সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

উপন্যাস

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

চিরশ্রী দেবনাথ


পর্ব চার

হোস্টেলে সকাল থেকেই আজ নানান হইচই। প্রতিবাদে সামিল হতে সবাই রাজি। ঈরা একটু নিমরাজি।  সবার সঙ্গে হ্যাঁ না মেলালে আবার নানারকম কথা শুনতে হবে , কিন্তু এসব তো আসলে সময় নষ্ট। ছোটবেলা থেকেই ঈরা পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস। ঈরার বেসিক ধারণা তার পৃথিবীটা শুধু পড়া দিয়েই গড়া,  যে পৃথিবী খুব নিরাপদ,  বাইরের কোন ঝড় ঝাপটা তাকে কখনো ডিস্টার্ব করবে না। মোটকথা পড়ার বাইরে , রেজাল্টের বাইরের পৃথিবী নিয়ে ঈরার কোন দরকার নেই,  নিজস্ব জগতে শুধু তারই পছন্দের কয়েকজন মানুষ থাকবে,  তাদের সঙ্গেই সে খাবে দাবে , সামান্য ঘুরবে, পরীক্ষা দিয়ে ভালো চাকরি জোগাড় করে পৃথিবীর মাঝে যেন এক নিরাপদ গ্রিন হাউসের ভেতর তার বাকি জীবন কেটে যাবে। বাড়ি থেকে বাবার টেনশনে ভরা ফোনকল গতকাল থেকে ঈরাকে অস্থির রেখেছে, আজ আবার সবাই এটা নিয়ে পড়েছে। রাত  নটার পর হোস্টলের চত্বরে সাধারনত  বেরোনো নিষেধ কোনরকম ইমার্জেন্সি ছাড়া,  আর এমনিতেও পাহাড়ি জায়গায় রাত নটা মানে মধ্যরাত। এখানে   বিকেল পাঁচটায় পুরোপুরি সন্ধ্যা। কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায় চারপাশ। টিলায় টিলায় জ্বলে ওঠে ফ্লাড লাইট ।

কলকাতায় হবে রাতদখল। অভয়াকাণ্ডের প্রতিবাদে  সামিল হতে সবাই  নেমে যাবে রাতের রাজপথ দখল করতে , সৃজনী,  ইশা , সুহানি ওরাও চাইছে এমন একটা কিছু করতে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছে,   ওদের সঙ্গে থাকবেন প্রফেসর ডঃ অন্বেষা চৌধুরী ।

মানে ক্লাশের পর আজ কেউ আর হোস্টেলে ফিরছে না,  সারা সন্ধ্যা জুড়ে ক্যাম্পাসে চলবে প্রতীকী রাত দখলের জমায়েত,  বক্তৃতা এইসব। ঈরা ভীষণ বিরক্ত ।এসবে কি আদৌ কোন লাভ হবে কোথাও?

ঈরার মুড খারাপ দেখে সুহানি বলল আচ্ছা ঈরা বলতো , কাজের জায়গায় মেয়েদের যদি নিরাপত্তা না থাকে তবে এই পড়শোনা করে কি লাভ। ? আমার আশ্চর্য লাগছে তোমার নির্লিপ্ততা দেখে। তুমি যেন কিছুই নিতে পারছ না,  একজন লেডি ডাক্তার অন ডিউটি এরকম নৃশংসভাবে খুন হলো,  এটার জন্য তো দেশে রীতিমতো যুদ্ধ হওয়া উচিত।

প্লিজ সুহানি আমি ফিল করি,   কিন্তু এটা কোন সাধারণ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়. নয়,  যেখানে ছাত্র আন্দোলন, মিছিল মিটিং ইত্যাদি প্রত্যেকদিন লেগে থাকবে,  এটা গবেষণার জায়গা,  গভীর মনোযোগের জায়গা,  নাহলে বিরাট কিছু অ্যাচিভ করা যায়না।

তুমি তাহলে বিশাল কিছু অ্যাচিভ কর ঈরা , আমরা তো প্রতিবাদ করবই,  মনে রেখো এরকম এক জঘন্য স্যোসাল কালচারের মধ্যে তোমাকেও কাজ করতে হবে,  একটা মৃত্যু বলে দিল মেয়েদের মেধাও অনেকের কাছে বিপজ্জনক ।

সুহানি চলে গেল পোস্টার বানাতে , আজ গান কবিতা বা নাচ নয়,  শুধুই চিৎকার একটা ভয়াবহ চিৎকার যেন ফেটে পরে চারদিকে।

ঈরাও যাবে,  নিশ্চিত। কিন্তু ঈরা বুঝতে পারেনা এতো চিৎকার কোথায় গিয়ে মরে যায়,  আর ফিরে আসতে পারেনা মানুষের কন্ঠে।

প্রফেসর অন্বেষা চৌধুরী থাকছেন।  

তিনি EIIMS এর পিওর ম্যাথমেটিক্সের অন্যতম সিনিয়র প্রফেসর। তার বর্তমান গবেষণার বিষয় Topological Data Analysis ,  তাকে ঈরার একদমই ভালো লাগেনা । ভীষণ অহংকারী মনে হয়,  ছাত্রছাত্রীদের থেকে যেন অনেক দূরে ওনার বসবাস । ক্লাশে আসেন,  জোরদার লেকচার দেন,  সবাই ফলো করে ওনার পড়ানো,  পারতপক্ষে কোন স্টুডেন্টের সঙ্গেই কথাবার্তা বলেন না,  এরকমই মনে হয় ঈরার । বিশেষ করে ঈরাও ওনাকে এড়িয়ে চলে, এই বিষয়ে তো খুব বেশি ছাত্র ছাত্রী নেই। জনাকয়েক স্টুডেন্টই আসে যাদের গবেষণার সঙ্গে ব্যাপারটির যোগাযোগ আছে।  তাই এখানে কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে টিচারদের বন্ডিং তৈরি হয়ে যায়। তবে অন্বেষা ম্যাডামের সঙ্গে আবির খুব কথা বলে কারণ তিনি আবিরের অন্যতম গাইড টিচার ।সুহানির কথাবার্তায় মনে হলো ওরও বেশ ভালো সম্পর্ক। তাহলে কি ক্লাশের বাইরেও অন্বেষা চৌধুরী ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেশেন ।আসলে তিনি এখানকার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও অনেকটা পালন করেন, তবে ঈরার সঙ্গে তো তিনি কখনো নিজে থেকে কথা বলেননি ।অত্যন্ত কঠোর ভাব ধরে থাকেন,  যা ঈরার অসহ্য লাগে ।ঈরাও কি খানিকটা এরকম?  যাকে আর কয়েকদিন পর সবাই এড়িয়ে চলবে। রাত দখলের বিষয়টিতে সবাই ইনভলভড হয়ে যাচ্ছে,  আজ কারোরই পড়াশোনায় মন নেই। কলকাতায় ডাক্তারদের গণ সমাবেশ,  সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ,  তীব্র ঘৃণা আর প্রতিবাদ এই সুন্দর শৈলশহরের নিরুদ্রপ উত্তাপহীন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে এসেও ঢেউয়ের মতো এসে আছড়ে পড়েছে। 


মুখার্জি স্যার সপ্তাহে তিনদিন ক্লাস নেন,  আজ ওনার ক্লাস নেই,  কিছুসময় সাইবার ক্যাফে তে কাটাবে বলে ঠিক করল ঈরা । কয়েকটা  জিনিস সার্চ করার ছিল,  এক্ষেত্রে নিজের ল্যাপটপের চেয়ে এখানে করা ভালো , এতে নেট কানেকশনও ভালো পাওয়া যায়,  কাজ করতেও আরাম।


CyberNode যেন EIIMS এর একটি উজ্জ্বল পালক। ইন্সটিটিউশনের এক কোণে অবস্থিত আধুনিক ডিজিটাল রিসার্চ ক্যাফে । 

ঢোকার মুখেই , দেয়ালের ঠিক ওপর লেখা


 "Information is the true infinity."


লাইব্রেরির পেছনের দিকের দোতলায় গ্যালারির পাশে কাচের দেয়ালঘেরা জায়গাটি প্রথম দেখায় অনেকটা আধুনিক ক্যাফের মতো। কিন্তু ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে কফির চেয়ে কোডিং বেশি, আর চায়ের চেয়ে চিন্তা গভীর। এমন কি যে কেউ সেখানে ঢুকতে পারেনা। 

প্রবেশদ্বারে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানার – ছাত্রছাত্রীদের আইডি কার্ড দেখালে দরজা খুলে যায়। ভেতরে  soft lighting—সাদা, নীল আর হালকা সবুজ আলো মিশে এক গাঢ় একাগ্রতার পরিবেশ তৈরি করেছে। দেয়ালজুড়ে সাউন্ডপ্রুফ বুথ – প্রতিটিতে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেস্কটপ, তিন মনিটর, উন্নত গ্রাফিকস কার্ড, হাই স্পিড নেট কানেকশন এবং প্রি-ইনস্টলড জার্নাল সার্চ ইঞ্জিন, ম্যাথ ল্যাব, পাইথন, R, ম্যাথমেটিকা ইত্যাদি সফটওয়্যার। ডান পাশে "Global Access Pod" নামে পরিচিত পাঁচটি ছোট কিউবিকল – এখান থেকে IEEE, JSTOR, Springer, Elsevier, arXiv–এর মতো আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে প্রবেশ করা যায়। 

মাঝে কয়েকটি অ্যানালগ ডেস্ক রয়েছে—যেখানে শুধু কাগজ-কলম, রুলার দিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা চলে। এখানকার দেয়ালে একপ্রস্থ সফ্ট বোর্ড। কেউ ইচ্ছে করলে কিছু পিন করে যেতে পারে যদি অন্য কারো কাছে সম্ভাব্য কোন উত্তর থাকে। 

প্রতিদিন সন্ধ্যে ছ’টা থেকে সাতটা পর্যন্ত একঘণ্টা আল্ট্রা সাইলেন্স জোন হয়—যখন কেউ কথা বলে না, শুধু কিবোর্ডের শব্দ, স্ক্রলের হালকা শব্দ , আর কোথাও কোথাও নিঃশব্দে ঘাম ঝরার মতো চিন্তার তীব্রতা ছড়িয়ে থাকে।


এক পাশে রাখা থাকে ‘Research Query Box’—যেখানে কেউ চাইলে নাম না দিয়ে জটিল প্রশ্ন ফেলে রাখতে পারে, এবং অন্যরা তাদের মতামত যোগ করতে পারে। তবে অনেকেই বলে এখানে কিছুই না রাখতে, কারণ চিন্তা চুুরি হয়ে যেতে পারে।

তাছাড়াও যে যার গবেষণার গোপনীয়তার কারণে সার্চ হিস্ট্রি পর্যন্ত ডিলিট করে যায়। 

CyberNode যেন শুধুই একটা ডিজিটাল ঘর নয়—এটা ঈরার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি ধ্যানঘর,  এখানে বসলে তার মনে হয় এই ইউনির্ভাসের সকল কোণ থেকে সংখ্যারা যেন তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। বিকেলবেলার দিকে এলে কাচের জানলা দিয়ে দেখা যায় কুয়াশার দীর্ঘ আস্তরণের পরও মাঝ আকাশে উঁকি দিচ্ছে একটি নক্ষত্র,  যার আলো এখান থেকে ম্লান কিন্তু আসলে হয়ত সে সুতীব্র আলোর ঝলকানি,  কী অদ্ভুত এক আপেক্ষিকতা। 


ঈরা এক মনে হাঁটছে। আজ সে পরে আছে নীল রঙের একটি কুর্তি আর সাদা কটন প্যান্ট। চুলে টাইট করে বিনুনী বেঁধে নিয়েছে। ঢোকার মুখে বাবাকে ফোন করল। বাবা বললেন , তুই যে একা একা সাইবার ক্যাফেতে বসে কাজ করবি সেটা কি নিরাপদ?  আরো কাউকে নিলি না কেন সঙ্গে?

বাবা , এভাবে নিজের কাজ করা যায় না,

কিছু কিছু কাজ একাও করতে হয়। তাছাড়া 

এখানে সব জায়গায় গার্ড থাকে,

বাবা বলছে আরে অভয়ার ওখানেও সিভিক পুলিশ ছিল!

তাহলে কি এতো বছরের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম জলে দিয়ে বাড়ি চলে আসব  ?  শুধু ভয়ে ?


ঈরার রাগ উঠলেও বাবাকে কিছু বলতে সে পারেনা,  নরম স্বরে বলল কিছু হবে না বাবা , এখানকার পরিবেশ খুব ভালো , একদমই অন্যরকম। তুমি আর মা আসো আরো একবার,  

আমরা পাহাড় ঘুরে আসব। এখন রাখি,  চিন্তা করো না। 

আই ডি কার্ড স্ক্যান করিয়ে ঈরা ঢুকে পড়ল ভেতরে । 

বাঁদিকে ,কফির ভেন্ডিং মেশিনের পাশে একটা ছোট ‘চুপচাপ কোণা’ – যেখানে  প্রফেসর বা পিএইচডি স্কলাররা   বসে কোনো সংকেতপদ্ধতি বা জটিল গণিতের সমস্যার সমাধানে ডুবে থাকেন। একটি ছোট ক্লাসরুমের মতো বলা যেতে পারে। 

 ছোট্ট টেবিলের ওপর বিস্কুটের কৌটোও রয়েছে।

ঈরা দেখল সেখানে আজ আবির আরো দুজন

বসে কথা বলছে , এই স্যারের নাম ডঃ কুলকার্নি,  আবির ওনার আন্ডারে একটা পেপার করবে সেদিন শুনেছিল। ঈরার অবশ্য এই প্রফেসরের সঙ্গে এখনো কোন রকম প্রয়োজন পড়েনি।  

না পড়লেই ভালো । ঈরা শুধু মুখার্জি স্যারের স্টুডেন্ট হয়েই থাকতে চায়। ইচ্ছে হয় ঈরা  সামনে বসে থাকবে আর স্যার বোঝাতে থাকবেন,  কলমের সূক্ষ্মরেখায় তৈরি হবে নতুন কোন অংক,  যার সমাধান শুধু ঈরার কাছেই আছে।

দূর,  এসব ভাবনা যে কেন আসে,  নিজের ওপরই রাগ হলো,   জানলার ওপাশে একটি খ্রিসমাস ট্রি,  বেশ লম্বা ,  আর ফাঁক দিয়ে তাকালে  চোখে পড়ে দূর পাহাড়ের আবছা অবয়ব,  এটাই ঈরার সবচেয়ে প্রিয় বসার জায়গা,  অন্য কেউ বসা থাকলে অবশ্য সে আর এক জায়গায় বসে , আজ কেউ নেই,  তাই 

 প্রিয় কোণটা বেছে নিয়ে সে বসে পড়ল, তার 

সাইডে পোস্ট-ইট নোটে লেখা একটি লাইন ,


“Don’t shut down the system. The proof is coming.”


উপন্যাস, সংখ্যার শরীরে মৌমাছি


উপন্যাস 

চিরশ্রী দেবনাথ

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

পর্ব তিন

ঈরার ক্লাশ এখন Gauss Campus Hall এ , যা এক কথায় EIIMS ক্যাম্পাসের গ্ল্যামার  , ঠিক মাঝখানে যেখানে টিলাটা সামান্য উৃচু তার ওপর অর্ধেক গোলাকার অনেকটা গম্বুজের মতো দেখতে এই হলঘরটি  মনের মধ্যে কেমন যেন সম্ভ্রম জাগায়।  দুই দিকে প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে। 

ধূসর পাথরের গাঁথুনি , ক্যাম্পাস হলটিতে কেমন একটা ঠান্ডা আর গম্ভীর ভাব বজায় রাখে , এখানে ঢুকে ক্লাশ করার সুযোগ অর্জন করা খুব একটা সহজ কম্ম নয় এটা ভেবে ছাত্রছাত্রীদের মনেও থাকে প্রচ্ছন্ন গর্ব। 

হলে ঢুকতেই চোখে পরে কাঠের ব্যালকনিতে গড়া ধাপে ধাপে বসার ব্যবস্থা , মনে হয় নির্দিষ্ট কোনো গাণিতিক  অনুক্রমে যেন সাজানো হয়েছে। ছাদে আধচাঁদের মতো স্টিল-গ্লাসের ছাউনির ফাঁক দিয়ে সকালের আলো ঠিকরে পড়ে বোর্ডের ওপর—যেখানে জটিল ফর্মুলা আর তত্ত্বের নকশা আঁকা থাকে রঙিন চকে।

 সামনে থাকা বিশাল  স্লেট বোর্ডটি প্রায় পাঁচ মিটার চওড়া, যার পাশে মাউন্ট করা আছে আধুনিক টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে—গবেষণার পেপার পড়ার জন্য । একপাশে ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রফেসররা হাতে ছোট্ট মাইক নিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে  বলেন  আর অন্যপাশে একটি সাদা রোলিং বোর্ড, যেখানে কেউ কেউ হাতে-কলমে সমীকরণ কষেও  দেখান ।

হল ঘরের এক প্রান্তে টানানো বিশাল দেয়ালচিত্রে , পিথাগোরাস,  ইউক্লিড ,  গাউস, রামানুজান, পিয়ের দে ফার্মা,  জি এইচ হার্ডি এবং আধুনিক সময়ের ফারমেটস লাস্ট থিয়োরেম প্রুফ করা ম্যাথমেটিশিয়ান অ্যান্ড্রু ওয়াইলসের  প্রতিকৃতি—এক এক করে সকলের দিকে তাকালে মনে হয় তারা আজও এই কক্ষের ছাত্রছাত্রীদের বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় চোখ রাখছে।


 মাঝে মাঝে এখানেই বসে অতিথি বক্তাদের  সেমিনার—কখনো সুইজারল্যান্ড থেকে আসা লরাঁ ফার্ব বা জাপানের কোন তরুণ তুর্কি সংখ্যা তত্ত্ববিদ, যিনি আঁকছেন Elliptic curve-এর গতিপথ। স্লাইডে ভেসে ওঠে complex variable-এর জটিল উপত্যকা, আর পেছনের সারিতে বসো ঈরা-আবিরেরা চুপচাপ গিলতে থাকে  প্রত্যেকটি সূত্র, প্রতিটি রঙিন রেখার মানে।

গ্যালারির শেষ সারিতে বসলে একটি বাড়তি পাওনা রয়েছে, একমাত্র এখান থেকেই যেন অংকের গাম্ভীর্যের মাঝখান ঢুকে পড়ে কিছু 

রঙ,  কারণ এই জায়গাটি দিয়ে দেখা যায় পাহাড়ের ঢাল,  আর কয়েকটি ফুলে ছাওয়া প্রাপ্তবয়স্ক গুলমোহর গাছ,  মাঝে মাঝে চোখও ক্লান্ত হয়,  মনও ।

চোখ আর হৃদয় দুটোই তখন ফুলের সৌন্দর্য দেখে,  বাদ পড়ে যায় প্রফেসরদের দু একটি দামি লাইন , একটু অন্যমনস্কতার জন্য দামও দিতে হয় অনেক,  তবুও ঈরা বুঝতে পারছে এই গম্বুজের মতো ঘরটায় একটা ভালোবাসা জোর করে ঢুকে পড়তে চাইছে আর ঈরা দুহাত দিয়ে আটকাচ্ছে শুধু। 

  অংক কি শুধুই পরিসংখ্যান, না রহস্যময় কোনো জাদু, যে জাদুর নিচে লুকিয়ে থাকে প্রেম, অপেক্ষা  আর অনন্ত সম্ভাবনা।


ক্যাফেতে এসো  একটু , কথা আছে, সুহানি বলল ।

মুখার্জি স্যার পড়াচ্ছেন,  এসময় বাড়তি কথা ঈরার খুব অপছন্দ,  সে হাত দিয়ে ইশারা করল পরে,  এরমধ্যে আবির আবার কোশ্চেনও জিজ্ঞেস করে ফেলছে একটি , কোশ্চেনটা ভালো করে শোনাই হলো না ।

আবিরের সঙ্গে ছোট্র একটা নোটবুক সবসময় থাকে,  সে কখনও ফাঁকা থাকে না,ওর বিষয় নিয়ে  যখন যা মনে হয় সেটা লিখে রাখে বিভিন্নভাবে , পরে কনফিউশন ধরে ধরে  প্রশ্ন করে । সবাই আবার একে আইনস্টাইনের নোটবুক বলে একটু হাসাহাসিও করে। আজ 

আবির এই গ্রুপ থেকে দূরে বসেছে এবং মন দিয়ে শুনছে।


মুখার্জি স্যার একবার যেন পুরো ক্লাসটাকে মনযোগ দিয়ে দেখলেন। ঈরা প্রত্যেকদিনই কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করে,  ওর কোশ্চেনগুলোর ভ্যালু আছে। ঈরা নিশ্চিত স্যার ওকেই খুঁজছিলেন।কিন্তু আজ ঈরা ভালো করে পড়ে আসতে পারেনি তাই চুপচাপ বসে আছে,  হঠাৎ করে ফালতু প্রশ্ন করে ফেলার কোন মানে হয় না এখানে।

প্রায় দু ঘন্টার ক্লাশ শেষ হলো,  স্যার বেরিয়ে যাচ্ছেন,  পেছন পেছন কয়েকজন অতি উৎসাহী গবেষক,  আশ্চর্য ঈরাও তো তেমনই একজন , আজ সে অন্যদের এভাবে ভাবছে । নিজে পড়ে আসেনি বলে ? স্যার ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন,  গাড়িতে উঠে গেলেন,  হলের সামনে তখন ঈরা দাঁড়িয়ে,  খোলা চুল উড়ছে সামান্য হিমেল বাতাসে । স্যারের চশমা রোদে কালো হয়ে যায়, তাই ঈরা ঠিক বুঝতে পারল না গাড়ির দরজা বন্ধ করার সময় কি ওর দিকে তাকালেন স্যার।

সৌমিতাভ অনেকক্ষণ ধরে ঈরার কানের কাছে কি জানি ঘ্যানঘ্যান করছিল , এবার ঈরা চোখ তুলে তাকালো,  কি বলছো জানি?

বাপরে বাপ , কোথায় থাকো তুমি ঈরা , আমরাও অংক নিয়ে পড়াশোনা করি,  কিন্তু মাঝেমধ্যে সামান্য হাসিঠাট্টাও করি ।

সেরকম কোন ব্যাপার নয় সৌমিতাভ,  বলো শুনছি। 

 চলো হাঁটি। প্রায় দেড় ঘন্টা বাকি নেক্সট ক্লাসের,  কোথাও বসি ঈরা , তোমার আপত্তি না থাকলে।

আমার আপত্তি আছে সৌমিতাভ।

এভাবে বলছো কেন?

আমি এখন লাইব্রেরিতে যাব,  তুমি যাবে?  তবে আলাদা টেবিলে বসতে হবে। গতকাল কিছু পড়া হয়নি , আজ আমি মুখার্জি স্যারের ক্লাশে প্রায় ব্ল্যাঙ্ক ছিলাম।

ঈরা তুমি বোধহয় ভাবো তুমি সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট তাইনা?  আর ঐ আবির বর ঠাকুর ! আমিও আই আইটি থেকেই এম এস সি করেছি, স্কলারশিপ পেয়েই পড়ছি,  কিন্তু তোমার ব্যবহারটা খুব রূঢ় ঈরা ,.সাবজেক্ট নিয়ে কথা বললে বুঝতে পারতে এই সৌমিতাভও কিছু জানে। বাই দ্য ওয়ে , তুমি খুব বাজেভাবে রিয়েক্ট করলে আমার কথায় আজ,  আর আমার মনে হয় ই্যয়ু আর ফল ইন লাভ উইথ মুখার্জি স্যার। খুব কষ্ট পাবে। হি উইল ইউজ ই্যয়ু ।

যা তা বলছ সৌমিতাভ,  ঈরা প্রায় চিৎকার করে উঠল।

সৌমিতাভ আর পেছন ফিরে তাকাল না। ওর খাটো হাট্টাখাট্টা শরীরটা নিয়ে হনহন করে চলে গেল।  

ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রছাত্রীদের বসার জন্য  সিমেন্টের  বেঞ্চ বানানো রয়েছে তারই একটির  মধ্যে ঈরা বসে পড়ল ধপ করে।

কী থেকে কী হয়ে গেলো। সত্যিই তো সৌমিতাভ খুব একটা খারাপ কিছু বলেনি তখন। ঈরা বাজেভাবে রিয়েক্ট করেছে।

মুখার্জি স্যারের প্রতি ও দুর্বল এই ভয়াবহ সত্যটা যা ঈরা নিজেকেও বিশ্বাস করাতে চায় না,  সেটা সৌমিতাভের চোখে কী করে ধরা পড়ল ? তবে যে ঈরা খুব অহংকারের সঙ্গে বলে ওর শরীরের ভাষাও গাণিতিক এটা তবে ভুল ।

যাহ্ আজকের দিনটাও মাটি হলো। এখন আর ঈরা পড়ায় মন বসাতে পারবে না। মনের দু জায়গায় খিমচে আছে আবির আর সৌমিতাভের কথাগুলো।  কেন এতো সেনসিটিভ  আমি?  নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল ঈরা ।

এখানে বসে থেকে লাভ নেই , বইয়ের আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁদতেও আরাম। ঈরা দ্রুত হাঁটতে লাগল । এখান থেকে লাইব্রেরি অনেকটাই দূর। ঐ টিলার ওপর , বিশাল রামানুজন ব্লক , ওখানেই লাইব্রেরি এবং জেরক্স আর প্রিন্টিং এর দোকান। 

লাইব্রেরির নাম শ্রীনিবাস রামানুজন লাইব্রেরি ।

বড় বড় দুটো দেবদারু গাছ দুদিকে। ব্যাগ ইত্যাদি জমা রাখার কাউন্টারে লোকেশদা বসে আছে ।

লোকেশ থাপা , নেপালি। বাংলা , হিন্দি , ইংরেজি তিনভাষাতেই কাজ চালাতে পারে। শুধু রাগ উঠলে নেপালি ভাষায় গালাগাল দেয়,  মাতৃভাষাটা স্পেশালি গালাগালের জন্য ইউজ করে। 

কোন স্টুডেন্ট লাইব্রেরি আওয়ারের শেষ মুহূর্তে বেরোলে লোকেশদা গম্ভীর মুখে বলে এক কাপ চা মাঙতা হ্যায়। 

ঈরা সব জমা রেখে , খাতা ও পেন্সিল নিয়ে ঢুকল লাইব্রেরিতে ।

লাইব্রেরির মাঝ বরাবর লম্বা ওক কাঠের টেবিল, যার গায়ে ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারে ছোপ পড়েছে। সবাই ঘাড় নিচু করে আছে, কারো ল্যাপটপের স্ক্রিনে PDF, কারো হাতে  পুরনো জার্নাল। সময় যেন এখানে ধীরতর; কোথাও কিচ্ছু নড়ে না—শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানোর শব্দ, মাঝে মাঝে কারো কফির কাপ নামানোর মৃদু টুং।


ডানদিকে তাকালে চোখে পড়ে কয়েকটা গ্লাস-কেসে সংরক্ষিত হাতের লেখা থিসিস, তাম্রফলক-চিহ্নিত কিছু দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি—কোনোটিতে গাণিতিক চিহ্নের পাশে গবেষকের ব্যক্তিগত নোট, একটুখানি দুঃসাহস, একটুখানি সংশয়।


লাইব্রেরির শেষ কোণে "The Infinity Room" নামে এক গোপন পড়ার ঘর, যেখানে শুধু M.Phil ও PhD স্কলারদের প্রবেশাধিকার—এখানে বসে ঈরা একদিন গভীর রাতে আবিষ্কার করেছিল একটি ভুলে-যাওয়া সূত্র, যা নিয়ে পরে আবিরের সঙ্গে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছিল।


আর লম্বা করিডোরের শেষপ্রান্তে  বড় সাইনবোর্ডে লেখা ,

“An equation for me has no meaning unless it expresses a thought of God.”

– Srinivasa Ramanujan





উপন্যাস

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

চিরশ্রী দেবনাথ



পর্ব দুই


তুমি deterministic নাকি probabilistic—আমি জানি না। কিন্তু আমি জানি, তুমি জিরো থেকে শুরু করে ইনফিনিটি পর্যন্ত যেতে পারো।


প্রত্যেকেই তো একটা ইনফিনিটি  , তাই না আবির। 


তুমি ঠিক বললে না ঈরা , এভাবে বললে ইনফিনিটিকে নেগলেক্ট করা হয়। আর মনে রেখো ইনফিনিটিরর মূল্য সবাই দিতে পারে না,  একমাত্র মেধাবীরাই দিতে পারে এর মূল্য ।তার কাছে ইনফিনিটি উজ্জ্বল আলো হয়ে ওঠে ।


তুমি কি সাহিত্যে ইন্টারেস্টেড আবির?

থোরা বহুত তো আছি।

ও মাই গড,  আমি নই।

সেকী!  তুমি বাঙালি মেয়ে , দেখতে সুন্দর আর সাহিত্যে ইন্টারেস্টেড নও?

বাঙালি বুঝলাম , সৌন্দর্যের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক কি?

কেন নাচ বা গান টান মানে রবীন্দ্রসঙ্গীত  করো না ?  তোমাদের মতো বাঙালি মেয়েদের সঙ্গে  সবাই প্রেম করতে চায়,  এই যে শাড়ি,  লম্বাচুল ইত্যাদি ।

প্রথম কথা তুমি খুব ভাট বকছো আবির। রবীন্দ্রসঙ্গীত দুটো একটা গাই বলে আমি সাহিত্যে পারঙ্গম নই,  হ্যাঁ শারদীয় আনন্দমেলা বা ছোট বেলায় কিছু গল্পটল্প পড়েছি শুধু , সাহিত্য অনেক বড় ব্যাপার , আজই শখ করে একটু শাড়ি পরেছি , চুলটা ভেজা ছিল বলে খুলে রেখেছি তাকে তুমি কীরকম যেন generalisation করে ফেললে , মানে প্রেমের উপযুক্ত বাঙালি মেয়ে , খুব খেলো কথা হয়ে গেল তাই না?

সরি ঈরা, তুমি রাগ করলে।

অবশ্যই ।

আরে কফি শেষ করে ওঠো।

যাচ্ছি নাতো,  দাম দিয়ে কিনেছি , খেয়েই যাব,  তবে এখানে বসে নয়। অন্য টেবিলে ।

একটা স্পষ্ট কথা শোন আবির

আমি খাটতে ভালোবাসি , পড়তে ভালোবাসি , অংক আমার শখ নয়,  অংকই আমার ল্যাঙ্গুয়েজ , শরীর অথবা মনের ।


ঈরা অন্য টেবিলে গিয়ে বসল । ক্যাম্পাসের মধ্যে এই  কাঠের তৈরি ছোট ক্যাফেটেরিয়াটি সব ছাত্রছাত্রীদেরই প্রিয়। এরকম  তিনটে আছে। একটি স্যার এবং স্টাফদের জন্য আর  ছাত্রছাত্রীদের জন্য দুটো। লাঞ্চ ব্রেকে জায়গা পাওয়াই মুশকিল ।তবে এখন সক্কাল সক্কাল,  তাই ফাঁকা খানিকটা। 

 ক্যাম্পাসটি মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা,  একদিকে পিজি স্টুডেন্টদের অন্যদিকে পি এইচ ডি স্টুডেন্টদের জন্য। এখানে বসলে দু তরফের ছাত্রছাত্রীদেরই আসা যাওয়া দেখা যায়। সুহানি, নীলম,  রাজ তিনজন একসঙ্গে যাচ্ছে,  ওদের সঙ্গেই  একটু পরে ঈরার কমন ক্লাশ আছে। 

তার মধ্যে নীলম ও রাজের সাবজেক্ট অবশ্য  সম্পূর্ণ আলাদা তবে  সুহানি আর  ঈরা দুজনেই ক্রিপ্টোগ্রাফি রিলেটেড । 

ঈরাকে হাই বলল সুহানি, ঈরাও হাত তুলল। ঈরা এখন ক্লাশে যাবেনা। এখন গেলে গল্প হবে।  ডঃ এ মুখার্জির ক্লাশ। স্যার এখনো আসেননি। এখান দিয়েই যাবেন তিনি,  তার পেছন পেছন ঈরা ক্লাসে ঢুকবে। তিনি. Dept. of Algebra & Cryptography বিভাগের হেড অব দ্য ডিপার্টমান্ট । একটু রুক্ষ,  তবে কালে ভদ্রে সামান্য রসিকতাও করেন,  দীর্ঘকায়,  সৌম্যদর্শন, মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে দুটো গভীর কালো মেধাবী চোখ, নিজের সাবজেক্টের ওপর প্রশ্নাতীত দক্ষতা, আর পুরুষালি ভয়েস ঈরাকে মুগ্ধ করে চলেছে প্রত্যেকদিন,  শ্রদ্ধায় যেন তার মাথা নুয়ে আসে,  এরকমই তো হওয়া উচিত শিক্ষক,  এখন পর্যন্ত ঈরার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ডঃ এ  মুখার্জি । ঈরা যখন প্রশ্ন করে কী সুন্দর বুঝিয়ে দেন,  সাধারণ প্রশ্নকেও তুচ্ছ করেন না। ঈরা অনুভব করছে সে ক্রমাগত অতিরিক্ত বায়াসড হয়ে গেছে ওনার প্রতি। এমনকি অন্য ছাত্রছাত্রীদের স্যার সেইম ট্রিটমেন্ট দিলেও ঈরার কেমন যেন হিংসে হয়। ওনার ব্যক্তিত্ব কিছুটা রুক্ষ, অথচ স্নেহপরায়ণ । স্যারের সবচেয়ে প্রিয় কথাগুলোর  মধ্যে অন্যতম হলো  “Math is a weapon. Use it wisely.”



ঈরা আড়চোখে দেখল আবির ওর ব্যাগ থেকে একটা জার্নাল বের করেছে, জার্নালের কভার  ঈরার চেনা, International Journal of Number Theory (IJNT) একটি বিশ্বখ্যাত পিয়ার-রিভিউড (peer-reviewed) গবেষণা পত্রিকা , যা সংখ্যাতত্ত্ব  ও তার বিভিন্ন শাখায় গবেষণা প্রকাশ করে , এখানকার লাইব্রেরি থেকেই নিয়েছে নিশ্চয়ই,  ঈরার স্বপ্ন একজন তরুণ গবেষক হিসেবে তার লেখাও IJNT তে প্রকাশিত হবে।

ঈরা আবিরকে নিয়ে একটু সচেতন,  আবির 

বর ঠাকুর , আসামের তেজপুর থেকে এসেছে।

গায়ের রঙ বাদামি , ভালো উচ্চতা ও মেদহীন শরীর, চোখগুলোতে সরলতা নেই,  জিজ্ঞাসা আছে, ওর গবেষণার বিষয় , ”Quantum Key Distribution (QKD) in Post-Quantum Cryptography”

আসলে সে এমন এক এনক্রিপশন পদ্ধতির ওপর কাজ করছে যা কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসার পরেও ভেঙে ফেলা যাবে না।

 ঈরার বিষয়ের সঙ্গে আবিরের বিষয়ের সূক্ষ্মতর পার্থক্য রয়েছে,  দুজন দুটো  ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে চায় সমস্যাকে। 

 প্রায়শই তর্ক হয়—কিন্তু এই তর্কের জন্যই ঈরা আবিরের সান্নিধ্য পছন্দ করছিল,  এখন এক নিমেষে ঈরার আবিরের প্রতি অভালোলাগা তৈরি হয়েছে,  এ হচ্ছে ঈরার বিপদ , নিজের মনের মতো তো সবাই হবে না,  কিন্তু মনের এই আবছায়া ভালোলাগা ভেঙে গেলেই ঈরা সেই মানুষ থেকে দূরে সরে আসে,  এভাবে ঈরা ধীরে ধীরে একা হয়ে যায়,  যেন পৃথিবীর মধ্যে মধ্যবসন্তে ভেসে বেড়ানো নিঃসঙ্গ কোন সংখ্যা, তবে স্যার যে বলেন সংখ্যা কখনো একা হয় না, অর্থহীন হলেও তার আশেপাশে কেউ থাকবেই । ঈরার মনে তখন কেবল ভেসে উঠল এ সি স্যারের মুখ । একটু লজ্জা হতে লাগল । এই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এভাবে গবেষণায় মনোসংযোগে বাধা আসবে। ঈরা ল্যাপটপ খুলে গতকালকে পড়ানো পেপারগুলোর পি ডি এফ আবারো রিভাইস করা শুরু করলো। আবির আর ঈরার দিকে তাকায়নি,  জার্নালে ডুবে গেছে। অন্যদিন হলে ঈরা আবিরের পাশে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত আর্টিকেলগুলো,  কোথায় কি নিয়ে কাজ হচ্ছে এসব জানাটা খুব দরকার। তবে এ , সি স্যার সাধারণত খোঁজখবর নিয়েই তার ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিষয় নির্বাচন করেন,  তিনি সবসময় বলেন চোখকান বন্ধ রেখে গবেষণার কাজ হয় না। 

আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফিতে অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেব্রা বিশেষ করে গ্রুপ থিওরি, ফিনাইট ফিল্ডস, এলিপটিক কার্ভ এবং নাম্বার থিওরি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই বিষয়টি pure mathematics ও applied mathematics-একটি মেলবন্ধন । 

ঈরার দাদু ছিলেন শিলচরের একটি নামী হাইস্কুলের অংকের মাস্টারমশাই ।ছাত্ররা খুব ভয় পেতো এই জাঁদরেল অংকস্যারকে,  তিনি কিন্তু ছোট থেকেই ঈরাকে চিনতে পেরেছিলেন,  তাই অংক নিয়ে ভয় নয় বরং একটা মজা বা কৌতুহল ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন নাতনির মনে । দাদুভাই তাকে নাম্বার দিয়ে বিভিন্ন ধাঁধা দিতেন, কখনও গোপন কোডে চিঠি লিখতেন নাতিনকে,  দাদু আর নাতিনেরর এই মজার খেলাই ঈরাকে আজ এখানে দাঁড় করিয়েছে,  কিন্তু দাদুভাই দেখে যেতে পারেননি, সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাকে চারবছর আগে দাদুভাই চলে গেল পৃথিবী থেকে,  মহাশূন্যের কোনো অংক ক্লাসে। খুব মিস করে দাদুভাইকে ঈরা ।

ল্যাটিস বেইসড ক্রিপ্টোগ্রাফি এই নিয়ে ঈরা গবেষণা করছে, কারণ এটি quantum computer-এর বিপদ থেকেও নিরাপত্তা দিতে পারে – অর্থাৎ ভবিষ্যতের সাইবার সিকিউরিটিই হলো ঈরার গবেষণার লক্ষ্য । Quantum Computing আসার পর অনেক প্রচলিত ক্রিপ্টোগ্রাফি ভেঙে পড়বে – তাই নতুন সিস্টেম তৈরির জন্য এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।



এমন সময় সৃজনী এসে ধপ করে ঈরার সামনে বসল , পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের ছাত্রী , ঈরার জুনিয়রই বটে , তবে ছটফটে আর খুব মিশুকে ।


ঈরাদি তুমি এতো শান্ত কেন বলতো ? ইচ্ছে করছে না রাগে ফেটে যেতে,  চিৎকার করতে?

মেয়েদের পড়াশুনো,  গবেষণা সবকিছুই তো খুব ফালতু তাইনা?

ঈরা বুঝতে পারল সৃজনী কলকাতার আর জি কর হাসপাতালের  এম ডি পাঠরতা সেই ডাক্তার মেয়েটির ধর্ষণ ও খুনের কথা বলছে ।

খুব নৃশংস এবং হতাশার,  কিন্তু ঈরা জোর করে নিজেকে এই মুহূর্তে সরিয়ে রাখতে চাইছে সব থেকে,  সৃজনীর সঙ্গে এখন এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই ঈরা পরবর্তীতে আর ক্লাশে মন দিতে পারবে না,  আলোচনা করেই বা কি হবে,  

আলোচনা প্রতিবাদ কতটুকু বদলেছে মানুষকে ?


এখন যে আমার ক্লাশ আছে সৃজনী,  আসি রে,

অবশ্য তখন আরো কয়েকজন ঢুকে পড়েছে ক্যাফেতে,  সৃজনী ঈরাকে ছেড়ে তাদের দিকে মন দিল। সবার দিকে তাকিয়ে একটু আলতো হেসে ঈরা বেরিয়ে পড়ল,  আর যেখানে প্রত্যেকদিনই ঈরার একবার চোখ পড়ে সেটা হলো, ক্যাফেতে ঢোকার মুখেই একটি রঙিন সাইনবোর্ড ,  যেখানে বড় বড় করে লেখা,

 “ Life is not a linear equation “,










সংখ্যার শরীরে মৌমাছি ( উপন্যাস)


সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

চিরশ্রী দেবনাথ


পর্ব দুই


তুমি deterministic নাকি probabilistic—আমি জানি না। কিন্তু আমি জানি, তুমি জিরো থেকে শুরু করে ইনফিনিটি পর্যন্ত যেতে পারো।


প্রত্যেকেই তো একটা ইনফিনিটি  , তাই না আবির। 


তুমি ঠিক বললে না ঈরা , এভাবে বললে ইনফিনিটিকে নেগলেক্ট করা হয়। আর মনে রেখো ইনফিনিটিরর মূল্য সবাই দিতে পারে না,  একমাত্র মেধাবীরাই দিতে পারে এর মূল্য ।তার কাছে ইনফিনিটি উজ্জ্বল আলো হয়ে ওঠে ।


তুমি কি সাহিত্যে ইন্টারেস্টেড আবির?

থোরা বহুত তো আছি।

ও মাই গড,  আমি নই।

সেকী!  তুমি বাঙালি মেয়ে , দেখতে সুন্দর আর সাহিত্যে ইন্টারেস্টেড নও?

বাঙালি বুঝলাম , সৌন্দর্যের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক কি?

কেন নাচ বা গান টান মানে রবীন্দ্রসঙ্গীত  করো না ?  তোমাদের মতো বাঙালি মেয়েদের সঙ্গে  সবাই প্রেম করতে চায়,  এই যে শাড়ি,  লম্বাচুল ইত্যাদি ।

প্রথম কথা তুমি খুব ভাট বকছো আবির। রবীন্দ্রসঙ্গীত দুটো একটা গাই বলে আমি সাহিত্যে পারঙ্গম নই,  হ্যাঁ শারদীয় আনন্দমেলা বা ছোট বেলায় কিছু গল্পটল্প পড়েছি শুধু , সাহিত্য অনেক বড় ব্যাপার , আজই শখ করে একটু শাড়ি পরেছি , চুলটা ভেজা ছিল বলে খুলে রেখেছি তাকে তুমি কীরকম যেন generalisation করে ফেললে , মানে প্রেমের উপযুক্ত বাঙালি মেয়ে , খুব খেলো কথা হয়ে গেল তাই না?

সরি ঈরা, তুমি রাগ করলে।

অবশ্যই ।

আরে কফি শেষ করে ওঠো।

যাচ্ছি নাতো,  দাম দিয়ে কিনেছি , খেয়েই যাব,  তবে এখানে বসে নয়। অন্য টেবিলে ।

একটা স্পষ্ট কথা শোন আবির

আমি খাটতে ভালোবাসি , পড়তে ভালোবাসি , অংক আমার শখ নয়,  অংকই আমার ল্যাঙ্গুয়েজ , শরীর অথবা মনের ।


ঈরা অন্য টেবিলে গিয়ে বসল । ক্যাম্পাসের মধ্যে এই  কাঠের তৈরি ছোট ক্যাফেটেরিয়াটি সব ছাত্রছাত্রীদেরই প্রিয়। এরকম  তিনটে আছে। একটি স্যার এবং স্টাফদের জন্য আর  ছাত্রছাত্রীদের জন্য দুটো। লাঞ্চ ব্রেকে জায়গা পাওয়াই মুশকিল ।তবে এখন সক্কাল সক্কাল,  তাই ফাঁকা খানিকটা। 

 ক্যাম্পাসটি মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা,  একদিকে পিজি স্টুডেন্টদের অন্যদিকে পি এইচ ডি স্টুডেন্টদের জন্য। এখানে বসলে দু তরফের ছাত্রছাত্রীদেরই আসা যাওয়া দেখা যায়। সুহানি, নীলম,  রাজ তিনজন একসঙ্গে যাচ্ছে,  ওদের সঙ্গেই  একটু পরে ঈরার কমন ক্লাশ আছে। 

তার মধ্যে নীলম ও রাজের সাবজেক্ট অবশ্য  সম্পূর্ণ আলাদা তবে  সুহানি আর  ঈরা দুজনেই ক্রিপ্টোগ্রাফি রিলেটেড । 

ঈরাকে হাই বলল সুহানি, ঈরাও হাত তুলল। ঈরা এখন ক্লাশে যাবেনা। এখন গেলে গল্প হবে।  ডঃ এ মুখার্জির ক্লাশ। স্যার এখনো আসেননি। এখান দিয়েই যাবেন তিনি,  তার পেছন পেছন ঈরা ক্লাসে ঢুকবে। তিনি. Dept. of Algebra & Cryptography বিভাগের হেড অব দ্য ডিপার্টমান্ট । একটু রুক্ষ,  তবে কালে ভদ্রে সামান্য রসিকতাও করেন,  দীর্ঘকায়,  সৌম্যদর্শন, মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে দুটো গভীর কালো মেধাবী চোখ, নিজের সাবজেক্টের ওপর প্রশ্নাতীত দক্ষতা, আর পুরুষালি ভয়েস ঈরাকে মুগ্ধ করে চলেছে প্রত্যেকদিন,  শ্রদ্ধায় যেন তার মাথা নুয়ে আসে,  এরকমই তো হওয়া উচিত শিক্ষক,  এখন পর্যন্ত ঈরার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ডঃ এ  মুখার্জি । ঈরা যখন প্রশ্ন করে কী সুন্দর বুঝিয়ে দেন,  সাধারণ প্রশ্নকেও তুচ্ছ করেন না। ঈরা অনুভব করছে সে ক্রমাগত অতিরিক্ত বায়াসড হয়ে গেছে ওনার প্রতি। এমনকি অন্য ছাত্রছাত্রীদের স্যার সেইম ট্রিটমেন্ট দিলেও ঈরার কেমন যেন হিংসে হয়। ওনার ব্যক্তিত্ব কিছুটা রুক্ষ, অথচ স্নেহপরায়ণ । স্যারের সবচেয়ে প্রিয় কথাগুলোর  মধ্যে অন্যতম হলো  “Math is a weapon. Use it wisely.”



ঈরা আড়চোখে দেখল আবির ওর ব্যাগ থেকে একটা জার্নাল বের করেছে, জার্নালের কভার  ঈরার চেনা, International Journal of Number Theory (IJNT) একটি বিশ্বখ্যাত পিয়ার-রিভিউড (peer-reviewed) গবেষণা পত্রিকা , যা সংখ্যাতত্ত্ব  ও তার বিভিন্ন শাখায় গবেষণা প্রকাশ করে , এখানকার লাইব্রেরি থেকেই নিয়েছে নিশ্চয়ই,  ঈরার স্বপ্ন একজন তরুণ গবেষক হিসেবে তার লেখাও IJNT তে প্রকাশিত হবে।

ঈরা আবিরকে নিয়ে একটু সচেতন,  আবির 

বর ঠাকুর , আসামের তেজপুর থেকে এসেছে।

গায়ের রঙ বাদামি , ভালো উচ্চতা ও মেদহীন শরীর, চোখগুলোতে সরলতা নেই,  জিজ্ঞাসা আছে, ওর গবেষণার বিষয় , ”Quantum Key Distribution (QKD) in Post-Quantum Cryptography”

আসলে সে এমন এক এনক্রিপশন পদ্ধতির ওপর কাজ করছে যা কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসার পরেও ভেঙে ফেলা যাবে না।

 ঈরার বিষয়ের সঙ্গে আবিরের বিষয়ের সূক্ষ্মতর পার্থক্য রয়েছে,  দুজন দুটো  ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে চায় সমস্যাকে। 

 প্রায়শই তর্ক হয়—কিন্তু এই তর্কের জন্যই ঈরা আবিরের সান্নিধ্য পছন্দ করছিল,  এখন এক নিমেষে ঈরার আবিরের প্রতি অভালোলাগা তৈরি হয়েছে,  এ হচ্ছে ঈরার বিপদ , নিজের মনের মতো তো সবাই হবে না,  কিন্তু মনের এই আবছায়া ভালোলাগা ভেঙে গেলেই ঈরা সেই মানুষ থেকে দূরে সরে আসে,  এভাবে ঈরা ধীরে ধীরে একা হয়ে যায়,  যেন পৃথিবীর মধ্যে মধ্যবসন্তে ভেসে বেড়ানো নিঃসঙ্গ কোন সংখ্যা, তবে স্যার যে বলেন সংখ্যা কখনো একা হয় না, অর্থহীন হলেও তার আশেপাশে কেউ থাকবেই । ঈরার মনে তখন কেবল ভেসে উঠল এ সি স্যারের মুখ । একটু লজ্জা হতে লাগল । এই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এভাবে গবেষণায় মনোসংযোগে বাধা আসবে। ঈরা ল্যাপটপ খুলে গতকালকে পড়ানো পেপারগুলোর পি ডি এফ আবারো রিভাইস করা শুরু করলো। আবির আর ঈরার দিকে তাকায়নি,  জার্নালে ডুবে গেছে। অন্যদিন হলে ঈরা আবিরের পাশে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত আর্টিকেলগুলো,  কোথায় কি নিয়ে কাজ হচ্ছে এসব জানাটা খুব দরকার। তবে এ , সি স্যার সাধারণত খোঁজখবর নিয়েই তার ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিষয় নির্বাচন করেন,  তিনি সবসময় বলেন চোখকান বন্ধ রেখে গবেষণার কাজ হয় না। 

আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফিতে অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেব্রা বিশেষ করে গ্রুপ থিওরি, ফিনাইট ফিল্ডস, এলিপটিক কার্ভ এবং নাম্বার থিওরি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই বিষয়টি pure mathematics ও applied mathematics-একটি মেলবন্ধন । 

ঈরার দাদু ছিলেন শিলচরের একটি নামী হাইস্কুলের অংকের মাস্টারমশাই ।ছাত্ররা খুব ভয় পেতো এই জাঁদরেল অংকস্যারকে,  তিনি কিন্তু ছোট থেকেই ঈরাকে চিনতে পেরেছিলেন,  তাই অংক নিয়ে ভয় নয় বরং একটা মজা বা কৌতুহল ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন নাতনির মনে । দাদুভাই তাকে নাম্বার দিয়ে বিভিন্ন ধাঁধা দিতেন, কখনও গোপন কোডে চিঠি লিখতেন নাতিনকে,  দাদু আর নাতিনেরর এই মজার খেলাই ঈরাকে আজ এখানে দাঁড় করিয়েছে,  কিন্তু দাদুভাই দেখে যেতে পারেননি, সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাকে চারবছর আগে দাদুভাই চলে গেল পৃথিবী থেকে,  মহাশূন্যের কোনো অংক ক্লাসে। খুব মিস করে দাদুভাইকে ঈরা ।

ল্যাটিস বেইসড ক্রিপ্টোগ্রাফি এই নিয়ে ঈরা গবেষণা করছে, কারণ এটি quantum computer-এর বিপদ থেকেও নিরাপত্তা দিতে পারে – অর্থাৎ ভবিষ্যতের সাইবার সিকিউরিটিই হলো ঈরার গবেষণার লক্ষ্য । Quantum Computing আসার পর অনেক প্রচলিত ক্রিপ্টোগ্রাফি ভেঙে পড়বে – তাই নতুন সিস্টেম তৈরির জন্য এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।



এমন সময় সৃজনী এসে ধপ করে ঈরার সামনে বসল , পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের ছাত্রী , ঈরার জুনিয়রই বটে , তবে ছটফটে আর খুব মিশুকে ।


ঈরাদি তুমি এতো শান্ত কেন বলতো ? ইচ্ছে করছে না রাগে ফেটে যেতে,  চিৎকার করতে?

মেয়েদের পড়াশুনো,  গবেষণা সবকিছুই তো খুব ফালতু তাইনা?

ঈরা বুঝতে পারল সৃজনী কলকাতার আর জি কর হাসপাতালের  এম ডি পাঠরতা সেই ডাক্তার মেয়েটির ধর্ষণ ও খুনের কথা বলছে ।

খুব নৃশংস এবং হতাশার,  কিন্তু ঈরা জোর করে নিজেকে এই মুহূর্তে সরিয়ে রাখতে চাইছে সব থেকে,  সৃজনীর সঙ্গে এখন এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই ঈরা পরবর্তীতে আর ক্লাশে মন দিতে পারবে না,  আলোচনা করেই বা কি হবে,  

আলোচনা প্রতিবাদ কতটুকু বদলেছে মানুষকে ?


এখন যে আমার ক্লাশ আছে সৃজনী,  আসি রে,

অবশ্য তখন আরো কয়েকজন ঢুকে পড়েছে ক্যাফেতে,  সৃজনী ঈরাকে ছেড়ে তাদের দিকে মন দিল। সবার দিকে তাকিয়ে একটু আলতো হেসে ঈরা বেরিয়ে পড়ল,  আর যেখানে প্রত্যেকদিনই ঈরার একবার চোখ পড়ে সেটা হলো, ক্যাফেতে ঢোকার মুখেই একটি রঙিন সাইনবোর্ড ,  যেখানে বড় বড় করে লেখা,

 “ Life is not a linear equation “,










উপন্যাস

উপন্যাস

চিরশ্রী দেবনাথ

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

পর্ব এক

কোন কোন দিন পৃথিবীকে খুব সুন্দর লাগে ।
আজ এমনই একটি দিন।
হঠাৎ করে গুলমোহর গাছগুলোর মনে হয়েছে ফুল দিয়ে রাস্তার ধুলো ঢেকে দিতে হবে।
ফুল সরিয়ে তাই হাঁটতে হচ্ছে ।
 খুব ভালো লাগছে ।
ঈরার কাঁধের ব্যাগ খুব ভারী , এক সপ্তাহ ধরে পরে থাকার জন্য ওর ধূসর রঙের জিন্স একটু ব্ল্যাকিস হয়ে গেছে তবে কুর্তিটা বেশ ঝলমলে এই মুহূর্তের মনটার মতোই ।
জটিল সমস্যার উত্তর যখন দূর আকাশে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে তখন হয়তো এমনিই লাগে, এখনই একবার স্যারের কোয়ার্টারে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করছে।
কিন্তু যাওয়া যাবেনা। 
আজ ঈরাকে স্যার সময় দেননি। নতুন দুজন তরুণ গবেষক ওখানে থাকবে। স্যারের সঙ্গে তাদের প্রথম সাক্ষাৎ।
তিনি কি আরোও বেশি ইম্পপরট্যান্ট বিষয় ওদের জন্য ভেবে রেখেছেন যা ঈরাকে দেননি।
নাহ তা হতে পারেনা। ঈরার দুর্দান্ত ভালো রেজাল্ট আর এম এস সির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তো জে আর এফ । 

ঈরা এখন যে পথে  হাঁটছে  তা এই বিশাল ইনস্টিটিউশনটির দ্বিতীয় প্রবেশপথ,  এদিকেই লেডিজ হোস্টেলের রাস্তা, বাঁদিকে পাহাড়ের ঢালু অংশ অনেক দূর অব্দি নেমে গেছে, নানারকমের বুনো ফুল ফুটে আছে ,  ঈরা এখানে এসেছে প্রায় তিনমাস হতে চলল,  এই তিন মাসের মধ্যে ফুলের রঙ যেন কয়েকবার করে বদলে গেছে
 ,  ফুলগুলো থেকে একটু ঝিম ধরানো গন্ধ বের হয়,  মাঝে মাঝে কেয়ারটেকাররা  এসে এগুলো 
কেটে একদম পরিষ্কার করে দেয় , উচ্চতার কারণে এখানে   অনেকক্ষণ কুয়াশার নরম আস্তরণে ঢেকে থাকে সমস্ত উপত্যকা, তারপর হঠাৎই ঝিলিক দেয় উজ্জ্বল রোদ, আবার
 দুপুর তিনটের পর থেকেই রোদ মরে আসতে থাকে , ঈরা প্রত্যেকদিন এই ঢালটার সামনে এসে একটু সময় দাঁড়ায়, এখান থেকে দেখা যায় উল্টোদিকের দূর পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে থাকা দুটো অপূর্ব ঝর্ণাকে,  বৃষ্টি হলে জল বেড়ে যায় তখন খরস্রোতা ঝর্ণার ঝরঝর শব্দও কানে আসে,  তবে গত এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হচ্ছে না,  তাই আজ সেই শব্দটা নেই,  কেমন যেন নিস্তব্ধতা চারপাশে,  হঠাৎ কানে এলো ঢং ঢং , মনে হয় কাছে পিঠে কোথাও মন্দির আছে,  পূন্যার্থীরা পুজো দিতে এসে ঘণ্টা বাজায় , সেই শব্দই প্রতিধ্বনিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে,  কি দেবতা অথবা দেবী?  আসলে ঈরার ক্যাম্পাস থেকে বের হবার তেমন কোন দরকারই পড়েনি,  ছোটখাটো শপিংমল থেকে শুরু করে সিনেমা হল এবং ডে নাইট ক্যান্টিন রয়েছে স্টুডেন্টদের সুবিধার জন্য। পুরো সময়টা নিজের স্টাডির জন্য দিতে পেরে ঈরার খুবই ভালো লাগছে। সকাল থেকে রেগুলার ক্লাস তারপর লাইব্রেরি  , বহির্জগতের সঙ্গে এখন শুধু নেটের মাধ্যমেই জুড়ে আছে , ছোট্ট এয়ারপোর্টটা থেকে গাড়িতে করে  ক্যাম্পাসে  ঢোকার পর আজ পর্যন্ত আর বাইরে যাওয়া হয়ে ওঠেনি , তবে পুরো সিস্টেমটার সঙ্গে এডজাস্ট প্রায় হয়ে এসেছে,  এখন একদিন শহরটিতে ঘুরে আসতে হবে,  এই যেমন মন্দিরটা দেখে আসবে বা দূর পাহাড়ের ঝর্ণাটাকে খুব কাছ থেকে দেখবে । ঐ যে পাকদণ্ডী পথটা অনেক নিচে চলে গেছে সেই পথটা দিয়ে নামলেই বোধহয় ওখানে পৌঁছুনো যাবে। 

 East Indian Institute of Mathematical Sciences (EIIMS) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল
 1983 তে পাহাড়ে ঘেরা এই ছোট্ট শহরে, 
মোট ছাত্রসংখ্যা: ~500 (PG এবং PhD) সহ , সঙ্গে রয়েছেন প্রফেসররা আর অজস্র কর্মচারী যারা প্রতিষ্ঠানের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ অব্দি সব ম্যানেজ করেন। সংস্থাটির ফান্ডিং আসে মূলত NBHM (National Board of Higher Mathematics), CSIR, DRDO, এবং আন্তর্জাতিক অন্যান্য  গবেষণা সংস্থা থেকে  

EIIMS এর মূল  প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট গণিতবিদ ডঃ শচীন্দ্রনাথ মিত্র, যিনি কেমব্রিজ থেকে ফিরে এসে ভারতীয় পিওর ম্যাথেম্যাটিক্সে গবেষণার আন্তর্জাতিক মান গড়তে চেয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির মিশন ছিল "Mathematics for Truth and Transformation"। ধীরে ধীরে এটি স্বাধীনতার পরবর্তী প্রজন্মের মেধাবীদের  গবেষণার জন্য একটি  নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে। ম্যাথমেটিক্সের  অনেকগুলো বিভাগের মধ্যে EIIMS এর অন্যতম একটি প্রধান বিভাগ হলো ,  Department of Algebra & Number Theory,যেখানে প্রধানত যে বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করা হয় সেগুলো হলো – এলিপটিক কার্ভ, গ্যালোয়া থিওরি, ক্রিপ্টোগ্রাফি ইত্যাদি । ঈরার বিষয় হলো ক্রিপ্টোগ্রাফি। 
শুধুমাত্র এই বিষয়েই এখানে রয়েছে Cryptography Research Wing (CRW): DRDO-এর সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত সাইবার সিকিউরিটি গবেষণা শাখা । ছোট থেকেই অংক ছিল ঈরার নেশা, সংখ্যার জগতে একবার ঢুকে যেতে পারলে সে যেন নিজেও একটি সংখ্যা হয়ে যেত। ঈরার বাবা বিজিত রায় স্বনামধন্য স্কুল শিক্ষক, ওনার বিষয় পদার্থবিদ্যা, তবে মেয়ের অংক নিয়ে এই আগ্রহকে যে একটি বৃক্ষে পরিনত করতে হবে সেই স্বপ্ন তিনি ছোট থেকেই ঈরার মধ্যে বপন করতে পেরেছিলেন, আর দুরন্ত মেধাবী ঈরার স্বপ্ন ছিল একটু চ্যালেঞ্জিং বিষয় নিয়ে গবেষণা করবে। ক্রিপ্টোগ্রাফি  তথ্যকে নিরাপদভাবে আদানপ্রদান করার বিজ্ঞান, যা আজকের ডিজিটাল যুগে – বিশেষ করে অনলাইন লেনদেন, সাইবার নিরাপত্তা, এবং মিলিটারি কমিউনিকেশন – এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আসা যাওয়ার পথে বিভিন্ন ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গে দেখা হয়,  কারো কারো সঙ্গে শুধু মুখ চেনা আর
কয়েকজন আছে যাদের সঙ্গে মাত্রই কথা বলা শুরু হয়েছে ।
হোস্টেলে পৌঁছে ব্যাগটা টেবিলে রেখে একটু টানটান হয়ে শুতেই বাবার ফোন,  হ্যালো বলতেই বাবা হাউমাউ করে উঠল,  কলকাতার আর জি কর মেডিকেল হাসপাতালে রাতের বেলায় একজন পি জি স্টুডেন্টকে কে বা কারা ওন ডিউটি নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুন করেছে,  মোবাইলে নিউজফিডে এ বি পি আনন্দের খবরে এটা সকালবেলায় দেখেছিল ঈরা , তখন ততটা গুরুত্ব দেয়নি,  ক্লাশ শুরু হয়ে যাবে তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছিল, বাবার গলার স্বরে প্রচুর টেনশন এবং উত্তেজনা,  সাবধানে থাকিস মামণি , ঘরের দরজা ভালো করে আটকে ঘুমাস,  ঈরা সবকিছুতেই হ্যাঁ বলে বাবাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল,  কিন্তু এক অজানা ভয়  শিরশির করে ঈরার মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে পায়ের পাতা অব্দি  পৌঁছে গেল। থম মেরে বসে রইল বিছানায় ,   লাইট পর্যন্ত জ্বালাতে ভুলে গেল ।
ফেসবুকে ঈরার একটি একাউন্ট আছে বটে তবে ফ্রেন্ডলিস্ট খুবই ব্যক্তিগত পরিসরে আবদ্ধ,  সেখানে কয়েকজন স্কুল কলেজের ক্লাসমেট ও আত্মীয় স্বজন ছাড়া ঈরার ফ্রেন্ডলিস্টে আর কেউ নেই । প্রোফাইলটিও লক করা,  ঈরার কিশোরীবেলার একটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি ছাড়া আর কোনো ছবি নেই প্রোফাইলে। পড়াশোনায় ডুবে থাকায় ঈরা অনেককিছু থেকেই নিজেকে সরিয়ে রাখে,  ডিনারের পর কয়েক ঘন্টা নিবিড় পড়াশোনা করে তারপর ঈরা ঘুমোতে যায়। আজ মোবাইল খুলতেই সেখানে শুধু আর জি কর,  কিছুক্ষণ পর ঈরা নিজেকে ফেসবুক থেকে লগ আউট করল। 
হোস্টেলের ঘরে ঘরে এখন লাইট জ্বলছে,  সবাই পড়তে বসেছে , ঈরার ঘরটি দুজনের জন্য,  কিন্তু রুমমেট মেয়েটি  একমাসের মতো থেকেই চলে গেছে বাড়িতে , ওর নাকি বিয়ের কথাবার্তা চলছে , এতো ভালো পি এইচ ডি ‘র সুযোগ ছেড়ে কেউ বিয়ে করে? গুয়াহাটি থেকে আসা নিতান্তই অপরিচিত মেয়েটিকে ঈরা  খুব করে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল , মেয়েটির স্তব্ধতা ঈরাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল কোথাও একটা অপারগতা আছে,  তবে যাওয়ার দিন ঈরাকে জড়িয়ে কুহু নামের মেয়েটি কেঁদেছে খুব , তারপর বলেছে দেখো আমি আবার আসব। যদিও কুহু এখনো আসেনি। ঈরা মনেপ্রাণে চাইছে কুহু ফিরে আসুক,  দেরি হয়ে যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসগুলো চলে যাচ্ছে,  তাছাড়া কুহুর সাবজেক্ট এক্সপার্ট মিঃ কুলকার্নি স্যার নাকি ক্যালিফোর্নিয়া চলে যাচ্ছেন কোন একটি সেমিনারে যোগ দেবার জন্য,  প্রায় দুই থেকে তিনমাস থাকবেন সেখানে,  ঈরার বিষয়ের সঙ্গেও তিনি খানিকটা জড়িত তাই ওনার ক্লাশগুলো আজকাল রোজ হচ্ছে। কুহুর ফোন নং আছে ঈরার কাছে, দুদিন ফোন করেছিল,  কুহু ধরেনি। 

মন বসছে না,  খুব স্বাভাবিক। ঈরা জানলার পাশে এসে দাঁড়ালো। এখান থেকে ক্যাম্পাস লেকটা স্পষ্ট দেখা যায়, এতো উঁচুতেও এই লেকে জল থাকে,  কিছুটা কৃত্রিম উপায়েও মেন্টেন করা হয়। একটি ফ্লাড লাইট সারা রাত জ্বলে,  তাই জায়গাটি আলোকিত,  দুজন ভদ্রলোক লেইকের কিনারে বেঞ্চিতে বসে আছে,  এখনো রাত নটা বাজেনি , নটার পর ক্যাম্পাসে স্টুডেন্টদের ঘোরাঘুরি করা নিষিদ্ধ । তারা বোধহয় স্টুডেন্ট,  ভারী জ্যাকেট ও টুপি থাকায় চেহারা একদমই অস্পষ্ট।
ম্যাথমেটিক্স কী খুব বোরিং ? লেকের পাশে একটি সাইনবোর্ড। সেখানে একটি মজার লাইন লেখা আছে। রাতের বেলাতেও লেজার লাইটের জন্য লাইনগুলো দূর থেকে দেখা যায়
 ‘∑(Love) = Undefined’

ঈরা মনে মনে ভাবছে , সিগমা (∑) দিয়ে আমি শুধু সংখ্যার যোগফল নয়, যন্ত্রণাও গুনে দেখি। Discrete হয়েও তো জীবন একটা Series।

আত্মকথন, চিরশ্রী দেবনাথ

আত্মকথন

 চিরশ্রী দেবনাথ


 অকবিতায় বিশ্বাস করি। অকবিতা কবিতার প্রাণবিন্দু, স্বার্থহীন প্রেম।  অকবিতার নগ্ন ডানায় ভর করে আমার নিঃসঙ্গ ভ্রমণকে আমি প্রণাম করি।

কৈলাসহরে জন্ম। বাবা  রাধাগোবিন্দ মজুমদার দিনরাত লেখালেখি বইপত্রে ডুবে থাকতেন। অধ্যাপক মহাশয়ের দীন ঘরে সমস্তদিন ছাত্রছাত্রীদের ভিড় । সংস্কৃত সাহিত্য , নাটক , বেদ বেদান্ত গীতা উপনিষদ আর দর্শনের  অবিরাম চর্চা সেখানে। সেজন্যই বোধহয় অকালপক্ক অনুভবের একটি অবৈধ অনুপ্রবেশ আমার ভেতরে ঘটে গিয়েছিল। 

দুষ্মন্ত, শকুন্তলা আর দুর্ব্বাশা মুণির নিরন্তর আনাগোনা সেখানে। 

মনুনদীর চোরা ঘুর্ণির মতো এই  ফাঁদ আমাকে শেষপর্যন্ত লেখালেখির জগতে টেনে এনেছে।

 আমি  বাবুর ছোট মেয়ে পড়ার বইয়ের চাইতে  গল্পের বই  অনেক বেশি  পড়ি। কলেজ লাইব্রেরি আর শহরের পাবলিক লাইব্রেরি থেকে প্রচুর বইয়ের নিয়মিত জোগান পেতাম। তবে কবিতা বলতে তখনও রবীন্দ্র নজরুল সুকান্ত আর ইস্কুলের পাঠ্যবই।

দৈনিক সংবাদের ছোটদের পাতায় গল্পও লিখে

ফেলতাম মাঝে মধ্যে । মনের মধ্যে তখন থেকেই অমসৃণ দুর্বিনীত কথাবার্তার ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বাসা বেঁধেছে অজান্তে ।



সেইসময় হেমন্ত ঋতু মানে দীর্ঘ আর গভীর এক শীতকালের সূচনা মাত্র । মফসসল শহরের শান্ত সন্ধ্যায়  চরাচর ঢেকে যেত কুয়াশায়। 

সন্ধ্যাবাতির কাঁসর আর উলুধ্বনিতে পাড়ার এই বাড়ি ও বাড়ি মুখর হয়ে উঠত। সাইকেল চালিয়ে বিরহকাতর যুবকেরা মহম্মদ রফির দু কলি গান গেয়ে বাড়ির পথে যাচ্ছে। নেশাগ্রস্ত  রিক্সাওয়ালারাও  জোড়সে এবং সুরেলা গলায় গান গাইত “ দেখা এক খোয়াব তো, ইয়ে সিলসিলা হুয়ে “

গ্যাসের সিলিন্ডার তখনো হানা দেয়নি আমাদের বাঁশের বেড়ার রান্নাঘরে। রাতের বেলা শ্রীমতি মায়ারানি মজুমদার ,বরিশাল কন্যা এবং আমার মা ভাত রান্না করছেন। উনুনে ঠেলে দিচ্ছেন শুকনো লাকড়ির টুকরো। গনগনিয়ে উঠছে আগুন। আমি  স্কুলে পড়ি,  রান্নাঘরেই চাটাই পেতে মার পাশে বসেই পড়ছি।

বহুদিন পর হলেও এই লাইনটি এখনও ভুলি না।

মাকে বলেছিলাম , “আগুনের পাশে তোমাকে আগুনগাছের মতো লাগছে মা” । এইরকম একটি নিভন্ত আগুন বুকের পাশে সবসময়ই জ্বলে রইল। কখনও নিভে যায়, মৃত গাছ ঠেলে দিই। সামান্য দাউ দাউ করে ওঠে ।



১৯৯৭ ,কলেজজীবন শুরু হলো করিমগঞ্জে ( বর্তমান নাম শ্রীভূমি)  । করিমগঞ্জ কলেজে এসে বন্ধুদের সঙ্গে দেয়াল পত্রিকার মাধ্যমে অপরিনত উচ্ছ্বাসকেই বলতাম কবিতা। সেখানেই পরিচয় হয় প্রাণজয় সিনহা  এবং অমিত দেব পুরকায়স্থের সঙ্গে। আমি ম্যাথমেটিক্সে অনার্স নিয়েছি। প্রাণজয় কেমিস্ট্রিতে আর অমিত পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছিল। ফিজিস্ক অনার্স। আর এক বন্ধু সমীর। তেলিয়ামুড়ার। সেও ছিল ফিজিস্কের। আমরা সাহিত্যচর্চা ভালোবাসতাম । প্রাণজয় তখন থেকেই ভালো কবি , তার খাতা ভর্তি কঠিন কঠিন প্রাজ্ঞ কবিতা । অমিত , কলকাতা থেকে এসেছে, সেই  আমাদের মধ্যে তখনো একমাত্র,  যে জয় গোস্বামীর “ যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল “ পড়েছে  এবং এর একটি জেরক্স কপি সে আমাদের  দিয়েছিল। টুয়েলভে পড়ার সময় আমি জয় গোস্বামীর উপন্যাস  “ সেইসব শেয়ালেরা “ পড়েছিলাম। কবিতা শুধু রেডিওতে ব্রততী বন্দোপাধ্যায়ের গলায় “বেণিমাধব “ শুনেছি। 

 সেইসব শেয়ালেরা আমাকে একটা ঘোরে ফেলেছিল আর যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল সেটা ছিল সত্যিই বেশ ঘোর বাদলদিন । জয় গোস্বামীর  কবিতার সঙ্গে এর মাধ্যমেই আমার  পরিচয় ঘটল নিবিড়ভাবে । তারপর থেকে কখনও তার কবিতায় ভিজেছি কখনও ভালো লাগেনি , আবার ফিরে ফিরে জয় গোস্বামীর কবিতা পড়ি । পরবর্তীতে এবং এখনো জয় গোস্বামীর  “গোঁসাইবাগান” প্রথম দুই খণ্ড” আমার কাছে অভিধানের মতো ।

 বহু কবিতা পড়া ছেলে অমিত । অকাতরে জ্ঞান দিত কবিতা নিয়ে। জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, শক্তি,  সুনীল,  সুভাষ,  মন্দাক্রান্তা  সবার কবিতা আস্তে আস্তে পড়ছি। ভাবছি পৃথিবীতে গল্প ছাড়াও কবিতা ছিল, যার শরীরে সৌন্দর্যের লোভনীয় খনি।

সেসময় অমিত আমাকে রাজাদা বলে একজনের কয়েকটি কবিতা পড়ায়। অনেকেই হয়তো চিনবেন রাজাদা হলো কবি সপ্তর্ষি বিশ্বাস । করিমগঞ্জেই তার পূর্ব বাড়ি ছিল এবং অমিতদের হয়তো বা পারিবারিক বন্ধু । আমি ওনার কিছু কিছু পংক্তি বার বার পড়তে থাকি। এই বুঝি কবিতা !!!

“ আমার একটি জাহাজ আছে বন্দর নেই

সঠিক বসতি নেই,  মুঠোভর্তি অযুত ঠিকানা “.

…সপ্তর্ষি বিশ্বাস ( রাজাদা)

এই দুটো লাইন কেন জানি এখনো স্মৃতিতে রয়ে গেছে। 

তবে কলেজ দেয়াল পত্রিকা পুনর্জ্জীবনের ক্ষীণ প্রচেষ্টা ও ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটি সাহিত্যপত্রিকা বের করার মাধ্যমেই আমার  কলেজস্তরের কবিজীবনের প্রাথমিক সমাপ্তি। বস্তুত অনার্সের অঙ্কের প্রভূত চাপ আর আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের  সেমিস্টার পদ্ধতির শুরুয়াৎ  আমাকে আর মাথা তুলতে দেয়নি। নিবিড় ও নীরস অসংখ্য সমীকরণের জালে আমি আটকা পড়ে যাই। 

 


২০০২ , শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ টিলায় ম্যাথস্ ডিপার্টমেন্ট । আর তার ঠিক নিচের টিলায় বাংলা ডিপার্টমেন্ট । ডঃ  তপোধীর ভট্টাচার্য তখন ভাষাতত্ত্ব বিভাগ ( linguistic Department )এর প্রধান ।

ইউনিভার্সিটি উইকে ওনার ভাষণ শোনার পর থেকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ওনার একটি ভাষণও মিস করিনি তা যে বিষয়ের ওপরই হোক না কেন। মাঝে মাঝে পেছনে বসে বাংলা ডিপার্টমেন্টে ক্লাশ করি , যা লেকচার চলছে তাই শুনি। লাস্ট বেঞ্চে বসে থাকলে স্যাররা তত লক্ষ্যও করেন না। আর করলেই বা কি।  আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অংক বইয়ের পাশাশাশি একটি করে বাংলা উপন্যাস আনি। দুটো বইই কেবলমাত্র নেওয়ার পারমিশন ছিল।  তখনো তো মোবাইল আসেনি আমাদের জীবনে, গল্পের বইই প্রধান আশ্রয় ছিল, দুপুরের দিকে ক্লাশ থাকলে সকালেই লাইব্রেরি চলে আসতাম , টুক করে একটা বাংলা গল্প বা উপন্যাস নিয়ে গণিত সেকশনে চলে যেতাম। কিছুক্ষণ চলত এম এস সির জন্য পড়া, সেমিনার টপিক বানানো তারপর গল্পের বই আর অজস্র ম্যাগাজিন ।  আমি দীর্ঘদিন দেবেশ রায় গল্প সমগ্র লাইব্রেরিতে বসে বসে পড়েছি।

উষশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো। বাংলা নিয়ে পড়ছে। আইরংমারার মেস বাড়ির রুমের দেয়ালে  কবিতার লাইন লিখে লিখে রাখে । উষষী ছিল ব্ল্যাক বিউটি । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে আমার প্রথম ভালোলাগা মানুষ যে বাংলা  কবিতার মাধ্যমে আমার কাছে এসেছিল। 

 বন্ধুত্বের পরিসর বাড়ল । ঠিক হলো হিজল নামে দেয়াল পত্রিকা বের করবো। শুধু বাংলা লেখাই থাকবে তাতে। 

আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের মুখেই ভাষা শহিদ বেদী । বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল এই মাটির সন্তানেরা।

ঊনিশে মে ভাষা শহিদ দিবসে শহিদ বেদিতে মাল্যদান ,  নাটক এবং ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে মৌন মিছিল শেষে প্রথম উন্মোচিত হলো ‘হিজল ‘ ।

 যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস, সমাজ সচেতনতা ইত্যাদি নিয়ে পাথরের মতো ভারী ভারী কবিতা লিখে হিজলের কাগজ আমিও কয়েকবার অলঙ্কৃত করেছি। সহসম্পাদকও হলাম তারপর। 

পৃথিবীর বুকে তখন তালিবান সন্ত্রাস। আফগানিস্থানে বানিয়ান বুদ্ধমূর্তি টুকরো টুকরো হয়েছে। এগারোই সেপ্টেম্বর নিউহয়র্কের টুইন টাওয়ার গুঁড়ো হয়েছে। ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ হয়েছে।

 বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর জুড়ে একদিন শান্তি মিছিল হলো।

ইউনিভার্সিটি উইকে রিসাইটেশন কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করলাম। আমি বাচিক শিল্পী নই ।অসুন্দর কন্ঠ। বহু ছেলেমেয়েরাই দারুণ সুন্দর পারফরমেন্স করল।

তখন আমার ধারণা ছিল কবিতাকে যত লম্বা করে লেখা যায় ততই নিজের জ্ঞান জাহির করা যায়। আমিও “ আফগানিস্তানের মেয়েরা “ এই শিরোনামে দীর্ঘ একটি কবিতা লিখলাম ।সেখানে সাম্প্রতিক বিশ্বের সব সমস্যাই তুলে ধরার ব্যাপক চেষ্টা করলাম। ভাষার গাম্ভীর্যে আর ঘটনার ঘনঘটায় আক্রান্ত সেই কবিতাই  রিসাইটেশন কম্পিটিশনে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে আবৃত্তি করলাম।

তখন লেখকরা বেশ স্বাধীন ছিলেন। ভেবে লিখতে হতো না কিছু।

চটপট বেশ হাততালি পড়ল। আমি তৃতীয় হলাম। 

সাহিত্যচর্চা মানেই যোগাযোগ। সহিত চর্চার ধারাবাহিকতা। তাই কয়েকদিনের মধ্যেই তখন শিলচর ও করিমগঞ্জের দু তিনটি লিটল ম্যাগে আমার অতি দুর্বল কিছু লেখা কবিতা নাম নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। কোনো এক কবিতা অনুরাগীর কল্যানে শিলচরের গান্ধীবাগে একটি কবিসম্মেলনে আমন্ত্রণপত্রও পেয়েছিলাম। যদিও জীবনের সেই প্রথম কবিসম্মেলনের মেদুর আমন্ত্রণে আমি যাইনি। 

চোখের পলকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে গেলো। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়কালীন কবিতাচর্চায় ইতি টানলাম।




তারপর কবিতাযাপন থেকে সুদীর্ঘতম বিরতি । কর্মলাভের প্রচেষ্টা, সাংসারিক জীবনে প্রবেশ,  সন্তানলাভ ইত্যাদি নিয়ে বহুদিন কেটে গেল।

 লেখালেখির জগতে ক্ষীণ একটি প্রবেশ ঘটল, পদ্য নয় গদ্য দিয়ে,  ২০০৯ সালে ত্রিপুরা তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প প্রতিযোগিতায় একটি গল্প প্রেরণ এবং প্রথম পুরস্কার লাভ । 

আমার শাশুড়ি মা সুনীতি দেবনাথ লেখালেখির সঙ্গে আজন্মকাল জড়িত। আর ধর্মনগরের একটি সুপ্রাচীন সাহিত্যপত্র হলো ‘ অনার্য ‘ ।

কিছুদিন বন্ধ থাকার পর কবিতা উপত্যকার কবিতাপ্রেমীরা সিদ্ধান্ত নেন আবার নিয়মিতভাবে

প্রকাশ করার। সেইসময় শ্রদ্ধেয় কবি রসরাজ নাথ,  রত্নময় দে,  সুজিত দেব এবং সেলিম মুস্তাফা সবার সঙ্গে পরিচিত হই। তারা সবাই আমাদের বাসায় নিয়মিত আসতেন,  কবিতাচর্চা হতো।  সেইসূত্রেই অনার্য পত্রিকায় আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। সেলিম মুস্তাফার নিজস্ব পত্রিকা “ পাখি সব করে রব “ এবং রত্নময় দে’ র “ঢিল “ পত্রিকা ও সুজিত দেবের “ অন্যধারা  “ পত্রিকায় আমি আস্তে আস্তে লিখতে শুরু করি। তখন সময়টা ২০১২–১৩,

২০১৪ সালে আমার স্বামী অরূপ আমাকে একটি স্মার্টফোন কিনে দেয়। এজন্য  আমি আজীবন কৃতজ্ঞ । পরবর্তীতে আরোও দুটো , যতবারই মোবাইল নষ্ট হয়েছে। তাই অরূপের এই সাহায্যটুকুছাড়া হয়তো আমার লেখক জীবনের শুরুই হতো না। 

 ফেসবুকে এলাম। ইভার নোট ,  গুগল ডক ইত্যাদি ডাউনলোড করলাম। তখন ফেসবুকে দিনের শেষে একটি লেখা পোস্ট করা ছিল আমার প্রতিদিনের কাজ। কবি সেলিম মুস্তাফা ফেসবুকে “ পাখি সব করে রবে “র একটি পেজ খুলেছিলেন। সেখানে কবিতা লিখতাম । সেইসব ধর্ষণ বিরোধী , নারীজাতির উন্নয়নপ্রকল্পে লেখা কবিতাগুলো কে পড়ত আমি জানিনা। তবে সেখানে একদিন একটি কমেন্ট পেলাম। আমার কবিতাজীবনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমেন্ট। কবি সমরজিৎ সিংহ বললেন , বক্তৃতার মতো লিখেন কেন?

আমি তখনও কবি সমরজিৎ সিংহকে চিনিনা। 

ফেসবুকে চিনলাম। ।

সেসময় ফেসবুক থেকেই চিনলাম কবি শ্বেতা চক্রবর্তীকে। জীবনের সেই পর্যায়ে শ্বেতা চক্রবর্তীর কবিতা আমাকে অত্যন্ত প্রভাবিত করেছিল। পেলাম “ মিলন সাগর “ বাংলা কবিতার আর্কাইভ এবং খুব অল্পদিনের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বহু কবির লেখা পড়ার সুযোগ । এখন সেই আর্কাইভে আমার কিছু কবিতাও স্থান পেয়েছে  ।

দেবারতি মিত্রের কবিতা পড়ে উপলব্ধি হলো নিজের দীনতার। 

 “পাখি সব করে রব” এর ফেসবুক পেজে গৌহাটি থেকে  সাংবাদিক ও কবিতাবোদ্ধা বাসব রায় মাঝে মাঝে আমার এক দুটি লেখায় মন্তব্য করতেন এবং তিনি বেশ কয়েকবার আমার কবিতা আসামের কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য নিয়েছিলেন। লেখালেখি শুরু করার সেই লগ্নে আমার জন্য এসব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 

বলতে গেলে তখন থেকেই ধীরে ধীরে কবিতাকে জড়িয়ে ধরি প্রাণপনে।

ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় ছিলেন  আইনবিদ শুভেন্দু ঘোষ। ওনার আগ্রহেই ২০১৬ তে আমার প্রথম বই “জলবিকেলে মেঘের ছায়া”

প্রকাশিত হয়। শ্রদ্ধেয় কবি নকুল রায় বইটি সম্পাদনা করে দেন। তখন কেউ কেউ বলেছিলেন কবিতার বইয়ের আবার সম্পাদনা কি। বই বের করা বা প্রকাশনা জগত সম্বন্ধে আমার কোনো ধারনা ছিল না। সেইসময় কেবল শুভেন্দু ঘোষ দাদার আগ্রহেই চিলড্রেনস পার্কে  আগরতলা বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন স্টলে খুব সম্ভবত ১৪ ই ফেব্রুয়ারি আমার বইটি প্রকাশিত হয়েছিল,  শুভেন্দু ঘোষদাদাই বইটির মোড়ক উন্মোচিত হয়েছিল। সেই সন্ধ্যায়  সেখানে ত্রিপুরার অনেক কবি সাহিত্যিকই ছিলেন যাদেরকে এতোদিন  শুধু ফেসবুকেই চিনতাম। তবে অনেক বই উপহার দিয়েছিলাম সেদিন, কবি শঙ্খ সেনগুপ্ত আমাকে তখন বলেছিলেন এইভাবে বই উপহার দিলে বইয়ের অমর্যাদা হয়। এই কথাটি  আজও মনে রাখি। তিনি আরও বলেছিলেন “জল বিকেলে মেঘের ছায়া” বইটির কবিতগুলোর সিলেকশন ভালো হয়নি। বইটির প্রচুর কপি এখনও আমার কাছে আছে। এই বইটির একটিমাত্র  কবিতা  ভালো লেখা বলে আমার মনে হয় ।

লেখাটি হলো


“এক হেমন্তসকালে

......

পৃথিবীর শেষতম স্টেশনে জ্বলে উঠে মাঝরাতে

স্বচ্ছ এক আলো, ধূসর এক স্টেশনমাস্টার কুয়াশাপাত্রে জমা করতে থাকে অতি সূক্ষ্ম জীবন্ত মেঘকণা,তারা আসলে সব মানুষ ঘুমিয়ে গেলে তার গহন থেকে বেরিয়ে আসা কষ্টগুলো, একটি কষ্টের গায়েও লেগে নেই  ময়লা, কী ভীষণ নরম প্রতিটি কষ্টবিন্দু, সার সার কুয়াশাপাত্র জমা হচ্ছে থেমে থাকা একটি ট্রেনের কামরায়, দূরতম কোনো  বর্তমানে রোবটেরা যখন ভালবাসা জাগানোর জন্য খেয়ে নেবে একচামচ অক্সিটসিন, তখন  এক হেমন্তসকালে সব কুয়াশাপাত্রের ঢাকনা খুলে যাবে, পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশুদ্ধ কষ্টবিন্দু আর তাকে জড়িয়ে থাকা  ভালবাসা স্পেকট্রাম …”


জানুয়ারি দুই হাজার ষোলতে, কবি শ্যামলেন্দু মজুমদার কলকাতা লিটিল ম্যাগ মেলায় প্রকাশিত  "রাত্রির কোরাস "এই লিটিল ম্যাগাজিনটিতে  চারটি কবিতা প্রকাশ করেছিলেন।  এটাই ছিল কলকাতার কোনো পত্রিকায় প্রথম কবিতা প্রকাশ। এছাড়া মধূসূদন দরিপা দাদা কর্তৃক প্রকাশিত আর্ষ পত্রিকার সঙ্গে তখনই আমার যোগাযোগ হয়, এখন পর্যন্ত আর্ষ পত্রিকা আমার প্রিয় একটি সাহিত্য পত্রিকা। 

 ঔপন্যাসিক শ্যামল বৈদ্য আগরতলার পূর্বমেঘ সাহিত্যপত্রিকার জন্য আমার কাছ থেকে একটি কবিতা নেন। উত্তর ত্রিপুরার বাইরে ত্রিপুরার অন্য জায়গার সাহিত্য পত্রিকায় সেই ছিল আমার প্রথম কবিতা প্রকাশ।

ফোটা মাটির সম্পাদক খোকন সাহা তার ফোটামাটি বিশেষ সংখ্যায় ত্রিপুরার দশজন কবিদের মধ্যে আমার কবিতাও রেখেছিলেন।

এসব স্মৃতি এখনো মনে হলে বেশ কবি কবি ভাব হয়। 

আমার প্রথম বইটির কাজ যখন চলছিল তখনই  ফেসবুকে বসন্ত ধুলো নাম দিয়ে  একটি কবিতা সিরিজ লিখতে শুরু করেছিলাম।

আস্তে আস্তে প্রত্যেকটি ঝতুকে নিয়েই লিখি ফেসবুকেই। এই সমগ্র ঋতুযাপনকে কাব্যগ্রন্থ বের করব বলে ডিসিশন নেই। আমি তখন খুব অস্থির। পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে জীবনের। পৃথিবীতেও লেখা হয়ে গেছে হাজার হাজার কবিতা। তবুও মনে হতে লাগল আমাকেও কবিতা লিখতে হবে। কুমারঘাটে  স্রোত প্রকাশনার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। প্রকাশক গোবিন্দ ধরকে বললাম একটি বই বের করতে চাই। 

স্রোত প্রকাশনার তরফে বইটি ছাপা হয়ে হাতে এলো। নাম রেখেছিলাম “ ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায় “ । প্রচ্ছদ নিজেই করেছিলাম। ছাপা হয়ে আসার পর দেখলাম তাতে অসংখ্য বানান ভুল । প্রকাশককে বললাম । তিনি বললেন বানানগুলো কারেকশন করে দিতে। কারেকশন করলাম,  পরবর্তী বইগুলোতে একটি পৃষ্ঠা যোগ করা হলো , যাতে ছিল ভুল বানানগুলোর সংশোধন পৃষ্ঠা নাম্বার সহ। এধরনের আজব জিনিস আর কখনো হয়েছে কিনা জানিনা। স্বপ্নের বইটির এরকম করুণ অবস্থার জন্য খুব মর্মাহত হলাম। তবে তিনি আমাকে স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত বেশ কিছু বই দিয়েছিলেন। যা আমাকে ত্রিপুরার সাহিত্য সম্পর্কে সেইমুহূর্তে জানতে বেশ সাহায্য করেছিল। হয়তো ভুল বানানে বই ছাপা হওয়াটাই আমার ভবিতব্য । 

কারণ আমার প্রত্যেকটা বইতেই একটা দুটো অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকেই যাচ্ছে। তার কারণ হলো সীমিত জ্ঞান ও তাড়াহুড়ো এবং যথোচিত যত্নের অভাব।  

 কবি এবং শাব্দিক পত্রিকার সম্পাদক সঞ্জীব বণিক শাব্দিকের একটি সংখ্যার জন্য আমার কাছে একবার একগুচ্ছ কবিতা চেয়েছিলেন । তখন  কোন কারণে আমার বাবার বাড়ি কৈলাসহরে গিয়েছিলাম। সেখানেই “প্রেমে সন্ত্রাসে “ নাম দিয়ে আটটি কবিতার একটি গুচ্ছ লিখে পাঠাই । কি করে যেন মনের মধ্যে আরো এক কবিতা রসায়ন সৃষ্টি হলো। নীহারিকা প্রকাশনা থেকে ২০১৮ সালে প্রকাশিত হলো তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “ প্রেমে সন্ত্রাসে “ । বইটি প্রকাশ করলেন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি এবং নানা গুণে গুণান্বিত ও সাহিত্য বোদ্ধা সকলের কাছে সুপরিচিত শুভাশিস  তলাপাত্র স্যার। বইটির প্রকাশ সন্ধ্যায় রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে তিনি “ প্রেমে সন্ত্রাসে “ বইটি নিয়ে কয়েকটি কথা বলেছিলেন যা আমার এই ক্ষণস্থায়ী, অস্থির কবিতাযাপনকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল এবং ওনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত সবসময়ই আমার ভুলগুলো দেখিয়ে দেয়।

“  আজকাল পত্রিকায় আরোও কয়েকজন তরুণ কবির কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করার সময়  কবি , সুসাহিত্যিক  ও অধ্যাপক সুমন গুণ “প্রেমে সন্ত্রাসে” বইটি নিয়েও কয়েক লাইন লিখেছিলেন ।হয়তো এর চাইতে বেশি আলোচনা পাবার অধিকারি তখনো আমি হয়ে উঠিনি।

তারপর থেকে নীহারিকা প্রকাশনার তীর্থঙ্কর দাশ আমার অন্যতম সুহৃদ। পরবর্তী প্রায় সবগুলো বইই নীহারিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালে  কবি অমিতাভ কর দাদা ত্রিপুরার কয়েকজন তরুণ কবির এক ফর্মা বই নীহারিকা থেকে প্রকাশ করার দায়িত্ব নেন। এবং তিনি আমাকেও আমন্ত্রণ জানান। সেইসময় ওনার আগ্রহেই  প্রকাশিত হয় এক ফর্মার বই “ ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স “ । তিনি তাঁর মায়ের নামে নীহারিকা প্রকাশনার মাধ্যমে  চালু করেন সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মাননা।   যার প্রথম প্রাপক হবার সৌভাগ্য অর্জন করি। সামান্য জীবনে কবিতাকে আশ্রয় করে এইসব প্রাপ্তি আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান ।

কলকাতার গুরুচণ্ডা৯ প্রকাশনা থেকে সায়ন কর ভৌমিক আমার কাছে একটি একফর্মার কবিতার পাণ্ডুলিপি চান। সেখান থেকে কলকাতা বইমেলায় ২০১৮-১৯ সালেই প্রকাশিত হয়

 কাব্যগ্রন্থ “ বিশ্বাসের কাছে নতজানু “ । এজন্য সায়ন কর ভৌমিক ও ঈপ্সিতা পাল দুজনের প্রতি আমার ভালোবাসা সবসময়  অক্ষুণ্ন ।  

কবি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় কাব্যগ্রন্থটির একটি ক্ষুদ্র পাঠ প্রতিক্রিয়াও দেন।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত একদা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত “ কৃত্তিবাস “ পত্রিকা তখনো বন্ধ হয়নি। এই সময় কালে কৃত্তিবাস পত্রিকায় আমার লেখা “ প্রাগজ্যোতিষপুরে “ কবিতাটি প্রকাশিত হয় এবং এইসময়ই আমার একটি ছোট গল্প “ ব্যারনফিল্ড “ অবলম্বনে তৈরি হয় একটি সর্ট ফিল্ম। আনন্দবাজার স্কুলে এ পত্রিকায় দুটো ছোট গল্পও প্রকাশিত হয়। একদম খুশির সীমা নেই তখন। বস্তুত এই সবকিছুই হয়েছিল স্যোসাল মিডিয়ায় লেখালেখির সুবাদে। তাই আমার কাছে এখন লেখালখির  সবচেয়ে বড় মাধ্যম স্যোসাল মিডিয়া ।

ত্রিপুরার বিদগ্ধ  কবি ও সাহিত্যিক মিলনকান্তি দত্ত “ ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায় “ এবং কাব্যগ্রন্থ “ শুভ দ্বিপ্রহর “ নিয়ে ফেসবুকের দেয়ালে দুটো পাঠ প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। নতুন লিখতে আসা যেকোন লেখক  এইসব   প্রাপ্তি আজীবন মনে রাখে এবং সেখানে পূর্বজ সাহিত্যিকের জন্য একটি চিরস্থায়ী শ্রদ্ধার আসন আঁকা হয়ে যায়।  

এখন আর বলতে বিশেষ লজ্জা পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে কবিতাই লিখছি । কবি সম্মেলনে গিয়ে কবিতাপাঠ করার জন্য মন তখন ব্যাকুল । মনে হতো কবি সম্মেলনে কবিতাপাঠ না করলে বোধহয় কবিত্বের স্বীকৃতি হয় না। এদিকে তখনো কোন আমন্ত্রণ পাচ্ছি না। যে সময়টার কথা বলছি সেটা হলো ২০১৫–১৬ । একুশে মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে ধর্মনগর পোয়েটস ইউনিটের পক্ষ থেকে বিশ্ব কবিতা দিবস পালন করা হয়। শ্রদ্ধেয় কবি হৃষিকেশ নাথ আমাকে ফোন করে কবিতা পাঠ করার আমন্ত্রণ জানান। সেটাই প্রথম কবি সম্মেলনে কবিতাপাঠ। প্রত্যেক বছর ধর্মনগর পোয়েটস ইউনিটের উদ্যোগে বিশ্ব কবিতা দিবসের এই অনুষ্ঠান আমার কাছে অন্য সব অনুষ্ঠানের থেকে দামি। কবি হৃষিকেশ নাথ সম্পাদিত “ শব্দনীল ‘ এবং  নিবারণ নাথ সম্পাদিত “ নীলকন্ঠ “ বিধানচন্দ্র দে সম্পাদিত “ সন্ধিক্ষণ “ পত্রিকায় লেখার সুযোগও পেয়েছি। কবিতা পাঠের আসরে কবিতা বিনিময় হয়। তবে কবি সম্মেলনে কবিতাপাঠ করা অপেক্ষা সবার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ্রহটাই আজকাল বেশি আকর্ষণ করে। কিন্তু কবি সম্মেলনে পাওয়া উত্তরীয়কে বড্ড ভারী মনে হয়, ফুলের তোড়া জলে ডুবিয়ে রাখি তবুও শুকিয়ে যায় কয়েকদিন পর, শুভেচ্ছা স্মারকগুলো ব্যাগে করে কোথায় রাখি আর মনে থাকেনা , কলমটা মেয়েকে দিয়ে দিই, রাইটিং  প্যাডে অবান্তর হিসেব লিখি । এর চাইতে দীর্ঘ কবিতা কি কোনো কবি লিখতে পারেন? 

ধর্মনগরে কবি সেলিম মুস্তাফা , সুবল চক্রবর্তী এবং এক ঝাঁক মেধাবী তরুণ কবিদের আগ্রহে প্রত্যেক রবিবারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে “ কথা ও কবিতার আসর “ ।  কবিতাপাঠের অন্য নাম 

‘আনন্দ ‘ ,  মধ্যবয়সে  এটাই অনুভব করি।

 সেলিম মুস্তাফা আমার “ প্রেমে সন্ত্রাসে “কবিতার বইটির একটি দীর্ঘ পাঠ প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। এখনও তিনি প্রশংসা ও সমালোচনা দুটোই খোলামনে করেন। 

ফেসবুকে এসে বহু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। তাদের মধ্যে অনেকই আছেন কবিতার সঠিক সমালোচনা করেছেন।  আছেন  সাহিত্য বোদ্ধা এবং বর্তমানে পারিবারিক বন্ধু 

 সজ্জন ভদ্রলোক কানুলাল দাশ , তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের আধিকারিক দেবাশিস নাথ,  দেবাশিস পাল ,  কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য , কবি তমেলশেখর দে,  কবি সত্যজিৎ দত্ত, গল্পকার দেবব্রত দেব,  সাহিত্যিক দেবব্রত দেবরায়, কবি বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী,   কলকাতার দৌড় পত্রিকার সম্পাদক মধুমঙ্গল বিশ্বাস , মধুমিতা নাথ, অর্পিতা আচার্য,  দেবাশ্রিতা চৌধুরী এবং আরোও অনেকে।

 যার কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তিনি হলেন কবি সম্মেলন পত্রিকার সম্পাদক  কবি শ্যামলকান্তি দাশ। আর যিনি আমাকে শ্যামলকান্তি দাশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি হলেন কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কবি সম্মেলন পত্রিকার সঙ্গে আমার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। কবি সম্মেলনে  গুচ্ছ কবিতা প্রকাশ সহ প্রায় প্রত্যেকটা বিশেষ সংখ্যাতেই কবিতা লেখার সুযোগ পেয়েছি। 

 কৃত্তিবাস চক্রবর্তী ত্রিপুরার অন্যতম প্রধান সাহিত্য পত্রিকা ভাষা সাহিত্যের জন্য  আমার একগুচ্ছ কবিতা নির্বাচন করেছিলেন । কবিতাগুচ্ছটির নাম ছিল “ রাজগৃহে “ । পরে আরো কয়েকবার ভাষাসাহিত্যে কবিতা ও গল্প বেরিয়েছে । কিন্তু প্রথম প্রকাশ অনেক বেশি গৌরবের । 

সদ্য প্রয়াত কবি ও সাংবাদিক জ্যোতির্ময় রায় কর্তৃক সম্পাদিত “ প্রজন্ম চত্বরে “  লেখার সুযোগ পেয়েছি বহুবার । ধর্মনগর বইমেলায় কবি সম্মেলন সঞ্চালনায় জ্যোতির্ময় রায়কে দেখেছি একজন সুযোগ্য রসিক সঞ্চালক হিসেবে। 

কবি সন্তোষ রায় কর্তৃক সম্পাদিত “ জলজ “ সাহিত্য পত্রিকায় যেদিন কবিতা পাঠানোর আমন্ত্রণ পেলাম,  বেশ আনন্দ হয়েছিল । কোন কোন পত্রিকা নিজ প্রসাদগুণে সতন্ত্র। তাই সেসব পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হলে ভালো লাগে । জলজ তেমনই একটি পত্রিকা।


বাচিক শিল্পীদের গলায় কবিতা পূর্ণতা পায়। এই সামান্য কবির কবিতা চেনা অচেনা অনেকেই আছে। ত্রিপুরার খ্যাতনামা বাচিক শিল্পী ইন্দ্রানী চক্রবর্তী তার আবৃত্তি সংস্থা শ্রুতিপুরমের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে অনেকবার আমার কবিতা আবৃত্তি করিয়েছেন। এছাড়া বাচিক শিল্পী সুনন্দা দেবনাথ, নির্ঝর পাল, সংহিতা সিনহা,  জয়ত্রী চক্রবর্তী , মধুমিতা ভট্টাচার্য , গৌহাটির  কবি ও বাচিক শিল্পী  দেবলীনা সেনগুপ্ত  এবং আরোও অনেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমার কবিতা পড়েছেন।  

 কাজী নজরুলের জন্মদিনে  আমার একটি কবিতার ভিডিয়োগ্রাফি করেছেন বাংলাদেশের

নিশাত শারমিন শান্তা। 

আট বছর ধরে আমরা চার বন্ধু মিলে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করি । চিত্তরঞ্জন নাথ,  মৌলিক মজুমদার এবং রাহুল সিনহা ও আমি। নাম “ কীর্ণকাল “ । কীর্ণকাল বিষয়ে আমাদের একটিই অহংকার  কীর্ণকালে বাজে কবিতা ছাপা হয়না।

যদিও বছরে একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় তবুও কীর্ণকাল কিছুটা হলেও বর্তমান কবিতাসময়কে ধারণ করে ।

করোনাকালে ভ্রাতৃসম কবি অভিজিৎ চক্রবর্তী ও আমি কবিতা নিয়ে একটি কথোপকথনধর্মী বই লিখেছিলাম ।  বইটি খুব কম লোক পড়েছেন।

কিন্তু নিরিবিলি এই বইটি আমার খুব প্রিয়, কেন যেন কম প্রচারিত ও কম জনপ্রিয় বই কবির অচেনা অভিমানকে ধারণ করে।

জল বিকেলে মেঘের ছায়া, ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায়,  প্রেমে সন্ত্রাসে, ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স , বিশ্বাসের কাছে নতজানু, শুভ দ্বিপ্রহর,  উড়িয়ে দিও, তারা মেঘের মতো , সংলাপ কাব্যগ্রন্থ “ সোমবার সন্ধ্যায় “ , দুটো দীর্ঘ কবিতা “শোক ও শিউলি “ আমার যাপনকালের এক একটি মুখ । তারা সবাই এক সঙ্গে থাক এটাই চেয়েছি শুধু। 

অনেক বেশি কথা বলে ফেললাম। এবার শেষ করি,  চিরশ্রী দেবনাথের একটি ক্ষীণ পরিচয় আছে , কেউ কেউ বলেন শুনেছি,  ঐ যে ফেসবুকে কবিতা টবিতা লেখে । আমরা এই সমাজে বাস করি যেখানে কবিতার সঙ্গে টবিতা যোগ করে কবির শিল্পসুষমাকে ব্যক্ত করা হয়। হাসি পায়,  দুঃখ তো হয়ই না , অপমানবোধও মরে গেছে। কবিতা এলে কবিতা লিখব , না এলে লিখব না , নাই বা থাকল তাতে বিশুদ্ধ ছন্দের কারিগরী, জীবনের যে সময়কে আশ্রয় করে কবিতা গড়ে ওঠে তার চেয়ে সৎ উচ্চারণ আর নেই,  উপনিষদের ভাষায় “আত্মানং বিদ্ধি “ ।  নিজেকে জানার এই যে বিচিত্র সুযোগ তাকে যত্ন করা আমার দায়িত্ব, বাকিটা পাঠক বলবেন ।










মামেকং শরণং ব্রজ

মামেকং শরণং ব্রজ

শ্রীকৃষ্ণের তখন পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে,  যদুবংশ ধ্বংসের শেষ সীমায় আগত, হিংসা,  হানাহানি, মেয়েদের ওপর অত্যাচার, লোভ সবমিলিয়ে পাপের ঘড়া পরিপূর্ণ এমনই এক ক্রান্তিকালে শ্রীকৃষ্ণকে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন উদ্ধব। শ্রীকৃষ্ণ এবং উদ্ধবের মধ্যে এই যে কথোপকথন এটাই উদ্ধব গীতা। কে এই উদ্ধব?  তিনি শ্রীকৃষ্ণের পিতা বাসুদেবের ভাইয়ের ছেলে,  সম্পর্কে কৃষ্ণের ভাই এবং তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভক্ত । জীবনের শেষ সময়ে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বলেছিলেন আমার কাছে প্রত্যেক ভক্তই কিছু না কিছু চেয়েছে কিন্তু তুমি তো কখনো কিছু চাইলে না। তখন উদ্ধব বলেছিলেন আমি আপনার কাছে শুধু কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাই , আপনি দেবেন ? 
শ্রীকৃষ্ণ যেন খুব কষ্টে তাঁর ভুবনমোহনকারী হাসিটি দিলেন,  বললেন করো।
ভগবদ্গীতা যদি যুদ্ধক্ষেত্রের দর্শন হয় তবে  উদ্ধব গীতা হলো জীবনের শেষপ্রান্তের আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ।
উদ্ধবের করা প্রশ্নগুলোর মধ্যে  একটি বিখ্যাত প্রশ্ন হলো,
আপনি তো ভূত ভবিষ্যত সবই জানেন তাহলে সেদিন আপনি যুথিষ্ঠিরকে কেন পাশা খেলা থেকে বিরত করলেন না ? 
উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বললেন , 
আমি পাণ্ডবদের আজীবনের উপকারী বন্ধু ছিলাম । তাঁরা আমাকে ভগবানের মতই বিশ্বাস করত। কিন্তু যুথিষ্ঠির যখন দুর্যোধনের আহ্বানে পাশা খেলায় সম্মতি দেয় তখন সে একবারের জন্যও আমার পরামর্শ চায়নি। এমনকি কৌরবদের সভায় সদলবলে উপস্থিত হয়েও সে আমাকে একবারও ডাকেনি ।দুর্যোধন পাশা খেলতে পারদর্শী নয় তাই সে তার বিবেক ও বিবেচনা মামা শকুনিকে দিয়ে দিয়েছিল,  পাশাও সেই খেলেছিল দুর্যোধনের হয়ে,  যুথিষ্ঠিরও একইভাবে আমাকে তাঁর জায়গায় পাশা খেলতে দিতে পারত তাহলে তো এই ভারতকথাই অন্যরকম হতো। কিন্তু সুতীব্র অহংবোধে তখন ধর্মরাজ যুথিষ্ঠির আক্রান্ত। পাঁচ ভাই এবং দ্রৌপদী কেউ তখন আমাকে মনে করেনি। দুঃশাসন চুল ধরে টেনে আনার সময়ও দ্রৌপদী আমাকে ডাকেনি , 

 সব শেষে বস্ত্রহরণের সময় নিরুপায় হয়ে  দ্রৌপদী আমাকে ডাকল

" হে হরি অভয়ম
হে কৃষ্ণ অভয়ম "

এবং আমি উপস্থিত হলাম।

অহং,  ক্ষমতা ও লোভ  মানুষকে উপকারী বন্ধুর কথা মনে করায় না,  ভগবানের প্রতি বিশ্বাসকে টলিয়ে দেয় তখনই তার বিনাশ হয়। এটাই যুগান্তর। আমরা সবাই এই কালচক্রের দাস। এই যেমন আমি নিজের হাতে মদমত্ত যদুবংশ শেষ করে যাচ্ছি কারণ তারা এখন শুধু অন্যের ক্ষতির কারণ হবে।

মহাভারতের প্রত্যেকটি ঘটনা এখন যেন আবার পুনরাবৃত্ত হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে ।
মোমবাতি মিছিলে হারিয়ে যাওয়ার দেশ এই ভারত নয়। এখানে তো নারীর অপমানে লঙ্কাকাণ্ড বা কুরুক্ষেত্র হয়েছে। বদলে গেছে সময়।

শ্রীকৃষ্ণ প্রত্যেকটি সময়ের প্রতিভূ যিনি বলেন কর্ম করো কিন্তু আসলে তুমি কেউ নও। ভগবান তোমাকে প্রত্যক্ষ কোনো সাহায্য করবেন না শুধু
তোমার ভালো ও খারাপ প্রত্যেকটি কাজের ফল তোমার জ্ঞানে এবং অজ্ঞানে দিয়ে যাবেন। এখন তোমাকেই ভাবতে হবে তুমি পাপের সঙ্গে থাকবে না শুভবোধের সঙ্গে।

কুরুক্ষেত্রের যু্দ্ধে অভিমন্যুর নৃশংস হত্যার পর চরম বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে বোঝাবার জন্য শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে আত্মা লোকে নিয়ে যান।
সেখানে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে অর্জুন দেখলেন অভিমন্যু তাঁর ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন করার সুফল নিয়ে প্রসন্নমনে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
অর্জুন তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন ।বলছেন আমি তোমার পিতা হে পুত্র।
অভিমন্যু অবাক হয়ে বলছেন কে কার পিতা ? আমাদের হাজার জন্ম হয়েছে হয়তো। কোনো জন্মে আমি তোমার পিতা কোনো জন্মে তুমি আমার।
আত্মা তো অবিনশ্বর।
এখন আমরা যদি পরজন্মে বিশ্বাস করি তবেই হয়তো মোক্ষযোগের  দর্শন এবং লোভকামপাপপ্রেমহিংসা ত্যাগ করে অক্ষয় আলোর এই  স্তরে পৌঁছুতে পারব।
  

#চিরশ্রীদেবনাথ