উপন্যাস, সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

৬:৫৯ PM চিরশ্রী দেবনাথ 0 Comments


উপন্যাস 

চিরশ্রী দেবনাথ

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

পর্ব তিন

ঈরার ক্লাশ এখন Gauss Campus Hall এ , যা এক কথায় EIIMS ক্যাম্পাসের গ্ল্যামার  , ঠিক মাঝখানে যেখানে টিলাটা সামান্য উৃচু তার ওপর অর্ধেক গোলাকার অনেকটা গম্বুজের মতো দেখতে এই হলঘরটি  মনের মধ্যে কেমন যেন সম্ভ্রম জাগায়।  দুই দিকে প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে। 

ধূসর পাথরের গাঁথুনি , ক্যাম্পাস হলটিতে কেমন একটা ঠান্ডা আর গম্ভীর ভাব বজায় রাখে , এখানে ঢুকে ক্লাশ করার সুযোগ অর্জন করা খুব একটা সহজ কম্ম নয় এটা ভেবে ছাত্রছাত্রীদের মনেও থাকে প্রচ্ছন্ন গর্ব। 

হলে ঢুকতেই চোখে পরে কাঠের ব্যালকনিতে গড়া ধাপে ধাপে বসার ব্যবস্থা , মনে হয় নির্দিষ্ট কোনো গাণিতিক  অনুক্রমে যেন সাজানো হয়েছে। ছাদে আধচাঁদের মতো স্টিল-গ্লাসের ছাউনির ফাঁক দিয়ে সকালের আলো ঠিকরে পড়ে বোর্ডের ওপর—যেখানে জটিল ফর্মুলা আর তত্ত্বের নকশা আঁকা থাকে রঙিন চকে।

 সামনে থাকা বিশাল  স্লেট বোর্ডটি প্রায় পাঁচ মিটার চওড়া, যার পাশে মাউন্ট করা আছে আধুনিক টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে—গবেষণার পেপার পড়ার জন্য । একপাশে ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রফেসররা হাতে ছোট্ট মাইক নিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে  বলেন  আর অন্যপাশে একটি সাদা রোলিং বোর্ড, যেখানে কেউ কেউ হাতে-কলমে সমীকরণ কষেও  দেখান ।

হল ঘরের এক প্রান্তে টানানো বিশাল দেয়ালচিত্রে , পিথাগোরাস,  ইউক্লিড ,  গাউস, রামানুজান, পিয়ের দে ফার্মা,  জি এইচ হার্ডি এবং আধুনিক সময়ের ফারমেটস লাস্ট থিয়োরেম প্রুফ করা ম্যাথমেটিশিয়ান অ্যান্ড্রু ওয়াইলসের  প্রতিকৃতি—এক এক করে সকলের দিকে তাকালে মনে হয় তারা আজও এই কক্ষের ছাত্রছাত্রীদের বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় চোখ রাখছে।


 মাঝে মাঝে এখানেই বসে অতিথি বক্তাদের  সেমিনার—কখনো সুইজারল্যান্ড থেকে আসা লরাঁ ফার্ব বা জাপানের কোন তরুণ তুর্কি সংখ্যা তত্ত্ববিদ, যিনি আঁকছেন Elliptic curve-এর গতিপথ। স্লাইডে ভেসে ওঠে complex variable-এর জটিল উপত্যকা, আর পেছনের সারিতে বসো ঈরা-আবিরেরা চুপচাপ গিলতে থাকে  প্রত্যেকটি সূত্র, প্রতিটি রঙিন রেখার মানে।

গ্যালারির শেষ সারিতে বসলে একটি বাড়তি পাওনা রয়েছে, একমাত্র এখান থেকেই যেন অংকের গাম্ভীর্যের মাঝখান ঢুকে পড়ে কিছু 

রঙ,  কারণ এই জায়গাটি দিয়ে দেখা যায় পাহাড়ের ঢাল,  আর কয়েকটি ফুলে ছাওয়া প্রাপ্তবয়স্ক গুলমোহর গাছ,  মাঝে মাঝে চোখও ক্লান্ত হয়,  মনও ।

চোখ আর হৃদয় দুটোই তখন ফুলের সৌন্দর্য দেখে,  বাদ পড়ে যায় প্রফেসরদের দু একটি দামি লাইন , একটু অন্যমনস্কতার জন্য দামও দিতে হয় অনেক,  তবুও ঈরা বুঝতে পারছে এই গম্বুজের মতো ঘরটায় একটা ভালোবাসা জোর করে ঢুকে পড়তে চাইছে আর ঈরা দুহাত দিয়ে আটকাচ্ছে শুধু। 

  অংক কি শুধুই পরিসংখ্যান, না রহস্যময় কোনো জাদু, যে জাদুর নিচে লুকিয়ে থাকে প্রেম, অপেক্ষা  আর অনন্ত সম্ভাবনা।


ক্যাফেতে এসো  একটু , কথা আছে, সুহানি বলল ।

মুখার্জি স্যার পড়াচ্ছেন,  এসময় বাড়তি কথা ঈরার খুব অপছন্দ,  সে হাত দিয়ে ইশারা করল পরে,  এরমধ্যে আবির আবার কোশ্চেনও জিজ্ঞেস করে ফেলছে একটি , কোশ্চেনটা ভালো করে শোনাই হলো না ।

আবিরের সঙ্গে ছোট্র একটা নোটবুক সবসময় থাকে,  সে কখনও ফাঁকা থাকে না,ওর বিষয় নিয়ে  যখন যা মনে হয় সেটা লিখে রাখে বিভিন্নভাবে , পরে কনফিউশন ধরে ধরে  প্রশ্ন করে । সবাই আবার একে আইনস্টাইনের নোটবুক বলে একটু হাসাহাসিও করে। আজ 

আবির এই গ্রুপ থেকে দূরে বসেছে এবং মন দিয়ে শুনছে।


মুখার্জি স্যার একবার যেন পুরো ক্লাসটাকে মনযোগ দিয়ে দেখলেন। ঈরা প্রত্যেকদিনই কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করে,  ওর কোশ্চেনগুলোর ভ্যালু আছে। ঈরা নিশ্চিত স্যার ওকেই খুঁজছিলেন।কিন্তু আজ ঈরা ভালো করে পড়ে আসতে পারেনি তাই চুপচাপ বসে আছে,  হঠাৎ করে ফালতু প্রশ্ন করে ফেলার কোন মানে হয় না এখানে।

প্রায় দু ঘন্টার ক্লাশ শেষ হলো,  স্যার বেরিয়ে যাচ্ছেন,  পেছন পেছন কয়েকজন অতি উৎসাহী গবেষক,  আশ্চর্য ঈরাও তো তেমনই একজন , আজ সে অন্যদের এভাবে ভাবছে । নিজে পড়ে আসেনি বলে ? স্যার ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন,  গাড়িতে উঠে গেলেন,  হলের সামনে তখন ঈরা দাঁড়িয়ে,  খোলা চুল উড়ছে সামান্য হিমেল বাতাসে । স্যারের চশমা রোদে কালো হয়ে যায়, তাই ঈরা ঠিক বুঝতে পারল না গাড়ির দরজা বন্ধ করার সময় কি ওর দিকে তাকালেন স্যার।

সৌমিতাভ অনেকক্ষণ ধরে ঈরার কানের কাছে কি জানি ঘ্যানঘ্যান করছিল , এবার ঈরা চোখ তুলে তাকালো,  কি বলছো জানি?

বাপরে বাপ , কোথায় থাকো তুমি ঈরা , আমরাও অংক নিয়ে পড়াশোনা করি,  কিন্তু মাঝেমধ্যে সামান্য হাসিঠাট্টাও করি ।

সেরকম কোন ব্যাপার নয় সৌমিতাভ,  বলো শুনছি। 

 চলো হাঁটি। প্রায় দেড় ঘন্টা বাকি নেক্সট ক্লাসের,  কোথাও বসি ঈরা , তোমার আপত্তি না থাকলে।

আমার আপত্তি আছে সৌমিতাভ।

এভাবে বলছো কেন?

আমি এখন লাইব্রেরিতে যাব,  তুমি যাবে?  তবে আলাদা টেবিলে বসতে হবে। গতকাল কিছু পড়া হয়নি , আজ আমি মুখার্জি স্যারের ক্লাশে প্রায় ব্ল্যাঙ্ক ছিলাম।

ঈরা তুমি বোধহয় ভাবো তুমি সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট তাইনা?  আর ঐ আবির বর ঠাকুর ! আমিও আই আইটি থেকেই এম এস সি করেছি, স্কলারশিপ পেয়েই পড়ছি,  কিন্তু তোমার ব্যবহারটা খুব রূঢ় ঈরা ,.সাবজেক্ট নিয়ে কথা বললে বুঝতে পারতে এই সৌমিতাভও কিছু জানে। বাই দ্য ওয়ে , তুমি খুব বাজেভাবে রিয়েক্ট করলে আমার কথায় আজ,  আর আমার মনে হয় ই্যয়ু আর ফল ইন লাভ উইথ মুখার্জি স্যার। খুব কষ্ট পাবে। হি উইল ইউজ ই্যয়ু ।

যা তা বলছ সৌমিতাভ,  ঈরা প্রায় চিৎকার করে উঠল।

সৌমিতাভ আর পেছন ফিরে তাকাল না। ওর খাটো হাট্টাখাট্টা শরীরটা নিয়ে হনহন করে চলে গেল।  

ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রছাত্রীদের বসার জন্য  সিমেন্টের  বেঞ্চ বানানো রয়েছে তারই একটির  মধ্যে ঈরা বসে পড়ল ধপ করে।

কী থেকে কী হয়ে গেলো। সত্যিই তো সৌমিতাভ খুব একটা খারাপ কিছু বলেনি তখন। ঈরা বাজেভাবে রিয়েক্ট করেছে।

মুখার্জি স্যারের প্রতি ও দুর্বল এই ভয়াবহ সত্যটা যা ঈরা নিজেকেও বিশ্বাস করাতে চায় না,  সেটা সৌমিতাভের চোখে কী করে ধরা পড়ল ? তবে যে ঈরা খুব অহংকারের সঙ্গে বলে ওর শরীরের ভাষাও গাণিতিক এটা তবে ভুল ।

যাহ্ আজকের দিনটাও মাটি হলো। এখন আর ঈরা পড়ায় মন বসাতে পারবে না। মনের দু জায়গায় খিমচে আছে আবির আর সৌমিতাভের কথাগুলো।  কেন এতো সেনসিটিভ  আমি?  নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল ঈরা ।

এখানে বসে থেকে লাভ নেই , বইয়ের আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁদতেও আরাম। ঈরা দ্রুত হাঁটতে লাগল । এখান থেকে লাইব্রেরি অনেকটাই দূর। ঐ টিলার ওপর , বিশাল রামানুজন ব্লক , ওখানেই লাইব্রেরি এবং জেরক্স আর প্রিন্টিং এর দোকান। 

লাইব্রেরির নাম শ্রীনিবাস রামানুজন লাইব্রেরি ।

বড় বড় দুটো দেবদারু গাছ দুদিকে। ব্যাগ ইত্যাদি জমা রাখার কাউন্টারে লোকেশদা বসে আছে ।

লোকেশ থাপা , নেপালি। বাংলা , হিন্দি , ইংরেজি তিনভাষাতেই কাজ চালাতে পারে। শুধু রাগ উঠলে নেপালি ভাষায় গালাগাল দেয়,  মাতৃভাষাটা স্পেশালি গালাগালের জন্য ইউজ করে। 

কোন স্টুডেন্ট লাইব্রেরি আওয়ারের শেষ মুহূর্তে বেরোলে লোকেশদা গম্ভীর মুখে বলে এক কাপ চা মাঙতা হ্যায়। 

ঈরা সব জমা রেখে , খাতা ও পেন্সিল নিয়ে ঢুকল লাইব্রেরিতে ।

লাইব্রেরির মাঝ বরাবর লম্বা ওক কাঠের টেবিল, যার গায়ে ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারে ছোপ পড়েছে। সবাই ঘাড় নিচু করে আছে, কারো ল্যাপটপের স্ক্রিনে PDF, কারো হাতে  পুরনো জার্নাল। সময় যেন এখানে ধীরতর; কোথাও কিচ্ছু নড়ে না—শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানোর শব্দ, মাঝে মাঝে কারো কফির কাপ নামানোর মৃদু টুং।


ডানদিকে তাকালে চোখে পড়ে কয়েকটা গ্লাস-কেসে সংরক্ষিত হাতের লেখা থিসিস, তাম্রফলক-চিহ্নিত কিছু দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি—কোনোটিতে গাণিতিক চিহ্নের পাশে গবেষকের ব্যক্তিগত নোট, একটুখানি দুঃসাহস, একটুখানি সংশয়।


লাইব্রেরির শেষ কোণে "The Infinity Room" নামে এক গোপন পড়ার ঘর, যেখানে শুধু M.Phil ও PhD স্কলারদের প্রবেশাধিকার—এখানে বসে ঈরা একদিন গভীর রাতে আবিষ্কার করেছিল একটি ভুলে-যাওয়া সূত্র, যা নিয়ে পরে আবিরের সঙ্গে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছিল।


আর লম্বা করিডোরের শেষপ্রান্তে  বড় সাইনবোর্ডে লেখা ,

“An equation for me has no meaning unless it expresses a thought of God.”

– Srinivasa Ramanujan





0 মন্তব্য(গুলি):