সংখ্যার শরীরে মৌমাছি
উপন্যাস
সংখ্যার শরীরে মৌমাছি
চিরশ্রী দেবনাথ
পর্ব চার
হোস্টেলে সকাল থেকেই আজ নানান হইচই। প্রতিবাদে সামিল হতে সবাই রাজি। ঈরা একটু নিমরাজি। সবার সঙ্গে হ্যাঁ না মেলালে আবার নানারকম কথা শুনতে হবে , কিন্তু এসব তো আসলে সময় নষ্ট। ছোটবেলা থেকেই ঈরা পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস। ঈরার বেসিক ধারণা তার পৃথিবীটা শুধু পড়া দিয়েই গড়া, যে পৃথিবী খুব নিরাপদ, বাইরের কোন ঝড় ঝাপটা তাকে কখনো ডিস্টার্ব করবে না। মোটকথা পড়ার বাইরে , রেজাল্টের বাইরের পৃথিবী নিয়ে ঈরার কোন দরকার নেই, নিজস্ব জগতে শুধু তারই পছন্দের কয়েকজন মানুষ থাকবে, তাদের সঙ্গেই সে খাবে দাবে , সামান্য ঘুরবে, পরীক্ষা দিয়ে ভালো চাকরি জোগাড় করে পৃথিবীর মাঝে যেন এক নিরাপদ গ্রিন হাউসের ভেতর তার বাকি জীবন কেটে যাবে। বাড়ি থেকে বাবার টেনশনে ভরা ফোনকল গতকাল থেকে ঈরাকে অস্থির রেখেছে, আজ আবার সবাই এটা নিয়ে পড়েছে। রাত নটার পর হোস্টলের চত্বরে সাধারনত বেরোনো নিষেধ কোনরকম ইমার্জেন্সি ছাড়া, আর এমনিতেও পাহাড়ি জায়গায় রাত নটা মানে মধ্যরাত। এখানে বিকেল পাঁচটায় পুরোপুরি সন্ধ্যা। কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায় চারপাশ। টিলায় টিলায় জ্বলে ওঠে ফ্লাড লাইট ।
কলকাতায় হবে রাতদখল। অভয়াকাণ্ডের প্রতিবাদে সামিল হতে সবাই নেমে যাবে রাতের রাজপথ দখল করতে , সৃজনী, ইশা , সুহানি ওরাও চাইছে এমন একটা কিছু করতে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছে, ওদের সঙ্গে থাকবেন প্রফেসর ডঃ অন্বেষা চৌধুরী ।
মানে ক্লাশের পর আজ কেউ আর হোস্টেলে ফিরছে না, সারা সন্ধ্যা জুড়ে ক্যাম্পাসে চলবে প্রতীকী রাত দখলের জমায়েত, বক্তৃতা এইসব। ঈরা ভীষণ বিরক্ত ।এসবে কি আদৌ কোন লাভ হবে কোথাও?
ঈরার মুড খারাপ দেখে সুহানি বলল আচ্ছা ঈরা বলতো , কাজের জায়গায় মেয়েদের যদি নিরাপত্তা না থাকে তবে এই পড়শোনা করে কি লাভ। ? আমার আশ্চর্য লাগছে তোমার নির্লিপ্ততা দেখে। তুমি যেন কিছুই নিতে পারছ না, একজন লেডি ডাক্তার অন ডিউটি এরকম নৃশংসভাবে খুন হলো, এটার জন্য তো দেশে রীতিমতো যুদ্ধ হওয়া উচিত।
প্লিজ সুহানি আমি ফিল করি, কিন্তু এটা কোন সাধারণ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়. নয়, যেখানে ছাত্র আন্দোলন, মিছিল মিটিং ইত্যাদি প্রত্যেকদিন লেগে থাকবে, এটা গবেষণার জায়গা, গভীর মনোযোগের জায়গা, নাহলে বিরাট কিছু অ্যাচিভ করা যায়না।
তুমি তাহলে বিশাল কিছু অ্যাচিভ কর ঈরা , আমরা তো প্রতিবাদ করবই, মনে রেখো এরকম এক জঘন্য স্যোসাল কালচারের মধ্যে তোমাকেও কাজ করতে হবে, একটা মৃত্যু বলে দিল মেয়েদের মেধাও অনেকের কাছে বিপজ্জনক ।
সুহানি চলে গেল পোস্টার বানাতে , আজ গান কবিতা বা নাচ নয়, শুধুই চিৎকার একটা ভয়াবহ চিৎকার যেন ফেটে পরে চারদিকে।
ঈরাও যাবে, নিশ্চিত। কিন্তু ঈরা বুঝতে পারেনা এতো চিৎকার কোথায় গিয়ে মরে যায়, আর ফিরে আসতে পারেনা মানুষের কন্ঠে।
প্রফেসর অন্বেষা চৌধুরী থাকছেন।
তিনি EIIMS এর পিওর ম্যাথমেটিক্সের অন্যতম সিনিয়র প্রফেসর। তার বর্তমান গবেষণার বিষয় Topological Data Analysis , তাকে ঈরার একদমই ভালো লাগেনা । ভীষণ অহংকারী মনে হয়, ছাত্রছাত্রীদের থেকে যেন অনেক দূরে ওনার বসবাস । ক্লাশে আসেন, জোরদার লেকচার দেন, সবাই ফলো করে ওনার পড়ানো, পারতপক্ষে কোন স্টুডেন্টের সঙ্গেই কথাবার্তা বলেন না, এরকমই মনে হয় ঈরার । বিশেষ করে ঈরাও ওনাকে এড়িয়ে চলে, এই বিষয়ে তো খুব বেশি ছাত্র ছাত্রী নেই। জনাকয়েক স্টুডেন্টই আসে যাদের গবেষণার সঙ্গে ব্যাপারটির যোগাযোগ আছে। তাই এখানে কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে টিচারদের বন্ডিং তৈরি হয়ে যায়। তবে অন্বেষা ম্যাডামের সঙ্গে আবির খুব কথা বলে কারণ তিনি আবিরের অন্যতম গাইড টিচার ।সুহানির কথাবার্তায় মনে হলো ওরও বেশ ভালো সম্পর্ক। তাহলে কি ক্লাশের বাইরেও অন্বেষা চৌধুরী ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেশেন ।আসলে তিনি এখানকার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও অনেকটা পালন করেন, তবে ঈরার সঙ্গে তো তিনি কখনো নিজে থেকে কথা বলেননি ।অত্যন্ত কঠোর ভাব ধরে থাকেন, যা ঈরার অসহ্য লাগে ।ঈরাও কি খানিকটা এরকম? যাকে আর কয়েকদিন পর সবাই এড়িয়ে চলবে। রাত দখলের বিষয়টিতে সবাই ইনভলভড হয়ে যাচ্ছে, আজ কারোরই পড়াশোনায় মন নেই। কলকাতায় ডাক্তারদের গণ সমাবেশ, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, তীব্র ঘৃণা আর প্রতিবাদ এই সুন্দর শৈলশহরের নিরুদ্রপ উত্তাপহীন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে এসেও ঢেউয়ের মতো এসে আছড়ে পড়েছে।
মুখার্জি স্যার সপ্তাহে তিনদিন ক্লাস নেন, আজ ওনার ক্লাস নেই, কিছুসময় সাইবার ক্যাফে তে কাটাবে বলে ঠিক করল ঈরা । কয়েকটা জিনিস সার্চ করার ছিল, এক্ষেত্রে নিজের ল্যাপটপের চেয়ে এখানে করা ভালো , এতে নেট কানেকশনও ভালো পাওয়া যায়, কাজ করতেও আরাম।
CyberNode যেন EIIMS এর একটি উজ্জ্বল পালক। ইন্সটিটিউশনের এক কোণে অবস্থিত আধুনিক ডিজিটাল রিসার্চ ক্যাফে ।
ঢোকার মুখেই , দেয়ালের ঠিক ওপর লেখা
"Information is the true infinity."
লাইব্রেরির পেছনের দিকের দোতলায় গ্যালারির পাশে কাচের দেয়ালঘেরা জায়গাটি প্রথম দেখায় অনেকটা আধুনিক ক্যাফের মতো। কিন্তু ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে কফির চেয়ে কোডিং বেশি, আর চায়ের চেয়ে চিন্তা গভীর। এমন কি যে কেউ সেখানে ঢুকতে পারেনা।
প্রবেশদ্বারে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানার – ছাত্রছাত্রীদের আইডি কার্ড দেখালে দরজা খুলে যায়। ভেতরে soft lighting—সাদা, নীল আর হালকা সবুজ আলো মিশে এক গাঢ় একাগ্রতার পরিবেশ তৈরি করেছে। দেয়ালজুড়ে সাউন্ডপ্রুফ বুথ – প্রতিটিতে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেস্কটপ, তিন মনিটর, উন্নত গ্রাফিকস কার্ড, হাই স্পিড নেট কানেকশন এবং প্রি-ইনস্টলড জার্নাল সার্চ ইঞ্জিন, ম্যাথ ল্যাব, পাইথন, R, ম্যাথমেটিকা ইত্যাদি সফটওয়্যার। ডান পাশে "Global Access Pod" নামে পরিচিত পাঁচটি ছোট কিউবিকল – এখান থেকে IEEE, JSTOR, Springer, Elsevier, arXiv–এর মতো আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে প্রবেশ করা যায়।
মাঝে কয়েকটি অ্যানালগ ডেস্ক রয়েছে—যেখানে শুধু কাগজ-কলম, রুলার দিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা চলে। এখানকার দেয়ালে একপ্রস্থ সফ্ট বোর্ড। কেউ ইচ্ছে করলে কিছু পিন করে যেতে পারে যদি অন্য কারো কাছে সম্ভাব্য কোন উত্তর থাকে।
প্রতিদিন সন্ধ্যে ছ’টা থেকে সাতটা পর্যন্ত একঘণ্টা আল্ট্রা সাইলেন্স জোন হয়—যখন কেউ কথা বলে না, শুধু কিবোর্ডের শব্দ, স্ক্রলের হালকা শব্দ , আর কোথাও কোথাও নিঃশব্দে ঘাম ঝরার মতো চিন্তার তীব্রতা ছড়িয়ে থাকে।
এক পাশে রাখা থাকে ‘Research Query Box’—যেখানে কেউ চাইলে নাম না দিয়ে জটিল প্রশ্ন ফেলে রাখতে পারে, এবং অন্যরা তাদের মতামত যোগ করতে পারে। তবে অনেকেই বলে এখানে কিছুই না রাখতে, কারণ চিন্তা চুুরি হয়ে যেতে পারে।
তাছাড়াও যে যার গবেষণার গোপনীয়তার কারণে সার্চ হিস্ট্রি পর্যন্ত ডিলিট করে যায়।
CyberNode যেন শুধুই একটা ডিজিটাল ঘর নয়—এটা ঈরার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি ধ্যানঘর, এখানে বসলে তার মনে হয় এই ইউনির্ভাসের সকল কোণ থেকে সংখ্যারা যেন তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। বিকেলবেলার দিকে এলে কাচের জানলা দিয়ে দেখা যায় কুয়াশার দীর্ঘ আস্তরণের পরও মাঝ আকাশে উঁকি দিচ্ছে একটি নক্ষত্র, যার আলো এখান থেকে ম্লান কিন্তু আসলে হয়ত সে সুতীব্র আলোর ঝলকানি, কী অদ্ভুত এক আপেক্ষিকতা।
ঈরা এক মনে হাঁটছে। আজ সে পরে আছে নীল রঙের একটি কুর্তি আর সাদা কটন প্যান্ট। চুলে টাইট করে বিনুনী বেঁধে নিয়েছে। ঢোকার মুখে বাবাকে ফোন করল। বাবা বললেন , তুই যে একা একা সাইবার ক্যাফেতে বসে কাজ করবি সেটা কি নিরাপদ? আরো কাউকে নিলি না কেন সঙ্গে?
বাবা , এভাবে নিজের কাজ করা যায় না,
কিছু কিছু কাজ একাও করতে হয়। তাছাড়া
এখানে সব জায়গায় গার্ড থাকে,
বাবা বলছে আরে অভয়ার ওখানেও সিভিক পুলিশ ছিল!
তাহলে কি এতো বছরের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম জলে দিয়ে বাড়ি চলে আসব ? শুধু ভয়ে ?
ঈরার রাগ উঠলেও বাবাকে কিছু বলতে সে পারেনা, নরম স্বরে বলল কিছু হবে না বাবা , এখানকার পরিবেশ খুব ভালো , একদমই অন্যরকম। তুমি আর মা আসো আরো একবার,
আমরা পাহাড় ঘুরে আসব। এখন রাখি, চিন্তা করো না।
আই ডি কার্ড স্ক্যান করিয়ে ঈরা ঢুকে পড়ল ভেতরে ।
বাঁদিকে ,কফির ভেন্ডিং মেশিনের পাশে একটা ছোট ‘চুপচাপ কোণা’ – যেখানে প্রফেসর বা পিএইচডি স্কলাররা বসে কোনো সংকেতপদ্ধতি বা জটিল গণিতের সমস্যার সমাধানে ডুবে থাকেন। একটি ছোট ক্লাসরুমের মতো বলা যেতে পারে।
ছোট্ট টেবিলের ওপর বিস্কুটের কৌটোও রয়েছে।
ঈরা দেখল সেখানে আজ আবির আরো দুজন
বসে কথা বলছে , এই স্যারের নাম ডঃ কুলকার্নি, আবির ওনার আন্ডারে একটা পেপার করবে সেদিন শুনেছিল। ঈরার অবশ্য এই প্রফেসরের সঙ্গে এখনো কোন রকম প্রয়োজন পড়েনি।
না পড়লেই ভালো । ঈরা শুধু মুখার্জি স্যারের স্টুডেন্ট হয়েই থাকতে চায়। ইচ্ছে হয় ঈরা সামনে বসে থাকবে আর স্যার বোঝাতে থাকবেন, কলমের সূক্ষ্মরেখায় তৈরি হবে নতুন কোন অংক, যার সমাধান শুধু ঈরার কাছেই আছে।
দূর, এসব ভাবনা যে কেন আসে, নিজের ওপরই রাগ হলো, জানলার ওপাশে একটি খ্রিসমাস ট্রি, বেশ লম্বা , আর ফাঁক দিয়ে তাকালে চোখে পড়ে দূর পাহাড়ের আবছা অবয়ব, এটাই ঈরার সবচেয়ে প্রিয় বসার জায়গা, অন্য কেউ বসা থাকলে অবশ্য সে আর এক জায়গায় বসে , আজ কেউ নেই, তাই
প্রিয় কোণটা বেছে নিয়ে সে বসে পড়ল, তার
সাইডে পোস্ট-ইট নোটে লেখা একটি লাইন ,
“Don’t shut down the system. The proof is coming.”

0 মন্তব্য(গুলি):