সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , চিরশ্রী দেবনাথ

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

চিরশ্রী দেবনাথ



পর্ব ছয়


সকালের ব্রেকফাস্টে ছিল উপমা, চা , একটি কমলা ও এক মুঠো ড্রাই ফ্রুটস । এতোটা একসঙ্গে খেতে পারে না ঈরা , ফল আর ড্রাই ফ্রুটসগুলো রেখে দেয়,  পরে খিদে পেলে খায়। 

হোস্টেলের খাওয়াদাওয়া খুব ভালো লাগে ঈরার ।মোটামুটি একটা ব্যালেন্সড ডায়েট মেন্টেন করে ওরা । শিলচরে নিজের বাড়িতেও ঈরা এতোটা সুন্দরভাবে খাওয়া দাওয়া করত না আর তারপর আরো হোস্টেল ও মেসে কেটেছে এতগুলো বছর , সেখানেও খাবারের তেমন নির্দিষ্ট মেনু ছিল না,  যাকে বলে হেলদি ফুড। আসলে হেলদি খাবার সুস্থভাবে পড়াশোনা করার জন্য খুব দরকার।

আর জি কর নিয়ে কয়েকদিন একটা চাপান উতোর থাকবে,   এড়িয়ে যাওয়া যাবেনা , সেটা চায়ও না ঈরা , কিন্তু খুব বেশি ঢুকবেও না এসবে।

কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি,  যে সব পেপারগুলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে জমা দিতে হবে,  যেগুলোর ওপর সেমিনার রয়েছে কোনটাই তো তেমন এগোচ্ছে না। স্যার তৈরি করতে বলেছেন , সে চেষ্টা করছে,  সংখ্যার জটিলতা বা কখনো কখনো আলোর ঝলকানির মতো সারল্য দুটোই ঈরাকে মুগ্ধ ও মগ্ন করে রাখে। 

মাসে একদিন বা দুদিন স্যার ডেট দেন ব্যক্তিগতভাবে বসার জন্য। সেই হিসেবে নেক্সট উইকে ঈরার ডেট তার টপিকের কাজ কতদুর এগিয়েছে এই নিয়ে কথা বলার বা প্রবলেমগুলো ডিসকাস করার।  রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের সারি দেখতে দেখতে  ঈরা খুব গভীরভাবে সারাদিনের কাজগুলো গোছাচ্ছিল মনে মনে । প্রথমেই লাইব্রেরি তারপর ক্লাশ আর সবশেষে সোজা হোস্টেল ।

রেডি?

চমকে উঠল ঈরা , দরজায় উঁকি দিয়ে যার মুখটি দেখা যাচ্ছে সে হলো জয়ী ঘোষ। কলকাতার,  পড়াশোনায় তুখোড় আবার খুব রাজনৈতিক কথাবার্তা বলে সবসময়,  অনেকেই এড়িয়ে চলে,  ঈরার খারাপ লাগে না,  বুদ্ধিমানদের পাশাপাশি চুপচাপ হাঁটলেও অনেককিছু জানা যায়। জয়ী কবিতা লেখে, গানও গায়, স্লোগানও ভালোই বানায় মনে হল।


এই তো রেডি,  চলো।

দরজা নক করে ঈরা জয়ীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। 

মাঝে মাঝে মতবিরোধ হলেও ঈরা জয়ীর আইডিয়াগুলোকে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেনা। 

কেমন চলছে পড়াশোনা?  জয়ী জিজ্ঞেস করল?

হু,  চলছে।

বলবে না,  আমি যদি জেনে ফেলি তাইতো?  হাসল জয়ী। 

না না,  সেরকম কিছু নয়,  কাল রাতের কথা ভাবছিলাম ।

কোনটা আর জি কর?


নাতো,  তোমার আর জি কর নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। ইনফ্যাক্ট কারোরই নেই,  সবই লোক দেখানো। না হলে বৃষ্টি এলো বলে এভাবে পালিয়ে আসতে?

পালিয়ে?  নাতো। আমার সাইনাসের দোষ আছে,  জ্বর এলে ভুগব তাই চলে এসেছি?

আর জাহানারা?  কাশ্মীরকি কলি?  সারাক্ষণ যার বিয়ের গল্প,  আর ফাইট করে এখানে আসার গল্প আমাদের শুনতে হয়।

গল্প থাকতেই পারে,  যার যার নিজস্ব গল্প। তোমার ভালো না লাগলে শোনো না। 

আর জয়ী পি এন পি সি আমার পছন্দ নয়,  তোমাকে একটু অন্যরকম ভাবতাম , এখন তো দেখছি আলাদা কিছু নও।

কে বলেছিল অন্যরকম ভাবতে ?.ওহ্ তোমরা তো আবার নর্থ ইস্ট, কথায় কথায় নিজেদের অনুন্নত জায়গার বলে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট নাও সরকার থেকে।

জয়ীর কথাগুলো ঈরাকে খোঁচাখুঁচি করার চেষ্টা হলেও ঈরা রাগ দেখালো না। সাতসকালে মুড খারাপ হলে সারাদিনের পড়াশোনা শেষ।


আচ্ছা আসি,  তোমার তো এখন ক্লাশ,  আমি লাইব্রেরি যাবো। 

জয়ীকে টা টা করে ঈরা লাইব্রেরির দিকে চলে গেল। 

ঈরা ভাবছিল এই সুন্দর দেশটা কেমন যেন হয়ে গেছে, সাধারনভাবে কারো সঙ্গে মেশা যায় না। প্রত্যেকের ভেতরে একটা চুল্লি,  গনগনে আগুনে নিজেরাই  নিজেদের পোড়াচ্ছে, কেন এরকম হলো?  


লাইব্রেরি যেন একটা নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপ। এখানে ঢুকলে ঈরার মনে হয়, সে এখন সব পারবে। স্যারের দেওয়া টপিকগুলোকে সে সংখ্যা দিয়ে সাজিয়ে তৈরি করে ফেলতে পারবে দুর্ভেদ্য  গাণিতিক কোড। তার পেপারটাই সেরা হবে। স্যারের চোখ থেকে ঈরার জন্য ঝরবে প্রশংসা ও গর্ব।

এখানে কেউ কারো তেমন বন্ধু হয়তো নেই,তবুও কীরকম করে যেন একটা গ্রুপ তৈরিই হয়ে যায়। মতানৈক্য বা একজন আর একজনকে পিন করলেও কেমন করে জড়িয়ে যায় অনুভবে ও মননে ।

আবির,  জাহানারা,  সৌমিতাভ,  ঈরা , সুহানি, জয়ী,   তারাও কোন এক অলিখিত নিয়মে জড়িয়ে গেছে হয়তো টপিকগুলোর মধ্যে মিল থাকায়। এখানে ঈর্ষা ও দ্বন্দের মাঝখানে দু একটি নিয়মভাঙা ভালোবাসাও গড়ে ওঠে যাদের

মিলতে হবে এরকম দিব্যি কেউ দেয়নি,  তবে ভেঙেচুড়ে দেবেনা এই নিশ্চয়তাও নেই।

ঈরা দূর থেকে দেখল একটি টেবিলে আবির আর সুহানিকে । ওরা পড়ছে , পড়ুক।

ঈরা সেদিকে গেলো না।

প্রয়োজনীয় সব বইপত্র নিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসে গেল।  লাইব্রেরির এই দিকটায় বড় বড় কাচের জানলা,  খোলা হয় না,  ওপরে ভেন্টিলেটার দিয়েই  বেশ বাতাস আসে  ,  রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে  কাচ ঠিকরে অবারিত আলোয় ঝলমল করে ভেতরটা আর কুয়াশার দিনের জন্য প্রচুর লাইট তো রয়েছেই,  পুরো ইনস্টিটিউশনটা সোলার সিস্টেমে চলে  ,  এখন রোদ  আসছে, সারি সারি টেবিল , আর জানলার ওপারে চোখ দিলেই পাহাড়ের গায়ে পাহাড়  , ছোট ছোট জনপদ, হরেক রঙের পতাকা পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় উড়ছে। এগুলো মানুষ কেন দেয় ঈরা এখনো জানে না। দূরের মন্দিরটাও দেখা যায় কুয়াশা না থাকলে। এটা শিবমন্দির,  এতোদিনে ঈরার জানা হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষদের কাছে খুব আদরের শিবজী ।

  ঈরা  বাইরের দিকে তাকালো, আকাশটা বেশ নীল আজ,  কী অপূর্ব লাগছে সব, এক অদ্ভুত কল্পনা ঈরাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল,  সেখানে অন্য কেউ স্বপ্নের মতো ।

অনেকক্ষণ পর হঠাৎ সুহানির ডাকে সম্বিৎ ফিরল ঈরার । ক্লাশে যাবে না?

হ্যাঁ,  তোমরা যাও,  আসছি আমি।

আমি তো যাব না,  এলিনর ম্যাডামের ক্লাশ তোমাদের,  একটা জিনিস খুবই কনফিউজড ছিলাম, আবির হেল্প করল,  আসি, তোমরা যাও। 

ভীষণ লজ্জা আর রাগ হলো ঈরার নিজের ওপর । কিছুই তো পড়া হলো না। সুহানি তো দিব্যি নিজের কাজ করে নিল, আসলে কি সুহানি ততটা ইমোশোনাল নয়? 

ব্যাগ গুছিয়ে,  বইশুলো যথাস্থানে রেখে ঈরাও বেরিয়ে এলো লাইব্রেরি থেকে ।


ঈরার গবেষণা আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফির একটি ট্র্যানজিশন পিরিয়ডে — Post-Quantum Cryptography (PQC)— গড়ে উঠছে , কোয়ান্টাম কম্পিউটার এসেছে,  RSA, ECC-র মতো প্রচলিত পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে না শুধু পড়ছে । তাই ভবিষ্যতের নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন অ্যালগরিদম নিয়ে গবেষণা চলছে সবজায়গায় ।

ঈরা কাজ করছে lattice-based cryptography নিয়ে, যা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় post-quantum approach বলে ধরা হয় ।


এখন  এলিনর ম্যাডামের ক্লাস । ওনার ক্লাসগুলো পর পর দেওয়া হচ্ছে,  মনে হয় উনি চলে যাবেন , হয়তো আরো কিছু মাস পর আবার আসবেন,  এমনও হতে পারে অনলাইন ক্লাস নিলেন। তবুও এতো উন্নত প্রযুক্তির মধ্যেও ঈরার কেন জানি মনে হয় স্যার ম্যাডামদের সঙ্গে সামনা সামনি ক্লাস করার মধ্যে যে উষ্ণতা ছড়িয়ে পরে, অনলাইনে তা পাওয়াই যায় না।


এলিনর ম্যাডামের ক্লাসও Gauss Lecture হলে। তিনি একটি নরম বাদামি রঙের ওভারকোট পরে এসেছেন,  হালকা নীল স্কার্ফ আর চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্বের মিশেলে খুব সুন্দর লাগছে ওনাকে ।

তিনি ধীরে কথা বলেন । এক্সপ্লেইন করার সময় একটু থামেন,  সামনে বসা ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকান। প্রায় সব ছাত্রছাত্রীই বিভিন্ন ভাষাভাষী ভারতীয় , তিনি জার্মানির,  একমাত্র অংকই দুইয়ের মধ্যকার সেতু ।

 প্রত্যেকদিনের মূল টপিক শুরু করার আগে  Post-Quantum Cryptography (PQC) এবং Public Key Cryptography-এর বিষয়টার জটিলতা ও সম্ভাবনা নিয়ে  একটু বলেন , আজও বলছেন । বোর্ডে লিখলেন ,

 “The Unseen War of Numbers” 

আজ বৃষ্টি নেই। উজ্জ্বল রোদ বাইরে আর ভেতরে পিন পড়লেও শোনা যাবে এমন নিস্তব্ধতা।


Before I start, let me ask—how many of you believe that your WhatsApp chats are safe?


আবির হাত তুলল,  কিন্তু ম্যাডাম ওর কাছে কিছু জানতে চাইলেন না , তিনি নিজেই বলতে লাগলেন, 

"Public Key Cryptography—RSA, Elliptic Curve—they've served us well for decades. The concept is elegant: one key to lock, one key to unlock. But..." একটু থেমে আবার বললেন "quantum computers are coming. And with them, everything you thought was secure might vanish like fog."


সামনের সারিতে ঈরা মাথা নিচু করে বসে আছে,   নোট খাতা খোলা । জাহানারা চোখ কুঁচকে বোর্ডের দিকে  তাকিয়ে আছে, যেন এখনি সে পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে। 


জয়ী মেধাবী , কিন্তু এতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসেও তার মাথায় অনাবশ্যক জিনিস ঘোরাফেরা করে। 

 সে  ফিসফিস করে কিছু বলল সৌমিতাভকে , একবার ঈরার দিকেও ইশারা করল। 


এলিনর  বোর্ডে লিখলেন 


Public Key Cryptography: Two keys – Public & Private


RSA/ECC Vulnerability: Shor’s Algorithm on Quantum Computer


Post-Quantum Cryptography: Lattice-based, Code-based, Hash-based schemes


তিনি হাত দিয়ে বোর্ডে ল্যাটিস আঁকলেন ,

"Imagine a multidimensional maze. Now hide a password inside. That’s the world of lattice-based encryption. It's complex, resistant, but not unbreakable. Just... not breakable yet."


ঈরা  হাত তোলে, জিজ্ঞেস করে,

"Ma’am, are we trying to hide the key better, or change the whole lock?"



এলিনরের চোখে একটু যেন প্রশংসা দেখতে পেল ঈরা,


"Very good question, Ira. We’re doing both. We are redesigning what a 'lock' means in a post-quantum world."


সৌমিতাভ ফিসফিস করে জয়ীকে বলল বুঝলি, লক তোদের WhatsApp-এর, চাবি এখন কিউবিটে ঢুকে যাবে , একটু হাসির প্রলেপ পড়ল  ক্লাসে।


এলিনরও হাসলেন ওদের হাসি দেখে,  তারপর  বললেন ,In this new war, the battlefield is invisible, the weapons are algorithms, and the soldiers—are researchers like you.


জাহানারা একটু গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল, 

Miss, does that mean even medical data can be hacked in future?


"Yes, my dear. That's why we need ethical cryptographers—minds with not just logic, but conscience."


পেছনে জানালার কাচে এখন  বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, কখন রোদের পাট চুকে বৃষ্টি নেমেছে কেউ লক্ষ্যই  করেনি। 

ক্লাসে নিঃশব্দতার প্রতিধ্বনি বাজছে যেন।  ঈরা মনে মনে ভাবে—এই সময়েই তাকে প্রস্তুত হতে হবে, আগামীতে হয়তো  নিঃশব্দ  যুদ্ধ

হবে  যেখানে অস্ত্র শুধুই  অংক আর  কোড । 









সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , চিরশ্রী দেবনাথ



সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

চিরশ্রী দেবনাথ

পর্ব পাঁচ



বিকেল থেকে শুরু হয়েছে টিপ টিপ বৃষ্টি , আকাশ মেঘলা , বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। রুমে বইপত্র , ল্যাপটপ আর গরম চা নিয়ে বসে থাকার উপযুক্ত সময় এটা। কিন্তু নিজেকে এভাবে আলাদা রাখাটাও ঠিক নয়। কান ও  মাথা একটা কালো স্টোল দিয়ে ঢেকে ঈরা রুম লক করে ক্যাম্পাস চত্বরে চলে এলো। ছেলে মেয়ে সবাই এসেছে,  শুধু তাই নয় প্রফেসর অন্বেষা চৌধুরী ছাড়াও আরো অন্যান্য প্রফেসররাও এসেছেন যারা যারা  কোয়ার্টারে রেসিডেন্ট হিসেবে থাকেন। এখানে কোনো মঞ্চ তৈরি হয়নি,  বিশাল  ফেস্টুন তৈরি হয়েছে যেখানে একটি মেয়ের চোখ বাঁধা , মেয়েটির দুই কাঁধে দুটো ডানা আঁকা , নিচের দিকে মুখ ,

মুষ্টিবদ্ধ দুটো হাত , সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে রক্ত । ঈরা  একজন সঙ্গী খুঁজছে যার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কিছুসময় কথা বলা যায়। বহুজনের মাঝখানে এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকাটা খুবই অড লুকিং । 

লোকাল নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকরাও এসেছেন,  ওরা সবকিছু ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত , এই প্রতিবাদের আওয়াজটা সবজায়গায় পৌঁছে যেতে হবে তো।

ঈরার হঠাৎ নিচের দিকে চোখ গেল,  স্ট্রিট লাইটের জোরালো আলোতে এই বিশাল ক্যাম্পাস এরিয়া আলোয় আলোকিত হয়েই থাকে সন্ধ্যার পর থেকে,  যে  পিচরাস্তাটি এঁকেবেঁকে উঠেছে , সেই পথে একটি কালো গাড়ি আসছে,  যে গাড়িটি ঈরার খুব চেনা,  মুখার্জি স্যারের গাড়ি। 


প্রথমে অভয়ার জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হল।  

তারপর বলার পালা,  ঈরা বুঝতে পারছিল না এরা কি বলবে ? এতোটা নৃশংসতাকে কি বর্ণনা করা যায় ?

যেহেতু এটা একটা সভার মতোই হচ্ছে এবং প্রথম থেকেই সুহানি পুরো ব্যাপারটা পরিচালনা করছে , তাই সুহানি অন্বেষা ম্যাডামকেই বলল কিছু বলতে ।

অন্বেষা ম্যাডাম কিন্তু ঘটনার বিবরণে গেলেন না,  

তিনি মূলত এই ঘটনাটিকেই ছুঁলেন না। খুব সোজা সাপটা কোথায় বললেন দেখুন ছেলেমেয়েরা,  অনেক পরিশ্রম করে তোমরা এতোটা অব্দি এসেছো,   তোমাদের আবেগকে কারো হাতে তুলে দিয়ে তাকে অস্ত্র বানাতে সাহায্য করো না। তোমরা সবাই বুদ্ধিমতী , আর এটা ঠিক জাতীয় স্তরের শিক্ষাকেন্দ্রও নয়,  আন্তর্জাতিক স্তরেরও বটে , কোথাও যেন এর নাম কোনভাবে অনুজ্জল না হয়। তোমাদের যেকোন সমস্যার কথা আমাকে বলতে পারো,  আমি নিশ্চয়ই তা সমাধান করার চেষ্টা করব।


আরো অনেকেই কথা বলছে , ঈরা ভাবছে এখানেও সমস্যা?  

মিঃ মুখার্জীর গাড়ি এসে থামল। তিনি নামলেন,   

মৃদু হাসলেন তারপর চিৎকার করে  বললেন বহু কষ্টে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সমস্তরকম রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি,  নষ্ট করে দিচ্ছো তুমি অন্বেষা ম্যাডাম । ছাত্রছাত্রীদের কে সাহস দিলো ওদের অমূল্য সময় অপচয় করে এইসব হাবিজাবি ব্যাপারে মাথা ঘামাতে ?

ডঃ অন্বেষা চৌধুরী কিন্তু চিৎকার করলেন না। তিনি থামলেন। এগিয়ে গেলেন মিঃ মুখার্জির কাছে,  তারপর যেভাবে বললেন সেটা অনেকের কানেই পৌঁছুলো না। 

 তাই নাকি মিঃ অনিকেত? পড়াশোনার সময় মাঝে মাঝে নষ্ট করতে হয় বৈকি ? নাহলে তো পড়াশোনা শেষ করাটাও একসময় কঠিন হয়ে পড়ে বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। আর প্রতিষ্ঠানের মালিক তুমি নও,  সেটা গড়েও তোলোনি। আমি আর তুমি এখানে পড়াই,  হয়তো আরো কিছু বাড়তি দায়িত্ব পালন করি। আর আজকের এই জমায়েত কিন্তু ততটা হেলার নয়,  একটি উচ্চশিক্ষিত মেয়ে তার নিজের কাজের জায়গায়  মেডিকেল কলেজের মধ্যে ধর্ষিতা ও খুন হয়েছে,  সবকিছু পচে গেলে সেখানে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করা যায় না।

অবশ্য তোমার সঙ্গে এসব কি বলছি , তুমি তো…

থামলে কেন?

থামিনি অনিকেত।

আমার লাইফস্টাইল আমার,  সেখানে আছে মেধা আর সাকসেস,  এই একটাই ছক,

ছকের বাইরে যে থাকতে চাইবে সেই তো আউট তাই না  , তুমি কিন্তু পারোনি,  আমিই তার প্রমাণ , অনিকেত। 


ছাত্রছাত্রীরা ঠিক বুঝতে পারছিল না মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডাম কি কথা বলছে , কারণ তারা একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল , আর চারদিকে নানা হইচই। 


ঈরা এখন এসে জাহানারার কাছে দাঁড়ালো। জাহানারা কাশ্মীরি মেয়ে । ঈরার মতোই একটু চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে,  আজকে সেও এখানে এসে যেন কি করবে বুঝতে পারছিল না,   একটু পরে আবির এলো,  ওদেরকে দেখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। এটা ঈরার  ভালো লাগল , সেদিন  বেশিই খারাপভাবে কথা বলেছিল সে,  সরি বলাটা দরকার। কিন্তু এখন বললে  খুব ড্রামাটিক হবে।  ঈরা কিছু বলল না। আপাতত তারা মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডামের কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে ।কারণ স্যার প্রতিবাদ , জমায়েত এগুলোর বিপক্ষে বোঝাই যাচ্ছে। এমনসময় প্রফেসর এলিনর মরটিনকে ওদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখল ওরা ।  

এই মধ্যবয়সী জার্মান মহিলা, ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটেসনের গেস্ট লেকচারার হিসেবে এসেছেন।

খুব সুন্দর করে আস্তে আস্তে কথা বলেন , 

হঠাৎ তিনি সুহানির কাছ থেকে মাইক্রোফোন নিলেন,  তারপর বললেন


“Where I come from, we believe silence can be complicated. And today, I refuse to be complicit.”

“This isn't politics, Professor Mukherjee. This is mathematics of conscience. One wrong variable in a proof, and the theorem collapses.” 


মুখার্জি স্যার একটু চমকে উঠলেন, একটু হাসলেন এবং কেটে কেটে বললেন ওকে , গো এ হেড,  তবে রাত নটার সঙ্গে সঙ্গে ফেস্টুনসহ চত্বর খালি হওয়া চাই।  গাড়িতে করে তিনি নিজের কোয়ার্টারের দিকে চলে গেলেন। 

ঈরার  মনটা খারাপ হয়ে গেল,  দুর সবকিছুই  এখন যেন আলুনি লাগছে , তবে প্রফেসর এলিনরের কথাটাও খুব ভালো লেগেছে , সত্যিই তো তাই ।

প্রফেসর এলিনরের লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। ধূসর-নীল চোখ, হালকা বাদামি চুল সবসময় পিছনে জড়ানো থাকে। পরনে থাকে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা কুর্তা জাতীয় ঢিলেঢালা পোশাক—ভারতীয় পোশাকের সঙ্গে তিনি নিজের পোশাকের একটু মিল রাখেন সবসময়ই , তিনি স্পষ্টভাষী, অনুভবপ্রবণ কিন্তু আবেগপ্রবণ নন। ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের যুক্তিসম্মত প্রশ্ন করতে শেখান, 'blind memorization' একদম সহ্য করেন না , আজ তো  ঈরা ও সুহানি তাঁর কথায় মুগ্ধ ।


জাহানারা ঈরাকে বলছে ,

এই শোনো... ফির সে ছুটি পড়েগা না? ওয়াল্লাহ, মই না অ্যাবল টু গো ব্যাক কাশ্মীর রাইট নাও। ইট ওয়াজ হেল লাইক ফাইটিং উইথ মাই পেরেন্টস টু কম হিয়ার। জানো ঈরা, মাই বড়া চাচা তো অলরেডি মাই ম্যারেজ ফিক্স করচুকা থা... বাট মই বলি, 'নেহি, মই পড়েগি, দূর তাক পড়েগি!'

হামারে ফ্যামিলি মে কোই গার্ল এত দূর নাহি গেয়ি থি পড়নে, আর ইফ ইট ওয়াজ ফর এম.বি.বি.এস. না, দে উড হ্যাভ অ্যাক্সেপ্টেড। বাট ইটস ম্যাথস! আর ম্যাথস কে লিয়ে কে জিদ করনা, ইট ওয়াজ লাইক অ্যা রেবেলিয়ন।



অন্বেষা ম্যাডাম এগিয়ে আসছেন, ওদের জটলাটার দিকে তাকালেন মনে হলো, 

আবির হঠাৎ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল , 

আচ্ছা  কনটেক্সট না বুঝে থিওরেম দাঁড়ায় না , তাহলে এই ঘটনার প্রসঙ্গ থেকে নিজেকে আলাদা করাটা কি ঠিক? তোমরাই বলো ?


ম্যাডাম একটু হাসলেন। ওয়েল সেইড। আমাকে শুনিয়ে বলছ নাকি আবির?


না ম্যাডাম । এমনি বললাম ।


ভালোই বাংলা বলছ আজকাল , আবির বর ঠাকুর ! ম্যাডাম হাসলেন সামান্য। 


ভিড় ঠেলে তিনি একটু উঁচুতে দাঁড়িয়ে বললেন এটা কিন্তু মানতেই হবে , নটা পর্যন্ত সময়। চলো মিছিল শুরু হোক এবার। 


ঈরা মৃদু গলায় বলল, 

“এই ক্যাম্পাস আমাদের শেখায় প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিতে। তাহলে এইখানেই যদি কণ্ঠরোধ হয়, তাহলে আমরা কি সত্যিই গবেষক? কোথাও যেন অংক তৈরি হচ্ছে, তাই না? 


অন্বেষা ম্যাডাম বলছেন,


“তোমরা কেউ ভুল করছ না। যেটা ভুল, সেটা হলো—ভয় দেখিয়ে, চুপ করিয়ে রাখা। আমরা মেধাবী বলেই প্রতিবাদ করি। কারণ যে মানুষ যুক্তি জানে, সে অন্যায়কে চুপচাপ মেনে নিতে পারে না ,

আমাদের মিছিল ক্যাম্পাসের বাইরে সামনের ছোট বাজারটা পর্যন্ত যাবে এবং ঘুরে আবার এখানে এসে শেষ হবে,  সুহানির সঙ্গে স্লোগানে আমাদের সবার গলা যেন শোনা যায়, 

 we want justice. 


মিছিল শুরু হলো,  সেই সঙ্গে মেঘও ডাকতে লাগল আকাশে, ঠান্ডা হাওয়া বইছে । প্রত্যেকেই হালকা শীতের পোশাক পরে আছে,  কারণ এখানে সকাল এবং রাতে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডাই থাকে সারাবছর ধরে। 


সুহানি , ঈশা আর জয়ীর  কাছে তিনটে মাইক , প্রত্যেকটা স্লোগানের পর বলতে হবে we want justice , 


অনেকগুলো পোস্টার ছাত্রছাত্রীদের হাতে হাতে,  কোথাও লেখা 

"হসপিটাল নয় , মৃত্যুপুরী কেন?",  "যেখানে বিচার নেই, সেখানে বিদ্রোহ জন্মায়!",

 "Naari pe hinsa, bandh karo yeh tamasha!",  "Justice delayed is justice denied!", "হাম ন্যায় চাহতেঁ হ্যায়, রহম নয়!"

"Say her name – Avhaya! We won’t forget!"

 "চুপ করে বসে থাকলে, পরেরটা তুমিও হতে পারো!" এইসব।

ঈরার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে,  মেয়েটা তীব্র পাশবিক অত্যাচার সহ্য করেছে, এই কদিনে এটা স্পষ্ট সে কিছু একটার প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল,  তাই এভাবে চলে যেতে হয়েছে। ছেলে হলেও হতো এটা,  শুধু সেখানে ধর্ষণটা হয়তো থাকত না। মেয়ে মানেই শরীর , শরীরটাকে ছাড় দেওয়া যাবেনা।

পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে মিছিল এখন মেইন রাস্তায়,  দুপাশের বাড়িঘর থেকে কয়েকটি নিরুত্তাপ মুখ একটু উঁকিঝুৃঁকি দিচ্ছে,  রান্না বসিয়েছে লোকজন , ধোঁয়া বেরোচ্ছে , শুকনো মাছ রান্নার তীব্র গন্ধ নাকে এলো কয়েকবার। ছোট্ট বাজারটাতে এসে একটু সময় থামা হলো,  স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সেখানে উপস্থিত ছিলেন,  ঈরা অবাক হলো,  সুহানি , জয়ী , ঈশা এতোসব করার সময় পেলো কখন,  করেই বা কি হবে?  ঈশা , সৃজনী অবশ্য পি এইচ ডির স্টুডেন্ট নয় ওরা এম এস সি করছে। 

গ্রামপ্রধান স্থানীয় ভাষায় ভাষণ টাইপের কিছু বললেন , পঞ্চায়েতের লোকেরাও ছিল,  প্রায় জনা পঞ্চাশ এলাকার লোকজন  । এদিকে বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে, পাহাড়ি ঠান্ডা খুব ভয়ঙ্কর ব্যাপার , অসুস্থ হলে দেখতে হবেনা আর।

সবাই ছাতা আনেনি বলে যারা এনেছিল তারাও খুলতে পারছে না,   এই যাহ্ জোর বৃষ্টি ।

কোনরকমে দ্রুত হেঁটে হোস্টেলে চলে এলো ঈরা আর জাহানারা।

নটার আগেই সব শেষ। শান্ত রাত। গভীর কুয়াশা। বহুদূরে একটি মেয়েকে দুঃসহ যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে ।

In this time mathematics is unable to explain. 


ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স , চিরশ্রী দেবনাথ

বইয়ের নাম


ঝাউবন এবং জ্যামিতি বাক্স


চিরশ্রী দেবনাথ



জ্যামিতি বাক্স

কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয় না বলে
কেমন সস্তা হয়ে যাচ্ছে বিকেলগুলো
যেন ধুলো ঢেকে দিয়েছে বিকেলের গাল
একটি রাস্তা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে দুপুরে
আজ, কাল বা পড়শু বা আরো অনেকদিন
এ পথে যাবে না কেউ, তাই বুকজোড়া ঝোপ তার
কুবো পাখি দেখে এসেছে বারান্দায় কুয়াশার জুতো
যে দম্পতি হারিয়ে ফেলেছে পৌষের সকাল
তাদের মানিব্যাগে টুক করে ঢুকে যাবে বলে
ঘন আষাঢ়ের রামধনু স্নান সেরে বসে আছে



ছালমোচন

দুঃসহ সময়ে কবিতা থেকে উঠিয়ে নিলাম প্রতিবাদ,
আগুন থেকে যেমন সরে যাচ্ছে ক্রমাগত দহনের দাগ
প্রতিবাদ, দহন ছাড়া শুধু লেখা হোক প্রেমের কবিতা,
প্রেম কোন প্রতিবাদ নয়, রাজনৈতিক খুন কিংবা বক্তৃতা নয়
নিরবিচ্ছিন্ন রুগ্ন বসন্ত ছড়িয়ে...কবিতা লেখে প্রেমিকের হাত।
প্রেমের কবিতা খুব নিরাপদ,
অন্তরে ঘটতে দেওয়া অপরাধের মতো
তাই হোক, কেমন শব হয়ে গেছি সব
স্বেচ্ছাচারী কবি একটি বাকলহীন প্রেম লিখো,
সতৃষিত ধর্ষণের পংক্তি,
এ সবকিছুই খুব নিবিড়, নিরাপদ, গোপন, প্রতিবাদ।




অন্নদাতা

অনশন চলছে, কৃষকদের,
আদিগন্ত মাঠ পেতে তারা বসেছে
জল খাচ্ছে না, শস্যদানা খাচ্ছে না
যেন পৃথিবীর পাখি তারা, সন্ধ্যার আগে নীর ছোঁ মেরে নিয়েছে কেউ
তাদের এখন ধর্মঘট, বীজ বুনবে না, ট্রাক্টর চালাবে না, ভোরের কুয়াশা মেখে মাঠে আসবে না
হে শক্তিমান, তুমি কি হেনেছো সেই কুঠার
করো না এমন, করো না এমন
দেখো কেমন মায়া ভরে
পৃথিবী তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে সূর্যাস্তের মদিরা, সভ্যতার অনীহা ...




গোলাপি মুক্তো

আমার সবকিছু ব্যক্তিগত
যেমন একটি গ্রাম, শহর ও মহানগরী একান্ত
গ্রামের দেহাতি, রূঢ় যুবকটি আমার ভেতর
সে শহর দেখতে চায় না, কথা বলে না, জেদের পাহাড় তার ভেতরে
শহুরে যুবকটিও আমার, শুধু নির্জনে দরজা বন্ধ করতে জানে
মহানগরীতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে দেহাতি যুবক বদলে গেছে
কাঠের বাক্সে তার কাছে এখন গোলাপি মুক্তো,
যত্ন করে পাঠিয়েছে আমাকে
মিথ্যে শেখার পর থেকে সে একদম  নির্ভুল
ধানক্ষেতে ছড়িয়ে দিয়েছি মধ্য জোয়ারে আহৃত সেই গোলাপি সমুদ্রবীর্য


আমার কাছ থেকে সমুদ্র অনেক দূরে
তাই আগে মুক্তো চাষ করি, তারপর জল, তারপর ঢেউ, তারপর গর্জন, আস্তে আস্তে গোটা সমুদ্র 




 ঝাড়লন্ঠনের ছায়া 

আজকে বোধহয় আর লেখা হবে না
বড়ো মগ্নতা এসে গেলো, মনে হলো ভাবি একটু
এই ভাবনাগুলোকে রাজপ্রাসাদে রাখি তো !
সেখানে শুধু ঝাড়লন্ঠন আর  টানা পাখা...
পাখা আলো সরিয়ে দেয়, আলো বাতাসকে, কেমন বৈরীভাব দুজনে
আর তখন সব শোনা যায়
শিশিরপতনের শব্দ,কচুপাতায় নক্ষত্রের রঙ জমা হওয়ার শব্দ
আশ্চর্য গাছেরাও এতো জোরে কথা বলে জানতাম না
রাতের বেলা আকাশ যে আস্তে  আস্তে পৃথিবীর বুকে নেমে আসে, অন্ধ না হলে দেখা যায় না
সব সুর, সব কবিতার জন্য অন্ধ হয়ে যেতে হয়,
বাউলের একতারার কাছে হিংসে রেখে আসতে হয় ...






উদাসীন মাল্যগ্রন্থি


আজ এসেছি মুগ্ধ হতে, রঙ চটে নির্জন হয়েছে কিছু,
বাকি সব উদ্ভাস
কোথাও জমেছে পাথর আদর জমে জমে, শ্যাওলার মখমল
রাস্তা শেষে আঘাতেরা মেলেছে ডানা
সিন্দবাদের সমুদ্রদ্বীপে তারাই রূপপাখি
এখন গুটানো হাত, নিমগ্ন পা ঈশ্বরের কাছে
তবুও পেতেছি হাত, যা কিছু দিলাম অবিশ্বাস, অবিরত সংঘাত
কোনটাই স্বাধীনতাকামী যুদ্ধ ছিল না
ভেবে গেছো অপ্রেম, নির্বোধ এ জমি
জেনেছ হয়তো বুদ্ধের মতো নির্বান অস্তরাগ, ক্ষীণ পাকদন্ডী, দেয়ালে তারিখমালা, অশুদ্ধ তিথি
যদি এখন ফেরত দিতে বলি সমস্ত অগম্য গ্রহণ, খোলা জানলা, কিছু ব্যক্তিগত মাল্যগ্রন্থি
কী অসম্ভব দুর্বার হবে সেইসব রঙীন ফেলে আসা গেঁজে যাওয়া  ফেনা !



সোনার চুড়ি


ভালো হবো, ভালো হবো খুব!
এই খুলে ফেললাম দুর্বিনীত জিহ্বা, শ্লেষ শব্দ অস্ফুট
খরা তো ছিলো না কখনো, কী সে মরল কে জানে
এই কি সেই মসৃণ সেগুন, শিকড় ছড়াতে জানে না ভালো করে
এমনি সহজ, ভয়াবহ সরল
হঠাৎ বিদ্যুতচমকে খুঁজেছে মেঘের উৎস, হেমন্তে ও বাকি ঋতুতে
অবিরাম বক্ষ পেয়েছে সে, ঝরেছে প্রথমের মতো 







সূচকাঙ্ক

আজই তাদের দেখাদেখির শেষদিন,
তারপর মেয়েটি বিদেশ যাবে বরের সঙ্গে।
ঐ যেখানে মিসিসিপি বয়ে চলে, এলোমেলো উদ্বাস্তু ছাতা।

তাই সে ফিরিয়ে দিতে এসেছে সমস্ত মেসেজ, প্রাণপণে ডিলিট করছে ভাগ করা কথোপকথন ।

এক জোড়া চোখ সামনে। নির্বাক।

দীর্ঘ শুভেচ্ছাবার্তার লাল হলুদ রঙগুলো দ্রুত মরে যাচ্ছে।
উড়িয়ে দাও সব, এসমস্ত দিনরাত, বিহঙ্গের ছটফটানি।

এখন দ্বীপান্তর হবে। 

সঘন নির্বাসন। স্ব ইচ্ছায়। যুদ্ধে মন নেই।
ছেলেটির কিন্তু খুব যুদ্ধ করতে ইচ্ছে করছে।
যেন সে অর্জুন। গাণ্ডিবে এখনি দেবে টান।


আসলে এসব কিছুই হচ্ছে না, শুধু মেয়েটি চলে যাচ্ছে।
আর দিকচক্রবাল জুড়ে হেরে যাচ্ছে তৃৃতীয় বিশ্ব ...



ডাকটিকিটের মেয়ে


এখন কিছু কাগজ আসে নিজের নামে
একটি ঠিকানা রয়েছে যেন কোথাও আম্রপল্লবের স্বস্তিকাচিহ্নরচিত
আমার মার একটি বাড়ি ছিল, নিজেদের ঘাম রক্তে ঘেরা।
সেখানে বাবার নামে অজস্র চিঠি আসতো, বই পত্র ইত্যাদি।
মার নামে তেমন কিছু চিঠি আসেনি কোনোদিন, কিন্তু বাড়িটি প্রবলভাবে মাকে ঘিরেই হয়ে উঠেছিল।
এই যে, আজকাল কিছু পত্রিকা, বই ডাক যোগাযোগ !
এটাই বোধহয় সামান্য অতিক্রম করা মাকে,
বাড়ি, অস্তিত্ব বা কিছুই হয়তো ঠিকঠাক নেই, তবুও,খামের ওপর এইসব অদেখা জায়গাগুলোর নাম পড়ে পড়ে শুধু মনে হয়
অক্ষরগুলো নৌকার মত, মৃদুমন্দ বাতাসে তাদের বিবাহ দিয়েছি দূরদেশে,
পরিচয় আর ঠিকানা নিয়ে মায়ের হৃদয়ে ফিরে এসেছে সুখি মুখ দেখাতে।




বলপ্রিন্টের ঘর

তাদের বাজারে চড়া ঋণ
বাকি পড়ে আছে স্কুল ফি, দোকানের খরচ,
জমে আছে বেঁচে থাকার জন্য না কেনা ঔষধের প্রেসক্রিপশন ।
সবাই আজ বিকেলে মরে যাবে ঠিক করেছে
কেউ তাই ছাদ থেকে কাপড় আনছে না, বিকেলের ট্রেনের হুইশেল শুনছে না,
কাঁদছে, নিস্তব্ধ হয়ে কাঁদছে।
ছোট্ট মেয়েটি হঠাৎ দরজা খুলে দিলো
ওমনি ঝাঁক বেঁধে ঘরে ঢুকে গেলো একদল গৃহগামী পাখি
আজ রাতে তারা এখানেই থাকবে
সুতরাং রাঁধতে হলো, খেতে হলো, রাতের বাহুতে দীর্ঘায়ত হচ্ছে প্রহরকাল,
এই নিবিড় রসিকতা চলতে থাকুক। 







সমুদ্র গৃহ

একজন বড়লোকের মেয়ে একজন গরিবের ছেলেকে ভালোবাসলো
তারপর গাছে গাছে ফুল ও ফল
একটি নিবিষ্ট বৈশাখে রেজিষ্টিও সমাপ্ত
আকাশ থেকে আসন্ন বর্ষার আরক্ত জলধারা তাদের ভিজিয়ে দিলো খোলা রাস্তায়

মেয়েটি ছেলেটির বাড়ি এলো
তিনখানা ঘর, খোলা বারান্দা,
একটি লেবু গাছ ও পাশের বাড়ির কাঠগোলাপ গাছের ফুলে ছাওয়া অবাধ্য ডাল
সবকিছু মিলিয়ে মেয়েটি অপেক্ষা করতে লাগলো নির্জনতার
অবশেষে রাত,মাঝখানের ঘর, তিনখানা দরজা, সারা রাত অন্যদের আসা যাওয়া।
রাগ, চলতে থাকা অভিমান !

গরিব ছেলেটি হয়তো এই দুরন্ত সমস্যাটির আশু সমাধান নিশ্চয়ই করবে
কিন্তু খুব দেরি হওয়ার আগে
এইসব ভালোবাসা প্রবণ দম্পতিরা
পৃথিবীর কাছ থেকে কি একটি নির্জন সমুদ্রগৃহ উপহার পেতে পারে না !! 





সংলাপ ...ঝাউবন ও ধুনকর


তোমার বুঝি চার পাহাড় অভিমান হয়েছে !

আমি খবর দিয়েছি ধুনকরকে, খবর দিয়েছি তাঁতিকে

খবর পাঠালাম রঙিন ধুলোর কারিগরকে ...


কি হবে তাতে?


নিদাগ হবে, ধূসরিত হবে, তুলোর ফেঁসো জড়াবে নাকে মুখে,

মোটা কাপড় পরে কুড়িয়ে আনবে লম্বা মিছিল


তাতে কি অভিমান কমবে?


তাতে অভিমান লজ্জা পাবে, ডোরাকাটা দাগ, গর্জন শুনে মনে হবে সুখী মাওবাদি।


আমি তখন গুহা কিনতে বেরোব। তোমার হাতে গর্জন গাছের ডাল, মেঘ আটকে রেখেছো। দাঁড়িয়ে আছো পেছন ফিরে।

গুমগুম পাহাড় ভাঙছে, দিনদুপুরে... শুনতে পাচ্ছো? পাচ্ছো কি?


এসেছো তাহলে !


তবে  শোনো ..., কিছু ঝাউগাছ আর দু তিন টুকরো বেলাভূমিও এনো  সঙ্গে , বারান্দা সাজাবো আমি 







দস্যুরোগ

যে পথে চলে গিয়েছ সে পথে এখন নদী, দিক বদলে এসেছে
জটায়ূর আহত পাখা থেকে কুড়িয়ে এনেছি যুগ্ম আভরণ,
অভিমান আর অভিমানে লেখা
চা গ্রাম গুলোর ভোর জুড়ে আজও এই ভরা অন্নকুট উৎসবে, ক্ষুধা নামে
পচা ভাতের সোমরস গিলে গিলে বনমালীর দল সমূহ কুটিরে ঢেলে দেয় রাতজাগা নক্সা ,
তাদের কাছেই দিতে হলো ধান্যপল্লবে লেখা একটি মাত্র পংক্তি, " আমি যে নত হয়েছিলাম ", 


সে থেকে ডানা ভিজে ভিজে ওঠে , গায়ে ছড়িয়ে পড়ে ঘরকুনো শ্যাওলা, কচি বেড়ালশিশুর ভয়লাগা স্বর
লিখে  রাখি সব ... বিকেল করে আসা গৃহরোদে
একা একা পড়ি, বৈশাখমাস জাগে নিভৃত প্রদেশে
ঘেমে ঘেমে রক্তচন্দনের দস্যুরোগ বাঁধাই,
এ সুখদান, এ দুঃখদান, এ ভরা কলস দিয়েছো বলে আমি পথচারিণী …






উন্মোচন

পাগল দম্পতি দেখেছি, যুগ্ম নক্ষত্র , সহাস্য পঞ্চাশ
একটি ছেলেও আছে, সুস্থ, সুন্দর শালতরু
কী বিশুদ্ধ মিলনে জন্ম হয়েছিল তার, কত প্রবল ভালোবাসাবাসিতে
আগুনের ঘরবাড়ি, ভেতরে গুহা, নদী, অন্ধকার,
ধরেছে হাত, জ্বলেছে মনের গহন
অথচ মস্তিস্কে জট, খাদের গভীর, নেমেছে কুয়াশা, সূর্যের আলো দিকচিহ্ন হীন
এই সময়ে রোপিত বীজ, পত্রপুষ্প দিয়েছে ঢেলে কোন্ শ্বেতপ্রপাত ?





লেখক পরিচিতি

চিরশ্রী দেবনাথের জন্ম ত্রিপুরার কৈলাসহরে , ১৯৭৯ এর ১২ ফেব্রুয়ারী। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার, মা মায়ারাণী মজুমদার। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির শুরু বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হন। তার লেখা ত্রিপুরা ছাড়াও আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত লিখেন। কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না, এটাই বিশ্বাস করেন।


প্রকাশিত অন্যান্য কাব্য গ্রন্থ: জলবিকেলে মেঘের ছায়া, ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায়, প্রেমেসন্ত্রাসে, শুভ দ্বিপ্রহর ইত্যাদি


“নিষিদ্ধ নয়, নন্দন: যৌনতার সাহিত্যিক ভাষ্য” , চিরশ্রী দেবনাথ

 “নিষিদ্ধ নয়, নন্দন: যৌনতার সাহিত্যিক ভাষ্য”



চিরশ্রী দেবনাথ




পৃথিবীতে প্রত্যেকদিন হাজার হাজার মানুষের জন্ম হয় তারপরও আমরা লেখক  লেখিকার কাছে জানতে চাই , লেখায় যৌনতা কেন এসেছে বা কিরকম ভাবে এসেছে তখন ব্যাপারটা খুব আশ্চর্যের মনে হয়। 


অথচ তাদেরকে আমরা জিজ্ঞেস করিনা আপনি খুনের দৃশ্য কেন লিখেছেন ? বা ধর্ষণ?  এগুলো তো অস্বাভাবিক কষ্টের বিষয় । ভয়ানক অশ্লীল জিনিস।


কিন্তু একই গল্প বা উপন্যাসে ভালোবাসার , প্রেমের  ঘনিষ্ঠদৃশ্যের বর্ণনাকে কেন যেন মানুষ মেনে নিতে পারেনা। যেন জীবনপাত্র উছলিয়ে ওঠা কামনা একটি বড়ো মিছে কথা। 


। অথচ, মনোবিজ্ঞানে, বিশেষ করে Sigmund Freud-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, লিবিডো শুধু শারীরিক কামনা নয়; এটি মানুষের ভেতরের এক ধরনের জীবনীশক্তি, যা ভালোবাসা, আকর্ষণ, সৃজনশীলতা এবং সম্পর্ক গঠনের শক্তির সঙ্গেও যুক্ত।



গল্পে উপন্যাসে খাওয়ার দৃশ্যের যেমন বর্ণনা থাকে তেমনি খুব সাধারণভাবেই একটি যৌনতাবিষয়ক দৃশ্যের বর্ণনা থাকতে পারে।  পার্থক্যটা হচ্ছে উপভোগ বা বিনোদনের । উপন্যাস বা সিনেমায় মানুষ এই সহজ স্বাভাবিক সুন্দর দৃশ্যটাকে উপভোগ করতে চায় বা যাদের জীবনযাত্রায় সেটা যথেষ্ট সহজলভ্য নয় তারা সেটার পাঠসুখ বা দৃশ্যসুখ অনুভব করতে চায়। কিন্তু সিনেমায় বিনোদন যতটা আগ্রাসীভাবে বা বাণিজ্যিক কারণে আসে সাহিত্যে ততটা নয়। এখানে সাহিত্যকে নিছকই পর্ণোগ্রাফির সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা ভালো । এটারও অবশ্য সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি কেউ যে এতোটুকু বর্ণনা করা যাবে তার বাইরে নয়,  কারণ ভারতবর্ষের মন্দিরগাত্র আমাদের সকল প্রশ্নকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে যৌনতার উন্মুখ সৌন্দর্যের কাছে দাঁড় করিয়ে দেয়।


আমার কবিতা,  গল্প ও উপন্যাসে মানুষ আছে, তাই যৌনতাও আছে । মানুষ থাকবে আর সে মানবজীবনের উৎসমুখের কাছে দাঁড়িয়ে অমৃতের অনুভব নেবেনা তা কি হয় নাকি?  তাই সমকাম এসেছে, এসেছে নরনারীর ভালোবাসার উদযাপন। আমি যেহেতু ভাষার সৌন্দর্যায়নে বিশ্বাস করি তাই কখনও রূপক, কখনও দৃশ্যের আড়ালে দৃশ্য,  এভাবে পাঠককে গভীর মননের দিকে আকর্যণ করার একটা চেষ্টা আমার মধ্যে আছে। যৌনতা যেন তার বিকৃতরূপ নিয়ে নর-নারীর মধ্যে এসে না দাঁড়ায় , সবচেয়ে সুন্দর রূপক যেন তার আধার হয়।


আমার দু একটি ছোট্ট কবিতা এখানে রইল।





চা



দু'কাপ চা তোমার আমার


খানিকটা চিনি... প্রথম বৃষ্টিপাত


উষ্ণ গাভী রস,


একটিই চামচ সেখানে


নাড়তে থাকে তোমাকে আমাকে। ( কাব্যগ্রন্থ ‘ প্রেমে সন্ত্রাসে ‘ )







উন্মোচন 


পাগল দম্পতি দেখেছি, যুগ্ম নক্ষত্র , সহাস্য পঞ্চাশ 

একটি ছেলেও আছে, সুস্থ, সুন্দর শালতরু

কী বিশুদ্ধ মিলনে জন্ম হয়েছিল তার, কত প্রবল ভালোবাসাবাসিতে

আগুনের ঘরবাড়ি, ভেতরে গুহা, নদী, অন্ধকার, 

ধরেছে হাত, জ্বলেছে মনের গহন

অথচ মস্তিস্কে জট, খাদের গভীর, নেমেছে কুয়াশা, সূর্যের আলো দিকচিহ্ন হীন

এই সময়ে রোপিত বীজ, পত্রপুষ্প দিয়েছে ঢেলে কোন্ শ্বেতপ্রপাত ? 



( কাব্যগ্রন্থ ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স ) 





বিভাজিত মেঘ


.........................


দুজন সমকামী মেয়ের অর্ধেক আকাশ নেই


দেহতত্ত্বের অন্ন সুবাসে


তাদের শরীরে জারিত পূর্ণ আকাশ


এই ভূমিকায় একটি  গ্রহণ ছেয়ে যাবে


সে গ্রহণের দায় কোন সন্তানের নয়



ক্যাকটাসে যে ফুল ফুটে চল্লিশটি বছর পর


একমেয়ে অন্য মেয়ের চুলে গুঁজে দিয়েছে সেই গন্ধ



" বাহারোঁ ফুল বরষাও "



বৃষ্টি জ্বলছে আঁধারে, ডুবছে পরিধি 


 এখানে পতন হোক দিগন্তের 


পাতাল ছুঁয়ে দেখুক কেউ কেউ …




( কাব্যগ্রন্থ “ প্রেমে সন্ত্রাসে “)





“অনন্ত কাম হয়ে ওঠো


চোখে কাম , চোরা থুতনিতে কাম


তোমাকে দেখে দ্রবীভূত হয়ে গেছে অন্ধকার


তোমারই কামে আগুন জ্বেলে


পুড়িয়ে দিচ্ছো নরম শঙ্খের মুখ


অবারিত কাম শেষে


শরীরে এখন শান্ত নগ্ন জল” ( কাব্যগ্রন্থ ‘ নিঃস্বরের করতলে ‘) 





নিজের কবিতার ব্যাখ্যা নিজে নাই বা করলাম ।




প্রত্যেকটি মানুষের জীবন একটি উপন্যাস । আমার লেখা তিনটে উপন্যাস ‘ সূর্যছক ‘,


 “ মারমেডের শহর থেকে “, এবং “ সংখ্যার শরীরে মৌমাছি “ , সবগুলোতেই রয়েছে নরনারী । তাই উপন্যাসের নরনারীকে জীবন্ত রূপ দিতে যৌনতার নন্দনভাষ্য এসেছে ।


তবে আমার লেখায় অতিরিক্ত  সচেতন হয়ে যৌনতার প্রয়োগ নেই । সবগুলো উপন্যাসেই 


বর্ষায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মতো যৌনতা রয়েছে  এবং কোথাও কোথাও রয়েছে নিজেকে ভালোবেসে নিজেকে যাপন করার স্বাভাবিকতা , এটাও তো একপ্রকার  যৌনতা ।

নিঃস্বরের করতলে, দীর্ঘ কবিতা, চিরশ্রী দেবনাথ

বইয়ের নাম

নিঃস্বরের করতলে 


চিরশ্রী দেবনাথ




লেখকের কথা 


দীর্ঘ কবিতা প্রলাপের মতো । প্রবল জ্বরে মানুষ প্রলাপ বলে । ঘোরের কথা মানুষের মনে থাকে না। কিন্তু দেহঘরে আলো জ্বালায় মানুষের এই আকুতি । বীজধানের মতো তাকে তুলে রাখি নিঃস্বরের করতলে। 




উৎসর্গ

যেদিন কবিতা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে সেই লেখাহীন , কবিতাহীন  সময়ের কোন এক আশ্বিনের বিকেলকে…






সূচীপত্র


শোক 


আশ্বিনের বিকেল


নিঃস্বরের করতলে


মনুনদীর উপাখ্যান




এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই


কাব্যগ্রন্থ


1. জলবিকেলে মেঘের ছায়া (২০১৬)

2. ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় (২০১৬)

3. প্রেমে সন্ত্রাসে (২০১৭)

4. শুভ দ্বিপ্রহর (২০১৮)

5. ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স (২০১৮)

6. উড়িয়ে দিও (২০১৯)

7. বিশ্বাসের কাছে নতজানু (২০১৯)

8. পাঠ করো নিভৃতে (২০২২)

9. তারা মেঘের মতো (২০২২)

---

গল্পগ্রন্থ


1. মায়ারাণী — কুড়িটি ছোটগল্পের সংকলন (২০১৯)

2. অণুগল্প সংকলন — একান্নটি অণুগল্প (২০২০)

3. নিকটবর্তী রূপকথা — ছাব্বিশটি ছোটগল্পের সংকলন (২০২৩ )

---

 সংলাপ কবিতা

1. সোমবার সন্ধ্যায় (২০২১)


 কবিতা বিষয়ক আলোচনামূলক বই 

( অভিজিৎ চক্রবর্তী ও চিরশ্রী দেবনাথ) 


1. যে জীবন কবিতাগামী (২০২১)

---

 উপন্যাস


1. সূর্যছক (২০২১)

2. মারমেডের শহর থেকে (২০২২)

3. ঝিলমারির কাণ্ড কারখানা — কিশোর উপন্যাস (২০২২)

4. সংখ্যার শরীরে মৌমাছি (২০২৫)( প্রকাশিতব্য)










শোক


দীর্ঘ লেখা আসার আগে হাঁটু গেড়ে  বসি

শরীর থেকে  ক্রোধ নেমে যায়, 

নেমে যায় অশ্রুকাম ,মলিন জীবন 

থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মধুশ্বাস

পাখি হারিয়ে ফেলা অরণ্য যেন 

তোমার প্রতীক ।এই লঘু  স্তন ও

 বিরামচিহ্ন দিয়ে অঙ্কিত চরাচর

দ্রোণফুলের সুগন্ধ বয়ে আনা ভোর, মৃত্যুর শ্বাস

 


প্রত্যেকে নিশাচর, সকরুণ বিরোধে 

অবহেলা সয়ে যায় শীতের আয়ুর মতো ;

 এখানে আমি আছি অথবা নেই ;

 আছে শুধু রেখে যাওয়া শরীরের 

নিঃসীম পচন ।নদীর ঢালে অপুষ্টিতে

 বেড়ে ওঠা চিনার ফলের  ফ্যাকাশে 

বীজের দানায় দানায় আত্মহত্যাসম প্রাণ, 

ছেঁড়া পতাকা পড়ে  আছে, 

ধূসর সংগ্রামের দগ্ধ চিহ্ন। 


দেবী আসছে, পথে জ্বেলে রাখো

 আলো, সশস্ত্র জওয়ান !

 মা...ঢেকে রাখো বুক, পাহাড়ি কোমর,

পৃথিবীতে ভয়, ছিঁড়ে ফেলে শরীর, 

চারদিকে শুধু মেয়েদের শরীর, 

আমাদের লেখায় তারা মেধাবী উষ্ণ!

দেবীকন্যারা কামদুনি,  মণিপুর হয়ে 

এসো, ওদের বারান্দায় বসে পুজো নিও, বেলপাতা, যজ্ঞের ধোঁয়া, 

রক্ত মাখা ফুল নিয়ে পায়ে পায়ে এসো, 

এখানে এখন পুজোর আয়োজন, চন্দন ধূপ...


যুদ্ধ ছেড়ে চলে যাওয়া পরাজিত 

সৈনিক সুন্দর! গৃহমুখী প্রাণ,

 দরজায় মায়ের অপেক্ষা হলুদ 

সম্বরার ঘ্রাণ ।নারীর কোলে মাথা 

রাখবে সে যুবক পুন্য হীন, 

ফিরে এসেছে যেন অচেনা হাওয়া 

কিংশুকের শব নিয়ে উদাস বসন্তে, 

তারপর, কবিয়াল হৃদয় খুলে দাহ 

দেখাও, দেখো এই আবাহন, 

বাঁশের বনে কেন নিঃশব্দে হেঁটে 

যাচ্ছে শান্ত চোখের ডাহুক ! 


ধান কাটার পর যে মাঠ পড়ে থাকে

 তার কাছে গিয়েছি ,জলে ভেজা

 দুর্বল মেরুদণ্ড, হাতের পাতায় মগ্ন ভোর

আমার পায়ের শব্দে ঘুম থেকে উঠেছে

 মাটির কীট, চোরা ঘাসে কেটেছে পা, 

নির্জন সূর্যের ছেঁড়া আলো

হেঁটে যেতে যেতে শরীর থেকে 

ঝরে গেছে আবরণ , দীর্ঘতম মাঠ, 

জলশূন্য চোখে উপল মাছের 

কোলাহল, পৃথিবী দ্বিধা হতে 

গিয়ে হয়ে গিয়েছে আমার মতো, 

সোনালি ঘরে রাখা ভেজা ধান,  

পচন ধরেছে এইমাত্র


কুয়াশা নামেনি এখনও, বর্ষার দুখি 

ধারা চরাচরে ,আনাজের নরম শিকড় 

গলে গেছে, নষ্ট হয়েছে ফসল

পুজো যেন অভিঘাত, ভয়ঙ্কর 

নদীস্রোত, কান্না। কিশোরীর 

দু বেণি বেয়ে সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত

এই সুখ মৃত্তিকার মতো, 

মুঠো থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে গাছ, 

এসো পাখি, সবুজ তাপে 

পুড়ে যাক স্মৃতিস্মারক 


হলুদ সর্ষের খেত নেই, 

জলে ভরা শস্যহীন মাঠ

আগাছা আর বেগুনি ফুলের ঝোপ, 

গোধূলির আসনে ম্লান ফুলের দল, 

অসুস্থ মানুষের চোখে তবু

ভিড় করে আসে উৎসবের 

হারানো দিন, পায়ে পায়ে

 জড়িয়ে আছে এই দংশন, 

শ্যামাপোকা, কোজাগরীর মোহ, 

নিবেদন করি মাঝে মাঝে, 

কোথায় লোভহীন দেবতার থান, 

উজ্জ্বল রশ্মি দিও, চোখ ছিন্ন 

করে চলে যাবে ভেতরে, 

অনেক নিচে হাওয়ার মতো 

শোক, মৃদু সুখ ...



ভালোবাসি বলে, করতলে তিল 

হরিতকী, শুশ্রূষা। মৃত্যুশোক ভুলে 

যেতে চাই তাই, তর্পণ মানি না

বাসক গাছের পাতা তুলে আনি, 

নীলকণ্ঠের মধুবিষ

পাত্র ভরে রাখা অদৃশ্য ধোঁয়া, 

চোখ জ্বালা করা। 

যখন অবিশ্বাস করি এই 

মোহকান্তার, কন্ঠে ঢালি 

নেশার মতন, দেখি ঘুঘু 

ডেকে যাচ্ছে চরাচরে,

রোপিত হচ্ছে যেন শুধু 

কালো দ্রাক্ষার বীজ ...



এখানে এসেছি বলে মহুয়ার 

গাছ ছায়া মেলে দিল

বনের গন্ধ যেন যুবতীর ঘোর, 

কৈশোরের মফসসলের চৌরাস্তা 

থেকে আরো ঘন হয়ে সর নামে 

জ্যোৎস্নার!  গুল্মপথে নির্বিকার 

আজ সেই নারী, শুনশান আকাশ, 

বোবা নক্ষত্র বাড়িয়েছে হাত, 

এই তবে মৃত পূর্ব পুরুষ, 

সময় হয়ে গেলে চিনে নিও ইশারা,

 গলে গেছে পাপতাপ, সকরুণ 

আলো শুধু ভেসে বেড়ায় অস্মিত প্রান্তরে।



বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে শহরে 

 ভেসে আসে জুরি নদীর দীর্ঘশ্বাস

শুষ্কতা এতো জলীয় কেন? 

কেন দিকচিহ্ন আগলে রাখে 

মন্দিরের দরজা।  পথিক ফিরে যেও !

এখানে ইতিহাস নেই,  

স্তব্ধ ধানের তুষ আছে

গড়ে ওঠা এক মিশ্রবসতির 

সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ।কার্তিকের 

সংকীর্তন থেকে প্রসাদ কুড়িও ,

শোক ছিঁড়ে যেন নিরাকার ব্রহ্ম জেগে ওঠে।



ব্যর্থ জীবন দ্রুত আগুনের কাছে 

যেতে চায় ,আগুন পেরোলে যেন 

কিছু না থাকে আর 

স্বর্গের রতিচিহ্ন অথবা 

নরকের সহবাস

শূন্য থেকে এসে শুধু বিলীন , 

চিহ্নমাত্র ভুল জেগে নেই কোথাও



নারী ফিরে গেলে মৌ দাগ পড়ে থাকে

পুরুষ ফিরে গেলে দিকচক্রবাল

ফিরে যেতে যেতে অভ্যাস হয়ে 

যায় সমস্ত বিরহবিন্দু

উদাসীনতার বৈভবে মেতে উঠছি , 

হয়তো ঝরে যাচ্ছে  আত্মরতি

ভাঙা সঙ্গীতে ভেসে আসছে 

আমারই কন্ঠ অকাতর

আগে শুনিনি, কেঁপে উঠছি, 

হাত ডুবিয়ে তুলে আনছি পাহাড়ি বাদল



শূন্যমাত্র জানি, ফিরে দেখা 

বকুলের খুধা ,জলবায়ুর উষ্ণ  

বার্তা পেলে কেঁদে উঠি

খুলে দেখি অবারিত বায়ুসম্ভার , 

গরিব মেধা ,শীতের করুণ পাতার 

 ওপর শিশিরের দাগ , যত্নে গড়া 

মাকরসার ঘরবাড়ি আর অস্থায়ী

আমি, এখান থেকে চলে যেতে যেতে

খুৃৃঁজে পেয়েছি কড়ির মালা , 

 জৈব গন্ধে ভরা ।


একদিন উচ্ছাসের কামনা 

করেছিলাম ,বসন্তের নরম ধুলো 

মাখা সন্ধ্যায় হেঁটে বেড়ানো । 

তারপর জেনেছি খুব কঠিন

দুইজন একসঙ্গে হওয়া কোনো এক

গোধূলিতে। সেই থেকে বহে বায়ু ,

ক্রমাগত ব্যক্তিগত পদ্ম সম্ভারে

জমানো হয়ে গেছে না হওয়া দিনলিপি।


দুঃখযাত্রা শেষে আবারও জেগেছে পৃথিবী

মৃত্যুভার , শোক সন্তাপ নিয়ে ব্যথিত 

শঙ্খের মতো যেন ভোরের আকাশ ।

এসো ' সন্তর্পন ' তোমাকে ছুঁয়ে দিই

দমকলের সাইরেনের মতো কি 

কোথাও সংকেত দিল  অশুভ !

ছিন্নধারাপাতে গলে গেছে তুঁতফলের রঙ

ফ্যাকাশে বিস্ময়ে কাঁটাভরা চোখে দেখে

মন্বন্তরের মাঠেও কেউ বলে  ওঠে

 " আহা চলো তো "

 সোনালি খাবারের মতোই মেয়েরা

 ছেলেদের খেয়ে ফেলে 

এই অভিশাপ পেতে পেতে ছেয়ে 

গেছে শুধু গ্রহণ আর পাপ 


অনন্ত কাম হয়ে ওঠো

চোখে কাম , চোরা থুতনিতে কাম

তোমাকে দেখে দ্রবীভূত হয়ে গেছে অন্ধকার

তোমারই কামে আগুন জ্বেলে

পুড়িয়ে দিচ্ছো নরম শঙ্খের মুখ

অবারিত কাম শেষে

শরীরে এখন শান্ত নগ্ন জল


হে ক্ষণিক এসো , লৌহপাত্র নিয়ে ।

 স্বচ্ছতোয়ায় হাত রাখি,

পৃথিবীর অজানা গহ্বর যেন,

 লেখা আছে সেখানে কোনো

এক জন্মান্তরের ইতিহাস , 

অশ্লেষা নক্ষত্রের অভিশাপ, 

অভিশপ্তরা সুন্দর হয়

জনারণ্যে তারা বিদ্যুতের 

মতো আঘাত দেয়,

কাঙালের মতো কাঁদে।


অনন্ত আলোর মতো জেগে 

উঠেছে পৃথিবী ,ছড়ানো নৃশংসতা,  

ডানা ভাঙা আকুতি

ডিনামাইট আর বোমারুর গর্জন

তারই ফাঁকে নতুন কান্না জেগেছে

দুহাত মেলে যে চারাগাছ 

জন্ম নিয়েছে ,সে কি শোক 

ভুলে যাবে দ্রুত, মৃত্যুর ওপর 

দাঁড়িয়ে বাক্স খুলে বের করবে 

পান্না রঙের যোনি !


 

প্রতি ঋতুতে  কবিতা লিখি ,

ঋতুর পর ঋতু কবিতা

 লিখতে লিখতে

ঋতুহীন দিনে বসবাস ঘনিয়ে 

আসছে ক্রমাগত

দুধঘাসে ছাওয়া নদীতীর 

আমাকে জীবনের লোভ দিও, 

প্রথম স্নানের চিহ্ন

তুলে এনে বলো এসব 

এক মানুষীর অবহেলা

ভুলতে পারিনা ঐ সন্ধ্যা , 

ফিরে আসা ধূপগন্ধ

শেষশয্যায় আমার শরীরে 

সব ক্ষত জেনে রেখো

বিস্মৃত প্রেমের দারুচিনি গাছ



আধা শহরে বাস করি, পাগলের সংখ্যা কম

প্লাস্টিকের চেয়ার ও গোল টেবিলে 

সন্ধ্যার আড্ডা হয় ,কুকুরেরা শোনে, 

কিছু মানুষও । আড্ডা শেষে রাস্তায়

 একা ঘুরে বেড়ায় অরিজিৎ সিং এর 

গানের কলি, গেয়ে গেছে বখাটে ছেলে, 

নেশা আর গান, হোলির দিনে 

তাকে ডেকে এনো, ধর্মগ্রন্থ ছিঁড়ে 

যজ্ঞের ধুনো দিও, শহরে ছেড়ে দিলে

 সে তখন পাখির মতো হয়ে যাবে ,

 মিহি সুর, তর্জনীহীন, অন্ধকার চোখ



পৃথিবীর বুকে এখন শৈত্য ঝড়

যুদ্ধের কারবারিতে জিডিপির 

ওঠানামা ,পাহাড়ের ভেতরে

 ইন্টারনেট সংকেত নেই

তবুও গোপন যুদ্ধ আছে, 

মশাল জ্বালানো হয় না

ক্রমবর্ধমান জ্বালানীর দাম, 

নেভানো আগুন। 

অন্ধকারে বিবশ কিছু মানুষের দল, 

পরস্পরের কাঁধ খুঁজে বেড়ায়,

ধারালো অস্ত্র হারিয়ে গেছে শুনেছি

হয়তো বন্ধুত্ব চায় সংকেতহীন 

জঙ্গলে... মধুর শিস। 


ভারতবর্ষ এতো ধার্মিক ছিল না ,

এখন হয়েছে।

যখন তখন আকাশবাণী শুনি, 

দধিচির হাড় শপিংমলে বিক্রি হয়. 

 চড়া জি এস টি ।

কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির 

অনেকক্ষণ হলো টয়লেট পেয়েছে ।

সে হাসছে,বসতে নিষেধ আছে।

বাইশো টাকার কালো ব্লেজারের নিচে

ভাত আর আলুসেদ্ধ হজম হয়ে গেছে কবেই।

তারও গার্লফ্রেন্ড আছে, অস্থায়ী চাকরি করে।

এখন সবাই অস্থায়ী,  বেতন অনিশ্চিত।

নীল কাজল আর ন্যুড লিপস্টিকের নিচে

অবারিত কামনার ছলছল ।



শহরে মিছিল,অটোওয়ালারা 

পতাকা লাগিয়েছে ,রামমন্দিরের ছবি। 

বাড়িতে হলুদ চাল এসেছে, পরমান্ন রাঁধব। মহাকাব্য তৈরি করছি আমরাই। 

মহাকাব্যে রাবণ নেই, 

আশ্চর্য এক রামায়ন শুষে নিচ্ছে জলজ অক্ষর।

হে মেধাবী দেশ ছেড়ে যেও না। 

রাজনীতিতে এসো, 

বশিষ্ঠের মতো শিকড় ছড়ানো শেখো।





কবি তৈরি হচ্ছে, 

পোশাকের নিচে শূন্য হৃদয়।

ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ে সরু গলায়। 

শীতার্ত জোঁক ধীরে ধীরে কামড়ে ধরে ধমনী

রক্তপাতেও থেমে থাকে না বসন্তের বিবরণ

সামনের লোকগুলো ঘুমিয়ে গেছে ।

উত্তরীয় আর স্মারকের দোকানে 

বাকি  পড়ে আছে টাকা। 

রক্তখাওয়া জোঁকের মুখে নুন ছেড়ে দিই,  

আরো একটি কবিতার জন্ম

দিতে গিয়ে যেন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে কেউ।



জনহীন রাস্তায় নিঃসঙ্গ  পি. সি.ও আর

 জয়পুরি দোপাট্টার মেয়েটি , 

শ্যামলা মুখখানি হারিয়ে গেছে কোথাও 

 ছায়া দিয়ে সাজানো এক অদ্ভুত বাতিঘর ,

 ক্যাশবাক্সে প্রেমিকার নাম্বার রেখে গেছে দোহারা যুবক

জেরক্স মেশিনখানি নষ্ট হয়েছে কবে

আশিকির গান বাজছে আজো, 

শুধু শেষ হয়ে গেছে নব্বইয়ের দশক 


কবিতা লিখি,

 যেমন লেখে প্রেমহীন মানুষ, 

ভালোবাসাগুলো শরীরের কাছে গিয়ে

ফেরার পথ খুঁজে, শয্যায় শায়িত সেই ধ্রুব

অভিমান নিয়ে বনমহোৎসবে সামিল হই 

গাছেদের মিলন নেই, অথচ বসন্ত আছে

ফুলসম্ভার,  সুগন্ধি আর প্রবল ঝড়ের দিনে

নম্র উচ্ছাস, হাওরার মাতন, কেবল স্পর্শ নেই। 


শান্তি এসেছে, 

খয়েরি খামে পাইন গাছের বীজ

সমান্তরাল পথরেখা, শুকনো মাছের গন্ধ,

অনার্য নারী মাটির পাত্রে রেখেছে ভাতের মণ্ড, 

টিউবওয়েলের জল ঢেলে, হেসে ওঠে চিকন, 

গর্বিত চোখ। হোক চোলাই ! 

দেহে তো নতুন জোশ। 

ঢুঁপি ছরার জল ছেঁকে পাওয়া কাংলা মাছ, 

কালোকৃষ্ণ পাতার গন্ধ নিয়ে 

ফুটে উঠেছে হলুদ ঝোল।

সন্ধ্যা বড়ো মরমী হয়, 

পিচ রাস্তা ছেড়ে দিয়ে

ধীরে ধীরে  মিশে যায় রুগ্ন গ্রামের শরীরে।


যে পথে পৌষ ঢোকে আমি তার সঙ্গী বাউল

পরনে কুসুম রঙের পালক, নীল তিলক

শূন্যতা তুলে নিয়ে যেতে, ধানের খেতে এলাম

অগ্রহায়নের বৃষ্টিতে নরম হয়ে গেছে পাকা ধান

বিষণ্ণতার রোদ ছুঁয়ে মগ্নতা এসেছে তার।

অসময়ে বৃষ্টি  হলে আমিও লক্ষ্যহীনতায় ভুগি

ভেতরে ভেতরে সুগন্ধি পচন, পোকা, ব্যর্থ 

কবিতা মাদুলি, আভূমি প্রণাম করে ক্ষমা

তুলে নিয়ে যাচ্ছি, মুখ ফসকে অঙ্গার বেরিয়ে

যায় যখন তখন, ঠান্ডা ধার, 

 ডিসেম্বরেই আমার ভেতর যতো

অকারণ প্রপাত। 


চাকার আওয়াজ যেন রাত্রির অভিঘাত

এতো দ্রুতগামী ট্রেন দিয়ে কি করব?

যদি ছায়া না দেখতে দেখতে যেতে পারি

পুরনো দিনের মতো অলস হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়

ফোন নং হারিয়ে গিয়ে যেখানে আমি অবান্তর

ঘাসের ওপর দিয়ে চলে গেছে কিছু মানুষের পায়ে হাঁটা পথ ....


 সৌরভ ছড়ানো এই বেঁচে থাকা শেষ হবে 

না যেন কোনোদিন, কখনো শাকের আঁটির মতো সংসার আর ছলনার মায়াময় জাজিম, ডুবে গেছি । যে স্তর ছেড়ে আসি সেখানে অমৃতের জন্ম হয় , প্রেতিনীর মতো এগিয়ে এসেছি পদচিহ্ন নেই, বাসভূমিতে মন্ত্র জেগেছে, 

ধোঁয়ার জলসা । চারপাশে ভিড় হোক,

 শান্ত মলিন জল ,মাছজন্ম ভালো , 

জলহীন সমাধিতেই শেষ




আমি যে লেখা লিখি ,সে আমার ফাঁদ

ফাঁদে পা দিয়েই কামড়ে ধরি কন্ঠ

তারপর ফোঁটা ফোঁটা করে পড়তে থাকে

অম্ল ও ক্ষার ...এক একটি আত্মহত্যার খবর 

নাড়িয়ে দিয়ে যায় ছাইয়ের মতো রাতে , বেঁচে থাকা মানুষেরা স্তব্ধ সাদা পাথরগুলো নিয়ে আলোচনা করে,আমাদের নিঃশ্বাসে তাদের

দীর্ঘ শ্বাস হারায় ,আত্মহত্যার কারণ শোনা যায় ,

কিন্তু সে কারণ একটি ফুলের মৃত্যুর মিথ্যে গুজব



পুরস্কার প্রাপ্তি , ধর্ষণ আর হত্যার খবর 

একসঙ্গে পড়ি , কেমন যেন নিস্পৃহ হয়ে বসে থাকি,জলাভূমিতে বেড়ে ওঠা কলমি লতার

মায়াবী তুচ্ছতাগুলোই শুধু আমার হোক  

...জ্যোৎস্নার মতো পরিকল্পনাহীন ,

এরকম বেঁচে থাকি আরো কিছুদিন 



কোনোদিন ভোরবেলায় ভুল করে উঠি

দেখি লাইট পোস্ট ঢেকে আছে স্বর্গীয় আলোয়

মনে হয় এল ই ডি বাল্ব নয় , না দেখা মেসেজ।

সকাল হতে হতে বিস্মৃত মায়াবীলোক 

রান্নাঘরে ধোঁয়া ওঠে , তরুণ শাকসব্জি স্পর্শ করতে গিয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে আঙুল ।



অস্বীকার করতে ভালো লাগে যেমন তুমিও করো

একে অপরকে অস্বীকার করতে করতে

চোরা কুঠুরিই সম্বল,

হতাশ হওয়াও নেশার মতন

তবুও আমরা অস্বীকার করি

এই মাঠ ,শ্বেতফলে ভরা গাছ ,

 বহু নিচে ছড়ানো শেকড়



কেন জানি রোজ মৃত্যুর কথা ভাবি

কীভাবে মরব কে জানে

হয়তো আমার মায়ের মতন

শুষ্ক গলায় চলে গেছে জলহীন

আমিও যাবো এভাবে যাহোক একটা

জলহীন,  কবিতাহীন,  গানহীন



মুখর ছিলাম ,এখন পুরনো বাড়ির মতো ।

যেসমস্ত উদ্ভাস কবিতা ছিল

ছত্রাকের স্থবিরতায় জমেছে  ফ্যাকাশে চর্বি,

আত্মার  ক্ষয় নেই, 

 এই বিশ্বাস আছে কোথাও এখনো ,

তাই আবারও উঠে যাবো 

অক্ষরে ছড়ানো আবেগে ভেসে বেড়াবে ক্রৌঞ্চমিথুন ।




শহরের একটিমাত্র মৃতপ্রায় নদীকে নিয়ে

আমরা স্রোতের স্বপ্ন দেখি    

আমাদের জল কমে যাচ্ছে

মেশিন দিয়ে নদীর আরো গভীরে যাই

দগদগে ক্ষত থেকে দমকে দমকে ওঠে কিছু জলের বেদনা, 

স্নানঘরে সেইসব জলবিন্দু থেকে অনিশ্চিত ফেনা 

ছড়িয়ে পড়ে শরীর থেকে শরীরে

এই জল তাই ভালোবাসা জানেনা, 

আসলে ভালোবাসা বলে কিছু নেই, 

আছে শুধু দেহ ও ক্ষত উন্মোচন । 

















আশ্বিনের বিকেল 


এমন  বৃষ্টিদিন এসেছে

 কয়েক ঋতু পর, উন্মুক্ত !

 স্নানযাত্রায় গোঠের ঠাকুর

 যেন আমাদের পাহাড়ে, 

শটিবন, বাঁশঝাড়, ধলাই নদী, 

পোড়া আলুর প্রসাদ, 

গহন ছেড়ে এই মাত্র 

সন্ধ্যা পথপ্রান্তে সমাগত,  

অন্ধত্ব প্রবাহিত হয়ে ধুয়ে 

নিয়ে যাচ্ছে ক্লেদ, ছিন্ন বল্কল,

 এখানে সমাধিক্ষেত্র, মনসার থান, 

দরগার সীমানা, ধূপবাতি, মোম,

 আগাছার ফুল নিয়ে চলে যাচ্ছে, 

তমসা সুন্দরী, গতবছর মরেছে সে

 সাপের কামড়ে, দু 'হাতে কুয়াশার

 ঠোঙা, নীলকণ্ঠ ফুলের রস,

 ক্ষীণ হাসি, জ্যোৎস্নার প্রেতিনী যেন, 

বর্ষা ধুয়ে দিতে চায় যত 

তাঁর দুঃখ সমারোহ, 

হেলেঞ্চার জঙ্গলে ভরে গেছে পথ, 

গোধূলির ভাঙা আলো পড়ে

 যেন স্বর্ণসম রূপ, তাম্রবর্ণ যুবা,

 প্রবল জীবন, সাদাটে সন্ধ্যায় 

আলোড়ন তুলে গেছে গ্রামে, 

দাঁড়াও ক্ষণিক, শান্ত বারিধারায়, 

ধুয়ে যাক অশুভ বচন,

 মাটি পেয়েছে জননের ক্ষমতা,

 কাদামাটি জলে মিশে যায় 

শুধু প্রসবের সুখ... বেদনা। 






কাঁঠালের হলুদ শাঁসের মতো 

আঠালো লেখা কী করে

 লিখবে গ্রাম্য কবি,

 যদি তাকে উপেক্ষা করে

 যায় গভীর সেই প্রেম, 

উদাস স্তনের মতো খালি 

হয়ে গেছে  মৃৎ পাত্র,

 ধানের শিকড় থেকে 

আনো বংশধারা, জিন। 

ব্যক্তিগত ছিল যে নারী,  

আর জন্ম দিতে চায় না, 

ভুলে গেছে মিলন মুহূর্ত, 

তার গাভীর নাম শশী,

 উঠোনে ঝরছে নতুন দুগ্ধ,

আঠারোমুড়ার জঙ্গল থেকে 

সোজা চলে গেছে উৎরাই পথ,

 রোমশ ছাগল শিশু আর 

পাহাড়ি ছরার জলে, 

নীরবে নামছে কায়াহীন 

সংসার, এখানে মরে গেলে 

যেন জন্ম হয় আবার, 

রিফিউজি লতা ঘেরা 

বাসুকির খোপে লাল জবা, 

কালো তাগা, তাবিজের বন্ধন, 

পাঠ শেষ , ফিরে এসো বধূ, 

এই অনিহা ছেড়ে,

 সংসার সংসার খেলা 

হোক পুনর্বার, হিম চাঁপার

 সৌরভ খুঁজে পাক মৌমাছির 

আস্তানা, ধূপগাছে ছাওয়া 

দেবদেউলে ধরা পড়ি

 জৈষ্ঠ্যের চন্দ্রগ্রহণে।






এই যে বিস্তৃত মনু নদীর অববাহিকা

ঘোলা জলের অন্তর্লীন স্রোতধারা, 

পাহাড় ধুয়ে আসা সেগুন, শিমুলের

 শিকড়স্নাত জল, নিশিন্দা আর কালো 

ওঝা গাছ,  দু একটি শ্মশানঘাট, 

পোড়া কাঠ, মাটির কলসী, কাল রাতের

 ঘন বর্ষা নিয়ে গেছে লোভ আর দংশনে মৃত

 দেহের ছাই, তারে মেলে দেওয়া হলুদ লাল 

শাড়ি, বাড়ির উঠোন ঘেঁষে চলে যাওয়া

মাটির রাস্তা, যেতে যেতে শশা, কুমড়ো,

গন্ধরাজ লেবু, কাঁঠাল কিনে নেওয়া,

 শ্মশান দেখে ফেরার সময়, সংসারের    

কথা ভাবা, চোরা স্রোত, জলের ঘূর্ণি 

দেখতে দেখতে আবার স্থবিরতায় আসা, 

পায়ের পাতায় মোরগের নরম পালক, 

ভাট ফুলের ঝোপের কাছে দুটো বক

 নির্নিমেষ আর তাদের গলার কাছে 

পিছলে যাচ্ছে মেঘভাঙা রোদ, কেমন

যেন মিলেমিশে আছি, হয়তো আমার

আর ভাবার কিছু নেই, তর্ক মরে গেলে 

মানুষ এমনই খোলা হাওয়ার মতো হয়ে যায় ।


 কোনো লেখাই আসল নয়, 

আগুন থেকে জন্ম নিয়ে আসেনি

 সেই ঢেউ, জ্যোৎস্না থেকে চুরি 

করেছি আলো ,জোনাকি থেকে

 গোপন আলোর অভিসার, 

পল্লবিত গাছ থেকে

ছায়ার নরম কৃষ্ণ ইতিহাস

রৌদ্র দগ্ধ দুপুরের হলকা

মুখে মেখে যাকে চলে যেতে

দেখেছি অভিমানে, তার মুখ থেকে

কুড়িয়ে এনেছি দু একটি অঙ্গার

গরিব হয়েছি , হৃদয়ে ধারণ

করেছি গৈরিক, নির্বাণের স্তুতি    

দীর্ঘ রাস্তা …স্বর্ণচোরা

ঘাসে ঢাকা, শস্যের খেতের পাশে, 

ঝড়ের আকাশের নিচে যেদিন মাটি 

গেয়ে উঠবে দাহ গান, বল্কল

খুলে দেখবো অস্তিত্ব বলতে ছিল

খানিকটা বর্ণমালা, শঙ্খমুখের পাতা।




ছোট গ্রাম, নদী নেই তার,

 ছরা আছে ,উঠোনের পাশ

 দিয়ে বয়ে চলা,

 কিশোরীর তরুণ হাতের মতো,

 মুঠোতে  নাগচম্পার দাম, 

অর্জুন বৃক্ষের মুকুল, 

বাড়িতে বাড়িতে সুপুরি 

গাছের দেহ দিয়ে তৈরি 

ব্যক্তিগত ঘাটখানা, 

দু একখানি বড়শি রাখা, 

টিলার পাশ দিয়ে চলে

 গেছে যেন সে এক গ্রামীণ ভৈরবী,

 গোপনে নিয়েছে শুঁকে 

গর্জন গাছের পাতায় মোরা 

পান্তা ভাত, ধানি লঙ্কার গোছ, 

শুঁটকির ভর্তা, রান্নাঘরের ছনের 

চাল থেকে ঝরে পরে রাতের শিশির, 

শব্দহীন !  নৌকো নেই কোথাও, 

সাঁকো আছে,  বড়ো আপন, 

এখানে জন্ম নিয়ে মেয়েটি 

রয়ে গেছে এখানেই, 

বাপের ভিটে ছেড়ে গেছে 

কেবল দু'ঘর, একই রয়ে

 গেছে জলের উৎস, ছায়ার পতন, 

মনখারাপ হলে পা দুলিয়ে  

জলে তুলেছে ঢেউ, 

দুধ জ্যোৎস্নায় ভেজা 

বাঁশপাতা পড়েছে ঘাটের কোণে,  

ভাসতে ভাসতে পাশের ঘাট 

থেকে ডেকে এনেছে মাকে, 

শীর্ণ শরীর, মায়া ভরা চোখ, 

পাথরের থানে তার যাবতীয় 

বিশ্বাস কমলা সিঁদুরে লেখা, 

মেয়ের বাড়ি যেতে  হবে বলে 

নিয়েছে, কচুর লতি, কাঁঠালের

 বীজ, দিব্য গন্ধ স্বর্ণমুসুরি চাল।




মনুনদীর তীরে যে সন্ধ্যা নেমে 

আসে ,তা নিমের ছায়ার মতো ,

পারের কাছে শ্মশান বলেই

 মনু স্ত্রী হতে পারেনি

ভুলবশতঃ আমরা তাকে

 নদী বলি ।শূন্য বক্ষে বর্ষার

 ঘোলা জল ভরে দিয়ে 

শোকাতুর মানুষকে বাড়ি 

পাঠিয়ে দেয় ,ফিরে আসতে 

আসতে দেখি কুশের বনে ,

জেগে উঠছে কাশের চারা 




ত্রিপুরার কিছু দুঃখ ও মোহ, 

সিঁদলের গন্ধ থেকে আসা,

পোড়ানোর সময় গলতে থাকে 

আঁশের নিচে থাকা নুন, চর্বি, 

ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে খাদ্যনালী, 

পুঁটিমাছ আর মরিচের ঝাঁঝে, 

খালি হয়ে যায় পূর্ববঙ্গের জমিদার

 রিফিউজিদের পাত, নির্দ্বিধায় 

দুহাজার টাকা কেজি, ইলিশের 

গল্প ওঠে আজকাল, আর কবে 

কোন কালে সতের টাকা দিয়ে

 কিনে আনা হতো নববর্ষার স্বাদ, 

ছিল এক কাটাতারহীন নির্দোষ

 চোরা কারবারি,আমাদের গরিব

 জিহ্বা এখনো এসব, আঁশটে

 দুর্বল অনভিজাত খুচরো গল্প

 উগড়ে দিয়ে মৃত্যুবাসরে সন্ধ্যার 

কীর্তন গেয়ে, খোল করতাল 

বাজিয়ে,বিড়ি ফুঁকতে ফুৃঁকতে 

বাড়ি ফেরে রোমশ অন্ধকারে। 





খাং বাঁশের বেড়া, শিল বরুয়ার খুঁটি 

বেতুয়ার টুকরি করে এনেছে পাহাড়ের মাটি

ঘর উঠছে ঘর, নয়নতারার অঙ্গন, 

ঈশান দিয়েছে পুরোহিত, পুজো হয়েছে,

মুরগি আর কবুতরের মাংসল প্রসাদ

রক্তের শুভ্রতা দিয়ে তৈরি ঘর মনোরম

সুন্দি গাছের নতুন খাটে শুরু হয় 

চোখে চোখ রাখা, ঠোঁটে মাকড়সার 

পবিত্র জাল, ঘর বেঁচে থাকে ততদিন,

যতদিন ইঁদুর, বেড়াল, আদার ঝোপ,

হলুদ গাছ, চাঁদের আলো পারস্পরিক 




 গান গাইতে জানি না, জন্ম থেকেই 

বেসুরো।  এটা অভিশাপ। 

আমার কাছে লুকোনো আছে

 কিছু ঝর্ণা ও পাথর। 

পাথর বসিয়ে বসিয়ে পথ 

বানিয়ে দিই, বাঁকাচোরা, পিছল। 

তাতে ঝর্ণার কষ্ট হয়, রক্তক্ষরণে 

ভেসে যায় সে, কোনোদিন 

এই রক্তস্রোত নিয়ে আসবে সুর, 

নিষ্ঠুরতা মুছে যাবে আমার, 

অপেক্ষা করছি, 

দুর্বল ঠিকানা রইল এখানে,


 " পূর্ব হিমালয়ের নিম্নভাবর 

অঞ্চলের বাসিন্দা,  

কালবৈশাখীর বিকেল থেকে 

কবিতা লিখে আসছি “







একটি সন্ধ্যা হচ্ছে, যেন সব 

সন্তান দূরে চলে গেছে, 

একা কোনো মা শাঁখ বাজাচ্ছে, 

ঘরের আলোয়, ফুটে ফুটে উঠছে

 চলে যাওয়া মেয়েদের পা,

 শ্যামলা সবুজ তরল মুখের 

ছায়াগুলো পালং শাকের মতো 

নরম, তারা রয়ে গেছে মায়ের চোখে, 

সন্ধ্যার সর নেমে আসছে মফস্বলের

 লাইটপোস্টে ভাঙা পিচ রাস্তায়,

 ছুটি হয়ে যাওয়া নিচু অফিসবাড়িতে,  

পৃথিবীর সব শহরে এমনি সন্ধ্যা আসে,

 চুপচাপ। স্মৃতির শহরে জাহাজডুবির 

খবর ছাপা হয়, আবহে হারমোনিয়ামের 

সুর, প্রত্যেকটি সন্ধ্যা প্রিয় অতীত, 

নীরব আততায়ী, খেয়ে ফেলে 

মেয়েদের কলিজা, নরম জরায়ু।



অজস্র গাছ কেটে নিলে, 

পাহাড়ে ভাঙন নামে,  

শালিক পাখি সন্তানহারা, 

পুত্রঞ্জীব গাছ গিয়েছে মরে, 

দেহ জাগো, ভিড় করো অরণ্যের 

মতো, প্রখর মিলন, বিশ্বস্ত মেঘে 

ঢাকা সেদিনের চরাচর, গড়িয়া 

পুজোর মাস, গাছের সঙ্গে গাছ 

মিশে যাচ্ছে, ধনেশের পালক 

পড়ে গেছে নিচে, হাজার রঙের 

জখম, সেইদিন সব গাছ হয়েছিল 

মানুষের মতো চন্দ্রকামুক, 

তাদের আশ্লেষে ঝড় হয়েছিল, 

বোঝেনি কেউ, ধ্রুব ভেঙে 

জেগে উঠেছিল ভাস্কর্য, 

ভোরের বেলায়, নিভে গেছে সব, 

চিহ্নমাত্র নেই, শুধু সবুজ লতার

 চর উদ্ভিন্ন সৌরভ




যেন সে অনেকদিন পর এলো,

 বহু সকালের পর, নিশিডাক 

ফিরে গেছে কত, দ্বাদশীর আকাশ

 চূর্ণ মেঘের মতো নেমেছে উঠোনে,

 সভ্রান্ত লয়ে এসেছে সে, 

হলুদ গোলাপের স্তবকে রহস্য 

ছড়িয়ে যায় কুবু পাখির ডাক, 

খাসিয়া পানের বাটা রেখো, 

ভেজানো সুপুরি কুচি, 

যাদের ভালোবেসেছিলাম, 

নীরবে এসেছি ছেড়ে, সেইসব  

রূপোলি ভালোবাসা দিয়ে 

অঙ্কিত এই চরাচর 



সেগুন,  শিমুল, গর্জন, জারুল, 

মেহগনি ,গামাই, অর্জুন, অগরু

  চিরহরিৎ পুরুষ গাছ, বর্ষার গায়ক।

এখন গাছ নয় কাঠ শুধু কাঠ, 

চামড়া নেই, ভেতরের মাংসগুলো 

খাঁ খাঁ করছে ।

হেমন্ত ঋতুর বিষাদ আঁকা, 

শরতের সুখ ,বুড়াছা দেবতার 

পুজো হয়েছিল কোনোদিন

হয়তো লেগে আছে মাঘ মাসের বলির দাগ

বনজামের হারানো রঙে এখন কেঁদে ওঠে

ভৃঙ্গরাজ, উদাল ঝোপের ছায়ায় ছায়ায়

সে ছিল এক বনভূমি, ফেনি থেকে মনু, 

শাকানের চুড়ো, এখন গাছ নয়,

 কাঠ শুধু কাঠ,চামড়া নেই, 

খাঁ খাঁ করছে মাংস, রক্তময় নিস্তব্ধতা


 .

বড়ো বড়ো সড়ক হচ্ছে আমাদের, 

পাহাড় ফেটে যাচ্ছে, কালচে ঝর্ণার ধারা

মসৃণ রাস্তায় এখন দ্রুত চলে যায় গাড়ি

আমার হাত থেকে হারিয়ে গেছে কবিতা

অশরীরী ছায়া নিয়ে মৃত বনে ঘুরে বেড়ায় 

গাছের শিশুরা, কোথায় গেল হাজার পাখি

আমি প্রতিদিন এই একটি লেখাই লিখছি

 গাছ কাটা হয়েছে, বৃষ্টি কমে গেছে

ঝড়ের নামকরণ হওয়ার পর হিসহিসে 

গলায় শহুরে লোকজন বলে ' চিয়ার্স '। 

এখন গাছগুলো আবার লাগিয়ে 

দিয়ে যান মাননীয় কর্তৃপক্ষ, 

রেইন ট্রি বড়ো হতে দীর্ঘ সময় লাগে ...

ততদিন  শুষ্ক  হাত, মরু হৃদয়, 

বিপুল কাতরতা, হয়তো আমৃত্যু ! 


পুনরায় এসেছে আশ্বিনের শেষ

গাড়ই ব্রত করে ফিরে যাচ্ছে বধূ,

কোলে কাঁখে নীরব মধ্যাহ্ন, 

খালি বাড়ি পূর্ণ হোক সন্তান সন্ততিতে, 

বৃষ্টি বৃষ্টি খেলা নামবে হয়তো 

কাল সকালে, অতসী ফুলে

ভরে যাবে পশ্চিমের পুকুরের ঘাট,

পায়েস পাতা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে 

মেয়েটি, গ্রীষ্মের গন্ধমাখা 

কালোজিরা চাল জোগাড় হয়েছে, 

আলো মরে আসছে, দিন চলে 

গেল...একটি দিন। 

উপবাস, আর দুর্বল শরীর 

ফেলে যায় ঋণ, অনুতাপে লবনাক্ত। 




আসাম আগরতলা জাতীয় সড়কে

এখন বাঁক কমে গেছে

সরল হতে হতে দ্রুত হচ্ছে গতি

কোথায় রহস্য ঘেরা এক পশলা অন্ধকার

আর ঋজু নাগার্জ্জুন গাছ?

ত্রিপুরার রাস্তা তবে কি হারিয়ে ফেলেছে

তার শরীরের মায়াবী ধার

বাঁক হারিয়ে গেলে অজানাও হারিয়ে যায়

অজ্ঞাত বাঁকেই সব মৌতাত

সংকীর্তনের মতো সহজ হয়ে যেও না তুমি

লোভ জাগিয়ে রেখো শ্মশানের ডোমের মতো

মৃত্যু এসে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে

বলে যাবো একাদশ বাঁকে আমি ছিলাম






নিঃস্বরের করতলে 

—------------------


স্তব্ধরমণ থেকে উঠে আসা কোন ধ্রুবতারা

আহুতি দিয়েছে জন্মরহস্য, বিষণ্ণ কালপুরুষ। 

বুক থেকে চলে গেছে বোধ , অন্ধ পদ্মযোনি ।

এখন তবে মগ্ন  রাত, স্থানীয় গ্রামে

চন্দ্রগ্রহণের সংস্কার, বকের পাখায়

লেগে থাকা চাঁদের বেদনা ।


……


এসো তবে যেকোন নারী, পুড়িয়ে দেওয়া দেহ

তারো আগে ধর্ষণের ক্ষতচিহ্ন,  আর্তনাদ,

তার শরীর থেকে জন্ম নেবে হয়তো অসুর

পাপ ছড়িয়ে যাবে আরো,  বৃক্ষে রক্তফুল,

এ তবে পৃথিবী, রুগ্ন মাংস , তেজস্ক্রিয়তায় 

নষ্ট হৃদয়,


…..

ছেড়ে যাওয়া মানুষ প্রত্যেকদিন

নিবিড় হয়ে আসে, যেন ঘিরে আছে স্বর্গদূত।

সুস্থ হয়ে গেছে তারা, দগ্ধ শিশুদের 

গায়ে সেখানে ফুটেছে পারিজাত।


……

মধ্যবয়স ভুলে যেতে চায় শান্ত বিকেল

চেনা রাস্তা,  কৈশোরের বিদ্যুৎ বিনিময় 

মৃত মানুষের হাহাকার তাকে শূন্য করে দেয় ।

বাঁচো , বাঁচো বলে দেয় অপঠিত উপনিষদ। 

কুড়োই ধুলোমাটি, ঈশানকোণে রাখা হলুদের শিকড়,  নাড়কেল গাছে ছাওয়া বাড়ি,

ক্ষুধাহীন,  কষ্টহীন, সুখী মানবমানবী ,

ছুঁয়ে দেখি,  চলে গেছে যারা ।

ভুলে যাও মৃত্যুশোক।

আনন্দকে ডাকো সখাসম ।


……

ফিরতে ফিরতে জানি অসংলগ্ন হয়ে আছি

শুনিনি  শ্লোক, অজানা থেকে আসা ওম্

 সামবেদে কিছু সমাপতন , নিরোগ প্রাণবায়ু

বুনে নিচ্ছি রম্য জাল, সুলভ আশ্রয়

অশ্রুহীন একা থাকার ঘনঘোর অভ্যাস।


…..

জেগে ওঠা প্রশান্ত মহাসাগর , 

ঢেউয়ের ভেতর আগুন , তোলপাড়। 

লাভা কিছু জানে আমাদের কথা, 

ঘন হয়ে তাই চেপে ধরে কন্ঠ

যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেশ, 

 অধিবাসী হঠাৎ রিফিউজি ,

 তাদের পায়ে পায়ে পোকাদের একটানা গুঞ্জন , যেন ওরা আগাছা,

দেশ পেরিয়ে তাঁবুর ভেতর গুটিসুটি রাত। 

আঙুরের খেত, শস্যের উঠোন, গ্রীষ্মের চেনা দাবদাহ,

আলো জ্বেলো রোজ,  ভুলে গেলে

ধ্বংসস্তুপ থেকে তুলে এনো যুবকযুবতীর

 শেষ কথোপকথন , মুছে যাওয়া অধরস্পর্শ। 



…..


মৃত বিশ্ব– কিন্তু জেগে আছে পৃথিবী

জ্যোৎস্না বয়ে আনে আদরের গান

রূপকথার ভেতরে কোন এক রাক্ষসী

গিলতে থাকে বর্ণমালা  হারানো হাত !


….

ভেতর থেকে খুঁড়ে আনি বেঁচে থাকার উৎসাহ

কড়ির ভেতর যেমন সমুদ্রের বোধ

ছায়াময় উপত্যকা , লৌকিক ব্যথা

বালুকণা মুঠোতে নিয়ে বাঁচে নুলিয়ার ছেলে

প্রতিদিন ঝরে আলো তবু সে স্বপ্ন অভিসারী

সুনামির বুক থেকে তুলে আনে সমুদ্রঝড়ে হারানো নৌকো। 

…..


মানুষ ভেঙে পড়েছে,  মিনারের কান্না। 

 পরাজিত দম্ভের মধ্যে দাঁড়িয়ে

পুড়ছে গ্রন্থ,  শিল্পকলা,  আমাদের সূক্ষ্ম

অসীম দৃষ্টিপাত।

 বিদূষী চলে গেছে অগ্নিস্নানে,  

শ্বেতদাহে জ্বলে উঠে গৈরিক বেশ , চকিত ইশারার বিনিময়ে নীলপাত্রে ধীরে জমছে

বিষাক্ত স্নেহ। 

……..

মফস্বল শহরের ছোট নদীর মতো 

বাঁচতে চাই, গরিব চায়ের দোকান

গাজনের গান গেয়ে জেগে থাকা দুপুর

শিব গৌরী জল খেতে চাইলে

ব্রোঞ্জরঙ মাখা হাতে তুলে দিই অরেঞ্জ স্কোয়াশ,

কোথাও যাবো না, আমি। 

অন্য শহরে চলে যাওয়া মানুষদের

 অসুখী বারান্দায় দেখি ,

 ডানা ভেঙে পড়ে আছে শুধু হারানো দিনের

উচ্ছ্বাস  ।


…..

জড়িয়ে মড়িয়ে বেড়ে উঠেছে কোন বটগাছ

তুলশীতলায় শ্যাওলার আস্তরণ

বর্ষার জলে ভিজে আছে দু একটি সিঁড়ি

গ্রিল ধরে দাঁড়ানো এক অনন্ত কিশোরী–

তাকে ছেড়ে এসেছি। 

তাকে ধরে রেখেছি।

যেতে দিইনি আজো, শাঁখ বাজানো শেষ হলে

ঝোপঝাড়ে আস্তে চলে যায় বাস্তুসাপ 

এ শ্রাবণ তোমার স্পর্শ না পাওয়া হাতের

মতো আমাকে ছুঁয়ে থাকে,

জমিয়ে রাখা কাঞ্চনফুলের বীজ ছড়িয়ে

দিয়েছি বিগত আষাঢ়ে , প্রখর সূর্যে 

এখন তাদের নিবিড় সালোকসংশ্লেষ ।


কিছু বছর নাহয় অপেক্ষা করি ,

সমুদ্র সঙ্গে নিয়ে হয়তো  জেগে উঠবে

 নবীন ভঙ্গুর যৌথ স্বদেশ। 






মনুনদীর উপাখ্যান


নদী প্রাণ, নদীরে করি প্রণাম

বন্দনা করি পাহাড় আর মাটি

বুকে নিয়ে জল আর জল

মনুনদীর কথা বলব এখন

শুক্রেশ্বর বাণেশ্বর রচে রাজমালা

মনু ঋষি করেছিল তপস্যা

আদি সত্যযুগে বৃক্ষ ও পর্বতমাঝে

বয়ে যাওয়া এই নদীতীরে ,

সে থেকে নদীর নাম হলো মনু 

চর্যাপদ নামে আছে আমাদের

গ্রন্থরাজি, সান্ধ্যভাষায় বলে কথা

মনখেমর নামে ছিল এক জাতি

দ্রাবিড় সংস্কৃতির বাহক তারা

ঊনকোটির পাহাড় কুঁদে

নির্মাণ করেছে শিব-পার্বতী 

শিব যদি হয় দ্রাবিড় পুরুষ,

পার্বতী বনদেবী।মনখেমর

করে বাস,অদূরে নদী

বর্ষাকালে খরস্রোতা,শীতকালে

চরা,শাক,সব্জী,ধানে ভরা 

তাদের কূলবধূ শঙ্খে দেয় ফুঃ

দু ধারে বাঁশবন আর বৃক্ষরাজি

মধ্য দিয়ে মনু নদী বহে ছলছল

 

জনপদ জ্বালে প্রদীপের আলো, 

মাঝিদের গান আর খেয়াঘাটে 

বাঁধা নৌকো চান্দের আলোয়

যেন স্বপনের মতো, ক্রমে ক্রমে

নাম হয়, ছাম্বুলনগর । মনুর 

অববাহিকায় মাটির প্রাসাদ

গড়ে ধর্মমাণিক্য, রাঙাউটি

স্থানের নাম আর চতুর্দশ দেবতার

মন্দির , ক্ষণকাল ইন্দ্রমানিক্য 

ছিলেন সেথায়,  জিতু দিঘি 

নামে এক জলাশয় আজো

আছে ধীর শান্ত কালো টলমল।

সুবরাইখুঙ্গ নামে আছে শিবমন্দির

‘রাজরত্নাকর গ্রন্থ ‘ করে বর্ণন

 কিরাতরাজ্যে স নৃপশ্ছাম্বুল 

নগরান্তরে শিবলিঙ্গ সমদ্রাক্ষিৎ

 সুবড়াইকৃতে মঠে। এই রূপে 

মনুনদী করে বহন,কত প্রাচীন

 কথা আর মানুষের জীবন। 


ঊনকোটি পাহাড়ের কথা 

সর্বজনে জানে, কৈলাসপতি

 করে বাস হরিষে বিষাদ

সেই থেকে  নাম কৈলাসহর 

আষাঢ়ে নদী ভরা জল , 

দুকূলে প্লাবন, শরতে সাদা

কাশের বন, উড়ায় পবন। 




আর এক রূপকথা আছে,

শুনো দিয়া মন । মনুনদীর কথা

 না হয় শেষ,  করি আরো বর্ণন

হালাম নামে আছে আদিবাসী

তাদের যে সর্দার মহাপরাক্রম হয়

মনু নামে ছিল তার কন্যা গুণবতী


চুল  ঘন মেঘ ,আষাড়ের ছায়া 

 ডহররূপি চোখ, ঘূর্ণির নাচন 

 সুমিষ্ট বুলি তার দোয়েলের মতন

কাঁঠগুলাচের খোঁজে সব যুবক যায়,

মনুর চুলেতে দেবে,এমন ইচ্ছা হয়

চোরা চাহনি, ফুলের নুপুর পায়।

যেন বৃষ্টির চলন, ফণা নামিয়ে

পথ করে দেয় যত কালনাগিনীর দল 


লঙ্গাই ও দেও নামে ছিল দুই ছেলে

মনু বাসিত দুজনে প্রাণেরও অধিক

তাদের কুজনে ও গীতে পাহাড় ঝর্ণা 

হয় মুখরিত । দিনে দিনে মনু যুবতী

হয়, ধানের গোছা যেন শরতকালের ।

বিবাহযোগ্যা সর্দারকন্যা অতি সুন্দরী । 


হালাম সর্দার রাগী ও অহংকারী, 

লঙ্গাই ও দেও তার নাহয় মনের 

মতো।ধলাই নামে এক ছেলে ছিল,

পিতার মনোনীত। মনু তাতে না 

দেয় মত।এমন দ্বন্দ্ব চলে প্রতিদিন

কাঁদতে কাঁদতে মনু বন্ধুদের কাছে যায়।


লঙ্গাই-দেও পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে

এক নারী দুই পুরুষ কেমনে সম্ভব

মনু কেঁদে বলে ভালোবাসি দুজনে

সন্ধ্যার বাতাস বহে,বনফুলের ঘ্রাণ

মশাল নিয়ে আসে সর্দারের মানুষ

খুৃঁজে ফিরে মনুরে বনের প্রান্তরে 

জোনাক জ্বলে আর জ্যোৎস্নার ধূপ

বনদেবীর থানে কাঁদে যুবতী ।

ঘরেতে এসে মনু স্তব্ধ হলো

পিতার আদেশে মাথা করে 

নিচু। গোপন শর্ত এক রেখে 

এসেছে আজ আঁধারে। কাল

ভোরে যার সঙ্গে দেখা হবে

প্রথম, সেই হবে মনুর দোসর, 

কাটবে জীবন। দীন বাসে নীরবে,

মনু ঘর ছাড়ে,রাতের আকাশ 

আস্তে আস্তে ফিকে রঙ ধরে।

  

সময় ধরতে দেও দ্রুত ছুটে বনপথে। 

ডুবন্ত ধ্রুবতারার সঙ্গে রৌদ্রের 

প্রথম কিরণে দোহা’র কোমল 

মুখ জাগে। পরস্পরের কন্ঠে 

ফুলের মালা দোলে, বহুদূরে 

জলগান বাজে। এদিকে ধীরে সুস্থে

লঙ্গাই,মনু সঙ্গে মিলন স্বপ্ন নিয়ে

হাঁটে,পথ মাঝে কোয়েল ডেকে কয়

যার কাছে যাও তুমি সে আর

তোমার নয়। প্রথমে এসে দেও

মনুকে করেছে বধূ।তার কথা

শুনে লঙ্গাই মনে ব্যথা পায় ,

নিজের ভুলের কারণে মনুকে

হারায়। মনু-দেও একসঙ্গে

তৃপ্তিতে যায়। কুঁড়েঘর বাঁধবে

এই রূপকথা হবে সত্য ,ভাবে

আনন্দিত মনে, এমনসময় ধলাই 

আসে দলবল নিয়ে। সর্দারের 

আদেশ সে না পারল করতে 

পালন। দেও সঙ্গে মনু বিবাহ 

দেখে ছাম্বুলবাসীগণ। রাগে 

কাঁদে সর্দার, দেয় অভিশাপ

সব তোরা নদী হবি,মানবশরীর

গলে হইবি পলির মতন,নদী

হয়ে বয়ে যাবি তোরা চারজন।


 শাপে বর হলো ,তাই আজ

 আমরা পেয়েছি চার নদী, 

একদিকে বয়ে  যায় লঙ্গাই। 

কৃষিহেতু খ্যাত,লঙ্গাইয়ের 

বেগুন ব্যঞ্জন,রসিক জনে জানে । 

আরো জনপদ হলো ধীরে

ধলাই আর দেও নদীর তীরে।

সর্বোপরি মনু এক মায়াবিনী 

জলের আরক। নদী জীবন,  

নদী প্রাণ, নদী সর্বংসহা ।

নদীতীরে গ্রামে গ্রামে বিনিদ্র 

শস্যের ঘরে লক্ষ্মী সর্বক্ষণ। 


শাখান পর্বতে অরণ্যে বাস করে

আমাদের বিরহী যক্ষ একা ।

মেঘের সঙ্গে বলে দুঃখকথা

ইথারে ইথারে, বহুদূরে সাগরে 

গভীর নিম্নচাপ হয়, বৃষ্টি হয়ে ঝরে ,

 মনুর বক্ষ ভরে ওঠে জলভারে

পাথরের গায়ে গায়ে উঠে তার ধ্বনি

পার ভেঙে নিয়ে যায় মানুষের ঘর

উন্মাদিনী সম ছোটে বর্ষার দিনে

শাখাং হতে বয়ে চলে উত্তরের দিকে

কৈলাসহরকে রেখে এক ধারে

মাতাল জলঢেউ নিয়ে চলে

বাংলাদেশের দিকে, কুশিয়ারা 

ছুঁয়ে সুরমানদীর হাত ধরে সে 

মেঘনাতে যায়, মনুর জলে তাই

মাছের আগমন হয়। বোয়াল ,

শোল, আড় আর বাঁশপাতা মাছ

ঝালে ঝোলে কৈলাসহরের পাতে

বারোমাস । বন্যার দুঃখ ভোলাতে

বিলাসপুরের হাওরে শীতকালে

ঝলমল করে সব্জির খেত, নবান্নের গান।

মনু সঙ্গে দেও নদীর দেখা হয় কুমারঘাটে

দুজনে মিলে প্রবাহিত হয় কৈলাসহরে।

আরো এক শহর,  নাম ফটিকরায়,

মনুর অববাহিকায়। এককালে

পাট,  তিল,  কার্পাস আদি বহু 

দ্রব্য হতো পরিবহন, নদী ছিল

নাব্য আর বিস্তৃত নিম্নাঞ্চল ,

মনুনদীর পারে আছে এক বাজার,

পানিচৌকি নাম তার, বহু পুরাতন।

অতীতকালে সেথা চৌকি বসিত।

কৃষকগণ লয়ে পণ্য বণিকে দিত ,

রাজস্ব উঠিত কোষাগারে , অর্থ

নিয়ে রাজকর্মচারী প্রফুল্ল চিত্তে

চলে যেত হাতির পিঠে চড়ি ।

বেলকম টিলার পেছনে সূর্য

ডোবার পালা, রঘুনন্দন পাহাড়

দিত হাতছানি,উনকোটির আরো

এক নাম রঘুনন্দন, বিস্মৃত এখন ।

নদীর বুকে হাজার কথা, ফাগুন

মাসে লয়ে চলে কইন্যার ক্রন্দন।

দুইধারে ধামাইল গান আর রাত্রি

জাগরণ। চায়ের বাগানে ধ্বনি

দেয় কুলির সর্দার, ঝুমুর গান

যেন মনুর পায়ে পরায় রুপার 

অলঙ্কার , একটি কুঁড়ি দুইটি পাতা

 দোলে বাতাসে ,উর্বরা মাটি 

মা গো  তোমার , রত্নসমা পলি।   



মনুর এক তীরে আমাদের শ্মশান

জেগে থাকে রাত্রিদিন, আগুনকাঠের

ঘর আর শ্মশানকালীর নিবাস

ধোঁয়া উঠলে যেন সে সাগরকে ডাকে

মনুনদীর জলে মিশে অনন্ততে যায়

এ জীবন নশ্বর মনে করাতে মনু

বয়ে যায়, মনুর মাটি লয়ে কারিগর

উৎসবের মূর্তি গড়ে । এইভাবে

মনুনদীর তীরে শঙ্খ বাজে সন্ধ্যায়।

বধূগণ আঁচল পেতে আশীর্বাণী চায় ।


রামকৃষ্ণ আশ্রমে ভোরের আহির ভৈরব 

আর প্রার্থনার গান নদী শোনে রোজ ,

 ত্যাগ আর জীবনের সুরে,বালক সাধুর

 মায়ায় নদীর গর্ভে একটি দিন শেষে

 রাতের জন্ম হয় । কপোলে চন্দন 

আর শিশিরের মায়া,ঘামে মুছে যায় ।


মনুনদীর আখ্যান খুব বেশি দীর্ঘ নয়

ধৈর্য ধরে পড়তে হবে, কৈলাসহরবাসী কয়। 











লেখক পরিচিতি


চিরশ্রী দেবনাথের জন্ম ত্রিপুরার কৈলাসহরে , ১৯৭৯ এর ১২ ফেব্রুয়ারী।  বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার, মা মায়ারানি মজুমদার।  গণিতে স্নাতকোত্তর এবং শিক্ষিকা।ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির শুরু বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।  প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ নয়টি,  তিনটি উপন্যাস, একটি কিশোর উপন্যাস,  দুটো ছোট গল্প সংকলন, একটি অণুগল্প সংকলন, কবিতা সংক্রান্ত যৌথ বই একটি । ‘ কীর্ণকাল ‘ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন যৌথভাবে আটবছর ধরে প্রকাশ করে চলেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন

 কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না। 








বিশ্বাসের কাছে নতজানু, চিরশ্রী দেবনাথ

বইের নাম 


বিশ্বাসের কাছে নতজানু


ভূমিকা




সময়টি  মাংসকালের। নির্মোহ মাংসাশী গ্রাম ও শহর।  অপরাহ্নের নিমন্ত্রনে ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে রাত, দিন, ধর্ম, ধ্বজা, পতাকা ও যোনি। অন্ধদের থালা বাটি গ্লাস ভরে উঠছে ভরপেট নৈবেদ্যে। যেদিন হেমন্তসময় প্রবাহিত হবে, মাঠের পাশে বসে থাকব আমরা  সার বেঁধে,   ... মাংসের কথা, পেটভরার কথা, শরীরসুখের কথা বলতে এতো অক্ষর লাগাও কেনো হে, 

কসাইের কাছে রক্ত জলের মতো, কৃষকের কাছে কাদা তো  মুঠ মুঠ পরমান্ন, আমাদের এই বোকা এবং অশ্লীল চেয়ে থাকা  পৃথিবীর আঁচে নিজস্ব  দহন জ্বালাবার  জন্য ...




 


চিরশ্রী দেবনাথ 




প্রিয় দোয়েল পাখি 


 বার বার পাসওয়ার্ড ভুলে যাই সবকিছুর

 কত জায়গায় লিখে লিখে রাখি তাদের, 

তারপর লিখে রাখা জায়গা গুলোও হারিয়ে যায়

গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিজ্ঞেস করলে, 

দোয়েল পাখির নাম মনে করার চেষ্টা করি, 

কালই দেখেছি পাখিটিকে, দিনের শেষে কথা হয়েছিল

তাদের বাসাও আজ নিলামে উঠেছে, 

কিচির মিচির আর উড়ান নিয়ে চলে যেতে চাইছে আশ্বিনের গ্রহ



যৌনতা নয়   

কোথাও খুব চিৎকার, যুক্তি তর্ক হলে

আমি সরে আসি, খুব বোগাস কোন সিনেমা দেখি

দেখি নায়িকার ব্লাউজ খুলছে নায়ক

কাছেই হয়তো ছিল ক্যামেরা  ম্যান 

মোট কতজন লোক দেখছিল সেই ব্লাউজ খোলার দৃশ্য,  আসলে আমি সহ তা পেরিয়ে গেছে হয়তো কয়েক লক্ষ    

এনামেলের হাঁড়িতে ভাত ফুটছে, 

কোথাও এভাবেই খুলে যাচ্ছে রাতপোশাক বুদ্ধের ভঙ্গিতে, 

তুমি যা ভাবছো, তা কিন্তু  নয়, 

হয়তো সব মিলিয়ে পৃথিবীতে এখন গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হয়েছে

ছেলেরা বাড়ি ফিরতে ফিরতে কিশোরীদের ঢেকে দিচ্ছে হৃদয় উপচানো রোদে

এতো স্বাভাবিক সবকিছু, যেন কোথাও কোন জন্ম নেই, শুধু বেঁচে থাকছে পুরনো মানুষেরা




কৃষিজমিন 


যে তরুণীর গোড়ালি খুব লাল আর মসৃণ, তার সঙ্গেই  বিয়ে হবে রাজার, 

প্রচারিত হয়েছিল রাজপথে ও গ্রামে গ্রামে। 

পিতা নিজের রক্ত দিয়ে মুছে দিয়েছিলেন মেয়ের গোড়ালি, 

মুখ ঢাকা মেয়েরা বসেছিল সারি সারি... গোড়ালি দেখিয়ে ।     

রাজা এলেন।  ধুলোমাখা, ঘাস লেগে থাকা এক মেয়েকে নিলেন ঘোড়ার পিঠে তুলে,

 সবাই সোজা উঠে দাঁড়ালো, মানে গোলাপি গোড়ালির  মেয়েরা !  

কি হলো এটা? 

রাজা কৃষকের মেয়েকে নিলেন ঘোড়ার পিঠে ! ছিঃ ছিঃ! 

 যদিও গল্প, তাও রূপকথার। 

তবু মনে হয়, আমাদের ছেলেরাও একদিন তুলে নিয়ে যাবে সব ফাটা গোড়ালির মেয়েদের,

আচ্ছন্ন শীতে সেই মেয়েরা বিবাহ তুলে দেবে ছেলেদের হাতে। 




ব্ল্যাকবোর্ড 


অবশেষে বর্ম খুলে ফেলেছিলাম

একেই বলে আকুল হওয়া, হয়তো ভরা কদম, চূর্ণ হওয়া, 

ফিরে আসতে গিয়ে দেখি... পারি না

শীতের রোদ সারসের মতো পা ফেলে ফেলে খুৃঁজে নিচ্ছে সন্ধিস্থল, 

বরফ পড়েছে সর্বত্র। হলুদ ঘাসেরা নিচে, উটের মতো বোরিং চাহনি বিকেলের। 

ছাত্রদের মুখগুলো দেখি।

একদিন বললাম, শোনো এই হলো " বিশ্বায়ন  "। 

"জেনে কী লাভ অর্থনীতি ! আমরা তো ব্যবসা করবো ম্যাডাম ",

কিছু ট্যাক্স ফাঁকি, কিছু জবানবন্দি মিথ্যা, ওতে কিছু হয় না।  

ওতে কিছু হয় না ! বলো কি? 

হঠাৎ কেউ চলে গেলে সত্যিই কি কিছু হয় না !  

 লেখা হচ্ছিল না, তিনদিন।

ভাবলাম তবে শেষ, মনে হলো আমার পাশে ব্রহ্মপুত্র নদ। সন্ন্যাসীর পোশাক, নির্বিকার।

দূর থেকে দেখেছিলাম কোনোদিন নীলাচল, ঠান্ডার ঝাপট।

শিরশির করছিল দাঁত, নখ, সাদা কার্ডিগান।

 বাইরে ছেয়ে আছে কাশ্মীরি শালের মতো ওম দেওয়া আড্ডা,

তারা কি নেবে আমাকে?  দু এক দানা আগুন জ্বলতে শুরু করেছে, 

আমি কি যাবো আসলে?

আসলে কি আমি যেতে চাই?

আমি কি কোন আড্ডার কথা তোমাকে ছাড়া ভাবতে পেরেছি?

তুমি কখনো ছিলে আমার সেসব ব্যক্তিগত, বোকা আড্ডায়? 

যেখানে মেধা পুড়েনি, ক্লাসিক্যালের সুর আসেনি? 

দৈনিক সংবাদ অযথা বকবক করে গেছে, 

রেগার টাকা, শীতের কম্বল, ধর্ষণ,  বি পি এল কার্ড, পেঁয়াজের দাম ইত্যাদি, ইত্যাদি।

টিভিতে ধীরে ধীরে পনেরহাজার কৃষকের মৃত্যু, কী অসাধারণ বিশ্লেষণ।

শুনেছি।

শুনিনি। 

আসলে কারো সঙ্গেই আমি কখনো ছিলাম না। 

একা একা।  অবাধ্য।  হিম জমা করাই আমার কাজ, উষ্ণতার দিনগুলোতেও কখনো বা সবসময়।  




একান্তে


একজন কবি ২০১৯ এর

ফেসবুকে নেই, একা গাছ... হেমন্তের

সমস্ত পাতা জড়ো করে রেখেছে বুকে

ঝরতে দেবে না, দেবে না কোনদিন

ঝরে গেলে, পুড়ে যায়

এভাবে নিজেকে কত পোড়াবে গাছ?

সে কিছু রাখেনি নিজের জন্য 

বই , মাইক , মঞ্চ , এমন কী  হাহাকার 

শুধু পাতা আঁকড়ে শীত সহ্য করে, 

নিঝুম রাতে জ্যোৎস্নার আরতি তাকে তান্ত্রিক করেছে ...



গজল    


কেউ অন্যকিছু লিখে দিতে বললে

আমি শুধু বলি, প্লিজ কবিতা ছাড়া কিছু লিখছি না,    

দেখাও কোথায় কবিতা


চোখ বন্ধ করি, মিথ্যে কল্পনা করছিলাম , সবল পংক্তিগুচ্ছ নেই

ধুলো মাটি আলতো মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছি  


ভালোবাসায় ছিলাম বলে কিছু লেখা হয়নি, লেখা যায়নি


সময় লাগবে, অনেক সময়, এই বিজন স্রোত বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে একা, কেন যে জানি না 




নীল স্পর্শক 


আমার  সমস্ত না পাওয়া, তিন চারটে ফোঁস ফোঁস, 

হরতাল, একা রাস্তা, ছেড়ে যাওয়া হাত

চিলের মতো গর্বিত ডানা তাদের

আগলে রাখে সবসময় ধূসরতার নিচে

মনে হয় পালাচ্ছো, মনে হয় ভুলে গেছো

আসলে শীতকাল আমার সব যাওয়া আসার ডাইরি,

লিখতে লিখতে নিজে থেকেই মুছে যায় লাইনগুলো

যদি দেখে ফেলে জলন্ত দেশ, প্রতিবাদী জনতা, অথবা স্বার্থপর আমাকে। 



হলুদ রঙের ঝুমঝুমি 


নতুন কিছু,লেখা হয়নি অনেকদিন

মনে হয় হয়তো পাড়া থেকে হারিয়ে গেছে সমস্ত কিশোর আর তাই আমিও হারিয়ে ফেলেছি রাধাভাব

সীমান্ত থেকে শহিদ হওয়ার খবর আসে ...ভালোবাসার দিনে

কিন্তু যে সংবাদ কোথাও পড়া হয়নি, তা হলো 

বসন্তে জন্ম নেওয়া সেদিনের সমস্ত পাখির দল বোবা ও জন্মান্ধ 

তাই খুব তাড়াতাড়ি  গ্রীষ্মকালীন নিস্তব্ধতা সমাগত,

 এই পলাশ, শিমুলের দিনে, ক্ষীণ মাঘিপূর্নিমায় 

 কয়েকটি বিষাদময় পর্বতশিখর,  বৃক্ষরাজি এখনও  মাথা নত করে আছে  

কিন্তু এতো মৃত্যু আর প্রতিবন্ধী সংবাদের  পরও

আমি রাতের বেলা মাংস কষিয়েছিলাম

পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা ছেঁচা গন্ধ, মাংসের গা থেকে চুঁইয়ে পড়া সর্ষে তেলে গমগম করছিল ভেতর

হৃদয়েও জব্বর  গোলাগুলি হয়, আর ডি এক্স বি়স্ফোরণ যখন তখন

এইসব শব্দ শুনতে পায় আমার প্রয়াত মা বাবা 

মৃত্যুর পর তাঁরা নিষ্ঠুর হয়ে গেছে, আদর করে না

অথচ আমি রোজদিন কিশোরী হয়ে যাচ্ছি একটু একটু করে

মনে হয়, আমার বয়ঃসন্ধিতে দাঁড়াবে এখন নতুন কেউ 

তার মুখে বিকেল ঘনিয়ে আসা জঙ্গলের নির্জন ছায়া  

মনে হয়, আমি  সেই পৃথিবীতে শ্বাস নিচ্ছি, যেখানে কোনোদিন যুদ্ধ হয়নি 

তারপর  আরো ছোট হবো, আমার হাতে ঝুমঝুমি ধরিয়ে দেবে কেউ,  রাজারাণীর গল্প শুনতে চাইবো

তখন সবাই বুঝে যাবে, যাক একে নিয়ে আর ভয় নেই ! 




বিশ্বাসের কাছে নতজানু


এখন রাত নেমে আসছে খুব সাধারণভাবে 

ঠিক যেমন ঈদের রাতে মুসলমানের বারান্দায় বেড়াতে আসে চাঁদ

ঠিক যেমন আমি হালকা করে বললাম

 'এসো '

অথচ কাকে বললাম আসতে জানি না ঠিক

সে হতে পারে  'চাঙ্গা অর্থনীতি ' কিংবা 'জাতীয় সংহতি'


আজকাল আমি প্রায়ই চুপচাপ করজোড়ে বলতে থাকি


"এসো এসো এসো "


বিশ্বাস করি তখন কিছু আসে, 


সে হতে পারে মরুভূমি অরণ্য হয়ে যাওয়ার খবর অথবা ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠা দুজন মানুষ ...




বৈভব


সত্যি বলো তো কি চেয়েছিলে ,

ডানা গুটিয়ে এনে অস্থায়ী কোন আশ্রয়? 

চুম্বন? 

ভালোবাসা?

একসঙ্গে কিছু কাল কথা বিনিময়?

আসলে কি সে সুখ?

জানো না !

আমি জানতাম।

আমি জানি মফস্বল শহরে কোথাও প্রবল স্নেহে শেষবিকেলে রান্না হয়,

 তখন একমুঠো সুখ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সে বাড়িতে ঢুকে পড়ে  ...












কৃষ্ণা


সব তোলপাড় হয়ে গেলে, 

 মানুষ কী করে নিজেকে গুছিয়ে নেয় আবার? 

জানা আছে তো নিশ্চয়ই কোন বিধ্বস্ত মানুষের?


তার কাছে যেতে চাই

হয়তো লোকটির মাথার চুলগুলো ধূপগাছের মতো জ্বলছে গ্রীষ্মের দুপুরে, 

ওর চোখ জ্বালা করা, বুকে মোচর দেওয়া, গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠা শক্ত ডেলা

সবকিছুই কি সে আমার মতো গিলে ফেলে

তার ছোট্ট মেয়ে কী তাকেও জিজ্ঞেস করে, 

তোমাকে কোনদিন কাঁদতে দেখিনি কেন?

আকাশে অনেক মেঘ, ছাতা নিয়ে যাও, 

বলতে বলতে আমি সবকিছুর  অনুবাদ করি

রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই শেখা এসব ফাঁকিবাজি। 



বড়দিন  


ধানসিড়ি নদীটি, সে জীবনানন্দের নয়, নাগাকন্যা, 

 পাহাড়ি বাঁক, লাইসাং থেকে চোখ  মেরেছে  ব্রহ্মপুত্রের  দিকে

দুপাশে  তরুণী হাত, অভয়া অরণ্য জাপটে আছে,  

তুমুল ক্যাটলিয়ার সমারোহ, 

রঙে রঙে খুন হয়ে গেছে ধানসিড়ির জল, ঘোলা জলে ডুবে গেছে ফুলের ছায়া

নদীপ্রবাহের পাশে কাঠ চেরাইের মিল, জলে গাছের শব    

পঁচিশে ডিসেম্বরের সপ্তাহে তিনটে স্টার সারারাত ধরে জ্বলতে থাকে  

শুয়োরের মাংস, কোয়াস সেদ্ধ, নাগা মরিচের ঝালে

বনের জিহ্বায়  স্বাদ ফিরে আসুক, বীজমন্ত, উর্বরা বৃক্ষমেয়ে...

প্রসব ক্ষমতা অনন্ত হোক তাদের, 

যীশুর কাছে বহতা নদীর আর কিছু চাওয়ার নেই, শুধু এই, এইমাত্র ...




( ধানসিড়ি, ভারতের নাগাল্যান্ডের একটি নদী, লাইসাং তার উৎপত্তিস্থল, ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে)  






বীতশোক


উদ্বৃত্ত তো হয়েছি কবেই

তাই চারপাশ থেকে অহংকার কুড়িয়ে এনে বালির পাহাড় বানিয়ে রাখি

সম্মান কমে গেলে যেমন ডেকে ডেকে উত্তরীয় দেখাই


কিন্তু ভালোবাসা সরে গেলে 

মানুষ শিল্পী হতে পারে অনায়াসে 


চলে যেও তুমি তাই নির্বিকারে,

 পাঁচটা বাজতে আর কত বাকি?



ভেন্টিলেটার দিয়ে ঢুকে পড়ছে একান্ত চোরাআলোগলি ! 


ধুলো ঝারার সময় কই,  ম্যাগাজিন থেকে পুরনো কবিদের কবিতা পড়ি 

আশ্চর্য দেখি তারা চেনা যুবকের মতোই, স্পর্ধা আছে, কাম, ক্রোধ সবই 

গভীর  হতাশার কথা রবিবার সকালে  লিখতে লিখতে, 

তারাও লিখেছেন বীতশ্রদ্ধ পৃথিবীবাসের লঘু দুঃখ, বিষাদ ইত্যাদি ইত্যাদি।




বেহালাবাদক 

...................

তাহলে মাঝখান থেকে শুরু করি

রোজা ভেঙে গেলে যেমন বরবাদ মনে হয় দিন 

ধর্মগ্রন্থ পড়া হয় না, অনেকেরই আজকাল

শুধু তার গন্ধটুকু নেয়, কখনো ধূপ, কখনো আতর

ছায়ায় ছায়ায় মারাত্মক যুদ্ধ

হিন্দুস্থান জিতে যাচ্ছে, আসমুদ্র হিমাচল গর্জমান...নতজানু

কী করে যেন বহতা নদী দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে বানানো গল্প,

অন্ধত্বের অক্ষর সুনির্বাচিত। 

 বসন্ত মরসুমে, 

কবিতায় প্রতিবাদ হারিয়ে গেলে, জেগে ওঠো শ্লোগান

শ্লোগান হারিয়ে গেলে, আগুনের কাছে জখম নাও 

তারপর বাকি থাকে চিৎকার, রুচিহীন চিৎকার ...

তবে কি তাই হবে আগুনওয়ালা, বাঁশীওয়ালা ?

... ও বেহালাবাদক বলো না? 











 



লেখক পরিচিতি


.... চিরশ্রী দেবনাথের, জন্ম1979 এর 12 ফেব্রুয়ারি উত্তরপূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার।  দুজনেই প্রয়াত।  তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করেন। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি।  বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন। পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প প্রথম পুরস্কার, স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার, ত্রিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ  প্রতিযোগিতায় প্রথম  পুরস্কার। তার লেখা  অনুগল্প, "আনন্দবাজার স্কুলে "তে প্রকাশিত হয়েছে। এখনো কোন গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়নি। ছয়টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। যথাক্রমে, "জলবিকেলে মেঘের ছায়া ", "ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় ", "প্রেমে সন্ত্রাসে ",  "শুভ দ্বিপ্রহর ", "ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স "    "উড়িয়ে দিও "। একটি গল্প সংকলন, "মায়ারাণী "।

২০১৯ এ, সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মান পেয়েছেন। 

 'কীর্ণকাল' নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন চার বছর ধরে। 

কবিতা ভালবাসেন তাই লিখে যেতে চান। কবিতায় নিজের কথা, মেয়েদের কথা বলতে ভালবাসেন।
















কীর্ণকাল ---সহিতসৃষ্টির প্রবহমানতা



‘কীর্ণকাল’ –সহিতসৃষ্টির প্রবহমানতা 


চিরশ্রী দেবনাথ


পৃথিবী এখন কবিতার জন্য থমকে আছে। এসময় কবিতার। স্বাগত এই ক্রান্তিকাল, স্বাগত  কবিতা বসন্ত,আজ যে কবি আর লিখবেন না বলে শূন্যচোখে তাকিয়ে আছেন, তার সামনে দুরন্ত সময় প্রেমিকার মতো বসে আছে। বাহুডোরে বাঁধো তাকে, বিলীন হয়ে যাক সকল অপারগতা।  কবিতা কখনও স্লোগান, কখনও সোজাসাপটা বিবৃতি, কেউ বলবেন কবিতা কেন চিৎকার হবে , সে তো ছায়াচ্ছন্ন আত্মপরিক্রমা যা একসময় মহাকালের সঙ্গে লীন হয়ে যায়, আবার

কখনও মনে হয়, পৃথিবীর সকল দেশের কবি যেন একটি কবিতাকেই দীর্ঘ করছেন, তবে কি  ফুরিয়েছে কবিতাবোধ, তখনই হৃদয়ের আর্তি বলে দেয় থামলে চলবে না, খারাপ হোক, ভালো হোক রুদ্ধ সময়ের বাহক হতে, ঘাতক হতে কবিতার কাছেই নতজানু হতে হবে বার বার। " কীর্ণকাল " এই কবিতাবসন্তের একটি সবুজপত্র, সূর্যাক্ষরে লেখা তার প্রতিটি নিঃশ্বাস। 


এরকমই একটি ইচ্ছে নিয়ে  আমরা চার বন্ধু 

 মৌলিক মজুমদার, রাহুল সিনহা, চিত্তরঞ্জন দেবনাথ এবং আমি  একটি 

সাহিত্যপত্রিকা  কীর্ণকাল প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেই ।  

চিত্তরঞ্জন দেবনাথ পত্রিকাটির সহ সম্পাদক।

মৌলিক মজুমদার এবং রাহুল সিনহা মুখ্য উপদেষ্টা। আমি সম্পাদকের দায়িত্বে। লেখা চারজনে মিলেই সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। কারো সময় কম থাকলে সে করে না।

পত্রিকাটির ব্যয়ভার আমরা চারজন মিলে সমানভাবে শেয়ার করি। একটি সংখ্যা ছাড়া প্রতিটি সংখ্যাই মুদ্রিত হয়েছে ধর্মনগরের জয়শ্রী অফসেটে। হরিহরদা শুধু এই প্রিন্টিং প্রেসটির মালিকই নন তিনি লিটল ম্যাগাজিনের একজন একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। যতদূর পারা যায় কম টাকায় তিনি লিটল ম্যাগাজিন ছাপানোয় সাহায্য করেন।

এই বিষয়ে একটি ছোট্ট মজার কথা রয়েছে,  আমিও অপটু অনভিজ্ঞ সম্পাদিকা, প্রুফ রিডিং এর পরও প্রচুর ভুল থেকে যায়।  প্রথমবার পত্রিকা ছাপা হবার পর দেখা গেলো কোন মূল্যই ধার্য করা হয়নি পত্রিকাটির। তারপর কিছু কপিতে মূল্য কুড়িটাকা হাতে লিখে দেওয়া হলো। একমাত্র প্রথম সংখ্যাটিরই হার্ড কভার করা হয়। বাকি সংখ্যাগুলো আর হার্ড কভার হয়নি।

কীর্ণকালের একটি সংখ্যার প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন কবি ও চিত্রশিল্পী বাপ্পা চক্রবর্তী।

যাইহোক, কীর্ণকালের হোয়াটস এপ গ্রুপে আমাদের চারজনের অনেক তর্ক বিতর্কের পর অবশেষে, পনের ফেব্রুয়ারি, দুইহাজার সতেরো, সন্ধ্যা ছয়টায়, আগরতলা বইমেলায়, লিটিল ম্যাগাজিন স্টলে, "কীর্ণকাল "প্রথম বর্ষ, প্রথমসংখ্যার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হয় । 

সেদিন সেখানে ত্রিপুরার অনেক লেখকলেখিকাই উপস্থিত থেকে ছোট্ট এই পত্রিকাটির জন্মসময়কে গৌরবান্বিত করে তুলেছিলেন। 

পরবর্তীতে সহ সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দেবনাথের অনুরোধে কীর্ণকালের জন্য একটি লোগো ও নামলিপি  তৈরি করে দেন চিত্রশিল্পী কৃষ্ণধন আচার্য। পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত একেবারেই পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। হঠাৎ এক দুপুরবেলা প্রথমে আমাদের তিনজনের  কনফারেন্স কলে ঠিক হয় পত্রিকা বের হবে।

সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হলো কীর্ণকাল হোয়াটস এপ্ গ্রুপ। চিত্তরঞ্জন সবার ছোট কিন্তু খুব ভালো কবি এবং লেখালেখি বিষয়ে সিরিয়াস, তাকে আমন্ত্রণ করে আমাদের গ্রুপে এড করি,  যে হোয়াটস এপ গ্রুপটি এখনো  আমাদের একে অন্যের লেখা পড়াবার এবং দেশ ,জাতি, সমাজ বিষয়ে নানা মতামত দেবার একটি ভার্চুয়েল খোলা জানলা,  আড্ডার সামান্য প্রাণখোলা বাতাস যা পত্রিকাটি প্রকাশ করার দু তিনমাস আগে থেকে উজ্জীবিত হয় তারপর আবার শীতঘুমে চলে যায়। 

নামকরণ নিয়ে বিস্তর ঝামেলা হলো । যে নামই ঠিক করা হয় দেখা যায় কোন না কোন লিটল ম্যাগের সেই নাম আছে। 

 আমরা প্রথম সম্পাদকীয়তে  লিখি ,

 "কীর্ণকাল " একটি সময়কে তুলে ধরার সাময়িক চেষ্টা। কবিতা একটি অহংকারী অভিমান। সেই অভিমানকে বুকে লালন করে যারা, তারা কীর্ণকালের পথিক। আমরা আমাদের চলার পথে কুড়িয়ে নিতে চাই তাদের কলমের মণিমুক্তোকে। বাংলা কবিতা, সব সময় আধুনিক, নানাভাবে হয়তো বা অজান্তেই হয়ে ওঠে বর্তমান সময়ের মুখ, তাকে গাঢ়ভাবে ছুঁয়ে থাকে অতীত, আর সামনে থাকে একটি উজ্জ্বল বর্তমান। "কীর্ণকাল "এভাবেই যাতে সময়ের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারে, এই  চেষ্টা রইলো। শ্রদ্ধেয় কবি নকুল রায়, আমাদের লিটিল ম্যাগাজিনটির নামকরণ করেছেন।  

কীর্ণকাল পত্রিকাটির ট্যাগ লাইন –”সহিতসৃষ্টির প্রবহমানতা “ এটিও কবি নকুল রায়েরই দেওয়া। 


অভিজ্ঞতায় আস্তে আস্তে সমৃদ্ধ হোক "কীর্ণকাল "। সমস্ত লেখক এবং লেখিকাকে আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ, যারা লিটিল ম্যাগাজিনটির  ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত জেনেও, তাদের মূল্যবান লেখাটি প্রথম সংখ্যার জন্য দিয়েছেন। প্রচ্ছদটি করেছেন শিল্পী মিতালী দেবনাথ। 

প্রথম সংখ্যায় অনেক ত্রুটি রয়ে  গেলো। আগামী সংখ্যায় আশা করবো " কীর্ণকাল " আরো সমৃদ্ধ হবে। একটি ক্ষেত্রে, আমরা এবার ভীষণভাবে আঞ্চলিক রয়ে গেলাম, কারণ, কবি প্রবুদ্ধসুন্দর কর কৃত অনুবাদ কবিতাটি ছাড়া,  প্রথম সংখ্যায় শুধুমাত্র ত্রিপুরার লেখক লেখিকাদের লেখাই থাকছে, পরবর্তীতে "কীর্ণকাল " আপন গতিতে বিস্তৃত হবে।”

তাই বছরে একটি সংখ্যাই প্রকাশিত হবে এরকমই সিদ্ধান্ত নেই ।

তারপর থেকে আটবছরে আটটি সংখ্যা প্রকাশ করে কীর্ণকাল। পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে আমি কাজ করলেও এটা একা আমার পত্রিকা নয়। আমরা চারজনই প্রায় এক বয়সী । মৌলিক মজুমদার আর আমি কৈলাসহরের ,  স্কুল সময়ের বন্ধু । রাহুল সিনহাও আমাদের দুজনের ইয়ারমেট এবং পরবর্কীতে বিবাহসূত্রে সে আমার পারিবারিক ঘনিষ্ঠ জন।  চিত্তরঞ্জন আমাদের চেয়ে দু তিনবছরের ছোট হলেও সমসাময়িক কবিতা লিখিয়ে বলে বন্ধুস্থানীয় ।

আটবছরে আটটি সংখ্যার মধ্যে একটি সংখ্যা কীর্ণকাল প্রকাশ করেছে শুধুমাত্র ত্রিপুরার অনুর্দ্ধ চল্লিশ কবিদের কবিতা নিয়ে।

কবিতার কাগজ হলেও কীর্ণকালের অষ্টম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে ত্রিপুরার গল্পকারদের ছোট গল্প নিয়ে। আমরা প্রথম থেকেই ভীষণভাবে আঞ্চলিক হতে চেয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল শুধুমাত্র ত্রিপুরার লেখকদের লেখা   নিয়েই কীর্ণকাল  প্রকাশিত হবে। তবে নিয়ম যেহেতু নিয়ম ভাঙার জন্যই তৈরি হয়,আমরাও আসাম , পশ্চিমবঙ্গ,  বাংলাদেশ বিভিন্ন জায়গার লেখা নিয়েছি। তবে ধীরে ধীরে দেখলাম খ্যাতিমান কবিদের কাছে যখন নেহাতই শীর্ণ এবং অখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন লেখা চাইত তখন তিনি হয় পূর্বপ্রকাশিত না হয় ওনার লেখা খুব সাধারণ মানের কবিতাটি হয়তো দিতেন। তাই সম্পাদক হিসেবে আমার তখন মনে হতে লাগল আমি বড় লেখকদের লেখা নেব না এবং চেষ্টা করব শুধুমাত্র ত্রিপুরার লেখা নিতে। 

কবিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি অত্যন্ত খুঁতখুঁতে হয়ে উঠতে লাগলাম ।ধীরে ধীরে মনে হতে লাগল এইসব কবিতা প্রকাশ করে কি হবে। কী- ই বা আছে কবিতাগুলোতে।

একজন কবিকে লেখার আমন্ত্রণ পাঠিয়ে কবিতা সংগ্রহ করার পর সেই লেখা পছন্দ হচ্ছে না বলে বার বার লেখা পাল্টে দিতে বলাটা অসম্মানজনক। তারপর তো আর লেখাই পাওয়া যাবে না।

এইরকম পরিস্থিতিতে আমরা চার বন্ধুই এখন মধ্যবয়সে ।এই বয়সে সন্তানদের উঁচু ক্লাসে ওঠাজনিত ব্যস্ততা , বৃদ্ধ মা বাবা ,শ্বশুরশাশুড়ির অসুস্থতা ও মৃত্যু  সব মিলিয়ে 

আমরা পত্রিকাটি দু বছর ধরে বের করতে পারছি না।

তাছাড়াও আমার বড় ভয় , কবিতা চাইব কবির কাছে। তারপর সেই কবিতা পছন্দ হলো না তখন কি করব। এখন নানা দোলাচালে আছি। তবে কীর্ণকাল নিশ্চয়ই আবার প্রকাশিত হবে । ভালো লেখার সন্ধানে কীর্ণকাল ত্রিপুরার প্রকৃত কবিতার মুখ হয়ে উঠতে চায়। তাই ঘন ঘন সংখ্যা নয়,খুব কম সংখ্যাই হোক, কিন্তু তাতে যেন কবিতা থাকে। লিটল ম্যাগাজিনের অহংকারটুকুই তার অস্তিত্বের কারিগর। এতোটুকু আত্মমর্যাদা তো রাখতেই হয়। আমরা আজপর্যন্ত একটিও লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে পারিনি নিজেদের পারিবারিক নানা অসুবিধেয় এবং অনীহা ও  আলস্যের কারণে। তবুও সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনেই আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়,  এজন্য আয়োজক কমিটিদের প্রতি  অসীম  কৃতজ্ঞতা । 


কীর্ণকালের ষষ্ঠ সংখ্যাটি নিয়ে কয়েকটি কথা বলি ।এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ত্রিপুরার চল্লিশ বছর বয়সের নিচের কবিদের কবিতা নিয়ে।  সংখ্যাটির প্রচ্ছদ করে দেন ত্রিপুরার উজ্জ্বলতম তরুণী কবি আম্রপালী দে। তীক্ষ্ণ কবিতা লেখার পাশাপাশি কবি আম্রপালী দে একজন দক্ষ প্রচ্ছদশিল্পী, যার আঁকায় প্রচ্ছদ হয়ে ওঠে বাঙ্ময় । 

এই সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, 

“কবিতা লেখা খুব কঠিন। আবার খুব ঘেমে নেয়ে লেখার জিনিসও নয় বটে। তবে অনেকেই খুব সহজে কবি হওয়ার জন্য আসেন, তারপরেই দেখা যায় আত্মপ্রবঞ্চনার গোলকধাঁধা। কবি কখনো হওয়া যায় না, কবিতা লেখার প্রত্যাশাকে জিইয়ে রেখে যিনি বেঁচে থাকেন তিনিই কবি। একজন তরুণ যখন হাতে তুলে নেন কবিতার পাণ্ডুলিপি, তিনি অবধারিত ভুল সুরে বাজাবেন, সবাই যে পথ চিনে ফেলেছে, পথের ধারে ধারে প্রতিটি সরাইখানা, জঙ্গল, গণিকালয়, পানশালা সবকিছুর নাম যে পথে বিস্তৃত হয়ে বিস্মৃত হয়ে আছে রাতের অন্ধকারে, তরুণ কবিকে প্রথমেই সেই পথের বাইরে অন্য একটি নির্জন পথ খুঁজে নিতে হবে।

কবিতার মতো নান্দনিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আমি ভাবব, তাই আমাকে হতে হবে সুস্থ, শুদ্ধ, আমার মধ্যে পাগলামো থাকলেও আমার লেখা যেন পাগলামো না হয়, শেষপর্যন্ত অস্থির সংলাপ শুধু ব্যর্থ চিৎকার করেই নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলে।  কোন কথাস্বরের কথা বলছি, সময়কে চিহ্নিত করার স্বর?

কবিতার প্রতিটি লাইনই কোন না কোন সময়কে চিহ্নিত করে, কবিকে বোধহয় খুব সচেতন হয়ে সময়ের চিহ্নক না হলেও হয়, যে দুর্বিষহ বিষ, দুঃসহ অনুভূতি মিলে আছে জীবনযাপনে, তাকে আলাদা করে তুলে আনতে হলে বড় মেকি হয়ে যায়, তরুণ কবির প্রথম উত্তরীয়  দীর্ঘ ঘাসের মতো , গরিবখানায় হঠাৎ বেড়াতে আসা

সুলতানের মতো প্রখর রাজনৈতিক, সেই মুহূর্তে তাকে ভুলে যেতে হবে কবিতার কণ্ঠ সর্বদাই  ধাপে ধাপে আসা ডিপ্রেশনের মাইলস্টোনগুলোকে পেরিয়ে যেতে হবে, যেভাবেই হোক।

প্রথম কাব্যগ্রন্থের মতো শ্রেষ্ঠ উপহার আর কিছু হয় না, এই শামুক, পিঁপড়ে, আর ডাহুকের জীবনকে সে কোন ভঙ্গিমায় লিখেছে, সেই মেধাকে ঈর্ষা করবো  বলেই তো দিনের পর দিন কবিতার জন্য বেঁচে থাকা…”

আলোচ্য সংখ্যাটিতে ত্রিপুরার এই সময়ের তরুণ কবি ও  গবেষক অভিজিৎ চক্রবর্তী শূন্য দশকে ত্রিপুরার বাংলা কবিতা নিয়ে একটি সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন যা একটি অমূল্য সম্পদ  হয়ে রইল কীর্ণকাল এবং আবহমান বাংলা কবিতার ইতিহাসের জন্য । 




আপাতত ছোট গল্প নিয়ে প্রকাশিত অষ্টম সংখ্যাই কীর্ণকালের সর্বশেষ সংখ্যা। সেখানেও আমাদের বক্তব্য ছিল, 

“গল্প না গদ্য? যুক্তিতর্ককেই কি আমরা এখন গল্প বলে চালিয়ে দিচ্ছি না গল্প হারিয়েছে তার পুরোনো বিন্যাস?

শ্লথ হয়ে নেমে আসা তারপর চৌম্বকীয়  আকর্ষণে  গল্পের মধ্যে পাঠককে ঢুকিয়ে দেওয়া।

তবে যদি হয় একটি কথোপকথন? হয়তো বা ভেতর থেকে আসল গল্পটি সামান্য উঁকি  দিয়েই চলে গেল।

সাধারণ পাঠকরা নাকি এখন ধৈর্যহীন। তবে এখন কি গল্প আমরা অর্ধেক পাঠকের জন্য লিখব? যার কাছে বৃহত্তর পাঠপ্রবাহের কোনো মূল্য নেই সে চায় খুব ছোট একটি পরিসরের টুকরো টুকরো বিন্দুর মতো কিছু একটা অথবা সেই বিন্দুর—

মধ্যেই রয়ে গেছে বৃহত্তর পটভূমিকা যার জন্য কেবল ইঙ্গিতই যথেষ্ট?

আসলে এই সময়ের পাঠক ঠিক কি ধরনের গল্প ভালোবাসেন? পাঠকের উপযোগী করে গল্প লিখবেন না সময়ের কথা না ভেবে নিজেদের মতো করে লিখবেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লেখক নিজেকে ভাববেন, ভাষা বদলাবে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে, ঘটনা বদলাবে, একজন লেখক হতে গেলে এভাবেই নিজেকে তৈরি করার চেষ্টা তিনি করে থাকেন। কোথাও ভাবের ঋণ শোধ করতে গিয়েও পড়তে পারেন। কিন্তু হৃদয়ে একবার নতুন বীজ বুনে দিতে পারলে সেটাই আবার গল্প হয়ে ফিরে আসবে। সাহিত্যে তো শেষ পর্যন্ত মানুষের বুকের কথাই বলে তাই না?

এই সংখ্যায় যে সমস্ত লেখকরা আমাদের গল্প দিয়েছিলেন তারা হলেন 

 মিলনকান্তি দত্ত, অভিজিৎ চক্রবর্তী ,পারিজাত দত্ত,সুমন পাটারী, অনিন্দিতা চক্রবর্তী,শুভদীপ দেব, মুনমুন দেব ,সন্তোষ রায়, অর্পিতা আচার্য, নন্দিতা দত্ত,দেবাশ্রিতা  চৌধুরী,সুমিতা দেবনাথ,মৌলিক মজুমদার

এবং সম্পাদক নিজে।

কীর্ণকাল সবসময় নিজের উদ্দেশ্য ও বক্তব্য নিয়ে স্পষ্ট থেকেছে। সম্পাদকীয়তে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে কীর্ণকালের দৃশ্যমান,  অনুভবময় অবয়বকে,

“​কবিতা একটি স্বতন্ত্র সত্তা, জন্মমাত্রই সে স্বাধীন। কবিতা খুব বিরক্ত হয়, যখন তাকে নিয়ে পাতার পর পাতা গদ্য লেখা হয়। কবিতাকে ভেঙে গদ্য তৈরি করার নাম হলো গণতান্ত্রিক অসহায়তা বা নির্জন ব্যালটবাক্সে সাপের খোলস ঢুকিয়ে দেওয়া। কবিদের অভিমান হয়, যখন কারো কবিতা নিয়ে আলোচনা হয় না, তার কবিতার কোনো লাইন নিয়ে কেউ যখন নানাদিক তুলে লাইনটির বহুমুখিতাকে আরো ব্যাপ্ত করেন না। খোলাপাতায় ছড়িয়ে থাকা সেইসব শ্বাস প্রশ্বাস তো আসলে অর্ধেক রাত্রির পর জেগে ওঠা নির্ঘুম কামনার পদছাপ। কামনাকে কে কবে সাদা আলোর মতো স্পষ্ট করে দেখতে পেয়েছে।

​দু একটি  সংখ্যায় কবিতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও এই সংখ্যায় কবিতা নিয়ে কোনো আলোচনা থাকছে  না। ভালো লাগছে না কবিতাকে কেটেকুটে প্লেটে সাজিয়ে কাঁটা চামচ দিয়ে খেতে। মনে হচ্ছে তাকে শুধু পান করি মাটির ভাঁড়ে, পোড়া দেহের আগ্নেয় যন্ত্রণাসহ।

​আমরা যারা কবিতা লিখছি বা গল্প, উপন্যাস যাই লিখছি সবাই আবহমান বাংলা সাহিত্যের ধারক ও বাহক, কিন্তু কয়েক বছর বাংলা লেখালেখির ভুবনকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, প্রথম ভুবন, দ্বিতীয় ভুবন এবং তৃতীয় ভুবন হিসেবে এবং এই ধারণাটি শুরু হয়েছে আসামের সাহিত্যজগৎ থেকে। এমনকি তৃতীয়ভুবনের কবিতা নামে তারা কবিতা সংকলনও প্রকাশ করছেন। আমার মনে হয়, এই শব্দবন্ধটি আর ব্যবহার করা উচিত নয়। বাংলা ভাষা যতরকম ভাবেই বলা হোক না কেন, তা শেষপর্যন্ত বাংলাই। তাই পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে বাংলা ভাষায় লেখা সমস্ত সাহিত্যই বাংলাভাষাকেই প্রতিনিধিত্ব করে, শুধু প্রথম ও শেষ কথা হলো তা যেন সাহিত্য পদবাচ্য হয়, হৃদয়মথিত করা রস যেন থাকে, তাহলে স্থান কাল পাত্রভেদে তা জ্বলজ্বল করে উঠবেই। এটি একটি ব্যক্তিগত মতামত। মনে হলো কথাটি বলা দরকার, তাই বললাম।

​মাঝে মাঝে মনে হয় কবিতাহীন বিশ্ব কীরকম হতে পারে? বেঁচে থাকার জন্য কবিতা দরকার নেই, কিন্তু পুনরায় বেঁচে ওঠার জন্য কবিতার প্রয়োজন হয়, অন্যভাবে, অন্যরূপে, তাই হয়তো অন্ন বস্ত্রের সংস্থান হলেই মানুষ সৃজনের কাছে ফিরে আসে, খুঁজতে থাকে হারিয়ে যাওয়া রূপোর কাঠি অথবা সোনার কাঠি, সেই কাঠিটি দিয়ে সে নিজের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা রাজকন্যা কিংবা রাজকুমারকে জাগিয়ে তোলে, শিশিরে ভেজা যে পথ জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, সেই পথে হাঁটতে শুরু করে, ঝুলিতে থাকে মধুকরের অদৃশ্য মহল। “

‘কীর্ণকাল ‘ আবার প্রকাশ করব এই বিশ্বাসটুকু নিয়ে আজ এখানেই কীর্ণকালের কথা শেষ করি। ছোট্ট একটি সাহিত্যপত্রিকা,  বলা যায় সে এখনো শিশু। তার অনেক পরিচর্যা দরকার তবেই হয়তো একদিন কীর্ণকাল লাভ করবে দৃঢ় সবুজ শিরদাঁড়া।