পাঠ করো নিভৃতে, চিরশ্রী দেবনাথ
কাব্যগ্রন্থ
'পাঠ করো নিভৃতে '
রচনাকাল ...২০১৯--২০২১
চিরশ্রী দেবনাথ
ভূমিকা
এই বইয়ের লেখাগুলো পড়তেই হবে পাঠককে সে দাবি আমার নেই, এগুলো লিখতে আমার ভালো লাগছিল তাই লিখছিলাম, লেখাগুলোর বিষয়বস্তুর মধ্যে পুনরাবৃত্তি রয়েছে, পুনরাবৃত্তি সরাবার প্রচেষ্টাও নেই, যদি কারো ভালো লাগে, পাঠ করবেন নিভৃতে।
নির্জন নিমগাছ এবং ...
একজন অসফল মানুষ বলেই হয়তো,
ব্যর্থ, বিষণ্ণ মানুষগুলোকে আমার খুব ভালো লাগে।
আমার জন্য এবং তাদের জন্য আমি ভেবে রেখেছি,
অলস নদী, নির্জন নিমগাছ, কাঠের বাড়ি, টানা বারান্দা
সেখানে বসে আমরা সফল মানুষদের যাওয়া আসা দেখি।
তাদের সুখ, ব্যস্ততা, ইগো প্রবলেম ইত্যাদি।
আর দেখি আমাদের চেয়েও দ্রুত তারা চলে যাচ্ছে নিঝুম কোটরে...
ঝিনুকের স্তব
কিছু মানুষ আছে,
যারা কোনোদিন কাউকে ভালোবাসার কথা বলতে পারেনি
তারা খুব ভালো মানুষ, গায়ে মেঘের জামা
অথচ সেখান থেকে বৃষ্টি গড়ায়নি ভুল করেও কোন মুহূর্তে
তাদের ভেতরে অসংখ্য স্তব জমে গেছে, পুড়ে গেছে
তারা কিভাবে ভালোবাসতে চেয়েছিল, কখনো জানেনি কেউ...
যত্নে রেখেছি
এই কান্নাটি আমার তোমার কাছেই কাঁদতে হবে
আর কারো কাছে গেলে সে ঝরবে না অঝোরে
তা সম্ভব নয়। চাই না।
এই কান্নাটি দিয়ে কি করবো আমি?
কেনো এলো সে আমার কাছে অযথা, অসময়ে?
কীভাবে যত্ন করি, কোথায় রাখি, যাতে ভেঙেচুরে নষ্ট না হয়ে যায় ...
কবির হাত
অনেক ভিড়ের মধ্যে একখানি শীর্ণ হাত
দীর্ঘ দীর্ঘ আঙুল, সাদা সরু নখ
নীল শিরা শরীর বেয়ে নখের গোড়ায় থেমে গেছে
সেখানে জমকালো সূর্যাস্ত হচ্ছে তখন
তির তির রক্তদানা নিয়ে কাঁপছে পাতলা চামড়া।
চিনেছো ঠিকই তুমি, এ যে কবির হাত।
জাপটে ধরে আছে কিছু প্রতিবাদ ও হারানো ভালোবাসা।
চিনবেই ।
কারণ সেটা তোমারই সেই হারানো হাত,
গিয়েছিলে কোনো একদিন কবিতার কাছে
নষ্ট হয়ে, রিক্ত হয়ে, এসেছো ফিরে অভিমানে
সায়াহ্নে
এটা হলো একটি বেলাভূমি
সমুদ্র শান্ত, কোন ঝড় আসবে না
তেমন কোন আবহাওয়া সংবাদ নেই
আমাদের মাথার রোদের ছাতা উড়ে গেছে
দীর্ঘ ঝাউগাছ ছায়া হয়ে নেমে আসছে
দূরে যে দু চারটি মানুষ দেখা যাচ্ছে`^
তারা আমাদের সম্পর্কে কৌতুহলী নয়
তাই আমরা নিশ্চিন্তে হাত রাখলাম, পায়ের পাতা ছড়িয়ে দিলাম
সমুদ্র চিল এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত বলে,
আমরা আরো একা হয়ে গেলাম
তারপর সূর্যাস্ত দেখলাম, যুগান্তর ঘটে যাচ্ছে
অথচ কত নির্বিকার ভাবে আমরা ভালোবেসে যাচ্ছি ক্রমাগত
খেয়া ঘাট
আমার কবিতায় কেবলি প্রেমিকের কথা
তারা কারা? আমি দেখেছি কখনো ভালো করে?
কেমন তাদের চোখের পলক, নিজস্ব সংবাদ
আরো তো মানুষ আছে আমাদের
দিদি, ছোটোবোন, ভাই কিংবা কোনও অতিথি
কিন্তু কবিতা মানেই যেন শূন্যে ভাসা রেলিং, নীল সমুদ্র,
যেখান থেকে শুধুই অগম্য ভালোবাসাদের কথা বলাবলি
নিঃসৃতময়
আমাদের একটি ঘর থাক দুজনের
চারটে দেয়াল, চারটে মহাসাগর
দিনরাত ঢেউ, নীল বেলাভূমি বিছানায়
কিছু না, টুকটাক কথা দুজনের ব্যক্তিগত দিনশেষে
হতে পারে একশ টাকার হিসেব বা শাহরুখ খানের বুড়ো হয়ে যাওয়া
একটি টি ভি অকারণ, বাজে সিরিয়েল,
বদলে দিয়ে খুব গাল দিলাম, ঘুরে ফিরে চ্যানেল বদলে চলে এলাম সেখানেই
ততক্ষণে চার দেয়ালের সমুদ্রে জোয়ার এসেছে, চাঁদ উঁকি দিচ্ছে প্রবলভাবে
নৌকোটৌকা গুলোকে সামাল দিয়ে তুমি ফিরে এলে
টিভির খবরে
আমার পা তখন তোমার পায়ে জড়িয়ে আছে ঝগড়া করবে বলে
আসলে তখন আমরা মিথ্যে মিথ্যে প্ল্যান করছিলাম কোথাও বেড়াতে যাওয়ার
জঙ্গলমহল, মহুয়া গাছ, গির অরণ্য, কেশরবান সিংহ
তারপরই হাসি,
তুমি বললে এই ভালো
আমি বললাম কি?
তুমি বললে এই তো চারদেয়াল।
আমি বললাম কোথায় সেই চার দেয়াল?
"একটি ব্যক্তিগত দিনের শেষে যেখানে দুজন পাশাপাশি "
চুম্বন
পাহাড়ের গায়ে ঠোঁট রাখলাম
পাহাড় জানিয়ে দিলো ভেতরে আগ্নেয়গিরি
ঝর্ণার শরীরে ঠোঁট রাখলাম
ঝর্ণা জানিয়ে দিলো জল নয় অম্লধারা
মাটিতে ঠোঁট রাখলাম
মাটি জানিয়ে দিলো ভেতরে ভূমিকম্পের ভাঙন
শুকনো ঠোঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছি
দুহাতে সরাচ্ছি ম্লান রাজনৈতিক অধিকার
ঠোঁট রাখলাম পাথরে
ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে যাবতীয় শুষ্কতা
সামুদ্রিক শোঁ শোঁ কোথায় যেন অন্দরমহলে ধীরে,
ফিরে এসেছে মন্থর দান অতিক্রম শেষে,
ফিরে এসেছি আমি ...
ভাঙা রোদ
তুমি আমাকে ছাতা খুঁজে দিতে বলো
অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে থাকি দূরে, রোদে ভেসে যাচ্ছে সব,
রঙীন ছাতায় চড়ে কবে চলে গেছে আমাদের শৈশব
কোথা থেকে খুঁজে এনে দিই হারানো মার্বেল
পৃথিবীময় আরো কত হারিয়ে যাওয়া জিনিস
সেখানে কি করছে যেন তোমার ছাতাটি,
এসব আমাকে বলে কী লাভ?
আমার মুখে স্যাঁতসেঁতে রাস্তা, ছপছপে জল
একটু সামলেসুমলে হেঁটে গেলেই তো পারো !
সুন্দর এসে ফিরে যায়
তোমার অভিমান
আমার অসম্মতি
তোমার অসম্মতি
আমার অভিমান
পৃথিবীর হৃদয়ে এর চাইতে বেশি
বেদনানির্ভর চলাচল আর নেই
আমাদের যৌথ বাহুতে যুদ্ধের ষড়যন্ত্রকে হারিয়ে,
এভাবে কখনো কখনো সাদা ফুলের মতো জেগে ওঠে
কিছু কিছু ক্ষয়িত সন্ধ্যা
অবিন্যস্ত
যা যা বলছ সব মেনে নিচ্ছি
খাটাচ্ছি না জোর, যেন ছিল সুপ্ত ঋণ
এরমধ্যেই ঘটে যায় বিচ্ছেদ
পত্রপুষ্পপূর্ণ বৃক্ষতলে একদম একা কোনদিন
পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি
বড় জোর হাঁটতে পারে দু মাইল
গলা শুকিয়ে গেলে খেয়ে নেয় আপোষ
পেছন ফিরতে ফিরতে বিকেল
তুমুল হেরেছে আজ আকাশ
ঝলমলে হয়ে আছে ব্যস্ত নীল
যে কান্না ঝরে গেছে কোনোখানে
বালিশে বা বালুচরে, শক্তমুখে
তাকে বলি ' দাঁড়াও ',
আমার কাছে গুমরে উঠছে ঝাপসা রুমাল
শুধু ক্লান্তি না এলে অনায়াসে করে দিতে পারি পাটিগণিত
মধুপুরগামী ট্রেনকে বলি থামো, বেমানান গ্রাম্য চিৎকার
সময় শেষ হয়ে এলেও, কেউ তো দেবে পরীক্ষা?
ঢং ঢং বাজবে বাকি থাকা পাঁচ মিনিট
আমি যা লিখছি, মাঝে মাঝে
এঁফোড় ওঁফোড় করে দিচ্ছে দাবার বিব্রত অশ্বচাল
কখনো নিঃশেষ হতে হয়, আক্রোশ জমা দিয়েছি কার কাছে যেন...
সে তো রাজা নয়, রাজপাটহীন নক্ষত্র
স্মৃতিশক্তি নিয়ে সব ঠাট্টা, অসুখ বলে জানি
গোপনে আমি অভিনয় জমা দিয়ে খালি ঠোঁটে
চেয়ে থাকি।
স্পর্শে যেন জাগো
মানুষ যখন কথা থাকে না
তখন জিজ্ঞেস করে বৃষ্টির সংবাদ
আর কথা জমে গেলে তারা ভিজতে থাকে
আমাদের কথা জমে আছে
ঝরটর, শিলাবৃষ্টি, উপচানো জলাশয় হয়তো
এখন আমরা অভিযোগ করবো ইত্যাদি
তারচাইতে আগে চলো আদর করে নিই
তারপর যা হবার হোক
নির্ভার হতে চাই
যারা যারা লেখা দিতে বলেছিল
তারা চলে গেছে, পত্রিকা বেরিয়ে গেছে
আমি দিইনি, এরকম তো কখনো হয়নি আগে
শুধু কথা বলেছি, এক অনন্ত পরিভ্রমণ
ভেবেছি লিখবো কোনদিন এই পূর্ণগ্রাস
স্তিমিত ঝড়কে ক্ষমা করে দিয়ে, খুলেছি সফেদ রঙ
পাত্র ভরে গেছে কাণায় কাণায়, তৃপ্তি অসীম
সেই আনন্দে মনে হয়, " এসো হে মৃত্যু "
ঘরবাড়ি হোক অন্য কারো, সাজাক তারা
প্রতিটি প্রিয় ম়ৃত্যু আমাকে দিয়ে যাচ্ছে রুপোলি আঙরাখা,
ভয়, অস্থিরতা আর বহুগামী রেখাপথ...ক্ষমা করো।
দু বিন্দু দুর্যোগ
কয়েকটি সময় এমনি খালি চলে যায়
জ্বর ছেড়ে গেলে যেমন কবিতা চলে যায়
নিরন্তর অসুখও তো তেমন ভালো কিছু নয়
ভেষজ গাছ আনমনে দিয়েছে বল্কল ও নিরাময়
পরিধেয় বস্ত্র হয়েছে, হৃদয়ের সমৃদ্ধি
আনাচ কানাচ থেকে পড়ে গিয়েছে রক্তবিন্দু দল
এখন ক্লান্ত হয়ে বসে থাকি কিছুদিন তোমার পাশে
সময় দিতে হবে না, এমন কী কথাবার্তাও
আরো দুখানা পর পর বৃষ্টির মাস, এমনই তো হয়
নির্জন দুর্যোগ শেষ হলে আবার মুখরতা কিছুকাল
দ্বিধা
পুতুলের দোকানে এখন ভিড় কম
কয়েকটি বার্বি ডল, মিকিমাউস, টেডি বিয়ার সাজিয়ে
লোকটি অপেক্ষা করছিল কারো জন্মদিনের
ভীষণ রাগ হয়, ভারতীয় পুতুল নেই?
দোকানি সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে এলো ছোটা ভীম
বার তিনেক তুলনা করে, বার্বি ডলই কিনলাম
জন্মদিনের বাচ্চাটির হয়তো ভীম আছে,
তাকে বলা হয় ভীমের শরীরে খুব জোর
বার্বি ডলের শরীরে জোর নেই, সৌন্দর্য আছে
ছেলে বাচ্চাটি দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হোক,
জোর ও সৌন্দর্য, নারী ও জোর, যুদ্ধ ও সৌন্দর্য
যেতে দাও বসন্তে
সমস্ত শহর জুড়ে বইছে বসন্তের শান্ত চলে যাওয়া
মাটির গভীরে যেন জীবন্ত পতঙ্গের একটানা এস্রাজ
এ মধু অনুসঙ্গ সাহায্য করেছে ছিঁড়ে দিতে বন্ধন
পাতায় পাতায় সংঘর্ষের জেরে চালু থাক পতনের শব্দ
কোথা থেকে আলো কুড়িয়ে বলো জ্বেলে রাখি রঙঘর
পুকুরের পার থেকে গল্পগাঁছা নিয়ে চলে গেছে যে নারী
সন্ধ্যার গৃহে তার হৃদয়ে শান্ত মল্লিকাবন, ফুলসৌরভ
বসন্তে প্রত্যাখ্যাত হওয়া প্রস্তাব, অশরীরী সে চিরদিন
যত দূরে যাও, অনন্তে প্রোথিত যে, বৃন্দাবনধাম
সহস্রসুখে তোমাকে ছেড়ে যাবে না সে, অনন্তনাগ
আমিও চিনেছি তাকে,অমৃতের পাত্র ঢেলে গোপন স্নান
বেড়ানো
যেসমস্ত জায়গা গুলো বেড়াবো বলে
ঠিক করেছিলাম,
ঝিলম নদীর ধার বরাবর একটু খানি হাঁটা
তখন কি খুব হাওয়া দেবে, ঠান্ডা!
আমাদের আবার ঠাণ্ডা লাগার দোষ
পাঞ্জাবের হলুদ সর্ষে ক্ষেতে ঝলসে দেবো চোখ
আমাদের আবার খুব রোদ সহ্য হয় না, মাথা ব্যথার দোষ,
তবুও না হয় চা খেতাম, ঝকঝকে স্টীলে চলকে যেতো ঠোঁট
" রাজার বাড়ি " নামে একটি গ্রাম আছে
সব গরিব লোক থাকে সেখানে, নীলচে রঙের গীর্জা
সুরকি দেওয়া রাস্তা গেছে অনেক দূর , সূর্য যেন নিশানা
ছোট্ট বেঞ্চ, সেখানে বসব বলেই আসা
আমাদের আবার হতাশ হওয়ার খুব ঝোঁক
আগে থেকেই শতভাগ অনুমান মিলে যাওয়ার ক্ষোভ
তবুও বুকিং শেষ কবেই,
আমরাই প্রথম নিসর্গ দূত সব সিজনে
কোনদিন কয়লা খাদান দেখবো, এও ভেবেছি কবে
আমাদের আবার ভুলে যাওয়ার দোষ
নরম অন্ধকারে আঁকা আমাদের নির্জন নোটবুক
'ক্লান্তি ' এসো না তুমি
হঠাৎ করে খুব ক্লান্ত লাগছে
মনে হয় একজন আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে আরো ক্লান্ত হয়েছে
তাকে ভালোবেসে এসব বলতে বলতে
আসল রহস্যময় দ্বীপ ছেড়ে এসেছি
সামনে নিতান্তই নদীবারান্দা, নৌকাবাটি
এখানে আমার সকল অহংকার শেষ করেছি, এমনকি গন্তব্যও
যা কিছু আড়ম্বরহীন, তাই দিচ্ছি, স্বঅভিমানে
চৈত্র
তুমি যাকে ভালবাসলে
আর তাকে দিতে চাইলে তোমার ' না পাওয়া
অবাক হয়ে দেখলে তার কাছে আছে শুধু 'হাহাকার '
বাধ্য হয়ে তুমিও কুড়িয়ে নিলে সেই ' হাহাকার '
তারপর খাদের পাশে দাঁড়িয়ে দুজনে
কী ভয় ! কী ভয় !
যদি ফিরে আসে আরো বিকট শূন্যতা,
ভীতু পাখির মতো নামানো চোখ শুধু বলে যাচ্ছে , "নিঃশর্ত, নিঃশর্ত "!
বৈশাখ
.........
বৈশাখ এসেছে, দ্বারে দাঁড়িয়েছে
রাস্তা গিলে এসেছে, গিলে এসেছে চৈত্রের প্রতিবাদ।
মাংস রান্না হচ্ছে, চন্দন সুবাস।
একটি মেঘকুঞ্জ জমছে, জমছে অনেক জায়গায়,
শহরে , গ্রামে অক্ষম হস্তীর বৃংহণে।
আষাঢ় মাসে বছরের গায়ে জল জমবে, কাদা, ক্লেদ, মাঠ ভরে প্রসূতির মেলা,
সব পেটে যাবে, গর্ভে লুটোপুটি খাবে, স্থুল তারা, অনাবৃষ্টির ছায়া কোলে দিয়ে যাবে!
ভালোবাসো কী তারে?
উদ্ধত বক্ষ কেটে ফেলেছে সে,
শাণিত লুন্ঠন এক আগাপাশতলা।
বৈশাখ এসেছে,
এসেছে বৈশাখ।
দ্বারে দাঁড়িয়েছে,
রাস্তা ছুঁয়ে এসেছে, ছুঁয়ে এসেছে ঝড়, মেঘের দ্বৈরথ।
পেয়েছে একটি ঘর, অবেলার।
ঐ যে সে, গালে হাত দিয়ে বসেছে, চূর্ণ ঠোঁটে রাগ দেখাচ্ছে।
কারণ ছাড়া কাঁপছে কেউ, যেন পৃৃথিবী আমার যুগলবাহুতে।
এই অধিকার যেন কার, আরো কার কার?
যার চোখে বন্ধক রাখা চক্ষুজোড়া, যার পকেটে খয়েরি চাবি,
সোনালি জং ধরা ...
আট মার্চ
বসন্ত এসেছে, পলাশ জ্বলছে।
কিছু উড়ন্ত পংক্তি মেঘ হয়ে নেমে আসছে
নীচে ধুলো ঝড় গিলতে থাকা কোনো মেয়ে
আগুন খেতে খেতে উজ্জ্বল হয়েছে ত্বক
নিঃসঙ্গ গোলাপের পাঁপড়ি তার জিনসের পকেটে
আলাদা দিবস হিসেবে সে কিনেছে
পি সি চন্দ্র জুয়েলার্সের সরু চুড়ি আর
আপোষহীন একান্ত সময়।
নিজের মৌতাতে মগ্ন হয়ে বিরহ ভুলেছে,
আরো দুটো জিনিস হেলায় উড়িয়েছে,
' অপ্রাপ্তি ও অপেক্ষা '।
চিরশ্রী দেবনাথ
বাংলা আমার ভাষা
...................
বাংলায় কথা বলি... তাই ,
আমরা খুব সহজেই অন্যভাষায় কথা বলতে পারি
আমাদের লেখায় ছড়িয়ে পড়ে ভারতের রঙ
বাংলায় কথা বলি, তাই সবাইকে ডেকে আনি,
আমাদের হিংসে হয় না, রাগ হয় না,
অন্যভাষার টুঁটি আমরা চেপে ধরতে জানি না
বাংলায় গান গাই, তাই অন্য ভাষার গান এতো ভালোবাসি
আমাদের রান্নায় ভাষার সুবাস
তাই বাংলার মতো নরম আমাদের ক্ষত
রক্তিম রেখায় সেখানে ফুটে ওঠে সকল মাতৃভাষার বিষাদ
রুক্ষ পাহাড় যে বাংলাকে দিয়েছে প্রান্তিক সুর ...
সেই বাংলা আরো মিঠে, পোড়া আলুর নোনা স্বাদ
আর নির্জন অহংকার বলে যদি কিছু থাকে,
তবে তা ভাঙাচোরা উদ্বাস্তুর দৃপ্ত বাংলা, বাউলের গড়া তাজা মাটির দেউল।
যাতায়াত
আবার অপেক্ষা করছি প্রেমের
আস্তে আস্তে কেমন করে সে হয়ে যায় অপ্রেম অপেক্ষা করছি তারও।
মজা সেখানেই, ক্লান্তি সেখানেই,
পাশে রাখা এক কিবোর্ড, চলাচল ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে শুধু।
ক্যালেন্ডার থেকে নীচে পরে যাচ্ছে কিছু সরকারি ছুটির দিন,
এইসকল ছুটির দিনে,
আমরা কখনো সখনো আধখানা গান শুনেছি
তারপর কেউ এসেছে, গল্প করেছে দেশের বেকার সমস্যা নিয়ে,
আমি শুনতে শুনতে ভাবতে থাকি
এখনো কি কোথাও আছে সেই ডাকবাক্স,
যেখানে নিভৃতে শুয়ে আছে কিছু বিশেষ ঘোষণা, ব্যথা আর ব্যর্থতার ...
শঙ্খজল
একদিন আপনাকে হারিয়ে ফেলব আমি
একটি ভুলভাল সংলাপের খেসারত হয়তো দেবো
আপনি চলে যাবেন অভিমান করে
আমি কোনো কোনো কবিতা পাঠের আসরে যাবো
মেয়ে তখন অনেক বড় হয়ে গেছে
পুরীর সমুদ্রধার থেকে পুরাতন মায়ের জন্য কিনে এনেছে শঙ্খমালা,
সেটাই পরেছি আমি
কবিতা পড়ছি, চশমার বাড়তি পাওয়ারের নীচ থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে কবিতার রঙ
আমি অনেকদিন আগে আপনার সেই চলে যাওয়াকে বলছি ...
কবিতায় যুদ্ধ নেই, বিপ্লব নেই, অসহায় মানুষের কথা নেই
শুধু চলে যাওয়ার অস্ফুট কিছু কথা আছে ...
পুরোনো জানিয়া
একটি আশ্চর্য অনুভব হলো আজ
ভেবেছিলাম আমরা পুরনো হয়ে গেছি
আমাদের সন্ধ্যাকাল আর অন্যান্য সময় নতুন কিছু নয় আর
কিন্তু যেই না এক বিকেলে আমরা খুব কাজে বেরোলাম দুজনে
মোষের গায়ের রঙের মতো কিছু মেঘ তখন আকাশে
আশ্চর্য কি ভালোই না লাগছিল হাঁটতে
অথচ কথা হচ্ছিল করোনা ভাইরাস, জিনিসপত্রের দাম ইত্যাদি নিয়ে
তবুও অনেক ভালো লাগছিল ...রাতের চেয়েও যেন কিছু বেশি
মৈথুন
হঠাৎ করে বিকেল নেমে এলো
যেন বহুদিন এরকম বিকেল আসেনি তোমার কাছে
তুমি কী করবে ভেবে পাচ্ছো না তাকে নিয়ে
একটি পাহাড়ি পথ গোপনে রেখেছো আজো বিভাজিকায়
সেখান দিয়ে সোজা হেঁটে গেলেই বন
না হয় একাই পথিক হলে,
আরোহন শেষে খুলে রাখলে নির্মল স্বেদ...
তরুণী কবির প্রতি
সমস্ত নিরাপদ লাইন থেকে নির্বাসিত
মেঠোপথে আছে তোমার অস্থিরতা
আলো আবছায়া হয়ে হেঁটে যাওয়া
সংসারে থেকে অসংসারী মন, উদোম হাওয়া
মাছের মতো পিচ্ছিল সব বসন্তকাল
হে নতুন কবিতা লিখতে আসা মেয়ে
মিলিয়ে নিও আমার সঙ্গে তোমার অবিকল ধারাপাত
জন্মান্তরে
................
ম্যাপ খুলে বসেছি দুজনে,
একসঙ্গে আঙুলে আঙুল লাগিয়ে
খুঁজছি আজ ,
যেখানে হবে মধুযামিনী জন্মান্তরে,
চোখ বন্ধ করে, আঙুল হাঁটতে থাকে,
কোথাও থামতে দিই না আমি ভয়ে,
যদি হয় আগ্নেয়প্রপাত, সাগরখাদ,
শ্বেতমরু, অথবা শ্বাপদ অরণ্য!
একসময়, তুমি বলে ওঠো স্টপ ইট্ !
চোখ খুলে ফেলি দুজনেই ভাঙামুহুর্তে,
দেখি এক ঝর্ণা ঘর!
স্নান শেষের গন্ধে ভরে আছে ধূসর দেয়াল,
সব সময় পুড়ে গেছে
ঋতুতে ঋতুতে শীতের মাঠে মাঠে,
তারা কোন জন্মান্তর রেখে যায়নি।
হে কবি
আপনি খুব বড়ো কবি
ভীষণ বিখ্যাত, জলদ গম্ভীর
দূর থেকে বেশ লাগে দেখতে
ঐ দীর্ঘ ঋজু দেহ এবং দেহাতীত সেই আঙুলগুলো !
আমি আঙুল দেখি,
জানি এই আঙুলেই আপনি আঁকেন,
যক্ষ নারীদের ছবি, ক্ষুধা, লোভ আর বালিহৃদয়
অন্তস্থল থেকে সেই ফর্সা শীর্ণ আঙুলে জমে ওঠে একটু রক্তাভ অনার্য ইতিহাস
আপনাকে দেখি না, শুধু আপনার বাক্যবন্ধগুলো আমার চোখের চারপাশে দীর্ঘ পায়চারি করে,
এতটুকু পড়ে ভাবছেন 'কে তিনি '
ধরে নিন রবীন্দ্রনাথ, রাত বাড়লে তিনি নিবিড় কবি হোন,
সকাল বেলায় আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলি...গার্হস্থ্যের ।
একাকী সুখে
একাতিত্ব আজকাল কোলাহলমুখর
সব নিবেদন লেখা আছে গহনে, যেন হস্তীযূথ, মুখরিত অরণ্য
একটি সংক্ষিপ্ত জীবন হোক মল্লিকা বনে
ভ্রমরের দংশন হোক আত্মার নিবিড় চরাচরে
এ পর্যন্ত লিখে, আমি চলে গেলাম স্নানে
স্নানঘর ঘিরে আছে পদ্মনাভি, সুরভিত কাম
আজ আর ফিরবো না অন্য কোন মুহূর্তে
কবি জয়দেব লিখে দিও, দু পংক্তি অসম সাহসী,
আমার খোলা পাতায়,
আমি যে তোমাকে দেখি পৃথিবীর পথে একাকী সুখে।
প্রাণ
দহন, দাহ, দগ্ধ ...কারা করে সেখানে বসবাস?
গভীরে নির্জনে সন্ধ্যার ব্যালকনিতে,
তাদের দেহ ঠান্ডা হয়ে আসে, বহিরঙ্গে সংসার, ঢিঁমে আঁচে,
আজন্ম কবিতায় তিনটি শ্বাস
হোক আমার, হোক আমার, বার বার
তৃপ্তি
মনে হয় কুড়িয়ে আনি ডালপালা
দুধর্ষ আগুন জ্বেলে দিই...রান্না হোক
পাট পাট করে গুছিয়ে রাখি আলোর ঘর
তোমাকে নতুন করে খুব ভালোবাসি,
যেমন করে বাসা হয়নি আগে
তাহলে কী তৃপ্তি আসবে ! পুড়ে যাবে অনুতপ্ত সময়?
অস্থিরতাময় এইসব লাইন লিখতে লিখতে
আমার পিপাসা মরে যেতে লাগল,
শান্ত পাখির মতো ঠোঁটে জমাতে লাগলাম ফলের বীজ,
আসলে লেখা ছাড়া আর কোনো তৃপ্তি নেই
বাবা
হাফ হাতা সাদা ঘেঁষা শার্ট, বগলে ব্যাগ, ছাতা
আমাদের কারো কারো বাবা এমনিই ছিলেন
কালো অথবা ফর্সার কাছ থেকে ফিরে আসা
বাবার খুলে রাখা চশমা খাপে মেলাতে গিয়ে দেখি
কাচে লেগে আছে আস্ত এক নদী অববাহিকা,
স্বপ্নের ঘরবাড়ি আঁকা সেখানে, আমার গন্ধে ভরা।
গরাদ
........
কোথাও যেতে যেতে দেখি
দেড়কাঠামতো এক টিনের বাড়ি, উঠোন সমেত,
পেছনে কি আছে ছোট্ট কোন পুকুর, যার ঘাটের জলবালিতে একটি কড়াই রাখা
দু এক আঁজলা ধোঁয়া বেরোচ্ছে পশ্চিমের একচালা থেকে,
শেষ বিকেলে আহা, কেউ এলো বোধহয় অতিথি হঠাৎ...
অথচ খাওয়া শেষ হলো কি বউটির?
ভাবতে ভাবতে পেরিয়ে এসেছি কতদূর, একটানা খেজুর গাছ, এলানো রাস্তা,
সন্ধ্যা হতে হতে এসবই কবিতা বলে তুলে রাখি আজকাল ...
প্রধানমন্ত্রী
ধরা যাক একটা লোক। খুব সাধারণ।
তাকে তার মাও ভালো বেসেছিল অভ্যাসের বশে,
একদিন তাকে কেউ জড়িয়ে ধরল
সত্যিকারের জড়িয়ে ধরা
মানে ভেঙে যাচ্ছে পাহাড়, সমুদ্রে ঢেউ উঠছে
আন্দামান বলছে বিপদসীমা পেরিয়ে গেছে, সুনামি নিশ্চিত
দু একটি আগ্নেয়গিরি কার্বন মনো অক্সাইডের ভয় দেখাচ্ছে
আমি নিশ্চিত লোকটা তখনও নির্বিকার থাকবে।
ভালোবাসা না পেতে পেতে তারা খুব পাথর হয়, নিষ্ঠুর হয়,
অনেকটা ঠিক কোনো কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো।
শীতলপাটি
আমি বলি, আমাদের বন্ধুত্বটা অসম
তাই বলেছি " কিছু চাই না "
যদি মনে হয় লাভ লোকসান, দেওয়া নেওয়া ইত্যাদি
আশ্রয় চাইনি বলে তুমিও হতাশ, আমিও বর্ষাহীন কদমগাছ
ভুলভাল কিছু আবহাওয়া সংবাদ, হয়তো আমাকে বদলাতে পারে
তখন কিছু দিও না হয়, হোক না তার পাতালঘেঁষা দাম
এতটুকু তো গভীর হতেই হবে বলো !
এ তো আর দৈনন্দিন নয়,
শখ করে খেলতে আসা বিপজ্জনক আদিম খেলা
সঙ্গীটিও মেধাবী, বহুকিছুই তার রীতিমতো শেখা অনেক আগেই
রেইনকোট
আসলে তো কেউ ফিরিয়ে দেয়নি
প্রতিটি মাঝপথ ওনাকে দ্বিধায় ফেলেছে
অন্যরা বলেছিল তিনি নাকি বামপন্থায় বিশ্বাসী
মৃত্যুর কিছুদিন আগে বুঝেছিলেন
তিনিও আদর্শহীন আসলে, রক্তে মেশাতে পারেননি কিছুই
উপর থেকে ঘাম চেটে কিছু মিছিল করেছেন
শ্লোগানের কথা পরিবারেও ঢুকতে দেননি
তিনি আসলে চামচা হয়েছিলেন, কমিউনিজম এতটা সহজ নয়
তাই ব্যাপক দলবদলেও আজ তার আর নিন্দে করতে ইচ্ছে হয় না
কারণ প্রতিদিন মিছিল মিটিং সেরে ঘামে ভেজা জামা বাইরে রেখে তিনিও ঘরে ঢুকতেন
কাছে আসা মৃত্যুকেও তার তাই ঘোলা মনে হয় আজকাল।
ছায়াসেতু
ছোট ছোট ঘরবাড়ির জঙ্গল পেরিয়ে
এক সেতু, মাঝ বরাবর
আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকেও!
পা ঝুলিয়ে বসে আছি পুরনো কাঠের ওপর
নীচে জল আর অজস্র ভুল
আমি আসলে বাসি না, বাসতে জানি না
জলের নীচে যেন বাস্তিলদুর্গ
কোন একদিন বিপ্লবী চিন্তাধারা ছিল বেশ
আজ নেতা দেখি না
এই দেখো কেমন করে চলে আসছি রাজনীতির দিকে
তুমি বলছো আমি সুবিধা বাদী
আমি আসলে একটা কিছু বিশ্বাস করতে চাই,
যা বদলে যায় না
সেটা ভালোবাসা বা আদর্শ জাতীয় কিছু হতে পারে
এই তো আবার কেমন নতুন কোন ঝড়বৃষ্টির সাজ, ভাঙা নক্ষত্রের ঝকমকানি ...
তোমরা বোধহয় নতুন কোন পরিকল্পনা করছো তাই না!
এই অসমাপ্ত বাদলা দিনের, খোলা জানালার?
বৃত্ত
এগুলো লিখে কী লাভ
তার চাইতে যে লোকটা রাস্তা বানায়, সে অনেক দামি
মনখারাপের বাড়ির সঙ্গে কেমন করে
জুড়ে দেয় নতুন কোনো বন্ধুর ব্যালকনি
তারা জল আলো ফেরি করে, জনপদ বানায়
আমি দারুণ আলস্য নিয়ে প্রলাপ লিখি
কী হয়, কী হয়?
কিছু না! কিছুই না।
তবুও কে যেন বলল সেদিন
এইসব লেখায় পৃথিবীর উষ্ণতা আধাআধি হয়,
শীতকাল খুলে ফেলে সামরিক সাজ, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা থেমে যায়
অথচ আমি জানি কবিতা সবসময় লেখা হয় যুদ্ধ লাগার পরে,
লাশ, ধ্বংস, আগুন দেখে দেখে দূরের শহরের সেই ব্যালকনিতে বসে ...
শিল্পী
খুব দ্রুতলয়ে যখন রাগিণী বাজে
উচ্চাঙ্গসংগীতের শিল্পী ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যান
এই তান, ঝংকার, যন্ত্রানুসঙ্গতা আসলে তার নয়
সুরের শরীরে শুয়ে থাকা কঠিন স্তম্ভ,
মাঝে মাঝে, তারা দেখে যায় হলের ভিড়
সুর বয়ে যায় অনেক নীচ দিয়ে, ক্ষীণ জলধারা...
শেষরাতের মতো
নির্বাসিত লেখকদের জন্য
...........
আমি সেসব নির্বাসিত লেখকদের জানি
যাদের হৃদয়ে মাটি সীমান্তহীন
মধ্যরাতে তাদের খোলা চশমার কাচে দু ফোঁটা জন্মভূমি।
যে ফুলদান রাখা, চুরুটের পাশে,
চলে যাওয়া নারীর দস্তানার মতো বিগত সুগন্ধে ভরা।
কোন দেশ নেই তার, আছে শুধু লেখার চোরাবালি,
ডুবন্ত সুখ।
সব বই সবুজাভ ঈর্ষায় তুমুল জনপ্রিয়,
তবে কী উড়ে বেড়ায় কোন অনিকেত শঙ্খচিল,
বিদেশি জানালায় ভোরের বেলায়?
সংঘাতে জ্বলেছিল শব্দ, বিয়ারের বুদবুদ, রাতপোশাকে ফসফরাসের ঢেউ,
আসলে তারা লেখার শরীর,
আমরণ পাপ ... সেখানে নিরন্তর ফসলের শিষ।
মনসা
পাঁচশ টাকা দিয়ে মনসা মূর্তি কিনে এনেছে যূথিকাবালা
তার পনের বছরের মেয়ে বলে, মা, মূর্তির দেখি দুই চোখ ভালা?
অথচ পদ্মপুরাণে কয় মনসা বলে কানা ...
মা কয়, চুপ চুপ, দেবতা ! দেবতা !
রাতের বেলা মাইয়াটা কালি দিয়া করল এক চোখ কানা,
মনসা হাসে, ঘুমায়
কত আন্দোলন করছে, এখন তাঁর শরীরভরা ক্লান্তি
আসলে তো ছোবলেরও শক্তি নেই, চক্ষুতে নাই বিষ
শ্রাবণের ভরা নদীর মতো খোলা মন আজকাল
কী যেন নাম তাঁর... অনার্য দেবী... চ্যাং মুড়ি কানি।
সানন্দা
অবসাদ একটি গভীর অসুখ
বলে যায় সানন্দার দশ নম্বর পাতা
পরের পাতায় স্বাদু খাবার, ব্রণ ওঠা কিশোরী
তারপর ঝড় আসে, উড়ে যায় পাতার পর পাতা।
শুকিয়ে গেছে পুরো পরিবার চরম বিষাদে জনবহুল
শহরের ফ্ল্যাটে
জীবন্ত কোমায় চোখের নীচে জমেছিল তাদের নোনা পাথর
কী হয়েছিল তারপর, দেখিনি নিউজ, রাখিনি আর খবর।
শেষ পাতায় কাটাকুটি ছক, ইচ্ছে করে হারিয়েছি পথ ...পাখার রঙ ধূসর
সোনালি টিকেটঘর
কৈলাসহরে একদিন ছোট্ট একটি রেলস্টেশন হবে
তার নাম হবে 'ঊনকোটি '
শহরের অস্থির মানুষগুলো বসন্তের বিকেলে,
স্টেশনের দিকে হাঁটতে চলে যাবে।
রাস্তার দুধারে নবীন গাছের সারি,
হাওয়ায় ভাসছে ভালোবাসার গুঞ্জন,
প্ল্যাটফর্মের সিমেন্টের চেয়ারে বসে
কোনো দম্পতি অপেক্ষা করবে প্রবাসী সন্তানের
রেলস্টেশন মানে জীবনের মৌতাত
ভারতবর্ষের রেল মানচিত্রে এ কোনো জংশন নয়,
অল্প তেল দিয়ে মাখা সামান্য ঝালমুড়ি,
ধূসর শাল গায়ে, একদিন শেষবিকেলে আমিও পৌঁছে যাবো সেখানে,
ঝরা ফুল কুড়িয়ে ভাবব, স্টেশন মানে হোক শুধু ফিরে আসার গল্প।
উড়ান
মাঝে মাঝে নিজের কাছে পরিযায়ী হই
দূর থেকে দেখি আমার ভেতর
দূষিত মাংস প্রাচীর এবং রূপনারায়ণ নদী পাশাপাশি মাখামাখি
একা ধমণী বয়ে নিয়ে যায় সব ফাঁকি এবং সুধা,
অসুস্থতা, দুঃস্বপ্ন, বিপন্ন ভোর, সুগন্ধি সকাল ছড়িয়ে পড়েছে কেমন করে মধ্যবেলায়
কোথা থেকে উড়ে আসে কৌশুলী বিহঙ্গ এক ,
অবাধ্য মাধবীলতার গুচ্ছ লাল, সংকেত মিথ্যার
তারপর ঋতু বদলে যায়, শীতকাল চারিদিকে,
উড়ান শেষ হয়, দেহের ভেতর ফিরে আসি।
শেষ
নিজেকে লিখি
দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনে উদ্বাস্তু আমি
ফুটনোটে সতেজ ব্যর্থতা, ভুল সারি সারি
এ জমি অনাবাদী, ব্যর্থ শ্রমের চাষ
দীর্ঘ পথে দুরন্ত কর্কট ছুঁয়ে দিও দ্বিপ্রহরেই,
সন্ধ্যাকাল শুধু মনখারাপ আনে, শঙ্খ বাজানো শিখিনি...ভজনে অনীহা, সুরহীন।
ঘৃণা পাওয়ার পর
খুব কষ্ট হলে, মানুষ কী করে
কেউ কাঁদে, কেউ জ্বলে, কেউ মরে, কেউ পাথর
তখন... তারপর, কত ঢেউ এসে ফিরে যায়
কষ্ট আর মুখ ফিরিয়েও দেখে না
তার কাছে অকিঞ্চিৎকর দুই একটি খড়কুটো সবসময়ই থাকে...বেঁচে থাকার জন্য।
যখন সময় বৃষ্টিহীন
কোনো একদিন আমি এসব লেখালেখি ছেড়ে দেবো
একটি কবিতা বা তার মতো কিছু আমার আর লিখতে ইচ্ছে হবে না
কালো কালো অক্ষরগুলোকে মনে হবে মেথি দানার মতো তেঁতো
আমি তখন ছোট ছোট টবে হালকা ফুল গাছ লাগাবো,
নরম পাতা বাহার
আজ দুপুরে যেমন বৃষ্টির বাতাস বইছিলো, তেমনই বইবে তখন
ছোট ছোট কাঠি গাছগুলোর পাশে লাগিয়ে দিতে দিতে বলবো,
জড়িয়ে থাকো তোমরা
আমার কাছে তখন না লেখার সুখ, চেয়ে চেয়ে দেখার আনন্দ
মনে মনে ভাবছি ,
অনেক আগে দিনরাত আমি লিখতাম যাবতীয় সমারোহ ...
নোনাবালি
ভালোবাসায় তুমুল থাকতে থাকতে
আমি ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা লিখতে থাকি
আমার শূন্যতা গুলো কীভাবে বাড়বে
সেই ভয়গুলো আমাকে একটু একটু গিলে ফেলতে থাকে
আমি যা লিখি তখন তা দুরন্ত প্রলাপ, ধ্বংস লেগে থাকে গায়ে
যা রঙ টঙ করি ধুয়ে মুছে ক্ষীণ বিষাদের মতো সুন্দর হয়ে ওঠে,
তখন মনে হয়, কেউ যেন তার পরিত্যক্ত নির্জনতা আমাকে দিয়ে যাচ্ছে সেতারের মতো...
জলের ধারে ডাহুকির পদছাপ
ভালোবাসা খুব স্বার্থপর
সে স্পর্শ চায় না, চায় না ধ্বনির গুঞ্জন,
কেবল শর্ত এবং আরো কিছু শর্ত
হয়তো তবুও ভালোবাসা কখনো চায়
বৃষ্টির মত স্বচ্ছ আলিঙ্গন
এই কল্পনাকে আমি মধুরঙ দিই একাই
মনে মনে বলি হে মধুকর ভাসাও, ভাসাও
ভালোবাসলে যা যা হয় সব আছে
নীরবতা, শূন্যতা, ভয়, আশংকা, পূর্বাভাস ইত্যাদি
শুধু সন্দেহ রাখিনি, সে আমার বিষয় নয়
এভাবে প্রতিধ্বনির মতো আমি আছি তোমার কাছে
আমাদের মুকুট নেই, ঝরাপাতার পোশাক, ধুলো মন।
তোমাকে কষ্ট দিই আড়ম্বরে,
সেখানে কখনো পেনডেমিকের কথা,
কখনো ত্রিপুরার লুপ্তপ্রায় বন জঙ্গল, ডাহুকির ডাক
মৃতপ্রায় পূর্ণিমা রাতে রাবার গাছের ফোঁটা ফোঁটা সাদা রক্ত... যেন বিরহ ঝরছে মন্দ মন্থরে।
তব পাশে
কবির হাত পুড়ে যাচ্ছে
পা পুড়ে যাচ্ছে
তার সমস্ত হৃদয়ে ছেয়ে যাচ্ছে... আগুন আগুন
চিৎকার হচ্ছে, কী যন্ত্রণা! আহ্!
কবিতা হচ্ছে, কবিতা চলছে নিরন্তর অশ্রু বিনিময়ে।
কান্না
যখন কাঁদতে চেয়েছি
তখন কাঁদতে দিও হে পুরনো মন্দির
তোমার সঙ্গে দেখা হলে মনে হয় চরণামৃতের বাটি ভরে গেছে জ্যোৎস্নার কান্নায়
এখনি তো কাঁদার সময়,
বৃষ্টি ক্রমাগত ছুঁয়ে যাচ্ছে ফুলের দেহে প্রজাপতির সংঘাত
এই পৃথিবীতে এতো কান্না বয়ে বয়ে যায়
কত বিরহ, মৃত্যু, যন্ত্রণা আর পাপ, কান্না হয়ে গলে গলে যায়
অন্ধকার গভীর হয়ে শ্মশানের পাশ থেকে নিয়ে যায় ঘৃত পোড়া গন্ধ, মৃতের দেহের বাঁশরীর সুর
পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ে কান্না,
গলাজলে ডুবে গেছে গৃহস্থালি,
দু এক খন্ড চন্দনকাঠ, গৃহদেবতার আশ্বাস
তবুও নতুন করে যেন কান্নাকে খুঁজে নিতে আসি
এই কান্নার কাছে হাঁটু মুড়ে না বসলে, অহং এর কাছ থেকে ফেরা যায় না
জলাভূমি
মানসভ্রমণে যাচ্ছি পৃথিবীর প্রিয় জায়গা গুলোতে
কথা বলছি অনর্গল, মুক্তহাসি, চোরা টান প্রথম বেলার মতো
যদিও আমাদের জানা জানি শেষ,
সব জায়গায় মহামারীর ফেলে যাওয়া ভয়
তবুও আমি খোস মেজাজে, এ জীবন আমার এরকমই
মেনে নিয়েছি, পাহাড়ের খোঁজ আর করি না অনেকদিন ...
কিন্তু এইসব ভ্রমণে কার সঙ্গে যাচ্ছি, কে আমার পাশে
বুঝতে পারি না, তার সঙ্গে কথা বলছি শুধু
আমার সকল কথার শেষে কিছু ভালো লাগা জন্ম নিচ্ছে
হয়তো একাই আছি অথবা কারো সাথে নয়
মেয়েরা যেভাবে কবিতা লিখে
……………
মেয়েরা একটু অন্যরকমভাবে কবিতা লেখে
এ আমার অনুমান
যখন তারা মশলার গুঁড়ো নেয়
খুব ধীরলয়ে ঢুকে পরে হলুদ মরিচের ক্ষেতে
সন্ধ্যা হওয়া দেখে নরম পায়ে ফিরে আসে
এই ফিরে আসাটাই তাদের কবিতা,
স্নান করতে করতে মুঠোতে ফেনা নিয়ে চলে যায় সমুদ্রে
ভাসাভাসি আর ঝিনুকদানা কলের জলেই উপচে পড়ে
তখন দেহ জুড়ে যে কাটাকাটি হয়
সেটাকেই তারা পরবর্তীতে কবিতা বলে চালিয়ে দেয়
ঘর গোছাতে গোছাতে অরণ্যে চলে যায়
শাল সেগুন ইত্যাদি পর্ণমোচী বৃক্ষকে সাবধান করে দিয়ে আসে দাবানল থেকে
হরিণকে সখা করে উপহার চায় মৃগনাভি লকেট
রাতের বেলা এইসব অরণ্য পদছাপ কুড়িয়ে লিখে ফেলে সমূহ উষ্ণ অক্ষর
এজন্য অনেক সময় মেয়েদের কবিতা ঠিক কবিতার মতো হয় না
অন্যমনস্ক ভাঁজ থেকে বালির মতো ঝরে যায় শুধু আবেগ
ঠিকঠাক কবিতা খুঁজতে হয়তো ততক্ষণে সে আবার আগুন জ্বালাতে বসেছে
ফিনকি দিয়ে ছুটছে রুটি পোড়া গন্ধ, নাহ্ এবারও কবিতা হলো না
কলমকে শান দিতে গিয়ে দু এক দাগ কম হিমোগ্লোবিনে,
আস্তে আস্তে সে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে,
ঘরের আনাচ কানাচে রোগা রোগা মেধা ধুলোর মতো জমে উঠছে ...
আলোকযানে করে
আলোর মতো সেজে উঠল দেহ
চন্দনগন্ধে ভরে যাচ্ছে রাতের সমূহ ছিদ্র
আলো ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে জঙ্গমে
নাচ উঠেছে কোথাও, কে গান গায়? এখন বাউলের সুর !
মেতেছে জন্মতিল, সুডোল রূপবাক্সে, হুলের মতো আঘাত, লয়হীন পাগলের মতো
দুটো আলো মিশে যাচ্ছে রাতের জংশনে
শব্দ হলো না, নিঃসাড়ে, নিস্তব্ধে আলো জ্বলেছে এক পাত্র
পুনর্বার
যত সব দুঃখদুয়ারী মেয়েরা
আমি তাদের মধ্যে নেই
কত হাজার সংগ্রামে যাদের কেটেছে পা
আমি তাদের মধ্যে নেই
পুরুষ হাত রাখেনি হাতে
বলে যাদের অভিমান
আমি তাদের মধ্যে নেই
ভালোবাসা নিংড়ে যারা
পুড়ে গেছে কোনো এক সকালে
আমি তাদের মধ্যে নেই
সব শর্ত নিজের কাছে বাজি রেখে
একে একে হেরে গেছি সবখানে
কেউ দেখে ফেলার আগে
উন্মুক্ত হৃদয় ভরে গেছে পরাজয়ের সুখে
দোপাট্টা উড়িয়ে পেতেছি হাত আবারো নিখাদ
হে খোদা... হে ঈশ্বর ইনতেজার ফরমাও, আতশ জ্বালাও,
আসমান... এই খোলা আসমান আমার,
ভুলে গেছি বাকি সব অগ্নিভ প্রতিবাদ
মিছিলে হেঁটে যারা কেড়ে নিয়েছে
অধিকার, আমি তাদের ক্লান্ত পা
ঘরে ফিরে হেঁটে গেছি আধখানা রাত
বিছানায় যেতে যেতে মেখেছি ক্রিম
বলিরেখার নীচে আঙুল চালিয়ে
কেড়ে নিতে চেয়েছি দুপুরের রোদ
তারপর বলেছি এই দুরন্ত ভ্রমণে,
আবারো মেয়ে হতে চাই
তোমাদের তৃষ্ণার্ত মুখে এঁকে দিতে অরণ্য,
মেয়ে হয়ে বার বার ডুবে যেতে চাই।
মোহনায়
দুজন দুদিক থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেললে
আঁচ কমে আসে, নিভন্ত সকাল বিকেল দুপুর
একসময় ঝড়ের পূর্বাভাস আসাও বন্ধ হয়ে যায়
মনে হয় জড়িয়ে ধরতে হবে প্রাণপনে এই সায়াহ্ন,
দু এক বিন্দু কান্নাকাটি, একটা সময় সব থেমে যায়
তখন দোষারোপ করে, আবার নতুন সিরিজ শুরু করা যায় কিন্তু !
কৃষ্ণপক্ষ
মনে হয় হাজার হাজার পাখি বসেছিল একদিন আমার শরীরে
অজস্র কথা লিখিয়েছে তারা অবান্তর,
অনাগ্রহ এসেছে যখন, উড়ে গেছে তারা
খুব কিচিরমিচির দরকার আমার এইমাত্র
সেই তো নিঃশব্দে খুন করলাম সেদিনও
চিৎকার উঠেছিল , গাছের যেমন হয়
অশ্রান্ত ঢেউয়ের ডাকে আমার অস্থিরতা শুধু বেড়ে যাচ্ছে, ভাসাচ্ছে, পাগল পাগল !
হোক অসম্পূর্ণ, এপর্যন্তই থাক এটা। দু একটি ঘোর কৃষ্ণপক্ষ নিজস্ব।
বদল
আমি কোথাও যাইনি, সে এসেছিল, চলেও গেছে কবে কোনসময় যেন,
মুহূর্তকিছু পেয়েছি, বিশ্বাস ভরেছি খোলা বাতাসে
তারপর থেকে অনেককিছু বদলে গেছে
কিছু কিছু থাকা হয়ে গেছে, না থাকার মতো
অনুপস্থিতে
ডেকে গেলাম।
ছিলেন না।
ফিরে এসে এসব লিখলাম।
ভালো হয়নি।
গাঢ় হয়ে দাগ পড়ছে না।
মুন্ডমালা থেকে রক্তপাত ক্ষীণ হয়ে আসছে।
অমাবস্যা হারাচ্ছে নিকষ,
ফ্যাকাশে সূর্যভূমি আমাকে ডাকছে। কী হবে জানি না।
শ্বেতপত্র
মাঝে মাঝে রাত কাতর নাছোড়
ঘৃণা থেকে ঘুরে এসে শরীরে মেখেছে আতর
মনে হয় কিছু ছেঁড়া পাতা , পরে আছে ধুলো মাখা
মনে হয় নেড়েচেড়ে দেখি আধখানা তরবারি
আকাশ থেকে পড়ছে বৃষ্টি আচমকা,
এ কেমন অগ্নিরথ বাইছি একা
এ কেমন জলসা ঘর, সরস্বতী নিবিড় একা
এ কেমন ফেব্রুয়ারি শ্বেতপত্র দেয়নি জমা
আরো যদি বলো দিতে পারি লিখে
পারমানবিক যুদ্ধ শেষে অন্তহীন তেজস্ক্রিয়তা
যখন আঠারো উঠছে কেঁপে দিগন্তে ডুবছে ভয়
আমার হাতে নীলাভ সময়, নামানো মুখ উরুসন্ধিতে,
আবহ গোত্রান্তরের,
একই গোধূলি ফেলে রাখা ঠোঁটে
মেলাতে হবে এমন কোন কথা নেই
অমিল যার নক্ষত্রের নক্সা, যক্ষ্মাহূতি অনিবার
রূপসাগরে
ভালোবাসা যখন মানুষকে ছেড়ে চলে যায়
তার মনে খুব দুঃখ আর শান্তি আসে
অস্থিরতা ও তাগিদ চলে যায়
নিশ্চিন্ত হয়ে বহুদিন পর ফিরে আসে পৃথিবীর কাছে
খুব গরম পড়েছে হয়তো,
রাত বারোটায় ভাত ভিজে উঠেছে,
তরকারিতে একটু টক টক ভাব
খেতে খেতে সেই শান্ত মানুষটা ভাবে
এক টুকরো গন্ধরাজ লেবু হলেই হয়ে যেতো খাওয়াটা,
নির্বিকারতম মানুষ সে তখন,
বিষণ্ণতার খোলসে হয়তো ফাটল ধরেছে তার
শ্লাঘা
কবিদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি যাবতীয় আস্কারা
আমাদের দহনের ভাষ্য
আমাদের ক্ষরণের নদী
রিরংসার উপপাদ্য
বিরহের স্তুতি
প্রেমের শ্লাঘা
যৌনতার সৌন্দর্য্যায়ন
ক্ষমা চেয়ো নিভৃতে তার অপমানের কাছে
অভিমান নেই
যে কথা গুলো বলা হয়েছে, সেগুলো না বললেও চলত
আমি যা বলেছি, গিলে ফেলা ভালো ছিল
তবুও বলেছি কম, সাহস ছেড়ে গেছে কবে আমাকে
এখন ভঙ্গুর সময়, সব সংঘর্ষ থাক অপঠিত,
ধুলোমাখা বিকেলের ভীতু ইতিবৃত্ত
হয়তো কিছু গুমরাহ, কিছু মাথা নীচু
আত্মসম্মানই তো শেষপর্যন্ত সবচেয়ে বড়
আর যা কিছু পোড়ামাটির মন্দির, অনাদৃতা কেউ
কখনো মুছে দিয়েছি পর পর সেতারের শব্দ
তারপর আর মুছিনি, ছড়ে যাওয়ার কষ্ট ভালো লাগে
যাবতীয় লিংক, কপিরাইট দু এক টুকরো অঙ্গারের মতো
কোনো হিংসে হয় না আমার,
চলে যাওয়ার সময় হলে নীরব থাকা ভালো
গ্রামের পাশের নিরীহ ধানক্ষেত এমনই হয়
দূর থেকে দেখে... একান্ন পীঠের অভিমান তার জন্মগত,
যজ্ঞসমিধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর, উন্মুক্ত হয়েছে ঠোঁট,
জ্বালিয়ে রেখেছি কিছু ক্ষুধা আর আলো ...ভেবে নিতে পারো এটাই দীর্ঘতম
ভোরে
খুব ভোরে তোমার ঘুমন্ত মুখের সঙ্গে দেখা হয়
তখন রাত নিভে গেছে, ভোর ছড়ানো চারপাশে
এই সময়টি পৃথিবীর বাইরে,
প্রতিদিন অজান্তে ছুটে আসে আমার কাছে
তাই তাকে পেতে হলে, রাত জাগতে হয়,
প্লেটে দুচামচ গ্রীষ্ম রেখে, বলি, আমি অচেনা কেউ,
আজ দরজায় বাজুক কলিং বেল, পাখির সুর,
এখানে এখন থেমে আছে সময়।
অজানা
গভীরে তোমাকে আমি সাঁওতাল তরুণ ভাবি
দীর্ঘ এক শাল্মলী তরু, পাহাড় চুড়োতে দাঁড়িয়ে
আছো একা,
আমিও সেজেছি বনজ্যোৎস্নায়
কালো রঙে ছেয়ে আছি, কী রূপ আমার!
তোমার কাছে যাবো বলে,
ধূসর হরিণ শিশুর সাথে সারা রাত পথ হারালাম
দেখেছিলাম তোমাকে, তবুও ফিরে এলাম একা একা,
ঠিক কতটা ভালোবাসলে, যেতে হয় কাছে, জানা নেই এখনো ...।
সোনালি নেউল
এখানে চুম্বিত হবার কথা ছিল
তাই বিষণ্ণ ফ্যাকাশে সবুজ ঘাসে একটি প্রজাপতি
ভালোবাসা হবার কথা ছিল দুজন জীর্ণ মানুষের
সাগর থেকে এসেছিল নোনা হাওয়া
এতো আয়োজন শেষে, গভীর অন্ধকার হলো
মানুষ ও মানুষী জেগে উঠল ধীরে, উদ্ধত তাদের ডানা
অনেকদিন পর, কেউ কুড়িয়ে পেল সেই সোনালি মাটি
ভালোবাসার চিহ্নে ভরা, ছুঁতে গেলেই কেঁপে ওঠে শরীর
ভয় জাগে, বলে শুদ্ধ হও আগে, আকাশে জ্বলুক ধ্রুবতারা
একাকী মধুর
এখুনি আমার জন্ম হলো
সেগুন বৃক্ষের মেয়ে, মা বহু দূর থেকে আসা চেরিগাছের বীজ,
লতিয়ে উঠেছিল কাণ্ড, ভাদ্রের রাতে
ধৈবতে ভাসছিল লাল রশ্মি
জন্মমাত্র, হাঁটতে শিখেছি
কচি চারা, আস্তে মেলেছি ডালপালা
সবুজ শরীর হয়েছে, নীল চোখ, কেন কে জানে?
তাতে সন্দেহ হয় পড়শী গাছের
তাদের গুঞ্জন হেলায় উড়িয়ে আমি তরুণী হলাম, মধুর ভৈরবী, অন্য গাছের সৌরভ পেতে...বৃষ্টিকে আহ্বান করি,
জঠরে বীজের দহন শুরু হলে গিলে ফেলি
মাটির জঙ্ঘা ছিঁড়ে বেরুতে চাইলে, চাপা দিই শিকড়,
এই বনে একাকী অপরূপা আমি, নীল আঁখি,
পর পর ঝড় আসে ক্রমাগত,
স্থির করে দিয়ে যায় আমার মসৃণ কোমরের মায়াবী মাপ।
খন্ডিত মুহূর্তে
পৃথিবীর বুকে প্রত্যেকদিন একটি সময়ের জন্ম হয়।
খুন , বন্ধুত্বের ভাঙন কিংবা ক্ষুধার মিছিলেও, তার শরীরে সুগন্ধির পবিত্র আকুতি
যে পায়নি, সে পায়নি।
যে পেয়েছে সে শাহজাদা, আলোর তাজ।
আমি তাকে দেখতে চাই, সে কী তখন ভুলেছিল গালাগাল দেওয়া
তারপর, "ভালোবাসা হওয়ার" মুহূর্ত থেকে আস্তে করে গড়িয়ে গেছে অপাপবিদ্ধতা।
রক্তনালী থেকে জন্ম নিয়েছে বিসর্জন, দুঃখের সম্ভার
ফিরে আসার পথে, দোকান থেকে কিনেছে দাবদাহ
নিজের কাছে ফিরতে চেয়ে, আজ চুপ করে বসে আছে
শরতের নীল মেঘ, তাকে ঢেকে দিচ্ছে ... ফিরে এসো মুশাফির।
স্মৃতি
পুজো এলে মা বাবার কথা মনে হয়
পুজো এলে মনে হয় ভেতরে খুলে গেছে হাট
যারা ছেড়ে চলে গেছে, তাদের শরীরে আমার হাত
জনহীন রাস্তায় মৌন ঢাকিদের আস্তে পথচলা
ঝরে পড়ছে শিউলি, বোঁটা ছেঁড়া কমলা রঙ
বাড়ি ফেরা, বাড়ি থেকে যাওয়া, গুলিয়ে গেছে সব
কবিতা পড়তে পড়তে, মুগ্ধতা হারিয়েছে হৃদয়ের মাঠ
গান গাইছে অচেনা লোক, যেন পাখা মেলেছে মুগ্ধ শ্লোক
গোটা রাস্তা ও কিছু গর্ত বুকের ভেতর ঢুকে গেছে,
গাছের ছায়া, নিবিড় নক্ষত্র, কুয়াশাভেজা তৃণদল।
পতঙ্গের মতো আহুতি শিখতে হবে, উর্ণনাভ ধৈর্য
তাই জ্বেলেছি শেষরাতের আগুন পর্বতপদপ্রান্তে
পরিক্রমা শেষে ফিরে যাচ্ছি সুখবিমুখ গাজন সন্ন্যাসী।
আবাহন
প্রতিদিন ব্যথা নিয়ে যে আনন্দ জেগে ওঠে তাকে প্রণাম।
ছেড়ে আসতে আসতে প্রলম্বিত হয়েছে প্রেম
অন্ধকারে নির্ভীক হয়ে ছুঁয়ে এসেছি পরিক্রমা ও পুজো
প্রসাদের মতো কেটে রাখা আছে আত্মরঙ, অগুরু ছড়ানো।
ঘর থেকে প্রণত আহ্বানে, পুরুষ ফিরিয়ে দিয়েছে যুদ্ধের তরবারি !
পাখির ছায়া কুড়িয়ে অবশেষে জেগে উঠেছে চেনা গৃহস্থালি।
শহরের বিষাদ
এইমাত্র শহরটির গায়ে জ্বর এলো, একশ ডিগ্রি তার বিষণ্ণতা,
কোথাও কেউ কেঁদে মরছে, দুঃখে পুড়ে যাচ্ছে অহংকার,
ছবিওলা আঁকতে পারছে না, কবি লিখতে পারছে না,
স্তব্ধ হয়ে গেছে আগুনের নিমন্ত্রণ, অপমানের গাঢ় দাগ
পাথর থেকে ঠান্ডা কুড়িয়ে কপালে রেখেছি অভিমান
রসদ খুঁজতে বেরিয়েছি,স্বপ্নসম্ভবা অন্ধকার , স্রোত ও শব্দ
উন্মাদের কাছ থেকে ধার নিয়েছি অবাস্তব, পকেট ভর্তি নুড়ি।
হারিয়ে ফেলেছি কবির বাড়ি, পথ ডুবে গেছে মৃত লেখায়...
মা
মা মরে গেলে
মেয়েরা খুব একা হয়ে যায়
গরম ভাতে মেয়েটি কি ভালোবাসত
সেটা মনে রাখার শেষ মানুষটি তখন নক্ষত্রের পাশে
তারপর থেকে মেয়েরা একা একা ভাত খায়
অনেক খাবারের সামনেও তারা একাই থাকে বাকি জীবন
সমৃদ্ধি
..................
এটা কিন্তু আলাদা সিরিজ
আগেরটার সঙ্গে এটাকে মিলিও না
আলাদা বারান্দা, আলাদা রান্নাঘর।
রোদের চাষ করছি, রাত এখন দেড়টা, শুক্রবার।
প্রবল বৃষ্টিতে ফলন নষ্ট হয়ে গেছে,
শিশুর মতো ধান হোক, হাতে রূপোর কৌটা নিয়ে কেউ আসুক
আলপথে, নদীর পাশ দিয়ে দিয়ে।
হৃদয়ে
.........
মেয়েরা রোগা মোটা হলে সহজেই বোঝা যায়
ব্লাউজের হাতা ছোটবড়ো হয়
তখন সেলাই করি ক্ষয়ে যাওয়া মেদ অথবা জমে ওঠা
সোহাগ
যেন তারা নিশ্চিত প্রতিবেদন লিখে দেয় বাস্তুগন্ধে ভরা এই পুরনো ক্ষেতের
আমি কি জানতাম তখন এখানেই গুলমার্গ,
রেইনট্রি বারোমাস ও দখিনা বাতাস
গভীরতম ফ্রিজে গোপনে জমা করি সুস্বাদু নরম ভ্যানিলা আইসক্রিম, স্বাদহীন বরফও থাকে পাশাপাশি,
হঠাৎ পাওয়া ব্যথায় চেপে ধরে তার ঠান্ডা অথচ সবল হাত ...
৯১.২৭ দ্রাঘিমাংশকে
....................
নেট সার্চ করে এবং যারা জম্পুই ঘুরে এসে ফটো দিয়েছে,
সবকিছু ভালো করে দেখে,
একটি নিঃসঙ্গ অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশে বসলাম
কুয়াশা, পাহাড় আর লুসাই সুন্দরীদের সঙ্গে মিলেমিশে
দিব্য এক গন্ধ পেলাম, লালাভ পরমান্নসুলভ
ঘাম ঝরানো জৈবিক, হলদে তরকারির রসা
ভেতরে বুনো সঙ্গীত আছে, গিটারের ছররা
ছেচল্লিশ কিলোমিটার দূরে বসে আমি জম্পুইের লিঙ্গ নির্ধারণ করি
মনে হয় নারী হলে বেশি খুশি হতাম
নির্দ্বিধায় বাহুলগ্না হতাম, খুমপুই ফুলের সই আমরা,
ভাগ করে এসেছি হরিদ্রাভ আঙরাখা গত একশ বছর
কিন্তু পুরুষালি মেঘ এমনভাবে নেমে আসে চার্চের রাস্তায়
মনে হয় আর না গেলেও চলে সেখানে,
যদি হয় ভাইরাল ফিভার, জ্বরো বাতাস বেপরোয়া !
শুনেছি, জম্পুই হিলে এক সোনালি স্কার্টের মেয়ে ক্যাকটাসের বাগান করেছে,
সেখানেই উদ্ধত হচ্ছে নাকি পাহাড়ি পশম ...
ঐ ঠিকানাটাই শুধু আমার গোপন প্যাপিরাস, বাকি সব অলিগলি সহজ রহস্যে ভরা ...
জুলাই মাস
..........
জুলাই মাসের শহর, মন ভেঙে ডুবছে আজ,
উন্মুক্ত পায়ের মতো দুই রাস্তা, নদীর দিকে, দগদগে ঘা
ঝরে পড়ে আছে কৃষ্ণচূড়া থোকা থোকা
মুখ ঢেকে আছে শহর, খুুব কান্না পেয়েছে তার, ভীষণ কান্না
তিনটি মেয়ে গিয়েছে একটু আগে, জীবিত নয় মৃত ...
একদল লোক কাঁধে করে নিয়ে গেছে শ্মশানের দিকে
ফেরারি
..........
বহুকাল হলো আমার কোন ফেরা নেই
ফিরতে চাইছি,
ডানে সমুদ্র বাঁয়ে পাহাড়, ঝাউয়ের বসত
পদচিহ্ন নেই, আঙুলের নির্দেশনা নেই
অমাবস্যা জমেছে বালির শরীরে
হাত পা মুখ আর হৃদয় গুঁজে
আমি সকল " ফিরে আসা " হারিয়ে ফেলেছি
আমাকে কেউ গালি দাও
চিৎকার করে বলো, এদিকে পথ, এখানে অবসর
যাতে আমি খুলে ফেলতে পারি চিবুকের সকল দ্যোতনা
এই ফিরে আসার পর আমার মুখে শক্ত মাটি দিও,
প্রাসাদ উঠবে সেখানে,
আমি ফিরে এসেছি, থাকছো কিন্তু তুমিও,
আয়ুধহীন গৃহযূথ যেন মিশে যাচ্ছি শর্তহীন আত্মসমর্পণে।
যাত্রা
......
স্বনির্ভর।
ছোট দোকান ছিল মেয়েটির।
সেদিন দেখলাম শাঁখা সিঁদুর হঠাৎই !
হেসে বললাম, আরে! কবে, কোথায়?
বহুদিন আগে কচি ছাপ পেরিয়ে যাওয়া মুখে উত্তর এলো
"দশদা, কাঞ্চনপুর ",দোকান ছেড়ে দেবো
এই শহর থেকে চলে যাবো।
কেউ নেই এখানে ... মা.. বাবা,
আর ভাইয়েরা গনগনে ।
বললাম, "ভালো থেকো "
চোখ না উঠিয়ে হাসলো
সে হাসির, তিন চার রকম অর্থ হয়
এই হাসি মাঘের শীত মুঠোতে নিয়ে উষ্ণতা দিতে জানে
অথবা,
এই হাসি আমাদের মধ্যে চলতে থাকা অপপ্রচারিত উদাসীন হেমন্ত
দ্বৈত শীত
...............
আজকাল যখন আমি দুজন হই
একমাত্র তখনই লিখতে পারি
এভাবে ক্রমাগত আত্মপ্রতারক হয়ে যাচ্ছি
জল মেশাচ্ছি দুহাতে সব সন্ধিগভীরে
ফেনা লেগে থাকা দুহাতে আরেকজনকে ছুঁয়ে দেখি
তার চোখ নেই, বুকভরা খনি নেই, খননশিল্পী নেই
দুরন্ত সকাল.. লেখার অন্ধকার দেয় না, দেয় না সঘন কামপ্রভা
তাহলে সেই আরেকজন কে সে?
কেন তাঁর কাছে বন্ধক রেখেছি সুখের অসুস্থতা
আছি আছি নেই নেই, হাতে হাত রাখে কৃত্তিকা রোহিণী
খুব কাছে যেন অন্যমনস্ক কৃষ্ণদেহ, ক্ষতহীন, গোলাপি রক্ত
দাহ হয় অন্য কেউ কোথাও কোনখানে , আমি লিখি ধর্মান্তর, তরুণী শীত, রূপসী পাহাড় ।
পৌষ সংক্রান্তির সকালে
.......................
ট্রেনে যেতে যেতে মানুষের উঠোন দেখি
অস্থির এক নিমগাছ ফেলেছে ছায়া
ছায়াটুকু কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে তুলে রাখছে অবিবাহিতা মেয়েটি
তেতো লেগে আছে তার মুখে ও দেহে
মনে তার হিংসে খুব, মিথ্যেও বলতে পারে বেশ
শুধু ভালোবাসা পেলেই সে বদলে যাবে
পৌষের হিম তুলে নিয়ে আসবে মাঠ থেকে
জানলা খুলে পিঠে বানাতে বসবে,
ধিকি ধিকি রোদ ঢুকছে তখন আগুনের বেশে,
তার পাশে বসে খেয়ে নিচ্ছে নরম আঙুল
খোল করতাল বেজে উঠল অসময়ে
পরিচ্ছন্ন রাস্তায় পৌষ বিদায় নিল এইমাত্র...ই।
নিষাদের কাছাকাছি
.........
মৃত্যু আসার আগে
বলব আসতে, বলব দেখে যেতে হবে
ততদিনে হেরে গেছে যশইচ্ছা, কুটোকাটা মনখারাপ
নিঃশর্ত হয়েছি সব শর্তে
বৃষ্টির মতো নেমে আসা সেইসব লাইন
পুনর্লিখিত হোক, চুরি হোক খুব
গ্রীবার কাছ থেকে চুল সরিয়ে
লিখে ফেলুক অন্য কেউ
আত্মার আচ্ছন্নকাল দিয়ে দিতে চাই তাকে নির্জনে,
তেমন প্রসারিত হাতই খুঁজেছি জাঁহাপনা
আজানের সময় শুকতারাকে বিদেয় দিয়ে
ভোরের রঙে লোভ করেছি
আড়ম্বর দেখে সরেছে কলম,
নিষাদের মতো নিষ্ঠুর হয়েছে সে, ক্ষতের কাছে ফেলে গেছে তির ধনুক ...
ডোম
জ্যোৎস্নাবন্ধু দেবকান্ত, বি এস সি পাশ
ডোমের চাকরি পেয়েছে। অস্থায়ী। এপ্লিকেশন দিয়েছিল।
ইলেকট্রিক চুল্লি হলে আর ডোমেরও দরকার নেই
বিদ্যুৎ ছোবলে চিরবির করে জ্বলে যাবে দেহসৌধ প্রত্নময়
আপাতত জ্যোৎস্নাবন্ধু দেবকান্ত, কাঠ ঠেলে ঠেলে দেয়
মৃতদেহ পোড়া গন্ধ খুব প্রিয় তার
চর্বিসহ অম্লবিধুর শরীরের দহন দেখতে দেখতে
তার মধ্যে বায়োলজিক্যাল মিথোস্ক্রিয়া হয়,
সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ডোমের ডিগ্রীর নাম 'আগুন '...
বোধন
...........
কবি মারা গেছেন।
তিনি বেঁচে উঠছেন।
লোহা গলে গলে মিশে যাচ্ছে আগুনের সঙ্গে
একমুঠো শিশির এখনো তার হাতের মুঠোয়,
...বাস্প হচ্ছে না, প্রিয় মানুষের ছায়া নিয়ে
টলটল করছে ছেড়ে যাওয়া পৃথিবীর মুখ
একদিন সে ভালোবেসেছিল
একদিন সে অপমান সয়েছিল
একদিন সে চুপ হয়ে গিয়েছিল
তারপরও যেতে পারেনি, সরাতে পারেনি নিঃশ্বাস
কবি চলে যেতে যেতে না লেখা শ্রেষ্ঠ কবিতাটি
ছিঁড়ে ছিঁড়ে দিচ্ছেন তাকে
শীতের বনে তারা ছড়িয়ে পড়ছে ট্রাম লাইনের মতো,
আর বিকল হৃদযন্ত্র শেষবার চুমু খাবার লোভে
আটকে রাখছে ঘন বাতাস।
সকল ক্ষতিতে এসো
...........
চুলগুলো শনের মতো,
ছবির গায়ে শীত মেঘ , তুষারপাতের সম্ভাবনাও আছে
অথচ বিখ্যাত শিল্পী হাঁটুমুড়ে বসে, চোখ নামিয়ে
সাধারণ ছবি আঁকতে মন চায়
সন্ধ্যা নামের একটি নদী, সূর্য , বাঁশের ঘর, বেড়া, রাস্তা
তুলিতে কবেই হারিয়ে গেছে এইসব সাধারণীরা
ঘুরে ঘুরে বিমূর্ততা আসে
আলাদা আলাদা হয়ে ছড়িয়ে পরে কারোর শরীর
হৃদয় খুঁজে পাওয়া যায় না
ওটাকেই আঁকতে হবে, মনে হয় সব রঙ শেষ
এতো কথা বলতে বলতে তারা উবে গেছে
মনোরমের সমাবেশ কই, যক্ষিণী বলে " আমাকে আঁকো "
তাকেও তো রুক্ষ চুলের আবহে , গালে আদর করে, ঠোঁটে হিংস্রতা এঁকে প্রাণ দিতে হবে
আজ থেকে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত এই তবে অন্ধকার, এই তবে শেষ ছবি
ফিরে যেতে হবে, ফিরে যেতে হবে মূলে, সকল ক্ষতিতে
বাগানের সাদা গোলাপ নিয়ে একক মিছিল, শবের কাছে কোলাহলে
যাবতীয় পদচিহ্ন মুছে দিতে মেঘেরা এসো তখন মাটিতে,
প্রস্তাব ও প্রত্যাখ্যানচূর্ণের ধূপে বিদ্যুৎ স্পর্শ দিও ।
ইলিশ
রুপোলি ইলিশ এক মহালয়ার সকালে
একটুখানি রক্ত কানকো ছুঁয়ে ভাসছে
শরীর জোড়া পদ্মা, আর এক বুক মেঘনা ...চর্বি ও মাংসে
উঠোনে শিউলি পড়ে আছে,
তেলে ইলিশ কমলা আর লালে, বাইরে পাতলা কুয়াশা মরছে
অজস্র জল সাঁতরে, নদীর গভীরে চাঁদের ভেঙে পড়া দেখতে দেখতে,
কত নিমগ্ন অভিসার হয়েছে, আঁশ ছোঁয়া কথোপকথন
ঝাঁকে ঝাঁকে জালে উঠেছিল তারা, মৃত্যুও তৎক্ষণাৎ
রাঁধুনি ভাজছে, মনে মনে ভাবছে সে একজন যমদূতি
নরকের কড়াইতে নাকি পাপীদের এরকম সাজা হয় !
কি পাপ করেছিল এই মাছ তবে?
গভীর জলে ছিল ডুবে যাওয়া জাহাজ, ভাঙা মাস্তুল
সেখানেই খেলেছে তারা শৈশব,
মাছেদের ঘরবাড়ি। শৈবাল ও ঝিনুকে জড়িয়ে। ভালোবেসে।
মাছেদের বহুগামী ভালোবাসা পাপ হয়ে উঠে এসেছে
মানুষের ঘরে, এইসব গৃহরচিত দিনে।
ট্র্যাপিজের মেয়ে
..............
ট্র্যাপিজের খেলায়
মেয়েটি ঠিক যে মুহূর্তে শূন্যে ভাসছিল
নীচে ঠিক তখুনি অগুনতি নক্ষত্র, বৃষ্টি মেঘ।
বেঁচে থাকার যাবতীয় হাততালি জড়ো করে, একটি নির্লিপ্ত হাসি
দুহাত বাড়িয়ে দেয় সঙ্গী যুবক
দড়ির ওঠানামায় গাঢ়তম জীবন
মধু, মাংস আর ভাতের চকিত বিস্ময়
কোনোদিন হাত ছেড়ে দিও বন্ধু
নীচের অবারিত জীবনে পিচ্ছিল হয়ে উড়বো আমি
নেশার মতো হাসি ঢাকতে থাকে মেয়েটিকে
গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সাহসী স্বেদ
...সবুজ আলো আর হাততালিতে
শীতের সকালে কুয়াশার দড়ি বেয়ে এভাবেই
হেঁটে যায় পৃথিবীর শুদ্ধতম তরুণীরা ...
জলমাটি
মনে হলো চার লাইন লিখি
দেখি বৃষ্টিতে চুপসে গেছে দারি, কমা
বিরতি মুহূর্ত খুঁজতে গিয়ে আমি কোন হ্রদের ধারে এসে পৌঁছেছি
এক চা ওয়ালা হাত বাড়িয়ে এক গ্লাস দিল, ধূসর গরম ভাঁপ
দেশি হ্রদ, পাটগাছে ভরে আছে জল জল মাটি
দু কথা ভেবেছি মাত্র, কালো মেঘ থরথর
চারপাশের গ্রাম থেকে চলে যাচ্ছে সেই " নব বিবাহিতা "
আশ্চর্য !
নৌকো করে আজও কত পারাপার হয় অনিচ্ছুক জনপদে,
ছইয়ের ভেতর থেকে একটু হলুদ লাল আঁচল জলদস্যুর মতো বেপরোয়া চাহনি দেয় ...
গুলবাহার
..........
একটা কার্পেট কেনা হলো আজ সকালে, হঠাৎই !
নীল হলুদ রঙ, ডিপ ব্রাউন কারুকার্য অনেকটা ঠিক অভিমানী মানুষের মতো ।
দীর্ঘকায় লোকটি নিয়ে এসেছিল, গলার স্বর খুব ভারী,
আমি মনে মনে বলি ' কাশ্মীর ... কাশ্মীর '
বাড়ি তার বানিহালের কাছে, লাল সূর্য গলছে যেখানে
যাবার সময় হেসেছে সে, সাদা কালো দাড়ির ফাঁকে
একটি ঠিকানাও দিয়েছে, বলেছে যেতে
তিন সারি রেইনট্রি, দুখানা আপেল বাগান
তারপরই রোজউড কাঠের ঘর তার, ঠিক চিনে নেওয়া যায়
যদি থাকে ইচ্ছা, খুবসুরত দিল ওউর শান্ত নিগাহ্
কার্পেটটি পেতেছি বিকেলে
তখন থেকে বরফ পড়ছে ঘরে
সার সার গ্রাম, দূরে দূরে সেনা কনভয় যাচ্ছে যাচ্ছে আর যাচ্ছে
অনেক খানি সময় নিয়ে নিয়ে ফিরে ফিরে আসে গুলির শব্দ
কত দূরে যুদ্ধ হচ্ছে, জানি না ঠিক কতই বা রাত এখন !
আমরা তো চিরকাল নিঃশব্দ।
দু পা হাঁটি, কার্পেটের শরীরে শরীরে
মনে হলো ডাললেক চুপ করে আছে এ সিজনে
জাফরান ফুলগুলো সাবধানে মাথা তুলছে ... তুলতে হয়
না হলে কাঁদে জাফরানচাষীর মেয়ে
রোজিনা নাম তার, গরমকাল এলেই নিকাহ্
ভিনদেশি জওয়ান, তাকেই পছন্দ অবশেষে স্নিগ্ধ রোদের দিনে
এতো যুদ্ধময়, এতো বারুদক্লান্ত ভূমি
এতো যে ফোটে টিউলিপ, এতো কান্না তার,
সবকিছু কন্ঠে নিয়ে,
কাশ্মীরী কবি কবিতা পড়তে এসেছে দিল্লি
বলেছে সে দেশকে ভালোবাসি,
বলেছে সে কাশ্মীরে গরীব খুব
পর্যটক কাবাব খেলে, তাদের খুশি হয়
বাড়িতে আমাদের শাক আর মোটা রুটি,
অল্পস্বল্প প্যায়ার এরমধ্যেই গুটিশুটি।
আর জানালায় ক্ষুধা নিয়ে চেয়ে থাকা বহুদশকের ক্ষিপ্র রাত, এই তো মোটামুটি।
অথচ জানো কি?
মরে যাচ্ছে শালের দোকান, ক্ষীণ সূচ ফুল তুলতে পারে না আর।
নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে শিকারা ঘর, একা একা নির্জনে মাউথ অর্গান বাজাচ্ছে গাইড,
পৃথিবীর মানুষেরা এসো,
এই গুলবাহার, গুলচিস্তান খুঁশিয়ো কা ভিখ্ মাঙতে আয়ে হে সঁদিও সে।
পড়তে পড়তে কাশ্মীরী কবি কেঁদে ফেলে
ভুলে যায় হলঘর, হাসিন রাত, আর মেহমান
ফিসফিস করে বলে,
তোমাদের শহর এতো শান্ত কেন?
গুমগুম করে বলে,
তোমাদের স্কুল কি বন্ধ হয় না যুদ্ধের জন্য?
হিস হিস করে বলে,
তোমাদের বিবাহমাস মুবারক !
হামকো ভি জন্নত দিলাও !
এক খিলতি হুঁয়ি শ্যাম, এক গভীর ঘুমে শুয়ে থাকা রাত ।
পেরিয়ে এসেছি কার্পেটের শরীর, ভয়ে ভয়ে,
কী জানি কী হয়, যদি কাশ্মীর এসে যায় আমার ঘরে !
মার্জিনের বাইরে এসে দেখছি দূর থেকে, নিরাপদে,
'কাশ্মীর... কাশ্মীর '।
আছি
.........
আজ কত তারিখ?
রঙখেলা নাকি, চৈত্রমাস ! দোলপুজো?
শুনেছি আবির শেষ হয়ে গেছে দোকানে দোকানে
কাল রাতেই কিনে নিয়ে গেছে রাজনীতির লোকেরা
কিছু কিশোর কিশোরী মুখে নেশার গন্ধ নিয়ে
চষে ফেলছে শহরের মাতাল বাতাস, মনে প্রেম নেই, কেমন হিংস্রতা জেগে উঠেছে তাদের শরীরে।
এদিকে নহবত বসিয়েছে কোকিলের দল,
আমের মুকুল, লেবুর ফুল হারিয়ে দিচ্ছে মনখারাপের গন্ধ,
এতো জোড়ে মাইক বাজছিল সরস্বতী পুজোয় ফেব্রুয়ারি মাসে !
পুজোর বেদীতে কেঁপে উঠছিল কলমের হৃদয় , ভীতু ভীতু কালির বিন্দু,
এইসব রঙখেলা, সরস্বতী পুজো, ভালোবাসার দিন সব মিলেমিশে আমি তোমাকে ভাবি ...
অবয়ব নয়, হৃদয় নয়,
আমার বেঁচে থাকার মুদিখানায় ভীষণ অনিবার্য, দুজন পাশাপাশি আছি, চলে যাচ্ছে, এই ভাবনাটুকু।
কন্ঠীবদল
.............
শ্যামলীরাই বোষ্টমী। জেলা উত্তর ত্রিপুরা। গ্রাম "পলাশকুঞ্জ "।
সাড়ে কুড়ি বছরে কন্ঠীবদল।
তখন ফাগুনমাস। বেহায়া বাতাস। দুজোড়া ধুতি চাদর।
পলাশফুল পড়ে পড়ে পিছল হয়ে থাকে আখড়ার প্রাঙ্গন।
তিলক মুছে তিনবার মাছ খাওয়া হয়েছে।
দুবার মুরগীর ঝোল। তিনখানা হিন্দি ফিল্ম। নাচ গান।
এটুকুই অবৈধ বসন্ত। বাকি সব কীর্তন। সপ্তমীর জ্যোৎস্না।
শিউলি, কাঞ্চন, রঙহীন জবা তুলে তুলে নারায়ণের চরণে।
দোলের দিন সবুজ রঙ, গোলাপি আবির, সঙ্গীর পুরাতন মুখে
ভিক্ষাকষ্ট শুধু।
পুন্যের মাস। কার্তিকের কুয়াশা মেখে মেখে শহরের অলিগলি ঘোরা হয়।
একজন মরল, দ্বিতীয়জনের লগে কন্ঠীবদল।
শ্যামলীরাই হাসে না। নামগান করে।
তৃতীয়জন এলেই বা কী। বয়স তার এখন সাঁইত্রিশ।
ভরা হাতে মাছ কাটতে ইচ্ছা হয়। রক্ত ধুয়ে তেলে হলুদে জমিয়ে গন্ধ ছাড়তে ইচ্ছা হয়।
না হয় সন্ধ্যাবেলা একটু তুলসীতলা। বাকি মাছভাত আর রমণ।
সে হবার জো নেই।
অথচ ভক্তি নেই।
ঘোর সংসার বুকের ভেতর।
ঘরবাড়ি উঠোন চুলা আর পুকুরঘাট সমেত।
গাছভর্তি আমের বোল। কষা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে ফাগুন চৈত্র মাসে, আর পুকুরের জলে গা ধুতে ধুতে লাক্স সাবানের ফেনায় ফেনায় ধুয়ে যাচ্ছে বোষ্টমী রঙ।
তিলকের মারপ্যাঁচ, তুলসীমালার বৈরাগ্য।
ট্রেনে কইরা আসাম যাওয়ার সময় দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা।
ভরা যৌবন।
বিবাহের রঙ নাই কপালে। কিন্তু বোঝা যায় মাংস ছুঁয়েছে তারা। কই কন্ঠীবদল তো হয় নাই।
জীবন্ত স্বাধীন। শ্যামলীরাই কীর্তনের সুর তোলে। দশটাকা, দশটাকা দেয় দুজনে।
কয় আশীর্বাদ করো যেন আজ রোজগার হয়, আমরাও বোষ্টমী, ঘর আছে, ঘর নাই। বাইরে বেরুলেই টাকা।
বাড়ি ফিরলে জিগায় টাকা আনছো নি?
তবুও তোমাদের তো ভণিতা নাই, শ্যামলীরাই তর্ক করে।
হি হি ! ভণিতা ! ছুরির মতো হাসি। নাহ্ ভণিতা নাই, রঙখেলার দিন কৃষ্ণ আসে খেলতে।
তার চোখে দেখা যায় এই বসন্তকাল।
গোপী মেয়েদের ব্যথা।
কত কত রঙ নিয়ে আমরা পদাবলী লিখে যাই।
`মানুষ ভুল করে ভাবে ধর্মের গান, অথচ এসব
আসলে নাড়ি ছেঁড়া অশৌচ কাল।
বসন্ত এলো বলে
ফুলকপির কেজি কুড়িটাকা, বাঁধাকপি দশটাকা।
আরো কুড়ি বছর পর কেউ যদি এই লেখাটি পড়েন,
দামটা আরো একটু বাড়িয়ে দেবেন অনুগ্রহ করে।
এইভাবে ফাল্গুনমাস প্রবেশ করে কৃষকের ঘরে
শিশির তখন ঝরে যাচ্ছে অভিমানের মতো
বসন্তকাল তাই শুধু কৃষকবধূর ভাঙা নথ, ধূসর স্বপ্ন।
এইসময় বিবাহের চিঠি এলে মনখারাপ হয়
সানাই বাজলে, মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিষাদ
বসন্তের দুহাতে কে যেন দিয়ে গেছে শুধু বিদায়ের অভিশাপ
তার সারা শরীরে পলাশের জমাট বাঁধা কালো রক্ত
প্রেম চলে গেলে মানুষ যেমন ম্লান হয়ে যায়
বসন্ত সেই হেরে যাওয়া বিরহী প্রেমিক,
গাঢ় ধুলো যার শরীরে সহস্র শতাব্দী ধরে
মিথ্যে বললাম বোধহয়, বসন্ত এলে মনে হয়,
পৃথিবী কোথায় লুকিয়ে রাখে তার বিচ্ছেদ,
আজন্ম আনন্দ কেনো এই ঋতুর দোহারে,
অবিরাম পরাগসংযোগে তার ক্লান্তি নেই
মৃতশরীরের রন্ধ্র থেকে বেজে ওঠে পৃথিবীর সুর ,
শুকনো পাতা ঝরে পরে মাটির দুরন্ত আলিঙ্গনে
বসন্ত এলো ...তাই তোমার পুরনো চোখে হারিয়ে গেছে
আমার পুরনো চোখ।
ভারবাহী
......
রাজিয়া সুলতানা , নূরজাহান, লক্ষ্মীবাঈ, আরোও কত সম্রাজ্ঞীরা
আছেন, যুদ্ধে ও শাসনে, তখনও এবং এই সায়াহ্নেও
উড়ছে আতর, রঙের গুঁড়ো তাদের প্রাসাদে
ভগ্নপ্রায় আলোর তলায় আমার কৌতুক রাখি
সেইসব স্তিমিত অধরগুচ্ছে যেন বিদ্যুৎ চমকালো
প্রত্যেকেই ক্ষমতায়নের পর ভালোবাসার অপেক্ষায় বসে আছে
মুজিবকে বাদশাহি গোলাপ
....................
একটি স্বাধীন হওয়া দেশ কে আবার জেগে উঠতে হলে, স্বপ্ন বদলাতে হয়।
হে মুজিব ...
আপনার মতো সরল স্বপ্ন দেখা,
আমরা বাংলাদেশের যুবক রা ছেড়ে দিয়েছি।
মুক্তিযুদ্ধের নামে আমরা দিন দিন পরাধীন হয়ে যাচ্ছিলাম
তাঁহাদের কথা, তাঁহাদের গান, তাঁহাদের স্মারকগ্রন্থ
একটি একা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আজকাল যুবকেরা ঘুমোয়
তাদের বুকের মাঝে একটি বাংলাদেশ, ভারতসীমান্ত আর কিছু বিদ্বেষ।
তথাপি মধ্যাহ্নে ভারতীয় যুবকের সঙ্গে দেখা হয়
দুজনের করমর্দন হয়, তারা রকেট বানায়, নতুন গ্রহে যায়,
যেখানে বেকারত্ব নাই ...বাদশাহি গোলাপের বিলাসিতা আছে।
২৯/০৬/২০২০, সোমবার, রাত ৯: ৪৫
ভালোবাসার বাড়িতে
.......
ভালোবাসা খুব একা হয়,
যারা ভালোবাসা ভেবে গোলাপ দিচ্ছে
তারা এখনো জানে না, গোলাপের নীচে নীরবতার সাম্রাজ্য
আগামীতে তারা একা হেঁটে যাবে বলে
তৈরি হচ্ছে শহর, পার্ক, ফুলের দোকান
এ পথে আমি যখন যাবো, তখন তুমি হেলায় ওড়াচ্ছ স্মৃতি
শীতের ধুলোলাগা পাতার মতো সেসব স্মৃতিস্মারক আমার অসুস্থতা,
তবুও আমি এখন খুব নিশ্চিন্ত,
হারিয়ে ফেলার পর আর ভালোবাসা হারানোর ভয় থাকে না
আমরা আর একে অপরকে দিব্যি দিই না
আমাদের কল্পনার বাতাসবাড়িতে
এখন অজস্র দোয়েলপাখির মেলা বসেছে, গানের জলসা
গোলকধাঁধায় পড়ে, সেই বাড়ি ছেড়ে এসেছি দুজনেই
তাতে হিমেল বাতাস বইছে , রোদের আহ্লাদ
তুমি বন্ধুর কাছে গল্প করছো, প্রেম হলো 'ন্যাকামো '
তাই এসবে হাসি পায়, তার চাইতে অনেক ভালো আছো এখন।
আমি বন্ধুর কাছে গল্প করছি, ভালোবাসা বলে কিছু হয় না
পুরোটাই ' ইগোসেন্টার্ড '।
আসলে ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাচ্ছি দুজনে
সেই ভাঙন ঢাকতে, আমরা আত্মহত্যার ঘটনাকে হেরে যাওয়ার গল্প বলে ঘেন্না করি,
পৃথিবীতে কেউ চলে গেলে, তাকে ছাড়াও আছে বেঁচে থাকার অজস্র জলঠিকানা,
একথা আমি কোথায় যেন এইমাত্র বলে এলাম উল্লাসে।
আমাকে ঢাকতে আমি উজ্জ্বল পোশাক পরছি
তোমাকে বিস্মৃত হতে ভ্রমণে যাচ্ছি পাহাড়ে সমুদ্রে
আমার আংটির নীলাভ পাথর থেকে গড়িয়ে যাচ্ছে তোমার রঙ
তাতে চুম্বন নেই, শ্রাবণ নেই, নেই চোখের ওপর চোখ রাখার অমোঘ তুর্যনাদ
কিন্তু গোপনে খোঁজ রাখছি তোমার
তোমার দেহে কী তেমনি ধাতব ঔজ্জ্বল্য
চশমার পাওয়ার বেড়ে, চোখ হয়েছে আরোও আবেদনময়
কারা কারা তোমার জন্য মুগ্ধ হয়? সেইসব শুকনো নদীতে কী তবে আমার ছেড়ে আসা জোয়ার?
একসময় আমরা ক্লান্ত হই
প্রতিটি দিনের মধ্যে যে গভীর একটি দিন আছে, সেখানে এসে দাঁড়াই।
কোথাও কেউ নেই, আমাদের ছেড়ে চলে গেছে পৃথিবী।
আমরা মৌন বিষাদের মতো নিজেদের গিলছি
অথচ আমাদের বাতাসবাড়িতে ভালোবাসার উৎসব হচ্ছে ...
সেখানে তোমার ও আমার নামে আসেনি কোনো আমন্ত্রণ।
অকিঞ্চিৎকর
..........
আমাদের কথাবার্তা রইল এখানেই
কাগজকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার এইসব দুঃসময়ে
তারা আর বই হবে না
শুধু আমরা চলে গেলে,
আলতো করে উঠিয়ে নিয়ে যাবে কোনো লোক এই সমস্ত অতীত,
হয়তো "নিন্দে" হবে, হয়তো নিতান্তই " অকিঞ্চিৎ "
তবু তারা বই হবে না, বৃক্ষের ছালে আমরা কোনকালেই কিছু লিখবো না
এইটুকু প্রতিশ্রুতি, বাকিটা মহামান্য সরকার জানে।
পেট্রোল
ছোট শহরের ছোটখাটো কবিতা পাঠের আসর শেষ হয়,
মনে হল আমার জন্যেই দাঁড়িয়ে তারা
দুইটি তরুণ... 'যুবক' হবে বলে ' অপেক্ষা'
রেখেছে যেন রোমশ সন্ধিতে,
আমি দাঁড়ালাম,
রুক্ষ পাহাড়ের প্রতিধ্বনি তরুণের গলায়
"আপনাকে শুনবো বলে শেষ পর্যন্ত বসেছিলাম "
ফিরছি, পথের ধুলোর কাছে খুব কষ্টে অহংকারটুকু দিয়ে দিলাম
ডেনিমের শার্ট আর ছেঁড়া জিনসের ফাঁক দিয়ে
বেড়িয়ে আছে সাদা সাদা প্রজাপতির পাখা
পেট্রোলের দাম শুধু বাড়ছে জেনেও
এই সব দেবদূতেরা গন্তব্যহীন ভেজা রাস্তায় বাইক
নিয়ে হারিয়ে যায় যখন তখন ...
দ্বাদশশ্রেণী
..................
জয়েন্টর রেজাল্ট বেরুলে
কিছু তরুণের মাথা ঝুঁকে যায়
ঘর অন্ধকার করে তাদের বাবারা বসে থাকে
বিপর্যস্ত মার্কশীট অজস্র রিংকলস্ এঁকে দেয় মার চোখে একরাতেই
ছেলেটি কিন্তু জানতো কেমিস্ট্রি তার নয়, সে তো
অন্য ফুলের মালী
কিংবা ফিজিক্স, তার কাছে রেখে গেছে মৃত পাখির শব
ম্যাথমেটিক্স ডুবিয়েছে তাকে, আসলে বাজতে চেয়েছিলো অন্য সেতার হৃদয় কেটে
এই তরুণেরা অসময়ে নির্ভুল ভালোবেসেছিল কাউকে
হারিয়েছে সময় বাই সাইকেলে আর খাতার পেছনে,
দ্বাদশশ্রেণী বড়ো ভুল করে, প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে আনমনে শুধু অ্যাসিড ঢালে ...
কেয়া দিদিমণি তুমি সবুজ শাড়ি আর পরে এসো না।
দোলযাত্রা
দোলযাত্রায় বসন্ত নিয়ে আসে রাত নাম্নী মেয়েকে
দিনশেষে রাত একটু বিশ্রাম, বিনিময় ভালোবাসার
দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে চায়ের দোকানি উনুনে জ্বেলেছে ঘুমহীন রাত
অন্ধকার সরে গেলে পাতলা কুয়াশায় দুধ গুলবে, গোলাপি দিন
মিছিল শেষ করে যুবকেরা ফিরে গেছে, হাত ভর্তি গুলাল
রাতের আড়ালে তারা হাতে তোলেনি নেশার গ্লাস,
কৃষকের প্রলাপ আর অম্লজল জমা করেছে বুকে
জন্ম নিচ্ছে শরীরে তাদের দূরাগত খারিফ শস্যের খেত ,
খেলার মাঠ থেকে পকেটভর্তি ধুলো নিয়ে বাড়ি গেছে এক তরুণ,
কাল আবির মিশবে ধুলোতে,
ঘামে চিনে নেবে তাকে একান্ত তরুণী...এই বিশ্বাস তার
গভীরে ভিজবো বলে,
মৃত মানুষদের দাঁড়াতে বলেছি স্নানঘরের দরজায়
আমার আসতে একটু দেরি, দুপুরের রোদ এইমাত্র দিয়ে গেলো দুধওয়ালা
পুড়ছে ভেতরে কিছু , রক্তহীন ঠোঁট,
দৈন্য ধুতে দীর্ঘ স্নান হবে ...দীর্ঘতম জলপ্রপাত
আমি কী চিনেছি রঙ, চিনেছি রঙের তফাৎ, মিশ্রণের অসহায়তা
বন নেই বলে হৃদয়ে, কাঠুরিয়া হেঁটে গেছে, সৈকতে ধূপের গাছ
শর্ত রেখেছি বসন্তে
পলাশ একটি রাজনৈতিক ফুল ,
পলাশ ফুটলে মনে হয় গনতান্ত্রিক এই দেশ।
পলাশ ফুটলে মনে হয়,
আমিও চিৎকার করি, স্লোগান বলা শিখি
পলাশের সঙ্গে মিশে যায় মিছিলের রুক্ষ পথ
তোমার গলায় আজ নকল পলাশের মালা ,
অথচ তুমি কোনোদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে !
আরে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি নয়,
অথবা প্রেম ট্রেম, চুমু টুমু
প্রতিশ্রুতি মানে আমার সকল মৌলিক অধিকার,
তুমি বা তোমরা, কে হও আসলে জানি না
শুধু জানি, প্রতিশ্রুতি মানে, আমার দেশকে ভালো রাখা ।
দীপা...দ্য অলিম্পিয়ান
.............................
দীপা... একটি গভীর আশার নাম
নাগেশ্বর ফুলের গন্ধে ডুবিয়ে রাখা শস্যনীড়
প্রদুনোভা ভল্টে হয়ত ঝলসাবে স্বর্ণশোভা হয়তো বা না
থাকবে একটি অক্লান্ত পেরিয়ে যাওয়া
থাকবে স্রোতের মুখে জ্বালিয়ে রাখা সবুজাভ আগুন
সেখানে পা রাখবে কচি গাছের দল
একটি পদক, স্বার্থপরের মতো চাওয়া,
ঘাম জেদে মাখামাখি, এখানে নেই ধাতবস্পর্শ
জেগে জেগে ওঠে শেষপর্যন্ত শুধু একটি মেয়েরই ঘুমহীন রাত
পদকের পথে গড়িয়ে পড়েছে কত অপমানের অভিধান
বিলিয়ন ভারতের চোখে মরুজ্যোস্না
উত্তরপূর্ব ভারতের এই একফোঁটা বৃষ্টি ঝরবে কি?
দীপা ...যদি না ওড়ে ত্রিবর্ণ রঙীন ,
যদি না বাজে সিন্ধুসঙ্গীত...রিও র আকাশে
আমরা শুধু জানবো,
তুমি সেদিন ঝরেছিলে সবটুকু দিয়ে।
( রচনাকাল -- 6/12/2016)
কাল্পনিক
ইংরেজী সে জানে ভালো
তুখোড় একদম, যেন সহজাত
শুধু কাঁদতে এলেই, বাংলায় কাঁদে
আমাকে সে বাংলায় ভালোবাসে
হিন্দিতে তার খিস্তি খুব
শুধু অভিমান হলে নীচের দিকে চোখ
আমাকে দেয় হলদেটে লাইন
ঋতুময় বিষাদ আর শান্ত চোখ
তার সঙ্গে সংঘাত হয়, ইংরেজিতে গালি,
তারপরই মুখ চেপে ধরা আর নীলচে জামদানি,
চোরাগলিতে ঢুকে পড়ে রাঙা ধুলো বালি
আমরা বাংলায় মুছে দিই আমাদের জেদ
ঘনিয়ে আসে বিকেলবেলা, গোধূলির ছাই
তার সঙ্গে পাগলামো হয়, বিষাক্ত শর্তাবলী
সবকিছুই লেখা হয় যেন অন্য ভাষায়
যে ভাষায় তাকে চিনি না আমি
তারপর জল কাদায় মাখামাখি
বাজে বর্ষা, গরম, মশা মাছি
পলাশের মতো আলো জ্বলে ওঠে
বাংলায় আলপনা দিতে বসি,
ঠারেঠোরে অপরাধ ভুলি
জানান দিই আমি তাকে
বাংলায় ভালোবাসি, বাংলাতেই এই মাখামাখি।
ঝুলন পূর্ণিমা
...............
এই দেখো কেমন আঘাত?
আমরা তো নিতেই পারি আঘাত।
এই দেখো কেমন শোক?
আমরা তো নিতেই পারি ছিন্ন বিজুরি,
ঘোর যামিনী, নিশীথ নূপুর, কালো ওড়নি
চলে এসো সখী, বিরহ মন্দ্রিত হোক ধীরে
তারপরে চলে যাবো গেহে, সম্ভ্রান্ত শয়নে
এ উচ্ছলতা ছাড়া সবই পবিত্র আছে, ছুঁয়ে দেখেছি নিজেকে
রবিপ্রণাম
............
আমি ফিরে আসি প্রতিদিন তাঁর কাছে
যাবতীয় ভুল, অপমানসূত্রতা কাঁধে নিয়ে
সায়াহ্নে রূপসাগরের জল ছুৃঁয়েছে ব্যর্থতা
যেন কিছু নয়, যেন কিছু নয়, যেন আকাশ আমার বিষয় নয়
রৌদ্র, শুষ্কপত্ররাজি ক্লান্ত বাতাস কোনটাই আমার ভাষ্য নয়,
কোথাও জমছে খনি, জমছে বারুদ, তৈরি হচ্ছে বিরুদ্ধ প্রাচীর
আমি কী তবে লিখবো বাতিল অসহায়তা
কোথা থেকে আনবো ঈশ্বর, চোখের জল, সুরাসুর সমাগম
এই যে লিখি অন্ধকারের সমাপতন
লিখতে লিখতে বার বার বদলে যাই
তোমাকে দেখি রবি... রবিকে দেখি
দীর্ঘ, দীর্ঘতর, ঋষির মতো, বিনয়ের মতো, ঔদ্ধত্যের মতো
যেন রেখেছো হাত আমার সকল তুচ্ছতায়
তব প্রাণে মিশে যেতে যেতে ভাবি
অক্ষরে অক্ষরে ফুলশোভিত যুদ্ধক্ষেত্র, দৃপ্ত আলিঙ্গন, ঝড়ের জানালা সব রেখে গেছো
এখানেই দুটো ভাত বেড়ে খাই, একমুঠো বৃক্ষ জ্বলে, এক সহস্র জলে আমার ধৃষ্টতা মাথা নত করে থাকে।
অসমাপ্ত মেয়েটি
ঠিকঠাক সংসারী হওয়া গেলো না
মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাই করার অক্ষমতা জন্মগত দূর্বলতা
গ্রীষ্মের কাঁচাফলে হলুদ লবন লাগিয়ে সঠিক রোদে মাপতে পারি না
খুব গরমের নেশাগ্রস্ত দুপুরে প্রায় বিলুপ্ত ঘুঘু পাখির অপেক্ষা করি
এই পাখিটির ডাক নষ্টালজিক কৈশোরের মতো,
আজীবন পুরনোকেই সুন্দর বলে, যেন আমি রুদ্ধদুয়ার নবাবের মেয়ে
এ পাড়ার ক্ষণজন্মা বউটিকে ভুলতে পারি না,
আমাদের গায়ে কি এখন সে গুল্মলতা হবে!
মেখে নেবে অসমাপ্ত, হাবিজাবি সাংসারিক পথ্য, ফাঁক
দিয়ে গলে পড়া ঝুলনের জ্যোৎস্না ...
হেমন্তের পাখি
..............
বিবাহের চিঠিরা একটি একটি হেমন্তের পাখি
শীতের বেলায় তারা নাম ও গোত্রের বাহক
গৃহস্থের ঘরে নিয়ে আসে আমৃত্যু নিমন্ত্রণের সম্ভাবনা
এ পথে কিছু ভুল লেখা থাকে সোনালি অক্ষরে
সামুদ্রিক সানাই যেন আনমনে ফেলে গেছে
অচেনা উদ্ভিদের বীজ,
উচ্ছ্বাস আছে বটে চিঠিতে, মাঘের বৃষ্টি, খনার বচন
আর হিম কেটে নিয়ে আসা একটুখানি যৌথ অরণ্য।
বিকেলবেলায় অজস্র পাখির কিচিরমিচির শুনেছিলাম
রেকর্ড করিনি, ছবি তুলিনি, তাই বোধহয় এখনও কানে বাজছে
'হেমন্তগোধূলিবিহঙ্গ ',অবাক হয়ো না ...
লাভা
যে মেয়েটির সঙ্গে আমার বেশ ভাব, নামটাও ঠিক জানি না তার। পান খায় খুব।
ব্রাউন রঙের লিপস্টিক লাগায়, একটু ধেবড়ে থাকে।
চুল সামান্য একটু কোঁকড়ানো, ঘড়ি পরে, গোল্ডেন চেন।
খসখসে আঙুল, রঙ লাগানো নখ, দ্রুত ফলস লাগায় আমার শাড়ির।
নাম দিয়েছি তার দ্রাঘিমা, বিয়ে করেনি বা হয়নি।
চালাক। বুদ্ধি খুব ।
তাকে আমি পছন্দ করি না ।
কিন্তু ভাব আছে, কথাও বলি না, কিন্তু ভাব আছে।
কারণ, ওর ভেতর জমে আছে স্বর্ণাভ লাভা ,
আগ্নেয়গিরিটিও চেনা আমার, একই লাভায় হাত দিই,
সুপ্ত, কী ভীষণ ভয়ঙ্কর এই নীরবতা !
মেয়েটিকে আমি পছন্দ করি না।
যদিও তার সঙ্গে খুব আধাআধি আমার।
আগ্নেয়গিরি দিয়েই আমাদের পরিচয় আর সর্বশান্ত হওয়া।
প্লাবন, ২০১৮
কাঁচির মতো চাঁদ যেদিন উঠবে বলে নিশ্চিত ছিল আকাশ,
সেদিন কোন কারণে তা ওঠেনি
প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং মেঘপ্রবাহে
কেরালায় শুরু হলো বন্যা, অসীম তার শক্তি, ভগবানকে খুন করে দেয়ার ক্ষমতা
তবুও তার পরের দিন ঝকঝকে ধারালো
একটি বাঁকানো চাঁদ উঠেছিল পশ্চিমঘাট পর্বতমালার আকাশে
তাই দেখে ইমাম ঘোষণা দিলেন আজ 'ঈদ '
এবং জলমগ্ন সেদিন মসজিদ।
মন্দিরপ্রাঙ্গনটি একটু উঁচু হওয়ায়, হিন্দুরা বলল
আজ এখানেই তবে হোক "ঈদের নামাজ "
এমন ভালো নিউজ হেডলাইন পেয়ে,
তরুণী সাংবাদিক বন্যার ভুল খবর পড়তে থাকে বার বার।
তরুণ আবহাওয়াবিদ দেয় ক্রমাগত নিম্নচাপের ভুল সংবাদ
দুজনেরই চাকরি গেছে আজ ...তা যাক্
তাঁরা এখন দুরন্ত বাজ, ভারত মহাসাগরের তীরে ঝড় গিলে খায় ...
কাঠের গোলাপ
লক্ষ্মী ছড়ার ব্রিজ থেকে কাল রাতে কেউ ঝাঁপ দিয়েছিল,
নীচে পড়েনি,
দুজন পরী কাছেই ছিল, একা অভিসারে
যুবকের দুপাশে জুড়ে দিলো ডানা, নাম বদলে গেলো তার মেঘের নিয়মে।
এখন সে সূর্যকেতু গন্ধর্ব
যে দু একজন মদখোর এই দৃশ্য দেখেছিল
তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি
পালকের মতো শরীর নিয়ে সূর্যকেতু উড়ে বেড়ায়
চাকরির আর দরকার নেই তার
আকাশ থেকে নক্ষত্রের জল পান করে, পরীদের হাত থেকে ফুলের পাপড়ি খায়
কিন্তু কারো গলার স্বর শুনতে পায় না , নেশাগ্রস্তদের একান্ত সুর, অথচ যুবকটি ছিল সঙ্গীতপ্রিয় ।
কোন চাহিদা নেই এখন, শুধু একদিন শুনতে চায় শেষবারের মতো... মরু বেহাগ...ওস্তাদ রশিদ খান।
তারপর উড়বে না, ডানা ভেঙে দেবে , মরবে, যাতে দেহ ভেসে ওঠে আষাঢ়ের জলে
মর্গে তার মৃতদেহ সনাক্ত করতে আসবে বন্ধুর ছেড়ে দেওয়া প্রেমিকা , মেয়েটি প্রিয় ছিল তাঁর, তিন পূর্ণ চাঁদ আগে।
অথচ দেখো সুগন্ধা কাঠগোলাপ ফুল এনেছে এখন... কেমন শোকহীন চোখে ?
খুব বেশি দেরি হয়ে গেলো নাতো আরেক বার বাঁচার কাছ থেকে ফিরে আসতে !
মায়াবী রাস
নেমেছে দুপুর, আজ জন্মাষ্টমীর পর চতুর্থ দিন
রাস্তা শুনশান, নির্মোহ ক্ষয়িত ভাদ্র
একটু আগে এ পথে হেঁটে গেছেন মদনমোহন
কোনো কোনো জানালায় ছেয়ে আছে বিষণ্ণমুখ, দিব্য দৃষ্টি হেনেছেন তিনি বেশ
অথচ নতুন সময়ের মেয়েরা বিষাদ দিয়ে বাঁশি চায় না,
চায় অন্যকিছু এ পৃথিবীর থেকে, এই জন্ম থেকে, এ শয্যা এবং বাকি সবকিছু থেকে
তাই কেবল অসুখ আর অসুখ
চিৎকার করে করে আমরা সমস্ত অসুস্থতা নিজেদের করে নিচ্ছি ...
কিন্তু কিছু ঝরে সত্যি সত্যিই, যুক্তিহীন, তর্কহীন,
সেসবে করতল ভরে গেলে আমি খুব শান্ত হয়ে যাই অনেক আগের মতো
পৃথিবীর হৃদয়
আমাজনের আশি শতাংশ অরণ্য পুড়ে গেছে আর
দেড় লক্ষ পশুপাখি,
গবাদি পশুর খামার হবে সেখানে।
বেশ ! বেশ !
এখন নাকি বৃষ্টি নেমেছে, জলীয়বাস্প আর গরম ধোঁয়া,
স্মোকড্ মাটন খেতে খেতে নিজেকে ভাবছি আমাজনের আদিবাসী
মৃত্যু উপত্যকার কাছাকাছি চলে এসেছি,
এ আগুনের পাশে দাঁড়াও বন্ধু , কদিনই আর বাঁচবো বলো?
ত্বক পুড়ে গেছে তো ! লাগছে দেখি এক আমাদের !
কী হে তুমি ইন্ডিয়া আর আমি কিন্তু ব্রাজিল
আমরা বিজ্ঞান শিখে ডিগ্রী নিয়ে বনের পাশে রান্নার দোকান খুলেছি
জঙ্গলের স্যুপ, পাখির কান্না আর বৃংহনে বৃংহনে ভালোবাসার জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করছি
বাড়ি
বাড়ি এক অনারোগ্য রোগ
ফেলে আসা অনেকদিনের থাকা সেই ঘর, বারান্দা, ঘাট, জল ...ক্ষতচিহ্নের মতো মনে হয়
একটি একটি ইট জড়ো করে মানুষ,
শরীর আর মনের গুটিবসন্তের যন্ত্রণা তাতে, শখ পুড়ে পুড়ে রঙ লাগানো
সমস্ত মলম মেখে , রোমান্টিকতা খেয়ে নিয়ে
নির্বাক, নিথর হয়ে দাঁড়ায় অবশেষে একটি বাড়ি,
লবন ভেসে ভেসে ওঠে সস্তার সিমেন্ট প্রলেপের ওপর
একজোড়া মানুষ মানুষী তখন সেই সমুদ্রদ্বীপে
বাটিতে জমা হয়েছে সমস্ত অমিল আর বিশ্রামমুখর কিছু সন্ধ্যা
আগে ঘরের দেয়ালে রঙ না আলমারি !
কত তর্ক গেছে দিনভর, রাগারাগি
এখন পুরনো কড়িকাঠ, শ্মশানযাত্রীদের মতো।
অন্য মানুষেরা সন্ধ্যা দেয়, হঠাৎ বৃষ্টিতে নিভে যায় তাদের শেষ মোমবাতি,
তবু বেঁচে থাকা শেষ হয় না,
কোচিং ফেরত একটি ছেলে ক্লান্তমুখে আসে হঠাৎ,
হাতে জামের ডাল, ভিজে উঠেছে তার শস্যক্ষেতের মতো বুক, ঘন আঁখিপল্লব ...
ভাদ্রপদী
কেন লিখে দিতে বলো গদ্যের হাত পা, চুরান্ত মৃদঙ্গ বোল
আমি ঘুরে ফিরে প্রিয় কিশোরকে নিয়ে দুই এক অক্ষরের কাছে বসি, ক্লান্ত কবিতা তোমাকেই ভালোবাসি
এখানেই রেখে দিতে পারি নীরব মাধুর্য, অস্পষ্ট গোপনে
এক অসময়ের বিকেল আমার আত্মার কাছে,
বিপুল বৈভব তার, তবু দীনহীন, শিখর চ্যুত ব্যসন যেন অজ্ঞাত ভাদ্র রাতে
মনে হয় তাকে রাখি নীরবে কাঠের বাড়িতে, জানা জতুগৃহে
বাইরে সবল বর্ষা বহুক, ডাহুক ডাকুক
কোনদিন বলব না তো, বুঝে নিতে হবে, না হলে মুছে মুছে যাক সকল অসময়ের বৃন্দ ছন্দ,
কাল থেকে ভেবেছি শুধু উন্মোচন, স্বপ্নের মধ্যে ছুঁয়ে গেছে আমাকে,
স্পর্শ করে এসেছি, জানতেও পারোনি, এমনি বোকা এক সময়খন্ড ভরে ফেলেছি ঝিনুকে
পাঠাবো ! যে ঠিকানায় কখনো কোন কিছু যায়নি সেখানে।
বিনীত
পৃথিবী শান্ত হয়ে যাক, বাজুক মুগ্ধ দোতারা
তুমিও চিনেছো আমাকে, আমিও তোমাকে
জেগে উঠেছে বিস্ময়, সবুজ সন্ধ্যা ও শহর
তুমিও কি বিশ্বাসপ্রবণ... ভালোবাসার মতো?
যারা ঠকে গেছে বলে আফসোস করে
তাদের দিলাম বাগান, আগাছা আর জলের কুঠার
রক্ত থেকে উষ্ণতা চলে গেলে মানুষ নীচু হয়
কুড়োতে শেখে, দেখে পথে পড়ে রয়েছে তার ঔদ্ধত্য
যারা যারা চলে গেছে ধুলোপথে, রেখে গেছে ঝিনুক
তাতে পা কেটে গেলে, ভেতরে সূর্যাস্ত শুধু নীরব, কাতর
কবিতা তোমার জন্য
অযত্নের গাছেও ফুটেছে ফুল, আমিও জাগছি নির্নিমেষ
বিরহী ধানের ক্ষেত ছেড়ে চলে যাচ্ছে পলাতক জ্যোৎস্না
যা কিছু নিঃশব্দ মনে হয়, হয়তো সুরহীন পাখির মৌনতা
বন্ধুর ছেড়ে দেওয়া হাতের মতো দুঃখ নেই
অশনিসংকেতে বুঝতে পারি অনাগত নিঃসঙ্গতা
যারা গভীর আনন্দে ভ্রমণে বেরিয়েছে মরুপথে
শ্রমহীন ক্লান্তিতে তাদের দেখি আধবোজা চোখে
তুমিও কি ভাবো কবিতা মানেই তোমার কথা বলছি,
যেখানে আমার মনখারাপ, সেখানেই তার ভাঙা শরীর
লেখক পরিচিতি
.... চিরশ্রী দেবনাথের, জন্ম 1979 এর 12 ফেব্রুয়ারি উত্তরপূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার। দুজনেই প্রয়াত। তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করেন। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি। বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন। পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প
প্রথম পুরস্কার, স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার, ত্রিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার।
২০১৯ এ, সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মান পেয়েছেন। তার লেখা, ছোটগল্প, "ব্যারনফিল্ড " অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সর্ট ফিল্ম। তৈরি করেছেন কলকাতার রত্নদীপ রায়। যা নাইজেরিয়ার ইন শর্ট চলচিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।
এছাড়া "কীর্ণকাল "নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন চারবছর ধরে। তিনি বিশ্বাস করেন কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বইগুলোর নাম,
কাব্যগ্রন্থ .........
"জলবিকেলে মেঘের ছায়া "( ২০১৬),
"ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় "(২০১৬),
"প্রেমে সন্ত্রাসে "(২০১৭),
"শুভ দ্বিপ্রহর " (২০১৮),
"ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স "(২০১৮) ,
"উড়িয়ে দিও "(২০১৯),
"বিশ্বাসের কাছে নতজানু "( ২০১৯ ),
কুুুুুড়িটি ছোটগল্প নিয়ে একটি গল্প সংকলন, "মায়ারাণী "(২০১৯),
একান্নটি অণুগল্প নিয়ে, অণুগল্প সংকলন ( ২০২০),
"সোমবার সন্ধ্যায় " (কথোপকথন)
"যে জীবন কবিতাগামী "( কবিতাবিষয়ক যৌথ গ্রন্থ )।
নিকটবর্তী রূপকথা ( ছাব্বিশটি ছোট গল্প )
সূর্যছক, উপন্যাস
মারমেডের শহর থেকে , উপন্যাস
ঝিলমারির কাণ্ডকারখানা , কিশোর উপন্যাস
সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , উপন্যাস
নিঃস্বরের করতলে, ( দীর্ঘ কবিতা)
মুঠোভাষ : 9402143011
ই মেইল : chirasree.debbath@gmail.com
