আত্মকথন, চিরশ্রী দেবনাথ

আত্মকথন

 চিরশ্রী দেবনাথ


 অকবিতায় বিশ্বাস করি। অকবিতা কবিতার প্রাণবিন্দু, স্বার্থহীন প্রেম।  অকবিতার নগ্ন ডানায় ভর করে আমার নিঃসঙ্গ ভ্রমণকে আমি প্রণাম করি।

কৈলাসহরে জন্ম। বাবা  রাধাগোবিন্দ মজুমদার দিনরাত লেখালেখি বইপত্রে ডুবে থাকতেন। অধ্যাপক মহাশয়ের দীন ঘরে সমস্তদিন ছাত্রছাত্রীদের ভিড় । সংস্কৃত সাহিত্য , নাটক , বেদ বেদান্ত গীতা উপনিষদ আর দর্শনের  অবিরাম চর্চা সেখানে। সেজন্যই বোধহয় অকালপক্ক অনুভবের একটি অবৈধ অনুপ্রবেশ আমার ভেতরে ঘটে গিয়েছিল। 

দুষ্মন্ত, শকুন্তলা আর দুর্ব্বাশা মুণির নিরন্তর আনাগোনা সেখানে। 

মনুনদীর চোরা ঘুর্ণির মতো এই  ফাঁদ আমাকে শেষপর্যন্ত লেখালেখির জগতে টেনে এনেছে।

 আমি  বাবুর ছোট মেয়ে পড়ার বইয়ের চাইতে  গল্পের বই  অনেক বেশি  পড়ি। কলেজ লাইব্রেরি আর শহরের পাবলিক লাইব্রেরি থেকে প্রচুর বইয়ের নিয়মিত জোগান পেতাম। তবে কবিতা বলতে তখনও রবীন্দ্র নজরুল সুকান্ত আর ইস্কুলের পাঠ্যবই।

দৈনিক সংবাদের ছোটদের পাতায় গল্পও লিখে

ফেলতাম মাঝে মধ্যে । মনের মধ্যে তখন থেকেই অমসৃণ দুর্বিনীত কথাবার্তার ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বাসা বেঁধেছে অজান্তে ।



সেইসময় হেমন্ত ঋতু মানে দীর্ঘ আর গভীর এক শীতকালের সূচনা মাত্র । মফসসল শহরের শান্ত সন্ধ্যায়  চরাচর ঢেকে যেত কুয়াশায়। 

সন্ধ্যাবাতির কাঁসর আর উলুধ্বনিতে পাড়ার এই বাড়ি ও বাড়ি মুখর হয়ে উঠত। সাইকেল চালিয়ে বিরহকাতর যুবকেরা মহম্মদ রফির দু কলি গান গেয়ে বাড়ির পথে যাচ্ছে। নেশাগ্রস্ত  রিক্সাওয়ালারাও  জোড়সে এবং সুরেলা গলায় গান গাইত “ দেখা এক খোয়াব তো, ইয়ে সিলসিলা হুয়ে “

গ্যাসের সিলিন্ডার তখনো হানা দেয়নি আমাদের বাঁশের বেড়ার রান্নাঘরে। রাতের বেলা শ্রীমতি মায়ারানি মজুমদার ,বরিশাল কন্যা এবং আমার মা ভাত রান্না করছেন। উনুনে ঠেলে দিচ্ছেন শুকনো লাকড়ির টুকরো। গনগনিয়ে উঠছে আগুন। আমি  স্কুলে পড়ি,  রান্নাঘরেই চাটাই পেতে মার পাশে বসেই পড়ছি।

বহুদিন পর হলেও এই লাইনটি এখনও ভুলি না।

মাকে বলেছিলাম , “আগুনের পাশে তোমাকে আগুনগাছের মতো লাগছে মা” । এইরকম একটি নিভন্ত আগুন বুকের পাশে সবসময়ই জ্বলে রইল। কখনও নিভে যায়, মৃত গাছ ঠেলে দিই। সামান্য দাউ দাউ করে ওঠে ।



১৯৯৭ ,কলেজজীবন শুরু হলো করিমগঞ্জে ( বর্তমান নাম শ্রীভূমি)  । করিমগঞ্জ কলেজে এসে বন্ধুদের সঙ্গে দেয়াল পত্রিকার মাধ্যমে অপরিনত উচ্ছ্বাসকেই বলতাম কবিতা। সেখানেই পরিচয় হয় প্রাণজয় সিনহা  এবং অমিত দেব পুরকায়স্থের সঙ্গে। আমি ম্যাথমেটিক্সে অনার্স নিয়েছি। প্রাণজয় কেমিস্ট্রিতে আর অমিত পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছিল। ফিজিস্ক অনার্স। আর এক বন্ধু সমীর। তেলিয়ামুড়ার। সেও ছিল ফিজিস্কের। আমরা সাহিত্যচর্চা ভালোবাসতাম । প্রাণজয় তখন থেকেই ভালো কবি , তার খাতা ভর্তি কঠিন কঠিন প্রাজ্ঞ কবিতা । অমিত , কলকাতা থেকে এসেছে, সেই  আমাদের মধ্যে তখনো একমাত্র,  যে জয় গোস্বামীর “ যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল “ পড়েছে  এবং এর একটি জেরক্স কপি সে আমাদের  দিয়েছিল। টুয়েলভে পড়ার সময় আমি জয় গোস্বামীর উপন্যাস  “ সেইসব শেয়ালেরা “ পড়েছিলাম। কবিতা শুধু রেডিওতে ব্রততী বন্দোপাধ্যায়ের গলায় “বেণিমাধব “ শুনেছি। 

 সেইসব শেয়ালেরা আমাকে একটা ঘোরে ফেলেছিল আর যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল সেটা ছিল সত্যিই বেশ ঘোর বাদলদিন । জয় গোস্বামীর  কবিতার সঙ্গে এর মাধ্যমেই আমার  পরিচয় ঘটল নিবিড়ভাবে । তারপর থেকে কখনও তার কবিতায় ভিজেছি কখনও ভালো লাগেনি , আবার ফিরে ফিরে জয় গোস্বামীর কবিতা পড়ি । পরবর্তীতে এবং এখনো জয় গোস্বামীর  “গোঁসাইবাগান” প্রথম দুই খণ্ড” আমার কাছে অভিধানের মতো ।

 বহু কবিতা পড়া ছেলে অমিত । অকাতরে জ্ঞান দিত কবিতা নিয়ে। জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, শক্তি,  সুনীল,  সুভাষ,  মন্দাক্রান্তা  সবার কবিতা আস্তে আস্তে পড়ছি। ভাবছি পৃথিবীতে গল্প ছাড়াও কবিতা ছিল, যার শরীরে সৌন্দর্যের লোভনীয় খনি।

সেসময় অমিত আমাকে রাজাদা বলে একজনের কয়েকটি কবিতা পড়ায়। অনেকেই হয়তো চিনবেন রাজাদা হলো কবি সপ্তর্ষি বিশ্বাস । করিমগঞ্জেই তার পূর্ব বাড়ি ছিল এবং অমিতদের হয়তো বা পারিবারিক বন্ধু । আমি ওনার কিছু কিছু পংক্তি বার বার পড়তে থাকি। এই বুঝি কবিতা !!!

“ আমার একটি জাহাজ আছে বন্দর নেই

সঠিক বসতি নেই,  মুঠোভর্তি অযুত ঠিকানা “.

…সপ্তর্ষি বিশ্বাস ( রাজাদা)

এই দুটো লাইন কেন জানি এখনো স্মৃতিতে রয়ে গেছে। 

তবে কলেজ দেয়াল পত্রিকা পুনর্জ্জীবনের ক্ষীণ প্রচেষ্টা ও ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটি সাহিত্যপত্রিকা বের করার মাধ্যমেই আমার  কলেজস্তরের কবিজীবনের প্রাথমিক সমাপ্তি। বস্তুত অনার্সের অঙ্কের প্রভূত চাপ আর আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের  সেমিস্টার পদ্ধতির শুরুয়াৎ  আমাকে আর মাথা তুলতে দেয়নি। নিবিড় ও নীরস অসংখ্য সমীকরণের জালে আমি আটকা পড়ে যাই। 

 


২০০২ , শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ টিলায় ম্যাথস্ ডিপার্টমেন্ট । আর তার ঠিক নিচের টিলায় বাংলা ডিপার্টমেন্ট । ডঃ  তপোধীর ভট্টাচার্য তখন ভাষাতত্ত্ব বিভাগ ( linguistic Department )এর প্রধান ।

ইউনিভার্সিটি উইকে ওনার ভাষণ শোনার পর থেকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ওনার একটি ভাষণও মিস করিনি তা যে বিষয়ের ওপরই হোক না কেন। মাঝে মাঝে পেছনে বসে বাংলা ডিপার্টমেন্টে ক্লাশ করি , যা লেকচার চলছে তাই শুনি। লাস্ট বেঞ্চে বসে থাকলে স্যাররা তত লক্ষ্যও করেন না। আর করলেই বা কি।  আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অংক বইয়ের পাশাশাশি একটি করে বাংলা উপন্যাস আনি। দুটো বইই কেবলমাত্র নেওয়ার পারমিশন ছিল।  তখনো তো মোবাইল আসেনি আমাদের জীবনে, গল্পের বইই প্রধান আশ্রয় ছিল, দুপুরের দিকে ক্লাশ থাকলে সকালেই লাইব্রেরি চলে আসতাম , টুক করে একটা বাংলা গল্প বা উপন্যাস নিয়ে গণিত সেকশনে চলে যেতাম। কিছুক্ষণ চলত এম এস সির জন্য পড়া, সেমিনার টপিক বানানো তারপর গল্পের বই আর অজস্র ম্যাগাজিন ।  আমি দীর্ঘদিন দেবেশ রায় গল্প সমগ্র লাইব্রেরিতে বসে বসে পড়েছি।

উষশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো। বাংলা নিয়ে পড়ছে। আইরংমারার মেস বাড়ির রুমের দেয়ালে  কবিতার লাইন লিখে লিখে রাখে । উষষী ছিল ব্ল্যাক বিউটি । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে আমার প্রথম ভালোলাগা মানুষ যে বাংলা  কবিতার মাধ্যমে আমার কাছে এসেছিল। 

 বন্ধুত্বের পরিসর বাড়ল । ঠিক হলো হিজল নামে দেয়াল পত্রিকা বের করবো। শুধু বাংলা লেখাই থাকবে তাতে। 

আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের মুখেই ভাষা শহিদ বেদী । বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল এই মাটির সন্তানেরা।

ঊনিশে মে ভাষা শহিদ দিবসে শহিদ বেদিতে মাল্যদান ,  নাটক এবং ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে মৌন মিছিল শেষে প্রথম উন্মোচিত হলো ‘হিজল ‘ ।

 যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস, সমাজ সচেতনতা ইত্যাদি নিয়ে পাথরের মতো ভারী ভারী কবিতা লিখে হিজলের কাগজ আমিও কয়েকবার অলঙ্কৃত করেছি। সহসম্পাদকও হলাম তারপর। 

পৃথিবীর বুকে তখন তালিবান সন্ত্রাস। আফগানিস্থানে বানিয়ান বুদ্ধমূর্তি টুকরো টুকরো হয়েছে। এগারোই সেপ্টেম্বর নিউহয়র্কের টুইন টাওয়ার গুঁড়ো হয়েছে। ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ হয়েছে।

 বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর জুড়ে একদিন শান্তি মিছিল হলো।

ইউনিভার্সিটি উইকে রিসাইটেশন কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করলাম। আমি বাচিক শিল্পী নই ।অসুন্দর কন্ঠ। বহু ছেলেমেয়েরাই দারুণ সুন্দর পারফরমেন্স করল।

তখন আমার ধারণা ছিল কবিতাকে যত লম্বা করে লেখা যায় ততই নিজের জ্ঞান জাহির করা যায়। আমিও “ আফগানিস্তানের মেয়েরা “ এই শিরোনামে দীর্ঘ একটি কবিতা লিখলাম ।সেখানে সাম্প্রতিক বিশ্বের সব সমস্যাই তুলে ধরার ব্যাপক চেষ্টা করলাম। ভাষার গাম্ভীর্যে আর ঘটনার ঘনঘটায় আক্রান্ত সেই কবিতাই  রিসাইটেশন কম্পিটিশনে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে আবৃত্তি করলাম।

তখন লেখকরা বেশ স্বাধীন ছিলেন। ভেবে লিখতে হতো না কিছু।

চটপট বেশ হাততালি পড়ল। আমি তৃতীয় হলাম। 

সাহিত্যচর্চা মানেই যোগাযোগ। সহিত চর্চার ধারাবাহিকতা। তাই কয়েকদিনের মধ্যেই তখন শিলচর ও করিমগঞ্জের দু তিনটি লিটল ম্যাগে আমার অতি দুর্বল কিছু লেখা কবিতা নাম নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। কোনো এক কবিতা অনুরাগীর কল্যানে শিলচরের গান্ধীবাগে একটি কবিসম্মেলনে আমন্ত্রণপত্রও পেয়েছিলাম। যদিও জীবনের সেই প্রথম কবিসম্মেলনের মেদুর আমন্ত্রণে আমি যাইনি। 

চোখের পলকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে গেলো। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়কালীন কবিতাচর্চায় ইতি টানলাম।




তারপর কবিতাযাপন থেকে সুদীর্ঘতম বিরতি । কর্মলাভের প্রচেষ্টা, সাংসারিক জীবনে প্রবেশ,  সন্তানলাভ ইত্যাদি নিয়ে বহুদিন কেটে গেল।

 লেখালেখির জগতে ক্ষীণ একটি প্রবেশ ঘটল, পদ্য নয় গদ্য দিয়ে,  ২০০৯ সালে ত্রিপুরা তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প প্রতিযোগিতায় একটি গল্প প্রেরণ এবং প্রথম পুরস্কার লাভ । 

আমার শাশুড়ি মা সুনীতি দেবনাথ লেখালেখির সঙ্গে আজন্মকাল জড়িত। আর ধর্মনগরের একটি সুপ্রাচীন সাহিত্যপত্র হলো ‘ অনার্য ‘ ।

কিছুদিন বন্ধ থাকার পর কবিতা উপত্যকার কবিতাপ্রেমীরা সিদ্ধান্ত নেন আবার নিয়মিতভাবে

প্রকাশ করার। সেইসময় শ্রদ্ধেয় কবি রসরাজ নাথ,  রত্নময় দে,  সুজিত দেব এবং সেলিম মুস্তাফা সবার সঙ্গে পরিচিত হই। তারা সবাই আমাদের বাসায় নিয়মিত আসতেন,  কবিতাচর্চা হতো।  সেইসূত্রেই অনার্য পত্রিকায় আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। সেলিম মুস্তাফার নিজস্ব পত্রিকা “ পাখি সব করে রব “ এবং রত্নময় দে’ র “ঢিল “ পত্রিকা ও সুজিত দেবের “ অন্যধারা  “ পত্রিকায় আমি আস্তে আস্তে লিখতে শুরু করি। তখন সময়টা ২০১২–১৩,

২০১৪ সালে আমার স্বামী অরূপ আমাকে একটি স্মার্টফোন কিনে দেয়। এজন্য  আমি আজীবন কৃতজ্ঞ । পরবর্তীতে আরোও দুটো , যতবারই মোবাইল নষ্ট হয়েছে। তাই অরূপের এই সাহায্যটুকুছাড়া হয়তো আমার লেখক জীবনের শুরুই হতো না। 

 ফেসবুকে এলাম। ইভার নোট ,  গুগল ডক ইত্যাদি ডাউনলোড করলাম। তখন ফেসবুকে দিনের শেষে একটি লেখা পোস্ট করা ছিল আমার প্রতিদিনের কাজ। কবি সেলিম মুস্তাফা ফেসবুকে “ পাখি সব করে রবে “র একটি পেজ খুলেছিলেন। সেখানে কবিতা লিখতাম । সেইসব ধর্ষণ বিরোধী , নারীজাতির উন্নয়নপ্রকল্পে লেখা কবিতাগুলো কে পড়ত আমি জানিনা। তবে সেখানে একদিন একটি কমেন্ট পেলাম। আমার কবিতাজীবনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমেন্ট। কবি সমরজিৎ সিংহ বললেন , বক্তৃতার মতো লিখেন কেন?

আমি তখনও কবি সমরজিৎ সিংহকে চিনিনা। 

ফেসবুকে চিনলাম। ।

সেসময় ফেসবুক থেকেই চিনলাম কবি শ্বেতা চক্রবর্তীকে। জীবনের সেই পর্যায়ে শ্বেতা চক্রবর্তীর কবিতা আমাকে অত্যন্ত প্রভাবিত করেছিল। পেলাম “ মিলন সাগর “ বাংলা কবিতার আর্কাইভ এবং খুব অল্পদিনের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বহু কবির লেখা পড়ার সুযোগ । এখন সেই আর্কাইভে আমার কিছু কবিতাও স্থান পেয়েছে  ।

দেবারতি মিত্রের কবিতা পড়ে উপলব্ধি হলো নিজের দীনতার। 

 “পাখি সব করে রব” এর ফেসবুক পেজে গৌহাটি থেকে  সাংবাদিক ও কবিতাবোদ্ধা বাসব রায় মাঝে মাঝে আমার এক দুটি লেখায় মন্তব্য করতেন এবং তিনি বেশ কয়েকবার আমার কবিতা আসামের কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য নিয়েছিলেন। লেখালেখি শুরু করার সেই লগ্নে আমার জন্য এসব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 

বলতে গেলে তখন থেকেই ধীরে ধীরে কবিতাকে জড়িয়ে ধরি প্রাণপনে।

ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় ছিলেন  আইনবিদ শুভেন্দু ঘোষ। ওনার আগ্রহেই ২০১৬ তে আমার প্রথম বই “জলবিকেলে মেঘের ছায়া”

প্রকাশিত হয়। শ্রদ্ধেয় কবি নকুল রায় বইটি সম্পাদনা করে দেন। তখন কেউ কেউ বলেছিলেন কবিতার বইয়ের আবার সম্পাদনা কি। বই বের করা বা প্রকাশনা জগত সম্বন্ধে আমার কোনো ধারনা ছিল না। সেইসময় কেবল শুভেন্দু ঘোষ দাদার আগ্রহেই চিলড্রেনস পার্কে  আগরতলা বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন স্টলে খুব সম্ভবত ১৪ ই ফেব্রুয়ারি আমার বইটি প্রকাশিত হয়েছিল,  শুভেন্দু ঘোষদাদাই বইটির মোড়ক উন্মোচিত হয়েছিল। সেই সন্ধ্যায়  সেখানে ত্রিপুরার অনেক কবি সাহিত্যিকই ছিলেন যাদেরকে এতোদিন  শুধু ফেসবুকেই চিনতাম। তবে অনেক বই উপহার দিয়েছিলাম সেদিন, কবি শঙ্খ সেনগুপ্ত আমাকে তখন বলেছিলেন এইভাবে বই উপহার দিলে বইয়ের অমর্যাদা হয়। এই কথাটি  আজও মনে রাখি। তিনি আরও বলেছিলেন “জল বিকেলে মেঘের ছায়া” বইটির কবিতগুলোর সিলেকশন ভালো হয়নি। বইটির প্রচুর কপি এখনও আমার কাছে আছে। এই বইটির একটিমাত্র  কবিতা  ভালো লেখা বলে আমার মনে হয় ।

লেখাটি হলো


“এক হেমন্তসকালে

......

পৃথিবীর শেষতম স্টেশনে জ্বলে উঠে মাঝরাতে

স্বচ্ছ এক আলো, ধূসর এক স্টেশনমাস্টার কুয়াশাপাত্রে জমা করতে থাকে অতি সূক্ষ্ম জীবন্ত মেঘকণা,তারা আসলে সব মানুষ ঘুমিয়ে গেলে তার গহন থেকে বেরিয়ে আসা কষ্টগুলো, একটি কষ্টের গায়েও লেগে নেই  ময়লা, কী ভীষণ নরম প্রতিটি কষ্টবিন্দু, সার সার কুয়াশাপাত্র জমা হচ্ছে থেমে থাকা একটি ট্রেনের কামরায়, দূরতম কোনো  বর্তমানে রোবটেরা যখন ভালবাসা জাগানোর জন্য খেয়ে নেবে একচামচ অক্সিটসিন, তখন  এক হেমন্তসকালে সব কুয়াশাপাত্রের ঢাকনা খুলে যাবে, পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশুদ্ধ কষ্টবিন্দু আর তাকে জড়িয়ে থাকা  ভালবাসা স্পেকট্রাম …”


জানুয়ারি দুই হাজার ষোলতে, কবি শ্যামলেন্দু মজুমদার কলকাতা লিটিল ম্যাগ মেলায় প্রকাশিত  "রাত্রির কোরাস "এই লিটিল ম্যাগাজিনটিতে  চারটি কবিতা প্রকাশ করেছিলেন।  এটাই ছিল কলকাতার কোনো পত্রিকায় প্রথম কবিতা প্রকাশ। এছাড়া মধূসূদন দরিপা দাদা কর্তৃক প্রকাশিত আর্ষ পত্রিকার সঙ্গে তখনই আমার যোগাযোগ হয়, এখন পর্যন্ত আর্ষ পত্রিকা আমার প্রিয় একটি সাহিত্য পত্রিকা। 

 ঔপন্যাসিক শ্যামল বৈদ্য আগরতলার পূর্বমেঘ সাহিত্যপত্রিকার জন্য আমার কাছ থেকে একটি কবিতা নেন। উত্তর ত্রিপুরার বাইরে ত্রিপুরার অন্য জায়গার সাহিত্য পত্রিকায় সেই ছিল আমার প্রথম কবিতা প্রকাশ।

ফোটা মাটির সম্পাদক খোকন সাহা তার ফোটামাটি বিশেষ সংখ্যায় ত্রিপুরার দশজন কবিদের মধ্যে আমার কবিতাও রেখেছিলেন।

এসব স্মৃতি এখনো মনে হলে বেশ কবি কবি ভাব হয়। 

আমার প্রথম বইটির কাজ যখন চলছিল তখনই  ফেসবুকে বসন্ত ধুলো নাম দিয়ে  একটি কবিতা সিরিজ লিখতে শুরু করেছিলাম।

আস্তে আস্তে প্রত্যেকটি ঝতুকে নিয়েই লিখি ফেসবুকেই। এই সমগ্র ঋতুযাপনকে কাব্যগ্রন্থ বের করব বলে ডিসিশন নেই। আমি তখন খুব অস্থির। পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে জীবনের। পৃথিবীতেও লেখা হয়ে গেছে হাজার হাজার কবিতা। তবুও মনে হতে লাগল আমাকেও কবিতা লিখতে হবে। কুমারঘাটে  স্রোত প্রকাশনার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। প্রকাশক গোবিন্দ ধরকে বললাম একটি বই বের করতে চাই। 

স্রোত প্রকাশনার তরফে বইটি ছাপা হয়ে হাতে এলো। নাম রেখেছিলাম “ ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায় “ । প্রচ্ছদ নিজেই করেছিলাম। ছাপা হয়ে আসার পর দেখলাম তাতে অসংখ্য বানান ভুল । প্রকাশককে বললাম । তিনি বললেন বানানগুলো কারেকশন করে দিতে। কারেকশন করলাম,  পরবর্তী বইগুলোতে একটি পৃষ্ঠা যোগ করা হলো , যাতে ছিল ভুল বানানগুলোর সংশোধন পৃষ্ঠা নাম্বার সহ। এধরনের আজব জিনিস আর কখনো হয়েছে কিনা জানিনা। স্বপ্নের বইটির এরকম করুণ অবস্থার জন্য খুব মর্মাহত হলাম। তবে তিনি আমাকে স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত বেশ কিছু বই দিয়েছিলেন। যা আমাকে ত্রিপুরার সাহিত্য সম্পর্কে সেইমুহূর্তে জানতে বেশ সাহায্য করেছিল। হয়তো ভুল বানানে বই ছাপা হওয়াটাই আমার ভবিতব্য । 

কারণ আমার প্রত্যেকটা বইতেই একটা দুটো অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকেই যাচ্ছে। তার কারণ হলো সীমিত জ্ঞান ও তাড়াহুড়ো এবং যথোচিত যত্নের অভাব।  

 কবি এবং শাব্দিক পত্রিকার সম্পাদক সঞ্জীব বণিক শাব্দিকের একটি সংখ্যার জন্য আমার কাছে একবার একগুচ্ছ কবিতা চেয়েছিলেন । তখন  কোন কারণে আমার বাবার বাড়ি কৈলাসহরে গিয়েছিলাম। সেখানেই “প্রেমে সন্ত্রাসে “ নাম দিয়ে আটটি কবিতার একটি গুচ্ছ লিখে পাঠাই । কি করে যেন মনের মধ্যে আরো এক কবিতা রসায়ন সৃষ্টি হলো। নীহারিকা প্রকাশনা থেকে ২০১৮ সালে প্রকাশিত হলো তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “ প্রেমে সন্ত্রাসে “ । বইটি প্রকাশ করলেন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি এবং নানা গুণে গুণান্বিত ও সাহিত্য বোদ্ধা সকলের কাছে সুপরিচিত শুভাশিস  তলাপাত্র স্যার। বইটির প্রকাশ সন্ধ্যায় রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে তিনি “ প্রেমে সন্ত্রাসে “ বইটি নিয়ে কয়েকটি কথা বলেছিলেন যা আমার এই ক্ষণস্থায়ী, অস্থির কবিতাযাপনকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল এবং ওনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত সবসময়ই আমার ভুলগুলো দেখিয়ে দেয়।

“  আজকাল পত্রিকায় আরোও কয়েকজন তরুণ কবির কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করার সময়  কবি , সুসাহিত্যিক  ও অধ্যাপক সুমন গুণ “প্রেমে সন্ত্রাসে” বইটি নিয়েও কয়েক লাইন লিখেছিলেন ।হয়তো এর চাইতে বেশি আলোচনা পাবার অধিকারি তখনো আমি হয়ে উঠিনি।

তারপর থেকে নীহারিকা প্রকাশনার তীর্থঙ্কর দাশ আমার অন্যতম সুহৃদ। পরবর্তী প্রায় সবগুলো বইই নীহারিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালে  কবি অমিতাভ কর দাদা ত্রিপুরার কয়েকজন তরুণ কবির এক ফর্মা বই নীহারিকা থেকে প্রকাশ করার দায়িত্ব নেন। এবং তিনি আমাকেও আমন্ত্রণ জানান। সেইসময় ওনার আগ্রহেই  প্রকাশিত হয় এক ফর্মার বই “ ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স “ । তিনি তাঁর মায়ের নামে নীহারিকা প্রকাশনার মাধ্যমে  চালু করেন সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মাননা।   যার প্রথম প্রাপক হবার সৌভাগ্য অর্জন করি। সামান্য জীবনে কবিতাকে আশ্রয় করে এইসব প্রাপ্তি আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান ।

কলকাতার গুরুচণ্ডা৯ প্রকাশনা থেকে সায়ন কর ভৌমিক আমার কাছে একটি একফর্মার কবিতার পাণ্ডুলিপি চান। সেখান থেকে কলকাতা বইমেলায় ২০১৮-১৯ সালেই প্রকাশিত হয়

 কাব্যগ্রন্থ “ বিশ্বাসের কাছে নতজানু “ । এজন্য সায়ন কর ভৌমিক ও ঈপ্সিতা পাল দুজনের প্রতি আমার ভালোবাসা সবসময়  অক্ষুণ্ন ।  

কবি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় কাব্যগ্রন্থটির একটি ক্ষুদ্র পাঠ প্রতিক্রিয়াও দেন।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত একদা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত “ কৃত্তিবাস “ পত্রিকা তখনো বন্ধ হয়নি। এই সময় কালে কৃত্তিবাস পত্রিকায় আমার লেখা “ প্রাগজ্যোতিষপুরে “ কবিতাটি প্রকাশিত হয় এবং এইসময়ই আমার একটি ছোট গল্প “ ব্যারনফিল্ড “ অবলম্বনে তৈরি হয় একটি সর্ট ফিল্ম। আনন্দবাজার স্কুলে এ পত্রিকায় দুটো ছোট গল্পও প্রকাশিত হয়। একদম খুশির সীমা নেই তখন। বস্তুত এই সবকিছুই হয়েছিল স্যোসাল মিডিয়ায় লেখালেখির সুবাদে। তাই আমার কাছে এখন লেখালখির  সবচেয়ে বড় মাধ্যম স্যোসাল মিডিয়া ।

ত্রিপুরার বিদগ্ধ  কবি ও সাহিত্যিক মিলনকান্তি দত্ত “ ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায় “ এবং কাব্যগ্রন্থ “ শুভ দ্বিপ্রহর “ নিয়ে ফেসবুকের দেয়ালে দুটো পাঠ প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। নতুন লিখতে আসা যেকোন লেখক  এইসব   প্রাপ্তি আজীবন মনে রাখে এবং সেখানে পূর্বজ সাহিত্যিকের জন্য একটি চিরস্থায়ী শ্রদ্ধার আসন আঁকা হয়ে যায়।  

এখন আর বলতে বিশেষ লজ্জা পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে কবিতাই লিখছি । কবি সম্মেলনে গিয়ে কবিতাপাঠ করার জন্য মন তখন ব্যাকুল । মনে হতো কবি সম্মেলনে কবিতাপাঠ না করলে বোধহয় কবিত্বের স্বীকৃতি হয় না। এদিকে তখনো কোন আমন্ত্রণ পাচ্ছি না। যে সময়টার কথা বলছি সেটা হলো ২০১৫–১৬ । একুশে মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে ধর্মনগর পোয়েটস ইউনিটের পক্ষ থেকে বিশ্ব কবিতা দিবস পালন করা হয়। শ্রদ্ধেয় কবি হৃষিকেশ নাথ আমাকে ফোন করে কবিতা পাঠ করার আমন্ত্রণ জানান। সেটাই প্রথম কবি সম্মেলনে কবিতাপাঠ। প্রত্যেক বছর ধর্মনগর পোয়েটস ইউনিটের উদ্যোগে বিশ্ব কবিতা দিবসের এই অনুষ্ঠান আমার কাছে অন্য সব অনুষ্ঠানের থেকে দামি। কবি হৃষিকেশ নাথ সম্পাদিত “ শব্দনীল ‘ এবং  নিবারণ নাথ সম্পাদিত “ নীলকন্ঠ “ বিধানচন্দ্র দে সম্পাদিত “ সন্ধিক্ষণ “ পত্রিকায় লেখার সুযোগও পেয়েছি। কবিতা পাঠের আসরে কবিতা বিনিময় হয়। তবে কবি সম্মেলনে কবিতাপাঠ করা অপেক্ষা সবার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ্রহটাই আজকাল বেশি আকর্ষণ করে। কিন্তু কবি সম্মেলনে পাওয়া উত্তরীয়কে বড্ড ভারী মনে হয়, ফুলের তোড়া জলে ডুবিয়ে রাখি তবুও শুকিয়ে যায় কয়েকদিন পর, শুভেচ্ছা স্মারকগুলো ব্যাগে করে কোথায় রাখি আর মনে থাকেনা , কলমটা মেয়েকে দিয়ে দিই, রাইটিং  প্যাডে অবান্তর হিসেব লিখি । এর চাইতে দীর্ঘ কবিতা কি কোনো কবি লিখতে পারেন? 

ধর্মনগরে কবি সেলিম মুস্তাফা , সুবল চক্রবর্তী এবং এক ঝাঁক মেধাবী তরুণ কবিদের আগ্রহে প্রত্যেক রবিবারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে “ কথা ও কবিতার আসর “ ।  কবিতাপাঠের অন্য নাম 

‘আনন্দ ‘ ,  মধ্যবয়সে  এটাই অনুভব করি।

 সেলিম মুস্তাফা আমার “ প্রেমে সন্ত্রাসে “কবিতার বইটির একটি দীর্ঘ পাঠ প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। এখনও তিনি প্রশংসা ও সমালোচনা দুটোই খোলামনে করেন। 

ফেসবুকে এসে বহু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। তাদের মধ্যে অনেকই আছেন কবিতার সঠিক সমালোচনা করেছেন।  আছেন  সাহিত্য বোদ্ধা এবং বর্তমানে পারিবারিক বন্ধু 

 সজ্জন ভদ্রলোক কানুলাল দাশ , তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের আধিকারিক দেবাশিস নাথ,  দেবাশিস পাল ,  কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য , কবি তমেলশেখর দে,  কবি সত্যজিৎ দত্ত, গল্পকার দেবব্রত দেব,  সাহিত্যিক দেবব্রত দেবরায়, কবি বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী,   কলকাতার দৌড় পত্রিকার সম্পাদক মধুমঙ্গল বিশ্বাস , মধুমিতা নাথ, অর্পিতা আচার্য,  দেবাশ্রিতা চৌধুরী এবং আরোও অনেকে।

 যার কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তিনি হলেন কবি সম্মেলন পত্রিকার সম্পাদক  কবি শ্যামলকান্তি দাশ। আর যিনি আমাকে শ্যামলকান্তি দাশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি হলেন কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কবি সম্মেলন পত্রিকার সঙ্গে আমার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। কবি সম্মেলনে  গুচ্ছ কবিতা প্রকাশ সহ প্রায় প্রত্যেকটা বিশেষ সংখ্যাতেই কবিতা লেখার সুযোগ পেয়েছি। 

 কৃত্তিবাস চক্রবর্তী ত্রিপুরার অন্যতম প্রধান সাহিত্য পত্রিকা ভাষা সাহিত্যের জন্য  আমার একগুচ্ছ কবিতা নির্বাচন করেছিলেন । কবিতাগুচ্ছটির নাম ছিল “ রাজগৃহে “ । পরে আরো কয়েকবার ভাষাসাহিত্যে কবিতা ও গল্প বেরিয়েছে । কিন্তু প্রথম প্রকাশ অনেক বেশি গৌরবের । 

সদ্য প্রয়াত কবি ও সাংবাদিক জ্যোতির্ময় রায় কর্তৃক সম্পাদিত “ প্রজন্ম চত্বরে “  লেখার সুযোগ পেয়েছি বহুবার । ধর্মনগর বইমেলায় কবি সম্মেলন সঞ্চালনায় জ্যোতির্ময় রায়কে দেখেছি একজন সুযোগ্য রসিক সঞ্চালক হিসেবে। 

কবি সন্তোষ রায় কর্তৃক সম্পাদিত “ জলজ “ সাহিত্য পত্রিকায় যেদিন কবিতা পাঠানোর আমন্ত্রণ পেলাম,  বেশ আনন্দ হয়েছিল । কোন কোন পত্রিকা নিজ প্রসাদগুণে সতন্ত্র। তাই সেসব পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হলে ভালো লাগে । জলজ তেমনই একটি পত্রিকা।


বাচিক শিল্পীদের গলায় কবিতা পূর্ণতা পায়। এই সামান্য কবির কবিতা চেনা অচেনা অনেকেই আছে। ত্রিপুরার খ্যাতনামা বাচিক শিল্পী ইন্দ্রানী চক্রবর্তী তার আবৃত্তি সংস্থা শ্রুতিপুরমের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে অনেকবার আমার কবিতা আবৃত্তি করিয়েছেন। এছাড়া বাচিক শিল্পী সুনন্দা দেবনাথ, নির্ঝর পাল, সংহিতা সিনহা,  জয়ত্রী চক্রবর্তী , মধুমিতা ভট্টাচার্য , গৌহাটির  কবি ও বাচিক শিল্পী  দেবলীনা সেনগুপ্ত  এবং আরোও অনেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমার কবিতা পড়েছেন।  

 কাজী নজরুলের জন্মদিনে  আমার একটি কবিতার ভিডিয়োগ্রাফি করেছেন বাংলাদেশের

নিশাত শারমিন শান্তা। 

আট বছর ধরে আমরা চার বন্ধু মিলে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করি । চিত্তরঞ্জন নাথ,  মৌলিক মজুমদার এবং রাহুল সিনহা ও আমি। নাম “ কীর্ণকাল “ । কীর্ণকাল বিষয়ে আমাদের একটিই অহংকার  কীর্ণকালে বাজে কবিতা ছাপা হয়না।

যদিও বছরে একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় তবুও কীর্ণকাল কিছুটা হলেও বর্তমান কবিতাসময়কে ধারণ করে ।

করোনাকালে ভ্রাতৃসম কবি অভিজিৎ চক্রবর্তী ও আমি কবিতা নিয়ে একটি কথোপকথনধর্মী বই লিখেছিলাম ।  বইটি খুব কম লোক পড়েছেন।

কিন্তু নিরিবিলি এই বইটি আমার খুব প্রিয়, কেন যেন কম প্রচারিত ও কম জনপ্রিয় বই কবির অচেনা অভিমানকে ধারণ করে।

জল বিকেলে মেঘের ছায়া, ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায়,  প্রেমে সন্ত্রাসে, ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স , বিশ্বাসের কাছে নতজানু, শুভ দ্বিপ্রহর,  উড়িয়ে দিও, তারা মেঘের মতো , সংলাপ কাব্যগ্রন্থ “ সোমবার সন্ধ্যায় “ , দুটো দীর্ঘ কবিতা “শোক ও শিউলি “ আমার যাপনকালের এক একটি মুখ । তারা সবাই এক সঙ্গে থাক এটাই চেয়েছি শুধু। 

অনেক বেশি কথা বলে ফেললাম। এবার শেষ করি,  চিরশ্রী দেবনাথের একটি ক্ষীণ পরিচয় আছে , কেউ কেউ বলেন শুনেছি,  ঐ যে ফেসবুকে কবিতা টবিতা লেখে । আমরা এই সমাজে বাস করি যেখানে কবিতার সঙ্গে টবিতা যোগ করে কবির শিল্পসুষমাকে ব্যক্ত করা হয়। হাসি পায়,  দুঃখ তো হয়ই না , অপমানবোধও মরে গেছে। কবিতা এলে কবিতা লিখব , না এলে লিখব না , নাই বা থাকল তাতে বিশুদ্ধ ছন্দের কারিগরী, জীবনের যে সময়কে আশ্রয় করে কবিতা গড়ে ওঠে তার চেয়ে সৎ উচ্চারণ আর নেই,  উপনিষদের ভাষায় “আত্মানং বিদ্ধি “ ।  নিজেকে জানার এই যে বিচিত্র সুযোগ তাকে যত্ন করা আমার দায়িত্ব, বাকিটা পাঠক বলবেন ।










মামেকং শরণং ব্রজ

মামেকং শরণং ব্রজ

শ্রীকৃষ্ণের তখন পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে,  যদুবংশ ধ্বংসের শেষ সীমায় আগত, হিংসা,  হানাহানি, মেয়েদের ওপর অত্যাচার, লোভ সবমিলিয়ে পাপের ঘড়া পরিপূর্ণ এমনই এক ক্রান্তিকালে শ্রীকৃষ্ণকে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন উদ্ধব। শ্রীকৃষ্ণ এবং উদ্ধবের মধ্যে এই যে কথোপকথন এটাই উদ্ধব গীতা। কে এই উদ্ধব?  তিনি শ্রীকৃষ্ণের পিতা বাসুদেবের ভাইয়ের ছেলে,  সম্পর্কে কৃষ্ণের ভাই এবং তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভক্ত । জীবনের শেষ সময়ে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বলেছিলেন আমার কাছে প্রত্যেক ভক্তই কিছু না কিছু চেয়েছে কিন্তু তুমি তো কখনো কিছু চাইলে না। তখন উদ্ধব বলেছিলেন আমি আপনার কাছে শুধু কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাই , আপনি দেবেন ? 
শ্রীকৃষ্ণ যেন খুব কষ্টে তাঁর ভুবনমোহনকারী হাসিটি দিলেন,  বললেন করো।
ভগবদ্গীতা যদি যুদ্ধক্ষেত্রের দর্শন হয় তবে  উদ্ধব গীতা হলো জীবনের শেষপ্রান্তের আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ।
উদ্ধবের করা প্রশ্নগুলোর মধ্যে  একটি বিখ্যাত প্রশ্ন হলো,
আপনি তো ভূত ভবিষ্যত সবই জানেন তাহলে সেদিন আপনি যুথিষ্ঠিরকে কেন পাশা খেলা থেকে বিরত করলেন না ? 
উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বললেন , 
আমি পাণ্ডবদের আজীবনের উপকারী বন্ধু ছিলাম । তাঁরা আমাকে ভগবানের মতই বিশ্বাস করত। কিন্তু যুথিষ্ঠির যখন দুর্যোধনের আহ্বানে পাশা খেলায় সম্মতি দেয় তখন সে একবারের জন্যও আমার পরামর্শ চায়নি। এমনকি কৌরবদের সভায় সদলবলে উপস্থিত হয়েও সে আমাকে একবারও ডাকেনি ।দুর্যোধন পাশা খেলতে পারদর্শী নয় তাই সে তার বিবেক ও বিবেচনা মামা শকুনিকে দিয়ে দিয়েছিল,  পাশাও সেই খেলেছিল দুর্যোধনের হয়ে,  যুথিষ্ঠিরও একইভাবে আমাকে তাঁর জায়গায় পাশা খেলতে দিতে পারত তাহলে তো এই ভারতকথাই অন্যরকম হতো। কিন্তু সুতীব্র অহংবোধে তখন ধর্মরাজ যুথিষ্ঠির আক্রান্ত। পাঁচ ভাই এবং দ্রৌপদী কেউ তখন আমাকে মনে করেনি। দুঃশাসন চুল ধরে টেনে আনার সময়ও দ্রৌপদী আমাকে ডাকেনি , 

 সব শেষে বস্ত্রহরণের সময় নিরুপায় হয়ে  দ্রৌপদী আমাকে ডাকল

" হে হরি অভয়ম
হে কৃষ্ণ অভয়ম "

এবং আমি উপস্থিত হলাম।

অহং,  ক্ষমতা ও লোভ  মানুষকে উপকারী বন্ধুর কথা মনে করায় না,  ভগবানের প্রতি বিশ্বাসকে টলিয়ে দেয় তখনই তার বিনাশ হয়। এটাই যুগান্তর। আমরা সবাই এই কালচক্রের দাস। এই যেমন আমি নিজের হাতে মদমত্ত যদুবংশ শেষ করে যাচ্ছি কারণ তারা এখন শুধু অন্যের ক্ষতির কারণ হবে।

মহাভারতের প্রত্যেকটি ঘটনা এখন যেন আবার পুনরাবৃত্ত হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে ।
মোমবাতি মিছিলে হারিয়ে যাওয়ার দেশ এই ভারত নয়। এখানে তো নারীর অপমানে লঙ্কাকাণ্ড বা কুরুক্ষেত্র হয়েছে। বদলে গেছে সময়।

শ্রীকৃষ্ণ প্রত্যেকটি সময়ের প্রতিভূ যিনি বলেন কর্ম করো কিন্তু আসলে তুমি কেউ নও। ভগবান তোমাকে প্রত্যক্ষ কোনো সাহায্য করবেন না শুধু
তোমার ভালো ও খারাপ প্রত্যেকটি কাজের ফল তোমার জ্ঞানে এবং অজ্ঞানে দিয়ে যাবেন। এখন তোমাকেই ভাবতে হবে তুমি পাপের সঙ্গে থাকবে না শুভবোধের সঙ্গে।

কুরুক্ষেত্রের যু্দ্ধে অভিমন্যুর নৃশংস হত্যার পর চরম বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে বোঝাবার জন্য শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে আত্মা লোকে নিয়ে যান।
সেখানে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে অর্জুন দেখলেন অভিমন্যু তাঁর ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন করার সুফল নিয়ে প্রসন্নমনে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
অর্জুন তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন ।বলছেন আমি তোমার পিতা হে পুত্র।
অভিমন্যু অবাক হয়ে বলছেন কে কার পিতা ? আমাদের হাজার জন্ম হয়েছে হয়তো। কোনো জন্মে আমি তোমার পিতা কোনো জন্মে তুমি আমার।
আত্মা তো অবিনশ্বর।
এখন আমরা যদি পরজন্মে বিশ্বাস করি তবেই হয়তো মোক্ষযোগের  দর্শন এবং লোভকামপাপপ্রেমহিংসা ত্যাগ করে অক্ষয় আলোর এই  স্তরে পৌঁছুতে পারব।
  

#চিরশ্রীদেবনাথ

গুচ্ছ কবিতা, চিরশ্রী দেবনাথ





চিরশ্রী দেবনাথ



গুচ্ছ কবিতা 







উৎসর্গ





শুভেন্দু দাশগুপ্ত ,কবি নকুল রায়, 

কবি মিলনকান্তি দত্ত,  রবীন্দ্রনাথ ঘোষ,  কানুলাল দাশ, নন্দিতা দত্ত,  দেবাশিষ নাথ, মধুমিতা নাথ,  অর্পিতা আচার্য, দেবাশ্রিতা চৌধুরী

.........



কথা হবে বলে মাঠের কাছে আকাশ

কথা হবে বলে মেঘের আড়াল 

কথা হবে বলে পরাজিত হয়ে  হাঁটছি অনেক দূর

কথা হবে বলে দুহাতে ধুলো আর নক্ষত্র

কথা হবে বলে পৃথিবী চুপ করে আছে

কথা হবে বলে সমস্ত বিভাজন মাথা পেতে নেই

কথা হবে বলে আমার ক্ষীণ অপেক্ষা ঘুমিয়ে পড়ছে 



যেখান থেকে শুরু হওয়া উচিত শুধু  তার মুখে রাঙামাটি

অজানা শস্যে ভরে গিয়ে বইছে সেখানে জনমুখর গ্রাম 

তাহলে থাক, গ্রামটি ঘুমোক, আমরাও আসি

যাচ্ছি তবে ...ভুবন হরকরা 

আমরা খুঁজেছি শুধু ফাঁকি আর ফাঁকি 

ঘরহীন সন্ধি আর  বসে থাকা পাশাপাশি। 















শ্রাবণের ধারার মতন 







এক



কষ্টের কাছ থেকে দূরে যেতে চেয়ে

বার বার কষ্টের কাছেই ফিরে আসি

অনিন্দ্যসুন্দর , এতো রঙ, রাগাশ্রয়ী, ধীর সে

বটবৃক্ষের ছায়াতলে আমি কষ্টের চিবুকে হাত রাখি

তাকে একা একা দেখি, একা স্নান করে প্রতিবার আলো মেখে উঠি 









দুই



মাটির পায়ে হাত রেখে আবারো ভেসে যাচ্ছে শ্রাবণধারা

প্রণাম করে এসেছি আমি, পুনরায় গাছ হয়ে জন্মেছে নয়ন

কেউ যদি দূর থেকে দেখো তারে, হলুদ পাতার মতো অযত্নের দাগ

যে জন্ম মাটি থেকে তুলে আনে জীবনের রঙিন

নিভৃতে তপোবনে আবছায়া দিয়ে ঘিরে  রাখে বারুদের জঞ্জাল

তার কাছে  চেয়েছো তুমি আজন্মের আশ্বাস

 ভয়ে মরে যেতে যেতে আগুন খেয়ে উঠে গেছে সে

 রেশমের কাপড়ে নোনাজলে ফুটে উঠে ক্রমাগত অক্ষরের দাগ







তিন



বর্ষার সঙ্গে প্রতিবার ভেসে আসে পৃথিবীর দুঃখ

কী হবে অমরত্বের কথা ভেবে ভেবে ব্যথিত  হয়ে

তার চাইতে কুড়িয়ে নিই অপমান, ভালোবাসা, প্রেম

এ জন্মকে ক্ষতবিক্ষত করে শরীরে এঁকে রাখুক মিথুন চিহ্ন

সে মানুষ এভাবেই গিলে খাক নিজেকে

একা একা লিখে রাখুক বারিধারার শহরে এই পবিত্র আচমন

জীবন দেখে, শুষে, পায়ে পিষে, হাওয়ায় উড়িয়েছে কেউ

এবার তাতে পচন হোক, মরতে চলেছে অঙ্গুরীয় 



প্রাণবায়ুর কাছে হাঁটু মুড়ে বসে আছে

সেই বাজে অসহায় মানুষগুলো ...তুমি দেখো না তাদের 









চার



যে বরিষণ আনে ক্ষুধা, ভাঙা ঘর, ভূমিধস, নেভানো চুল্লি

তাকে ঘিরে কেন আমরা লিখে রাখি বিরহের গান

এ বিরহে শরীর নেই, আশ্লেষ থেকে উঠে গিয়ে বসেছে 

কৃষকের ঘরে, 

আলিঙ্গনের পাশে অবহেলায় পড়ে আছে যাবতীয় ছোবল

অনন্ত প্রসবিনী সে, নারী হয়ে ঢুকে যাচ্ছে  মাটির ভেতরে 

এখন তার ভরে ওঠার সময়, ফুরিয়েছে অম্বাবুচির ক্ষরিত লাল

 এই সাময়িক উত্তেজনায় বর্ষা কাতর হয়নি কখনো, 

আগে ভেঙে দেয়, তারপর নিয়ে আসে শোভা,

আমাদের দেহে প্রদীপের মতো জ্বেলে দেয় অপেক্ষা 









পাঁচ

বর্ষার রাতে আঠারমুড়া থেকে খুলে গেলো যেন পাতার বসন

নগ্ন হতে হতে তার দেহে জেগে ওঠে অবাধ্য তৃণ, যোনির মতন

সেগুনের মসৃণ ডালে শঙ্খচূড়ের ফনায় তখন চাঁদের মধুদাগ

উদ্দাম ঝর্ণা উন্মুখ, গিলে নিচ্ছে ল্যাটেরাইট মিশ্রিত জল

এমন রাত্রি ভেসে যাচ্ছে, এখনো উদ্ধত কেন পাহাড়ী অভিমান

 বুনো আলু পোড়াচ্ছে কেউ, ভেঙে গেছে মৌচাক, রসের জ্বলন































হে অরণ্য



এক



যত আমরা কেটে ফেলছি মৌসুমী অরণ্য

তত কমে আসছে কবিতা

ফাঁকা অম্লদানে হাত রাখলেই

গলে যাচ্ছে নখ, হার, মাংস, মজ্জা 



খুব করে পড়ে নিচ্ছি হরপ্পা কিংবা মায়া সভ্যতার 

পতনের কারণ

আমাদের ডম্বুরেও তলিয়ে গেছে বনভূমি

তাই ঘর ভর্তি আলোতে জলবিদ্যুৎ গুমরে ওঠে

তাতে বনমোরগ, শুকোর, পাহাড়ি হরিণের মৃতছায়া 

পর্ণমোচি বৃক্ষভূমির বর্ষাকালীন গোঙানি



এইসব কিছু মিশিয়ে আমি অক্ষরের ককটেল

সম্পাদকের দপ্তরে জমা দিই









দুই



কোন এক গ্রামে হঠাৎই ছুটে আসছে মেট্রোশহরের মানুষ

থমথমে কালো জলের দিঘি ভয়ে কাঁপছে

বুকের মাঝে যেন সমুদ্র, হয়ে উঠতে চাইছে ভয়ঙ্কর সুনামি    

গ্রামের মানুষ শহরে, শহরের মানুষ গ্রামে

জলহীন জলহীন জলহীন জলহীন ...







তিন



ব্যক্তিগত কথা গুলো আপাতত বনভূমি হয়ে উঠতে চাইছে

প্রেম অথবা সংলাপ গাছের মতোন 

গোড়ায় জল দিতে চাইছি এখন

অথচ মৃত ডালপালা তো কবেই দেখেছি

জলবাউল এক নতুন ফেরিওয়ালা

ব্যাগে করে গাছের শিকড় আনে, জরিবুটি

পল্লীবধূদের বলে গর্ভে নয়,  মাটিতে পুঁতে দাও ঔষধি

 স্নান করতে করতে সঙ্গমে মন দিও    

মেঘের মতো খোকা খুকী হবে, 

জন্ম থেকেই চাষীর মত নরম মন







চার



সারা পৃথিবী বহুদিন ধরে বৃক্ষের চিৎকারে ভরে আছে

একটি গাছও কোনোদিন ঠিকভাবে লাগিয়ে যত্ন করিনি

তাই বোধহয় গুমড়ে গুমড়ে এইসব কান্না দিনরাত শুনি

আসলে মাটি নেই আমার

থাকলে চারটে গাছের নিজস্ব একটি বাগান হতো

মেঘ আটকে বৃষ্টি হতো সেখানেেই ... একলা ভেজার মতন





পাঁচ



কোল্ডড্রিঙ্কস্ কেউ নিষিদ্ধ করবে না

এ তথ্য বহুদিন ধরে জানা অনেকেরই

কারণ বুদবুদ ফুঁসে উঠলেই জমে যায় লিপস্টিক, 

রাত নামে সব জায়গায়   ।

এই আশ্লেষের নাম  'তৃতীয় বিশ্ব '

ঠান্ডা রস আর বিষে তার জন্মান্ধের অধিকার। 









ছয়



প্রেমের কবিতা লিখতে গেলেই

কলমে নর্দমা বইয়ে দিই

মিথ্যে কথা বহন করতে করতে জলের রিসাইক্লিং হয়, 

সেখানেই ধুয়ে যাই

দেখি দুর্নিবার গোধূলি, মনে হয় আরো কিছু লেখা হোক

নর্দমা অথবা নদী, দুটোই আমার একান্ত ব্যক্তিগত







সাত 



রাজস্থানে এক মেয়ে ছিল

তার নূপুর বেজে উঠলেই জানান দিত ভূগর্ভস্থ জল

আজ সারা ভারতে সেই মেয়ের খোঁজ পড়েছে

স্মার্ট সিটিতে বহু নীচে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত জমছে 

এখানে এসে থমকে গেছে তার নূপুর

বাজছে না তো, শুধু থেমে আছে পাথরের মতো 

শহরের লোক যেতে দিল না তাকে

স্ট্যাচু হয়ে গেছে মরুবালিকা 

বহুদিন পর কখনো নদী আসবে মাটির নীচে

হয়তো সেদিন মৃতনগরীর বুক থেকে শব্দ উঠবে ঝমঝম ঝমঝম, 

পিয়া জয়তু বর্ষারাস হাজার সাল বাদ...













আট



সব বনাঞ্চল ফিরে এসেছে

নদীরা পূর্ণগর্ভা, দুহাতে নিয়ে এসেছে মহেঞ্জোদারো সভ্যতা

বাদামি কালিকট, সম্ভ্রান্ত লোথাল 

যত যুদ্ধ হয়েছিল ভারতপ্রান্তরে, সব মুছে গেছে

মানুষীরা পুষ্ট বেশ, চোখ তাদের উর্বরা 

পৃথিবীকে সবুজ রাখতে আজকাল তারা দত্তক নেয় বৃক্ষ সন্তান

এই স্বপ্নটি অস্থির পদাতিকের মতো আমার দিকে আসে রোজ রোজ

'সে' বলে আমি নাকি অসুস্থ ক্রমাগত

অথচ পরমানু অস্ত্র কিংবা কাশ্মীর সীমান্ত অথবা ধর্ষণ,

সংসদে গুরুত্বহীন মাতৃভাষা,

 কোনটাই আর আমার বিষয় নয়

এমন কি তিনতালাক বা তেত্রিশ পার্সেন্ট সংরক্ষণের ক্ষমতায়ন, 

জলহীন শহরের কাছে সবকিছুই  তো আসলে শবের মিছিল

মাটিতে অংক কষে, বৃষ্টি নামানোর বার্তা দিতে পেরেছে কেউ?

তার কাছে যাবতীয় মেধাসত্ত্ব চুরমার হোক! 



















কাটাকুটি 



এক



যে  কবিতা হয়নি লেখা 

সে আমাকে আসলে ছেড়ে যায়নি

যে পথে বারুদ জ্বলেছে,

 তাতে এখন ছায়া সুনিবিড় গাছ    

মৃতদেহের দাগ সরিয়ে আলোর আলপনা

যে গান গাওনি  তুমি

আমি আজ সেই গান  শুনছি



দুই



ভোরের পাখির ডাক বহুদিন শুনিনি

তখন আমি ঘুমোই    

ঘুম থেকে উঠে দেখি চারপাশে পড়ে আছে

নীড় ছাড়ার আগের ব্যস্ততা

সেসব মাড়িয়ে যেতে যেতে

আমার ভেতরে জেগে ওঠে অরণ্যের হাতছানি





তিন



পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে দেখলাম

আলো নেমে যাচ্ছে খাদের ভেতরে    

উন্মুখ অন্ধকারও তাহলে এতো আকুল 

আমাকে অগ্রাহ্য করেছে খাদের উজ্জ্বল চোখ

আচ্ছন্ন হয়ে আমি দেখছি তোমাদের পবিত্র রূপ 







চার



তাহলে বলো, 

দুজনে মিলেই বসন্ত দেখছি এবারো

যাওয়া আসার পথে কিছু পলাশ আর রুক্ষতা

অনেকটা তুমি যখন রেগে যাও তেমনি

একসঙ্গে দেখা বলতে ঠিক পাশাপাশি নয়

 দূর থেকে দূরে গিয়ে

বৃষ্টিছেঁচা জলের মতো তীক্ষ্ণ সুর

পরস্পরের ব্যথাকে উন্মুখ রাখে শুধু...







পাঁচ



একটি প্রতিবাদী কবিতা আশা করি আপনার কাছে! 

অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছি, 

তখন আমি বিরহের  মুডে, 

 প্রতিবাদ অথবা জনারণ্য, ঝাপসা হয়ে আসে 

যে কিংখাবের বসনে জড়িয়েছি নিজেকে,

বাহুল্য মনে করে তুমি সরে যাচ্ছো ক্রমাগত ...     











জাদুগ্রন্থি 



এক

......

জাদুবাক্স খুলি, রাত তৃতীয় প্রহরে, ভেতরে ডালপালা সমেত চুনীর গাছ, সবুজ শ্যাওলা ঠিকরে বেরোচ্ছে, পূর্নিমা বিরহিত আকাশে শুদ্ধতম নক্ষত্র, যে মানুষ কোন পাপ  করেনি পৃথিবীর সংসারে, জাগছে সে  শিশুদের মতো, তার চোখ কোমল, টয়ট্রেনের মতো আলোর অভিযাত্রা, বনানী পাশে রেখে    নির্বিচারে জাদুবাক্সে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জানালা লাগাও,  কপাট পরাও, রশ্মির ছেঁচরামো বন্ধ করো, আলোর  হাঁড়িকুড়ি জ্বালো, মত্ত ক্ষুধা লেগেছে বয়সকালের।





দুই

.....

প্রতিশ্রুতির  পাশে দুর্বল গোলাপ গাছ থাকে, সমু্দ্রের হৃদয়ের কাছে যেমন ঝিনুকদের অসহায়তা, আমি একদিন বললাম   , তোর কোন ভয় নেই , যেমন খুশি ঝড় খা। আশ্চর্য সেই থেকে গোলাপের বাগান, কাঁটা বিক্রি করে। গভীর সতেজ ইচ্ছের মতো কাঁটা। সেগুলো কিনে ঘর সাজাই, বারান্দায় পেতে রাখি। এমনকি   সবগুলো পথ এইসব কাঁটাদের হাঁটাচলায় মুখর হয়ে আছে,  কোজাগরী এবং বসন্তপঞ্চমী নামে দুজন মেয়ে গোলাপ বাগিচায় আমার জন্য কিছু অচেনা সুগন্ধি খুঁজে আনছে ...এই বিশ্বাসে আমি গোধূলির পাশে বসেও  মন খারাপ করছি  না আজকাল... 













তিন





সময়টি  মাংসকালের। নির্মোহ মাংসাশী গ্রাম ও শহর।  অপরাহ্নের নিমন্ত্রনে ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে রাত, দিন, ধর্ম, ধ্বজা, পতাকা ও যোনি। অন্ধদের থালা বাটি গ্লাস ভরে উঠছে ভরপেট নৈবেদ্যে। যেদিন হেমন্তসময় প্রবাহিত হবে, মাঠের পাশে বসে থাকব আমরা  সার বেঁধে,   ... মাংসের কথা, পেটভরার কথা, শরীরসুখের কথা বলতে এতো অক্ষর লাগাও কেনো হে, 

কসাইের কাছে রক্ত জলের মতো, কৃষকের কাছে কাদা তো  মুঠ মুঠ পরমান্ন, আমাদের এই বোকা এবং অশ্লীল চেয়ে থাকা  পৃথিবীর আঁচে নিজস্ব  দহন জ্বালাবার  জন্য ...













চার 

.....

একই বাতাসের মধ্যে তো আমরা আছি, সুনীলের পংক্তি, আমার  প্রিয়, তারপরও সব সৌন্দর্য, সব সুকুমার বোধ গুলোকে স্বরধ্বনি দিই, কেন যে এই শত শত বছর এগুলো পাপ মনে হয় না , মনে হয় না গুহার পর গুহা ভেঙে দিচ্ছি সস্তা আয়োজনে, নিজস্ব অর্কিডের বনকে তুলো মনে করে বালিশে ঢুকিয়ে সেলাই করে নিচ্ছি, গভীর ঘুমেও নিবিড়তা ছুঁতে পারছি না, জ্যোৎস্নার পাখিরা গা ঢাকা দিয়ে আছে, আমরা খাঁচার জন্য খরকুটো কিনে চলেছি।







নত হয়ে গেছি

.......



আমি কোন প্রতিবাদের কবিতা লিখতে পারি না

 দেখি দুতিনটে দরজা, ক্ষয়িত মানুষ, হলুদ মেয়ে 

তারা সবাই একসঙ্গে মিছিলে যাবে বলে দীর্ঘশ্বাস জমা  করেছিল 

মৌনতার মিছিলে মিশেছে মোমবাতি, সাদা ফুল, কালো পতাকা 

কিছুদূর যেতে যেতে, রাস্তায় পাহাড়ের মৃতদেহ, গাছেদের ছায়া 

 মানুষগুলোর কাঁধ থেকে নেমে গেলো মৃতদেহের চিৎকার,  শপথের দুর্বল শ্লোক

দুতিনটে ঘর আর মুরগীর খাঁচা, নিমগাছ ক্রমাগত, কিছু গৃহমুখী গন্তব্য 

তাদের মাথা নীচু হতে হতে কবে যেন  রাস্তা হয়ে গেছে।















বৃদ্ধাশ্রম 



যেখানে সব ঋতুকাল মরে গেছে, 

সেখানে শুরু অস্মিত দিকবলয়ে বৃদ্ধাশ্রমের গল্প

মিলনের পর ঋজু তমাল আর অশ্বত্থ জন্ম দিয়েছে বামন ছেলে 

আকাশ দেখতে না পেয়ে সন্ততিরা কুড়িয়ে নেয় কেবলি কলহ আর রুদ্ধ দীর্ঘ শ্বাস

কত স্বাভাবিক সারি সারি বাণপ্রস্থ

কি যেন ছিলো গভীর আলমারীতে পুরনো ছবি, হারানো সমূহ দ্বীপ 

বসন্তের পাতা হয়ে জমে আছে পৃথিবীর সব সৈকতে

তাদের চোখে শ্লোক, মন্ত্র, প্রার্থনা গানের অশ্রু 

সখা হে, চাবির গুচ্ছে মোহ, স্নেহের কবিতাটি কেবলি মনে পড়ে। 



 





   







মাটির কান্না 

.............



এক



কৃষকদের আন্দোলন হচ্ছে

রাজধানী বন্ধ, রাজপথে অভিজাত গাড়ি

মাটি আর আগুনের ধক ধক দেখে

দুঃস্বপ্নের ক্ষুধা জ্বলে ওঠে

এতো অপরূপ আঁখি আমার দেশের

অথচ জলে ভরা, একটি দিনও সে না কেঁদে থাকেনি 





দুই

..............

তুমি এলে, কিছু ছটফটানি, ডানার আস্তে সরে যাওয়া

লিখে  রাখলাম অবাধ্য ঠিকানার কষ্ট, লালচে অ্যাসিড

ভেবেছিলাম সেরে উঠব, প্রত্যেকবারের মতো, 

অনেকদিন হলো, ঘুম হারিয়ে ফেলেছি, 

ভোরের তন্দ্রা ছেড়ে আমি জীবন্ত দিন ঘুমের মতো কাটিয়ে দিই। 

জোর করে কবিতা হয় না, তাই সাদা পাতার কাছে চুপচাপ বসি

শিশির খসার শব্দ শুনতে পেলে, বুঝতে পারি নিস্তব্ধতা কতটা প্রখর।









তিন



আমার দেশ ভালো আছে, 

যে বিষাদ ছড়ালে অন্ধকার ঘরে বন্দী প্রজা, 

সে বিষাদ নিশ্চুপে বন্দী করলাম এইমাত্র, 

ভারতসাগর ঢেউয়ের দরজা খুলে দিও ...

ক্ষয় ও বিষাদ ডুববে, আত্মহত্যায় ওদের ভয় নেই  ...

















দু একটি তুচ্ছতা









এক





অন্ধকারে যারা হারিয়ে ফেলে ভালোবাসার মুখ

তারা বার বার চলে যায় একজন থেকে অন্যজনে

প্রতি ঠোঁটেই  তাদের চুম্বনের  ইচ্ছে জাগে

এইসব নিরাসক্তি এখন পুনঃপ্রেরিত, বিষাদহীন









দুই





অনেকদিন পর কবিতার কাছে এসে দেখি...

ধূ ধূ করছে শস্যহীন মাঠ

রুক্ষ  আলপথে পূর্বের জলদাগ    

বহুদূরে একটি গাছ, দুপুর হচ্ছে

কোথাও কোথাও অহংকার জমেছে কাদার মতো

হঠাৎ আমার নকল ধ্যান ঠুকরে দিয়ে 

উড়ে গেলো একটি সঙ্গীহীন পাখি    









তিন





বিখ্যাত  কবিদের  সব  কবিতা  ভালো  হয় না

তাদের বাজে  কবিতাও  ছাপা  হয়

পড়তে পড়তে  পাঠক  বলে  ' অখাদ্য ' 

আমার  খুব কষ্ট  হয়, মনে হয় সেটাই আসল লেখা 

 যেন  রক্তাক্ত আঁচড়,  যে স্পর্শ  চলে গেছে তার রিক্ততা    











চার





আমাদের জন্য কী আছে পৃথিবীতে 

অসমাপ্ত কথোপকথন আর মুছে দেওয়া

আমাদের ব্যস্ততা গুলো ছায়াপথ রেখে যাচ্ছে

কেউ বলে হৃদয় কেটে পথ

আমার মনে হয় রক্তারক্তি যেন আচম্বিতে

ধার করে নিচ্ছি যাদু বাস্তবতা, মানুষ কী আজকাল এভাবেই বাঁচে?







দ্বৈত    





এক



প্রত্যেকটি বন্ধুত্বের নীচে নোনা দাবি থাকে 

আমি সে আবদার রাখতে জানি না    

আস্তে আস্তে আমার স্বপ্নের বন্ধুত্বগুলো দূরে চলে যায়

আমি হেরে যেতে যেতে, দেখি

চারপাশে নেমে আসছে ধূসরতা 

আবারো হাত বাড়াই ক্ষণকাল    

স্পর্শহীন উষ্ণতার অলীক চাওয়া নিয়ে    

পুড়ে যাচ্ছে যেসব কবিতা, তাদের দহন অক্লান্ত থাক। 

সেখানে নিভৃত বালুচর, পদচিহ্ন রয়েছে। 

বই হিসেবে তুমি তাকে না পড়লেই কী ? 

নিভৃতে পড়ব বলে নিজের জন্য  লিখে রেখেছি সব। 











দুই



অনেকদিন পর আমি লিখতে বসেছি

তোমাকে হারিয়ে, তোমাকে নিজের মতো ভাবতে

কিছু পংক্তি জমা করব।

দিকচক্রবাল থেকে গ্রীবা উঁচিয়ে আমাকে দেখছে নম্র রাত

ব্যস এতটুকুই লেখা হলো

তারপর থেকে ভাবছি,

 আমার ফুরিয়ে যাওয়া  দীর্ঘ ক্লান্তিকর লেখার মতো, 

উচ্ছলতার কাছ থেকে আরব্ধ নিয়ে, নিভে যাচ্ছি মৃদু রবে।

দুর্বল শব্দগুচ্ছের প্রতিবাদ গলা টিপতে চাইছে

শ্বাস নেই, সবুজ হলকা বেরোয়, অসংবৃত অবকাশ













তিন    





যখন অস্থিরতার পাশ দিয়ে যাও তুমি, 

আমি টের পাই গোধূলির লাল চোখ থেকে নেমে যাচ্ছে অন্ধকার

বাগানের সহিষ্ণু আগাছায় বাড়ছে বাগিচার অনাঙ্খিত সুখ, 

পৃথিবীর গভীর থেকে আসা কম্পন, 

আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে প্রথমের কাতরতা

এইসব বহন করতে করতে, আমরা কবি হই

আসলে আমি লিখতে জানি না, প্রলাপের কাছে ঋণ জমা  করি শুধু।









অগ্রহায়নে





এক



শেষ অগ্রহায়নে, শঙ্খের হৃদয় থেকে ছড়িয়ে পড়েছে তীক্ষ্ণ সুর

ঘরছাড়া মানুষীদের বলে, মন দাও আগুনে, অঙ্গারের অলঙ্কার

শীতকালীন ফুলের সমারোহ থেকে আমার কাছে এসেছে বিষণ্ণ সুবাস

তুমি কি ভুলে গেছো ভ্রমণের পথ, চেনা পান্থশালার রঙীন কাচ

অভিমান জমা হয়েছে অবহেলার ডাকবাক্সে, জংধরা ধাতব শরীর

বহুদিন পর ঠিকানা মনে এলে, ভুলপথে আরো মন্থর হবে অপেক্ষা, সবই অজুহাত।    

পৌঁছুবার ইচ্ছে ছিল গ্রীষ্মের রাতে, 

 ভ্রমনপথের সীমানায় বাড়তে দিয়েছি কয়েকটি কৃষ্ণচূড়ার গাছ। 











দুই



কৃষকদের নিয়ে গান বাঁধা হোক 

গমের ক্ষেতে উড়তে থাকুক তরুণ কবির কবিতা    

আর্সেনিকের স্তর জানিয়ে গেছে আধিকারিক    

তাতে কোথাও আটকে যায়নি চাষবাষ

হাত পা পচে গেলে, বদলে যায় ভাড়াটে চাষী

আমার দুর্বল দু লাইন ধানের গর্ভে জমা থাক

অস্বস্তি আর অপারগতা ঢাকতে আমি উৎসবকে নিমন্ত্রণ করি

শুয়ে শুয়ে লেখা  দু ছত্র প্রতিবাদী কবিতা আমাকে গালি দিয়েছে, বলেছে নির্লজ্জ, অশ্লীল! 





















স্বনির্বাসনে





এক



ভীষণ ভাবে ছুটে আসা অন্ধকার আঁকবো বলে

বসে আছি, বসে আছি দ্বিপ্রহরে

কোথাও সূর্য উঠেছে, বিশ্রী লাল 

রক্ত উড়ছে,  বাতাসের আলিঙ্গনে , মেঘের পতনে

আমি অহং আঁকছি, চশমায় ধুলো জমছে

মুহূর্তে মুহূর্তে বেড়ে যাচ্ছে দিক নির্নায়ক ক্ষমতা

এতকাল পাখার স্তব করেছি পরীর কাছে

আজ সে রেখে গেছে দুপশলা ডানা,

 সেই থেকে দেবী হয়ে আছি, ভালোবাসা ভুলে গেছি। 







দুই



স্ব ইচ্ছায় একটি নির্জনতম দ্বীপে গিয়েছিলাম

সারা রাত বিচ্ছিন্ন ঘুমে, মৃত স্বপ্নদের দেখে

পরদিন সকালে আমি ছটফট করতে লাগলাম

 কোলাহলের জন্য

ততক্ষণে শেষতম জাহাজটিও চলে গেছে 

যদি একটি চিঠিও আমার ফেলে আসা

 বারান্দায় পরে থাকে, কথা দিয়ে গেছে এনে দেবে, 

ততদিন অপেক্ষা, 

কেবল শোঁ শোঁ, শিকারি পাখি, সূর্যাস্ত,

কী বিকট এই একা থাকা। 







তিন



তুমি ভাবছিলে হারাচ্ছো আমাকে 

এতোদিনে আমি শিখে গেছি ঠিকঠাক নমস্কার ও প্রণাম 

কী করে নড়বড়ে সাঁকোর মতো বাঁচিয়ে রাখতে হয় 

অচেনা আহ্বান 

পদাবলী কীর্তনের মতো অশ্রু অভিনয় অথবা 

 ইচ্ছেমত বিষাদকথা 

টেবিলের ওপর পেপার ওয়েট দিয়ে চাপা থাকে সাদা কাগজ

হাত চালালেই হলুদ অসুখে ভরা অক্ষর নেমে আসবে 

নেড়েচেড়ে ভাবি স্কেচ আঁকবো অনুভবের

জটিল বাঁকানো শরীরের রেখা বলে দেবে ধুলো উড়েছিল 

অবিশ্বাসী চোখ না দেখে বুনে গেছে পোকামাকড়ের বাসভূমি 















নক্ষত্রের রাতেরা 



এক



নক্ষত্র ঘন হয়ে থাকা রাতে পাশের ফ্ল্যাটে ঝগড়া শুনি

ভাঙা ঢেউ, অস্পষ্ট ঝুরো চীৎকার

একটু থেমে থাকা, ঘুমভাঙা  শিশুর কান্না

পরদিন সকালে ভয়ে ভয়ে উঁকি দিই

নুডলস সেদ্ধর মশলা গন্ধ ভেসে আসে

দরজাটি বন্ধ হয়,

 একটি দ্বীপ অথবা শ্যাওলা পড়া  তিমির পিঠ,

 পৃথিবী থেকে দূরে চলে যায়

সন্ধ্যায় সিন্দাবাদ আজ স্বপ্ন নিয়ে ফিরে আসুক,

জোব্বার পকেটে থাক  আদুরে ভীনদেশী গোলাপ 







দুই



সাঁতষট্টি বছর বয়স হলো আমার

তোমাকে চিনেছি এখন

 সেই কবে থেকে যেন আলাদা ছিলাম আমরা

সেদিন জুলাইয়ের শেষ

 অথবা একটি ঋতু এবং খরার  শুরু 

 খুঁজে পেয়েছি উপহারের খোলস 

পশুর সরল ভাষায় ভরা

পাখির কুজনের মতো চেনা এক নদী আকাশে গিয়েছে চলে

যেদিন পুনর্বসু উঠেছিল জ্বলজ্বলে 

এখানে দেখা হবে এমনি কথা হয়তো ছিল মনে

স্তব্ধতা ফেটে গেলো, কী অপরূপ কান্না হলো আমাদের। 









তিন



স্যার, আপনি শুধু সায়ন্তনীর কপি নিতেন

ওর ভুলে ভরা কপিতে

কালো মার্কার দিয়ে শুদ্ধ করে দিতেন সযত্নে

বাকি ক্লাস হুমড়ি খেয়ে পড়তো সায়ন্তনীর ওপর

কোঁকড়ানো চুল আর ঝিলমিল চোখ ওর

সেদিকে তাকিয়েই পড়ান আমাদের 

তারপর একদিন সায়ন্তনী ভুল করে ফেলল

শেষ পরীক্ষার শেষে আনমনে সুইসাইড করলো

যেন এটুকু বাঁচতেই তার ভুল করে বেড়াতে আসা পৃথিবীতে 

কেঁদেছিলো কি ! হয়তো ! 

কান্না গিলে ফেলেছে একটি জৈষ্ঠ্যের বিকেল

পড়ন্ত উল্কাটি স্বাক্ষী ছিল, মাঝপথে ছাই 

 শুনেছি আপনি এখনো যথাক্রমে কপি শুধরান নবাগতাদের। 















  মায়াঘাত





এক



হঠাৎই চোখে পড়ল  বিশাল ফাঁকা মাঠটি। কোথায় লুকিয়েছিল এতো শূন্যতা নিয়ে ধূ ধূ প্রান্তর,  গোধূলির  সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে মাঠে, মাঠ তখন কড়াই, রোদ ছড়িয়ে পড়ে মাঠটাকে অদৃশ্য করে দিচ্ছে, আমাকে  অস্তিত্বহীন, অথচ আলোর  মাঝি  হাল ধরেছে, তাই আমি বিষণ্ণ হচ্ছি  না, মুগ্ধ ভাব নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ভাসছি...ভালোবাসা চলে যাবার পর আস্তে আস্তে আমাদের চোখ অন্ধ করে দিয়ে এভাবেই কি ভেসে ওঠে সকল মায়াবী অন্তর্ঘাত! 









দুই



কোভিড সময়ে সারা পৃথিবীতে আত্মহত্যা বেড়ে গেছে,  শুনলে মনে হয়, আগে যেন মানুষ একা ছিল না, বিষণ্ণ ও উদাস ছিল না, তারা শুধু দল  বেঁধে আনন্দ করতো, মহামারী চলে গেলে মানুষ কি তবে আত্মহত্যা থেকে ফিরে আসবে, বন্ধ ফ্ল্যাট আর একা বাড়ি থেকে চলে যাবে সকল অসুস্থতা,  যতদূর খবর পড়ি শুধু শুনি যশ, অর্থ সবকিছু নিয়ে একা মৃতদেহ পড়ে আছে নির্জন ঘরে, আসলে নির্জনতম হলেই মানুষ মরে যায়, তখন গান হয় না, কবিতা হয় না, নিঃসঙ্গ  তীক্ষ্ণ শিস কেটে কেটে দেয় ধমনী, শিরা ... কাছাকাছি এক  হাতছানি ভয় শুধু ভয়ের...











তিন



বড় কোনো ঘটনার জন্য ছোট ছোট প্রাণীরা প্রাণ দেয়, রাশিয়ায় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের  সময় অজস্র  কুকুরকে মেরে ফেলা হলো, তারাও ছিল রুশ নাগরিক, বরফঢাকা প্রান্তরে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া রাতে গাইত রুশ জাতীয় সঙ্গীত, অথচ জীবন্ত দেহগুলো অসহ্য ঘুমের ঔষধের ডোজ খেয়ে তলিয়ে গেলো নিষ্ঠুর নীলাভ জলে , মার্কিন প্রেসিডেন্টের কন্যা এলো ভারতে, ভিখিরীদের কোথায় যেন হাফিজ করে দেওয়া হলো  কদিনের জন্য, নাহ্  মারেনি, শুধু চোখের সামনে থেকে গরিব সরিয়ে ফেলা, যেমন নদী বাঁধ বানাবার সময় হাজার হাজার একর জমি চলে যায় জলের নীচে, কত গ্রাম আর মানুষের বেঁচে থাকা হারিয়ে যায়, অথচ অতিথি  ভাইরাসটি খুব নিরপেক্ষ, সে এসে গরিব ধনী আলাদা করলো না, নিজের কাঁধেই তুলে নিল বায়োলজিক্যাল ট্র্যাশের দায়িত্ব... বাদুরের হাসি তার ট্রেডমার্ক। 







চার



আজকাল আমরা আবার চলে এসেছি রূপকথার পৃথিবীতে, সেখানে গবাদিপশুর ডানা গজিয়েছে, মরুভূমিতে ভাসছে ময়ূরপঙ্খী নৌকো, রেশনের দোকান থেকে কিনে আনছি শুষ্ক গ্রন্থাবলী, খিদে না  মিটলে আন্তর্জাল থেকে ভাষ্য চুরি করে ঘর সাজাচ্ছি, যারা যারা হিসেব কষে পরবর্তী প্রেমটি করছো, সঙ্গে চালু  রাখছো সন্ধানী দৃষ্টি, আস্তে করে ছেড়ে আসছো পলকা ইশারা, তারা ভুলে গেছে বিশ্বাসের একটি রক্তহীন চোখ আছে, সেই  উজ্জ্বলতার কাছে স্থির হয়ে আছে মানচিত্রের সীমান্তপ্রহরা ...



     





পাঁচ 



ধরো তোমার রাগ হচ্ছে, কান্না পাচ্ছে, সামনে অনেক লোক, ভুলে গেলে, এখন তুমি নিঃসঙ্কোচে কাঁদছো, খটখটে দিন বাইরে, রুক্ষ, প্রেমহীন রিরংসাময়, চারদিক থেকে আস্তে আস্তে আকাশ নেমে আসবে তখন, মেঘের পরে  মেঘ, কালপুরুষের শরীর, সব  লোক অবাক হয়ে দেখছে, একজন মানুষ সারা শরীর ঝরিয়ে কী করে কেঁদে ওঠে, শুধু পৃথিবীটা অবাক হয়নি,  তোমাকে কাঁদার অধিকার দিয়ে প্রসারিত করেছে মাটির উঠোন, সরিয়ে দিচ্ছে দূরবর্তী পাথরের পাহাড় ...

 

















দ্বিতীয় সময়



পৃথিবীর এক গভীর দুঃসময়ে কোথাও কোথাও নতুন দ্বীপের জন্ম হয়, এই খবর কোন নিউজ চ্যানেল  দেখায় না, হয়তো ঝড় থাকে চারপাশে তবু কারা যেন সেখানে একটি মোম জ্বালিয়ে স্বপ্ন দেখে, কখনও নিভবে না আলো, আমিও সেই স্বপ্ন দেখি, একে কি আদর বলে, জড়িয়ে ধরা বলে, ভেসে যাওয়া বলে জানি না তো ! তবুও বিচ্ছিন্ন পংক্তিতে হারিয়ে না যাওয়ার স্বপ্ন শুধু আমাদের জন্য থাক। 









পৌঁছে যেও নিঃসঙ্গ পারিজাত বনে



আগামীকাল নির্ভয়ার দোষীদের ফাঁসি

হয়তো এসব লিখতে লিখতে তারা পৌঁছে যাবে নির্ভয়ার কাছে অবশেষে

রক্তের দাগহীন একটি ধবধবে সাদা শাড়ি পরে নির্ভয়া কাঁদছে 

জ্যোস্নালালিত স্বর্গে, পারিজাত বনে 

যন্ত্রণা কমেনি তার, শুধু রক্তের দাগ মুছে গেছে

প্রতিদিন তাঁর রক্ত ছুটে ছুটে চলে যায় অন্য আরেক একটি যন্ত্রণার কাছে, ফেসবুকে ছবি আপলোড হয়,

গোটা দেশ পোড়া গন্ধ নিতে নিতে রাতের খাবার খেয়ে ফেলে

তার দুদিন পর ব্ল্যাক আউট, একটি নিরপরাধ মহামারী 

ইরানে বিমান থেকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে মানুষের লাশ

নীচে গর্ত, ঝটপট কবর, সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা,

স্বজন কোথায়?  হে মৃতদেহ ! প্রিয়ার হাত? 

ভাইরাসের কাছে চলে গেছে সব অলিখিত গোপন মেসেজ, সতর্কবার্তা, 

শাট ডাউন পৃথিবী ! শাট ডাউন! 

 অনেক হয়েছে, নিস্তব্ধ হও নিজের কাছে

চুপচাপ পাঠাতে থাকো ভালোবাসার কবিতা, শেষবারের মতো

জানো তো ভালোবাসা নিঃস্তব্ধ থাকতে ভালোবাসে, হয়তো নিঃসঙ্গও,

 তাই নিজের কাছে লালন করে বিষাক্তজীবাণু, প্রতিষেধকহীন, 

বাজার থেকে কিনে নিতে পারো 'মোকাবিলা '

ফোন করে বলে দাও সবাইকে ...

"আমাদের বাড়ি এসো না "

আমরা অস্ত্রহীন হয়ে খুঁজে পেয়েছি সাদা কালো লুডোর ছক্কা, কিছু অবসর

এখন আমার পালা, দক্ষ খেলুড়ে নই, পরাজয়ে বিশ্বাস রাখি 

পৃথিবীর বেঁচে থাকা বৃক্ষকে সাক্ষী করে বলছি 

কোনোদিন তেমন কিছু চুরি করিনি, শুধু জমিয়ে রেখেছি নদীর জল, কিছু শায়েরি, রুবাইয়াত আর মেধাবী চাকর। 

অস্ত্র কিনতে কিনতে ভরে ফেলেছি সিন্ধু সভ্যতার বাড়িঘর

চালু থাক ইন্টারনেট, বসন্তের গান, প্রেমের ছড়া আদ্যোপান্ত রহস্যহীন

তুমিও তো ফিসফিস করে বলো হ্যান্ডওয়াশ দরকার খুব, গলা জ্বালা করছে, শ্বাসকষ্ট

অথচ শেষ হচ্ছে না, লতা - রফি মিউজিক নাইট

এখনো মানুষের কাঁদা বাকি, হাত তুলে নাচ করা বাকি 

গেন্দাফুলের মালা নিয়ে চোখ টেরিয়ে টেরিয়ে তাকাচ্ছে  গণপ্রজাতন্ত্রী দেশের চালু যুবক

তাতেই নাকি দ্বিখণ্ডিত তেজী 'কোভিড ১৯ '

এই অবাঞ্ছিত মার্চ মাস শেষ হয়ে গেলে 

সকল স্থগিত উৎসবে আমাকে নেমতন্ন করো 

আমি পৌঁছে যাবো দ্রুত, পকেটে বেকারত্ব, বিপন্ন অর্থনীতি, 

কিছু আকাশি রঙের ছাড়পত্র, তাতে ঈগল আঁকা

ডানা দিয়েছে আমাকে, পারোনি বুঝতে?

নখ, দাঁত দুর্বল হয়ে গেছে, ডানায় চড়ে খুঁজতে যাবো 

অলৌকিকের ঠিকানা 

গরিব মেয়েরা তাকিয়ো না, আমিও খুব গরিব,

 শুধু হৃদয়ে মোহর ভরেছি বলে, ঝকঝক করে উঠি শেষ বিকেলে

একটি গভীর কবর আমিও খুঁড়ছি প্রতিদিন 

ভয় হয় জড়াতে, ভয় হয় ছাড়তে,  ভয় হয় কথা বলতে, 

যদি জড়িয়ে যাই 

যদি নৃশংস যক্ষ এসে দেখে ফেলে সুতীব্র আলিঙ্গন 

আসলে তো হাত নেই, পা নেই, নিঃশ্বাসও নেই 

পাথরের ভাস্কর্য গড়ে দিয়ে মরে গেছে বিখ্যাত ভাস্কর 

তবুও স্পর্শ চাই না, দূরে যেতে যেতে পৃথিবী থেকে বিনা অপবাদে চলে যেতে চাই 

চৈত্র কুয়াশার ভেজা কিংশুকে ঘুমিয়ে আছে পেনডেমিক ! 

একথা বিশ্বাস করি না,

 যাক মানুষ মৃত্যু পেয়ে ধর্ম ভুলেছে কিছুদিন, 

ধার করা আলোতে টিমটিম করে জ্বলছে দেবতার গৃহ 

প্রার্থনা না করে মানুষ অবলীলায় শরীরে ঢোকাচ্ছে সূঁচ

জীবন খুব ভালোবাসে সবাই, আমিও কি?

অন্যমনস্ক বিচরণ ছেড়ে হয়তো আমিও কোথাও যেতে চাই না। খুলে ফেলতে চাই তাবৎ বাহু ডোর,

মহামারীতে আক্রান্ত লোককে গুলি করে মেরে দেওয়া হয়, তবুও মধ্যরাতে আমি লিখি 

শেষরাতে মৃত্যুদণ্ড

মেয়েটিও রাজপথে ছিল গভীর রাতেই

শাট্ ডাউন পৃথিবী ! আপাতত...



রাত : ১:৪০, বৃহস্পতিবার, ১৯/০৩/২০২০ 











পেনডেমিকের দিন লিপি





এক



তোমরা যে বলো হরিণ হেঁটে চলেছে রাজপথে নিশ্চিন্তে

এই কদিনেই ফুটপাতে ফুটে গেছে

বসন্ত মরীচিকার প্রতিধ্বনি

অল্প হাওয়ায় দুলছে ফুলের মুখ 

এদিকে আমরা ঘরে ঘরে মুছে দিচ্ছি

 জানলা দরজা আসবাব অ্যালকোহলে

অথচ নেশা হচ্ছে না, 

পাশ ফিরে কুড়িয়ে নিচ্ছি শুধু  ছিঁটেফোঁটা অন্ধকার ঘুম











দুই



ভেন্টিলেশনে যাওয়ার পর

মৃত্যুর খুব কাছাকাছি আসার সময়

হঠাৎ বিদ্যুত চমকে ফিরে আসবে সকল বিশুদ্ধ বাতাস 

রোবট হাত আস্তে আস্তে খুলে নেবে শ্বাসযন্ত্রের সাপোর্ট

মহামারীর একটি সংখ্যা হবার দু সেকেন্ড আগে আমি দেখেছি একটি মুখ, কৃশকায়,

মৃত উল্কার যাবতীয় ধবংস চিহ্ন ছিল তাতে,

তখনো বিশ্বাস করে গেছি, এ আমার ভুল ছিল, অকৃত্রিম যার নিশানা







তিন



করোনা ভাইরাস ছেড়ে গেছে পৃথিবী

তুমিও একা থাকতে থাকতে বোবা হয়ে গেছো

আইসোলেশনের পর এসে দেখি

বরফের ফুলে হাত কেটেছে তোমার

সাদা রক্তের দিকে অচেনা চোখ আমাদের









চার



আমাদের কথা হয়েছিল মহামারীতে

আমাদের সাক্ষীর ভার নিয়েছে এই পেনডেমিক

আমরা কথা বলার ভার পাখিদের দিয়ে নির্ভার থেকেছি

আমরা নিস্তব্ধ হওয়ার অনুভব মহামারী থেকে নিয়েছি

আমাদের শরীর স্পর্শ করে গেছে সমুদ্রের জলো হাওয়া

আমাদের প্রিয় আগুন হওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে নিষ্ঠুর খবর

আমাদের ব্যথার ইতিহাস খেলো হয়ে গেছে বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক মন্দার কাছে

আমরা ক্রমাগত তুচ্ছ হয়ে গেছি মহামারীর কাছে ...









পাঁচ



এমনো তো হতে পারে নিরপরাধ পেঙ্গোলিন

পৃথিবী থেকে কুড়িয়ে নিতে এসেছে ছেঁড়া আঁশ

এমনো তো হতে পারে বাদুরের দল হতে চেয়েছে মানুষের দস্তানা

এমনো তো হতে পারে সামুদ্রিক বাজার শোধ নেবে বলে পাঠিয়েছে হলদে ঢেউ

এমন যেন না হয়, আমরা সব ভুলে গিয়ে নিষ্ঠুর দাঁতে কেটে নিই পশুর হৃদয়যন্ত্র

কত মৃত্যু এলে অবশেষে একটু শান্ত হবে জান্তব কান্না

 উৎসব পালনে উদাত্ত হবো না কখনো হয়তো

এই যেমন চুপ করে আছো, 

উত্তর কেমন করে দিতে হয়, অনর্গল অস্থিরতায় ভুলেছি সব









ছয়



ভালোবাসি বলে আকাশ থেকে চাঁদ তারা এনে দিতে বলি না

তার   চাইতেই খুব   কঠিন   যে সংগোপন সেটাই ঢেলে দিই

 ভালোবাসি বলে গল্প হতে পারে চুরান্ত হিসেবের কিছু

কিন্তু তুমি ভাবছো কখন আসবে সেইসব গোধূলির রণাঙ্গন

আমি কিন্তু প্রিয় যুদ্ধ এগিয়ে দিতে দিতে হৃদয়ে মুখ রাখি

রুদ্ধশ্বাস নিউজ চ্যানেলের কাউন্ট ডাউনের মতো 

আমি শুধু হিসাব রাখি আরোগ্যের, 

অথচ দূর করে দিতে পারি ব্যথা এ অহংকার আমার নেই  









সাত



আমার সকল কাজই অসমাপ্ত 

সকল বিরোধই নিজেকে ফিরিয়ে দিচ্ছি

কয়েক ঢেউ ঘেন্না, সফেন ভালোবাসার আবাদ সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে বনান্ত

দুর্ভিক্ষের দুঃস্বপ্ন নিয়েও কি উষ্ণতায় ভরিয়ে দেবো সাদা স্ক্রিণ

খুব স্বার্থপর হয়ে চেটে নেবো মধ্যবয়স 

সকাতর বাতাস গিলে নেবো, অস্থি মজ্জায় হোক তার প্রদীপের গেহ

কত ঝড় আগলে রেখে দেবো এই প্রিয় উষ্ণীষ, শুধু দেখে নিও





আট



মেয়েটিকে দিয়েছো N 95 মাস্ক, কিছু শ্রান্ত কথাবার্তা, 

সে তাই নিয়ে লকডাউনের রাজপথে একটুখানি উড়তে গেলো নিষেধ না মেনে,

হয়তো তার শ্বাসযন্ত্রে সন্দেহ ছিল না, ফুসফুসটিও খুব টগবগে

এদিকে কিছুই ভালো লাগছে না তোমার

সপ্রতিভ মান্দার ফুল নিয়ে বসে আছো

 তাকে দেখছো দূর থেকে, নিঃশব্দের বাগানে বসে 



স্পর্শ খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর নয়

শুধু চোখে চোখে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পৃথিবী ডুবে থাকুক অনন্ত বিরহে























পরিযায়ী,  ২০২০





লোক গুলো হেঁটে যাচ্ছিল

তাদের বাড়ি ঘরে সন্ধ্যা নামছিল

তাদের দুটুকরো জমিতে নষ্ট ফসল

তাদের হাতে পোঁটলা পুঁটলি রুটি

কাঁধে বাচ্চাকাচ্চা আর শরীর জুড়ে ক্লান্তি



মন্দির মসজিদ গুরুদুয়ারা পেরিয়ে

যাচ্ছিল তারা রেললাইনের ধার ধরে

চারপাশে মাঠ আর পথ আর রোদ    

চারপাশে অন্ধকার আর ময়লা চাঁদ 

তারা যাচ্ছিল, শুধু যাচ্ছিল দিনরাত

নাগরিক শহরে তারা পথ হারায়নি, 

তাদের কালো কালো মাথা 

পথে পথে রেখে গেছে রক্তের দাগ

পথে পথে রেখে গেছে ক্ষুধার ছোঁয়াচ

পথে পথে ছড়িয়ে গেছে  সংক্রমিত ভোটচিহ্ন



কিছুদিন পর কিছু হাড়গোড় কুয়োতে

কিছু ক্লান্তিতে ঢলে গেছে বন্ধুর কোলে

পায়ের নখ ও চামড়া খুলে গেছে

ফটো উঠেছে মুখবই এ, দেখেছে কি তারা

কত লাইন লেখা হয়েছে, উড়ে গেছে ঝড়ে

বেঘোরে মরেছে আমার সকল আবেগ 



কার দোষ বলো, অদৃশ্য  ভাইরাস?

 সরকার না মালিকপক্ষ?



শুধু হেঁটে হেঁটে গেছে যারা

সারা ভারতে তারা নতুন জাতি

নাম তার পরিযায়ী

মহারাষ্ট্রের নোনা হাওয়া থেকে

রাজস্থানের মরুবালি, গঙ্গার পলি

মেখে মেখে তারা প্রমাণ করে গেছে

এই ভারতের তারা কেউ নয়, কেউ নয়

আমাদের ভাত, আসবাব, তেল, নুন

সব কিছুতে আজ রক্ত লেগে আছে

আমরা সাবানজলে ধুয়ে যাচ্ছি আমাদের পাপ, 

আমাদের সংসদে চিরস্থায়ী হলো পরিযায়ীর লাশ। 











কালো দলিল 



আমাদের পাড়ায় দুটো পরিবার ফিরে এসেছে

পরিযায়ী শ্রমিকের ট্রেনে, সেদিন সন্ধ্যায় 

লক ডাউন তেমন নেই  আর, মাস্কে ঢেকে গেছে শহর

চৌদ্দ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকার পর, শুনে এলাম  তারা আর যাবে না,

সুগন্ধির কারখানায় ছিল, বন্ধ হয়ে গেছে। 

কি কাজ তুলে দেবে তার হাতে সরকার?

পারফিউম যে বানাতো,  নরম গ্লাভসের নীচে সরু হয়ে গেছে আঙুল,

রাতের জানালা দিয়ে, ওদের ঘরে উঁকি দিই

ভৌতিক শহর থেকে দেশি ফুলের গন্ধ আততায়ীর মতো তাদের ঘরে ঢুকে যায়,

 খিদের মুখে টের পাই প্রকৃতির অসহায়তা,

আমার ফেলে দেওয়া খাবারের তীক্ষ্ণ চোখ...অভিশাপ।











আদমসুমারী





উঠোন থেকে ক্রমাগত উঠে যাচ্ছে মিঠে রোদ    

বেকার সমস্যা আর গরিবি,  কেড়ে নিয়েছে ভালোবাসা

এখন  ঝগড়া হয়,  বাঁকানো পিঠ, হাঁটুতে জড়তা

মহামারী রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে 

তাকিয়েছিল তাদের দিকে...    

জ্বলজ্বলে খিদে পাওয়া চোখ দেখে 

দুটো বৃদ্ধ প্রাণ তুলে নিয়ে কিছু ভার লাঘব করে গেছে। 

তবুও  আসেনি সন্তোষ , 

আজকাল অস্থির সঙ্গম শুধু জারি... ভুলে থাকা সবকিছু

শরীরের নীচে দম আটকে মরছে প্রেম , 

দেশ চলছে, সংখ্যা বাড়ছে , প্রিয় সরকার  মহাশয়। 











নিঃস্ব





চাষবাস শিখলাম না কিছু

পড়াশোনা, গ্রন্থ পাঠ, গান শোনা 

মাটি কাঁদলে কান পেতে শুনি

আমার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ

কখনো ভাবি চারা কিনে আনব বৃক্ষের

কিছু ছায়া রচিত হোক আমার নামে

হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে না, 

এদিকে শরীর ভেঙে আসে, 

জায়গা খুঁজে পাই না

একান্ত একটি বৃক্ষের নীরবতার কাছে বসে থাকা

 কোনদিন হবে না 

কবিতায় আসা বিহঙ্গনাম ক্ষমা দিও, 

দিও তোমাদের ক্ষমা আমাকে 









স্থালন



এসো কিছু আঁচড়, কামড় হোক,

 গনগনে উল্লাসে তেঁতে ওঠা পৃথিবীর নীচে

আমাদের হাতে ফোস্কা উঠুক

আদিগন্ত পাপ বিছিয়ে রেখে প্রতিদিন সন্ধ্যা হয়

ফুটেছে কামিনী ফুল, দৃঢ় বোঁটা, সাহসী ধূর্জটি

অন্ধকার রাত্রির গায়ে তারা লিখে দেয় বীজমন্ত্র, 

ধানের বক্ষে আনে দুধ

একটু একটু করে পাপ কমে, ধুয়ে যায় ধরিত্রীর মুখ









ব্যর্থতা



আমি খুব সাধারণ একজন মানুয

ভয়ে ভয়ে থাকি, আমাকে কেন বলো লিখতে 

যত সব গণতান্ত্রিক কথা

এসব লিখতে আমি আসিনি, মেরুদণ্ড জন্ম থেকে ঝোঁকা

 আসলে কবি নই, দুর্বল মেয়ে, রাজনীতি বুঝি

যা কিছু আঁধার লিখেছি, তাতে ফুটে ওঠে কিছু কিছু দেশ 

বড় একা সে, মনখারাপের এইসব দিনে

তাকে ঢেকে রেখেছি আমার নরম গোলাপি চাদরে

এটুকুই পারি আমি

মিছিলে যাইনি কোনদিন, বন্যাত্রাণেও না

 লেখার পাত্র থেকে উড়ে যাচ্ছে শুধু ব্যথার আকুতি। 















আমাদের  কথা 

......................



দুবছর কেটে গেছে, 

অজস্র মৃত্যুর ওপর সৌধ হয়েছে এখন, 



নতুন রেজিস্টার। তাতে মৃতদেহের নাম লেখা হয়েছে বেলীফুলের কলমে। 



আমরা দুজন বেঁচে আছি, অপেক্ষারত নক্ষত্রের মতো 

 সকল বিষাদ ভাগ করে নিয়েছি অস্থির দিনগুলোতে



এখন ভয় কমে এসেছে, জ্বর গায়ে লিখছি আবার গোলাপের কাঁটা

ধ্বংসকে বুকে নিয়ে যে পৃথিবী জেগেছে, তার চোখে অশ্রু, 

গড়িয়ে পড়ছে পাহাড়চুড়ো বেয়ে অভ্যস্ত আবেগের মতো। 

কোনদিন দেখা হবে এই বিশ্বাস ছিল আমাদের ভালোবাসার  নির্নায়ক

টিভির খবর শোনা বন্ধ করেছি, পত্রিকা পড়িনি বহুদিন 

পুরনো সিনেমা দেখে ভেবেছি, বেঁচে থাকার নাম অবগাহন

অস্থিরতা, ব্যস্ততা, দুঃশ্চিন্তা আমাদের ঘিরে ছিল

 অকেজো সৃষ্টির কাছে  সঁপেছি এই শ্রমণযাত্রা    

ঝুলনের দিনে  বৃষ্টির উন্মুক্ত ধারার কাছে থই থই করে উঠেছে হৃদয়

 আকুতির পাশে  জেগেছিল মধ্যযাম, মধুমাখা  চরাচর

বাঁচতে ভয় করে, যদি ছেড়ে চলে যায় প্রিয়তম হাত 

তবুও বাঁচতে হয়, যতদিন না আয়ুরেখা বদলে দেয় দিক

কেমন করে ডাকো আমাকে ঘুঘুডাকা উঠোনের মতো

নির্জনপায়ে যেন পরিক্রমায় নেমেছে কৈশোরের আবেগ

যেখান থেকে রাতের আগুন ফিরে যায়

সেখান থেকেই জন্ম নেয় দ্বৈত সুর, চলাচল, স্পর্ধা



যারা বলছি পৃথিবীর পরাজয় হয়েছে, উপোস দিচ্ছে পরিচিত মানুষ

আমার অনিশ্চয়তা তাদের কাছে দিয়ে আসে চাকার দাগ

কৃষিক্ষেত্র জলে পূর্ণ হয়েছে নিঃশঙ্ক নীল বর্ষাজলে, নবান্নের স্বপ্ন দূরে 



মরক লেগেছে বলে বিচ্ছিন্ন করেছে মানুষ নিজেকে,

 তবুও সেতার বাজালাম কেউ কেউ এই নগ্ন অন্ধকারে



ভূমি হতে ডাক এলে, উপেক্ষা যেন থাকে তোমার চোখে

 ভালোবাসার উন্মত্ত পরিভ্রমন শেষ হয়ে গেছে, 

এই সুখব্যথা থাক, মায়াবী মেয়ের মতো আমার নরম দেহ

আস্তে আস্তে গলছে, একটি দাবদাহ এসেছিল,

কলরব শেষে ফিরে যাচ্ছে আত্মরশ্মি নিয়ে। 















শস্যের কাছে জমা করি অন্ধকার

...............



আমাদের চোখ ঢাকা পড়ে গেছে ধুলো ঝড়ে

তবু রাতে ঘুমোবার আগে আমরা ভাবি 

এ  ঝড় নয়, আবির ও রং মশালের পদাতিক

ভাতের থালায় অন্ধকারতম যুদ্ধের অশনিসংকেত

অস্ত্র জমাচ্ছি, অদৃশ্য শত্রু গিরিখাতে নয়, নিউজ চ্যানেলে

পতাকায় শস্য, আনাজ আর ট্রাক্টরের ছবি    

দুর্নিবার এই সামগ্রিক অন্ধত্বের আড়ালে

ছোট হয়ে যাক প্রজনন ক্ষমতা ও তোমার অন্যান্য চাহিদাগুলো

তুচ্ছ হতে হতে নর্দমা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে  তরল, নেশাগ্রস্থ শরীর। ভয় পাই। ভয় পাও! 

কোনদিন গনতন্ত্র কামড়ে খেয়ে বুঝতে হবে কতটা অখাদ্য ! 

তবুও সব ছেড়ে ভালোবাসার ন্যাকামো লিখি । 

মধ্যরাত থেকে মৌনতা নিয়ে যে নদী বয়ে চলে, 

তার কিনারায় ঘাসের বিছানায় শুয়ে থাকে ছেড়ে আসা জ্যোৎস্নার তাপ ও সঙ্গম সামগ্রী ।









জননী



সেদিন দেখছিলাম কৃষকের বউকে

ঘেমে নেয়ে কাতর, তুলে আনছে শেষ শীতের সব্জি

আমি একটু দাঁড়ালাম, ভাবলাম ছবি তুলি কর্মঠ পায়ের, 

হেঁটে এলো কাছে, হাতের পাতা খুলল, তাতে রাসায়নিক! 

তেঁতে উঠছে নীল রঙ, বিষাক্ত ঘা।

আবার পেছন ফিরল, দেখি পিঠেও সটান কালশিটে

ফাঁকে উঠে গেছে ছবি, কিন্তু অস্পষ্ট 

বউটি যেন কেমনধারা এলেবেলে, 

ছবি উঠতে উঠতে দেখি তার শরীর  হয়ে গেছে... অনেকটা ঠিক ভারতবর্ষের মানচিত্রের মতো। 













লেখক পরিচিতি





.... চিরশ্রী দেবনাথের, জন্ম 1979 এর 12 ফেব্রুয়ারি উত্তরপূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার।  দুজনেই প্রয়াত।  তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করেন। বর্তমানে শিক্ষকতা করেন। 

ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি।  বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন। পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প

প্রথম পুরস্কার, স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার, ত্রিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ  প্রতিযোগিতায় প্রথম  পুরস্কার।  

২০১৯ এ, সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মান পেয়েছেন। তার লেখা, ছোটগল্প, "ব্যারনফিল্ড " অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সর্ট ফিল্ম। তৈরি করেছেন কলকাতার  রত্নদীপ রায়। যা নাইজেরিয়ার  ইন শর্ট চলচিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।

এছাড়া  "কীর্ণকাল "নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন চারবছর ধরে। তিনি বিশ্বাস করেন কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না। 





এখন পর্যন্ত প্রকাশিত  বইগুলোর নাম, 





কাব্যগ্রন্থ .........

 "জলবিকেলে মেঘের ছায়া "( ২০১৬), 

"ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় "(২০১৬),

 "প্রেমে সন্ত্রাসে "(২০১৭), 

 "শুভ দ্বিপ্রহর " (২০১৮), 

"ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স "(২০১৮)  , 

 "উড়িয়ে দিও "(২০১৯),  

"বিশ্বাসের কাছে  নতজানু "( ২০১৯  ),

 কুুুুড়িটি ছোটগল্প নিয়ে একটি গল্প সংকলন,  "মায়ারাণী "(২০১৯), 

একান্নটি অণুগল্প নিয়ে, অণুগল্প সংকলন ( ২০২০), 

"সোমবার সন্ধ্যায় " সংলাপ কবিতা  ( ২০২১)

 "যে জীবন কবিতাগামী "( যৌথ গ্রন্থ, ২০২১ )

উপন্যাস, 'সূর্যছক ' ( ২০২১)













ঠিকানা







ইমেল : chirasree.debnath @ gmail.com





মুঠোভাষ : 9402143011

ই মেইল : chirasree.debbath@gmail.com





























চিরশ্রী দেবনাথ



গুচ্ছ কবিতা 







উৎসর্গ





শুভেন্দু দাশগুপ্ত ,কবি নকুল রায়, 

কবি মিলনকান্তি দত্ত,  রবীন্দ্রনাথ ঘোষ,  কানুলাল দাশ, নন্দিতা দত্ত,  দেবাশিষ নাথ, মধুমিতা নাথ,  অর্পিতা আচার্য, দেবাশ্রিতা চৌধুরী 





ফ্ল্যাপে এই কবিতাটি থাকবে

.........



কথা হবে বলে মাঠের কাছে আকাশ

কথা হবে বলে মেঘের আড়াল 

কথা হবে বলে পরাজিত হয়ে  হাঁটছি অনেক দূর

কথা হবে বলে দুহাতে ধুলো আর নক্ষত্র

কথা হবে বলে পৃথিবী চুপ করে আছে

কথা হবে বলে সমস্ত বিভাজন মাথা পেতে নেই

কথা হবে বলে আমার ক্ষীণ অপেক্ষা ঘুমিয়ে পড়ছে 



যেখান থেকে শুরু হওয়া উচিত শুধু  তার মুখে রাঙামাটি

অজানা শস্যে ভরে গিয়ে বইছে সেখানে জনমুখর গ্রাম 

তাহলে থাক, গ্রামটি ঘুমোক, আমরাও আসি

যাচ্ছি তবে ...ভুবন হরকরা 

আমরা খুঁজেছি শুধু ফাঁকি আর ফাঁকি 

ঘরহীন সন্ধি আর  বসে থাকা পাশাপাশি। 















শ্রাবণের ধারার মতন 







এক



কষ্টের কাছ থেকে দূরে যেতে চেয়ে

বার বার কষ্টের কাছেই ফিরে আসি

অনিন্দ্যসুন্দর , এতো রঙ, রাগাশ্রয়ী, ধীর সে

বটবৃক্ষের ছায়াতলে আমি কষ্টের চিবুকে হাত রাখি

তাকে একা একা দেখি, একা স্নান করে প্রতিবার আলো মেখে উঠি 









দুই



মাটির পায়ে হাত রেখে আবারো ভেসে যাচ্ছে শ্রাবণধারা

প্রণাম করে এসেছি আমি, পুনরায় গাছ হয়ে জন্মেছে নয়ন

কেউ যদি দূর থেকে দেখো তারে, হলুদ পাতার মতো অযত্নের দাগ

যে জন্ম মাটি থেকে তুলে আনে জীবনের রঙিন

নিভৃতে তপোবনে আবছায়া দিয়ে ঘিরে  রাখে বারুদের জঞ্জাল

তার কাছে  চেয়েছো তুমি আজন্মের আশ্বাস

 ভয়ে মরে যেতে যেতে আগুন খেয়ে উঠে গেছে সে

 রেশমের কাপড়ে নোনাজলে ফুটে উঠে ক্রমাগত অক্ষরের দাগ







তিন



বর্ষার সঙ্গে প্রতিবার ভেসে আসে পৃথিবীর দুঃখ

কী হবে অমরত্বের কথা ভেবে ভেবে ব্যথিত  হয়ে

তার চাইতে কুড়িয়ে নিই অপমান, ভালোবাসা, প্রেম

এ জন্মকে ক্ষতবিক্ষত করে শরীরে এঁকে রাখুক মিথুন চিহ্ন

সে মানুষ এভাবেই গিলে খাক নিজেকে

একা একা লিখে রাখুক বারিধারার শহরে এই পবিত্র আচমন

জীবন দেখে, শুষে, পায়ে পিষে, হাওয়ায় উড়িয়েছে কেউ

এবার তাতে পচন হোক, মরতে চলেছে অঙ্গুরীয় 



প্রাণবায়ুর কাছে হাঁটু মুড়ে বসে আছে

সেই বাজে অসহায় মানুষগুলো ...তুমি দেখো না তাদের 









চার



যে বরিষণ আনে ক্ষুধা, ভাঙা ঘর, ভূমিধস, নেভানো চুল্লি

তাকে ঘিরে কেন আমরা লিখে রাখি বিরহের গান

এ বিরহে শরীর নেই, আশ্লেষ থেকে উঠে গিয়ে বসেছে 

কৃষকের ঘরে, 

আলিঙ্গনের পাশে অবহেলায় পড়ে আছে যাবতীয় ছোবল

অনন্ত প্রসবিনী সে, নারী হয়ে ঢুকে যাচ্ছে  মাটির ভেতরে 

এখন তার ভরে ওঠার সময়, ফুরিয়েছে অম্বাবুচির ক্ষরিত লাল

 এই সাময়িক উত্তেজনায় বর্ষা কাতর হয়নি কখনো, 

আগে ভেঙে দেয়, তারপর নিয়ে আসে শোভা,

আমাদের দেহে প্রদীপের মতো জ্বেলে দেয় অপেক্ষা 









পাঁচ

বর্ষার রাতে আঠারমুড়া থেকে খুলে গেলো যেন পাতার বসন

নগ্ন হতে হতে তার দেহে জেগে ওঠে অবাধ্য তৃণ, যোনির মতন

সেগুনের মসৃণ ডালে শঙ্খচূড়ের ফনায় তখন চাঁদের মধুদাগ

উদ্দাম ঝর্ণা উন্মুখ, গিলে নিচ্ছে ল্যাটেরাইট মিশ্রিত জল

এমন রাত্রি ভেসে যাচ্ছে, এখনো উদ্ধত কেন পাহাড়ী অভিমান

 বুনো আলু পোড়াচ্ছে কেউ, ভেঙে গেছে মৌচাক, রসের জ্বলন































হে অরণ্য



এক



যত আমরা কেটে ফেলছি মৌসুমী অরণ্য

তত কমে আসছে কবিতা

ফাঁকা অম্লদানে হাত রাখলেই

গলে যাচ্ছে নখ, হার, মাংস, মজ্জা 



খুব করে পড়ে নিচ্ছি হরপ্পা কিংবা মায়া সভ্যতার 

পতনের কারণ

আমাদের ডম্বুরেও তলিয়ে গেছে বনভূমি

তাই ঘর ভর্তি আলোতে জলবিদ্যুৎ গুমরে ওঠে

তাতে বনমোরগ, শুকোর, পাহাড়ি হরিণের মৃতছায়া 

পর্ণমোচি বৃক্ষভূমির বর্ষাকালীন গোঙানি



এইসব কিছু মিশিয়ে আমি অক্ষরের ককটেল

সম্পাদকের দপ্তরে জমা দিই









দুই



কোন এক গ্রামে হঠাৎই ছুটে আসছে মেট্রোশহরের মানুষ

থমথমে কালো জলের দিঘি ভয়ে কাঁপছে

বুকের মাঝে যেন সমুদ্র, হয়ে উঠতে চাইছে ভয়ঙ্কর সুনামি    

গ্রামের মানুষ শহরে, শহরের মানুষ গ্রামে

জলহীন জলহীন জলহীন জলহীন ...







তিন



ব্যক্তিগত কথা গুলো আপাতত বনভূমি হয়ে উঠতে চাইছে

প্রেম অথবা সংলাপ গাছের মতোন 

গোড়ায় জল দিতে চাইছি এখন

অথচ মৃত ডালপালা তো কবেই দেখেছি

জলবাউল এক নতুন ফেরিওয়ালা

ব্যাগে করে গাছের শিকড় আনে, জরিবুটি

পল্লীবধূদের বলে গর্ভে নয়,  মাটিতে পুঁতে দাও ঔষধি

 স্নান করতে করতে সঙ্গমে মন দিও    

মেঘের মতো খোকা খুকী হবে, 

জন্ম থেকেই চাষীর মত নরম মন







চার



সারা পৃথিবী বহুদিন ধরে বৃক্ষের চিৎকারে ভরে আছে

একটি গাছও কোনোদিন ঠিকভাবে লাগিয়ে যত্ন করিনি

তাই বোধহয় গুমড়ে গুমড়ে এইসব কান্না দিনরাত শুনি

আসলে মাটি নেই আমার

থাকলে চারটে গাছের নিজস্ব একটি বাগান হতো

মেঘ আটকে বৃষ্টি হতো সেখানেেই ... একলা ভেজার মতন





পাঁচ



কোল্ডড্রিঙ্কস্ কেউ নিষিদ্ধ করবে না

এ তথ্য বহুদিন ধরে জানা অনেকেরই

কারণ বুদবুদ ফুঁসে উঠলেই জমে যায় লিপস্টিক, 

রাত নামে সব জায়গায়   ।

এই আশ্লেষের নাম  'তৃতীয় বিশ্ব '

ঠান্ডা রস আর বিষে তার জন্মান্ধের অধিকার। 









ছয়



প্রেমের কবিতা লিখতে গেলেই

কলমে নর্দমা বইয়ে দিই

মিথ্যে কথা বহন করতে করতে জলের রিসাইক্লিং হয়, 

সেখানেই ধুয়ে যাই

দেখি দুর্নিবার গোধূলি, মনে হয় আরো কিছু লেখা হোক

নর্দমা অথবা নদী, দুটোই আমার একান্ত ব্যক্তিগত







সাত 



রাজস্থানে এক মেয়ে ছিল

তার নূপুর বেজে উঠলেই জানান দিত ভূগর্ভস্থ জল

আজ সারা ভারতে সেই মেয়ের খোঁজ পড়েছে

স্মার্ট সিটিতে বহু নীচে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত জমছে 

এখানে এসে থমকে গেছে তার নূপুর

বাজছে না তো, শুধু থেমে আছে পাথরের মতো 

শহরের লোক যেতে দিল না তাকে

স্ট্যাচু হয়ে গেছে মরুবালিকা 

বহুদিন পর কখনো নদী আসবে মাটির নীচে

হয়তো সেদিন মৃতনগরীর বুক থেকে শব্দ উঠবে ঝমঝম ঝমঝম, 

পিয়া জয়তু বর্ষারাস হাজার সাল বাদ...













আট



সব বনাঞ্চল ফিরে এসেছে

নদীরা পূর্ণগর্ভা, দুহাতে নিয়ে এসেছে মহেঞ্জোদারো সভ্যতা

বাদামি কালিকট, সম্ভ্রান্ত লোথাল 

যত যুদ্ধ হয়েছিল ভারতপ্রান্তরে, সব মুছে গেছে

মানুষীরা পুষ্ট বেশ, চোখ তাদের উর্বরা 

পৃথিবীকে সবুজ রাখতে আজকাল তারা দত্তক নেয় বৃক্ষ সন্তান

এই স্বপ্নটি অস্থির পদাতিকের মতো আমার দিকে আসে রোজ রোজ

'সে' বলে আমি নাকি অসুস্থ ক্রমাগত

অথচ পরমানু অস্ত্র কিংবা কাশ্মীর সীমান্ত অথবা ধর্ষণ,

সংসদে গুরুত্বহীন মাতৃভাষা,

 কোনটাই আর আমার বিষয় নয়

এমন কি তিনতালাক বা তেত্রিশ পার্সেন্ট সংরক্ষণের ক্ষমতায়ন, 

জলহীন শহরের কাছে সবকিছুই  তো আসলে শবের মিছিল

মাটিতে অংক কষে, বৃষ্টি নামানোর বার্তা দিতে পেরেছে কেউ?

তার কাছে যাবতীয় মেধাসত্ত্ব চুরমার হোক! 



















কাটাকুটি 



এক



যে  কবিতা হয়নি লেখা 

সে আমাকে আসলে ছেড়ে যায়নি

যে পথে বারুদ জ্বলেছে,

 তাতে এখন ছায়া সুনিবিড় গাছ    

মৃতদেহের দাগ সরিয়ে আলোর আলপনা

যে গান গাওনি  তুমি

আমি আজ সেই গান  শুনছি



দুই



ভোরের পাখির ডাক বহুদিন শুনিনি

তখন আমি ঘুমোই    

ঘুম থেকে উঠে দেখি চারপাশে পড়ে আছে

নীড় ছাড়ার আগের ব্যস্ততা

সেসব মাড়িয়ে যেতে যেতে

আমার ভেতরে জেগে ওঠে অরণ্যের হাতছানি





তিন



পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে দেখলাম

আলো নেমে যাচ্ছে খাদের ভেতরে    

উন্মুখ অন্ধকারও তাহলে এতো আকুল 

আমাকে অগ্রাহ্য করেছে খাদের উজ্জ্বল চোখ

আচ্ছন্ন হয়ে আমি দেখছি তোমাদের পবিত্র রূপ 







চার



তাহলে বলো, 

দুজনে মিলেই বসন্ত দেখছি এবারো

যাওয়া আসার পথে কিছু পলাশ আর রুক্ষতা

অনেকটা তুমি যখন রেগে যাও তেমনি

একসঙ্গে দেখা বলতে ঠিক পাশাপাশি নয়

 দূর থেকে দূরে গিয়ে

বৃষ্টিছেঁচা জলের মতো তীক্ষ্ণ সুর

পরস্পরের ব্যথাকে উন্মুখ রাখে শুধু...







পাঁচ



একটি প্রতিবাদী কবিতা আশা করি আপনার কাছে! 

অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছি, 

তখন আমি বিরহের  মুডে, 

 প্রতিবাদ অথবা জনারণ্য, ঝাপসা হয়ে আসে 

যে কিংখাবের বসনে জড়িয়েছি নিজেকে,

বাহুল্য মনে করে তুমি সরে যাচ্ছো ক্রমাগত ...     











জাদুগ্রন্থি 



এক

......

জাদুবাক্স খুলি, রাত তৃতীয় প্রহরে, ভেতরে ডালপালা সমেত চুনীর গাছ, সবুজ শ্যাওলা ঠিকরে বেরোচ্ছে, পূর্নিমা বিরহিত আকাশে শুদ্ধতম নক্ষত্র, যে মানুষ কোন পাপ  করেনি পৃথিবীর সংসারে, জাগছে সে  শিশুদের মতো, তার চোখ কোমল, টয়ট্রেনের মতো আলোর অভিযাত্রা, বনানী পাশে রেখে    নির্বিচারে জাদুবাক্সে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জানালা লাগাও,  কপাট পরাও, রশ্মির ছেঁচরামো বন্ধ করো, আলোর  হাঁড়িকুড়ি জ্বালো, মত্ত ক্ষুধা লেগেছে বয়সকালের।





দুই

.....

প্রতিশ্রুতির  পাশে দুর্বল গোলাপ গাছ থাকে, সমু্দ্রের হৃদয়ের কাছে যেমন ঝিনুকদের অসহায়তা, আমি একদিন বললাম   , তোর কোন ভয় নেই , যেমন খুশি ঝড় খা। আশ্চর্য সেই থেকে গোলাপের বাগান, কাঁটা বিক্রি করে। গভীর সতেজ ইচ্ছের মতো কাঁটা। সেগুলো কিনে ঘর সাজাই, বারান্দায় পেতে রাখি। এমনকি   সবগুলো পথ এইসব কাঁটাদের হাঁটাচলায় মুখর হয়ে আছে,  কোজাগরী এবং বসন্তপঞ্চমী নামে দুজন মেয়ে গোলাপ বাগিচায় আমার জন্য কিছু অচেনা সুগন্ধি খুঁজে আনছে ...এই বিশ্বাসে আমি গোধূলির পাশে বসেও  মন খারাপ করছি  না আজকাল... 













তিন





সময়টি  মাংসকালের। নির্মোহ মাংসাশী গ্রাম ও শহর।  অপরাহ্নের নিমন্ত্রনে ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে রাত, দিন, ধর্ম, ধ্বজা, পতাকা ও যোনি। অন্ধদের থালা বাটি গ্লাস ভরে উঠছে ভরপেট নৈবেদ্যে। যেদিন হেমন্তসময় প্রবাহিত হবে, মাঠের পাশে বসে থাকব আমরা  সার বেঁধে,   ... মাংসের কথা, পেটভরার কথা, শরীরসুখের কথা বলতে এতো অক্ষর লাগাও কেনো হে, 

কসাইের কাছে রক্ত জলের মতো, কৃষকের কাছে কাদা তো  মুঠ মুঠ পরমান্ন, আমাদের এই বোকা এবং অশ্লীল চেয়ে থাকা  পৃথিবীর আঁচে নিজস্ব  দহন জ্বালাবার  জন্য ...













চার 

.....

একই বাতাসের মধ্যে তো আমরা আছি, সুনীলের পংক্তি, আমার  প্রিয়, তারপরও সব সৌন্দর্য, সব সুকুমার বোধ গুলোকে স্বরধ্বনি দিই, কেন যে এই শত শত বছর এগুলো পাপ মনে হয় না , মনে হয় না গুহার পর গুহা ভেঙে দিচ্ছি সস্তা আয়োজনে, নিজস্ব অর্কিডের বনকে তুলো মনে করে বালিশে ঢুকিয়ে সেলাই করে নিচ্ছি, গভীর ঘুমেও নিবিড়তা ছুঁতে পারছি না, জ্যোৎস্নার পাখিরা গা ঢাকা দিয়ে আছে, আমরা খাঁচার জন্য খরকুটো কিনে চলেছি।







নত হয়ে গেছি

.......



আমি কোন প্রতিবাদের কবিতা লিখতে পারি না

 দেখি দুতিনটে দরজা, ক্ষয়িত মানুষ, হলুদ মেয়ে 

তারা সবাই একসঙ্গে মিছিলে যাবে বলে দীর্ঘশ্বাস জমা  করেছিল 

মৌনতার মিছিলে মিশেছে মোমবাতি, সাদা ফুল, কালো পতাকা 

কিছুদূর যেতে যেতে, রাস্তায় পাহাড়ের মৃতদেহ, গাছেদের ছায়া 

 মানুষগুলোর কাঁধ থেকে নেমে গেলো মৃতদেহের চিৎকার,  শপথের দুর্বল শ্লোক

দুতিনটে ঘর আর মুরগীর খাঁচা, নিমগাছ ক্রমাগত, কিছু গৃহমুখী গন্তব্য 

তাদের মাথা নীচু হতে হতে কবে যেন  রাস্তা হয়ে গেছে।















বৃদ্ধাশ্রম 



যেখানে সব ঋতুকাল মরে গেছে, 

সেখানে শুরু অস্মিত দিকবলয়ে বৃদ্ধাশ্রমের গল্প

মিলনের পর ঋজু তমাল আর অশ্বত্থ জন্ম দিয়েছে বামন ছেলে 

আকাশ দেখতে না পেয়ে সন্ততিরা কুড়িয়ে নেয় কেবলি কলহ আর রুদ্ধ দীর্ঘ শ্বাস

কত স্বাভাবিক সারি সারি বাণপ্রস্থ

কি যেন ছিলো গভীর আলমারীতে পুরনো ছবি, হারানো সমূহ দ্বীপ 

বসন্তের পাতা হয়ে জমে আছে পৃথিবীর সব সৈকতে

তাদের চোখে শ্লোক, মন্ত্র, প্রার্থনা গানের অশ্রু 

সখা হে, চাবির গুচ্ছে মোহ, স্নেহের কবিতাটি কেবলি মনে পড়ে। 



 





   







মাটির কান্না 

.............



এক



কৃষকদের আন্দোলন হচ্ছে

রাজধানী বন্ধ, রাজপথে অভিজাত গাড়ি

মাটি আর আগুনের ধক ধক দেখে

দুঃস্বপ্নের ক্ষুধা জ্বলে ওঠে

এতো অপরূপ আঁখি আমার দেশের

অথচ জলে ভরা, একটি দিনও সে না কেঁদে থাকেনি 





দুই

..............

তুমি এলে, কিছু ছটফটানি, ডানার আস্তে সরে যাওয়া

লিখে  রাখলাম অবাধ্য ঠিকানার কষ্ট, লালচে অ্যাসিড

ভেবেছিলাম সেরে উঠব, প্রত্যেকবারের মতো, 

অনেকদিন হলো, ঘুম হারিয়ে ফেলেছি, 

ভোরের তন্দ্রা ছেড়ে আমি জীবন্ত দিন ঘুমের মতো কাটিয়ে দিই। 

জোর করে কবিতা হয় না, তাই সাদা পাতার কাছে চুপচাপ বসি

শিশির খসার শব্দ শুনতে পেলে, বুঝতে পারি নিস্তব্ধতা কতটা প্রখর।









তিন



আমার দেশ ভালো আছে, 

যে বিষাদ ছড়ালে অন্ধকার ঘরে বন্দী প্রজা, 

সে বিষাদ নিশ্চুপে বন্দী করলাম এইমাত্র, 

ভারতসাগর ঢেউয়ের দরজা খুলে দিও ...

ক্ষয় ও বিষাদ ডুববে, আত্মহত্যায় ওদের ভয় নেই  ...

















দু একটি তুচ্ছতা









এক





অন্ধকারে যারা হারিয়ে ফেলে ভালোবাসার মুখ

তারা বার বার চলে যায় একজন থেকে অন্যজনে

প্রতি ঠোঁটেই  তাদের চুম্বনের  ইচ্ছে জাগে

এইসব নিরাসক্তি এখন পুনঃপ্রেরিত, বিষাদহীন









দুই





অনেকদিন পর কবিতার কাছে এসে দেখি...

ধূ ধূ করছে শস্যহীন মাঠ

রুক্ষ  আলপথে পূর্বের জলদাগ    

বহুদূরে একটি গাছ, দুপুর হচ্ছে

কোথাও কোথাও অহংকার জমেছে কাদার মতো

হঠাৎ আমার নকল ধ্যান ঠুকরে দিয়ে 

উড়ে গেলো একটি সঙ্গীহীন পাখি    









তিন





বিখ্যাত  কবিদের  সব  কবিতা  ভালো  হয় না

তাদের বাজে  কবিতাও  ছাপা  হয়

পড়তে পড়তে  পাঠক  বলে  ' অখাদ্য ' 

আমার  খুব কষ্ট  হয়, মনে হয় সেটাই আসল লেখা 

 যেন  রক্তাক্ত আঁচড়,  যে স্পর্শ  চলে গেছে তার রিক্ততা    











চার





আমাদের জন্য কী আছে পৃথিবীতে 

অসমাপ্ত কথোপকথন আর মুছে দেওয়া

আমাদের ব্যস্ততা গুলো ছায়াপথ রেখে যাচ্ছে

কেউ বলে হৃদয় কেটে পথ

আমার মনে হয় রক্তারক্তি যেন আচম্বিতে

ধার করে নিচ্ছি যাদু বাস্তবতা, মানুষ কী আজকাল এভাবেই বাঁচে?







দ্বৈত    





এক



প্রত্যেকটি বন্ধুত্বের নীচে নোনা দাবি থাকে 

আমি সে আবদার রাখতে জানি না    

আস্তে আস্তে আমার স্বপ্নের বন্ধুত্বগুলো দূরে চলে যায়

আমি হেরে যেতে যেতে, দেখি

চারপাশে নেমে আসছে ধূসরতা 

আবারো হাত বাড়াই ক্ষণকাল    

স্পর্শহীন উষ্ণতার অলীক চাওয়া নিয়ে    

পুড়ে যাচ্ছে যেসব কবিতা, তাদের দহন অক্লান্ত থাক। 

সেখানে নিভৃত বালুচর, পদচিহ্ন রয়েছে। 

বই হিসেবে তুমি তাকে না পড়লেই কী ? 

নিভৃতে পড়ব বলে নিজের জন্য  লিখে রেখেছি সব। 











দুই



অনেকদিন পর আমি লিখতে বসেছি

তোমাকে হারিয়ে, তোমাকে নিজের মতো ভাবতে

কিছু পংক্তি জমা করব।

দিকচক্রবাল থেকে গ্রীবা উঁচিয়ে আমাকে দেখছে নম্র রাত

ব্যস এতটুকুই লেখা হলো

তারপর থেকে ভাবছি,

 আমার ফুরিয়ে যাওয়া  দীর্ঘ ক্লান্তিকর লেখার মতো, 

উচ্ছলতার কাছ থেকে আরব্ধ নিয়ে, নিভে যাচ্ছি মৃদু রবে।

দুর্বল শব্দগুচ্ছের প্রতিবাদ গলা টিপতে চাইছে

শ্বাস নেই, সবুজ হলকা বেরোয়, অসংবৃত অবকাশ













তিন    





যখন অস্থিরতার পাশ দিয়ে যাও তুমি, 

আমি টের পাই গোধূলির লাল চোখ থেকে নেমে যাচ্ছে অন্ধকার

বাগানের সহিষ্ণু আগাছায় বাড়ছে বাগিচার অনাঙ্খিত সুখ, 

পৃথিবীর গভীর থেকে আসা কম্পন, 

আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে প্রথমের কাতরতা

এইসব বহন করতে করতে, আমরা কবি হই

আসলে আমি লিখতে জানি না, প্রলাপের কাছে ঋণ জমা  করি শুধু।









অগ্রহায়নে





এক



শেষ অগ্রহায়নে, শঙ্খের হৃদয় থেকে ছড়িয়ে পড়েছে তীক্ষ্ণ সুর

ঘরছাড়া মানুষীদের বলে, মন দাও আগুনে, অঙ্গারের অলঙ্কার

শীতকালীন ফুলের সমারোহ থেকে আমার কাছে এসেছে বিষণ্ণ সুবাস

তুমি কি ভুলে গেছো ভ্রমণের পথ, চেনা পান্থশালার রঙীন কাচ

অভিমান জমা হয়েছে অবহেলার ডাকবাক্সে, জংধরা ধাতব শরীর

বহুদিন পর ঠিকানা মনে এলে, ভুলপথে আরো মন্থর হবে অপেক্ষা, সবই অজুহাত।    

পৌঁছুবার ইচ্ছে ছিল গ্রীষ্মের রাতে, 

 ভ্রমনপথের সীমানায় বাড়তে দিয়েছি কয়েকটি কৃষ্ণচূড়ার গাছ। 











দুই



কৃষকদের নিয়ে গান বাঁধা হোক 

গমের ক্ষেতে উড়তে থাকুক তরুণ কবির কবিতা    

আর্সেনিকের স্তর জানিয়ে গেছে আধিকারিক    

তাতে কোথাও আটকে যায়নি চাষবাষ

হাত পা পচে গেলে, বদলে যায় ভাড়াটে চাষী

আমার দুর্বল দু লাইন ধানের গর্ভে জমা থাক

অস্বস্তি আর অপারগতা ঢাকতে আমি উৎসবকে নিমন্ত্রণ করি

শুয়ে শুয়ে লেখা  দু ছত্র প্রতিবাদী কবিতা আমাকে গালি দিয়েছে, বলেছে নির্লজ্জ, অশ্লীল! 





















স্বনির্বাসনে





এক



ভীষণ ভাবে ছুটে আসা অন্ধকার আঁকবো বলে

বসে আছি, বসে আছি দ্বিপ্রহরে

কোথাও সূর্য উঠেছে, বিশ্রী লাল 

রক্ত উড়ছে,  বাতাসের আলিঙ্গনে , মেঘের পতনে

আমি অহং আঁকছি, চশমায় ধুলো জমছে

মুহূর্তে মুহূর্তে বেড়ে যাচ্ছে দিক নির্নায়ক ক্ষমতা

এতকাল পাখার স্তব করেছি পরীর কাছে

আজ সে রেখে গেছে দুপশলা ডানা,

 সেই থেকে দেবী হয়ে আছি, ভালোবাসা ভুলে গেছি। 







দুই



স্ব ইচ্ছায় একটি নির্জনতম দ্বীপে গিয়েছিলাম

সারা রাত বিচ্ছিন্ন ঘুমে, মৃত স্বপ্নদের দেখে

পরদিন সকালে আমি ছটফট করতে লাগলাম

 কোলাহলের জন্য

ততক্ষণে শেষতম জাহাজটিও চলে গেছে 

যদি একটি চিঠিও আমার ফেলে আসা

 বারান্দায় পরে থাকে, কথা দিয়ে গেছে এনে দেবে, 

ততদিন অপেক্ষা, 

কেবল শোঁ শোঁ, শিকারি পাখি, সূর্যাস্ত,

কী বিকট এই একা থাকা। 







তিন



তুমি ভাবছিলে হারাচ্ছো আমাকে 

এতোদিনে আমি শিখে গেছি ঠিকঠাক নমস্কার ও প্রণাম 

কী করে নড়বড়ে সাঁকোর মতো বাঁচিয়ে রাখতে হয় 

অচেনা আহ্বান 

পদাবলী কীর্তনের মতো অশ্রু অভিনয় অথবা 

 ইচ্ছেমত বিষাদকথা 

টেবিলের ওপর পেপার ওয়েট দিয়ে চাপা থাকে সাদা কাগজ

হাত চালালেই হলুদ অসুখে ভরা অক্ষর নেমে আসবে 

নেড়েচেড়ে ভাবি স্কেচ আঁকবো অনুভবের

জটিল বাঁকানো শরীরের রেখা বলে দেবে ধুলো উড়েছিল 

অবিশ্বাসী চোখ না দেখে বুনে গেছে পোকামাকড়ের বাসভূমি 















নক্ষত্রের রাতেরা 



এক



নক্ষত্র ঘন হয়ে থাকা রাতে পাশের ফ্ল্যাটে ঝগড়া শুনি

ভাঙা ঢেউ, অস্পষ্ট ঝুরো চীৎকার

একটু থেমে থাকা, ঘুমভাঙা  শিশুর কান্না

পরদিন সকালে ভয়ে ভয়ে উঁকি দিই

নুডলস সেদ্ধর মশলা গন্ধ ভেসে আসে

দরজাটি বন্ধ হয়,

 একটি দ্বীপ অথবা শ্যাওলা পড়া  তিমির পিঠ,

 পৃথিবী থেকে দূরে চলে যায়

সন্ধ্যায় সিন্দাবাদ আজ স্বপ্ন নিয়ে ফিরে আসুক,

জোব্বার পকেটে থাক  আদুরে ভীনদেশী গোলাপ 







দুই



সাঁতষট্টি বছর বয়স হলো আমার

তোমাকে চিনেছি এখন

 সেই কবে থেকে যেন আলাদা ছিলাম আমরা

সেদিন জুলাইয়ের শেষ

 অথবা একটি ঋতু এবং খরার  শুরু 

 খুঁজে পেয়েছি উপহারের খোলস 

পশুর সরল ভাষায় ভরা

পাখির কুজনের মতো চেনা এক নদী আকাশে গিয়েছে চলে

যেদিন পুনর্বসু উঠেছিল জ্বলজ্বলে 

এখানে দেখা হবে এমনি কথা হয়তো ছিল মনে

স্তব্ধতা ফেটে গেলো, কী অপরূপ কান্না হলো আমাদের। 









তিন



স্যার, আপনি শুধু সায়ন্তনীর কপি নিতেন

ওর ভুলে ভরা কপিতে

কালো মার্কার দিয়ে শুদ্ধ করে দিতেন সযত্নে

বাকি ক্লাস হুমড়ি খেয়ে পড়তো সায়ন্তনীর ওপর

কোঁকড়ানো চুল আর ঝিলমিল চোখ ওর

সেদিকে তাকিয়েই পড়ান আমাদের 

তারপর একদিন সায়ন্তনী ভুল করে ফেলল

শেষ পরীক্ষার শেষে আনমনে সুইসাইড করলো

যেন এটুকু বাঁচতেই তার ভুল করে বেড়াতে আসা পৃথিবীতে 

কেঁদেছিলো কি ! হয়তো ! 

কান্না গিলে ফেলেছে একটি জৈষ্ঠ্যের বিকেল

পড়ন্ত উল্কাটি স্বাক্ষী ছিল, মাঝপথে ছাই 

 শুনেছি আপনি এখনো যথাক্রমে কপি শুধরান নবাগতাদের। 















  মায়াঘাত





এক



হঠাৎই চোখে পড়ল  বিশাল ফাঁকা মাঠটি। কোথায় লুকিয়েছিল এতো শূন্যতা নিয়ে ধূ ধূ প্রান্তর,  গোধূলির  সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে মাঠে, মাঠ তখন কড়াই, রোদ ছড়িয়ে পড়ে মাঠটাকে অদৃশ্য করে দিচ্ছে, আমাকে  অস্তিত্বহীন, অথচ আলোর  মাঝি  হাল ধরেছে, তাই আমি বিষণ্ণ হচ্ছি  না, মুগ্ধ ভাব নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ভাসছি...ভালোবাসা চলে যাবার পর আস্তে আস্তে আমাদের চোখ অন্ধ করে দিয়ে এভাবেই কি ভেসে ওঠে সকল মায়াবী অন্তর্ঘাত! 









দুই



কোভিড সময়ে সারা পৃথিবীতে আত্মহত্যা বেড়ে গেছে,  শুনলে মনে হয়, আগে যেন মানুষ একা ছিল না, বিষণ্ণ ও উদাস ছিল না, তারা শুধু দল  বেঁধে আনন্দ করতো, মহামারী চলে গেলে মানুষ কি তবে আত্মহত্যা থেকে ফিরে আসবে, বন্ধ ফ্ল্যাট আর একা বাড়ি থেকে চলে যাবে সকল অসুস্থতা,  যতদূর খবর পড়ি শুধু শুনি যশ, অর্থ সবকিছু নিয়ে একা মৃতদেহ পড়ে আছে নির্জন ঘরে, আসলে নির্জনতম হলেই মানুষ মরে যায়, তখন গান হয় না, কবিতা হয় না, নিঃসঙ্গ  তীক্ষ্ণ শিস কেটে কেটে দেয় ধমনী, শিরা ... কাছাকাছি এক  হাতছানি ভয় শুধু ভয়ের...











তিন



বড় কোনো ঘটনার জন্য ছোট ছোট প্রাণীরা প্রাণ দেয়, রাশিয়ায় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের  সময় অজস্র  কুকুরকে মেরে ফেলা হলো, তারাও ছিল রুশ নাগরিক, বরফঢাকা প্রান্তরে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া রাতে গাইত রুশ জাতীয় সঙ্গীত, অথচ জীবন্ত দেহগুলো অসহ্য ঘুমের ঔষধের ডোজ খেয়ে তলিয়ে গেলো নিষ্ঠুর নীলাভ জলে , মার্কিন প্রেসিডেন্টের কন্যা এলো ভারতে, ভিখিরীদের কোথায় যেন হাফিজ করে দেওয়া হলো  কদিনের জন্য, নাহ্  মারেনি, শুধু চোখের সামনে থেকে গরিব সরিয়ে ফেলা, যেমন নদী বাঁধ বানাবার সময় হাজার হাজার একর জমি চলে যায় জলের নীচে, কত গ্রাম আর মানুষের বেঁচে থাকা হারিয়ে যায়, অথচ অতিথি  ভাইরাসটি খুব নিরপেক্ষ, সে এসে গরিব ধনী আলাদা করলো না, নিজের কাঁধেই তুলে নিল বায়োলজিক্যাল ট্র্যাশের দায়িত্ব... বাদুরের হাসি তার ট্রেডমার্ক। 







চার



আজকাল আমরা আবার চলে এসেছি রূপকথার পৃথিবীতে, সেখানে গবাদিপশুর ডানা গজিয়েছে, মরুভূমিতে ভাসছে ময়ূরপঙ্খী নৌকো, রেশনের দোকান থেকে কিনে আনছি শুষ্ক গ্রন্থাবলী, খিদে না  মিটলে আন্তর্জাল থেকে ভাষ্য চুরি করে ঘর সাজাচ্ছি, যারা যারা হিসেব কষে পরবর্তী প্রেমটি করছো, সঙ্গে চালু  রাখছো সন্ধানী দৃষ্টি, আস্তে করে ছেড়ে আসছো পলকা ইশারা, তারা ভুলে গেছে বিশ্বাসের একটি রক্তহীন চোখ আছে, সেই  উজ্জ্বলতার কাছে স্থির হয়ে আছে মানচিত্রের সীমান্তপ্রহরা ...



     





পাঁচ 



ধরো তোমার রাগ হচ্ছে, কান্না পাচ্ছে, সামনে অনেক লোক, ভুলে গেলে, এখন তুমি নিঃসঙ্কোচে কাঁদছো, খটখটে দিন বাইরে, রুক্ষ, প্রেমহীন রিরংসাময়, চারদিক থেকে আস্তে আস্তে আকাশ নেমে আসবে তখন, মেঘের পরে  মেঘ, কালপুরুষের শরীর, সব  লোক অবাক হয়ে দেখছে, একজন মানুষ সারা শরীর ঝরিয়ে কী করে কেঁদে ওঠে, শুধু পৃথিবীটা অবাক হয়নি,  তোমাকে কাঁদার অধিকার দিয়ে প্রসারিত করেছে মাটির উঠোন, সরিয়ে দিচ্ছে দূরবর্তী পাথরের পাহাড় ...

 

















দ্বিতীয় সময়



পৃথিবীর এক গভীর দুঃসময়ে কোথাও কোথাও নতুন দ্বীপের জন্ম হয়, এই খবর কোন নিউজ চ্যানেল  দেখায় না, হয়তো ঝড় থাকে চারপাশে তবু কারা যেন সেখানে একটি মোম জ্বালিয়ে স্বপ্ন দেখে, কখনও নিভবে না আলো, আমিও সেই স্বপ্ন দেখি, একে কি আদর বলে, জড়িয়ে ধরা বলে, ভেসে যাওয়া বলে জানি না তো ! তবুও বিচ্ছিন্ন পংক্তিতে হারিয়ে না যাওয়ার স্বপ্ন শুধু আমাদের জন্য থাক। 









পৌঁছে যেও নিঃসঙ্গ পারিজাত বনে



আগামীকাল নির্ভয়ার দোষীদের ফাঁসি

হয়তো এসব লিখতে লিখতে তারা পৌঁছে যাবে নির্ভয়ার কাছে অবশেষে

রক্তের দাগহীন একটি ধবধবে সাদা শাড়ি পরে নির্ভয়া কাঁদছে 

জ্যোস্নালালিত স্বর্গে, পারিজাত বনে 

যন্ত্রণা কমেনি তার, শুধু রক্তের দাগ মুছে গেছে

প্রতিদিন তাঁর রক্ত ছুটে ছুটে চলে যায় অন্য আরেক একটি যন্ত্রণার কাছে, ফেসবুকে ছবি আপলোড হয়,

গোটা দেশ পোড়া গন্ধ নিতে নিতে রাতের খাবার খেয়ে ফেলে

তার দুদিন পর ব্ল্যাক আউট, একটি নিরপরাধ মহামারী 

ইরানে বিমান থেকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে মানুষের লাশ

নীচে গর্ত, ঝটপট কবর, সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা,

স্বজন কোথায়?  হে মৃতদেহ ! প্রিয়ার হাত? 

ভাইরাসের কাছে চলে গেছে সব অলিখিত গোপন মেসেজ, সতর্কবার্তা, 

শাট ডাউন পৃথিবী ! শাট ডাউন! 

 অনেক হয়েছে, নিস্তব্ধ হও নিজের কাছে

চুপচাপ পাঠাতে থাকো ভালোবাসার কবিতা, শেষবারের মতো

জানো তো ভালোবাসা নিঃস্তব্ধ থাকতে ভালোবাসে, হয়তো নিঃসঙ্গও,

 তাই নিজের কাছে লালন করে বিষাক্তজীবাণু, প্রতিষেধকহীন, 

বাজার থেকে কিনে নিতে পারো 'মোকাবিলা '

ফোন করে বলে দাও সবাইকে ...

"আমাদের বাড়ি এসো না "

আমরা অস্ত্রহীন হয়ে খুঁজে পেয়েছি সাদা কালো লুডোর ছক্কা, কিছু অবসর

এখন আমার পালা, দক্ষ খেলুড়ে নই, পরাজয়ে বিশ্বাস রাখি 

পৃথিবীর বেঁচে থাকা বৃক্ষকে সাক্ষী করে বলছি 

কোনোদিন তেমন কিছু চুরি করিনি, শুধু জমিয়ে রেখেছি নদীর জল, কিছু শায়েরি, রুবাইয়াত আর মেধাবী চাকর। 

অস্ত্র কিনতে কিনতে ভরে ফেলেছি সিন্ধু সভ্যতার বাড়িঘর

চালু থাক ইন্টারনেট, বসন্তের গান, প্রেমের ছড়া আদ্যোপান্ত রহস্যহীন

তুমিও তো ফিসফিস করে বলো হ্যান্ডওয়াশ দরকার খুব, গলা জ্বালা করছে, শ্বাসকষ্ট

অথচ শেষ হচ্ছে না, লতা - রফি মিউজিক নাইট

এখনো মানুষের কাঁদা বাকি, হাত তুলে নাচ করা বাকি 

গেন্দাফুলের মালা নিয়ে চোখ টেরিয়ে টেরিয়ে তাকাচ্ছে  গণপ্রজাতন্ত্রী দেশের চালু যুবক

তাতেই নাকি দ্বিখণ্ডিত তেজী 'কোভিড ১৯ '

এই অবাঞ্ছিত মার্চ মাস শেষ হয়ে গেলে 

সকল স্থগিত উৎসবে আমাকে নেমতন্ন করো 

আমি পৌঁছে যাবো দ্রুত, পকেটে বেকারত্ব, বিপন্ন অর্থনীতি, 

কিছু আকাশি রঙের ছাড়পত্র, তাতে ঈগল আঁকা

ডানা দিয়েছে আমাকে, পারোনি বুঝতে?

নখ, দাঁত দুর্বল হয়ে গেছে, ডানায় চড়ে খুঁজতে যাবো 

অলৌকিকের ঠিকানা 

গরিব মেয়েরা তাকিয়ো না, আমিও খুব গরিব,

 শুধু হৃদয়ে মোহর ভরেছি বলে, ঝকঝক করে উঠি শেষ বিকেলে

একটি গভীর কবর আমিও খুঁড়ছি প্রতিদিন 

ভয় হয় জড়াতে, ভয় হয় ছাড়তে,  ভয় হয় কথা বলতে, 

যদি জড়িয়ে যাই 

যদি নৃশংস যক্ষ এসে দেখে ফেলে সুতীব্র আলিঙ্গন 

আসলে তো হাত নেই, পা নেই, নিঃশ্বাসও নেই 

পাথরের ভাস্কর্য গড়ে দিয়ে মরে গেছে বিখ্যাত ভাস্কর 

তবুও স্পর্শ চাই না, দূরে যেতে যেতে পৃথিবী থেকে বিনা অপবাদে চলে যেতে চাই 

চৈত্র কুয়াশার ভেজা কিংশুকে ঘুমিয়ে আছে পেনডেমিক ! 

একথা বিশ্বাস করি না,

 যাক মানুষ মৃত্যু পেয়ে ধর্ম ভুলেছে কিছুদিন, 

ধার করা আলোতে টিমটিম করে জ্বলছে দেবতার গৃহ 

প্রার্থনা না করে মানুষ অবলীলায় শরীরে ঢোকাচ্ছে সূঁচ

জীবন খুব ভালোবাসে সবাই, আমিও কি?

অন্যমনস্ক বিচরণ ছেড়ে হয়তো আমিও কোথাও যেতে চাই না। খুলে ফেলতে চাই তাবৎ বাহু ডোর,

মহামারীতে আক্রান্ত লোককে গুলি করে মেরে দেওয়া হয়, তবুও মধ্যরাতে আমি লিখি 

শেষরাতে মৃত্যুদণ্ড

মেয়েটিও রাজপথে ছিল গভীর রাতেই

শাট্ ডাউন পৃথিবী ! আপাতত...



রাত : ১:৪০, বৃহস্পতিবার, ১৯/০৩/২০২০ 











পেনডেমিকের দিন লিপি





এক



তোমরা যে বলো হরিণ হেঁটে চলেছে রাজপথে নিশ্চিন্তে

এই কদিনেই ফুটপাতে ফুটে গেছে

বসন্ত মরীচিকার প্রতিধ্বনি

অল্প হাওয়ায় দুলছে ফুলের মুখ 

এদিকে আমরা ঘরে ঘরে মুছে দিচ্ছি

 জানলা দরজা আসবাব অ্যালকোহলে

অথচ নেশা হচ্ছে না, 

পাশ ফিরে কুড়িয়ে নিচ্ছি শুধু  ছিঁটেফোঁটা অন্ধকার ঘুম











দুই



ভেন্টিলেশনে যাওয়ার পর

মৃত্যুর খুব কাছাকাছি আসার সময়

হঠাৎ বিদ্যুত চমকে ফিরে আসবে সকল বিশুদ্ধ বাতাস 

রোবট হাত আস্তে আস্তে খুলে নেবে শ্বাসযন্ত্রের সাপোর্ট

মহামারীর একটি সংখ্যা হবার দু সেকেন্ড আগে আমি দেখেছি একটি মুখ, কৃশকায়,

মৃত উল্কার যাবতীয় ধবংস চিহ্ন ছিল তাতে,

তখনো বিশ্বাস করে গেছি, এ আমার ভুল ছিল, অকৃত্রিম যার নিশানা







তিন



করোনা ভাইরাস ছেড়ে গেছে পৃথিবী

তুমিও একা থাকতে থাকতে বোবা হয়ে গেছো

আইসোলেশনের পর এসে দেখি

বরফের ফুলে হাত কেটেছে তোমার

সাদা রক্তের দিকে অচেনা চোখ আমাদের









চার



আমাদের কথা হয়েছিল মহামারীতে

আমাদের সাক্ষীর ভার নিয়েছে এই পেনডেমিক

আমরা কথা বলার ভার পাখিদের দিয়ে নির্ভার থেকেছি

আমরা নিস্তব্ধ হওয়ার অনুভব মহামারী থেকে নিয়েছি

আমাদের শরীর স্পর্শ করে গেছে সমুদ্রের জলো হাওয়া

আমাদের প্রিয় আগুন হওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে নিষ্ঠুর খবর

আমাদের ব্যথার ইতিহাস খেলো হয়ে গেছে বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক মন্দার কাছে

আমরা ক্রমাগত তুচ্ছ হয়ে গেছি মহামারীর কাছে ...









পাঁচ



এমনো তো হতে পারে নিরপরাধ পেঙ্গোলিন

পৃথিবী থেকে কুড়িয়ে নিতে এসেছে ছেঁড়া আঁশ

এমনো তো হতে পারে বাদুরের দল হতে চেয়েছে মানুষের দস্তানা

এমনো তো হতে পারে সামুদ্রিক বাজার শোধ নেবে বলে পাঠিয়েছে হলদে ঢেউ

এমন যেন না হয়, আমরা সব ভুলে গিয়ে নিষ্ঠুর দাঁতে কেটে নিই পশুর হৃদয়যন্ত্র

কত মৃত্যু এলে অবশেষে একটু শান্ত হবে জান্তব কান্না

 উৎসব পালনে উদাত্ত হবো না কখনো হয়তো

এই যেমন চুপ করে আছো, 

উত্তর কেমন করে দিতে হয়, অনর্গল অস্থিরতায় ভুলেছি সব









ছয়



ভালোবাসি বলে আকাশ থেকে চাঁদ তারা এনে দিতে বলি না

তার   চাইতেই খুব   কঠিন   যে সংগোপন সেটাই ঢেলে দিই

 ভালোবাসি বলে গল্প হতে পারে চুরান্ত হিসেবের কিছু

কিন্তু তুমি ভাবছো কখন আসবে সেইসব গোধূলির রণাঙ্গন

আমি কিন্তু প্রিয় যুদ্ধ এগিয়ে দিতে দিতে হৃদয়ে মুখ রাখি

রুদ্ধশ্বাস নিউজ চ্যানেলের কাউন্ট ডাউনের মতো 

আমি শুধু হিসাব রাখি আরোগ্যের, 

অথচ দূর করে দিতে পারি ব্যথা এ অহংকার আমার নেই  









সাত



আমার সকল কাজই অসমাপ্ত 

সকল বিরোধই নিজেকে ফিরিয়ে দিচ্ছি

কয়েক ঢেউ ঘেন্না, সফেন ভালোবাসার আবাদ সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে বনান্ত

দুর্ভিক্ষের দুঃস্বপ্ন নিয়েও কি উষ্ণতায় ভরিয়ে দেবো সাদা স্ক্রিণ

খুব স্বার্থপর হয়ে চেটে নেবো মধ্যবয়স 

সকাতর বাতাস গিলে নেবো, অস্থি মজ্জায় হোক তার প্রদীপের গেহ

কত ঝড় আগলে রেখে দেবো এই প্রিয় উষ্ণীষ, শুধু দেখে নিও





আট



মেয়েটিকে দিয়েছো N 95 মাস্ক, কিছু শ্রান্ত কথাবার্তা, 

সে তাই নিয়ে লকডাউনের রাজপথে একটুখানি উড়তে গেলো নিষেধ না মেনে,

হয়তো তার শ্বাসযন্ত্রে সন্দেহ ছিল না, ফুসফুসটিও খুব টগবগে

এদিকে কিছুই ভালো লাগছে না তোমার

সপ্রতিভ মান্দার ফুল নিয়ে বসে আছো

 তাকে দেখছো দূর থেকে, নিঃশব্দের বাগানে বসে 



স্পর্শ খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর নয়

শুধু চোখে চোখে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পৃথিবী ডুবে থাকুক অনন্ত বিরহে























পরিযায়ী,  ২০২০





লোক গুলো হেঁটে যাচ্ছিল

তাদের বাড়ি ঘরে সন্ধ্যা নামছিল

তাদের দুটুকরো জমিতে নষ্ট ফসল

তাদের হাতে পোঁটলা পুঁটলি রুটি

কাঁধে বাচ্চাকাচ্চা আর শরীর জুড়ে ক্লান্তি



মন্দির মসজিদ গুরুদুয়ারা পেরিয়ে

যাচ্ছিল তারা রেললাইনের ধার ধরে

চারপাশে মাঠ আর পথ আর রোদ    

চারপাশে অন্ধকার আর ময়লা চাঁদ 

তারা যাচ্ছিল, শুধু যাচ্ছিল দিনরাত

নাগরিক শহরে তারা পথ হারায়নি, 

তাদের কালো কালো মাথা 

পথে পথে রেখে গেছে রক্তের দাগ

পথে পথে রেখে গেছে ক্ষুধার ছোঁয়াচ

পথে পথে ছড়িয়ে গেছে  সংক্রমিত ভোটচিহ্ন



কিছুদিন পর কিছু হাড়গোড় কুয়োতে

কিছু ক্লান্তিতে ঢলে গেছে বন্ধুর কোলে

পায়ের নখ ও চামড়া খুলে গেছে

ফটো উঠেছে মুখবই এ, দেখেছে কি তারা

কত লাইন লেখা হয়েছে, উড়ে গেছে ঝড়ে

বেঘোরে মরেছে আমার সকল আবেগ 



কার দোষ বলো, অদৃশ্য  ভাইরাস?

 সরকার না মালিকপক্ষ?



শুধু হেঁটে হেঁটে গেছে যারা

সারা ভারতে তারা নতুন জাতি

নাম তার পরিযায়ী

মহারাষ্ট্রের নোনা হাওয়া থেকে

রাজস্থানের মরুবালি, গঙ্গার পলি

মেখে মেখে তারা প্রমাণ করে গেছে

এই ভারতের তারা কেউ নয়, কেউ নয়

আমাদের ভাত, আসবাব, তেল, নুন

সব কিছুতে আজ রক্ত লেগে আছে

আমরা সাবানজলে ধুয়ে যাচ্ছি আমাদের পাপ, 

আমাদের সংসদে চিরস্থায়ী হলো পরিযায়ীর লাশ। 











কালো দলিল 



আমাদের পাড়ায় দুটো পরিবার ফিরে এসেছে

পরিযায়ী শ্রমিকের ট্রেনে, সেদিন সন্ধ্যায় 

লক ডাউন তেমন নেই  আর, মাস্কে ঢেকে গেছে শহর

চৌদ্দ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকার পর, শুনে এলাম  তারা আর যাবে না,

সুগন্ধির কারখানায় ছিল, বন্ধ হয়ে গেছে। 

কি কাজ তুলে দেবে তার হাতে সরকার?

পারফিউম যে বানাতো,  নরম গ্লাভসের নীচে সরু হয়ে গেছে আঙুল,

রাতের জানালা দিয়ে, ওদের ঘরে উঁকি দিই

ভৌতিক শহর থেকে দেশি ফুলের গন্ধ আততায়ীর মতো তাদের ঘরে ঢুকে যায়,

 খিদের মুখে টের পাই প্রকৃতির অসহায়তা,

আমার ফেলে দেওয়া খাবারের তীক্ষ্ণ চোখ...অভিশাপ।











আদমসুমারী





উঠোন থেকে ক্রমাগত উঠে যাচ্ছে মিঠে রোদ    

বেকার সমস্যা আর গরিবি,  কেড়ে নিয়েছে ভালোবাসা

এখন  ঝগড়া হয়,  বাঁকানো পিঠ, হাঁটুতে জড়তা

মহামারী রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে 

তাকিয়েছিল তাদের দিকে...    

জ্বলজ্বলে খিদে পাওয়া চোখ দেখে 

দুটো বৃদ্ধ প্রাণ তুলে নিয়ে কিছু ভার লাঘব করে গেছে। 

তবুও  আসেনি সন্তোষ , 

আজকাল অস্থির সঙ্গম শুধু জারি... ভুলে থাকা সবকিছু

শরীরের নীচে দম আটকে মরছে প্রেম , 

দেশ চলছে, সংখ্যা বাড়ছে , প্রিয় সরকার  মহাশয়। 











নিঃস্ব





চাষবাস শিখলাম না কিছু

পড়াশোনা, গ্রন্থ পাঠ, গান শোনা 

মাটি কাঁদলে কান পেতে শুনি

আমার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ

কখনো ভাবি চারা কিনে আনব বৃক্ষের

কিছু ছায়া রচিত হোক আমার নামে

হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে না, 

এদিকে শরীর ভেঙে আসে, 

জায়গা খুঁজে পাই না

একান্ত একটি বৃক্ষের নীরবতার কাছে বসে থাকা

 কোনদিন হবে না 

কবিতায় আসা বিহঙ্গনাম ক্ষমা দিও, 

দিও তোমাদের ক্ষমা আমাকে 









স্থালন



এসো কিছু আঁচড়, কামড় হোক,

 গনগনে উল্লাসে তেঁতে ওঠা পৃথিবীর নীচে

আমাদের হাতে ফোস্কা উঠুক

আদিগন্ত পাপ বিছিয়ে রেখে প্রতিদিন সন্ধ্যা হয়

ফুটেছে কামিনী ফুল, দৃঢ় বোঁটা, সাহসী ধূর্জটি

অন্ধকার রাত্রির গায়ে তারা লিখে দেয় বীজমন্ত্র, 

ধানের বক্ষে আনে দুধ

একটু একটু করে পাপ কমে, ধুয়ে যায় ধরিত্রীর মুখ









ব্যর্থতা



আমি খুব সাধারণ একজন মানুয

ভয়ে ভয়ে থাকি, আমাকে কেন বলো লিখতে 

যত সব গণতান্ত্রিক কথা

এসব লিখতে আমি আসিনি, মেরুদণ্ড জন্ম থেকে ঝোঁকা

 আসলে কবি নই, দুর্বল মেয়ে, রাজনীতি বুঝি

যা কিছু আঁধার লিখেছি, তাতে ফুটে ওঠে কিছু কিছু দেশ 

বড় একা সে, মনখারাপের এইসব দিনে

তাকে ঢেকে রেখেছি আমার নরম গোলাপি চাদরে

এটুকুই পারি আমি

মিছিলে যাইনি কোনদিন, বন্যাত্রাণেও না

 লেখার পাত্র থেকে উড়ে যাচ্ছে শুধু ব্যথার আকুতি। 















আমাদের  কথা 

......................



দুবছর কেটে গেছে, 

অজস্র মৃত্যুর ওপর সৌধ হয়েছে এখন, 



নতুন রেজিস্টার। তাতে মৃতদেহের নাম লেখা হয়েছে বেলীফুলের কলমে। 



আমরা দুজন বেঁচে আছি, অপেক্ষারত নক্ষত্রের মতো 

 সকল বিষাদ ভাগ করে নিয়েছি অস্থির দিনগুলোতে



এখন ভয় কমে এসেছে, জ্বর গায়ে লিখছি আবার গোলাপের কাঁটা

ধ্বংসকে বুকে নিয়ে যে পৃথিবী জেগেছে, তার চোখে অশ্রু, 

গড়িয়ে পড়ছে পাহাড়চুড়ো বেয়ে অভ্যস্ত আবেগের মতো। 

কোনদিন দেখা হবে এই বিশ্বাস ছিল আমাদের ভালোবাসার  নির্নায়ক

টিভির খবর শোনা বন্ধ করেছি, পত্রিকা পড়িনি বহুদিন 

পুরনো সিনেমা দেখে ভেবেছি, বেঁচে থাকার নাম অবগাহন

অস্থিরতা, ব্যস্ততা, দুঃশ্চিন্তা আমাদের ঘিরে ছিল

 অকেজো সৃষ্টির কাছে  সঁপেছি এই শ্রমণযাত্রা    

ঝুলনের দিনে  বৃষ্টির উন্মুক্ত ধারার কাছে থই থই করে উঠেছে হৃদয়

 আকুতির পাশে  জেগেছিল মধ্যযাম, মধুমাখা  চরাচর

বাঁচতে ভয় করে, যদি ছেড়ে চলে যায় প্রিয়তম হাত 

তবুও বাঁচতে হয়, যতদিন না আয়ুরেখা বদলে দেয় দিক

কেমন করে ডাকো আমাকে ঘুঘুডাকা উঠোনের মতো

নির্জনপায়ে যেন পরিক্রমায় নেমেছে কৈশোরের আবেগ

যেখান থেকে রাতের আগুন ফিরে যায়

সেখান থেকেই জন্ম নেয় দ্বৈত সুর, চলাচল, স্পর্ধা



যারা বলছি পৃথিবীর পরাজয় হয়েছে, উপোস দিচ্ছে পরিচিত মানুষ

আমার অনিশ্চয়তা তাদের কাছে দিয়ে আসে চাকার দাগ

কৃষিক্ষেত্র জলে পূর্ণ হয়েছে নিঃশঙ্ক নীল বর্ষাজলে, নবান্নের স্বপ্ন দূরে 



মরক লেগেছে বলে বিচ্ছিন্ন করেছে মানুষ নিজেকে,

 তবুও সেতার বাজালাম কেউ কেউ এই নগ্ন অন্ধকারে



ভূমি হতে ডাক এলে, উপেক্ষা যেন থাকে তোমার চোখে

 ভালোবাসার উন্মত্ত পরিভ্রমন শেষ হয়ে গেছে, 

এই সুখব্যথা থাক, মায়াবী মেয়ের মতো আমার নরম দেহ

আস্তে আস্তে গলছে, একটি দাবদাহ এসেছিল,

কলরব শেষে ফিরে যাচ্ছে আত্মরশ্মি নিয়ে। 















শস্যের কাছে জমা করি অন্ধকার

...............



আমাদের চোখ ঢাকা পড়ে গেছে ধুলো ঝড়ে

তবু রাতে ঘুমোবার আগে আমরা ভাবি 

এ  ঝড় নয়, আবির ও রং মশালের পদাতিক

ভাতের থালায় অন্ধকারতম যুদ্ধের অশনিসংকেত

অস্ত্র জমাচ্ছি, অদৃশ্য শত্রু গিরিখাতে নয়, নিউজ চ্যানেলে

পতাকায় শস্য, আনাজ আর ট্রাক্টরের ছবি    

দুর্নিবার এই সামগ্রিক অন্ধত্বের আড়ালে

ছোট হয়ে যাক প্রজনন ক্ষমতা ও তোমার অন্যান্য চাহিদাগুলো

তুচ্ছ হতে হতে নর্দমা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে  তরল, নেশাগ্রস্থ শরীর। ভয় পাই। ভয় পাও! 

কোনদিন গনতন্ত্র কামড়ে খেয়ে বুঝতে হবে কতটা অখাদ্য ! 

তবুও সব ছেড়ে ভালোবাসার ন্যাকামো লিখি । 

মধ্যরাত থেকে মৌনতা নিয়ে যে নদী বয়ে চলে, 

তার কিনারায় ঘাসের বিছানায় শুয়ে থাকে ছেড়ে আসা জ্যোৎস্নার তাপ ও সঙ্গম সামগ্রী ।









জননী



সেদিন দেখছিলাম কৃষকের বউকে

ঘেমে নেয়ে কাতর, তুলে আনছে শেষ শীতের সব্জি

আমি একটু দাঁড়ালাম, ভাবলাম ছবি তুলি কর্মঠ পায়ের, 

হেঁটে এলো কাছে, হাতের পাতা খুলল, তাতে রাসায়নিক! 

তেঁতে উঠছে নীল রঙ, বিষাক্ত ঘা।

আবার পেছন ফিরল, দেখি পিঠেও সটান কালশিটে

ফাঁকে উঠে গেছে ছবি, কিন্তু অস্পষ্ট 

বউটি যেন কেমনধারা এলেবেলে, 

ছবি উঠতে উঠতে দেখি তার শরীর  হয়ে গেছে... অনেকটা ঠিক ভারতবর্ষের মানচিত্রের মতো। 













লেখক পরিচিতি





.... চিরশ্রী দেবনাথের, জন্ম 1979 এর 12 ফেব্রুয়ারি উত্তরপূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার।  দুজনেই প্রয়াত।  তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করেন। বর্তমানে শিক্ষকতা করেন। 

ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি।  বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন। পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প

প্রথম পুরস্কার, স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার, ত্রিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ  প্রতিযোগিতায় প্রথম  পুরস্কার।  

২০১৯ এ, সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মান পেয়েছেন। তার লেখা, ছোটগল্প, "ব্যারনফিল্ড " অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সর্ট ফিল্ম। তৈরি করেছেন কলকাতার  রত্নদীপ রায়। যা নাইজেরিয়ার  ইন শর্ট চলচিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।

এছাড়া  "কীর্ণকাল "নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন চারবছর ধরে। তিনি বিশ্বাস করেন কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না। 





এখন পর্যন্ত প্রকাশিত  বইগুলোর নাম, 





কাব্যগ্রন্থ .........

 "জলবিকেলে মেঘের ছায়া "( ২০১৬), 

"ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় "(২০১৬),

 "প্রেমে সন্ত্রাসে "(২০১৭), 

 "শুভ দ্বিপ্রহর " (২০১৮), 

"ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স "(২০১৮)  , 

 "উড়িয়ে দিও "(২০১৯),  

"বিশ্বাসের কাছে  নতজানু "( ২০১৯  ),

 কুুুুড়িটি ছোটগল্প নিয়ে একটি গল্প সংকলন,  "মায়ারাণী "(২০১৯), 

একান্নটি অণুগল্প নিয়ে, অণুগল্প সংকলন ( ২০২০), 

"সোমবার সন্ধ্যায় " সংলাপ কবিতা  ( ২০২১)

 "যে জীবন কবিতাগামী "( যৌথ গ্রন্থ, ২০২১ )

উপন্যাস, 'সূর্যছক ' ( ২০২১)

উপন্যাস। মারমেডের শহর থেকে

কিশোর উপন্যাস ...ঝিলমারির কান্ড কারখানা
গল্প সংকলন.. নিকটবর্তী রুপকথা