল রয়েছে। তারা সবাই একটি  বিশাল হলের মতো গুহায় থাকে। সবকিছু প্রাকৃতিক হলেও, অত্যাধুনিক কিছু যন্ত্রপাতি রয়েছে। যেগুলো এখানকার জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। 

ব্রজ অংকের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে।


তাকে মাধ্যম করে নাকি অন্য গ্রহের জীবরা কিছু একটা করতে চাইছিল, ব্রজকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছে অন্য একদল বিজ্ঞানী, তাকে সহজভাবে তাই বোঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে সে খুব মূল্যবান কেউ। তার মধ্যে রয়েছে অসীম সম্ভাবনাময় মেধা। 


তবে মুক্তি কথাটিও ঠিক নয়। এখনও ব্রজ অংক করছে। 

এসব হলো ভালো অংক, এটা ব্রজ করতে বসেই বুঝতে পেরেছে, কারণ এগুলো থেকে ব্রেনে কোন কষ্ট হয় না।

আনন্দ হয়। 

তাকে অজস্র প্রবলেম দেওয়া হয়েছে। বিশাল একটা স্ক্রিন। সেখানে সে এই প্রবলেম গুলো সলভ্ করছে। তার নিজের মতো করে। মাঝে মাঝেই  চিৎকার করে উঠছে। নেচে নিচ্ছে। ব্রজ, কবির,  ওদের নতুন গোঁফ গজানো শুরু হয়েছে। লম্বা হয়ে গেছে অনেকটাই। একজন অতিবৃদ্ধ কিন্তু শক্তপোক্ত লোক মাঝে মধ্যে তাদের কাছে আসেন। এসে একটি মাইক্রোফোনের মাধ্যমে কথা বলেন। খুব সুন্দর ইংরেজিতে সেগুলো ধ্বনিত হতে থাকে। তিনি নানান রকম আশার কথা বলেন সবসময়। তারমধ্যে মোদ্দা কথা হলো, পৃথিবীর খুব বিপদ। সেখানে ঝিলমারি নামের শহরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় আছে। এখান থেকে পৃথিবীকে বাঁচানো সম্ভব। বর্তমানে পৃথিবীতে পেনডেমিক চলছে। এই পেনডেমিকে অনেক অনেক মানুষ মারা যাবে। কিন্তু একসময় পৃথিবীর অসুখ হয়তো সারবে। কিন্তু পৃথিবীর ওপর আঘাত হানা হবে। বাইরের পৃথিবী থেকে। সেই আঘাত সারাবার ব্যবস্থা করতেই এই আয়োজন। এইজন্য কয়েকজন বিশ্বস্ত আর খুব মেধাবী এবং কল্পনাপ্রবণ  মানুষ শুধু দরকার। যারা এসব নিয়ে গবেষণা করবে। কিন্তু এর ফল পেতে অনেক অনেক দেরি হবে। ইত্যাদি । ব্রজর এসব নিয়ে কোন দরকার নেই। সে প্রাণের খুশিতে আছে। যে খাবারের কথা সে মনে মনে ভাবে, কোনো এক আশ্চর্য উপায়ে লাঞ্চে সেই খাবার উপস্থিত হয়, কিন্তু বাকি খাবার ওদের ইচ্ছেমত খেতে হয়। এমন কী সঙ্গে আছে নানান এক্সারসাইজ আর ধ্যান।


কিছুদিন হলো নিতাইবাবু, তাদের পাড়ার অংক স্যার এখানে এসেছেন। নিতাই স্যার তিন চার দিন গুম হয়ে বসেছিলেন। খাবারও খেতেন না। তারপর একসকালে উঠে গুহার বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলেন। হঠাৎ আনন্দে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রায় ছুটে এসে ব্রজ ও কবিরকে জড়িয়ে ধরে বললেন, কী সুন্দর জায়গা রে! কাছেই একটা নদী দেখে দারুণ খুশি। আলোর মতো জল,  স্বচ্ছ। নিচে পাথর কুচি, ছোট ছোট মাছ। 

কিন্তু আমার বউ ছেলেমেয়েদের কি হবে। আমি তো প্রাইভেট টিউশনি করি শুধু। কি করে খাবে তারা।

সে কথাও টের পেয়ে গেলেন কেমন করে যেন বৃদ্ধ মানুষটি। গুহার এক কোণায় একটি ছোট্ট স্ক্রিন আছে, সেই ব়ৃদ্ধ নির্দিষ্ট পাস ওয়ার্ড দিয়ে সেটা খুলে ওদেরকে পৃথিবী দেখান।   নিতাইবাবুর বউ আর ছেলেকেও দেখালেন। তাকে নিশ্চিন্ত করলেন, তাদের কখনো খাওয়ার অভাব হবে না। কবির আর ব্রজ আজকাল বায়না করছে, ওদের বাড়িতে অন্তত  যেন ভালো থাকার খবরটুকু পাঠানো হয়। It has done, বলে সেই মানুষটি গম্ভীর হয়ে চলে গেলেন।

আজকে তারা সবাই খুব উত্তেজিত। কারণ সকাল বেলা একটি মেসেজ এসেছে, টাইমমেশিনে ভ্রমণ করানো হবে তাদের। 

এই হল ঘরটির মেঝে পাথরের। দেয়াল পাথরের, সবুজ গুল্ম লতা নেমে এসেছে দেয়াল বেয়ে। পাশে স্নান ঘর। বিশাল। ঝর্ণায় স্নান করতে হবে। কৃত্রিম ঝর্ণা না প্রাকৃতিক ঝর্ণা কিছুই জানে না ওরা। ইনফ্যাক্ট জায়গাটি কোথায় তাও ঠিক করে জানে না তারা। সবাই মিলে শুধু মজা লুটছে এই আপাত আরাম আয়েসের। কুসুম কুসুম গরম জল ঝর্ণার। তাতেই স্নান হলো সবার। মাঝখানে জলাধারও রয়েছে। ইচ্ছে হলে সেখানেও করা যায় স্নান।

খাবার এলো। ধবধবে সাদা ভাত। শাক সব্জী সেদ্ধ, ডিমের ওমলেট, মাংসের স্যুপ,  ফলমূল আর দুধ। 

ঘরের মধ্যে মাইক্রোফোনিক আওয়াজ এলো, বাইরে চলে আসুন।

উত্তেজনায় ব্রজ দৌড়ে গেলো সবার আগে। একটি স্বচ্ছ সবুজ রঙের এরোপ্লেনের মতো দেখতে মোটরগাড়ি। বেশ উঁচু, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হলো। উঠে বসার সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে গেলো দরজা। বসার সঙ্গে সঙ্গে সিটবেল্ট জড়িয়ে ধরল তাদের। একটা প্রবল ঝাঁকুনি লাগল, কিছুক্ষণের জন্য সব অন্ধকার হয়ে গেলো। তারপর তাকিয়ে দেখলো চারদিকে ধূ ধূ বালি। অনেক দূরে ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। আকাশ নির্মল। জলো বাতাস বইছে। একটু তাকাতেই বোঝা গেলো, একটি নদী বইছে, অজস্র ছোট বড়  নৌকো নদীতে। পতপত করে উড়ছে নানা রঙ এর পতাকা, তারা তিনজন হাঁটতে লাগল। নদীটির তীর ঘেঁসে। মনে হচ্ছে এটা একটা নদী বন্দর, এখানে ব্যবসা বাণিজ্য হয়। আরো একটু এগোলে দেখা গেল, বড় বড় গাছের গুঁড়ি। কাঠ কাটা হচ্ছে, তৈরী হচ্ছে নানান জিনিস, অস্ত্র সস্ত্র, বানানো হচ্ছে বাসন কোসন। একটি বড় বাজার। পন্য কেনা বেচা চলছে। ব্রজ, কবির আর নিতাইবাবু ভাবলেন আর যাওয়া ঠিক হবে না। তারা কিছু চেনেন না জানেন না। অমনি কানের কাছে ফিসফিস, যেমন খুশি ঘোরো। তোমাদের কেউ দেখছে না। ষোলশ শতাব্দীতে গিয়েছো তোমরা। আজ ছুটি তোমাদের। কবির মুগ্ধ বিস্ময়ে বাজারে ঘুরছে। এটা কোন জায়গা কে জানে। একজায়গায় কিছু মানুষকে জড়ো করে রাখা হয়েছে। বিক্রি করা হচ্ছে তাদেরও।  কবির একটু দাঁড়িয়ে মানুষ বিক্রি করা দেখলো।

দুজন লোক এলো, দুটো মানুষ কিনে নিয়ে গেলো। তারা ঘোড়ার পিঠে করে এসেছিল। পেছনে বসিয়ে লোক দুটোকে নিয়ে গেলো। সেই সময় দুটো মহিলা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। মনে হলো তাদের আপনজন কেউ। লোক দুটো হাত নেড়ে নেড়ে চলে যাচ্ছে। কবিরের ভালো লাগছে না কিছু। এখানকার লোকজন খুব বাজে। সব জায়গায় শুধু কাটা গাছ ছড়ানো। যেন গাছেদের ডেডবডি। 

 কাছেই বোধ  হয় গভীর বন আছে। সেখান থেকে শত শত গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে নির্বিচারে। এর ফল ভুগবে তারা। জায়গাটা নদীর কিনারায়। খুব জল নদীটিতে, কিন্ত নদীটির নাব্যতা কমে গেছে, অদূর ভবিষ্যতেই নদীটি শুকিয়ে যাবে। তখন এই বিশাল জনপদ ভীষণ বিপদের মুখে পড়বে। ব্রজ একমনে একটি খাবারের দোকান দেখছে। সেখানে নানানরকম মিঠাই বিক্রি হচ্ছে। বড় বড় চুলা। লোহার কড়াই। তামাটে রঙের একজন বলশালী মানুষ বড় বড় হাতা দিয়ে মিঠাই তৈরি করছে। ব্রজ খেতে চাইলো। সঙ্গে সঙ্গে কানের কাছে ফিসফিস এলো কেউ কিছু খেতে পারবে না।  

খিদে পেলে সহ্য করো।

ব্রজ নিরাশ হলো। বেচারা নিতাই বাবু হাঁ হয়ে দোকান মালিকের হিসেব নিকেশ শুনছিলেন। কী সব সংখ্যা। হঠাৎ খুব ঝড় উঠলো। নদীর ওপর থেকে ঘূর্ণির মতো বাতাস ধেয়ে আসতে লাগলো জনপদটির দিকে। তারা কী করবে বোঝার আগেই, চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলো। প্রবল ঝাঁকুনি লাগলো। চোখ খুলে দেখল, তাদের হল ঘরের সামনের সেই প্রান্তরে ওরা দাঁড়িয়ে আছে।

ব্রজ ঝটপট ঘরে ঢুকে স্ক্রিনের সামনে গিয়ে অংক কষা আরম্ভ করলো। ওর খিদের কথা আর মনে নেই। কবির বসলো প্রোগ্রাম বানাতে। নিতাইবাবু গম্ভীর মুখে বসে রইলেন। গভীর চিন্তায় মগ্ন। 



ডঃ অতনু আর এতো চিন্তিত নন, ছেলে মেয়েদের নিয়ে। তিনি বুঝতে পেরেছেন ওরা ভালো আছে। কোনো একটা বিশেষ কাজে তাদের নেওয়া হয়েছে।

তিনি চান কোভিড এর ভ্যাকসিন খুব তাড়াতাড়ি আবিস্কার হোক। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালাচ্ছেন। পৃথিবী সব কিছু নিয়ে একটি গভীর লড়াইয়ের মধ্যে দিকে যাচ্ছে। একদিকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত আমাজনের অরণ্যে মানুষের সৃষ্ট দাবানল। এ কোথায় যাচ্ছে পৃথিবী। ভূ গর্ভের প্লেট সরে যাচ্ছে ধীর গতিতে। বড় বিপদ আশংকা করছেন ভূবিজ্ঞানীরা।

নাহ্ এই পৃথিবীর কি তবে দিন শেষ। কয়েক শো বছর পর পর ধ্বংস আসে। পৃথিবীর বুকে কি তাই আসতে চলেছে?


আজ ঝিলমারিতে পাঁচজন মারা গেছেন। মধ্যবয়সী লোক। মুম্বাই এবং দিল্লী থেকে এসেছিলেন তারা । বাঁচানো যায়নি। অনেক চেষ্টা করেছেন তিনি।

চাই ভ্যাকসিন, ভ্যাকসিন এবং ভ্যাকসিন।


তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তার স্ত্রী বাড়িতে একজন কাজের লোকের সঙ্গে আছেন, কবির কোথায়, তারা জানেন না। শুধু একটি মেসেজ তিনি পেয়েছেন, সে ভালো আছে, কিন্তু কীভাবে পেয়েছেন এই মেসেজ, কাউকে জানাতে পারবেন না। চীন, আমেরিকা, ইতালি মৃত্যু মিছিল দেখছে, ভারতের দিল্লী, মহারাষ্ট্র, গুজরাট সংক্রমণে সর্ব্বোচ্চ। কী হবে কে জানে।


ব্রজ নিবিষ্ট মনে একটি দীর্ঘ অংক করেছে। তবে সেটা কোনো ডিজিটের অংক নয়। তাকে একটা আশংকা দেওয়া হয়েছিল। ভীমাণু ১ এবং ভীমাণু ২, দুটো বিশাল গ্রহাণু পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়বে দু এক বছরের মধ্যেই। এরকমই নাম দেওয়া হয়েছে তাদের। তারপর পৃথিবীর যে পরিবর্তিত রূপ হবে, সেই পৃথিবীকে কীভাবে সাজাতে হবে তারই প্ল্যান। এখানে পুরো প্ল্যানটাই অনিশ্চিত। তবুও ব্রজ অংকটা তৈরি করছে। একটি চুরান্ত বৈজ্ঞানিক জনপদ তৈরি হবে। তার আগের ক্যালকুলেশেন ওর কম্ম নয়। সেটা কারা করছে জানে না। তবে কবির সুন্দর ছবি আঁকছে। স্বপ্নের মতো। সেগুলো সংরক্ষিত হচ্ছে। নিতাই স্যারকে কেন আনা হয়েছে, এখন পর্যন্ত বোঝা যায়নি। ওনাকে কোন কাজ দেওয়া হয়নি। তিনি শুধু এধার ওধার ঘুরে ডাইরি লিখছেন।

শেষ খবর অনুযায়ী পৃথিবীতে পেনডেমিকে মারা গেছে সাতলক্ষ মানুষ। দু সপ্তাহ পর তাদের আবার টাইমমেশিনে করে বেড়ানো আছে।

অতীতে যে তাদের ঘোরানো হয়েছিল সে বোধহয় আমাদের অপরিনামদর্শিতা দেখানোর জন্য। সামনে কী দেখানো হবে কে জানে। 

এই কদিনের মধ্যে একটিই বাজে কাজ করা হয়েছে তাদেরকে নিয়ে। বেদনাদায়ক কাজ। একজন রোবট ডাক্তার এবং নার্স এসে, বলা কওয়া নেই হঠাৎ এসে তাদের পিঠে একটা সিল দিল। যে সে সিল নয়। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল তিনজনই। একটি নাম্বার বসানো হয়েছে তাদের পিঠে। এক্স রে প্লেট দিয়ে ছবিও ওঠানো হলো সেই ক্ষত পিঠের। আশ্চর্য তো! 


পৃথিবীর অসুখ সহজে সারল না। কোভিড ১৯ এর আঘাতে, অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা ভেঙে যাওয়া পৃথিবীর বুকে হানা দিল পর পর আরোও দু টো পেনডেমিক। একটি প্রবল ভূমিকম্প। হাজার হাজার মাইল ব্যাপী উন্মত্ত সুনামী। পনের বছর কেটে গেছে।

এই গুহা গর্ভটি পৃথিবীর মধ্যেই আর একটি মিনি পৃথিবী। একশ মাইল ব্যাপী এর বিস্তৃতি। পৃথিবীর চারজন শ্রেষ্ঠ ভূতত্ত্ববিদ এই গুহাটি খুঁজে পাওয়ার পর, গোপনে একে নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। এর ভেতর ড্রোন দিয়ে ঢুকেছিলেন গুটিকয় বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, তাদের সঙ্গে ছিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তি জানা কিছু রোবট । প্রথম থেকেই তারা চাইছিলেন ধনী এবং ক্ষমতাবান রাজনৈতিকদের হাত থেকে যেন একে নিরাপদে রাখা যায়। 

এইসমস্ত রোবটদের দ্বারাই তৈরি হয়েছে এখানকার সমস্ত আনুষঙ্গিক। যেমন ল্যাবরোটারি, কিচেন। কোয়াটার্স, লাইব্রেরি, বাথরুম, কনফারেন্স রুম ইত্যাদি। কিন্তু কোনোকিছুই প্রথাগত নিয়মে নয়। পৃথিবীর এই সর্ববৃহৎ গুহাটির রয়েছে নিজস্ব জলবায়ু। তার ভেতর আছে পাথরের গভীর স্তর। জলধারা, এমন কী আস্ত একটি নদী।

সেসব দিয়েই বানানো হয়েছে বাকি সব ব্যবস্থাপনা। এখানে বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে এমন কিছু রোবট, যারা দেখতে গাছের মতো, পাথরের মতো। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যাবে না। অথচ তারা সবকিছু নজর রাখছে। প্রকৃতি সৃষ্ট অসামান্য এই গোপন স্থানের নিরাপত্তা সুনির্দিষ্ট করা খুব জরুরী।

ব্রজ, কবির, নিতাইবাবু পালটে গেছে । তাদের স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। শারীরিক কিছু বৃদ্ধি যেন তাদের আটকে ছিল, সব সম্পূর্ণ হয়েছে এখন। 

ব্রজ গম্ভীর মুখে আজকে মেসেজ পাঠিয়েছে সে তার বাড়ি যেতে চায়। কাকে পাঠিয়েছে ভালো করে জানে না। যেখানে তাদের অসুবিধে গুলো জানাতে হয় সেখানেই বলেছে।

এখনো উত্তর আসেনি।

ঝিলমারি শহরটাকে খুব মিস করছে তারা সবাই। তাদের স্কুল, বাড়ি, মা বাবা, বন্ধুরা।


না ব্রজ সেই অনুমতি পায় নি। কেটে গেছে দীর্ঘ দশবছর। ঘটে গেছে বহু ঘটনা। দুটো গ্রহাণুই পর পর পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছিল। তাতে কয়েকটি দেশের বিশাল অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যার মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন এবং আমেরিকারর হাজার হাজার বর্গমাইল এলাকা।

ঝিলমারি শহরটা বেঁচে আছে। পেনডেমিক উধাও হয়েছে পৃথিবী থেকে। ব্রজ আর বাড়ি যেতে চায় না। মহাকাশে প্রায় সাতাশশো কৃত্রিম স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে চালু হয়েছে ইন্টারনেট ব্যবস্থা। বন জঙ্গল, পাহাড় পর্বত, নদী সমুদ্র সব জায়গাই ওয়ান ওয়েবের মাধ্যমে জুড়ে গেছে। তারা বুঝে গেছে, একটি বৃহত্তর সম্ভাবনার আশায় তারা কাজ করছে। তাদের সবার নকল তৈরি হয়েছে। সেইসব নকল শরীরে তাদের অনুভব গ্রন্থিত। তারাই আপাতত ঝিলমারিতে যার যার ভূমিকা পালন করছে। সেই মেসেজ গুলোও পাচ্ছে তারা।

গুহার  বৃদ্ধ বিজ্ঞানীর বয়স একশ অষ্টআশি। তিনি নিজেই হাসতে হাসতে বলেছেন। স্টেম সেল চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্যে কঠিন রোগ গুলোকে হারিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ সব সুবিধা না পেলেও, মানব সভ্যতার হিতার্থে তারা প্রত্যেকে গিনিপিগের ভূমিকা পালন করছেন। নিজেদের ওপরেই সব প্রয়োগ হচ্ছে।


কবির আবিষ্কার করেছে, বয়সকে ঘুরিয়ে দেওয়ার আশ্চর্য এক কোষ পদ্ধতি। অর্থাৎ যে ভাবে আমাদের দিন দিন বুড়ো হয়ে যাওয়া ঘটে, সেটারই উল্টো ভাব। এতো সহজে নয়। এখনও পরীক্ষাধীন। 


নিতাইবাবুকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিল, তা বলা হয়নি। তাকে দেওয়া হয়েছিল, কিছু জিনিয়াস তৈরির কাজ। কুড়ি জন কিশোরকে পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে আফ্রিকান, চাইনিজ, তুর্কি, রুশ, বাঙালি সবাই আছে। এই ভেঙে যাওয়া পৃথিবীকে মেরামত করতে হবে তাদের দিয়ে। সবকিছু হওয়ার আগে, বেসিক তৈরি করতে হয়। যেমন ব্রজর ভেতরটাকে তিনি তৈরি করেছিলেন। আবার এমন মানুষ হতে হবে যিনি শয়তান নন, নির্লোভ। নাহলে সে সমস্ত মেধাসত্ত্ব চুরি করে হয়ে উঠবে ক্ষমতাধর। ঠেলে দেবে আবার মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে। 


কবির হাঁপিয়ে উঠছে। একটি আনন্দের জীবন থেকে কিসের বেড়াজালে আটকে গেলো সে। 

পরিপূর্ণ একজন যুবকের এই জীবন ভালো লাগার কথা নয়। কীসের জন্য এতো আত্মদান।

সারা জীবন তাকে এই ভাবে বয়ে বেড়াতে হবে। মানুষের সততা কিছুদিন পর আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যায়। তারো হচ্ছে। নিজস্ব কিছু গবেষণা করেছে সে। এভাবেই তার হাতে উঠে এসেছে আশ্চর্য জনক এক তথ্য।

পৃথিবীর ভেতরে কিছু নির্ভুল জায়গা রয়েছে। যেগুলো কখনো ধ্বংস হবে না। সেগুলোর অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, গাণিতিক অবস্থান এমনই মজবুত এবং নিরাপদ যে, সারা পৃথিবী নষ্ট হলেও কয়েকটি ভূখন্ডের মতো তারা জেগে থাকবে। আর এই ভূখন্ডটির নিচেই রয়েছে প্রকৃতির এই  বিশাল গুহা। তেমনই একটি ভূখন্ড হলো ঝিলমারি। পৃথিবীর সেই অত্যাশ্চর্য নির্ভুল জায়গাগুলোর মধ্যে একটি। সেজন্যই এই সাদামাটা জায়গাটিকে কেন্দ্র করে এতো কিছু।

এখানকার লাইব্রেরিতে রয়েছে নানান ডিস্ক। দীর্ঘদিনের গভীর বিশ্বস্ততায় এখন তাদের হাতেই সবকিছু। সেগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতেই আচমকা কিছু হিসেব নজরে আসে তার। একটি ম্যাপ। অবশেষে নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি।

সে অনায়াসে এখন দখল করে নিতে পারে ঝিলমারিকে।

নিতাইস্যারকে হ্যান্ডেল করা কোনো ব্যাপারই না। উনি থাকুন না কেন নিজের মতো। মুশকিল যেই জিনিয়াস গুলো ওনার হাতে অংক শিখছে, তাদের জন্য। তাদেরকে সে কি নিজের আয়ত্তে আনতে পারবে? 

আর একটি বড় ব্যাপার হলো 'ব্রজ'। ব্রজর নিরাসক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে সে কিছু বুঝতে পারে না।

ভাবতে না ভাবতেই ব্রজর ফোন। না হাতে করে মোবাইল ব্যবহার করার সময় তারা পেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। ত্বকের সঙ্গে মিশে আছে এখন মহাজাগতিক মাইক্রো ওয়েভ। আছে নির্দিষ্ট কোড। সেটার মাধ্যমেই বার্তা আসে মনে। তখন ইচ্ছে করলে জোরে বলো না হয় মনে মনে। তবে সাবকনশাস মনটাকে খুব নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় তাদের। সম্ভাবনা কম হলেও মাঝে মাঝে কলিশন হয়। তখন নিজের মনের কথা জেনে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। তাই পৃথিবীর অনেকেই এখনো এই পদ্ধতি ব্যবহার না করে, মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন এখনো। আর এই পদ্ধতি খুব ব্যয়সাধ্যও বটে, পৃথিবীর মানুষের জন্য।

যদিও পৃথিবীর  লোকজন এখন সেই অর্থে গরিব নেই।

চালু হচ্ছে সম্পদের সম বন্টন ব্যবস্থা। বিরাট ধ্বংসের পর মানুষের শিক্ষা হয়। এই স্বর্ণ যুগ শুরু হয়েছে। ঝিলমাারিতে কবিরের ক্লোন একটি ব্যবসা খুলেছে। আইসক্রিমের দোকান। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় সেই আইসক্রিম। কিন্তু দাম বেশি নিতে পারবে না। বাঁধা আছে রেট।

আজকাল কবিরের চোখের তলায় কালো তিল। যেন তাতে হিংসে জমে উঠেছে।  

ব্রজ বলছে, একটু আয় আমার ঘরে। কবির বলল আসছি।

ব্রজ খুব সুদেহী হয়েছে। পাঁচফুট দশ ইঞ্চির লম্বা স্বাস্থ্যবান যুবক। উন্নত চিবুক। দীর্ঘ পেশিবহুল হাত। কবির গুণগুণ করতে করতে ব্রজ 'র ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। 

ব্রজ সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলল। ব্রজর ঘরের ডিজাইন রুবিক কিউবের মতো। ও নিজেই বানিয়েছে এসব ডিজাইন। এগুলো এমনি খোপ নয়। কী আছে কে জানে। ব্রজ'র ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখন সবাই তারা বড়ো। তাদের পড়াশুনো, তাদের বড়ো হওয়া সব অন্যরকম ভাবে হয়েছে। এক একজন এক একটি ইউনিট। তারা ব্যবহৃত হচ্ছে কোন বৃহত্তর স্বার্থে, মাঝে মাঝে আজকাল মনে হচ্ছে দুরন্ত মেধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা খুব পাপ। 

ব্রজর মুখ এখন উল্টোদিকে। খোলা জানালা। বাইরে গমের ক্ষেত। এই গুহার আবহাওয়া মেনে এক একটি শস্যসম্ভার গড়ে তোলা হয়েছে। কবির নরম সোফায় হেলান দিয়ে বসল। ব্রজ তার দিকে তাকাল। সম্প্রতি সবুজ একটি কন্টাক্ট লেন্স সে ব্যবহার করছে। কী জানি কোনো যন্ত্র কিনা। ঘুরতে যাবি?

কোথায়? কবির বলল।

কেন বাইরের পৃথিবীতে। ব্রজ বলল।

তুই ভালো করে জানিস আমাদের ক্লোন গুলো সেখানে। কী করব গিয়ে। কিছু এডজাস্ট হবে না আমার। কেমন ভূমিহীন হয়ে গেছি মনে হয়। 

নিতাই স্যার যেতে চাইছে। তোর মনে দুঃখ আছে তাই বললাম।

আর তুই? ব্রজকে জিজ্ঞেস করল কবির।

নাহ্। আমি এখানেই থাকব। মাঝে মাঝে ঘুরে আসব। আমাকে অনেক কিছু বানাতে হবে।

সে তো আমাকেও হবে, কবির আশ্চর্য হয়ে বলল। 

হ্যাঁ হবে। তবুও।

কি করে যাবি?

এখানে এই একটি ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণ অন্ধ। এই গুহা থেকে বেরোবার কোনো পথ আমাদের কোনোদিন বলা হয়নি। এমনকি এই ব্যাপারে কোনো চিন্তাশক্তি কাজে আসে না।

এটাও কি চক্রান্ত?

ব্রজ বলল, আমি পথ খুঁজে বের করেছি।

কবির ভাবছিল, সেও এরকম একটি পথ আবছামতো পেয়েছিল, যখন ঝিলমারির নির্ভূল অবস্থান সে বের করতে পেরেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত হারিয়ে গেছে সূত্র। পরে আর চেষ্টা করেনি কখনো। 

এখনই চল।

বলে সোজা তাকিয়ে রইল কবিরের চোখের দিকে।

একসময় কবির দেখল, সে হাঁটছে। লম্বা লম্বা ঘাসের জঙ্গল। এদিকটায় এতো বছরেও কখনো আসেনি তো সে। একটি গুম গুম গর্জন, জলের শব্দ। ওহ্ সেই প্রপাত। এটা দেখেছে সে কয়েকবার, কিন্তু অন্য রাস্তায়। 

আসলে তাদের ল্যাবে, ল্যাবরোটারিতে, এত সুযোগ, এতো সম্মোহন যে, দিনরাত নেশার মতো ডুবে থাকে তারা নিত্য নতুন আবিষ্কারে,  বাইরেটা মাঝে মাঝে দেখে শুধু, এখন যেন আর কোনো চাওয়া নেই। ছোটবেলার পৃথিবীতে গেলে কীভাবে সে থাকবে? প্রথমে ক্লোনটাকে হাপিস করতে হবে। এখন নয়, ভেবে দেখা যাক আরো কিছুদিন।


একটি স্পিড বোট নদীতে। নিতাই স্যার দাঁড়ানো সেখানে। আশ্চর্য, যেন ব্রজ'র তৈরি কোনো ফর্মুলা এটা।

পা রাখতে হলো স্পিডবোটে। তিনজনই। তুমুল বেগে চলছে স্পিড বোট। নদী এখন নিম্নগামী, খরস্রোতা। হঠাৎ প্রবল ধাক্কা খেলো। ছিটকে বেরিয়ে এলো যেন। খুব ঠান্ডা বৃষ্টির ছাট লাগলো চোখে মুখে ।

কবির চোখ খুললো। সে পড়ে আছে ঘাসের ওপর। আর নিতাই স্যার এক পাশে। ব্রজ নেই কোথাও। নদীটাও নেই। তাদের পুরনো পৃথিবী। কবিরের বাড়ির কাছের মাঠটাই।  কোথায় সেই গুহার পথ।  হঠাৎ মনে হলো, ব্রজ নেই তো! তার মানে নিতাই স্যার আর কবিরকে বের করে দেওয়া হয়েছে এই গুহা সাম্রাজ্য থেকে। এখন থেকে পুরনো পৃথিবীটার সঙ্গে আবার লড়াই করতে হবে। কোথায় সেই অত্যাধুনিক ল্যাব, সর্ব সুবিধেজনক আবাসস্থল। কবির হঠাৎ ভাবল, যেই না তার মনে ঈর্ষা এসেছে, তখনি এই পরিনতি। তবে কি ব্রজ বুঝতে পেরেছিল তার মনের কথা। আর নিতাই স্যার!

নিতাইস্যার ভ্যাল ভ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তার মানে ওনার মনেও লোভ এসেছিল। এখন কী করা যায়।

কবির দ্রুত হাঁটতে লাগল নিজের বাড়ির দিকে। সেই মোরাম বিছানো সুন্দর পথ একইরকম আছে । বাড়ির সামনে লাল হয়ে ফুটে আছে কৃষ্ণচূড়া ফুল। বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে অবিকল কবিরের মতো দেখতে একটি ছেলে বই পড়ছে। কবিরের ক্লোন। একে কি করে ম্যানেজ করা? 

ক্লোনটাকে  মেরে ফেলতে হবে!   তার মানে খুন করতে হবে কবিরকে। সে কি করে তার মাকে বোঝাবে, এতোদিন যার সঙ্গে তারা হাসিখুশি জীবন কাটাচ্ছে, সে আসলে তার নকল। 

কবির আস্তে আস্তে গিয়ে তার ক্লোনের সামনে দাঁড়াল। ক্লোন ওরফে কবির মুখ তুলে দেখল আসল কবিরকে, কিন্তু তার মুখে খেলে গেল তীক্ষ্ণ, তীব্র হাসি। কাছে এলো কবিরের, হাত বাড়াচ্ছে ওর দিকে, না ভালোবাসার হাত নয়। গলা টিপে ধরবে মনে হচ্ছে। কবির হঠাৎ হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। সে জীবনে কোনোদিন মারপিট করেনি। খুব ভয় পেয়ে গেলো । দৌড় লাগাল, পেছন পেছন কবিরের ক্লোন, অনেকদিন পর কবির শহরে এসেছে, তবুও রাস্তাঘাট তেমনিই আছে, সে রিমঝিমদের বাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে, ব্রজদের কলোনির দিকে যাচ্ছে, আর কিছুদূর গেলেই ইটভাট্টা। তারপরই চিত্রা নদী।

কবির ভাবছে  চিত্রা নদীর জলে ঝাপ দেবে। খুব দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে ও। কবির ভুলে যাচ্ছে, কবির যা পারে, কবিরের ক্লোনও তা পারে। কিন্তু শহরের বাকি মানুষগুলো কোথায়, শুনশান রাস্তা। দুটো যুবক উন্মাদ হয়ে দৌড়ুচ্ছে, কেউ থামাচ্ছে না।

ঐ তো চিত্রা নদী। সেই চেনা নদীতীর, সিমেন্ট বাঁধানো ঘাট, বটগাছ, কবির পৌঁছে গেছে ঘাটে, কে বসা ওখানে, দুজন লোক? আরে নিতাই স্যার এবং আর একজন নিতাই স্যার, ভীষণ দুঃখী মুখ করে দুজন পাশাপাশি বসে আছে। মানে আর একজন নিতাই স্যারের ক্লোন। কে ক্লোন আসলে?

নিতাই স্যার কবিরকে বললেন, তোমার মনটাকে শান্ত করো, তাহলে ক্লোনও শান্ত হবে। 

কবির চুপ করে দাঁড়িয়ে, মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে বদলে ফেলল, ধীর শান্ত মন,  যেন সূর্যাস্ত দেখছে।

কবিরের ক্লোনও তার পাশে এসে দাঁড়ালো একই ভাবে।

কবির বুঝল এই আসল পৃথিবী এখন তার ল্যাবরোটারি। 

এখানেই বাঁচতে হবে আবার নতুন করে। 

আর কোনোদিন সেই গুহাকে সে খুঁজে পাবে না। কী করে সব বোঝাবে বাড়ির মানুষকে। তাকে কেউ বিশ্বাস করবে না। নিতাই স্যারও হয়তো তাই ভাবছেন।

দু জোড়া মানুষ বহু সন্দেহ, জিজ্ঞাসা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিত্রা নদীর তীরে।


Don 't worry .

 গলার স্বরে চমকে উঠং চারজনই। বৃদ্ধ বিজ্ঞানী। যার বয়সের  গাছ পাথর নেই। যার বেঁচে থাকার প্রয়োজন তিনি নিজে নির্ধারণ করছেন। যেন মহাভারতের ভীষ্ম।

তার দু হাতে দুটো নীল পাথর। দ্যূতি বেরোচ্ছে, কবির বুঝল লেজার রে। তিনি তাক করলেন ক্লোন গুলোর দিকে, আস্তে আস্তে সেই অদ্ভুত নীল আলো ঢেকে ফেলল ক্লোন দুটোকে। সেই আলোয় মিলিয়ে গেলো তারা। আলোও আস্তে আস্তে নিভে কোথায় যেন বিলীন হলো।

কবির আকুল হয়ে বলল,আমি কি আর গুহা পৃথিবীতে যেতে পারবো না। তিনি মাথা নাড়লেন। একটি ড্রোনে উঠে গেলেন তিনি। কবির দ্রুত পৌঁছুতে চাইল ড্রোনের কাছে। নাহ্, অদৃশ্য লেজার চাদরে ঢেকে গেলো সব। কিছুই বোঝা গেলো না আর। 

 

নিতাই স্যার বুঝলেন তার জীবনের সেরা ছাত্র ব্রজ। যে মেধা এবং বিশ্বাসে অতুলনীয়। 


বেঁচে যাওয়া পৃথিবীর বুকে পুরনো ঝিলমারি আর চিত্রানদীর তীরে কবির, নিতাইস্যারের দিনগুলো আবার আগের মতোই চলতে লাগল। 







দ্বিতীয় পর্ব 


এই সময়টায় আকাশ সবচেয়ে পরিষ্কার থাকে। আজকাল অবশ্য দূষণ জিনিসটি আস্তে আস্তে অবলুপ্তির পথে। পৃথিবীর বুকে প্রতিস্থাপিত হয়েছে গভীর অরণ্যানি। ফাঁকেফোঁকরে উঁকি দিচ্ছে মানুষের বাসস্থান, অধিকাংশই বৃক্ষ বাড়ি। অতিরিক্ত অক্সিজেন আকাশে বাতাসে। এটাও মানুষকে মাঝে মাঝে অসুস্থ করছে। অঙ্গদ তার গাছবাড়িতে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে বহু পুরনো কিছু গানের লিরিকস ঘাঁটাঘাঁটি করছে।

তার বাড়িটি বটগাছের ওপর তৈরি। 

মানুষ এখন বাড়ি তৈরি করার জন্য নিজের পছন্দমত বৃক্ষ বেছে নিতে পারে। সেজন্য নির্ধারিত সময় একবছর।

প্রথমে  তাকে বৃক্ষ সংরক্ষণাগারে যেতে হবে। সেখানে বৃক্ষ কর্মীরা আছেন, যারা কোন্ কোন্ বৃক্ষ এই মুহুর্তে বেশি প্রয়োজন সেটা দেখে প্রয়োজনীয় চারাটি দেবেন। 

 সায়েন্টিফিক পদ্ধতিতে দ্রুত চারা গাছটিকে বড় ও দৃঢ় করা হবে। গাছটির উচ্চতা, ডালপালার সংখ্যা, তাদের দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ কতটুকু হলে কী ডিজাইনের ঘর তৈরি করা যাবে সব কম্পিউটারে নক্সা করে নেওয়া হবে। 

তারপর শুরু হবে  সেই স্বপ্নের বৃক্ষগৃহ তৈরি করা। সবাইকেই যে এরকম বাড়িতে বাস করতে হবে এমন কোন কথা নেই, কারণ বহুতল বাড়ি তৈরি করার পর তাকে পুরো সবুজে ঢেকে ফেলা চালু হয়ে গিয়েছিল আরোও বহু বছর আগে থেকেই। দিন দিন তার ডিজাইন বদলাচ্ছে, ভাঙচুর হচ্ছে, প্রত্যেকটি জিনিসকেই যতটুকু পারা যায় বায়ো ডিগ্রেডেবল করা হচ্ছে। 

এইসময়, অঙ্গদ জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছে, জানলা বলতে বটের ঝুরিকেই বেঁকে চুরে জানলার শিকের মতো করা হয়েছে, পাখির পালকের পর্দা হালকা হাওয়ায় দুলছে। পৃথিবীতে এখন অসম ঋতুকাল । বহুকাল আগে নাকি কখনো শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত নামের পাওয়ারফুল এবং হেমন্ত ও শরৎ নামের দুটো হালকা ঋতু ছিল। কখনো ভীষণ বৃষ্টিতে পথঘাট ডুবে যেত। কিন্তু বহুদিন পরের এই পৃথিবীতে প্রকৃতি একদম বোরিং রকমের ভালো। সবসময় নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। চারদিক এত ব্যালেন্সড, পাহাড়পর্বত, তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ, বছরে দু একটি ঝড়টর হয় বটে, তবে ঐ পর্যন্তই, দুর্যোগ জিনিসটাই কমে এসেছে ভীষণ রকমভাবে ।

অঙ্গদ একটি বিরাট প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত আছে। সেটা হলো তারা সতেরটি টিম মিলে একটি ছোট পৃথিবী বানাবে, সেটা পৃথিবীর ভেতরেই তৈরি হবে। প্রত্যেকটি জিনিসের ডামি তৈরি হবে।  জাপান নামের একটি দেশ সেইসময়ের পৃথিবীতে প্রযুক্তিতে খুব উন্নত হয়েছিল। আনুমানিক দুইহাজার উনিশ সালেই তারা তৈরি করতে পেরেছিল টাচেবল থ্রি ডাইমেনশনাল হলোগ্রাম। সেইসময় থেকে সময়কে ধরলে অঙ্গদ ওরা বেশিদূর এগোতে পারে নি। মাঝখানের একটি বিশাল সময় পৃথিবীর মানুষকে যুদ্ধ করতে হয়েছে নষ্ট হয়ে যাওয়া পরিবেশের বিরুদ্ধে। কয়েকটি ভয়ঙ্কর পেনডেমিকের সঙ্গে। ভয়াবহ উল্কাপাত, ভূমিকম্প এবং সুনামির সঙ্গে। 

পৃথিবীকে অস্ত্রশূন্য করতে লেগেছে আরো বহু বছর। বরফের দুনিয়া গলেটলে টালমাটাল হয়েছিল এই পৃথিবী, তবে টিকে গেছে, মানুষই জিতেছে, যার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আজ এই সময়।

অঙ্গদের মাথায় ছিল একটি থিয়োরি। থিয়োরি অফ এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ড। কিছুই না, সাধারণ কম্পপ্লেক্স নাম্বার যেমন লেখা হয়. x+iy দিয়ে, যেখানে i হচ্ছে গিয়ে একটি ইমাজিনারি নাম্বার, এখন এই ইমাজিনারি নাম্বারটি ধ্রুবক বা কনস্টেন্ট, সেটাকে জীবিত সত্তার আইডেন্টিটি ধরে হলোগ্রাফিক ইমেজ তৈরি করা, আর এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ডের সীমা হতে পারে আপ টু ইনফিনিটি, সেজন্য এই ধরনের ডেমো পৃথিবী নির্মান করা খুব কিছু অসাধ্য নয়। আলট্রাসোনিক লেভিয়েশনের তত্ত্ব দিয়ে যাকে সাজানো যাবে মনের মতো করে, আবার বিপদ দেখলে ভ্যানিশ করে দেওয়া যাবে।

কিন্ত আপাতত, অঙ্গদ সায়েন্টিস্ট নয়, সে একজন শিল্পী, বহু পুরনো কিছু গানের লিরিক তাকে আচ্ছন্ন করছে, যেগুলোর হলোগ্রাফিক ইমেজ সে তৈরি করতে পেরেছে, এবং সামান্য ভয় পাচ্ছে।

কারণ প্রত্যেকটি স্বরগম জীবন্ত প্রাণীর মতো মনে হচ্ছে, যাদের সুর তাল লয় গতি এতটাই সুগ্রন্থিত এবং বিচিত্র যে মনে হয়, এই ব্যালেন্সড পৃথিবী তাদের পছন্দ নয়, বহু বহু বছর আগের পৃথিবীতে তাদের জন্ম দিয়েছিল কেউ, যার মধ্যে ইমোশন খুব বেশি ছিল , প্রতিটি শব্দবন্ধে পজিটিভ ও নেগেটিভ এক্টিভিটির একটি দুরন্ত আকর্ষণ রয়েছে ...হয়তো অঙ্গদ এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়েই পড়ত যদি সে প্রাচীন বালক হতো, কিন্তু না,

তার সামনে সুদৃশ্য গাছ কোটর, ছবি ভেসে উঠেছে যার, তার নাম সত্যকাম, অঙ্গদের সিনিয়র, গম্ভীর গলায় বলল, অঙ্গদ তোমার পাঠানো গানের লিরিকগুলোর মাধ্যমে এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ড এরিয়ায় প্রকৃতি ব্যালেন্সড থাকছে না …একথা অঙ্গদের জানা। এই ডামি তৈরির থিয়োরিও বহু পুরনো। এখন মহাকাশে আবিষ্কৃত হয়ে গেছে একটি নতুন গ্রহ, যা পৃথিবীর মতোই অনেকটা। সেখানে যাওয়া আসা করাটা যদিও অসম্ভব নয়,   কিন্তু  এই বিপুল আলোকবর্ষীয় দূরত্ব অতিক্রম করে মানুষের পৌঁছুনোটা খুবই কঠিন ব্যাপার, তারুণ্যে যাত্রা করে বার্দ্ধক্যে পৌঁছুতে হবে । আরো গতিবেগ বাড়ানোর কোনো থিওরি এখনো  আবিষ্কার করা যায়নি। আর যে মানুষগুলো যাবে, তারা আর কখনো ফিরতেই পারবে না।

তবে অঙ্গদ নতুন পৃথিবীর পেছনে বিজ্ঞানীদের উন্মাদনার কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না। এই পৃথিবীটাকে পুনর্গঠন করলেই তো হয়। এখন লোক সংখ্যা কম। কি অসুবিধে?




অঙ্গদ আজকে নিজেকে চিনে নিতে চায়। এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ডের যে থিয়োরি সেখান থেকে হাজার বছর আগের মানুষকেও খুঁজে বের করা যায়। যায় তার আগের চরিত্রকে জানা। এটা টাইমমেশিনেও করা যায়, তবে ততটা নিঁখুত ভাবে নয়। 


এই যে এক্স, এখান থেকেই যাবতীয় ইমাজিনেশনের জন্ম।

তাই আপাতত সত্যকামের পাঠানো সিগনাল থেকে সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে দেখা যাবে ক্ষণ। কোনো একজন স্রষ্টা এসব তৈরি করেছেন। শিল্প মানেই নতুন কিছু, ভীষণ রকম ব্যালেন্সড এই পৃথিবীর বুক থেকে তাই হারিয়ে গেছে শিল্প। 

এখন সবাই বিজ্ঞানী। মাপজোক করে গবেষণাগারে তৈরি হয় সব। কোথায় যেন সৃষ্টির আনন্দটি হারিয়ে গেছে।

যাইহোক, আপাতত অঙ্গদ গভীর নিমগ্ন। সে নিজে হলো এক্স। তার চারপাশে হলুদ আলো। এখন সে এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ড এরিয়া থেকে বেরিয়ে গেছে। একটি নতুন ই্যকুয়েশন বানিয়েছে অঙ্গদ । সেটা সল্ভ করে একটি বছর খুঁজে পাওয়া যায়, সেটি নির্ধারন করবে নিজেই । কত বছর পেছনে   যেতে  চাইবে, তিনশো, চারশো, পাঁচশো?

 না ঠিক আটশো বছর সাতাশদিন পেছনে গেলো সে, স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে বহু বহু বছর আগের বৃষ্টির দিন, একটি ছেলে স্কুল থেকে ফিরছে। সঙ্গে কয়েকজন বন্ধুবান্ধব। পেছনে ঝোলা ব্যাগ,  অংকের খাতা। একবার পেছন ফিরে তাকালো। বিষণ্ণ অথচ কীরকম অস্থির ছেলেটি। স্ক্রিনের মধ্যে এক্সের সঙ্গে আস্তে আস্তে মিশে গেলো ছেলেটির মুখ। নাম ব্রজ।

এখন সে অঙ্গদ, আগে ছিল ব্রজ।

ব্রজ ছিল অংকে জিনিয়াস। তাকে সিলেক্ট করেছিল কোনো গ্রহের এলিয়েন বা পৃথিবীরই কিছু দুষ্ট বিজ্ঞানী। তাকে মাধ্যম বানিয়ে বহু অংক করেছে তারা। কিন্তু আরোও মেধাবী এবং সৎ একজন মানুষের দৃষ্টিতে পড়ে যায় ব্রজ। তার মেধার যাতে খারাপ ব্যবহার না হয়, এজন্য তিনি তাকে লুকিয়ে ফেলেন। ব্রজের পাশাপাশি পেয়ে যান আরোও দুজন কে। তবে সে গল্প থাক। ব্রজের পিঠে একটি সিল। অজান্তেই অঙ্গদের হাত উঠে গেলো নিজের পিঠে, আশ্চর্য অস্পষ্ট একটি দাগ। সঙ্গে সঙ্গে ছোট ফোন দিয়ে ছবি তুলল নিজের পিঠের। সামনে এনে স্ক্যান করতেই অসংখ্য গুটি গুটি অক্ষরে ভেসে উঠল ব্রজ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য।


সেই পুরনো পৃথিবীটাকে দেখে অঙ্গদের খুব লোভ হলো। তার মনে হলো সে সেই ধুলো ধোঁয়ার জগতটাকে দেখে আসে। ফুটবল খেলতো মানুষ,তারো ইচ্ছে হলো সেও খেলে। এখনের এই কেজো পৃথিবী থেকে বেরিয়ে যায়।

অঙ্গদ হঠাৎ তার বন্ধুদের খুঁজে পেতে চাইল। আজ এটাই হবে তার কাজ। সবাইকে এই সময়ের পৃথিবীতে খুঁজে নিয়ে তাদের নিয়ে বাঁচতে চায়।

অঙ্গদের মা ডাকলো তাকে। স্ক্রিনে। তিনি একটি স্কুলে কাজ করেন। স্কুল জিনিসটা নতুন করে শুরু হয়েছে, আবার। ডিজিটাল পড়াশোনা চলেছে বহুদিন। তারপর ছাত্রদের জন্য  আনন্দ খুঁজে নিতে ইতিহাস ঘেঁটে স্কুলের কনসেপ্ট  আনা হলো। সেইরকম একটি স্কুলেই পড়ায় অঙ্গদের মা। অঙ্গদকে জিজ্ঞেস করলো কিছু খেয়েছে কিনা। অঙ্গদ বলল খেয়েছি রাইসবল, চিকেন সেদ্ধ, ফ্রুটস্। অঙ্গদের মা আশ্বস্ত হলেন, যাক। অঙ্গদের হাসি পেলো। একে বলে মাদার। হাজার বছর হলেও এসব কিছু বদলায়নি। বদলাবেও না। এই কয়েকদিনের মিশন হলো পুরনো বন্ধুদের খুঁজে বের করা। 

কারা কারা ছিল তাদের দলে। কবির, নিশা, রিমঝিম, টিনটিন, যিশু, এসব হলো তাদের নাম। তারা তখন কি কি পেশায় ছিল সেটাও বের করেছে সে। রিমঝিম ইংরেজি সাহিত্যের প্রফেসর হয়েছিল সেই সময়, কবির আইসক্রিম পার্লার চালাতো আর গল্প লিখতো, আস্তে আস্তে সে সেইসময়ের একজন বিখ্যাত রাইটার হয়েছিল।

নিশা স্কুলের টিচার আর তাদের ফ্যামিলির যে স্টল ছিল, সেটাই দেখত। যিশু হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার। আর টিনটিন ডাক্তার। এরমধ্যে কবির, নিশা , রিমঝিম তিনজনই ঝিলমারিতে তাদের জীবন কাটিয়েছিল, একমাত্র যিশু আর টিনটিন অন্য জায়গায় তাদের জীবন কাটিয়েছে।

হাসিখুশিই ছিলো তারা। আর ছিল অবাধ বন্ধুত্ব। কিন্তু ব্রজ মানে অঙ্গদ তাদের মধ্যে ছিল না। সে ছিল একটি নির্জন গুহায়। সেইসময়ের বিচারে একটি অত্যাধুনিক ল্যাবে। 

তার কৈশোর এবং যৌবন নিয়োজিত ছিল বিজ্ঞানের সেবায়। জীবনের অনেককিছু আর দেখা হয়নি তার। আজ সব দেখতে ইচ্ছে করে। এনজয় করতে ইচ্ছে করে। তবে সে এখন অনেকটাই বড়। তাই বন্ধুরাও নিশ্চয় এখন তারই সমবয়সী। তাই খুঁজে পেলে, আড্ডা হবে, গল্প হবে, কত আনন্দ হবে। প্রথমে চাই কবিরকে। কবিরের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছিল। ঠাণ্ডা ঝগড়া। এখন তার কবিরকেই বেশি ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। সে পৃথিবীর  রূপরসগন্ধ পেল না । ব্রজ কিছু  পেল না।

কবিরকে খুঁজতে হবে এই পৃথিবীতে। পাওয়া গেল, তাকে। 

জায়গার নাম, মেহেরগড় সিটি ফাইভ। 




কবির     


একটি সুদৃশ্য বাড়ি। গাছে ঘেরা অবশ্যই। বাড়ির সামনে খুব সুন্দর একটি লাইব্রেরি। ভেতরে বসার জায়গা। ডিজিটাল বুকস পড়তে পারে যে কেউ বসে, তাছাড়া আছে কাগজের বইও। এখন কাগজ আর গাছ থেকে তৈরি হয় না। সে পর্ব বাদ গেছে বহু আগেই। একটি বিশেষ রাসায়নিক সংকর পদার্থ দিয়ে তৈরি হয় কাগজ তৈরির কাঁচামাল। বাইরে বড় হোর্ডিং।  লেখা, শ্যামস বুকস্ হাউজ।

নিজের বানানো ছোট্ট একটি ড্রোনে করে সেই বাড়িটির সামনের লনে নামল অঙ্গদ।

তার পরনে টকটকে লাল গেঞ্জি, কালো ট্র্যাকস্যুট। চোখে চশমা। কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। বিশাল বড় গোল একটি সেন্টার টেবিল। কয়েকজন বসে বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছে। পাশে একটি কাউন্টার, সেখানে ভীষণ ডিজাইনার একটি ফ্রিজ, তাতে রাখা প্রচুর রকমারি আইসক্রিম। অতএব, নিঃসন্দেহে সে কবির। কোঁকড়ানো চুল, সৌম্য দর্শন, শান্ত ছেলেটিকে দেখে অঙ্গদের ইচ্ছে হলো গিয়ে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করল সে। আস্তে করে বলল, হ্যালো।

ছেলেটি ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো, বই পড়বেন?

অঙ্গদ মাথা নাড়ল।

তাহলে আইসক্রিম খাবেন?

অঙ্গদ মাথা নাড়ল।

তারপর সে পকেট থেকে ছোট একটি চিপস্ বের করল। ছেলেটির হাতে দিল। আর নিজের কাছে রাখা রিমোটটি অন করল। একটু হেসে বলল, যাস্ট ওয়েট ফিউ মিনিটস্। কবির স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইল, চিপস টি ধরে, ছোট কালো মতো একটি যন্ত্র। ধীরে ধীরে সে পিছিয়ে যাচ্ছে, অনেক অনেক বছর, দশমিনিট কাটল। অঙ্গদ একবুক আশা নিয়ে শ্যাম ওরফে কবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। 


আস্তে আস্তে ঘোর কাটছে শ্যামের। অস্ফুট শব্দে শ্যাম বলল, ব্রজ। যেন দুদিন পর তাদের দেখা হয়েছে। দুম করে দুজনের মনে পড়ে যাচ্ছে সেইসব দিন। হঠাৎ শ্যাম মাথা নিচু করে মুখ ফিরিয়ে রাখল। 

তার লজ্জা করতে লাগল। ভীষণ লজ্জা। হো হো করে হেসে উঠল অঙ্গদ। আরে কয়েক শো বছর পেরিয়ে গেছে রে। এখন আর ওসব ভেবে লাভ নেই। চল যিশু, টিনটিন, রিমঝিম আর নিশাকে খুঁজে বের করি। 

শ্যাম বলল, আইসক্রিম খা। অঙ্গদ বলল না রে। আমার চপ, ফুলুরি এসব খেতে খুব ইচ্ছে করছে। আপাতত কফি খাবো তোর বাসায় গিয়ে। তারপর নিশাকে বের করবো। নিশা কী সুন্দর গান গাইতো তাই না?

শ্যামের বাড়িতে খুব গল্প গুজব হলো। ওর মা বাবা দুজনেই বাড়িতে ছিলেন। সুদর্শন দেখতে। বর্তমান পৃথিবীর নিয়ম মেনে বুড়োটে ভাব নেই। সজীব, সুন্দর।

অঙ্গদের অঙ্কের ফর্মুলা অনুযায়ী, নিশা আছে কালিকট সিটি ফোরে । 

এখন আকাশে দুটো ড্রোন। রাত দুটো বাজে। তাতে কি।  আটশ নশো বছর আগের বন্ধুকে খুঁজে বের করতে সব করা যায়। একটি ড্রোনে শ্যাম, অপরটিতে অঙ্গদ। নীল তীব্র আলো জ্বেলে তারা চলেছে কালিকট সিটি ফোরে। নিচে প্রচুর বৃক্ষরাজি নিয়ে থাকা সুন্দর জনপদগুলো।





নিশা 


কালিকট সিটি ফোর এ পৌঁছুলো দুজনে। তখন ভোর, নির্মল নাতিশীতোষ্ণ বাতাস। শহরটি তখনো ঘুমিয়ে।

একটি হলুদ বাড়ি। এটাই নিশাদের বাড়ি হওয়া উচিত, অংক অনুযায়ী। সামনে যথারীতি লন এবং ড্রোন নামাবার ছোট্ট পার্ক। দুজনে সেখানে নামল। কলিং বেল টিপতেই ঝমঝমিয়ে ঝর্ণার আওয়াজ হলো। ভোরের নির্জনতাকে ভেঙে দরজা খুলে গেলো। সোনালি চুল, নীল চোখের, রোগামতো একটি মেয়ে। সেই আদিকালের ভাষা ইংলিশেই চলল কথা। মেয়েটি তাদের বসার ঘরে নিয়ে বসাল। এই বাড়ির থিম জল। সমুদ্রের নিচের আবহে সাজানো ঘরটি। ঘরের দেয়াল জুড়ে  নীলাভ রঙ  আর তার মধ্যে ফেনিল সাদা সমুদ্র  ঢেউ আঁকা। 

নরম দুটো গদি, দেখতে নৌকোর মতো, সেখানে বসল ওরা। এখন অঙ্গদের কাজ ওর হাতে চিপস্ ধরিয়ে দেওয়া। 

মেয়েটি অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অঙ্গদ মেয়েটির হাতে চিপস্ দিল, আর সেইসাথে রিমোট অন, দশমিনিট অপেক্ষা। ঢিপঢিপ করছে তাদের বুক। 


সোনালি চুলের মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর চেঁচিয়ে উঠে নেচে নিল কয়েক পাক। ভাবা যায়, সাড়ে আটশ বছর আগের তোরা। লেট আস সেলিব্রেট। মা মা বলে ডাক দিলো নিশা। কী নাম এখন ওর কে জানে?

নিশা কাঁধ নাড়িয়ে বলল আমার নাম বসন্ধুরা। অঙ্গদ অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, মা ডাক তো একই রকম রয়েছে। নিশার মা এলো! পরিচয় হলো নতুন করে ।


তিনজনে প্রাণের আড্ডা চলছে। সঙ্গে ফুলুরি আর চপ।

বসুন্ধরা এখনো পড়ছে। সে কোনো স্কুলে পড়াতে চায়। চায় অনেক পড়াশোনা করতে নিজের মতো করে। গান তার প্রিয় বিষয়।  সায়িন্টিফিক বিষয় নিয়ে তার কৌতূহলের শেষ নেই। অঙ্গদ বুঝল, এই গানপাগল নিশাকে তার লাগবে। সেও পড়াশোনা আর গান নিয়ে কাটাতে চায় জীবন। 



টিনটিন ও যিশু ও নিতাই স্যার


টিনটিন, যিশু তারা দুজন ছিল সেইসময়ের এভারেজ মেধাবী, পরিশ্রমী ছেলে। প্রচুর পড়াশোনা করে ডিগ্রি নিয়ে চাকরি করেছে। কোনো একস্ট্রা মেধা তাদের দেওয়া হয়নি। কিন্তু নিজেরা নিজেদের গড়ে পিটে নিয়েছিল। তারা ভালো ক্রিকেট খেলত। খুব মুভি দেখতো। হই হুল্লোড় করতো। কী অদ্ভুত ছিল তাদের প্রাণশক্তি।

অঙ্গদের ফর্মুলা এবং  মেশিন বলছে তারা আছে দুটো পাশাপাশি শহরে। একটি শহরের নাম মথুরা সিটি টু এবং ওপর শহর বৃন্দাবন সিটি থ্রি।

এখন ড্রোনের সংখ্যা তিন। নিশা সবুজ রঙের একটি স্কার্ট আর হলদে টপ পরেছে। তার সোনালি চুল সাদা রিবন দিয়ে টাইট করে বাঁধা। এই দুটো সিটি বেশ দূরে আছে। ড্রোনের সর্বোচ্চ স্পিডে গেলেও মোটামুটি সাত ঘন্টা লাগবেই। তারা তিনজনে যাত্রা আরম্ভ করলো। যার যার কানে হেডফোন। কথা চলছে তিনজনে যেতে যেতে। পথে সুন্দর একটি পাহাড় ঘেরা শহর দেখে তিনজনেরই ইচ্ছে হলো নামতে। ছোট্ট একটি নদী। লোকজন ঘোরাফেরা করছে। সবুজে ঘেরা  দুটো পার্ক দেখা যাচ্ছে। সবচাইতে মজার হলো সেই নদীটি। শহরের মাঝখান দিয়ে সে ছুটে চলেছে। স্রোত আছে বেশ।  অনেকগুলো বোট সেখানে। লোকজন শখ করে বোটিং করছে। নদীতে অনেক মাছ। তিরিং বিরিং লাফাচ্ছে। একটি পার্কের এক জায়গায় দেখা গেলো ড্রোন নামানোর জায়গা আছে। তিনজনেরই প্রবল ইচ্ছে শহরটিকে একটু এনজয় করে। তারা এদিক ওদিক ঘুরতে লাগল। একজায়গায় মনে হলো কিছু একটা হচ্ছে। প্রচুর মানুষ গোল হয়ে বসে আছে। একজন সৌম্য দর্শন মানুষ স্পিচ দিচ্ছেন। তারাও একজন আর একজনকে ইশারা করল। তারপর বসে পড়ল সেখানে। মনোরম ছাউনি, পাথরের ছোট ছোট বেঞ্চ। তারা বসতেই একজন এসে তাদের হাতে তিনটি  বাক্স দিয়ে গেলো। খুলে দেখল ফল আর চকলেট। সেই সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক বলেই চলেছেন। কখনও কোনো একজন শক্তিমানের কথা বলছেন, কখনও এই জীবনের হালকা আনন্দ, ভালোবাসার কথা বলছেন। বহু প্রাচীন পৃথিবীর কথা বলছেন যেখানে মানুষ রিলিজিয়ন নামের একটি মতবাদ নিয়ে খুনোখুনি করত, তিনি জ্ঞান বিজ্ঞান, ফিলোসফি, হিস্ট্রি, সবকিছু নিয়ে সাবলীল ভাবে বলে চলেছেন, সবাইকে মুগ্ধ করে রেখেছেন তার বাচনভঙ্গিমায়, জ্ঞানের গভীরতায়। অঙ্গদ, বসুন্ধরা এবং শ্যাম তারাও তন্ময় হয়ে গেলো। হঠাৎ অঙ্গদের কী যেন মনে হলো, সে এগিয়ে গিয়ে লোকটিকে কিছু বলল, তার সঙ্গে করমর্দন করল, তারপর দশমিনিটের মতো স্থবিরতা, আর অপেক্ষা এবং শেষে সেই লোকটির চোখে আনন্দাশ্রু, তিনি আজকের সভার সমাপ্তি ঘোষনা করলেন এবং তার প্রিয় ছাত্রদের নিয়ে হাঁটতে লাগলেন। বহুদিন পর নিতাই স্যারের ইচ্ছে হলো অঙ্ক করান তাদের। যদিও তিনি এখন অঙ্কের মাস্টারমশাই নন। তিনি একজন মোটিভেটর বা কখনও শুধুই একজন বক্তা। মানুষ তার কথা শুনতে ভালোবাসে। তার নাম মিঃ শ্বেতবাহন।

নিতাই স্যার বা মিঃ শ্বেতবাহন তাদের তিনজনকে নিজের বাসায় নিয়ে গেলেন। বাসাটি প্রিমিটিভ ডিজাইনের। বহু বছর আগের মানুষেরা যে ঘাস, মাটি এসব দিয়ে ঘর বানাতো সেরকম। আসলে সেটা মাটি নয়। কিন্তু বানানো হয়েছে সেভাবে। একটি ছোট জলাশয় বাড়ির সামনে, তাতে কয়েকরকম জলজ ফুল ফুটে আছে। ভাত খেলো ওরা, সঙ্গে ফিসকারি। মাস্টার মশাইরের ওয়াইফ খাওয়ালেন। গাউন পরা, ঘন নীল চোখের এক মধ্যবয়স্কা ভদ্রমহিলা।

খাওয়া শেষে বাইরে একটি নতুন ধরনের পাত্র থেকে তারা জল খেলো, ইতিমধ্যে অঙ্গদ সার্চ করে দেখেছে একে বলে মাটির কুঁজো, প্রাচীন পৃথিবীর মানুষ এতে জল রেখে পান করত। মিঃ শ্বেতবাহনের বাড়িতে এরপর থেকে যে তাদের আসাযাওয়া লেগেই থাকবে এ নিয়ে আর কোনো সন্দেহ রইল না। অসাধারণ এক আনন্দে সবার মন ভরে গেছে আজ। 


আবার ড্রোনে করে যাওয়া শুরু। মথুরা সিটি টু তে পৌঁছে, অঙ্গদ গটগটিয়ে একটি হসপিটালের সামনে এসে দাঁড়াল। এখানেই থাকার কথা টিনটিনের। অন্যরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। রিসেপশনে গিয়ে অঙ্গদ জিজ্ঞেস করলো এখন কোন কোন ডাক্তার ডিউটিতে আছে। রিসেপশনে একজন রোবট গার্ল বসা, সে সুমিষ্ট গলায় নামগুলো বলল। অঙ্গদ নামগুলোকে তার কাছে থাকা ছোট্ট রেকর্ডারে রেকর্ড করে নিলো। তারপর সামনে রাখা সোফায় বসল। একটির পর একটি নাম বসাচ্ছে তার ফর্মুলায়, মোবাইল স্ক্রিনে। হ্যাঁ মনে হয়, পেয়ে গেছে, অদ্ভুত উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখ। ডঃ সহদেব। সে রোবট রিসেপসনিষ্টের কাছে গিয়ে ডঃ সহদেবের এপয়েনমেন্ট চাইল। সবুজ আলোয় ঘেরা, ছোট একটি গুহার মতো সুদৃশ্য চেম্বার। সেখানে ঢুকল সে। তারপর আর বেশি সময় লাগেনি। মিনিট কুড়ি এবং বাকিটা কাকতালীয়। ডঃ সহদেব ওরফে টিনটিন বাইরে বেরিয়ে এসে ওদের বলল, বৃন্দাবন সিটি থ্রিতে তার একজন ভীষণ প্রিয় বন্ধু আছে। সে নিশ্চিত ওই যিশু হবে। এবং তাই হলো। তার নাম রবীনহুড। 

বাকি শুধু রিমঝিম। আর অঙ্গদ ভীষণ আশ্চর্য হলো তার বোকামিতে, কারণ অংক কষে দেখা গেল রিমঝিম অঙ্গদের সিটিতেই থাকে। 

ঝিলমপুুরী  সিটি ওয়ানের বাসিন্দা রিমঝিম। অঙ্গদ এবং সে এতোদিন এভাবেই পাশাপাশি আছে। উত্তেজনায় কেঁপে উঠল তারা সবাই। তাদের সকলে প্রিয় পছন্দের  মেয়েটি রিমঝিম। নিশা বলল আর দেরি নয়, চল এবার। টিনটিন, যিশু তারাও এক পায়ে রাজি। সব কাজ ফেলে, আকাশে ভেসে যাচ্ছে ড্রোনগুলো। না নিচে যতই সুন্দর সুন্দর শহর থাকুক না কেন, তারা আর থামবে না। এক উড়ানে পৌঁছে যাবে ঝিলমপুরীতে। 

ঝিলমপুরীতে যখন সবাই পৌঁছুলো তখন সেখানে সন্ধ্যা হচ্ছে। চারপাশে মৃদু আলো। পাখির কল কাকলি,কোথাও বাজছে গান গান। রেস্তোয়া গুলোতে মানুষ। লাইব্রেরিতে ভিড়। দোকানপাট গুলোতে মানুষজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সবার খুব টায়ার্ড লাগতে লাগল। তারা ঠিক করলো অঙ্গদের বৃক্ষবাড়িতে আজ রাত কাটুক। প্রথমে উষ্ণ স্নান। খাওয়া দাওয়া।

অঙ্গদের ক্লান্তি নেই। সে বের করতে বসে গেছে রিমঝিমকে। নিশা গান গাইছে। সেইসব ব্যারিয়ার ভাঙা সুর। যা এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ডের স্থিতিশীলতাকে বার বার ব্রেক দিচ্ছিল। প্রতিটি ওয়েভ কাঁপছে।

অঙ্গদ আশ্চর্য হয়েছ জিজ্ঞেস করলো তুই এইগুলো কোথায় শুনেছিস। নিশা বলল, কেন তুই জানিস না, এইসময়ের ফ্যামাস মিউজিশিয়ান ক্লারা মার্ট। যাকে খুব কম মানুষই দেখতে পেয়েছে এখন পর্যন্ত। নিভৃতে নিরালায় নিজের মতো কাজ করেন, তিনিই এই ট্যুইনগুলো সৃষ্টি করছেন, পৌঁছে দিচ্ছেন পৃথিবীর কোণায় কোণায়। অঙ্গদ অবাক হলো।

 ইয়েস ইট ইজ দ্য কো ইনসিডেন্স। রিমঝিম, ক্লারা মার্ট মিলে যাচ্ছে।




রিমঝিম 



পরদিন। তারা এখন যেদিকে যাচ্ছে, অঙ্গদ দীর্ঘদিন এ শহরে বাস করেও সেদিকে আসেনি কোনদিন। এই জায়গাটাতে জঙ্গলগুলো অগোছালো। যেমন আছে তেমনি যেন তাদের রেখে দেওয়া হয়েছে। মধ্যে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। দূরে নীল পাহাড়। একটি ক্যাসলের আদলে বানানো ছোট বাড়ি। চারপাশে ঝাউগাছ। বাড়ির সামনে একজন প্রৌঢ় বসা। হাতে একখানা রেডিও। এটা অঙ্গদ দেখেই চিনল। বহুকাল আগে এগুলো মানুষ ব্যবহার করতো। এখন আবার ফিরে এসেছে। কোনো দরকার নেই,এসবের।  অনেক অনেক মাধ্যম আছে সবকিছুর। তবুও মানুষ যেন আবার ফিরে পেতে চায় কিছু কৌতূহল, জীবনের অস্পষ্টতা, কৌতুক ইত্যাদি।  

তারা সবাই মিলে বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়াল। সেই ভদ্রলোক খুব অবাক হলেন,  এতো জন তরুণ তরুণীকে একসঙ্গে দেখে। তাদেরকে না চিনেও তিনি হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। উজ্জ্বল সেই লনটিতে সবাই বসল। কাঠের চেয়ার, দোলনা এলোমেলো ভাবে সাজানো চারপাশে। অঙ্গদ অস্থির। এ বাড়িতে ক্লারা মার্ট থাকেন?

ভদ্রলোক থমকে গেলেন? কেন বলো তো?

দরকার ছিল।

সে কারো সঙ্গে দেখা করতে চায় না।

তাকে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। 

শেষমুহূর্তে অঙ্গদের গলার স্বর একটু উঁচুতেই উঠে গেলো।

দরজা খুলে একটি মেয়ে বেরুলো। হাতে একটি স্টিক। যা অন্ধরা নেয়।

অঙ্গদ অবাক হলো। কেউ সাধ করে আজকাল অন্ধ হয়ে থাকে?

চিকিৎসা করলেই অন্ধত্ব সেরে যায়। 

মেয়েটি খুব ফর্সা।  কালো কোঁকড়ানো চুল। বেশ লম্বা। সে পরে আছে সাদা রঙের  একটি পোশাক, সারা শরীরে পেঁচিয়ে উঠেছে এটি, একে বলে শাড়ি, বহুদিন আগে ভারতবর্ষের মেয়েরা এসব পরত।  গলায় নীল স্কার্ফ।

নিচু স্বরে সে জিজ্ঞেস করলো আপনারা কে? 

অঙ্গদ হেসে বলল, আপত্তি না থাকলে আপনার হাত দিন, এখনই জেনে যাবেন, আমরা কারা।

মেয়েটি অনেকটা দ্বিধা নিয়ে হাত বাড়ালো। অঙ্গদও সেই চিপস্ টি হাতে গুঁজে দিল।


পুনর্মিলন। ক্লারা কাঁদছে, রিমঝিম কাঁদছে। সে বলল, আমি অন্ধ থাকতে চাই রে। এই অন্ধত্ব আমাকে সুর আর গান দেয়। আমি যেন বহু বহু দিন ধরে সুরের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো একটি অন্ধপাখি। 


টিনটিন বহুভাবে তাকে বোঝাতে চাইল। চোখে দেখলেও তুই গান লিখতে পারবি। না আমি চাই না। ক্লারার উত্তর। 


অঙ্গদ বুঝল। এধরনের একটি অভ্যাসে ক্লারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাকে আস্তে আস্তে এ থেকে বের করতে হবে। এতো তাড়াতাড়ি হবে না।



বহুদিন, বহুদিন নয় শত শত বছর পর, শ্যাম, অঙ্গদ আর মিঃ শ্বেতবাহন বসেছেন। সামনে একটি প্লেট। এখানে সিনেমা হবে। গোয়েন্দাগিরি। তবে পুরনো পৃথিবীকে নিয়ে। বর্তমান পৃথিবীর সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। কেন ব্রজ অংক নিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল, সেসময়ে চলতে থাকা কোভিড ১৯ এর পেনডেমিকের পেছনে মূল কারণ কি? এর সঙ্গে কি আদৌ কোন অন্য গ্রহের এলিয়েনদের যোগ সাজস ছিল। বা সেইসময়ের রাষ্ট্রনায়কদের। অঙ্গদের চোখের পাতাও পড়ছে না।সামনের এই যন্ত্রটির নাম টাইম প্লেট। খুব সূক্ষ্ম এর ব্রেণ, যদিও মানুষই বানিয়েছে এটাকে, কিন্তু আর্টিফিশিয়েল ইন্টিলেজেন্স এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে যন্ত্রটির, যে একসঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘটতে থাকা জিনিসগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বের করে শুধুমাত্র সেগুলোকেই পয়েন্ট আউট করে দেখায়। কিন্তু এই যন্ত্রটি যারা চালাবে তাদের হতে হবে প্রচন্ড তুখোড়, দারুণ মনোযোগী। ভাবনা থেকে একচুল এদিক ওদিক হলেই যন্ত্রটির চিন্তা শক্তিও এলেবেলে হয়ে যাবে। পুরো ব্যাপারটা একটি অত্যাধুনিক ভার্চুয়েল ট্যালিপ্যাথি। তাই ঘর বন্ধ। সবরকম নেটওয়ার্ক বন্ধ। শুধু যন্ত্রটির ধূসর একটি আলো জ্বলছে। সেখানে একটি দেশের গোপন আলোচনা কক্ষ দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন লোক। এবার তাদের আলোচনা কানে আসছে। একজন পরিবেশবিদ, তিনি বলছেন পৃথিবীর জনসংখ্যা কমাতে হবে। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে খুব দ্রুত। দু তিন বছরের জন্য পৃথিবীরকে শ্লথ করতে হবে। খুব তর্ক হচ্ছে। একটি দেশ গোপনে জীবাণু অস্ত্র বানিয়েছে, সেটা ভয়ঙ্কর, আরো অনেক দেশ এ নিয়ে গবেষণা করছে। হঠাৎ সব নিথর হয়ে গেলো। একটি বিস্ফোরণের ছবি, কোনো এক দেশের ল্যাবরোটারীতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তারপর কিছু কিছু স্লাইড সরে সরে গেলো। আবার একটি কনফারেন্স হল। একটি টিম বসে আছে। সকলের মুখে মুখোশের মতো মাস্ক। তাদের অন্তরঙ্গ কথাবার্তা অটোম্যাটিক ভাবে ট্রেনসলেট হয়ে শ্যাম, অঙ্গদ আর মিঃ শ্বেতবাহনের কানে পৌঁছে যাচ্ছে। খুব শীতল স্পষ্ট উচ্চারণ। পৃথিবীর কয়েকটি দেশে  দ্রুত কমাতে হবে জনসংখ্যা আর কার্বন নিঃসরণ, না হলে পরিবেশ উষ্ণায়ন এমন হবে যে সামুদ্রিক জলস্তর আচমকা বৃদ্ধি পেয়ে ডুবে যাবে সেসময়ের কয়েকটি বড় বড় শহর একবছরের মধ্যেই । তাদের কথাবার্তায় মনে হলো পরিকল্পনা করে একটি মারাত্মক ভাইরাসকে পৃথিবীর বুকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তারপরই আবার দৃশ্যান্তর, হাজার হাজার কফিন। মানুষ মারা যাচ্ছে।

যানবাহন সব বন্ধ। পৃথিবীর বড় বড় শহর গুলো শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। 



 না এসবের মধ্যে ব্রজকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। পেনডেমিকের কারণ সম্পর্কে কিছু অনুমান হলো মাত্র। তা জেনে কী হবে। পেনডেমিক আরোও এসেছে তারপর পৃথিবীর বুকে। 

কিন্তু অঙ্গদ আজকে ডিটারমাইন্ড, তার নিজের ওপর কি করা হয়েছিল বের করতে হবে। আবার ঝিলমারিকে ফর্মুলায় বসিয়ে, ব্রজ নামটি ফর্মুলায় ইনপুট করে একঘন্টার জটিলতম ক্যালকুলেশন চলতে লাগল, কেউ মন বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না, দ্রুত হাত চলছে স্ক্রিনের ওপর। বহুদিন ধরে নিতাইস্যার অংক থেকে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে তিনি এগুলো চেনেন। পাওয়া গেল। একটি ছেলে একা বসে আছে ঝিলমারিতে গাছের নিচে পাথরের ওপর। অংক কষছে। স্ক্রিনে যেটা দেখাচ্ছে সেটা হলো তার গায়ে অসংখ্য জালের মতো কী যেন। এগুলো কি কোনো বিশেষ ওয়েভ? এবার আলাপচারিতা। হ্যাঁ তারা পৃথিবীর কেউ নয়। পৃথিবীর বাইরের মানুষ,  পৃথিবীর ভেতরের প্রায় সব মানুষকে জৈব অস্ত্র দিয়ে মারতে চায়। যাতে পৃথিবীটা তেমনি থাকে, শুধু মানুষগুলো চলে যায়। কারণ তাদের গ্রহ নষ্ট হয়ে গেছে, পরিবেশদূষণের ফলে। দুটো উল্কা পিণ্ডের গতিপথ ঘুরিয়ে পৃথিবীর দিকে তাক করেছে। একাজে তারা একটি জীবন্ত ক্যালকুলেটর হিসেবে ব্যবহার করছে ব্রজ নামের একটি মেধাবী কিশোরকে। তারপরই কাট হয়ে গেলো সব। আবার শুরু। না ব্রজকে কেউ কিডন্যাপ করেছে। এখন তাকে একবার দেখা গেলো। শান্ত সৌম্য মুখ। সারা শরীর ঘিরে একটি আলো। যেন কেউ আর ছুঁতে পারবে না তাকে। সব বুঝে গেলো অঙ্গদ। আর লাগবে না কিছু। বাকি সব জানা হিস্ট্রি। 

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। যেন শত বছরের কৌতূহল মিটল আজ।

প্রশান্ত মুখে হাত পা ছড়িয়ে তারা শুয়ে পড়ল অঙ্গদের বৃক্ষবাড়ির লনে। তারাভরা আকাশ,  একই রকম যুগ যুগ ধরে। 



ক্লারা, সহদেব, রবিনহুড, বসুন্ধরা, অঙ্গদ, শ্যাম আর মিঃ শ্বেতবাহন,  একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন শহরে থাকে বটে, তবে এই পৃথিবী এখন তাদের কাছে অন্যরকম।

এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ডের সমস্যাগুলো অঙ্গদ তুড়ি মেরে সলভ করে দেয়। নতুন পৃথিবী বানাচ্ছে তারা। তবে এতো তাড়া কীসের। এই পৃথিবীর বুকে কি গ্রহ নক্ষত্রের অভাব আছে?

ক্লারা সুর দেয়, বসুন্ধরা গায়, রোগীকে সুস্থ করতে মেডিকেল থ্যারাপির জুড়ি নেই, টিনটিন এখন এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। মিঃ শ্বেতবাহন ভাবছেন নতুন করে অংক শেখার কথা। শ্যাম এবারেও রাইটার। তার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। 

রবীনহুড বরাবরই মুখচোরা। সে নীরবে সকলকে দেখে। তার কাজ পৃথিবী জোরা একটি রাস্তা বানানো। এই রাস্তা বানাতে বানাতে তার সমস্ত স্বপ্নগুলোকে তুলে দেয় প্ল্যানিং মাস্টার অঙ্গদের কাছে, তারপর  নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে ভাবতে থাকে, বন্ধুদের নিয়ে বেঁচে থাকার মতো এতো আনন্দ আর কোথাও নেই।