উপন্যাস

৫:১৪ PM চিরশ্রী দেবনাথ 0 Comments

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

চিরশ্রী দেবনাথ



পর্ব দুই


তুমি deterministic নাকি probabilistic—আমি জানি না। কিন্তু আমি জানি, তুমি জিরো থেকে শুরু করে ইনফিনিটি পর্যন্ত যেতে পারো।


প্রত্যেকেই তো একটা ইনফিনিটি  , তাই না আবির। 


তুমি ঠিক বললে না ঈরা , এভাবে বললে ইনফিনিটিকে নেগলেক্ট করা হয়। আর মনে রেখো ইনফিনিটিরর মূল্য সবাই দিতে পারে না,  একমাত্র মেধাবীরাই দিতে পারে এর মূল্য ।তার কাছে ইনফিনিটি উজ্জ্বল আলো হয়ে ওঠে ।


তুমি কি সাহিত্যে ইন্টারেস্টেড আবির?

থোরা বহুত তো আছি।

ও মাই গড,  আমি নই।

সেকী!  তুমি বাঙালি মেয়ে , দেখতে সুন্দর আর সাহিত্যে ইন্টারেস্টেড নও?

বাঙালি বুঝলাম , সৌন্দর্যের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক কি?

কেন নাচ বা গান টান মানে রবীন্দ্রসঙ্গীত  করো না ?  তোমাদের মতো বাঙালি মেয়েদের সঙ্গে  সবাই প্রেম করতে চায়,  এই যে শাড়ি,  লম্বাচুল ইত্যাদি ।

প্রথম কথা তুমি খুব ভাট বকছো আবির। রবীন্দ্রসঙ্গীত দুটো একটা গাই বলে আমি সাহিত্যে পারঙ্গম নই,  হ্যাঁ শারদীয় আনন্দমেলা বা ছোট বেলায় কিছু গল্পটল্প পড়েছি শুধু , সাহিত্য অনেক বড় ব্যাপার , আজই শখ করে একটু শাড়ি পরেছি , চুলটা ভেজা ছিল বলে খুলে রেখেছি তাকে তুমি কীরকম যেন generalisation করে ফেললে , মানে প্রেমের উপযুক্ত বাঙালি মেয়ে , খুব খেলো কথা হয়ে গেল তাই না?

সরি ঈরা, তুমি রাগ করলে।

অবশ্যই ।

আরে কফি শেষ করে ওঠো।

যাচ্ছি নাতো,  দাম দিয়ে কিনেছি , খেয়েই যাব,  তবে এখানে বসে নয়। অন্য টেবিলে ।

একটা স্পষ্ট কথা শোন আবির

আমি খাটতে ভালোবাসি , পড়তে ভালোবাসি , অংক আমার শখ নয়,  অংকই আমার ল্যাঙ্গুয়েজ , শরীর অথবা মনের ।


ঈরা অন্য টেবিলে গিয়ে বসল । ক্যাম্পাসের মধ্যে এই  কাঠের তৈরি ছোট ক্যাফেটেরিয়াটি সব ছাত্রছাত্রীদেরই প্রিয়। এরকম  তিনটে আছে। একটি স্যার এবং স্টাফদের জন্য আর  ছাত্রছাত্রীদের জন্য দুটো। লাঞ্চ ব্রেকে জায়গা পাওয়াই মুশকিল ।তবে এখন সক্কাল সক্কাল,  তাই ফাঁকা খানিকটা। 

 ক্যাম্পাসটি মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা,  একদিকে পিজি স্টুডেন্টদের অন্যদিকে পি এইচ ডি স্টুডেন্টদের জন্য। এখানে বসলে দু তরফের ছাত্রছাত্রীদেরই আসা যাওয়া দেখা যায়। সুহানি, নীলম,  রাজ তিনজন একসঙ্গে যাচ্ছে,  ওদের সঙ্গেই  একটু পরে ঈরার কমন ক্লাশ আছে। 

তার মধ্যে নীলম ও রাজের সাবজেক্ট অবশ্য  সম্পূর্ণ আলাদা তবে  সুহানি আর  ঈরা দুজনেই ক্রিপ্টোগ্রাফি রিলেটেড । 

ঈরাকে হাই বলল সুহানি, ঈরাও হাত তুলল। ঈরা এখন ক্লাশে যাবেনা। এখন গেলে গল্প হবে।  ডঃ এ মুখার্জির ক্লাশ। স্যার এখনো আসেননি। এখান দিয়েই যাবেন তিনি,  তার পেছন পেছন ঈরা ক্লাসে ঢুকবে। তিনি. Dept. of Algebra & Cryptography বিভাগের হেড অব দ্য ডিপার্টমান্ট । একটু রুক্ষ,  তবে কালে ভদ্রে সামান্য রসিকতাও করেন,  দীর্ঘকায়,  সৌম্যদর্শন, মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে দুটো গভীর কালো মেধাবী চোখ, নিজের সাবজেক্টের ওপর প্রশ্নাতীত দক্ষতা, আর পুরুষালি ভয়েস ঈরাকে মুগ্ধ করে চলেছে প্রত্যেকদিন,  শ্রদ্ধায় যেন তার মাথা নুয়ে আসে,  এরকমই তো হওয়া উচিত শিক্ষক,  এখন পর্যন্ত ঈরার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ডঃ এ  মুখার্জি । ঈরা যখন প্রশ্ন করে কী সুন্দর বুঝিয়ে দেন,  সাধারণ প্রশ্নকেও তুচ্ছ করেন না। ঈরা অনুভব করছে সে ক্রমাগত অতিরিক্ত বায়াসড হয়ে গেছে ওনার প্রতি। এমনকি অন্য ছাত্রছাত্রীদের স্যার সেইম ট্রিটমেন্ট দিলেও ঈরার কেমন যেন হিংসে হয়। ওনার ব্যক্তিত্ব কিছুটা রুক্ষ, অথচ স্নেহপরায়ণ । স্যারের সবচেয়ে প্রিয় কথাগুলোর  মধ্যে অন্যতম হলো  “Math is a weapon. Use it wisely.”



ঈরা আড়চোখে দেখল আবির ওর ব্যাগ থেকে একটা জার্নাল বের করেছে, জার্নালের কভার  ঈরার চেনা, International Journal of Number Theory (IJNT) একটি বিশ্বখ্যাত পিয়ার-রিভিউড (peer-reviewed) গবেষণা পত্রিকা , যা সংখ্যাতত্ত্ব  ও তার বিভিন্ন শাখায় গবেষণা প্রকাশ করে , এখানকার লাইব্রেরি থেকেই নিয়েছে নিশ্চয়ই,  ঈরার স্বপ্ন একজন তরুণ গবেষক হিসেবে তার লেখাও IJNT তে প্রকাশিত হবে।

ঈরা আবিরকে নিয়ে একটু সচেতন,  আবির 

বর ঠাকুর , আসামের তেজপুর থেকে এসেছে।

গায়ের রঙ বাদামি , ভালো উচ্চতা ও মেদহীন শরীর, চোখগুলোতে সরলতা নেই,  জিজ্ঞাসা আছে, ওর গবেষণার বিষয় , ”Quantum Key Distribution (QKD) in Post-Quantum Cryptography”

আসলে সে এমন এক এনক্রিপশন পদ্ধতির ওপর কাজ করছে যা কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসার পরেও ভেঙে ফেলা যাবে না।

 ঈরার বিষয়ের সঙ্গে আবিরের বিষয়ের সূক্ষ্মতর পার্থক্য রয়েছে,  দুজন দুটো  ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে চায় সমস্যাকে। 

 প্রায়শই তর্ক হয়—কিন্তু এই তর্কের জন্যই ঈরা আবিরের সান্নিধ্য পছন্দ করছিল,  এখন এক নিমেষে ঈরার আবিরের প্রতি অভালোলাগা তৈরি হয়েছে,  এ হচ্ছে ঈরার বিপদ , নিজের মনের মতো তো সবাই হবে না,  কিন্তু মনের এই আবছায়া ভালোলাগা ভেঙে গেলেই ঈরা সেই মানুষ থেকে দূরে সরে আসে,  এভাবে ঈরা ধীরে ধীরে একা হয়ে যায়,  যেন পৃথিবীর মধ্যে মধ্যবসন্তে ভেসে বেড়ানো নিঃসঙ্গ কোন সংখ্যা, তবে স্যার যে বলেন সংখ্যা কখনো একা হয় না, অর্থহীন হলেও তার আশেপাশে কেউ থাকবেই । ঈরার মনে তখন কেবল ভেসে উঠল এ সি স্যারের মুখ । একটু লজ্জা হতে লাগল । এই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এভাবে গবেষণায় মনোসংযোগে বাধা আসবে। ঈরা ল্যাপটপ খুলে গতকালকে পড়ানো পেপারগুলোর পি ডি এফ আবারো রিভাইস করা শুরু করলো। আবির আর ঈরার দিকে তাকায়নি,  জার্নালে ডুবে গেছে। অন্যদিন হলে ঈরা আবিরের পাশে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত আর্টিকেলগুলো,  কোথায় কি নিয়ে কাজ হচ্ছে এসব জানাটা খুব দরকার। তবে এ , সি স্যার সাধারণত খোঁজখবর নিয়েই তার ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিষয় নির্বাচন করেন,  তিনি সবসময় বলেন চোখকান বন্ধ রেখে গবেষণার কাজ হয় না। 

আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফিতে অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেব্রা বিশেষ করে গ্রুপ থিওরি, ফিনাইট ফিল্ডস, এলিপটিক কার্ভ এবং নাম্বার থিওরি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই বিষয়টি pure mathematics ও applied mathematics-একটি মেলবন্ধন । 

ঈরার দাদু ছিলেন শিলচরের একটি নামী হাইস্কুলের অংকের মাস্টারমশাই ।ছাত্ররা খুব ভয় পেতো এই জাঁদরেল অংকস্যারকে,  তিনি কিন্তু ছোট থেকেই ঈরাকে চিনতে পেরেছিলেন,  তাই অংক নিয়ে ভয় নয় বরং একটা মজা বা কৌতুহল ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন নাতনির মনে । দাদুভাই তাকে নাম্বার দিয়ে বিভিন্ন ধাঁধা দিতেন, কখনও গোপন কোডে চিঠি লিখতেন নাতিনকে,  দাদু আর নাতিনেরর এই মজার খেলাই ঈরাকে আজ এখানে দাঁড় করিয়েছে,  কিন্তু দাদুভাই দেখে যেতে পারেননি, সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাকে চারবছর আগে দাদুভাই চলে গেল পৃথিবী থেকে,  মহাশূন্যের কোনো অংক ক্লাসে। খুব মিস করে দাদুভাইকে ঈরা ।

ল্যাটিস বেইসড ক্রিপ্টোগ্রাফি এই নিয়ে ঈরা গবেষণা করছে, কারণ এটি quantum computer-এর বিপদ থেকেও নিরাপত্তা দিতে পারে – অর্থাৎ ভবিষ্যতের সাইবার সিকিউরিটিই হলো ঈরার গবেষণার লক্ষ্য । Quantum Computing আসার পর অনেক প্রচলিত ক্রিপ্টোগ্রাফি ভেঙে পড়বে – তাই নতুন সিস্টেম তৈরির জন্য এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।



এমন সময় সৃজনী এসে ধপ করে ঈরার সামনে বসল , পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের ছাত্রী , ঈরার জুনিয়রই বটে , তবে ছটফটে আর খুব মিশুকে ।


ঈরাদি তুমি এতো শান্ত কেন বলতো ? ইচ্ছে করছে না রাগে ফেটে যেতে,  চিৎকার করতে?

মেয়েদের পড়াশুনো,  গবেষণা সবকিছুই তো খুব ফালতু তাইনা?

ঈরা বুঝতে পারল সৃজনী কলকাতার আর জি কর হাসপাতালের  এম ডি পাঠরতা সেই ডাক্তার মেয়েটির ধর্ষণ ও খুনের কথা বলছে ।

খুব নৃশংস এবং হতাশার,  কিন্তু ঈরা জোর করে নিজেকে এই মুহূর্তে সরিয়ে রাখতে চাইছে সব থেকে,  সৃজনীর সঙ্গে এখন এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই ঈরা পরবর্তীতে আর ক্লাশে মন দিতে পারবে না,  আলোচনা করেই বা কি হবে,  

আলোচনা প্রতিবাদ কতটুকু বদলেছে মানুষকে ?


এখন যে আমার ক্লাশ আছে সৃজনী,  আসি রে,

অবশ্য তখন আরো কয়েকজন ঢুকে পড়েছে ক্যাফেতে,  সৃজনী ঈরাকে ছেড়ে তাদের দিকে মন দিল। সবার দিকে তাকিয়ে একটু আলতো হেসে ঈরা বেরিয়ে পড়ল,  আর যেখানে প্রত্যেকদিনই ঈরার একবার চোখ পড়ে সেটা হলো, ক্যাফেতে ঢোকার মুখেই একটি রঙিন সাইনবোর্ড ,  যেখানে বড় বড় করে লেখা,

 “ Life is not a linear equation “,










0 মন্তব্য(গুলি):