ঝিলমারির কাণ্ড কারখানা

কিশোর উপন্যাস 





উৎসর্গ


অদ্রিতা, সুজাতা, শুভশ্রী, সুকন্যা এবং সুবর্ণরেখাকে 





চিরশ্রী দেবনাথ


ঝিলমারি 'র কাণ্ডকারখানা  





পাহাড়ের সারি তিনদিকে, একদিকে সুন্দর একটি নদী। নদীর নাম চিত্রা , শহরের নাম ঝিলমারি। রেলস্টেশনের নাম জানা কথাই ঝিলমারি  স্টেশন।  পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে রেলপথ চলে গেছে। পাহাড়ি জায়গা। ছোট ছোট বাড়ি। ইট, কাঠ মিশিয়ে। বাঁশের বাড়িও আছে। তবুও এটা শহর। কারণ এখানকার লোকদের বেশ দেখনাই আছে। শহরে কলেজ আছে, অফিস, কোর্ট, খেলার মাঠ, টাউন হল, কেকের দোকান, রেস্টুরেন্ট, পার্ক অনেককিছুই আছে। শহর ছাড়িয়ে একটু গেলেই গ্রাম, খামার বাড়ি, শাক সব্জির ক্ষেত, ধান গমের সবুজ প্রান্তর।  লোকজন ভালো। শহরের পরিচিত চোর গুণ্ডারাও ভালো। একটু আধটু দুষ্টুমি ছাড়া তাদের আর কোন খারাপ গুণ নেই। পুলিশরাও তাদের চেনে।

কোচিং ক্লাস থেকে ফিরছে রিমঝিম, কবির, নিশা, ব্রজ, যীশু, টিনটিন  । আজ অনেকেই আসে নি। হোলির পরের দিন। রঙ খেলার রেশ কাটেনি কোনদিন। 

রিমঝিম তারা বেশ বড়লোক। দুটো কুকুর আছে তাদের। এজন্যই রিমঝিমকে বড়লোক মনে হয় ব্রজ 'র। কারণ সে একদিন রিমঝিমের বাড়িতে গিয়েছিল। তখন দেখেছে বড় বড় দুটো চিনেমাটির বাটিতে দুধ খাচ্ছে দুটো কুকুর। কুকুরকে দুধ খেতে দেখতে পাওয়া ব্রজের কাছে খুব আশ্চর্যজনক কিছু। মায়ের দুধ তিন চার বছর পর্যন্ত খাওয়ার পর সে কোনদিন আজপর্যন্ত গ্লাসে করে দুধ খায়নি।

ব্রজর বাবা ইটভাট্টায় ছোটখাটো কাজ করে । তিনজন ভাইবোন তারা। কোচিং এর অংক স্যার নিতাইবাবু ওকে বিনে পয়সাতেই পড়ান। কারণ ব্রজ খুব ভালো অংক বোঝে। নিতাই বাবুর ধারণা ব্রজের মতো এতো ভালো অংক বোঝা ছেলে পৃথিবীতে ভুল করে মাঝে মাঝে আসে।

ব্রজ অবশ্য এসব কিছুই পাত্তা দেয় না। 

যেকোন অংকই তার কাছে খুব সহজ মনে হয়, তার মাথায় এসব যেন আগে থেকেই সেট করা। প্রতিভা বা জিনিয়াস জিনিসটা আসলে কি? সে তো জানে তার খুব খিদে পায়, তখন খুব ভালো ভালো খাবার কল্পনা করে খেতে হয় ফ্যান সহ ভাত, কখনো সব্জি বা ডাল সেদ্ধ।

কালে ভদ্রে ছোট্ট এক পিস মাছ। কখনো কখনো দেশি মুরগির মাংস আর এক টুকরো বড় আলু এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্বাদের খাবার তার জন্য। ব্রজ চায় তার খুব টাকা পয়সা হোক। সে চায় পৃথিবীটা জয় করতে। এরোপ্লেনে চড়ে সব দেশ ঘুরে বেড়াতে।

ঝিলমারির ছোট্ট শহরে কোনোমতে বেঁচে থাকার মধ্যে তার কোনো আনন্দ নেই।

রিমঝিম ওরা কী গল্প করে কে জানে। টি ভি সিরিয়েলের ভুয়ো গল্প। হঠাৎ ব্রজের মাথাটা চিলিক দিয়ে উঠল। এই রে এখনি তাকে অংকে পেলো। ব্রজের মনে হয় তার মাথায় কেউ যেন সিগনাল পাঠায়, আর তাকে তখন অংক করতে হয়। এটা মাস খানেক ধরে হচ্ছে। কাউকে বললে কি বিশ্বাস করবে? তখন তাকে খাতা কলম বের করে  বাধ্য হয়ে বসে পড়তে হয়। অসংখ্য যোগ আর বিয়োগ শুধু, একটি গ্রাফ আঁকা শুরু হয়ে যায় যেন নিজে থেকেই তার হাত দিয়ে । মাঝে মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাম সেই গ্রাফের পয়েন্ট গুলোর মধ্যে ভাসতে থাকে। নাহ্ কাল নিতাই স্যার কে বলতেই হবে সব। 


রিমঝিম ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। কী সুন্দর লাগছে এই ঝিলমারি শহরটাকে। তাদের বাড়িটি দোতালা, তারপর সিঁড়ি আছে, আর একটি ছাদ বারান্দা, অনেকটা তিনতলার মতো। চারদিকে রেলিং, বসার জায়গা। রিমঝিমের বাবা আকাশ দেখতে ভালোবাসেন, তাই তিনি শখ করে এইভাবে বানিয়েছেন। এখানে বসে খোলা আকাশ আর চারপাশের দৃশ্যগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে। এখন সন্ধ্যে সাতটা হবে। আর একটু পড়ে রিমঝিম পড়তে বসবে। কিছু দূরের ইটভাট্টা থেকে বড় বড় লোহার নল থেকে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আগুনে ঝলসে যাচ্ছে ইট। ব্রজ র বাবা সেখানে কাজ করে। ব্রজ অংকে খুব ভালো। ওকে সবাই জিনিয়াস ডাকে। রিমঝিম অংক পারে না। তার প্রিয় বিষয় ইংরেজি। সে ইংরেজি গল্পের বই পড়তে পড়তে নিজেকে ব্রিটিশ ভাবে কখনো কখনো। তার ইচ্ছে করে ইউরোপের বরফাচ্ছিদত প্রান্তরে একটি মজবুত গাড়ি করে ঘুরে বেড়াতে। তার চুলগুলো হবে সোনালি সিল্কের মতো নরম, গর্জিয়াস। একমনে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল রিমঝিম। হঠাৎই মনে হলো একটি খুব তীব্র নীল আলো যেন  ওদের ঝিলমারির ওপর সার্চ লাইটের মতো ঘুরে গেলো। খুব সামান্য সময়ের জন্য। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই শেষ।



কবিরের বাবা ডাক্তার। ক্লাস এইটে পড়া কবির মনোযোগ দিয়ে টিভির খবর শুনছিল। মাথায় গিজগিজ করছে প্রোফেসর শঙ্কু সমগ্রের গল্পগুলো। টিভি দেখা আর অজস্র গল্পের বই পড়ার ফাঁকে যে সামান্য সময় পাওয়া যায় তারই অবসরে সে একটু স্কুলের বই পড়ে। সেই যে ছোট্ট একটি বলের মতো জিনিস প্রোফেসর শঙ্কু কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, যা ছিল আসলে জীবাণুদের গ্রহ, উঃ কি মারাত্মক চিন্তা, ভাবা যায়! পৃথিবীর বুকে ভিন গ্রহের কেউ যদি সত্যিই এমন একটি গ্রহ ফেলে দেয় বা একবাক্স জীবাণু, কি হবে তাদের। খবরে দেখাচ্ছিল চীনে দিন দিন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। ডিসেম্বর থেকে এই অজানা ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে চীনের বাণিজ্য নগরীতে। তাদের ঝিলমারি থেকে চীন কতদূরে? ভয় লাগছে ভীষণ। তারাও কি মরে যাবে?

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে ঢুকলো কবির। সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন পশু বাজার দেখাচ্ছে। রাশি রাশি মৃত পশু ঝোলানো। চামড়া নেই কোনো কোনোটির। কী বীভৎস লাগছে । টি ভি বন্ধ করে কবির বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বাবা আসছে। ঝিলমারি সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার তিনি। আসার সময় হেঁটে হেঁটে আসেন। এটাই নাকি ওনার এক্সারসাইজ। এইসময় ঝিলমারির মুক্ত হাওয়া শ্বাসে টেনে নিতে তার খুব ভালো লাগে। কবিরদের বাড়ির সামনে ছোট্ট লন। মাঝখানে রাবিশ দিয়ে রাস্তা। তারপর তাদের একতলা সাদা রঙের বাড়ি। ওর বাবা হেসে বললেন, কি ইয়ং মাস্টার, কেমন কাটল আজকের দিন। বাবা বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কবির কথা বলতে শুরু করে। আজ মাথায় ভাইরাস গিজ গিজ করছে। কবিরের বাবা হাত মুখ ধুতে ধুতে, খেতে খেতে কবিরের সব কথা মন দিয়ে শোনেন। আজও শুনছেন। ভাইরাসের কথা জিজ্ঞেস করতেই, কবিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাদের খুব সাবধান হতে হবে। হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যে বদলে যাবে পৃথিবী। 



গভীর রাত। নেশার ঘোরে ব্রজ বেরিয়ে এসেছে তাদের কলোনি থেকে। চাঁদনি রাত। হাওয়া বইছে। ঝিলমারি শহর যেন চাঁদের মেয়ে। একটি উঁচু পাথর আছে বুড়ো গাছতলায়। সেখানে এসে বসেছে সে। হাতে খাতা কলম। নির্বিচারে হিসেব কষছে। একসময় সব লেখা মুছে গেলো, নিচে ভেসে উঠল, দ্য আর্থ উইল বি ফিনিশড । 

অংক শেষ হলো। ভূতে পাওয়া মানুষের মতো ব্রজ আবার ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। 


প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে টেকটোনিক প্লেট গুলো সরে সরে যাচ্ছে। যদিও এই সরে যাওয়া খুব ধীর গতিতে ঘটছে। সাধারণ মানুষদের বোধগম্যের বাইরে এইসব ভৌগলিক বিবর্তন। কিন্তু ভূবিজ্ঞানীরা খবর রাখেন। পৃথিবীর প্রতিটি কম্পন তাদের গবেষণার বিষয়। একটি বিশাল ভূমিকম্প পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে একটি দেশ, অথবা জন্ম দিতে পারে নতুন একটি দেশের।

সবসময় এইসব খবর দেখতে দেখতে আজকাল কবির টের পাচ্ছে সে কেমন বদলে যাচ্ছে। কাল রাতে স্বপ্ন দেখলো, একটি রাসায়নিক বিস্ফোরণ ঘটেছে পুরো পৃথিবীতে, সব মানুষ গাছ হয়ে যাচ্ছে। তার মাথা থেকেও বেরুচ্ছে কচি কচি পাতা। ধরমরিয়ে উঠে দেখল, অথচ সে তার ঘরেই নিশ্চিন্ত মনে শুয়েছিল। কী কাণ্ড!


নিশা, ব্রজের বন্ধু, কারণ নিশার বাড়ি ব্রজদের বাড়ির খুব কাছে। নিশার মা নেই। বাবা একটি রেস্টুরেন্ট চালায়। এগরোল, লুচি,  ঘুঘনি,  চপ এবং চা কফি। দোকানে দুজন কর্মচারি আছে, নিশাও বাবাকে সাহায্য করে, ক্যাশে বসে। ব্রজদের কলোনির লোকেরা এখানে এসে চা খায়, আড্ডা দেয়। ব্রজ মাঝে মধ্যে আসে। নিশা তাকে খাবার খাওয়াতে চায়। ব্রজ খুব ইতস্তত করে খায়। তার কাছে টাকা থাকে না। আর নিশার বাবা হিসেবি খুব। তবু বলে খাও ব্রজ খাও। আজকাল ব্রজের চেহারা উদভ্রান্তের মতো। সে পাগল হয়ে যাচ্ছে যেন। অংক তাকে খেয়ে ফেলছে। গুঁড়ো গুঁড়ো পোকার মতো তার সারা শরীরে কিলবিল করছে ডিজিট আর ডিজিট।


নিশা বলল, কি রে তোর কি হয়েছে। পুরি খা। নাহ্। 

জানিস পৃথিবীর খুব বিপদ। নিশা অবাক হয়ে বলে, কি বিপদ। ব্রজ বলে, পৃথিবী থেকে মানুষ হারিয়ে যাবে আর কিছুদিনের মধ্যে। কোথাও অংক কষা হচ্ছে। অন্য গ্রহে, অন্য কোনোখানে। নিশা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ব্রজের দিকে। ব্রজ বিড়বিড় করতে করতে চলে যায়।


দুজন হারিয়ে গেলো ঝিলমারি থেকে। ব্রজ এবং কবির। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও তাদের। আজ একমাস হলো। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এক অজানা ভাইরাস, সংক্রমিত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। বড় বড় সিটি গুলোতে সব লক ডাউন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে প্লেগ রোগ ছড়িয়েছিল সারা পৃথিবীতে, এর মতোই এই রোগটিও। ইতি মধ্যেই কয়েক লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে মৃত্যু সংখ্যা।

ব্রজ ওরা তিন ভাইবোন। এক ছেলে হারিয়েছে। গরিবের সংসার। খিদের বোঝা টানতে গিয়ে ছেলের কথাও ভুলে যাচ্ছেন ব্রজের বাবা। মা শুধু রাত বাড়লে শ্রান্ত মুখে ব্রজের ফেলে রাখা খাতা পত্তর গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিছুই বোঝেন না তিনি। খাতার পর খাতা জুড়ে শুধু শত শত সংখ্যা।

কবিরের মা স্তব্ধ হয়ে গেছেন। কবিরের বাবা ঝিলমারিকে নিয়ে ব্যস্ত। নতুন হাসপাতাল হয়েছে, কোভিড- ১৯ রোগীদের রাখার জন্য। দিন রাত কাজ আর কাজ। কয়েকঘন্টা আগে একটি খবর শুনেছেন, নিতাই মাস্টার, যার কাছে কবির ওরা পড়ত, তাকেও কাল রাত থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ডাক্তারি পেশার এই হলো চ্যালেঞ্জ। তিনি সৌভাগ্যবান একটি পেনডেমিকের সঙ্গে যুদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছেন, শুধু বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে ছেলেটার জন্য। পুলিশ তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে, খুঁজে যাচ্ছে, লোকাল টিভি চ্যানেল থেকে শুরু করে ন্যাশনাল টিভি চ্যানেল, পত্রপত্রিকা কোনো কিছুই বাদ রাখেননি তিনি। 

শুধু মন বলছে  কবির,  ব্রজ, নিতাই মাস্টার কারো তেমন কিছু বিপদ হয়নি, নিঁখোজ হয়েছে শুধু । এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা যোগ রয়েছে, নিবিড় যোগ ।

হঠাৎ তার মোবাইল বেজে উঠল, ফোনটা ধরতেই একটি মিষ্টি গলা, এই গলাটাকে চেনেন তিনি। কবিরদের সঙ্গে পড়ে মেয়েটি। নাম তার রিমঝিম। স্কুল বন্ধ। অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে সব। আরো কয়েকবার মেয়েটি ফোন করে তার কাছে কবিরের কথা জানতে চেয়েছে। আজ কোন ভূমিকা না করে মেয়েটি বলল, কাকু একদিন হঠাৎ রাতের আকাশ থেকে জোরালো একটি নীল আলো কে আমি সার্চ লাইটের মতো ঝিলমারির ওপর ঘুরে বেড়াতে দেখেছিলাম। খুব অল্প সময়ের জন্য। কেন যেন মনে হচ্ছে এটা কোনো একটা রহস্য। এই নীল আলোটির সঙ্গে কবিরদের হারিয়ে যাওয়ার একটি মিল রয়েছে। রিমঝিম বলছে, আমি ওদের খুঁজে বের করবো, দেখবেন কাকু। কবিরের বাবা আঁতকে উঠলেন। না না। তুমিও হারিয়ে যাবে তাহলে। এসব যা করার পুলিশের গোয়েন্দারাই করবে। তুমি কিছু করতে যেও না। রিমঝিম বলল, এভাবে হবে না কাকু। ওরা কোনো সহজ জায়গায় হারিয়ে যায়নি। ওদেরকে দিয়ে কোনো কাজ করানো হচ্ছে। ব্রজ কয়েকমাস ধরে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। ওর এই পাগলামো খুব আশ্চর্যজনক কিছু। এপর্যন্ত বলে রিমঝিম ফোন রেখে দিল। রিমঝিমের বাবার ফোন নং ছিল কবিরের বাবা ডঃ অতনু ঘোষের কাছে। তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে রিমঝিমের বাবাকে বললেন, মেয়ের ওপর নজর রাখতে।

একজন বাবা হয়ে আর একজন বাবাকে সাবধান করলেন। আপাতত ওনার ডিউটি শেষ। কিন্তু তিনি হাসপাতালের বিশেষ কোয়ার্টারে থাকবেন। বাড়ি যাওয়া নিষেধ তার, কোভিড হাসপাতালে আছেন তিনি। নিজের রুমে ঢুকে স্নান টান করে  মোবাইলটা খুললেন। একটি হোয়াটস্ এপ মেসেজ। রিমঝিম করেছে, ওনাকে এড করেছে একটি গ্রুপে। কবিরদের স্কুলের আরো কয়েকজন আছে সেখানে। কেউ বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে না। বাড়িতে বসে তারা কীভাবে খোঁজ করবে, সেটাই তিনি বুঝতে পারছিলেন না! পড়ে বাকিদেরও বিপদ হতে পারে। কী যে হচ্ছে সব! 



অপূর্ব সুন্দর একটি জায়গা। পৃথিবীর মধ্যে, কিন্তু পৃথিবীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। দূর দূর পর্যন্ত তারা ঘুরে দেখেছে কোথাও  মানুষ নেই। শুধু কিছু বন্যপ্রানী আছে, তাও পৃথিবীর মতো দেখতে নয়, কিছু অমিল রয়েছে। তারা সবাই একটি  বিশাল হলের মতো গুহায় থাকে। সবকিছু প্রাকৃতিক হলেও, অত্যাধুনিক কিছু যন্ত্রপাতি রয়েছে। যেগুলো এখানকার জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। 

ব্রজ অংকের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে।


তাকে মাধ্যম করে নাকি অন্য গ্রহের জীবরা কিছু একটা করতে চাইছিল, ব্রজকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছে অন্য একদল বিজ্ঞানী, তাকে সহজভাবে তাই বোঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে সে খুব মূল্যবান কেউ। তার মধ্যে রয়েছে অসীম সম্ভাবনাময় মেধা। 


তবে মুক্তি কথাটিও ঠিক নয়। এখনও ব্রজ অংক করছে। 

এসব হলো ভালো অংক, এটা ব্রজ করতে বসেই বুঝতে পেরেছে, কারণ এগুলো থেকে ব্রেনে কোন কষ্ট হয় না।

আনন্দ হয়। 

তাকে অজস্র প্রবলেম দেওয়া হয়েছে। বিশাল একটা স্ক্রিন। সেখানে সে এই প্রবলেম গুলো সলভ্ করছে। তার নিজের মতো করে। মাঝে মাঝেই  চিৎকার করে উঠছে। নেচে নিচ্ছে। ব্রজ, কবির,  ওদের নতুন গোঁফ গজানো শুরু হয়েছে। লম্বা হয়ে গেছে অনেকটাই। একজন অতিবৃদ্ধ কিন্তু শক্তপোক্ত লোক মাঝে মধ্যে তাদের কাছে আসেন। এসে একটি মাইক্রোফোনের মাধ্যমে কথা বলেন। খুব সুন্দর ইংরেজিতে সেগুলো ধ্বনিত হতে থাকে। তিনি নানান রকম আশার কথা বলেন সবসময়। তারমধ্যে মোদ্দা কথা হলো, পৃথিবীর খুব বিপদ। সেখানে ঝিলমারি নামের শহরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় আছে। এখান থেকে পৃথিবীকে বাঁচানো সম্ভব। বর্তমানে পৃথিবীতে পেনডেমিক চলছে। এই পেনডেমিকে অনেক অনেক মানুষ মারা যাবে। কিন্তু একসময় পৃথিবীর অসুখ হয়তো সারবে। কিন্তু পৃথিবীর ওপর আঘাত হানা হবে। বাইরের পৃথিবী থেকে। সেই আঘাত সারাবার ব্যবস্থা করতেই এই আয়োজন। এইজন্য কয়েকজন বিশ্বস্ত আর খুব মেধাবী এবং কল্পনাপ্রবণ  মানুষ শুধু দরকার। যারা এসব নিয়ে গবেষণা করবে। কিন্তু এর ফল পেতে অনেক অনেক দেরি হবে। ইত্যাদি । ব্রজর এসব নিয়ে কোন দরকার নেই। সে প্রাণের খুশিতে আছে। যে খাবারের কথা সে মনে মনে ভাবে, কোনো এক আশ্চর্য উপায়ে লাঞ্চে সেই খাবার উপস্থিত হয়, কিন্তু বাকি খাবার ওদের ইচ্ছেমত খেতে হয়। এমন কী সঙ্গে আছে নানান এক্সারসাইজ আর ধ্যান।


কিছুদিন হলো নিতাইবাবু, তাদের পাড়ার অংক স্যার এখানে এসেছেন। নিতাই স্যার তিন চার দিন গুম হয়ে বসেছিলেন। খাবারও খেতেন না। তারপর একসকালে উঠে গুহার বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলেন। হঠাৎ আনন্দে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রায় ছুটে এসে ব্রজ ও কবিরকে জড়িয়ে ধরে বললেন, কী সুন্দর জায়গা রে! কাছেই একটা নদী দেখে দারুণ খুশি। আলোর মতো জল,  স্বচ্ছ। নিচে পাথর কুচি, ছোট ছোট মাছ। 

কিন্তু আমার বউ ছেলেমেয়েদের কি হবে। আমি তো প্রাইভেট টিউশনি করি শুধু। কি করে খাবে তারা।

সে কথাও টের পেয়ে গেলেন কেমন করে যেন বৃদ্ধ মানুষটি। গুহার এক কোণায় একটি ছোট্ট স্ক্রিন আছে, সেই ব়ৃদ্ধ নির্দিষ্ট পাস ওয়ার্ড দিয়ে সেটা খুলে ওদেরকে পৃথিবী দেখান।   নিতাইবাবুর বউ আর ছেলেকেও দেখালেন। তাকে নিশ্চিন্ত করলেন, তাদের কখনো খাওয়ার অভাব হবে না। কবির আর ব্রজ আজকাল বায়না করছে, ওদের বাড়িতে অন্তত  যেন ভালো থাকার খবরটুকু পাঠানো হয়। It has done, বলে সেই মানুষটি গম্ভীর হয়ে চলে গেলেন।

আজকে তারা সবাই খুব উত্তেজিত। কারণ সকাল বেলা একটি মেসেজ এসেছে, টাইমমেশিনে ভ্রমণ করানো হবে তাদের। 

এই হল ঘরটির মেঝে পাথরের। দেয়াল পাথরের, সবুজ গুল্ম লতা নেমে এসেছে দেয়াল বেয়ে। পাশে স্নান ঘর। বিশাল। ঝর্ণায় স্নান করতে হবে। কৃত্রিম ঝর্ণা না প্রাকৃতিক ঝর্ণা কিছুই জানে না ওরা। ইনফ্যাক্ট জায়গাটি কোথায় তাও ঠিক করে জানে না তারা। সবাই মিলে শুধু মজা লুটছে এই আপাত আরাম আয়েসের। কুসুম কুসুম গরম জল ঝর্ণার। তাতেই স্নান হলো সবার। মাঝখানে জলাধারও রয়েছে। ইচ্ছে হলে সেখানেও করা যায় স্নান।

খাবার এলো। ধবধবে সাদা ভাত। শাক সব্জী সেদ্ধ, ডিমের ওমলেট, মাংসের স্যুপ,  ফলমূল আর দুধ। 

ঘরের মধ্যে মাইক্রোফোনিক আওয়াজ এলো, বাইরে চলে আসুন।

উত্তেজনায় ব্রজ দৌড়ে গেলো সবার আগে। একটি স্বচ্ছ সবুজ রঙের এরোপ্লেনের মতো দেখতে মোটরগাড়ি। বেশ উঁচু, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হলো। উঠে বসার সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে গেলো দরজা। বসার সঙ্গে সঙ্গে সিটবেল্ট জড়িয়ে ধরল তাদের। একটা প্রবল ঝাঁকুনি লাগল, কিছুক্ষণের জন্য সব অন্ধকার হয়ে গেলো। তারপর তাকিয়ে দেখলো চারদিকে ধূ ধূ বালি। অনেক দূরে ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। আকাশ নির্মল। জলো বাতাস বইছে। একটু তাকাতেই বোঝা গেলো, একটি নদী বইছে, অজস্র ছোট বড়  নৌকো নদীতে। পতপত করে উড়ছে নানা রঙ এর পতাকা, তারা তিনজন হাঁটতে লাগল। নদীটির তীর ঘেঁসে। মনে হচ্ছে এটা একটা নদী বন্দর, এখানে ব্যবসা বাণিজ্য হয়। আরো একটু এগোলে দেখা গেল, বড় বড় গাছের গুঁড়ি। কাঠ কাটা হচ্ছে, তৈরী হচ্ছে নানান জিনিস, অস্ত্র সস্ত্র, বানানো হচ্ছে বাসন কোসন। একটি বড় বাজার। পন্য কেনা বেচা চলছে। ব্রজ, কবির আর নিতাইবাবু ভাবলেন আর যাওয়া ঠিক হবে না। তারা কিছু চেনেন না জানেন না। অমনি কানের কাছে ফিসফিস, যেমন খুশি ঘোরো। তোমাদের কেউ দেখছে না। ষোলশ শতাব্দীতে গিয়েছো তোমরা। আজ ছুটি তোমাদের। কবির মুগ্ধ বিস্ময়ে বাজারে ঘুরছে। এটা কোন জায়গা কে জানে। একজায়গায় কিছু মানুষকে জড়ো করে রাখা হয়েছে। বিক্রি করা হচ্ছে তাদেরও।  কবির একটু দাঁড়িয়ে মানুষ বিক্রি করা দেখলো।

দুজন লোক এলো, দুটো মানুষ কিনে নিয়ে গেলো। তারা ঘোড়ার পিঠে করে এসেছিল। পেছনে বসিয়ে লোক দুটোকে নিয়ে গেলো। সেই সময় দুটো মহিলা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। মনে হলো তাদের আপনজন কেউ। লোক দুটো হাত নেড়ে নেড়ে চলে যাচ্ছে। কবিরের ভালো লাগছে না কিছু। এখানকার লোকজন খুব বাজে। সব জায়গায় শুধু কাটা গাছ ছড়ানো। যেন গাছেদের ডেডবডি। 

 কাছেই বোধ  হয় গভীর বন আছে। সেখান থেকে শত শত গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে নির্বিচারে। এর ফল ভুগবে তারা। জায়গাটা নদীর কিনারায়। খুব জল নদীটিতে, কিন্ত নদীটির নাব্যতা কমে গেছে, অদূর ভবিষ্যতেই নদীটি শুকিয়ে যাবে। তখন এই বিশাল জনপদ ভীষণ বিপদের মুখে পড়বে। ব্রজ একমনে একটি খাবারের দোকান দেখছে। সেখানে নানানরকম মিঠাই বিক্রি হচ্ছে। বড় বড় চুলা। লোহার কড়াই। তামাটে রঙের একজন বলশালী মানুষ বড় বড় হাতা দিয়ে মিঠাই তৈরি করছে। ব্রজ খেতে চাইলো। সঙ্গে সঙ্গে কানের কাছে ফিসফিস এলো কেউ কিছু খেতে পারবে না।  

খিদে পেলে সহ্য করো।

ব্রজ নিরাশ হলো। বেচারা নিতাই বাবু হাঁ হয়ে দোকান মালিকের হিসেব নিকেশ শুনছিলেন। কী সব সংখ্যা। হঠাৎ খুব ঝড় উঠলো। নদীর ওপর থেকে ঘূর্ণির মতো বাতাস ধেয়ে আসতে লাগলো জনপদটির দিকে। তারা কী করবে বোঝার আগেই, চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলো। প্রবল ঝাঁকুনি লাগলো। চোখ খুলে দেখল, তাদের হল ঘরের সামনের সেই প্রান্তরে ওরা দাঁড়িয়ে আছে।

ব্রজ ঝটপট ঘরে ঢুকে স্ক্রিনের সামনে গিয়ে অংক কষা আরম্ভ করলো। ওর খিদের কথা আর মনে নেই। কবির বসলো প্রোগ্রাম বানাতে। নিতাইবাবু গম্ভীর মুখে বসে রইলেন। গভীর চিন্তায় মগ্ন। 



ডঃ অতনু আর এতো চিন্তিত নন, ছেলে মেয়েদের নিয়ে। তিনি বুঝতে পেরেছেন ওরা ভালো আছে। কোনো একটা বিশেষ কাজে তাদের নেওয়া হয়েছে।

তিনি চান কোভিড এর ভ্যাকসিন খুব তাড়াতাড়ি আবিস্কার হোক। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালাচ্ছেন। পৃথিবী সব কিছু নিয়ে একটি গভীর লড়াইয়ের মধ্যে দিকে যাচ্ছে। একদিকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত আমাজনের অরণ্যে মানুষের সৃষ্ট দাবানল। এ কোথায় যাচ্ছে পৃথিবী। ভূ গর্ভের প্লেট সরে যাচ্ছে ধীর গতিতে। বড় বিপদ আশংকা করছেন ভূবিজ্ঞানীরা।

নাহ্ এই পৃথিবীর কি তবে দিন শেষ। কয়েক শো বছর পর পর ধ্বংস আসে। পৃথিবীর বুকে কি তাই আসতে চলেছে?


আজ ঝিলমারিতে পাঁচজন মারা গেছেন। মধ্যবয়সী লোক। মুম্বাই এবং দিল্লী থেকে এসেছিলেন তারা । বাঁচানো যায়নি। অনেক চেষ্টা করেছেন তিনি।

চাই ভ্যাকসিন, ভ্যাকসিন এবং ভ্যাকসিন।


তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তার স্ত্রী বাড়িতে একজন কাজের লোকের সঙ্গে আছেন, কবির কোথায়, তারা জানেন না। শুধু একটি মেসেজ তিনি পেয়েছেন, সে ভালো আছে, কিন্তু কীভাবে পেয়েছেন এই মেসেজ, কাউকে জানাতে পারবেন না। চীন, আমেরিকা, ইতালি মৃত্যু মিছিল দেখছে, ভারতের দিল্লী, মহারাষ্ট্র, গুজরাট সংক্রমণে সর্ব্বোচ্চ। কী হবে কে জানে।


ব্রজ নিবিষ্ট মনে একটি দীর্ঘ অংক করেছে। তবে সেটা কোনো ডিজিটের অংক নয়। তাকে একটা আশংকা দেওয়া হয়েছিল। ভীমাণু ১ এবং ভীমাণু ২, দুটো বিশাল গ্রহাণু পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়বে দু এক বছরের মধ্যেই। এরকমই নাম দেওয়া হয়েছে তাদের। তারপর পৃথিবীর যে পরিবর্তিত রূপ হবে, সেই পৃথিবীকে কীভাবে সাজাতে হবে তারই প্ল্যান। এখানে পুরো প্ল্যানটাই অনিশ্চিত। তবুও ব্রজ অংকটা তৈরি করছে। একটি চুরান্ত বৈজ্ঞানিক জনপদ তৈরি হবে। তার আগের ক্যালকুলেশেন ওর কম্ম নয়। সেটা কারা করছে জানে না। তবে কবির সুন্দর ছবি আঁকছে। স্বপ্নের মতো। সেগুলো সংরক্ষিত হচ্ছে। নিতাই স্যারকে কেন আনা হয়েছে, এখন পর্যন্ত বোঝা যায়নি। ওনাকে কোন কাজ দেওয়া হয়নি। তিনি শুধু এধার ওধার ঘুরে ডাইরি লিখছেন।

শেষ খবর অনুযায়ী পৃথিবীতে পেনডেমিকে মারা গেছে সাতলক্ষ মানুষ। দু সপ্তাহ পর তাদের আবার টাইমমেশিনে করে বেড়ানো আছে।

অতীতে যে তাদের ঘোরানো হয়েছিল সে বোধহয় আমাদের অপরিনামদর্শিতা দেখানোর জন্য। সামনে কী দেখানো হবে কে জানে। 

এই কদিনের মধ্যে একটিই বাজে কাজ করা হয়েছে তাদেরকে নিয়ে। বেদনাদায়ক কাজ। একজন রোবট ডাক্তার এবং নার্স এসে, বলা কওয়া নেই হঠাৎ এসে তাদের পিঠে একটা সিল দিল। যে সে সিল নয়। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল তিনজনই। একটি নাম্বার বসানো হয়েছে তাদের পিঠে। এক্স রে প্লেট দিয়ে ছবিও ওঠানো হলো সেই ক্ষত পিঠের। আশ্চর্য তো! 


পৃথিবীর অসুখ সহজে সারল না। কোভিড ১৯ এর আঘাতে, অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা ভেঙে যাওয়া পৃথিবীর বুকে হানা দিল পর পর আরোও দু টো পেনডেমিক। একটি প্রবল ভূমিকম্প। হাজার হাজার মাইল ব্যাপী উন্মত্ত সুনামী। পনের বছর কেটে গেছে।

এই গুহা গর্ভটি পৃথিবীর মধ্যেই আর একটি মিনি পৃথিবী। একশ মাইল ব্যাপী এর বিস্তৃতি। পৃথিবীর চারজন শ্রেষ্ঠ ভূতত্ত্ববিদ এই গুহাটি খুঁজে পাওয়ার পর, গোপনে একে নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। এর ভেতর ড্রোন দিয়ে ঢুকেছিলেন গুটিকয় বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, তাদের সঙ্গে ছিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তি জানা কিছু রোবট । প্রথম থেকেই তারা চাইছিলেন ধনী এবং ক্ষমতাবান রাজনৈতিকদের হাত থেকে যেন একে নিরাপদে রাখা যায়। 

এইসমস্ত রোবটদের দ্বারাই তৈরি হয়েছে এখানকার সমস্ত আনুষঙ্গিক। যেমন ল্যাবরোটারি, কিচেন। কোয়াটার্স, লাইব্রেরি, বাথরুম, কনফারেন্স রুম ইত্যাদি। কিন্তু কোনোকিছুই প্রথাগত নিয়মে নয়। পৃথিবীর এই সর্ববৃহৎ গুহাটির রয়েছে নিজস্ব জলবায়ু। তার ভেতর আছে পাথরের গভীর স্তর। জলধারা, এমন কী আস্ত একটি নদী।

সেসব দিয়েই বানানো হয়েছে বাকি সব ব্যবস্থাপনা। এখানে বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে এমন কিছু রোবট, যারা দেখতে গাছের মতো, পাথরের মতো। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যাবে না। অথচ তারা সবকিছু নজর রাখছে। প্রকৃতি সৃষ্ট অসামান্য এই গোপন স্থানের নিরাপত্তা সুনির্দিষ্ট করা খুব জরুরী।

ব্রজ, কবির, নিতাইবাবু পালটে গেছে । তাদের স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। শারীরিক কিছু বৃদ্ধি যেন তাদের আটকে ছিল, সব সম্পূর্ণ হয়েছে এখন। 

ব্রজ গম্ভীর মুখে আজকে মেসেজ পাঠিয়েছে সে তার বাড়ি যেতে চায়। কাকে পাঠিয়েছে ভালো করে জানে না। যেখানে তাদের অসুবিধে গুলো জানাতে হয় সেখানেই বলেছে।

এখনো উত্তর আসেনি।

ঝিলমারি শহরটাকে খুব মিস করছে তারা সবাই। তাদের স্কুল, বাড়ি, মা বাবা, বন্ধুরা।


না ব্রজ সেই অনুমতি পায় নি। কেটে গেছে দীর্ঘ দশবছর। ঘটে গেছে বহু ঘটনা। দুটো গ্রহাণুই পর পর পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছিল। তাতে কয়েকটি দেশের বিশাল অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যার মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন এবং আমেরিকারর হাজার হাজার বর্গমাইল এলাকা।

ঝিলমারি শহরটা বেঁচে আছে। পেনডেমিক উধাও হয়েছে পৃথিবী থেকে। ব্রজ আর বাড়ি যেতে চায় না। মহাকাশে প্রায় সাতাশশো কৃত্রিম স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে চালু হয়েছে ইন্টারনেট ব্যবস্থা। বন জঙ্গল, পাহাড় পর্বত, নদী সমুদ্র সব জায়গাই ওয়ান ওয়েবের মাধ্যমে জুড়ে গেছে। তারা বুঝে গেছে, একটি বৃহত্তর সম্ভাবনার আশায় তারা কাজ করছে। তাদের সবার নকল তৈরি হয়েছে। সেইসব নকল শরীরে তাদের অনুভব গ্রন্থিত। তারাই আপাতত ঝিলমারিতে যার যার ভূমিকা পালন করছে। সেই মেসেজ গুলোও পাচ্ছে তারা।

গুহার  বৃদ্ধ বিজ্ঞানীর বয়স একশ অষ্টআশি। তিনি নিজেই হাসতে হাসতে বলেছেন। স্টেম সেল চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্যে কঠিন রোগ গুলোকে হারিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ সব সুবিধা না পেলেও, মানব সভ্যতার হিতার্থে তারা প্রত্যেকে গিনিপিগের ভূমিকা পালন করছেন। নিজেদের ওপরেই সব প্রয়োগ হচ্ছে।


কবির আবিষ্কার করেছে, বয়সকে ঘুরিয়ে দেওয়ার আশ্চর্য এক কোষ পদ্ধতি। অর্থাৎ যে ভাবে আমাদের দিন দিন বুড়ো হয়ে যাওয়া ঘটে, সেটারই উল্টো ভাব। এতো সহজে নয়। এখনও পরীক্ষাধীন। 


নিতাইবাবুকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিল, তা বলা হয়নি। তাকে দেওয়া হয়েছিল, কিছু জিনিয়াস তৈরির কাজ। কুড়ি জন কিশোরকে পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে আফ্রিকান, চাইনিজ, তুর্কি, রুশ, বাঙালি সবাই আছে। এই ভেঙে যাওয়া পৃথিবীকে মেরামত করতে হবে তাদের দিয়ে। সবকিছু হওয়ার আগে, বেসিক তৈরি করতে হয়। যেমন ব্রজর ভেতরটাকে তিনি তৈরি করেছিলেন। আবার এমন মানুষ হতে হবে যিনি শয়তান নন, নির্লোভ। নাহলে সে সমস্ত মেধাসত্ত্ব চুরি করে হয়ে উঠবে ক্ষমতাধর। ঠেলে দেবে আবার মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে। 


কবির হাঁপিয়ে উঠছে। একটি আনন্দের জীবন থেকে কিসের বেড়াজালে আটকে গেলো সে। 

পরিপূর্ণ একজন যুবকের এই জীবন ভালো লাগার কথা নয়। কীসের জন্য এতো আত্মদান।

সারা জীবন তাকে এই ভাবে বয়ে বেড়াতে হবে। মানুষের সততা কিছুদিন পর আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যায়। তারো হচ্ছে। নিজস্ব কিছু গবেষণা করেছে সে। এভাবেই তার হাতে উঠে এসেছে আশ্চর্য জনক এক তথ্য।

পৃথিবীর ভেতরে কিছু নির্ভুল জায়গা রয়েছে। যেগুলো কখনো ধ্বংস হবে না। সেগুলোর অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, গাণিতিক অবস্থান এমনই মজবুত এবং নিরাপদ যে, সারা পৃথিবী নষ্ট হলেও কয়েকটি ভূখন্ডের মতো তারা জেগে থাকবে। আর এই ভূখন্ডটির নিচেই রয়েছে প্রকৃতির এই  বিশাল গুহা। তেমনই একটি ভূখন্ড হলো ঝিলমারি। পৃথিবীর সেই অত্যাশ্চর্য নির্ভুল জায়গাগুলোর মধ্যে একটি। সেজন্যই এই সাদামাটা জায়গাটিকে কেন্দ্র করে এতো কিছু।

এখানকার লাইব্রেরিতে রয়েছে নানান ডিস্ক। দীর্ঘদিনের গভীর বিশ্বস্ততায় এখন তাদের হাতেই সবকিছু। সেগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতেই আচমকা কিছু হিসেব নজরে আসে তার। একটি ম্যাপ। অবশেষে নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি।

সে অনায়াসে এখন দখল করে নিতে পারে ঝিলমারিকে।

নিতাইস্যারকে হ্যান্ডেল করা কোনো ব্যাপারই না। উনি থাকুন না কেন নিজের মতো। মুশকিল যেই জিনিয়াস গুলো ওনার হাতে অংক শিখছে, তাদের জন্য। তাদেরকে সে কি নিজের আয়ত্তে আনতে পারবে? 

আর একটি বড় ব্যাপার হলো 'ব্রজ'। ব্রজর নিরাসক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে সে কিছু বুঝতে পারে না।

ভাবতে না ভাবতেই ব্রজর ফোন। না হাতে করে মোবাইল ব্যবহার করার সময় তারা পেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। ত্বকের সঙ্গে মিশে আছে এখন মহাজাগতিক মাইক্রো ওয়েভ। আছে নির্দিষ্ট কোড। সেটার মাধ্যমেই বার্তা আসে মনে। তখন ইচ্ছে করলে জোরে বলো না হয় মনে মনে। তবে সাবকনশাস মনটাকে খুব নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় তাদের। সম্ভাবনা কম হলেও মাঝে মাঝে কলিশন হয়। তখন নিজের মনের কথা জেনে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। তাই পৃথিবীর অনেকেই এখনো এই পদ্ধতি ব্যবহার না করে, মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন এখনো। আর এই পদ্ধতি খুব ব্যয়সাধ্যও বটে, পৃথিবীর মানুষের জন্য।

যদিও পৃথিবীর  লোকজন এখন সেই অর্থে গরিব নেই।

চালু হচ্ছে সম্পদের সম বন্টন ব্যবস্থা। বিরাট ধ্বংসের পর মানুষের শিক্ষা হয়। এই স্বর্ণ যুগ শুরু হয়েছে। ঝিলমাারিতে কবিরের ক্লোন একটি ব্যবসা খুলেছে। আইসক্রিমের দোকান। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় সেই আইসক্রিম। কিন্তু দাম বেশি নিতে পারবে না। বাঁধা আছে রেট।

আজকাল কবিরের চোখের তলায় কালো তিল। যেন তাতে হিংসে জমে উঠেছে।  

ব্রজ বলছে, একটু আয় আমার ঘরে। কবির বলল আসছি।

ব্রজ খুব সুদেহী হয়েছে। পাঁচফুট দশ ইঞ্চির লম্বা স্বাস্থ্যবান যুবক। উন্নত চিবুক। দীর্ঘ পেশিবহুল হাত। কবির গুণগুণ করতে করতে ব্রজ 'র ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। 

ব্রজ সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলল। ব্রজর ঘরের ডিজাইন রুবিক কিউবের মতো। ও নিজেই বানিয়েছে এসব ডিজাইন। এগুলো এমনি খোপ নয়। কী আছে কে জানে। ব্রজ'র ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখন সবাই তারা বড়ো। তাদের পড়াশুনো, তাদের বড়ো হওয়া সব অন্যরকম ভাবে হয়েছে। এক একজন এক একটি ইউনিট। তারা ব্যবহৃত হচ্ছে কোন বৃহত্তর স্বার্থে, মাঝে মাঝে আজকাল মনে হচ্ছে দুরন্ত মেধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা খুব পাপ। 

ব্রজর মুখ এখন উল্টোদিকে। খোলা জানালা। বাইরে গমের ক্ষেত। এই গুহার আবহাওয়া মেনে এক একটি শস্যসম্ভার গড়ে তোলা হয়েছে। কবির নরম সোফায় হেলান দিয়ে বসল। ব্রজ তার দিকে তাকাল। সম্প্রতি সবুজ একটি কন্টাক্ট লেন্স সে ব্যবহার করছে। কী জানি কোনো যন্ত্র কিনা। ঘুরতে যাবি?

কোথায়? কবির বলল।

কেন বাইরের পৃথিবীতে। ব্রজ বলল।

তুই ভালো করে জানিস আমাদের ক্লোন গুলো সেখানে। কী করব গিয়ে। কিছু এডজাস্ট হবে না আমার। কেমন ভূমিহীন হয়ে গেছি মনে হয়। 

নিতাই স্যার যেতে চাইছে। তোর মনে দুঃখ আছে তাই বললাম।

আর তুই? ব্রজকে জিজ্ঞেস করল কবির।

নাহ্। আমি এখানেই থাকব। মাঝে মাঝে ঘুরে আসব। আমাকে অনেক কিছু বানাতে হবে।

সে তো আমাকেও হবে, কবির আশ্চর্য হয়ে বলল। 

হ্যাঁ হবে। তবুও।

কি করে যাবি?

এখানে এই একটি ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণ অন্ধ। এই গুহা থেকে বেরোবার কোনো পথ আমাদের কোনোদিন বলা হয়নি। এমনকি এই ব্যাপারে কোনো চিন্তাশক্তি কাজে আসে না।

এটাও কি চক্রান্ত?

ব্রজ বলল, আমি পথ খুঁজে বের করেছি।

কবির ভাবছিল, সেও এরকম একটি পথ আবছামতো পেয়েছিল, যখন ঝিলমারির নির্ভূল অবস্থান সে বের করতে পেরেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত হারিয়ে গেছে সূত্র। পরে আর চেষ্টা করেনি কখনো। 

এখনই চল।

বলে সোজা তাকিয়ে রইল কবিরের চোখের দিকে।

একসময় কবির দেখল, সে হাঁটছে। লম্বা লম্বা ঘাসের জঙ্গল। এদিকটায় এতো বছরেও কখনো আসেনি তো সে। একটি গুম গুম গর্জন, জলের শব্দ। ওহ্ সেই প্রপাত। এটা দেখেছে সে কয়েকবার, কিন্তু অন্য রাস্তায়। 

আসলে তাদের ল্যাবে, ল্যাবরোটারিতে, এত সুযোগ, এতো সম্মোহন যে, দিনরাত নেশার মতো ডুবে থাকে তারা নিত্য নতুন আবিষ্কারে,  বাইরেটা মাঝে মাঝে দেখে শুধু, এখন যেন আর কোনো চাওয়া নেই। ছোটবেলার পৃথিবীতে গেলে কীভাবে সে থাকবে? প্রথমে ক্লোনটাকে হাপিস করতে হবে। এখন নয়, ভেবে দেখা যাক আরো কিছুদিন।


একটি স্পিড বোট নদীতে। নিতাই স্যার দাঁড়ানো সেখানে। আশ্চর্য, যেন ব্রজ'র তৈরি কোনো ফর্মুলা এটা।

পা রাখতে হলো স্পিডবোটে। তিনজনই। তুমুল বেগে চলছে স্পিড বোট। নদী এখন নিম্নগামী, খরস্রোতা। হঠাৎ প্রবল ধাক্কা খেলো। ছিটকে বেরিয়ে এলো যেন। খুব ঠান্ডা বৃষ্টির ছাট লাগলো চোখে মুখে ।

কবির চোখ খুললো। সে পড়ে আছে ঘাসের ওপর। আর নিতাই স্যার এক পাশে। ব্রজ নেই কোথাও। নদীটাও নেই। তাদের পুরনো পৃথিবী। কবিরের বাড়ির কাছের মাঠটাই।  কোথায় সেই গুহার পথ।  হঠাৎ মনে হলো, ব্রজ নেই তো! তার মানে নিতাই স্যার আর কবিরকে বের করে দেওয়া হয়েছে এই গুহা সাম্রাজ্য থেকে। এখন থেকে পুরনো পৃথিবীটার সঙ্গে আবার লড়াই করতে হবে। কোথায় সেই অত্যাধুনিক ল্যাব, সর্ব সুবিধেজনক আবাসস্থল। কবির হঠাৎ ভাবল, যেই না তার মনে ঈর্ষা এসেছে, তখনি এই পরিনতি। তবে কি ব্রজ বুঝতে পেরেছিল তার মনের কথা। আর নিতাই স্যার!

নিতাইস্যার ভ্যাল ভ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তার মানে ওনার মনেও লোভ এসেছিল। এখন কী করা যায়।

কবির দ্রুত হাঁটতে লাগল নিজের বাড়ির দিকে। সেই মোরাম বিছানো সুন্দর পথ একইরকম আছে । বাড়ির সামনে লাল হয়ে ফুটে আছে কৃষ্ণচূড়া ফুল। বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে অবিকল কবিরের মতো দেখতে একটি ছেলে বই পড়ছে। কবিরের ক্লোন। একে কি করে ম্যানেজ করা? 

ক্লোনটাকে  মেরে ফেলতে হবে!   তার মানে খুন করতে হবে কবিরকে। সে কি করে তার মাকে বোঝাবে, এতোদিন যার সঙ্গে তারা হাসিখুশি জীবন কাটাচ্ছে, সে আসলে তার নকল। 

কবির আস্তে আস্তে গিয়ে তার ক্লোনের সামনে দাঁড়াল। ক্লোন ওরফে কবির মুখ তুলে দেখল আসল কবিরকে, কিন্তু তার মুখে খেলে গেল তীক্ষ্ণ, তীব্র হাসি। কাছে এলো কবিরের, হাত বাড়াচ্ছে ওর দিকে, না ভালোবাসার হাত নয়। গলা টিপে ধরবে মনে হচ্ছে। কবির হঠাৎ হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। সে জীবনে কোনোদিন মারপিট করেনি। খুব ভয় পেয়ে গেলো । দৌড় লাগাল, পেছন পেছন কবিরের ক্লোন, অনেকদিন পর কবির শহরে এসেছে, তবুও রাস্তাঘাট তেমনিই আছে, সে রিমঝিমদের বাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে, ব্রজদের কলোনির দিকে যাচ্ছে, আর কিছুদূর গেলেই ইটভাট্টা। তারপরই চিত্রা নদী।

কবির ভাবছে  চিত্রা নদীর জলে ঝাপ দেবে। খুব দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে ও। কবির ভুলে যাচ্ছে, কবির যা পারে, কবিরের ক্লোনও তা পারে। কিন্তু শহরের বাকি মানুষগুলো কোথায়, শুনশান রাস্তা। দুটো যুবক উন্মাদ হয়ে দৌড়ুচ্ছে, কেউ থামাচ্ছে না।

ঐ তো চিত্রা নদী। সেই চেনা নদীতীর, সিমেন্ট বাঁধানো ঘাট, বটগাছ, কবির পৌঁছে গেছে ঘাটে, কে বসা ওখানে, দুজন লোক? আরে নিতাই স্যার এবং আর একজন নিতাই স্যার, ভীষণ দুঃখী মুখ করে দুজন পাশাপাশি বসে আছে। মানে আর একজন নিতাই স্যারের ক্লোন। কে ক্লোন আসলে?

নিতাই স্যার কবিরকে বললেন, তোমার মনটাকে শান্ত করো, তাহলে ক্লোনও শান্ত হবে। 

কবির চুপ করে দাঁড়িয়ে, মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে বদলে ফেলল, ধীর শান্ত মন,  যেন সূর্যাস্ত দেখছে।

কবিরের ক্লোনও তার পাশে এসে দাঁড়ালো একই ভাবে।

কবির বুঝল এই আসল পৃথিবী এখন তার ল্যাবরোটারি। 

এখানেই বাঁচতে হবে আবার নতুন করে। 

আর কোনোদিন সেই গুহাকে সে খুঁজে পাবে না। কী করে সব বোঝাবে বাড়ির মানুষকে। তাকে কেউ বিশ্বাস করবে না। নিতাই স্যারও হয়তো তাই ভাবছেন।

দু জোড়া মানুষ বহু সন্দেহ, জিজ্ঞাসা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিত্রা নদীর তীরে।


Don 't worry .

 গলার স্বরে চমকে উঠং চারজনই। বৃদ্ধ বিজ্ঞানী। যার বয়সের  গাছ পাথর নেই। যার বেঁচে থাকার প্রয়োজন তিনি নিজে নির্ধারণ করছেন। যেন মহাভারতের ভীষ্ম।

তার দু হাতে দুটো নীল পাথর। দ্যূতি বেরোচ্ছে, কবির বুঝল লেজার রে। তিনি তাক করলেন ক্লোন গুলোর দিকে, আস্তে আস্তে সেই অদ্ভুত নীল আলো ঢেকে ফেলল ক্লোন দুটোকে। সেই আলোয় মিলিয়ে গেলো তারা। আলোও আস্তে আস্তে নিভে কোথায় যেন বিলীন হলো।

কবির আকুল হয়ে বলল,আমি কি আর গুহা পৃথিবীতে যেতে পারবো না। তিনি মাথা নাড়লেন। একটি ড্রোনে উঠে গেলেন তিনি। কবির দ্রুত পৌঁছুতে চাইল ড্রোনের কাছে। নাহ্, অদৃশ্য লেজার চাদরে ঢেকে গেলো সব। কিছুই বোঝা গেলো না আর। 

 

নিতাই স্যার বুঝলেন তার জীবনের সেরা ছাত্র ব্রজ। যে মেধা এবং বিশ্বাসে অতুলনীয়। 


বেঁচে যাওয়া পৃথিবীর বুকে পুরনো ঝিলমারি আর চিত্রানদীর তীরে কবির, নিতাইস্যারের দিনগুলো আবার আগের মতোই চলতে লাগল। 







দ্বিতীয় পর্ব 


এই সময়টায় আকাশ সবচেয়ে পরিষ্কার থাকে। আজকাল অবশ্য দূষণ জিনিসটি আস্তে আস্তে অবলুপ্তির পথে। পৃথিবীর বুকে প্রতিস্থাপিত হয়েছে গভীর অরণ্যানি। ফাঁকেফোঁকরে উঁকি দিচ্ছে মানুষের বাসস্থান, অধিকাংশই বৃক্ষ বাড়ি। অতিরিক্ত অক্সিজেন আকাশে বাতাসে। এটাও মানুষকে মাঝে মাঝে অসুস্থ করছে। অঙ্গদ তার গাছবাড়িতে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে বহু পুরনো কিছু গানের লিরিকস ঘাঁটাঘাঁটি করছে।

তার বাড়িটি বটগাছের ওপর তৈরি। 

মানুষ এখন বাড়ি তৈরি করার জন্য নিজের পছন্দমত বৃক্ষ বেছে নিতে পারে। সেজন্য নির্ধারিত সময় একবছর।

প্রথমে  তাকে বৃক্ষ সংরক্ষণাগারে যেতে হবে। সেখানে বৃক্ষ কর্মীরা আছেন, যারা কোন্ কোন্ বৃক্ষ এই মুহুর্তে বেশি প্রয়োজন সেটা দেখে প্রয়োজনীয় চারাটি দেবেন। 

 সায়েন্টিফিক পদ্ধতিতে দ্রুত চারা গাছটিকে বড় ও দৃঢ় করা হবে। গাছটির উচ্চতা, ডালপালার সংখ্যা, তাদের দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ কতটুকু হলে কী ডিজাইনের ঘর তৈরি করা যাবে সব কম্পিউটারে নক্সা করে নেওয়া হবে। 

তারপর শুরু হবে  সেই স্বপ্নের বৃক্ষগৃহ তৈরি করা। সবাইকেই যে এরকম বাড়িতে বাস করতে হবে এমন কোন কথা নেই, কারণ বহুতল বাড়ি তৈরি করার পর তাকে পুরো সবুজে ঢেকে ফেলা চালু হয়ে গিয়েছিল আরোও বহু বছর আগে থেকেই। দিন দিন তার ডিজাইন বদলাচ্ছে, ভাঙচুর হচ্ছে, প্রত্যেকটি জিনিসকেই যতটুকু পারা যায় বায়ো ডিগ্রেডেবল করা হচ্ছে। 

এইসময়, অঙ্গদ জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছে, জানলা বলতে বটের ঝুরিকেই বেঁকে চুরে জানলার শিকের মতো করা হয়েছে, পাখির পালকের পর্দা হালকা হাওয়ায় দুলছে। পৃথিবীতে এখন অসম ঋতুকাল । বহুকাল আগে নাকি কখনো শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত নামের পাওয়ারফুল এবং হেমন্ত ও শরৎ নামের দুটো হালকা ঋতু ছিল। কখনো ভীষণ বৃষ্টিতে পথঘাট ডুবে যেত। কিন্তু বহুদিন পরের এই পৃথিবীতে প্রকৃতি একদম বোরিং রকমের ভালো। সবসময় নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। চারদিক এত ব্যালেন্সড, পাহাড়পর্বত, তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ, বছরে দু একটি ঝড়টর হয় বটে, তবে ঐ পর্যন্তই, দুর্যোগ জিনিসটাই কমে এসেছে ভীষণ রকমভাবে ।

অঙ্গদ একটি বিরাট প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত আছে। সেটা হলো তারা সতেরটি টিম মিলে একটি ছোট পৃথিবী বানাবে, সেটা পৃথিবীর ভেতরেই তৈরি হবে। প্রত্যেকটি জিনিসের ডামি তৈরি হবে।  জাপান নামের একটি দেশ সেইসময়ের পৃথিবীতে প্রযুক্তিতে খুব উন্নত হয়েছিল। আনুমানিক দুইহাজার উনিশ সালেই তারা তৈরি করতে পেরেছিল টাচেবল থ্রি ডাইমেনশনাল হলোগ্রাম। সেইসময় থেকে সময়কে ধরলে অঙ্গদ ওরা বেশিদূর এগোতে পারে নি। মাঝখানের একটি বিশাল সময় পৃথিবীর মানুষকে যুদ্ধ করতে হয়েছে নষ্ট হয়ে যাওয়া পরিবেশের বিরুদ্ধে। কয়েকটি ভয়ঙ্কর পেনডেমিকের সঙ্গে। ভয়াবহ উল্কাপাত, ভূমিকম্প এবং সুনামির সঙ্গে। 

পৃথিবীকে অস্ত্রশূন্য করতে লেগেছে আরো বহু বছর। বরফের দুনিয়া গলেটলে টালমাটাল হয়েছিল এই পৃথিবী, তবে টিকে গেছে, মানুষই জিতেছে, যার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আজ এই সময়।

অঙ্গদের মাথায় ছিল একটি থিয়োরি। থিয়োরি অফ এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ড। কিছুই না, সাধারণ কম্পপ্লেক্স নাম্বার যেমন লেখা হয়. x+iy দিয়ে, যেখানে i হচ্ছে গিয়ে একটি ইমাজিনারি নাম্বার, এখন এই ইমাজিনারি নাম্বারটি ধ্রুবক বা কনস্টেন্ট, সেটাকে জীবিত সত্তার আইডেন্টিটি ধরে হলোগ্রাফিক ইমেজ তৈরি করা, আর এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ডের সীমা হতে পারে আপ টু ইনফিনিটি, সেজন্য এই ধরনের ডেমো পৃথিবী নির্মান করা খুব কিছু অসাধ্য নয়। আলট্রাসোনিক লেভিয়েশনের তত্ত্ব দিয়ে যাকে সাজানো যাবে মনের মতো করে, আবার বিপদ দেখলে ভ্যানিশ করে দেওয়া যাবে।

কিন্ত আপাতত, অঙ্গদ সায়েন্টিস্ট নয়, সে একজন শিল্পী, বহু পুরনো কিছু গানের লিরিক তাকে আচ্ছন্ন করছে, যেগুলোর হলোগ্রাফিক ইমেজ সে তৈরি করতে পেরেছে, এবং সামান্য ভয় পাচ্ছে।

কারণ প্রত্যেকটি স্বরগম জীবন্ত প্রাণীর মতো মনে হচ্ছে, যাদের সুর তাল লয় গতি এতটাই সুগ্রন্থিত এবং বিচিত্র যে মনে হয়, এই ব্যালেন্সড পৃথিবী তাদের পছন্দ নয়, বহু বহু বছর আগের পৃথিবীতে তাদের জন্ম দিয়েছিল কেউ, যার মধ্যে ইমোশন খুব বেশি ছিল , প্রতিটি শব্দবন্ধে পজিটিভ ও নেগেটিভ এক্টিভিটির একটি দুরন্ত আকর্ষণ রয়েছে ...হয়তো অঙ্গদ এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়েই পড়ত যদি সে প্রাচীন বালক হতো, কিন্তু না,

তার সামনে সুদৃশ্য গাছ কোটর, ছবি ভেসে উঠেছে যার, তার নাম সত্যকাম, অঙ্গদের সিনিয়র, গম্ভীর গলায় বলল, অঙ্গদ তোমার পাঠানো গানের লিরিকগুলোর মাধ্যমে এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ড এরিয়ায় প্রকৃতি ব্যালেন্সড থাকছে না …একথা অঙ্গদের জানা। এই ডামি তৈরির থিয়োরিও বহু পুরনো। এখন মহাকাশে আবিষ্কৃত হয়ে গেছে একটি নতুন গ্রহ, যা পৃথিবীর মতোই অনেকটা। সেখানে যাওয়া আসা করাটা যদিও অসম্ভব নয়,   কিন্তু  এই বিপুল আলোকবর্ষীয় দূরত্ব অতিক্রম করে মানুষের পৌঁছুনোটা খুবই কঠিন ব্যাপার, তারুণ্যে যাত্রা করে বার্দ্ধক্যে পৌঁছুতে হবে । আরো গতিবেগ বাড়ানোর কোনো থিওরি এখনো  আবিষ্কার করা যায়নি। আর যে মানুষগুলো যাবে, তারা আর কখনো ফিরতেই পারবে না।

তবে অঙ্গদ নতুন পৃথিবীর পেছনে বিজ্ঞানীদের উন্মাদনার কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না। এই পৃথিবীটাকে পুনর্গঠন করলেই তো হয়। এখন লোক সংখ্যা কম। কি অসুবিধে?




অঙ্গদ আজকে নিজেকে চিনে নিতে চায়। এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ডের যে থিয়োরি সেখান থেকে হাজার বছর আগের মানুষকেও খুঁজে বের করা যায়। যায় তার আগের চরিত্রকে জানা। এটা টাইমমেশিনেও করা যায়, তবে ততটা নিঁখুত ভাবে নয়। 


এই যে এক্স, এখান থেকেই যাবতীয় ইমাজিনেশনের জন্ম।

তাই আপাতত সত্যকামের পাঠানো সিগনাল থেকে সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে দেখা যাবে ক্ষণ। কোনো একজন স্রষ্টা এসব তৈরি করেছেন। শিল্প মানেই নতুন কিছু, ভীষণ রকম ব্যালেন্সড এই পৃথিবীর বুক থেকে তাই হারিয়ে গেছে শিল্প। 

এখন সবাই বিজ্ঞানী। মাপজোক করে গবেষণাগারে তৈরি হয় সব। কোথায় যেন সৃষ্টির আনন্দটি হারিয়ে গেছে।

যাইহোক, আপাতত অঙ্গদ গভীর নিমগ্ন। সে নিজে হলো এক্স। তার চারপাশে হলুদ আলো। এখন সে এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ড এরিয়া থেকে বেরিয়ে গেছে। একটি নতুন ই্যকুয়েশন বানিয়েছে অঙ্গদ । সেটা সল্ভ করে একটি বছর খুঁজে পাওয়া যায়, সেটি নির্ধারন করবে নিজেই । কত বছর পেছনে   যেতে  চাইবে, তিনশো, চারশো, পাঁচশো?

 না ঠিক আটশো বছর সাতাশদিন পেছনে গেলো সে, স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে বহু বহু বছর আগের বৃষ্টির দিন, একটি ছেলে স্কুল থেকে ফিরছে। সঙ্গে কয়েকজন বন্ধুবান্ধব। পেছনে ঝোলা ব্যাগ,  অংকের খাতা। একবার পেছন ফিরে তাকালো। বিষণ্ণ অথচ কীরকম অস্থির ছেলেটি। স্ক্রিনের মধ্যে এক্সের সঙ্গে আস্তে আস্তে মিশে গেলো ছেলেটির মুখ। নাম ব্রজ।

এখন সে অঙ্গদ, আগে ছিল ব্রজ।

ব্রজ ছিল অংকে জিনিয়াস। তাকে সিলেক্ট করেছিল কোনো গ্রহের এলিয়েন বা পৃথিবীরই কিছু দুষ্ট বিজ্ঞানী। তাকে মাধ্যম বানিয়ে বহু অংক করেছে তারা। কিন্তু আরোও মেধাবী এবং সৎ একজন মানুষের দৃষ্টিতে পড়ে যায় ব্রজ। তার মেধার যাতে খারাপ ব্যবহার না হয়, এজন্য তিনি তাকে লুকিয়ে ফেলেন। ব্রজের পাশাপাশি পেয়ে যান আরোও দুজন কে। তবে সে গল্প থাক। ব্রজের পিঠে একটি সিল। অজান্তেই অঙ্গদের হাত উঠে গেলো নিজের পিঠে, আশ্চর্য অস্পষ্ট একটি দাগ। সঙ্গে সঙ্গে ছোট ফোন দিয়ে ছবি তুলল নিজের পিঠের। সামনে এনে স্ক্যান করতেই অসংখ্য গুটি গুটি অক্ষরে ভেসে উঠল ব্রজ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য।


সেই পুরনো পৃথিবীটাকে দেখে অঙ্গদের খুব লোভ হলো। তার মনে হলো সে সেই ধুলো ধোঁয়ার জগতটাকে দেখে আসে। ফুটবল খেলতো মানুষ,তারো ইচ্ছে হলো সেও খেলে। এখনের এই কেজো পৃথিবী থেকে বেরিয়ে যায়।

অঙ্গদ হঠাৎ তার বন্ধুদের খুঁজে পেতে চাইল। আজ এটাই হবে তার কাজ। সবাইকে এই সময়ের পৃথিবীতে খুঁজে নিয়ে তাদের নিয়ে বাঁচতে চায়।

অঙ্গদের মা ডাকলো তাকে। স্ক্রিনে। তিনি একটি স্কুলে কাজ করেন। স্কুল জিনিসটা নতুন করে শুরু হয়েছে, আবার। ডিজিটাল পড়াশোনা চলেছে বহুদিন। তারপর ছাত্রদের জন্য  আনন্দ খুঁজে নিতে ইতিহাস ঘেঁটে স্কুলের কনসেপ্ট  আনা হলো। সেইরকম একটি স্কুলেই পড়ায় অঙ্গদের মা। অঙ্গদকে জিজ্ঞেস করলো কিছু খেয়েছে কিনা। অঙ্গদ বলল খেয়েছি রাইসবল, চিকেন সেদ্ধ, ফ্রুটস্। অঙ্গদের মা আশ্বস্ত হলেন, যাক। অঙ্গদের হাসি পেলো। একে বলে মাদার। হাজার বছর হলেও এসব কিছু বদলায়নি। বদলাবেও না। এই কয়েকদিনের মিশন হলো পুরনো বন্ধুদের খুঁজে বের করা। 

কারা কারা ছিল তাদের দলে। কবির, নিশা, রিমঝিম, টিনটিন, যিশু, এসব হলো তাদের নাম। তারা তখন কি কি পেশায় ছিল সেটাও বের করেছে সে। রিমঝিম ইংরেজি সাহিত্যের প্রফেসর হয়েছিল সেই সময়, কবির আইসক্রিম পার্লার চালাতো আর গল্প লিখতো, আস্তে আস্তে সে সেইসময়ের একজন বিখ্যাত রাইটার হয়েছিল।

নিশা স্কুলের টিচার আর তাদের ফ্যামিলির যে স্টল ছিল, সেটাই দেখত। যিশু হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার। আর টিনটিন ডাক্তার। এরমধ্যে কবির, নিশা , রিমঝিম তিনজনই ঝিলমারিতে তাদের জীবন কাটিয়েছিল, একমাত্র যিশু আর টিনটিন অন্য জায়গায় তাদের জীবন কাটিয়েছে।

হাসিখুশিই ছিলো তারা। আর ছিল অবাধ বন্ধুত্ব। কিন্তু ব্রজ মানে অঙ্গদ তাদের মধ্যে ছিল না। সে ছিল একটি নির্জন গুহায়। সেইসময়ের বিচারে একটি অত্যাধুনিক ল্যাবে। 

তার কৈশোর এবং যৌবন নিয়োজিত ছিল বিজ্ঞানের সেবায়। জীবনের অনেককিছু আর দেখা হয়নি তার। আজ সব দেখতে ইচ্ছে করে। এনজয় করতে ইচ্ছে করে। তবে সে এখন অনেকটাই বড়। তাই বন্ধুরাও নিশ্চয় এখন তারই সমবয়সী। তাই খুঁজে পেলে, আড্ডা হবে, গল্প হবে, কত আনন্দ হবে। প্রথমে চাই কবিরকে। কবিরের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছিল। ঠাণ্ডা ঝগড়া। এখন তার কবিরকেই বেশি ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। সে পৃথিবীর  রূপরসগন্ধ পেল না । ব্রজ কিছু  পেল না।

কবিরকে খুঁজতে হবে এই পৃথিবীতে। পাওয়া গেল, তাকে। 

জায়গার নাম, মেহেরগড় সিটি ফাইভ। 




কবির     


একটি সুদৃশ্য বাড়ি। গাছে ঘেরা অবশ্যই। বাড়ির সামনে খুব সুন্দর একটি লাইব্রেরি। ভেতরে বসার জায়গা। ডিজিটাল বুকস পড়তে পারে যে কেউ বসে, তাছাড়া আছে কাগজের বইও। এখন কাগজ আর গাছ থেকে তৈরি হয় না। সে পর্ব বাদ গেছে বহু আগেই। একটি বিশেষ রাসায়নিক সংকর পদার্থ দিয়ে তৈরি হয় কাগজ তৈরির কাঁচামাল। বাইরে বড় হোর্ডিং।  লেখা, শ্যামস বুকস্ হাউজ।

নিজের বানানো ছোট্ট একটি ড্রোনে করে সেই বাড়িটির সামনের লনে নামল অঙ্গদ।

তার পরনে টকটকে লাল গেঞ্জি, কালো ট্র্যাকস্যুট। চোখে চশমা। কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। বিশাল বড় গোল একটি সেন্টার টেবিল। কয়েকজন বসে বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছে। পাশে একটি কাউন্টার, সেখানে ভীষণ ডিজাইনার একটি ফ্রিজ, তাতে রাখা প্রচুর রকমারি আইসক্রিম। অতএব, নিঃসন্দেহে সে কবির। কোঁকড়ানো চুল, সৌম্য দর্শন, শান্ত ছেলেটিকে দেখে অঙ্গদের ইচ্ছে হলো গিয়ে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করল সে। আস্তে করে বলল, হ্যালো।

ছেলেটি ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো, বই পড়বেন?

অঙ্গদ মাথা নাড়ল।

তাহলে আইসক্রিম খাবেন?

অঙ্গদ মাথা নাড়ল।

তারপর সে পকেট থেকে ছোট একটি চিপস্ বের করল। ছেলেটির হাতে দিল। আর নিজের কাছে রাখা রিমোটটি অন করল। একটু হেসে বলল, যাস্ট ওয়েট ফিউ মিনিটস্। কবির স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইল, চিপস টি ধরে, ছোট কালো মতো একটি যন্ত্র। ধীরে ধীরে সে পিছিয়ে যাচ্ছে, অনেক অনেক বছর, দশমিনিট কাটল। অঙ্গদ একবুক আশা নিয়ে শ্যাম ওরফে কবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। 


আস্তে আস্তে ঘোর কাটছে শ্যামের। অস্ফুট শব্দে শ্যাম বলল, ব্রজ। যেন দুদিন পর তাদের দেখা হয়েছে। দুম করে দুজনের মনে পড়ে যাচ্ছে সেইসব দিন। হঠাৎ শ্যাম মাথা নিচু করে মুখ ফিরিয়ে রাখল। 

তার লজ্জা করতে লাগল। ভীষণ লজ্জা। হো হো করে হেসে উঠল অঙ্গদ। আরে কয়েক শো বছর পেরিয়ে গেছে রে। এখন আর ওসব ভেবে লাভ নেই। চল যিশু, টিনটিন, রিমঝিম আর নিশাকে খুঁজে বের করি। 

শ্যাম বলল, আইসক্রিম খা। অঙ্গদ বলল না রে। আমার চপ, ফুলুরি এসব খেতে খুব ইচ্ছে করছে। আপাতত কফি খাবো তোর বাসায় গিয়ে। তারপর নিশাকে বের করবো। নিশা কী সুন্দর গান গাইতো তাই না?

শ্যামের বাড়িতে খুব গল্প গুজব হলো। ওর মা বাবা দুজনেই বাড়িতে ছিলেন। সুদর্শন দেখতে। বর্তমান পৃথিবীর নিয়ম মেনে বুড়োটে ভাব নেই। সজীব, সুন্দর।

অঙ্গদের অঙ্কের ফর্মুলা অনুযায়ী, নিশা আছে কালিকট সিটি ফোরে । 

এখন আকাশে দুটো ড্রোন। রাত দুটো বাজে। তাতে কি।  আটশ নশো বছর আগের বন্ধুকে খুঁজে বের করতে সব করা যায়। একটি ড্রোনে শ্যাম, অপরটিতে অঙ্গদ। নীল তীব্র আলো জ্বেলে তারা চলেছে কালিকট সিটি ফোরে। নিচে প্রচুর বৃক্ষরাজি নিয়ে থাকা সুন্দর জনপদগুলো।





নিশা 


কালিকট সিটি ফোর এ পৌঁছুলো দুজনে। তখন ভোর, নির্মল নাতিশীতোষ্ণ বাতাস। শহরটি তখনো ঘুমিয়ে।

একটি হলুদ বাড়ি। এটাই নিশাদের বাড়ি হওয়া উচিত, অংক অনুযায়ী। সামনে যথারীতি লন এবং ড্রোন নামাবার ছোট্ট পার্ক। দুজনে সেখানে নামল। কলিং বেল টিপতেই ঝমঝমিয়ে ঝর্ণার আওয়াজ হলো। ভোরের নির্জনতাকে ভেঙে দরজা খুলে গেলো। সোনালি চুল, নীল চোখের, রোগামতো একটি মেয়ে। সেই আদিকালের ভাষা ইংলিশেই চলল কথা। মেয়েটি তাদের বসার ঘরে নিয়ে বসাল। এই বাড়ির থিম জল। সমুদ্রের নিচের আবহে সাজানো ঘরটি। ঘরের দেয়াল জুড়ে  নীলাভ রঙ  আর তার মধ্যে ফেনিল সাদা সমুদ্র  ঢেউ আঁকা। 

নরম দুটো গদি, দেখতে নৌকোর মতো, সেখানে বসল ওরা। এখন অঙ্গদের কাজ ওর হাতে চিপস্ ধরিয়ে দেওয়া। 

মেয়েটি অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অঙ্গদ মেয়েটির হাতে চিপস্ দিল, আর সেইসাথে রিমোট অন, দশমিনিট অপেক্ষা। ঢিপঢিপ করছে তাদের বুক। 


সোনালি চুলের মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর চেঁচিয়ে উঠে নেচে নিল কয়েক পাক। ভাবা যায়, সাড়ে আটশ বছর আগের তোরা। লেট আস সেলিব্রেট। মা মা বলে ডাক দিলো নিশা। কী নাম এখন ওর কে জানে?

নিশা কাঁধ নাড়িয়ে বলল আমার নাম বসন্ধুরা। অঙ্গদ অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, মা ডাক তো একই রকম রয়েছে। নিশার মা এলো! পরিচয় হলো নতুন করে ।


তিনজনে প্রাণের আড্ডা চলছে। সঙ্গে ফুলুরি আর চপ।

বসুন্ধরা এখনো পড়ছে। সে কোনো স্কুলে পড়াতে চায়। চায় অনেক পড়াশোনা করতে নিজের মতো করে। গান তার প্রিয় বিষয়।  সায়িন্টিফিক বিষয় নিয়ে তার কৌতূহলের শেষ নেই। অঙ্গদ বুঝল, এই গানপাগল নিশাকে তার লাগবে। সেও পড়াশোনা আর গান নিয়ে কাটাতে চায় জীবন। 



টিনটিন ও যিশু ও নিতাই স্যার


টিনটিন, যিশু তারা দুজন ছিল সেইসময়ের এভারেজ মেধাবী, পরিশ্রমী ছেলে। প্রচুর পড়াশোনা করে ডিগ্রি নিয়ে চাকরি করেছে। কোনো একস্ট্রা মেধা তাদের দেওয়া হয়নি। কিন্তু নিজেরা নিজেদের গড়ে পিটে নিয়েছিল। তারা ভালো ক্রিকেট খেলত। খুব মুভি দেখতো। হই হুল্লোড় করতো। কী অদ্ভুত ছিল তাদের প্রাণশক্তি।

অঙ্গদের ফর্মুলা এবং  মেশিন বলছে তারা আছে দুটো পাশাপাশি শহরে। একটি শহরের নাম মথুরা সিটি টু এবং ওপর শহর বৃন্দাবন সিটি থ্রি।

এখন ড্রোনের সংখ্যা তিন। নিশা সবুজ রঙের একটি স্কার্ট আর হলদে টপ পরেছে। তার সোনালি চুল সাদা রিবন দিয়ে টাইট করে বাঁধা। এই দুটো সিটি বেশ দূরে আছে। ড্রোনের সর্বোচ্চ স্পিডে গেলেও মোটামুটি সাত ঘন্টা লাগবেই। তারা তিনজনে যাত্রা আরম্ভ করলো। যার যার কানে হেডফোন। কথা চলছে তিনজনে যেতে যেতে। পথে সুন্দর একটি পাহাড় ঘেরা শহর দেখে তিনজনেরই ইচ্ছে হলো নামতে। ছোট্ট একটি নদী। লোকজন ঘোরাফেরা করছে। সবুজে ঘেরা  দুটো পার্ক দেখা যাচ্ছে। সবচাইতে মজার হলো সেই নদীটি। শহরের মাঝখান দিয়ে সে ছুটে চলেছে। স্রোত আছে বেশ।  অনেকগুলো বোট সেখানে। লোকজন শখ করে বোটিং করছে। নদীতে অনেক মাছ। তিরিং বিরিং লাফাচ্ছে। একটি পার্কের এক জায়গায় দেখা গেলো ড্রোন নামানোর জায়গা আছে। তিনজনেরই প্রবল ইচ্ছে শহরটিকে একটু এনজয় করে। তারা এদিক ওদিক ঘুরতে লাগল। একজায়গায় মনে হলো কিছু একটা হচ্ছে। প্রচুর মানুষ গোল হয়ে বসে আছে। একজন সৌম্য দর্শন মানুষ স্পিচ দিচ্ছেন। তারাও একজন আর একজনকে ইশারা করল। তারপর বসে পড়ল সেখানে। মনোরম ছাউনি, পাথরের ছোট ছোট বেঞ্চ। তারা বসতেই একজন এসে তাদের হাতে তিনটি  বাক্স দিয়ে গেলো। খুলে দেখল ফল আর চকলেট। সেই সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক বলেই চলেছেন। কখনও কোনো একজন শক্তিমানের কথা বলছেন, কখনও এই জীবনের হালকা আনন্দ, ভালোবাসার কথা বলছেন। বহু প্রাচীন পৃথিবীর কথা বলছেন যেখানে মানুষ রিলিজিয়ন নামের একটি মতবাদ নিয়ে খুনোখুনি করত, তিনি জ্ঞান বিজ্ঞান, ফিলোসফি, হিস্ট্রি, সবকিছু নিয়ে সাবলীল ভাবে বলে চলেছেন, সবাইকে মুগ্ধ করে রেখেছেন তার বাচনভঙ্গিমায়, জ্ঞানের গভীরতায়। অঙ্গদ, বসুন্ধরা এবং শ্যাম তারাও তন্ময় হয়ে গেলো। হঠাৎ অঙ্গদের কী যেন মনে হলো, সে এগিয়ে গিয়ে লোকটিকে কিছু বলল, তার সঙ্গে করমর্দন করল, তারপর দশমিনিটের মতো স্থবিরতা, আর অপেক্ষা এবং শেষে সেই লোকটির চোখে আনন্দাশ্রু, তিনি আজকের সভার সমাপ্তি ঘোষনা করলেন এবং তার প্রিয় ছাত্রদের নিয়ে হাঁটতে লাগলেন। বহুদিন পর নিতাই স্যারের ইচ্ছে হলো অঙ্ক করান তাদের। যদিও তিনি এখন অঙ্কের মাস্টারমশাই নন। তিনি একজন মোটিভেটর বা কখনও শুধুই একজন বক্তা। মানুষ তার কথা শুনতে ভালোবাসে। তার নাম মিঃ শ্বেতবাহন।

নিতাই স্যার বা মিঃ শ্বেতবাহন তাদের তিনজনকে নিজের বাসায় নিয়ে গেলেন। বাসাটি প্রিমিটিভ ডিজাইনের। বহু বছর আগের মানুষেরা যে ঘাস, মাটি এসব দিয়ে ঘর বানাতো সেরকম। আসলে সেটা মাটি নয়। কিন্তু বানানো হয়েছে সেভাবে। একটি ছোট জলাশয় বাড়ির সামনে, তাতে কয়েকরকম জলজ ফুল ফুটে আছে। ভাত খেলো ওরা, সঙ্গে ফিসকারি। মাস্টার মশাইরের ওয়াইফ খাওয়ালেন। গাউন পরা, ঘন নীল চোখের এক মধ্যবয়স্কা ভদ্রমহিলা।

খাওয়া শেষে বাইরে একটি নতুন ধরনের পাত্র থেকে তারা জল খেলো, ইতিমধ্যে অঙ্গদ সার্চ করে দেখেছে একে বলে মাটির কুঁজো, প্রাচীন পৃথিবীর মানুষ এতে জল রেখে পান করত। মিঃ শ্বেতবাহনের বাড়িতে এরপর থেকে যে তাদের আসাযাওয়া লেগেই থাকবে এ নিয়ে আর কোনো সন্দেহ রইল না। অসাধারণ এক আনন্দে সবার মন ভরে গেছে আজ। 


আবার ড্রোনে করে যাওয়া শুরু। মথুরা সিটি টু তে পৌঁছে, অঙ্গদ গটগটিয়ে একটি হসপিটালের সামনে এসে দাঁড়াল। এখানেই থাকার কথা টিনটিনের। অন্যরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। রিসেপশনে গিয়ে অঙ্গদ জিজ্ঞেস করলো এখন কোন কোন ডাক্তার ডিউটিতে আছে। রিসেপশনে একজন রোবট গার্ল বসা, সে সুমিষ্ট গলায় নামগুলো বলল। অঙ্গদ নামগুলোকে তার কাছে থাকা ছোট্ট রেকর্ডারে রেকর্ড করে নিলো। তারপর সামনে রাখা সোফায় বসল। একটির পর একটি নাম বসাচ্ছে তার ফর্মুলায়, মোবাইল স্ক্রিনে। হ্যাঁ মনে হয়, পেয়ে গেছে, অদ্ভুত উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখ। ডঃ সহদেব। সে রোবট রিসেপসনিষ্টের কাছে গিয়ে ডঃ সহদেবের এপয়েনমেন্ট চাইল। সবুজ আলোয় ঘেরা, ছোট একটি গুহার মতো সুদৃশ্য চেম্বার। সেখানে ঢুকল সে। তারপর আর বেশি সময় লাগেনি। মিনিট কুড়ি এবং বাকিটা কাকতালীয়। ডঃ সহদেব ওরফে টিনটিন বাইরে বেরিয়ে এসে ওদের বলল, বৃন্দাবন সিটি থ্রিতে তার একজন ভীষণ প্রিয় বন্ধু আছে। সে নিশ্চিত ওই যিশু হবে। এবং তাই হলো। তার নাম রবীনহুড। 

বাকি শুধু রিমঝিম। আর অঙ্গদ ভীষণ আশ্চর্য হলো তার বোকামিতে, কারণ অংক কষে দেখা গেল রিমঝিম অঙ্গদের সিটিতেই থাকে। 

ঝিলমপুুরী  সিটি ওয়ানের বাসিন্দা রিমঝিম। অঙ্গদ এবং সে এতোদিন এভাবেই পাশাপাশি আছে। উত্তেজনায় কেঁপে উঠল তারা সবাই। তাদের সকলে প্রিয় পছন্দের  মেয়েটি রিমঝিম। নিশা বলল আর দেরি নয়, চল এবার। টিনটিন, যিশু তারাও এক পায়ে রাজি। সব কাজ ফেলে, আকাশে ভেসে যাচ্ছে ড্রোনগুলো। না নিচে যতই সুন্দর সুন্দর শহর থাকুক না কেন, তারা আর থামবে না। এক উড়ানে পৌঁছে যাবে ঝিলমপুরীতে। 

ঝিলমপুরীতে যখন সবাই পৌঁছুলো তখন সেখানে সন্ধ্যা হচ্ছে। চারপাশে মৃদু আলো। পাখির কল কাকলি,কোথাও বাজছে গান গান। রেস্তোয়া গুলোতে মানুষ। লাইব্রেরিতে ভিড়। দোকানপাট গুলোতে মানুষজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সবার খুব টায়ার্ড লাগতে লাগল। তারা ঠিক করলো অঙ্গদের বৃক্ষবাড়িতে আজ রাত কাটুক। প্রথমে উষ্ণ স্নান। খাওয়া দাওয়া।

অঙ্গদের ক্লান্তি নেই। সে বের করতে বসে গেছে রিমঝিমকে। নিশা গান গাইছে। সেইসব ব্যারিয়ার ভাঙা সুর। যা এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ডের স্থিতিশীলতাকে বার বার ব্রেক দিচ্ছিল। প্রতিটি ওয়েভ কাঁপছে।

অঙ্গদ আশ্চর্য হয়েছ জিজ্ঞেস করলো তুই এইগুলো কোথায় শুনেছিস। নিশা বলল, কেন তুই জানিস না, এইসময়ের ফ্যামাস মিউজিশিয়ান ক্লারা মার্ট। যাকে খুব কম মানুষই দেখতে পেয়েছে এখন পর্যন্ত। নিভৃতে নিরালায় নিজের মতো কাজ করেন, তিনিই এই ট্যুইনগুলো সৃষ্টি করছেন, পৌঁছে দিচ্ছেন পৃথিবীর কোণায় কোণায়। অঙ্গদ অবাক হলো।

 ইয়েস ইট ইজ দ্য কো ইনসিডেন্স। রিমঝিম, ক্লারা মার্ট মিলে যাচ্ছে।




রিমঝিম 



পরদিন। তারা এখন যেদিকে যাচ্ছে, অঙ্গদ দীর্ঘদিন এ শহরে বাস করেও সেদিকে আসেনি কোনদিন। এই জায়গাটাতে জঙ্গলগুলো অগোছালো। যেমন আছে তেমনি যেন তাদের রেখে দেওয়া হয়েছে। মধ্যে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। দূরে নীল পাহাড়। একটি ক্যাসলের আদলে বানানো ছোট বাড়ি। চারপাশে ঝাউগাছ। বাড়ির সামনে একজন প্রৌঢ় বসা। হাতে একখানা রেডিও। এটা অঙ্গদ দেখেই চিনল। বহুকাল আগে এগুলো মানুষ ব্যবহার করতো। এখন আবার ফিরে এসেছে। কোনো দরকার নেই,এসবের।  অনেক অনেক মাধ্যম আছে সবকিছুর। তবুও মানুষ যেন আবার ফিরে পেতে চায় কিছু কৌতূহল, জীবনের অস্পষ্টতা, কৌতুক ইত্যাদি।  

তারা সবাই মিলে বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়াল। সেই ভদ্রলোক খুব অবাক হলেন,  এতো জন তরুণ তরুণীকে একসঙ্গে দেখে। তাদেরকে না চিনেও তিনি হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। উজ্জ্বল সেই লনটিতে সবাই বসল। কাঠের চেয়ার, দোলনা এলোমেলো ভাবে সাজানো চারপাশে। অঙ্গদ অস্থির। এ বাড়িতে ক্লারা মার্ট থাকেন?

ভদ্রলোক থমকে গেলেন? কেন বলো তো?

দরকার ছিল।

সে কারো সঙ্গে দেখা করতে চায় না।

তাকে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। 

শেষমুহূর্তে অঙ্গদের গলার স্বর একটু উঁচুতেই উঠে গেলো।

দরজা খুলে একটি মেয়ে বেরুলো। হাতে একটি স্টিক। যা অন্ধরা নেয়।

অঙ্গদ অবাক হলো। কেউ সাধ করে আজকাল অন্ধ হয়ে থাকে?

চিকিৎসা করলেই অন্ধত্ব সেরে যায়। 

মেয়েটি খুব ফর্সা।  কালো কোঁকড়ানো চুল। বেশ লম্বা। সে পরে আছে সাদা রঙের  একটি পোশাক, সারা শরীরে পেঁচিয়ে উঠেছে এটি, একে বলে শাড়ি, বহুদিন আগে ভারতবর্ষের মেয়েরা এসব পরত।  গলায় নীল স্কার্ফ।

নিচু স্বরে সে জিজ্ঞেস করলো আপনারা কে? 

অঙ্গদ হেসে বলল, আপত্তি না থাকলে আপনার হাত দিন, এখনই জেনে যাবেন, আমরা কারা।

মেয়েটি অনেকটা দ্বিধা নিয়ে হাত বাড়ালো। অঙ্গদও সেই চিপস্ টি হাতে গুঁজে দিল।


পুনর্মিলন। ক্লারা কাঁদছে, রিমঝিম কাঁদছে। সে বলল, আমি অন্ধ থাকতে চাই রে। এই অন্ধত্ব আমাকে সুর আর গান দেয়। আমি যেন বহু বহু দিন ধরে সুরের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো একটি অন্ধপাখি। 


টিনটিন বহুভাবে তাকে বোঝাতে চাইল। চোখে দেখলেও তুই গান লিখতে পারবি। না আমি চাই না। ক্লারার উত্তর। 


অঙ্গদ বুঝল। এধরনের একটি অভ্যাসে ক্লারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাকে আস্তে আস্তে এ থেকে বের করতে হবে। এতো তাড়াতাড়ি হবে না।



বহুদিন, বহুদিন নয় শত শত বছর পর, শ্যাম, অঙ্গদ আর মিঃ শ্বেতবাহন বসেছেন। সামনে একটি প্লেট। এখানে সিনেমা হবে। গোয়েন্দাগিরি। তবে পুরনো পৃথিবীকে নিয়ে। বর্তমান পৃথিবীর সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। কেন ব্রজ অংক নিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল, সেসময়ে চলতে থাকা কোভিড ১৯ এর পেনডেমিকের পেছনে মূল কারণ কি? এর সঙ্গে কি আদৌ কোন অন্য গ্রহের এলিয়েনদের যোগ সাজস ছিল। বা সেইসময়ের রাষ্ট্রনায়কদের। অঙ্গদের চোখের পাতাও পড়ছে না।সামনের এই যন্ত্রটির নাম টাইম প্লেট। খুব সূক্ষ্ম এর ব্রেণ, যদিও মানুষই বানিয়েছে এটাকে, কিন্তু আর্টিফিশিয়েল ইন্টিলেজেন্স এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে যন্ত্রটির, যে একসঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘটতে থাকা জিনিসগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বের করে শুধুমাত্র সেগুলোকেই পয়েন্ট আউট করে দেখায়। কিন্তু এই যন্ত্রটি যারা চালাবে তাদের হতে হবে প্রচন্ড তুখোড়, দারুণ মনোযোগী। ভাবনা থেকে একচুল এদিক ওদিক হলেই যন্ত্রটির চিন্তা শক্তিও এলেবেলে হয়ে যাবে। পুরো ব্যাপারটা একটি অত্যাধুনিক ভার্চুয়েল ট্যালিপ্যাথি। তাই ঘর বন্ধ। সবরকম নেটওয়ার্ক বন্ধ। শুধু যন্ত্রটির ধূসর একটি আলো জ্বলছে। সেখানে একটি দেশের গোপন আলোচনা কক্ষ দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন লোক। এবার তাদের আলোচনা কানে আসছে। একজন পরিবেশবিদ, তিনি বলছেন পৃথিবীর জনসংখ্যা কমাতে হবে। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে খুব দ্রুত। দু তিন বছরের জন্য পৃথিবীরকে শ্লথ করতে হবে। খুব তর্ক হচ্ছে। একটি দেশ গোপনে জীবাণু অস্ত্র বানিয়েছে, সেটা ভয়ঙ্কর, আরো অনেক দেশ এ নিয়ে গবেষণা করছে। হঠাৎ সব নিথর হয়ে গেলো। একটি বিস্ফোরণের ছবি, কোনো এক দেশের ল্যাবরোটারীতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তারপর কিছু কিছু স্লাইড সরে সরে গেলো। আবার একটি কনফারেন্স হল। একটি টিম বসে আছে। সকলের মুখে মুখোশের মতো মাস্ক। তাদের অন্তরঙ্গ কথাবার্তা অটোম্যাটিক ভাবে ট্রেনসলেট হয়ে শ্যাম, অঙ্গদ আর মিঃ শ্বেতবাহনের কানে পৌঁছে যাচ্ছে। খুব শীতল স্পষ্ট উচ্চারণ। পৃথিবীর কয়েকটি দেশে  দ্রুত কমাতে হবে জনসংখ্যা আর কার্বন নিঃসরণ, না হলে পরিবেশ উষ্ণায়ন এমন হবে যে সামুদ্রিক জলস্তর আচমকা বৃদ্ধি পেয়ে ডুবে যাবে সেসময়ের কয়েকটি বড় বড় শহর একবছরের মধ্যেই । তাদের কথাবার্তায় মনে হলো পরিকল্পনা করে একটি মারাত্মক ভাইরাসকে পৃথিবীর বুকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তারপরই আবার দৃশ্যান্তর, হাজার হাজার কফিন। মানুষ মারা যাচ্ছে।

যানবাহন সব বন্ধ। পৃথিবীর বড় বড় শহর গুলো শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। 



 না এসবের মধ্যে ব্রজকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। পেনডেমিকের কারণ সম্পর্কে কিছু অনুমান হলো মাত্র। তা জেনে কী হবে। পেনডেমিক আরোও এসেছে তারপর পৃথিবীর বুকে। 

কিন্তু অঙ্গদ আজকে ডিটারমাইন্ড, তার নিজের ওপর কি করা হয়েছিল বের করতে হবে। আবার ঝিলমারিকে ফর্মুলায় বসিয়ে, ব্রজ নামটি ফর্মুলায় ইনপুট করে একঘন্টার জটিলতম ক্যালকুলেশন চলতে লাগল, কেউ মন বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না, দ্রুত হাত চলছে স্ক্রিনের ওপর। বহুদিন ধরে নিতাইস্যার অংক থেকে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে তিনি এগুলো চেনেন। পাওয়া গেল। একটি ছেলে একা বসে আছে ঝিলমারিতে গাছের নিচে পাথরের ওপর। অংক কষছে। স্ক্রিনে যেটা দেখাচ্ছে সেটা হলো তার গায়ে অসংখ্য জালের মতো কী যেন। এগুলো কি কোনো বিশেষ ওয়েভ? এবার আলাপচারিতা। হ্যাঁ তারা পৃথিবীর কেউ নয়। পৃথিবীর বাইরের মানুষ,  পৃথিবীর ভেতরের প্রায় সব মানুষকে জৈব অস্ত্র দিয়ে মারতে চায়। যাতে পৃথিবীটা তেমনি থাকে, শুধু মানুষগুলো চলে যায়। কারণ তাদের গ্রহ নষ্ট হয়ে গেছে, পরিবেশদূষণের ফলে। দুটো উল্কা পিণ্ডের গতিপথ ঘুরিয়ে পৃথিবীর দিকে তাক করেছে। একাজে তারা একটি জীবন্ত ক্যালকুলেটর হিসেবে ব্যবহার করছে ব্রজ নামের একটি মেধাবী কিশোরকে। তারপরই কাট হয়ে গেলো সব। আবার শুরু। না ব্রজকে কেউ কিডন্যাপ করেছে। এখন তাকে একবার দেখা গেলো। শান্ত সৌম্য মুখ। সারা শরীর ঘিরে একটি আলো। যেন কেউ আর ছুঁতে পারবে না তাকে। সব বুঝে গেলো অঙ্গদ। আর লাগবে না কিছু। বাকি সব জানা হিস্ট্রি। 

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। যেন শত বছরের কৌতূহল মিটল আজ।

প্রশান্ত মুখে হাত পা ছড়িয়ে তারা শুয়ে পড়ল অঙ্গদের বৃক্ষবাড়ির লনে। তারাভরা আকাশ,  একই রকম যুগ যুগ ধরে। 



ক্লারা, সহদেব, রবিনহুড, বসুন্ধরা, অঙ্গদ, শ্যাম আর মিঃ শ্বেতবাহন,  একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন শহরে থাকে বটে, তবে এই পৃথিবী এখন তাদের কাছে অন্যরকম।

এক্সটেন্ডেড কম্পপ্লেক্স ফিল্ডের সমস্যাগুলো অঙ্গদ তুড়ি মেরে সলভ করে দেয়। নতুন পৃথিবী বানাচ্ছে তারা। তবে এতো তাড়া কীসের। এই পৃথিবীর বুকে কি গ্রহ নক্ষত্রের অভাব আছে?

ক্লারা সুর দেয়, বসুন্ধরা গায়, রোগীকে সুস্থ করতে মেডিকেল থ্যারাপির জুড়ি নেই, টিনটিন এখন এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। মিঃ শ্বেতবাহন ভাবছেন নতুন করে অংক শেখার কথা। শ্যাম এবারেও রাইটার। তার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। 

রবীনহুড বরাবরই মুখচোরা। সে নীরবে সকলকে দেখে। তার কাজ পৃথিবী জোরা একটি রাস্তা বানানো। এই রাস্তা বানাতে বানাতে তার সমস্ত স্বপ্নগুলোকে তুলে দেয় প্ল্যানিং মাস্টার অঙ্গদের কাছে, তারপর  নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে ভাবতে থাকে, বন্ধুদের নিয়ে বেঁচে থাকার মতো এতো আনন্দ আর কোথাও নেই। 

 

 





















 

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , পর্ব চার


সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

পর্ব চার

চিরশ্রী দেবনাথ



হোস্টেলে সকাল থেকেই আজ নানান হইচই। প্রতিবাদে সামিল হতে সবাই রাজি। ঈরা একটু নিমরাজি।  সবার সঙ্গে হ্যাঁ না মেলালে আবার নানারকম কথা শুনতে হবে , কিন্তু এসব তো আসলে সময় নষ্ট। ছোটবেলা থেকেই ঈরা পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস। ঈরার বেসিক ধারণা তার পৃথিবীটা শুধু পড়া দিয়েই গড়া,  যে পৃথিবী খুব নিরাপদ,  বাইরের কোন ঝড় ঝাপটা তাকে কখনো ডিস্টার্ব করবে না। মোটকথা পড়ার বাইরে , রেজাল্টের বাইরের পৃথিবী নিয়ে ঈরার কোন দরকার নেই,  নিজস্ব জগতে শুধু তারই পছন্দের কয়েকজন মানুষ থাকবে,  তাদের সঙ্গেই সে খাবে দাবে , সামান্য ঘুরবে, পরীক্ষা দিয়ে ভালো চাকরি জোগাড় করে পৃথিবীর মাঝে যেন এক নিরাপদ গ্রিন হাউসের ভেতর তার বাকি জীবন কেটে যাবে। বাড়ি থেকে বাবার টেনশনে ভরা ফোনকল গতকাল থেকে ঈরাকে অস্থির রেখেছে, আজ আবার সবাই এটা নিয়ে পড়েছে। রাত  নটার পর হোস্টলের চত্বরে সাধারনত  বেরোনো নিষেধ কোনরকম ইমার্জেন্সি ছাড়া,  আর এমনিতেও পাহাড়ি জায়গায় রাত নটা মানে মধ্যরাত। এখানে   বিকেল পাঁচটায় পুরোপুরি সন্ধ্যা। কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায় চারপাশ। টিলায় টিলায় জ্বলে ওঠে ফ্লাড লাইট ।

কলকাতায় হবে রাতদখল। অভয়াকাণ্ডের প্রতিবাদে  সামিল হতে সবাই  নেমে যাবে রাতের রাজপথ দখল করতে , সৃজনী,  ইশা , সুহানি ওরাও চাইছে এমন একটা কিছু করতে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছে,   ওদের সঙ্গে থাকবেন প্রফেসর ডঃ অন্বেষা চৌধুরী ।

মানে ক্লাশের পর আজ কেউ আর হোস্টেলে ফিরছে না,  সারা সন্ধ্যা জুড়ে ক্যাম্পাসে চলবে প্রতীকী রাত দখলের জমায়েত,  বক্তৃতা এইসব। ঈরা ভীষণ বিরক্ত ।এসবে কি আদৌ কোন লাভ হবে কোথাও?

ঈরার মুড খারাপ দেখে সুহানি বলল আচ্ছা ঈরা বলতো , কাজের জায়গায় মেয়েদের যদি নিরাপত্তা না থাকে তবে এই পড়শোনা করে কি লাভ। ? আমার আশ্চর্য লাগছে তোমার নির্লিপ্ততা দেখে। তুমি যেন কিছুই নিতে পারছ না,  একজন লেডি ডাক্তার অন ডিউটি এরকম নৃশংসভাবে খুন হলো,  এটার জন্য তো দেশে রীতিমতো যুদ্ধ হওয়া উচিত।

প্লিজ সুহানি আমি ফিল করি,   কিন্তু এটা কোন সাধারণ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়. নয়,  যেখানে ছাত্র আন্দোলন, মিছিল মিটিং ইত্যাদি প্রত্যেকদিন লেগে থাকবে,  এটা গবেষণার জায়গা,  গভীর মনোযোগের জায়গা,  নাহলে বিরাট কিছু অ্যাচিভ করা যায়না।

তুমি তাহলে বিশাল কিছু অ্যাচিভ কর ঈরা , আমরা তো প্রতিবাদ করবই,  মনে রেখো এরকম এক জঘন্য স্যোসাল কালচারের মধ্যে তোমাকেও কাজ করতে হবে,  একটা মৃত্যু বলে দিল মেয়েদের মেধাও অনেকের কাছে বিপজ্জনক ।

সুহানি চলে গেল পোস্টার বানাতে , আজ গান কবিতা বা নাচ নয়,  শুধুই চিৎকার একটা ভয়াবহ চিৎকার যেন ফেটে পরে চারদিকে।

ঈরাও যাবে,  নিশ্চিত। কিন্তু ঈরা বুঝতে পারেনা এতো চিৎকার কোথায় গিয়ে মরে যায়,  আর ফিরে আসতে পারেনা মানুষের কন্ঠে।

প্রফেসর অন্বেষা চৌধুরী থাকছেন।  

তিনি EIIMS এর পিওর ম্যাথমেটিক্সের অন্যতম সিনিয়র প্রফেসর। তার বর্তমান গবেষণার বিষয় Topological Data Analysis ,  তাকে ঈরার একদমই ভালো লাগেনা । ভীষণ অহংকারী মনে হয়,  ছাত্রছাত্রীদের থেকে যেন অনেক দূরে ওনার বসবাস । ক্লাশে আসেন,  জোরদার লেকচার দেন,  সবাই ফলো করে ওনার পড়ানো,  পারতপক্ষে কোন স্টুডেন্টের সঙ্গেই কথাবার্তা বলেন না,  এরকমই মনে হয় ঈরার । বিশেষ করে ঈরাও ওনাকে এড়িয়ে চলে, এই বিষয়ে তো খুব বেশি ছাত্র ছাত্রী নেই। জনাকয়েক স্টুডেন্টই আসে যাদের গবেষণার সঙ্গে ব্যাপারটির যোগাযোগ আছে।  তাই এখানে কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে টিচারদের বন্ডিং তৈরি হয়ে যায়। তবে অন্বেষা ম্যাডামের সঙ্গে আবির খুব কথা বলে কারণ তিনি আবিরের অন্যতম গাইড টিচার ।সুহানির কথাবার্তায় মনে হলো ওরও বেশ ভালো সম্পর্ক। তাহলে কি ক্লাশের বাইরেও অন্বেষা চৌধুরী ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেশেন ।আসলে তিনি এখানকার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও অনেকটা পালন করেন, তবে ঈরার সঙ্গে তো তিনি কখনো নিজে থেকে কথা বলেননি ।অত্যন্ত কঠোর ভাব ধরে থাকেন,  যা ঈরার অসহ্য লাগে ।ঈরাও কি খানিকটা এরকম?  যাকে আর কয়েকদিন পর সবাই এড়িয়ে চলবে। রাত দখলের বিষয়টিতে সবাই ইনভলভড হয়ে যাচ্ছে,  আজ কারোরই পড়াশোনায় মন নেই। কলকাতায় ডাক্তারদের গণ সমাবেশ,  সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ,  তীব্র ঘৃণা আর প্রতিবাদ এই সুন্দর শৈলশহরের  উত্তাপহীন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে এসেও ঢেউয়ের মতো এসে আছড়ে পড়েছে। 


মুখার্জি স্যার সপ্তাহে তিনদিন ক্লাস নেন,  আজ ওনার ক্লাস নেই,  কিছুসময় সাইবার ক্যাফে তে কাটাবে বলে ঠিক করল ঈরা । কয়েকটা  জিনিস সার্চ করার ছিল,  এক্ষেত্রে নিজের ল্যাপটপের চেয়ে এখানে করা ভালো , এতে নেট কানেকশনও ভালো পাওয়া যায়,  কাজ করতেও আরাম।


CyberNode যেন EIIMS এর একটি উজ্জ্বল পালক। ইন্সটিটিউশনের এক কোণে অবস্থিত আধুনিক ডিজিটাল রিসার্চ ক্যাফে । 

ঢোকার মুখেই , দেয়ালের ঠিক ওপর লেখা


 "Information is the true infinity."


লাইব্রেরির পেছনের দিকের দোতলায় গ্যালারির পাশে কাচের দেয়ালঘেরা জায়গাটি প্রথম দেখায় অনেকটা আধুনিক ক্যাফের মতো। কিন্তু ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে কফির চেয়ে কোডিং বেশি, আর চায়ের চেয়ে চিন্তা গভীর। এমন কি যে কেউ সেখানে ঢুকতে পারেনা। 

প্রবেশদ্বারে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানার – ছাত্রছাত্রীদের আইডি কার্ড দেখালে দরজা খুলে যায়। ভেতরে  soft lighting—সাদা, নীল আর হালকা সবুজ আলো মিশে এক গাঢ় একাগ্রতার পরিবেশ তৈরি করেছে। দেয়ালজুড়ে সাউন্ডপ্রুফ বুথ – প্রতিটিতে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেস্কটপ, তিন মনিটর, উন্নত গ্রাফিকস কার্ড, হাই স্পিড নেট কানেকশন এবং প্রি-ইনস্টলড জার্নাল সার্চ ইঞ্জিন, ম্যাথ ল্যাব, পাইথন, R, ম্যাথমেটিকা ইত্যাদি সফটওয়্যার। ডান পাশে "Global Access Pod" নামে পরিচিত পাঁচটি ছোট কিউবিকল – এখান থেকে IEEE, JSTOR, Springer, Elsevier, arXiv–এর মতো আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে প্রবেশ করা যায়। 

মাঝে কয়েকটি অ্যানালগ ডেস্ক রয়েছে—যেখানে শুধু কাগজ-কলম, রুলার দিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা চলে। এখানকার দেয়ালে একপ্রস্থ সফ্ট বোর্ড। কেউ ইচ্ছে করলে কিছু পিন করে যেতে পারে যদি অন্য কারো কাছে সম্ভাব্য কোন উত্তর থাকে। 

প্রতিদিন সন্ধ্যে ছ’টা থেকে সাতটা পর্যন্ত একঘণ্টা আল্ট্রা সাইলেন্স জোন হয়—যখন কেউ কথা বলে না, শুধু কিবোর্ডের শব্দ, স্ক্রলের হালকা শব্দ , আর কোথাও কোথাও নিঃশব্দে ঘাম ঝরার মতো চিন্তার তীব্রতা ছড়িয়ে থাকে।


এক পাশে রাখা থাকে ‘Research Query Box’—যেখানে কেউ চাইলে নাম না দিয়ে জটিল প্রশ্ন ফেলে রাখতে পারে, এবং অন্যরা তাদের মতামত যোগ করতে পারে। তবে অনেকেই বলে এখানে কিছুই না রাখতে, কারণ চিন্তা চুুরি হয়ে যেতে পারে।

তাছাড়াও যে যার গবেষণার গোপনীয়তার কারণে সার্চ হিস্ট্রি পর্যন্ত ডিলিট করে যায়। 

CyberNode যেন শুধুই একটা ডিজিটাল ঘর নয়—এটা ঈরার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি ধ্যানঘর,  এখানে বসলে তার মনে হয় এই ইউনির্ভাসের সকল কোণ থেকে সংখ্যারা যেন তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। বিকেলবেলার দিকে এলে কাচের জানলা দিয়ে দেখা যায় কুয়াশার দীর্ঘ আস্তরণের পরও মাঝ আকাশে উঁকি দিচ্ছে একটি নক্ষত্র,  যার আলো এখান থেকে ম্লান কিন্তু আসলে হয়ত সে সুতীব্র আলোর ঝলকানি,  কী অদ্ভুত এক আপেক্ষিকতা। 


ঈরা এক মনে হাঁটছে। আজ সে পরে আছে নীল রঙের একটি কুর্তি আর সাদা কটন প্যান্ট। চুলে টাইট করে বিনুনী বেঁধে নিয়েছে। ঢোকার মুখে বাবাকে ফোন করল। বাবা বললেন , তুই যে একা একা সাইবার ক্যাফেতে বসে কাজ করবি সেটা কি নিরাপদ?  আরো কাউকে নিলি না কেন সঙ্গে?

বাবা , এভাবে নিজের কাজ করা যায় না,

কিছু কিছু কাজ একাও করতে হয়। তাছাড়া 

এখানে সব জায়গায় গার্ড থাকে,

বাবা বলছে আরে অভয়ার ওখানেও সিভিক পুলিশ ছিল!

তাহলে কি এতো বছরের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম জলে দিয়ে বাড়ি চলে আসব  ?  শুধু ভয়ে ?


ঈরার রাগ উঠলেও বাবাকে কিছু বলতে সে পারেনা,  নরম স্বরে বলল কিছু হবে না বাবা , এখানকার পরিবেশ খুব ভালো , একদমই অন্যরকম। তুমি আর মা আসো আরো একবার,  

আমরা পাহাড় ঘুরে আসব। এখন রাখি,  চিন্তা করো না। 

আই ডি কার্ড স্ক্যান করিয়ে ঈরা ঢুকে পড়ল ভেতরে । 

বাঁদিকে ,কফির ভেন্ডিং মেশিনের পাশে একটা ছোট ‘চুপচাপ কোণা’ – যেখানে  প্রফেসর বা পিএইচডি স্কলাররা   বসে কোনো সংকেতপদ্ধতি বা জটিল গণিতের সমস্যার সমাধানে ডুবে থাকেন। একটি ছোট ক্লাসরুমের মতো বলা যেতে পারে। 

 ছোট্ট টেবিলের ওপর বিস্কুটের কৌটোও রয়েছে।

ঈরা দেখল সেখানে আজ আবির আরো দুজন

বসে কথা বলছে , এই স্যারের নাম ডঃ কুলকার্নি,  আবির ওনার আন্ডারে একটা পেপার করবে সেদিন শুনেছিল। ঈরার অবশ্য এই প্রফেসরের সঙ্গে এখনো কোন রকম প্রয়োজন পড়েনি।  

না পড়লেই ভালো । ঈরা শুধু মুখার্জি স্যারের স্টুডেন্ট হয়েই থাকতে চায়। ইচ্ছে হয় ঈরা  সামনে বসে থাকবে আর স্যার বোঝাতে থাকবেন,  কলমের সূক্ষ্মরেখায় তৈরি হবে নতুন কোন অংক,  যার সমাধান শুধু ঈরার কাছেই আছে।

দূর,  এসব ভাবনা যে কেন আসে,  নিজের ওপরই রাগ হলো,   জানলার ওপাশে একটি খ্রিসমাস ট্রি,  বেশ লম্বা ,  আর ফাঁক দিয়ে তাকালে  চোখে পড়ে দূর পাহাড়ের আবছা অবয়ব,  এটাই ঈরার সবচেয়ে প্রিয় বসার জায়গা,  অন্য কেউ বসা থাকলে অবশ্য সে আর এক জায়গায় বসে , আজ কেউ নেই,  তাই 

 প্রিয় কোণটা বেছে নিয়ে সে বসে পড়ল, তার 

সাইডে পোস্ট-ইট নোটে লেখা একটি লাইন ,


“Don’t shut down the system. The proof is coming.”


মণিপুরের জঙ্ঘা

মণিপুরের জঙ্ঘা ( গল্প)

চিরশ্রী দেবনাথ

খুব সাবধানে চাপা দিয়ে দিয়ে রান্না করছি । একটুও যেন স্মেল না বেরোয় । কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে তাহলে। আজ শনিবার। শুক্রবার বিকেল বেলা এই ফ্ল্যাটবাড়ির রুমগুলো বেশ ফাঁকা হয়ে যায়। বিশেষ করে যেকোন বড় পরীক্ষা শেষের পর।
চড়চড়ে রোদে দুপুর আরো তেঁতে উঠছে। আমি চারতলায় থাকি। এখান থেকে রাস্তাও মোটামুটি দেখা যায়। হরি আঙ্কলের চা স্ন্যাক্সের  দোকানে কয়েকজন বসে আছে , আশা করি  এতোদূর অব্দি গন্ধ যাবেনা। আর বাড়িওয়ালা আন্টি তো আর থাকেন না বাড়িতে । তাই আমি আজ মোটামুটি টেনশন ফ্রি। আরো কয়েকদিন রেঁধেছি এরকমই সুযোগ বুঝে । আজ শেষ হয়ে গেল । আবার বাড়ি গেলে আনব। কিন্তু কবে বাড়ি যাবো?

দিল্লির দিলশাদ গার্ডেনের পাশের এই গলিপথ আর পুরনো ফ্ল্যাটগুলো ছাত্রছাত্রীদের কাছে কখনো স্বর্গ কখনো নরক।
আমার কাছে স্বর্গ।
ছোটবেলায় অনেক দূরে ছিল প্রাইমারি স্কুল। রোজদিন যেতে পারিনি। বাবা যেদিন পেরেছে সাইকেলে করে দিয়ে গেছে। কবে থেকে যেন মনের মধ্যে ইচ্ছেটা চাঁগাড় দিয়ে উঠেছিল যে করেই হোক  বড় জায়গায় পৌঁছুতে হবে।
তারপর থেকে মিড ডে মিলের পোকা ধরা চাল ,জলের মতো ডাল সবই স্বাভাবিক লেগেছে । জেদের জন্ম নিলে মানুষ গাছের মতো সহনশীল হয়,  আমি সহনশীল হতে চাই আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকের টিলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাজ পড়ে পুড়ে গিয়ে আবার বেঁচে ওঠা বটগাছটির মতো , চেষ্টা করে যাচ্ছি এখনো। 

 পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরের নবোদয় স্কুলে যেদিন চান্স পেলাম,  মনে হলো পৃথিবী আমার।
  তিনবছর পিছিয়ে ছিলাম। কিন্তু তাতে কি? 
প্রত্যেক ক্লাশে ফার্স্ট হয়েছি। এই দেশে অফিসার হতে পারলে মজাই মজা এটা আমার বিশ্বাস ।

শুধু একদিন ভয় পেয়েছিলাম, সামার ভেকেশনে বাড়ি গিয়েছি । এইসব পাহাড়ি পথ আর ঘরবাড়ি আমার কত্ত চেনা। প্রাণের বান্ধবী শাংবির কাছে যাবো, কিন্তু কয়েকদিনে যেন বদলে গেছে গ্রাম। 
  কয়েকটি কুকি ছেলে হঠাৎই পথ
 আঁকড়ে দাঁড়িয়েছিল।

"না জি? হি লেহ না লাম লো।"

আমার ভেতরেও ঢুকে গিয়েছিল একটি সাপ। হাসতে হাসতে জানান দিলাম আমি ডাইনি , জিন ভর করেছে,  অভিনয়টা নিঁখুত থাকায় সেদিন বেঁচে গেছিলাম , কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম। বুঝলাম পালাতে হবে বহুদূরে… কোনদিন। 

আমার রুমের সঙ্গে এক চিলতে কিচেন অ্যারেঞ্জমেন্ট, একটি ব্যালকনির অর্ধেকেরও কম হবে আয়তনে , যেন পাশের ফ্ল্যাটের সঙ্গে ঠিক এডজাস্ট হচ্ছিল না বলে জুড়ে দিয়েছে  এই রুমটির  বারান্দায় , বিরাট  ভাগ্য মনে হয় আমার,  এখানে দাঁড়ালে রাতের আবছা নক্ষত্রদের দেখা যায় আর বর্ষার দিনে  রাজধানির বৃষ্টি । দিনের বেলা চড়া রোদে দুটো বালিশও দিয়ে রাখা যায় কখনো সখনো ,
গলির অপরপ্রান্তের ফ্ল্যাটগুলোতে আমারই মতো বহু ছাত্রছাত্রী। পড়াশুনো এখানে নেশার মতো ছড়িয়ে আছে, তাই বুক ভরে শ্বাস নিই , হয়তো গ্রামের মতো বিশুদ্ধ নয় কিন্তু বিশ্বাসী , পরিশ্রম আর মেধার মিশ্রণে বয়ে যায় সৎ বাতাস ।

আসলে এই বাড়িটা  ঠিক পরিকল্পিত আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়ি নয়। মনে হয় আসল মালিক এটার বন্দোবস্ত করার আগে পর্যন্ত আমরা ছাত্র ছাত্রীদের ভাড়া থাকতে দিচ্ছেন।  বাড়িটিতে আমার রুমের রেন্টই সবচেয়ে কম।
রান্না ,& পড়া, কোচিং গিয়ে টেস্ট দিয়ে বিকেলবেলা ঘরে এসে ঘুমোব।  একটা হাফ জানলা আছে,  সেদিক দিয়ে আকাশ দেখা যায়, বেশিরভাগ সময়ই ঘোলাটে তবুও কোনদিন সামান্য নীলচে আভা।
টাকাপয়সার ব্যাপারে এখন একটু নিশ্চিন্তি।  বাচ্চাদের তিনটে কোচিং সেন্টারে পড়াই, মন্দ টাকা না,  বাড়ি থেকে বাবা পাঠায় কিছু। কেমন করে জানিনা। শুনেছি চাষবাসে প্রবলেম হচ্ছে,  খেতের ফসল পুড়িয়ে দিচ্ছে,  আগুন লাগাচ্ছে রাতের অন্ধকারে,  বুকের  কোণে পাথর চাপা দিয়ে রাখি বিকট এক টেনশন। আর একটি কোণে শুধু স্বপ্ন নয় অপর্যাপ্ত জেদ, শুধু একটা জীবন চাই সুনিশ্চিত।
ছোট থালায় ভাত বেড়ে নিলাম, সামান্য গলা গলা।   গরম  ধোঁয়া উঠছে, নাকের কাছে ইরোম্বার বাটিটা নিয়ে প্রাণপনে গন্ধটা নিচ্ছি বুক ভরে । তিনটে ছোট ছোট ঙারি ছিল, সঙ্গে আলু, বিনস যা সব্জি আবদুল আঙ্কলের দোকানে পেয়েছি। একটু বেশিই পরিমানে করেছি।
প্রথম গ্রাস মুখে দিলাম।
দরজায় নক 
ধুত্তোরি , পরে আছি হাফ পেন্ট,  স্যান্ডো গেঞ্জি।
নক করেই চলেছে
কেউ কি টের পেয়ে গেলো ড্রাই ফিসের স্মেল? একটা ডিশ দিয়ে ঢেকে স্পিডে বাটিটা ঢুকিয়ে দিলাম ছোট্ট খাটিয়াটার নিচে। ঘিয়ের শিশি আর নুনের কৌটো ভাতের সামনে রেখে , ঢোলা টি শার্টটা গলিয়ে দরজা খুললাম।
মুখে প্রচুর হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরভ। আরভ শর্মা। পিওর রাজস্থানি  ব্রাহ্মণ।

অন্যসময় আরভকে দেখলে আমি মোটামুটি খুশি হই।
আরভ আমার বন্ধু নয়। কিন্তু একই কোচিং সেন্টারে পড়ি,  আমি একটু সিরিয়াস বলে বেশ কয়েকজন এখন বন্ধুত্ব করতে চায় , প্রথমদিকে  পাত্তাই দিত না। ওরাই তো বোধহয় আর্য। লম্বা , ফর্সা নিঁখুত চেহারা। আমি বেঁটে , চোখগুলো ছোট,  নাকের ওপর দিয়ে পাহাড় চলে গেছে, সম্বল একটা আছে অবশ্য ,
 ভালো ইংলিশ বলতে পারি , ব্রেনটাও ওদের থেকে খারাপ না। 
“অরে সরকো, দরওয়াজে প্য খড়ো রহসি কি অন্দর আসি ভি?"
আরভ আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে রুমে ঢুকে গেল।
আর ইয়্যু কুকিং ড্রাই ফিস ?
নো নোওও নট অ্যাট্ ওল , আমি প্রায় চিৎকার করলাম এবং আমি যে মিথ্যা বলছি সেটা বেশ বোঝা গেল।
আরভ খুব বিশ্রিভাবে হাসল …

আন্টি নে ফোন কর লে, তু তো গই, আব তো ও কহেগি তান্নে কিরায়ো নীঁ মিলসি!"

 I have not cooked dry fish,  I am eating just rice and ghee , দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাইলাম।
আচমকাই আরভ ঝুঁকে খাটের তলায় দেখতে লাগল 
আমি ওকে টেনে তুললাম
আরভের তাকানোর মধ্যে বিশুদ্ধ বিদ্রুপ ,

ফ্রম রোটেন ফিস টু এক্সিকিউটিভ ডেস্কস …হোয়াট এ ফ্যারিটেইল!  সেইম সেইম!  ইটস ফিকশন!

আরভ দাঁতে দাঁত চেপে বলছিল কথা গুলো 

আমি হিস হিস করে বললাম.

আরভ আর ইয়্যু সেলফিস ? 

আরভ হঠাৎ একটু রিলাক্স হয়ে গেলো,   

আজ কোথি নেহি জা রাহা হুঁ ম্যায়… থোড়া মুড হ্যায় তেরে সাথ টাইম স্পেন্ড করনে কা, ব্যস!
তুম জাদা সুন্দর তো নেহি হো, লেকিন সেক্সি তো হো—ইয়ে তো মাননা পরেগা

বুঝলাম আরভ খুব সহজ একটা ই্যকুয়েশন  কষে  এখানে এসেছে?  

বেশ জোরে আরভকে থাপ্পরটা মারলাম 

মণিপুরের মেয়ের থাপ্পর

আরভের নাক দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল ,

শান্তভাবে বললাম গেট আউট
একটুখানি থমকাল আরভ
তারপরই চোখের নিমেষে আমার খাটিয়ার তলা থেকে বাটিটা নিয়ে ব্যালকনিতে এসে নিচে ফেলে দিল , 
 চিৎকার করে বলল , 

সবকো বতা দুঁগি, ছুপকে ছুপকে কেয়া খাতে হো তুম... ছোটে লোক হো তুম, বহুত ছোটে!

বহু নিচে বাটিটা পড়েছে,  তাই স্টিলের বাটি পড়ার আওয়াজটা শুনতে পেলাম না

একটা অস্বাভাবিক চাউনি আমার দিকে ছুৃঁড়ে দিয়ে আরভ চলে গেল

ঘি খেতে ইচ্ছে করছিল না আর। জল লবন আর একটা কাঁচালঙ্কা মেখে ভাত খাবার চেষ্টা করছি,   চোখে জল এলো সামান্য। গিলতে পারলাম না , ঢেকে রেখে দিলাম।
হয়তো আগামীকাল আমাকে নতুন রুম খুঁজতে হতে পারে , আতঙ্ক হলো,  আমাদের প্রায়ই নানান অসুবিধায় পড়তে হয়,  মিজো ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছিল  , কিন্তু বাড়তে দেওয়া হয়নি। 

বিকেলের আলোয় গলিটাকে দেখছিলাম,  প্রিন্টিং জোনের বড় সাইনবোর্ডটা , একটু পরে পরেই  চায়ের দোকান, দূরে কালীমন্দিরের চুড়োটা, সামনে ছোলেবাটুরে ,মোমো , চাউমিন,  আলুটিক্কা , গোলগাপ্পার ঠেলাগুলো ঝাঁপ খুলতে শুরু করেছে, SSC  প্রিপারেশন সেন্টার ,  নিট,  জে ই র বিভিন্ন স্পেশাল কোচিংএ  ছাত্রছাত্রীরা এক ব্যাচ ঢুকে আর এক ব্যাচ বের হচ্ছে,
ছোট্ট ছোট্ট ঘুপচি দোকানগুলোতে সব্জি, খাবার কি নেই এই ছোট্ট গলিতে ?
বহুদূরে পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা   গ্রামটাকে ভয়ঙ্কর দুর্গম মনে হয় এখন ,  যেখানে সামান্য ঔষধ কিনতে হলে কতদূর আসতে হয় ,
 নিজের ছোট্টখাট্টো শরীরটার দিকে তাকিয়ে একটু আগে আরভের কথাগুলো ঠাস ঠাস করে বাজতে লাগল ভেতরে। 
আরভরা তো রাজস্থানি ব্রাহ্মণ।

 , ওরাই কি আর্য সন্তান?
আর আমাদের মণিপুরে যেসব মিলিটারিরা   ছিঁড়েছে মণিপুর কন্যাদের শরীর ,  তারাও কি আর্য ?
পড়ায় মন বসল না
হাতে দুটো বই নিয়ে নিচে নেমে গলিতে হাঁটতে লাগলাম । 

দিল্লির পূর্ব প্রান্তের এক টুকরো নকশা যেন দিলশাদ গার্ডেন। দুরন্ত ব্যস্ততা নয়, আবার পুরোদস্তুর নির্জনতাও নয়—মাঝামাঝি একটা মিশ্র অনুভূতির জায়গা।
 রাস্তাগুলো ছায়াঘেরা। দুপাশে সারি সারি গাছ— পুরনো কাঁঠাল, কুরুল, আর কিছু নাম না জানা ঝোপ-গাছ। শেষ হয়ে যাওয়া দুপুরে হাঁটলে পাতার ফাঁক দিয়ে রোদের ফালি মাটিতে বিছিয়ে থাকে, আর সন্ধেবেলা হালকা বাতাসে ঝরঝর শব্দ হয় পাতার।
কিন্তু এসব দেখে আমার লাভ নেই। আমি ভাতের মানুষ । দুপুরবেলা ভরা পেট ভাত না খেলে ব্রেনে কিছুই ঢোকে না। 
আর হাবিজাবি খাবার সহ্যও হয় না। অতিরিক্ত তেল মশলা  পাকস্থলী নিতে  পারেনা। 

দূর থেকে চোখে পড়ল সীতা আন্টির 
‘ছোটি ধাবা’ এখনো খোলা। 
ভাত তো থাকবে না জানা কথাই। সীতা আন্টি ভাত কম রান্না করে। রুটি আর ডাল পেতে পারি। সেই ঘন ঘন ঘি দেয়া ডাল । তবুও খাবো।
চুপচাপ গিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে রুটি ডাল দিতে বললাম ।
সীতা আন্টির ছেলে বলল 
দাল তো খতম হোগেয়া, মিক্সড ভেজিটেবল বনায়া হ্যায়, চলে‌গা না?

ঝটপট চারটা রুটি আর সব্জি খেয়ে নিলাম ।

ছেলেটি ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জলের বোতলটা আমার সামনে রাখতেই মনে হলো পৃথিবী ততটা খারাপ নয়।
পেটে খাবার পড়তেই কালকের ক্লাস টেস্টের পড়া গুলো মনে হতে লাগল ।

 Social Contract Theory , লক, হবস্ ও রুশো কীভাবে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেছেন তা নিয়ে আলোচনা আর Democracy vs. Dictatorship 

কেমন যেন হাসি পেতে লাগল । আমার দেশ,  আমার গণতন্ত্র ! 
 কিন্তু আমাকে প্রতিনিধিত্ব করে শুধু  একটি অনার্য গন্ধ । 

দুইপাশে মোটা থামওয়ালা ভারী গ্রিলের গেট দেওয়া সামনের ফ্ল্যাটবাড়িটিকে কেন যেন প্রথম থেকেই আমার খুব ভয় লাগত । এই পাড়ার সবচেয়ে গম্ভীর প্রকৃতির ফ্ল্যাটবাড়ি , আবার পেছনে বড় বড় গাছও রয়েছে। 

এখন সেখানেই রুমের খোঁজ করব। 
গেটে তালা ছিলনা। ঢোকা গেল। 

 কলিংবেল বাজানোর প্রায় একমিনিট পর  একজন দরজা খুললেন।
জিজ্ঞেস করলাম  , রুম হোগা?  

বৈঠে বৈঠে ,  বলে লোকটি চিৎকার করে বলল 'ম্যাডাম জী, এক স্টুডেন্ট রুম মাঙ্গনে আয়া হ্যায়!'

আমাকে দেখে তাহলে এখনো স্টুডেন্টই মনে হয়।

মোটা গদি দেওয়া পুরনো মডেলের ব্রাউন কালারের সোফা। একটা জানলা দিয়ে পেছনের বাগান দেখা যাচ্ছে। গাছ আর রোদের গন্ধ মেশানো ঘরটি। জানলা থেকে চোখ সরাতেই চোখে পড়ল বিশাল একটি ওয়েল পেন্টিং,  যার ছবিটি খুব চেনা। মণিপুরের রাসলীলা নিয়ে আঁকা । পেইন্টিংটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। শিল্পীর নাম ক্ষিতীন্দ্রমোহন মজুমদার । চিনিনা আমি। চিনতেও চাইনা। কি হবে চিনে?  অভিজাত লোকজন এসব ওয়েল পেন্টিং  দেয়ালে টাঙিয়ে নিজেদের শিল্পবোদ্ধা জাহির করে। তবে ছবিটি সুন্দর। আর্টিস্ট  মন প্রাণ দিয়ে ছবিটিতে ভক্তি আর প্রেমের রঙ ঢেলেছেন। 

ভালো খুব ভালো । কিন্তু বাড়ির মালিক তো এখনো আসছেন না? 

তুম স্টুডেন্ট হো?   কিয়া চাহিয়ে বেটি? রুম? 

 ভদ্রমহিলার গলার স্বর খুব নরম। কেমন যেন ভেতরটা পাঁক দিয়ে উঠল। আমার মায়ের বয়সীই হবেন ।
কিন্তু তারপরই একটু  গম্ভীর হলেন,  বললেন

“"তুমহারা নাম? কহা সে আঈ হো? রুম চাহিয়ে তো এক দো বাত ক্লিয়ার কর লো পহলে।"

ম্যায় চিংথাংগম লেইশাংবি। মণিপুর সে আঈ হুঁ।
নাম থোড়া লম্বা হ্যায়, ফ্রেন্ডস লোক বুলাতে হ্যায় 'লেই'।
বহুৎ সারা এক্সাম দেনা হ্যায় আলাগ আলাগ। ড্রাই ফিশ খাতে হ্যায়, রান্নে মে থোড়ি বদবু আতি হ্যায়... রুম দেঙ্গে কেয়া?

ভদ্রমহিলা চোখ দুটো সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন …

 অপেক্ষা করছি উত্তরের। 

 শর্টস পরা উঁড়ু দুটোর দিকে তাকালাম,  বিড়বিড় করে নিজেকে সাহস দিচ্ছি , একে বলে মণিপুরের জঙ্ঘা, ছোটখাটো অপমান কোনো ব্যাপারই না,  ক্লান্তিটান্তি ওসব ফালতু কথা …

বিঃ দ্রঃ

কুকি ভাষায়

(না জি? হি লেহ না লাম লো।)

বাংলা 

(তুই কে?  এটা আর তোর জায়গা না )

( প্রকাশিত, শারদীয়  ত্রিপুরা দর্পণ )

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

উপন্যাস

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

চিরশ্রী দেবনাথ


পর্ব চার

হোস্টেলে সকাল থেকেই আজ নানান হইচই। প্রতিবাদে সামিল হতে সবাই রাজি। ঈরা একটু নিমরাজি।  সবার সঙ্গে হ্যাঁ না মেলালে আবার নানারকম কথা শুনতে হবে , কিন্তু এসব তো আসলে সময় নষ্ট। ছোটবেলা থেকেই ঈরা পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস। ঈরার বেসিক ধারণা তার পৃথিবীটা শুধু পড়া দিয়েই গড়া,  যে পৃথিবী খুব নিরাপদ,  বাইরের কোন ঝড় ঝাপটা তাকে কখনো ডিস্টার্ব করবে না। মোটকথা পড়ার বাইরে , রেজাল্টের বাইরের পৃথিবী নিয়ে ঈরার কোন দরকার নেই,  নিজস্ব জগতে শুধু তারই পছন্দের কয়েকজন মানুষ থাকবে,  তাদের সঙ্গেই সে খাবে দাবে , সামান্য ঘুরবে, পরীক্ষা দিয়ে ভালো চাকরি জোগাড় করে পৃথিবীর মাঝে যেন এক নিরাপদ গ্রিন হাউসের ভেতর তার বাকি জীবন কেটে যাবে। বাড়ি থেকে বাবার টেনশনে ভরা ফোনকল গতকাল থেকে ঈরাকে অস্থির রেখেছে, আজ আবার সবাই এটা নিয়ে পড়েছে। রাত  নটার পর হোস্টলের চত্বরে সাধারনত  বেরোনো নিষেধ কোনরকম ইমার্জেন্সি ছাড়া,  আর এমনিতেও পাহাড়ি জায়গায় রাত নটা মানে মধ্যরাত। এখানে   বিকেল পাঁচটায় পুরোপুরি সন্ধ্যা। কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায় চারপাশ। টিলায় টিলায় জ্বলে ওঠে ফ্লাড লাইট ।

কলকাতায় হবে রাতদখল। অভয়াকাণ্ডের প্রতিবাদে  সামিল হতে সবাই  নেমে যাবে রাতের রাজপথ দখল করতে , সৃজনী,  ইশা , সুহানি ওরাও চাইছে এমন একটা কিছু করতে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছে,   ওদের সঙ্গে থাকবেন প্রফেসর ডঃ অন্বেষা চৌধুরী ।

মানে ক্লাশের পর আজ কেউ আর হোস্টেলে ফিরছে না,  সারা সন্ধ্যা জুড়ে ক্যাম্পাসে চলবে প্রতীকী রাত দখলের জমায়েত,  বক্তৃতা এইসব। ঈরা ভীষণ বিরক্ত ।এসবে কি আদৌ কোন লাভ হবে কোথাও?

ঈরার মুড খারাপ দেখে সুহানি বলল আচ্ছা ঈরা বলতো , কাজের জায়গায় মেয়েদের যদি নিরাপত্তা না থাকে তবে এই পড়শোনা করে কি লাভ। ? আমার আশ্চর্য লাগছে তোমার নির্লিপ্ততা দেখে। তুমি যেন কিছুই নিতে পারছ না,  একজন লেডি ডাক্তার অন ডিউটি এরকম নৃশংসভাবে খুন হলো,  এটার জন্য তো দেশে রীতিমতো যুদ্ধ হওয়া উচিত।

প্লিজ সুহানি আমি ফিল করি,   কিন্তু এটা কোন সাধারণ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়. নয়,  যেখানে ছাত্র আন্দোলন, মিছিল মিটিং ইত্যাদি প্রত্যেকদিন লেগে থাকবে,  এটা গবেষণার জায়গা,  গভীর মনোযোগের জায়গা,  নাহলে বিরাট কিছু অ্যাচিভ করা যায়না।

তুমি তাহলে বিশাল কিছু অ্যাচিভ কর ঈরা , আমরা তো প্রতিবাদ করবই,  মনে রেখো এরকম এক জঘন্য স্যোসাল কালচারের মধ্যে তোমাকেও কাজ করতে হবে,  একটা মৃত্যু বলে দিল মেয়েদের মেধাও অনেকের কাছে বিপজ্জনক ।

সুহানি চলে গেল পোস্টার বানাতে , আজ গান কবিতা বা নাচ নয়,  শুধুই চিৎকার একটা ভয়াবহ চিৎকার যেন ফেটে পরে চারদিকে।

ঈরাও যাবে,  নিশ্চিত। কিন্তু ঈরা বুঝতে পারেনা এতো চিৎকার কোথায় গিয়ে মরে যায়,  আর ফিরে আসতে পারেনা মানুষের কন্ঠে।

প্রফেসর অন্বেষা চৌধুরী থাকছেন।  

তিনি EIIMS এর পিওর ম্যাথমেটিক্সের অন্যতম সিনিয়র প্রফেসর। তার বর্তমান গবেষণার বিষয় Topological Data Analysis ,  তাকে ঈরার একদমই ভালো লাগেনা । ভীষণ অহংকারী মনে হয়,  ছাত্রছাত্রীদের থেকে যেন অনেক দূরে ওনার বসবাস । ক্লাশে আসেন,  জোরদার লেকচার দেন,  সবাই ফলো করে ওনার পড়ানো,  পারতপক্ষে কোন স্টুডেন্টের সঙ্গেই কথাবার্তা বলেন না,  এরকমই মনে হয় ঈরার । বিশেষ করে ঈরাও ওনাকে এড়িয়ে চলে, এই বিষয়ে তো খুব বেশি ছাত্র ছাত্রী নেই। জনাকয়েক স্টুডেন্টই আসে যাদের গবেষণার সঙ্গে ব্যাপারটির যোগাযোগ আছে।  তাই এখানে কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে টিচারদের বন্ডিং তৈরি হয়ে যায়। তবে অন্বেষা ম্যাডামের সঙ্গে আবির খুব কথা বলে কারণ তিনি আবিরের অন্যতম গাইড টিচার ।সুহানির কথাবার্তায় মনে হলো ওরও বেশ ভালো সম্পর্ক। তাহলে কি ক্লাশের বাইরেও অন্বেষা চৌধুরী ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেশেন ।আসলে তিনি এখানকার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও অনেকটা পালন করেন, তবে ঈরার সঙ্গে তো তিনি কখনো নিজে থেকে কথা বলেননি ।অত্যন্ত কঠোর ভাব ধরে থাকেন,  যা ঈরার অসহ্য লাগে ।ঈরাও কি খানিকটা এরকম?  যাকে আর কয়েকদিন পর সবাই এড়িয়ে চলবে। রাত দখলের বিষয়টিতে সবাই ইনভলভড হয়ে যাচ্ছে,  আজ কারোরই পড়াশোনায় মন নেই। কলকাতায় ডাক্তারদের গণ সমাবেশ,  সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ,  তীব্র ঘৃণা আর প্রতিবাদ এই সুন্দর শৈলশহরের নিরুদ্রপ উত্তাপহীন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে এসেও ঢেউয়ের মতো এসে আছড়ে পড়েছে। 


মুখার্জি স্যার সপ্তাহে তিনদিন ক্লাস নেন,  আজ ওনার ক্লাস নেই,  কিছুসময় সাইবার ক্যাফে তে কাটাবে বলে ঠিক করল ঈরা । কয়েকটা  জিনিস সার্চ করার ছিল,  এক্ষেত্রে নিজের ল্যাপটপের চেয়ে এখানে করা ভালো , এতে নেট কানেকশনও ভালো পাওয়া যায়,  কাজ করতেও আরাম।


CyberNode যেন EIIMS এর একটি উজ্জ্বল পালক। ইন্সটিটিউশনের এক কোণে অবস্থিত আধুনিক ডিজিটাল রিসার্চ ক্যাফে । 

ঢোকার মুখেই , দেয়ালের ঠিক ওপর লেখা


 "Information is the true infinity."


লাইব্রেরির পেছনের দিকের দোতলায় গ্যালারির পাশে কাচের দেয়ালঘেরা জায়গাটি প্রথম দেখায় অনেকটা আধুনিক ক্যাফের মতো। কিন্তু ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে কফির চেয়ে কোডিং বেশি, আর চায়ের চেয়ে চিন্তা গভীর। এমন কি যে কেউ সেখানে ঢুকতে পারেনা। 

প্রবেশদ্বারে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানার – ছাত্রছাত্রীদের আইডি কার্ড দেখালে দরজা খুলে যায়। ভেতরে  soft lighting—সাদা, নীল আর হালকা সবুজ আলো মিশে এক গাঢ় একাগ্রতার পরিবেশ তৈরি করেছে। দেয়ালজুড়ে সাউন্ডপ্রুফ বুথ – প্রতিটিতে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেস্কটপ, তিন মনিটর, উন্নত গ্রাফিকস কার্ড, হাই স্পিড নেট কানেকশন এবং প্রি-ইনস্টলড জার্নাল সার্চ ইঞ্জিন, ম্যাথ ল্যাব, পাইথন, R, ম্যাথমেটিকা ইত্যাদি সফটওয়্যার। ডান পাশে "Global Access Pod" নামে পরিচিত পাঁচটি ছোট কিউবিকল – এখান থেকে IEEE, JSTOR, Springer, Elsevier, arXiv–এর মতো আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে প্রবেশ করা যায়। 

মাঝে কয়েকটি অ্যানালগ ডেস্ক রয়েছে—যেখানে শুধু কাগজ-কলম, রুলার দিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা চলে। এখানকার দেয়ালে একপ্রস্থ সফ্ট বোর্ড। কেউ ইচ্ছে করলে কিছু পিন করে যেতে পারে যদি অন্য কারো কাছে সম্ভাব্য কোন উত্তর থাকে। 

প্রতিদিন সন্ধ্যে ছ’টা থেকে সাতটা পর্যন্ত একঘণ্টা আল্ট্রা সাইলেন্স জোন হয়—যখন কেউ কথা বলে না, শুধু কিবোর্ডের শব্দ, স্ক্রলের হালকা শব্দ , আর কোথাও কোথাও নিঃশব্দে ঘাম ঝরার মতো চিন্তার তীব্রতা ছড়িয়ে থাকে।


এক পাশে রাখা থাকে ‘Research Query Box’—যেখানে কেউ চাইলে নাম না দিয়ে জটিল প্রশ্ন ফেলে রাখতে পারে, এবং অন্যরা তাদের মতামত যোগ করতে পারে। তবে অনেকেই বলে এখানে কিছুই না রাখতে, কারণ চিন্তা চুুরি হয়ে যেতে পারে।

তাছাড়াও যে যার গবেষণার গোপনীয়তার কারণে সার্চ হিস্ট্রি পর্যন্ত ডিলিট করে যায়। 

CyberNode যেন শুধুই একটা ডিজিটাল ঘর নয়—এটা ঈরার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি ধ্যানঘর,  এখানে বসলে তার মনে হয় এই ইউনির্ভাসের সকল কোণ থেকে সংখ্যারা যেন তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। বিকেলবেলার দিকে এলে কাচের জানলা দিয়ে দেখা যায় কুয়াশার দীর্ঘ আস্তরণের পরও মাঝ আকাশে উঁকি দিচ্ছে একটি নক্ষত্র,  যার আলো এখান থেকে ম্লান কিন্তু আসলে হয়ত সে সুতীব্র আলোর ঝলকানি,  কী অদ্ভুত এক আপেক্ষিকতা। 


ঈরা এক মনে হাঁটছে। আজ সে পরে আছে নীল রঙের একটি কুর্তি আর সাদা কটন প্যান্ট। চুলে টাইট করে বিনুনী বেঁধে নিয়েছে। ঢোকার মুখে বাবাকে ফোন করল। বাবা বললেন , তুই যে একা একা সাইবার ক্যাফেতে বসে কাজ করবি সেটা কি নিরাপদ?  আরো কাউকে নিলি না কেন সঙ্গে?

বাবা , এভাবে নিজের কাজ করা যায় না,

কিছু কিছু কাজ একাও করতে হয়। তাছাড়া 

এখানে সব জায়গায় গার্ড থাকে,

বাবা বলছে আরে অভয়ার ওখানেও সিভিক পুলিশ ছিল!

তাহলে কি এতো বছরের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম জলে দিয়ে বাড়ি চলে আসব  ?  শুধু ভয়ে ?


ঈরার রাগ উঠলেও বাবাকে কিছু বলতে সে পারেনা,  নরম স্বরে বলল কিছু হবে না বাবা , এখানকার পরিবেশ খুব ভালো , একদমই অন্যরকম। তুমি আর মা আসো আরো একবার,  

আমরা পাহাড় ঘুরে আসব। এখন রাখি,  চিন্তা করো না। 

আই ডি কার্ড স্ক্যান করিয়ে ঈরা ঢুকে পড়ল ভেতরে । 

বাঁদিকে ,কফির ভেন্ডিং মেশিনের পাশে একটা ছোট ‘চুপচাপ কোণা’ – যেখানে  প্রফেসর বা পিএইচডি স্কলাররা   বসে কোনো সংকেতপদ্ধতি বা জটিল গণিতের সমস্যার সমাধানে ডুবে থাকেন। একটি ছোট ক্লাসরুমের মতো বলা যেতে পারে। 

 ছোট্ট টেবিলের ওপর বিস্কুটের কৌটোও রয়েছে।

ঈরা দেখল সেখানে আজ আবির আরো দুজন

বসে কথা বলছে , এই স্যারের নাম ডঃ কুলকার্নি,  আবির ওনার আন্ডারে একটা পেপার করবে সেদিন শুনেছিল। ঈরার অবশ্য এই প্রফেসরের সঙ্গে এখনো কোন রকম প্রয়োজন পড়েনি।  

না পড়লেই ভালো । ঈরা শুধু মুখার্জি স্যারের স্টুডেন্ট হয়েই থাকতে চায়। ইচ্ছে হয় ঈরা  সামনে বসে থাকবে আর স্যার বোঝাতে থাকবেন,  কলমের সূক্ষ্মরেখায় তৈরি হবে নতুন কোন অংক,  যার সমাধান শুধু ঈরার কাছেই আছে।

দূর,  এসব ভাবনা যে কেন আসে,  নিজের ওপরই রাগ হলো,   জানলার ওপাশে একটি খ্রিসমাস ট্রি,  বেশ লম্বা ,  আর ফাঁক দিয়ে তাকালে  চোখে পড়ে দূর পাহাড়ের আবছা অবয়ব,  এটাই ঈরার সবচেয়ে প্রিয় বসার জায়গা,  অন্য কেউ বসা থাকলে অবশ্য সে আর এক জায়গায় বসে , আজ কেউ নেই,  তাই 

 প্রিয় কোণটা বেছে নিয়ে সে বসে পড়ল, তার 

সাইডে পোস্ট-ইট নোটে লেখা একটি লাইন ,


“Don’t shut down the system. The proof is coming.”


উপন্যাস, সংখ্যার শরীরে মৌমাছি


উপন্যাস 

চিরশ্রী দেবনাথ

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

পর্ব তিন

ঈরার ক্লাশ এখন Gauss Campus Hall এ , যা এক কথায় EIIMS ক্যাম্পাসের গ্ল্যামার  , ঠিক মাঝখানে যেখানে টিলাটা সামান্য উৃচু তার ওপর অর্ধেক গোলাকার অনেকটা গম্বুজের মতো দেখতে এই হলঘরটি  মনের মধ্যে কেমন যেন সম্ভ্রম জাগায়।  দুই দিকে প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে। 

ধূসর পাথরের গাঁথুনি , ক্যাম্পাস হলটিতে কেমন একটা ঠান্ডা আর গম্ভীর ভাব বজায় রাখে , এখানে ঢুকে ক্লাশ করার সুযোগ অর্জন করা খুব একটা সহজ কম্ম নয় এটা ভেবে ছাত্রছাত্রীদের মনেও থাকে প্রচ্ছন্ন গর্ব। 

হলে ঢুকতেই চোখে পরে কাঠের ব্যালকনিতে গড়া ধাপে ধাপে বসার ব্যবস্থা , মনে হয় নির্দিষ্ট কোনো গাণিতিক  অনুক্রমে যেন সাজানো হয়েছে। ছাদে আধচাঁদের মতো স্টিল-গ্লাসের ছাউনির ফাঁক দিয়ে সকালের আলো ঠিকরে পড়ে বোর্ডের ওপর—যেখানে জটিল ফর্মুলা আর তত্ত্বের নকশা আঁকা থাকে রঙিন চকে।

 সামনে থাকা বিশাল  স্লেট বোর্ডটি প্রায় পাঁচ মিটার চওড়া, যার পাশে মাউন্ট করা আছে আধুনিক টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে—গবেষণার পেপার পড়ার জন্য । একপাশে ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রফেসররা হাতে ছোট্ট মাইক নিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে  বলেন  আর অন্যপাশে একটি সাদা রোলিং বোর্ড, যেখানে কেউ কেউ হাতে-কলমে সমীকরণ কষেও  দেখান ।

হল ঘরের এক প্রান্তে টানানো বিশাল দেয়ালচিত্রে , পিথাগোরাস,  ইউক্লিড ,  গাউস, রামানুজান, পিয়ের দে ফার্মা,  জি এইচ হার্ডি এবং আধুনিক সময়ের ফারমেটস লাস্ট থিয়োরেম প্রুফ করা ম্যাথমেটিশিয়ান অ্যান্ড্রু ওয়াইলসের  প্রতিকৃতি—এক এক করে সকলের দিকে তাকালে মনে হয় তারা আজও এই কক্ষের ছাত্রছাত্রীদের বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় চোখ রাখছে।


 মাঝে মাঝে এখানেই বসে অতিথি বক্তাদের  সেমিনার—কখনো সুইজারল্যান্ড থেকে আসা লরাঁ ফার্ব বা জাপানের কোন তরুণ তুর্কি সংখ্যা তত্ত্ববিদ, যিনি আঁকছেন Elliptic curve-এর গতিপথ। স্লাইডে ভেসে ওঠে complex variable-এর জটিল উপত্যকা, আর পেছনের সারিতে বসো ঈরা-আবিরেরা চুপচাপ গিলতে থাকে  প্রত্যেকটি সূত্র, প্রতিটি রঙিন রেখার মানে।

গ্যালারির শেষ সারিতে বসলে একটি বাড়তি পাওনা রয়েছে, একমাত্র এখান থেকেই যেন অংকের গাম্ভীর্যের মাঝখান ঢুকে পড়ে কিছু 

রঙ,  কারণ এই জায়গাটি দিয়ে দেখা যায় পাহাড়ের ঢাল,  আর কয়েকটি ফুলে ছাওয়া প্রাপ্তবয়স্ক গুলমোহর গাছ,  মাঝে মাঝে চোখও ক্লান্ত হয়,  মনও ।

চোখ আর হৃদয় দুটোই তখন ফুলের সৌন্দর্য দেখে,  বাদ পড়ে যায় প্রফেসরদের দু একটি দামি লাইন , একটু অন্যমনস্কতার জন্য দামও দিতে হয় অনেক,  তবুও ঈরা বুঝতে পারছে এই গম্বুজের মতো ঘরটায় একটা ভালোবাসা জোর করে ঢুকে পড়তে চাইছে আর ঈরা দুহাত দিয়ে আটকাচ্ছে শুধু। 

  অংক কি শুধুই পরিসংখ্যান, না রহস্যময় কোনো জাদু, যে জাদুর নিচে লুকিয়ে থাকে প্রেম, অপেক্ষা  আর অনন্ত সম্ভাবনা।


ক্যাফেতে এসো  একটু , কথা আছে, সুহানি বলল ।

মুখার্জি স্যার পড়াচ্ছেন,  এসময় বাড়তি কথা ঈরার খুব অপছন্দ,  সে হাত দিয়ে ইশারা করল পরে,  এরমধ্যে আবির আবার কোশ্চেনও জিজ্ঞেস করে ফেলছে একটি , কোশ্চেনটা ভালো করে শোনাই হলো না ।

আবিরের সঙ্গে ছোট্র একটা নোটবুক সবসময় থাকে,  সে কখনও ফাঁকা থাকে না,ওর বিষয় নিয়ে  যখন যা মনে হয় সেটা লিখে রাখে বিভিন্নভাবে , পরে কনফিউশন ধরে ধরে  প্রশ্ন করে । সবাই আবার একে আইনস্টাইনের নোটবুক বলে একটু হাসাহাসিও করে। আজ 

আবির এই গ্রুপ থেকে দূরে বসেছে এবং মন দিয়ে শুনছে।


মুখার্জি স্যার একবার যেন পুরো ক্লাসটাকে মনযোগ দিয়ে দেখলেন। ঈরা প্রত্যেকদিনই কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করে,  ওর কোশ্চেনগুলোর ভ্যালু আছে। ঈরা নিশ্চিত স্যার ওকেই খুঁজছিলেন।কিন্তু আজ ঈরা ভালো করে পড়ে আসতে পারেনি তাই চুপচাপ বসে আছে,  হঠাৎ করে ফালতু প্রশ্ন করে ফেলার কোন মানে হয় না এখানে।

প্রায় দু ঘন্টার ক্লাশ শেষ হলো,  স্যার বেরিয়ে যাচ্ছেন,  পেছন পেছন কয়েকজন অতি উৎসাহী গবেষক,  আশ্চর্য ঈরাও তো তেমনই একজন , আজ সে অন্যদের এভাবে ভাবছে । নিজে পড়ে আসেনি বলে ? স্যার ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন,  গাড়িতে উঠে গেলেন,  হলের সামনে তখন ঈরা দাঁড়িয়ে,  খোলা চুল উড়ছে সামান্য হিমেল বাতাসে । স্যারের চশমা রোদে কালো হয়ে যায়, তাই ঈরা ঠিক বুঝতে পারল না গাড়ির দরজা বন্ধ করার সময় কি ওর দিকে তাকালেন স্যার।

সৌমিতাভ অনেকক্ষণ ধরে ঈরার কানের কাছে কি জানি ঘ্যানঘ্যান করছিল , এবার ঈরা চোখ তুলে তাকালো,  কি বলছো জানি?

বাপরে বাপ , কোথায় থাকো তুমি ঈরা , আমরাও অংক নিয়ে পড়াশোনা করি,  কিন্তু মাঝেমধ্যে সামান্য হাসিঠাট্টাও করি ।

সেরকম কোন ব্যাপার নয় সৌমিতাভ,  বলো শুনছি। 

 চলো হাঁটি। প্রায় দেড় ঘন্টা বাকি নেক্সট ক্লাসের,  কোথাও বসি ঈরা , তোমার আপত্তি না থাকলে।

আমার আপত্তি আছে সৌমিতাভ।

এভাবে বলছো কেন?

আমি এখন লাইব্রেরিতে যাব,  তুমি যাবে?  তবে আলাদা টেবিলে বসতে হবে। গতকাল কিছু পড়া হয়নি , আজ আমি মুখার্জি স্যারের ক্লাশে প্রায় ব্ল্যাঙ্ক ছিলাম।

ঈরা তুমি বোধহয় ভাবো তুমি সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট তাইনা?  আর ঐ আবির বর ঠাকুর ! আমিও আই আইটি থেকেই এম এস সি করেছি, স্কলারশিপ পেয়েই পড়ছি,  কিন্তু তোমার ব্যবহারটা খুব রূঢ় ঈরা ,.সাবজেক্ট নিয়ে কথা বললে বুঝতে পারতে এই সৌমিতাভও কিছু জানে। বাই দ্য ওয়ে , তুমি খুব বাজেভাবে রিয়েক্ট করলে আমার কথায় আজ,  আর আমার মনে হয় ই্যয়ু আর ফল ইন লাভ উইথ মুখার্জি স্যার। খুব কষ্ট পাবে। হি উইল ইউজ ই্যয়ু ।

যা তা বলছ সৌমিতাভ,  ঈরা প্রায় চিৎকার করে উঠল।

সৌমিতাভ আর পেছন ফিরে তাকাল না। ওর খাটো হাট্টাখাট্টা শরীরটা নিয়ে হনহন করে চলে গেল।  

ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রছাত্রীদের বসার জন্য  সিমেন্টের  বেঞ্চ বানানো রয়েছে তারই একটির  মধ্যে ঈরা বসে পড়ল ধপ করে।

কী থেকে কী হয়ে গেলো। সত্যিই তো সৌমিতাভ খুব একটা খারাপ কিছু বলেনি তখন। ঈরা বাজেভাবে রিয়েক্ট করেছে।

মুখার্জি স্যারের প্রতি ও দুর্বল এই ভয়াবহ সত্যটা যা ঈরা নিজেকেও বিশ্বাস করাতে চায় না,  সেটা সৌমিতাভের চোখে কী করে ধরা পড়ল ? তবে যে ঈরা খুব অহংকারের সঙ্গে বলে ওর শরীরের ভাষাও গাণিতিক এটা তবে ভুল ।

যাহ্ আজকের দিনটাও মাটি হলো। এখন আর ঈরা পড়ায় মন বসাতে পারবে না। মনের দু জায়গায় খিমচে আছে আবির আর সৌমিতাভের কথাগুলো।  কেন এতো সেনসিটিভ  আমি?  নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল ঈরা ।

এখানে বসে থেকে লাভ নেই , বইয়ের আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁদতেও আরাম। ঈরা দ্রুত হাঁটতে লাগল । এখান থেকে লাইব্রেরি অনেকটাই দূর। ঐ টিলার ওপর , বিশাল রামানুজন ব্লক , ওখানেই লাইব্রেরি এবং জেরক্স আর প্রিন্টিং এর দোকান। 

লাইব্রেরির নাম শ্রীনিবাস রামানুজন লাইব্রেরি ।

বড় বড় দুটো দেবদারু গাছ দুদিকে। ব্যাগ ইত্যাদি জমা রাখার কাউন্টারে লোকেশদা বসে আছে ।

লোকেশ থাপা , নেপালি। বাংলা , হিন্দি , ইংরেজি তিনভাষাতেই কাজ চালাতে পারে। শুধু রাগ উঠলে নেপালি ভাষায় গালাগাল দেয়,  মাতৃভাষাটা স্পেশালি গালাগালের জন্য ইউজ করে। 

কোন স্টুডেন্ট লাইব্রেরি আওয়ারের শেষ মুহূর্তে বেরোলে লোকেশদা গম্ভীর মুখে বলে এক কাপ চা মাঙতা হ্যায়। 

ঈরা সব জমা রেখে , খাতা ও পেন্সিল নিয়ে ঢুকল লাইব্রেরিতে ।

লাইব্রেরির মাঝ বরাবর লম্বা ওক কাঠের টেবিল, যার গায়ে ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারে ছোপ পড়েছে। সবাই ঘাড় নিচু করে আছে, কারো ল্যাপটপের স্ক্রিনে PDF, কারো হাতে  পুরনো জার্নাল। সময় যেন এখানে ধীরতর; কোথাও কিচ্ছু নড়ে না—শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানোর শব্দ, মাঝে মাঝে কারো কফির কাপ নামানোর মৃদু টুং।


ডানদিকে তাকালে চোখে পড়ে কয়েকটা গ্লাস-কেসে সংরক্ষিত হাতের লেখা থিসিস, তাম্রফলক-চিহ্নিত কিছু দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি—কোনোটিতে গাণিতিক চিহ্নের পাশে গবেষকের ব্যক্তিগত নোট, একটুখানি দুঃসাহস, একটুখানি সংশয়।


লাইব্রেরির শেষ কোণে "The Infinity Room" নামে এক গোপন পড়ার ঘর, যেখানে শুধু M.Phil ও PhD স্কলারদের প্রবেশাধিকার—এখানে বসে ঈরা একদিন গভীর রাতে আবিষ্কার করেছিল একটি ভুলে-যাওয়া সূত্র, যা নিয়ে পরে আবিরের সঙ্গে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছিল।


আর লম্বা করিডোরের শেষপ্রান্তে  বড় সাইনবোর্ডে লেখা ,

“An equation for me has no meaning unless it expresses a thought of God.”

– Srinivasa Ramanujan





উপন্যাস

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

চিরশ্রী দেবনাথ



পর্ব দুই


তুমি deterministic নাকি probabilistic—আমি জানি না। কিন্তু আমি জানি, তুমি জিরো থেকে শুরু করে ইনফিনিটি পর্যন্ত যেতে পারো।


প্রত্যেকেই তো একটা ইনফিনিটি  , তাই না আবির। 


তুমি ঠিক বললে না ঈরা , এভাবে বললে ইনফিনিটিকে নেগলেক্ট করা হয়। আর মনে রেখো ইনফিনিটিরর মূল্য সবাই দিতে পারে না,  একমাত্র মেধাবীরাই দিতে পারে এর মূল্য ।তার কাছে ইনফিনিটি উজ্জ্বল আলো হয়ে ওঠে ।


তুমি কি সাহিত্যে ইন্টারেস্টেড আবির?

থোরা বহুত তো আছি।

ও মাই গড,  আমি নই।

সেকী!  তুমি বাঙালি মেয়ে , দেখতে সুন্দর আর সাহিত্যে ইন্টারেস্টেড নও?

বাঙালি বুঝলাম , সৌন্দর্যের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক কি?

কেন নাচ বা গান টান মানে রবীন্দ্রসঙ্গীত  করো না ?  তোমাদের মতো বাঙালি মেয়েদের সঙ্গে  সবাই প্রেম করতে চায়,  এই যে শাড়ি,  লম্বাচুল ইত্যাদি ।

প্রথম কথা তুমি খুব ভাট বকছো আবির। রবীন্দ্রসঙ্গীত দুটো একটা গাই বলে আমি সাহিত্যে পারঙ্গম নই,  হ্যাঁ শারদীয় আনন্দমেলা বা ছোট বেলায় কিছু গল্পটল্প পড়েছি শুধু , সাহিত্য অনেক বড় ব্যাপার , আজই শখ করে একটু শাড়ি পরেছি , চুলটা ভেজা ছিল বলে খুলে রেখেছি তাকে তুমি কীরকম যেন generalisation করে ফেললে , মানে প্রেমের উপযুক্ত বাঙালি মেয়ে , খুব খেলো কথা হয়ে গেল তাই না?

সরি ঈরা, তুমি রাগ করলে।

অবশ্যই ।

আরে কফি শেষ করে ওঠো।

যাচ্ছি নাতো,  দাম দিয়ে কিনেছি , খেয়েই যাব,  তবে এখানে বসে নয়। অন্য টেবিলে ।

একটা স্পষ্ট কথা শোন আবির

আমি খাটতে ভালোবাসি , পড়তে ভালোবাসি , অংক আমার শখ নয়,  অংকই আমার ল্যাঙ্গুয়েজ , শরীর অথবা মনের ।


ঈরা অন্য টেবিলে গিয়ে বসল । ক্যাম্পাসের মধ্যে এই  কাঠের তৈরি ছোট ক্যাফেটেরিয়াটি সব ছাত্রছাত্রীদেরই প্রিয়। এরকম  তিনটে আছে। একটি স্যার এবং স্টাফদের জন্য আর  ছাত্রছাত্রীদের জন্য দুটো। লাঞ্চ ব্রেকে জায়গা পাওয়াই মুশকিল ।তবে এখন সক্কাল সক্কাল,  তাই ফাঁকা খানিকটা। 

 ক্যাম্পাসটি মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা,  একদিকে পিজি স্টুডেন্টদের অন্যদিকে পি এইচ ডি স্টুডেন্টদের জন্য। এখানে বসলে দু তরফের ছাত্রছাত্রীদেরই আসা যাওয়া দেখা যায়। সুহানি, নীলম,  রাজ তিনজন একসঙ্গে যাচ্ছে,  ওদের সঙ্গেই  একটু পরে ঈরার কমন ক্লাশ আছে। 

তার মধ্যে নীলম ও রাজের সাবজেক্ট অবশ্য  সম্পূর্ণ আলাদা তবে  সুহানি আর  ঈরা দুজনেই ক্রিপ্টোগ্রাফি রিলেটেড । 

ঈরাকে হাই বলল সুহানি, ঈরাও হাত তুলল। ঈরা এখন ক্লাশে যাবেনা। এখন গেলে গল্প হবে।  ডঃ এ মুখার্জির ক্লাশ। স্যার এখনো আসেননি। এখান দিয়েই যাবেন তিনি,  তার পেছন পেছন ঈরা ক্লাসে ঢুকবে। তিনি. Dept. of Algebra & Cryptography বিভাগের হেড অব দ্য ডিপার্টমান্ট । একটু রুক্ষ,  তবে কালে ভদ্রে সামান্য রসিকতাও করেন,  দীর্ঘকায়,  সৌম্যদর্শন, মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে দুটো গভীর কালো মেধাবী চোখ, নিজের সাবজেক্টের ওপর প্রশ্নাতীত দক্ষতা, আর পুরুষালি ভয়েস ঈরাকে মুগ্ধ করে চলেছে প্রত্যেকদিন,  শ্রদ্ধায় যেন তার মাথা নুয়ে আসে,  এরকমই তো হওয়া উচিত শিক্ষক,  এখন পর্যন্ত ঈরার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ডঃ এ  মুখার্জি । ঈরা যখন প্রশ্ন করে কী সুন্দর বুঝিয়ে দেন,  সাধারণ প্রশ্নকেও তুচ্ছ করেন না। ঈরা অনুভব করছে সে ক্রমাগত অতিরিক্ত বায়াসড হয়ে গেছে ওনার প্রতি। এমনকি অন্য ছাত্রছাত্রীদের স্যার সেইম ট্রিটমেন্ট দিলেও ঈরার কেমন যেন হিংসে হয়। ওনার ব্যক্তিত্ব কিছুটা রুক্ষ, অথচ স্নেহপরায়ণ । স্যারের সবচেয়ে প্রিয় কথাগুলোর  মধ্যে অন্যতম হলো  “Math is a weapon. Use it wisely.”



ঈরা আড়চোখে দেখল আবির ওর ব্যাগ থেকে একটা জার্নাল বের করেছে, জার্নালের কভার  ঈরার চেনা, International Journal of Number Theory (IJNT) একটি বিশ্বখ্যাত পিয়ার-রিভিউড (peer-reviewed) গবেষণা পত্রিকা , যা সংখ্যাতত্ত্ব  ও তার বিভিন্ন শাখায় গবেষণা প্রকাশ করে , এখানকার লাইব্রেরি থেকেই নিয়েছে নিশ্চয়ই,  ঈরার স্বপ্ন একজন তরুণ গবেষক হিসেবে তার লেখাও IJNT তে প্রকাশিত হবে।

ঈরা আবিরকে নিয়ে একটু সচেতন,  আবির 

বর ঠাকুর , আসামের তেজপুর থেকে এসেছে।

গায়ের রঙ বাদামি , ভালো উচ্চতা ও মেদহীন শরীর, চোখগুলোতে সরলতা নেই,  জিজ্ঞাসা আছে, ওর গবেষণার বিষয় , ”Quantum Key Distribution (QKD) in Post-Quantum Cryptography”

আসলে সে এমন এক এনক্রিপশন পদ্ধতির ওপর কাজ করছে যা কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসার পরেও ভেঙে ফেলা যাবে না।

 ঈরার বিষয়ের সঙ্গে আবিরের বিষয়ের সূক্ষ্মতর পার্থক্য রয়েছে,  দুজন দুটো  ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে চায় সমস্যাকে। 

 প্রায়শই তর্ক হয়—কিন্তু এই তর্কের জন্যই ঈরা আবিরের সান্নিধ্য পছন্দ করছিল,  এখন এক নিমেষে ঈরার আবিরের প্রতি অভালোলাগা তৈরি হয়েছে,  এ হচ্ছে ঈরার বিপদ , নিজের মনের মতো তো সবাই হবে না,  কিন্তু মনের এই আবছায়া ভালোলাগা ভেঙে গেলেই ঈরা সেই মানুষ থেকে দূরে সরে আসে,  এভাবে ঈরা ধীরে ধীরে একা হয়ে যায়,  যেন পৃথিবীর মধ্যে মধ্যবসন্তে ভেসে বেড়ানো নিঃসঙ্গ কোন সংখ্যা, তবে স্যার যে বলেন সংখ্যা কখনো একা হয় না, অর্থহীন হলেও তার আশেপাশে কেউ থাকবেই । ঈরার মনে তখন কেবল ভেসে উঠল এ সি স্যারের মুখ । একটু লজ্জা হতে লাগল । এই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এভাবে গবেষণায় মনোসংযোগে বাধা আসবে। ঈরা ল্যাপটপ খুলে গতকালকে পড়ানো পেপারগুলোর পি ডি এফ আবারো রিভাইস করা শুরু করলো। আবির আর ঈরার দিকে তাকায়নি,  জার্নালে ডুবে গেছে। অন্যদিন হলে ঈরা আবিরের পাশে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত আর্টিকেলগুলো,  কোথায় কি নিয়ে কাজ হচ্ছে এসব জানাটা খুব দরকার। তবে এ , সি স্যার সাধারণত খোঁজখবর নিয়েই তার ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিষয় নির্বাচন করেন,  তিনি সবসময় বলেন চোখকান বন্ধ রেখে গবেষণার কাজ হয় না। 

আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফিতে অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেব্রা বিশেষ করে গ্রুপ থিওরি, ফিনাইট ফিল্ডস, এলিপটিক কার্ভ এবং নাম্বার থিওরি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই বিষয়টি pure mathematics ও applied mathematics-একটি মেলবন্ধন । 

ঈরার দাদু ছিলেন শিলচরের একটি নামী হাইস্কুলের অংকের মাস্টারমশাই ।ছাত্ররা খুব ভয় পেতো এই জাঁদরেল অংকস্যারকে,  তিনি কিন্তু ছোট থেকেই ঈরাকে চিনতে পেরেছিলেন,  তাই অংক নিয়ে ভয় নয় বরং একটা মজা বা কৌতুহল ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন নাতনির মনে । দাদুভাই তাকে নাম্বার দিয়ে বিভিন্ন ধাঁধা দিতেন, কখনও গোপন কোডে চিঠি লিখতেন নাতিনকে,  দাদু আর নাতিনেরর এই মজার খেলাই ঈরাকে আজ এখানে দাঁড় করিয়েছে,  কিন্তু দাদুভাই দেখে যেতে পারেননি, সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাকে চারবছর আগে দাদুভাই চলে গেল পৃথিবী থেকে,  মহাশূন্যের কোনো অংক ক্লাসে। খুব মিস করে দাদুভাইকে ঈরা ।

ল্যাটিস বেইসড ক্রিপ্টোগ্রাফি এই নিয়ে ঈরা গবেষণা করছে, কারণ এটি quantum computer-এর বিপদ থেকেও নিরাপত্তা দিতে পারে – অর্থাৎ ভবিষ্যতের সাইবার সিকিউরিটিই হলো ঈরার গবেষণার লক্ষ্য । Quantum Computing আসার পর অনেক প্রচলিত ক্রিপ্টোগ্রাফি ভেঙে পড়বে – তাই নতুন সিস্টেম তৈরির জন্য এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।



এমন সময় সৃজনী এসে ধপ করে ঈরার সামনে বসল , পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের ছাত্রী , ঈরার জুনিয়রই বটে , তবে ছটফটে আর খুব মিশুকে ।


ঈরাদি তুমি এতো শান্ত কেন বলতো ? ইচ্ছে করছে না রাগে ফেটে যেতে,  চিৎকার করতে?

মেয়েদের পড়াশুনো,  গবেষণা সবকিছুই তো খুব ফালতু তাইনা?

ঈরা বুঝতে পারল সৃজনী কলকাতার আর জি কর হাসপাতালের  এম ডি পাঠরতা সেই ডাক্তার মেয়েটির ধর্ষণ ও খুনের কথা বলছে ।

খুব নৃশংস এবং হতাশার,  কিন্তু ঈরা জোর করে নিজেকে এই মুহূর্তে সরিয়ে রাখতে চাইছে সব থেকে,  সৃজনীর সঙ্গে এখন এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই ঈরা পরবর্তীতে আর ক্লাশে মন দিতে পারবে না,  আলোচনা করেই বা কি হবে,  

আলোচনা প্রতিবাদ কতটুকু বদলেছে মানুষকে ?


এখন যে আমার ক্লাশ আছে সৃজনী,  আসি রে,

অবশ্য তখন আরো কয়েকজন ঢুকে পড়েছে ক্যাফেতে,  সৃজনী ঈরাকে ছেড়ে তাদের দিকে মন দিল। সবার দিকে তাকিয়ে একটু আলতো হেসে ঈরা বেরিয়ে পড়ল,  আর যেখানে প্রত্যেকদিনই ঈরার একবার চোখ পড়ে সেটা হলো, ক্যাফেতে ঢোকার মুখেই একটি রঙিন সাইনবোর্ড ,  যেখানে বড় বড় করে লেখা,

 “ Life is not a linear equation “,