সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , চিরশ্রী দেবনাথ
সংখ্যার শরীরে মৌমাছি
চিরশ্রী দেবনাথ
পর্ব ছয়
সকালের ব্রেকফাস্টে ছিল উপমা, চা , একটি কমলা ও এক মুঠো ড্রাই ফ্রুটস । এতোটা একসঙ্গে খেতে পারে না ঈরা , ফল আর ড্রাই ফ্রুটসগুলো রেখে দেয়, পরে খিদে পেলে খায়।
হোস্টেলের খাওয়াদাওয়া খুব ভালো লাগে ঈরার ।মোটামুটি একটা ব্যালেন্সড ডায়েট মেন্টেন করে ওরা । শিলচরে নিজের বাড়িতেও ঈরা এতোটা সুন্দরভাবে খাওয়া দাওয়া করত না আর তারপর আরো হোস্টেল ও মেসে কেটেছে এতগুলো বছর , সেখানেও খাবারের তেমন নির্দিষ্ট মেনু ছিল না, যাকে বলে হেলদি ফুড। আসলে হেলদি খাবার সুস্থভাবে পড়াশোনা করার জন্য খুব দরকার।
আর জি কর নিয়ে কয়েকদিন একটা চাপান উতোর থাকবে, এড়িয়ে যাওয়া যাবেনা , সেটা চায়ও না ঈরা , কিন্তু খুব বেশি ঢুকবেও না এসবে।
কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি, যে সব পেপারগুলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে জমা দিতে হবে, যেগুলোর ওপর সেমিনার রয়েছে কোনটাই তো তেমন এগোচ্ছে না। স্যার তৈরি করতে বলেছেন , সে চেষ্টা করছে, সংখ্যার জটিলতা বা কখনো কখনো আলোর ঝলকানির মতো সারল্য দুটোই ঈরাকে মুগ্ধ ও মগ্ন করে রাখে।
মাসে একদিন বা দুদিন স্যার ডেট দেন ব্যক্তিগতভাবে বসার জন্য। সেই হিসেবে নেক্সট উইকে ঈরার ডেট তার টপিকের কাজ কতদুর এগিয়েছে এই নিয়ে কথা বলার বা প্রবলেমগুলো ডিসকাস করার। রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের সারি দেখতে দেখতে ঈরা খুব গভীরভাবে সারাদিনের কাজগুলো গোছাচ্ছিল মনে মনে । প্রথমেই লাইব্রেরি তারপর ক্লাশ আর সবশেষে সোজা হোস্টেল ।
রেডি?
চমকে উঠল ঈরা , দরজায় উঁকি দিয়ে যার মুখটি দেখা যাচ্ছে সে হলো জয়ী ঘোষ। কলকাতার, পড়াশোনায় তুখোড় আবার খুব রাজনৈতিক কথাবার্তা বলে সবসময়, অনেকেই এড়িয়ে চলে, ঈরার খারাপ লাগে না, বুদ্ধিমানদের পাশাপাশি চুপচাপ হাঁটলেও অনেককিছু জানা যায়। জয়ী কবিতা লেখে, গানও গায়, স্লোগানও ভালোই বানায় মনে হল।
এই তো রেডি, চলো।
দরজা নক করে ঈরা জয়ীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।
মাঝে মাঝে মতবিরোধ হলেও ঈরা জয়ীর আইডিয়াগুলোকে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেনা।
কেমন চলছে পড়াশোনা? জয়ী জিজ্ঞেস করল?
হু, চলছে।
বলবে না, আমি যদি জেনে ফেলি তাইতো? হাসল জয়ী।
না না, সেরকম কিছু নয়, কাল রাতের কথা ভাবছিলাম ।
কোনটা আর জি কর?
নাতো, তোমার আর জি কর নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। ইনফ্যাক্ট কারোরই নেই, সবই লোক দেখানো। না হলে বৃষ্টি এলো বলে এভাবে পালিয়ে আসতে?
পালিয়ে? নাতো। আমার সাইনাসের দোষ আছে, জ্বর এলে ভুগব তাই চলে এসেছি?
আর জাহানারা? কাশ্মীরকি কলি? সারাক্ষণ যার বিয়ের গল্প, আর ফাইট করে এখানে আসার গল্প আমাদের শুনতে হয়।
গল্প থাকতেই পারে, যার যার নিজস্ব গল্প। তোমার ভালো না লাগলে শোনো না।
আর জয়ী পি এন পি সি আমার পছন্দ নয়, তোমাকে একটু অন্যরকম ভাবতাম , এখন তো দেখছি আলাদা কিছু নও।
কে বলেছিল অন্যরকম ভাবতে ?.ওহ্ তোমরা তো আবার নর্থ ইস্ট, কথায় কথায় নিজেদের অনুন্নত জায়গার বলে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট নাও সরকার থেকে।
জয়ীর কথাগুলো ঈরাকে খোঁচাখুঁচি করার চেষ্টা হলেও ঈরা রাগ দেখালো না। সাতসকালে মুড খারাপ হলে সারাদিনের পড়াশোনা শেষ।
আচ্ছা আসি, তোমার তো এখন ক্লাশ, আমি লাইব্রেরি যাবো।
জয়ীকে টা টা করে ঈরা লাইব্রেরির দিকে চলে গেল।
ঈরা ভাবছিল এই সুন্দর দেশটা কেমন যেন হয়ে গেছে, সাধারনভাবে কারো সঙ্গে মেশা যায় না। প্রত্যেকের ভেতরে একটা চুল্লি, গনগনে আগুনে নিজেরাই নিজেদের পোড়াচ্ছে, কেন এরকম হলো?
লাইব্রেরি যেন একটা নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপ। এখানে ঢুকলে ঈরার মনে হয়, সে এখন সব পারবে। স্যারের দেওয়া টপিকগুলোকে সে সংখ্যা দিয়ে সাজিয়ে তৈরি করে ফেলতে পারবে দুর্ভেদ্য গাণিতিক কোড। তার পেপারটাই সেরা হবে। স্যারের চোখ থেকে ঈরার জন্য ঝরবে প্রশংসা ও গর্ব।
এখানে কেউ কারো তেমন বন্ধু হয়তো নেই,তবুও কীরকম করে যেন একটা গ্রুপ তৈরিই হয়ে যায়। মতানৈক্য বা একজন আর একজনকে পিন করলেও কেমন করে জড়িয়ে যায় অনুভবে ও মননে ।
আবির, জাহানারা, সৌমিতাভ, ঈরা , সুহানি, জয়ী, তারাও কোন এক অলিখিত নিয়মে জড়িয়ে গেছে হয়তো টপিকগুলোর মধ্যে মিল থাকায়। এখানে ঈর্ষা ও দ্বন্দের মাঝখানে দু একটি নিয়মভাঙা ভালোবাসাও গড়ে ওঠে যাদের
মিলতে হবে এরকম দিব্যি কেউ দেয়নি, তবে ভেঙেচুড়ে দেবেনা এই নিশ্চয়তাও নেই।
ঈরা দূর থেকে দেখল একটি টেবিলে আবির আর সুহানিকে । ওরা পড়ছে , পড়ুক।
ঈরা সেদিকে গেলো না।
প্রয়োজনীয় সব বইপত্র নিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসে গেল। লাইব্রেরির এই দিকটায় বড় বড় কাচের জানলা, খোলা হয় না, ওপরে ভেন্টিলেটার দিয়েই বেশ বাতাস আসে , রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে কাচ ঠিকরে অবারিত আলোয় ঝলমল করে ভেতরটা আর কুয়াশার দিনের জন্য প্রচুর লাইট তো রয়েছেই, পুরো ইনস্টিটিউশনটা সোলার সিস্টেমে চলে , এখন রোদ আসছে, সারি সারি টেবিল , আর জানলার ওপারে চোখ দিলেই পাহাড়ের গায়ে পাহাড় , ছোট ছোট জনপদ, হরেক রঙের পতাকা পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় উড়ছে। এগুলো মানুষ কেন দেয় ঈরা এখনো জানে না। দূরের মন্দিরটাও দেখা যায় কুয়াশা না থাকলে। এটা শিবমন্দির, এতোদিনে ঈরার জানা হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষদের কাছে খুব আদরের শিবজী ।
ঈরা বাইরের দিকে তাকালো, আকাশটা বেশ নীল আজ, কী অপূর্ব লাগছে সব, এক অদ্ভুত কল্পনা ঈরাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল, সেখানে অন্য কেউ স্বপ্নের মতো ।
অনেকক্ষণ পর হঠাৎ সুহানির ডাকে সম্বিৎ ফিরল ঈরার । ক্লাশে যাবে না?
হ্যাঁ, তোমরা যাও, আসছি আমি।
আমি তো যাব না, এলিনর ম্যাডামের ক্লাশ তোমাদের, একটা জিনিস খুবই কনফিউজড ছিলাম, আবির হেল্প করল, আসি, তোমরা যাও।
ভীষণ লজ্জা আর রাগ হলো ঈরার নিজের ওপর । কিছুই তো পড়া হলো না। সুহানি তো দিব্যি নিজের কাজ করে নিল, আসলে কি সুহানি ততটা ইমোশোনাল নয়?
ব্যাগ গুছিয়ে, বইশুলো যথাস্থানে রেখে ঈরাও বেরিয়ে এলো লাইব্রেরি থেকে ।
ঈরার গবেষণা আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফির একটি ট্র্যানজিশন পিরিয়ডে — Post-Quantum Cryptography (PQC)— গড়ে উঠছে , কোয়ান্টাম কম্পিউটার এসেছে, RSA, ECC-র মতো প্রচলিত পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে না শুধু পড়ছে । তাই ভবিষ্যতের নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন অ্যালগরিদম নিয়ে গবেষণা চলছে সবজায়গায় ।
ঈরা কাজ করছে lattice-based cryptography নিয়ে, যা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় post-quantum approach বলে ধরা হয় ।
এখন এলিনর ম্যাডামের ক্লাস । ওনার ক্লাসগুলো পর পর দেওয়া হচ্ছে, মনে হয় উনি চলে যাবেন , হয়তো আরো কিছু মাস পর আবার আসবেন, এমনও হতে পারে অনলাইন ক্লাস নিলেন। তবুও এতো উন্নত প্রযুক্তির মধ্যেও ঈরার কেন জানি মনে হয় স্যার ম্যাডামদের সঙ্গে সামনা সামনি ক্লাস করার মধ্যে যে উষ্ণতা ছড়িয়ে পরে, অনলাইনে তা পাওয়াই যায় না।
এলিনর ম্যাডামের ক্লাসও Gauss Lecture হলে। তিনি একটি নরম বাদামি রঙের ওভারকোট পরে এসেছেন, হালকা নীল স্কার্ফ আর চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্বের মিশেলে খুব সুন্দর লাগছে ওনাকে ।
তিনি ধীরে কথা বলেন । এক্সপ্লেইন করার সময় একটু থামেন, সামনে বসা ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকান। প্রায় সব ছাত্রছাত্রীই বিভিন্ন ভাষাভাষী ভারতীয় , তিনি জার্মানির, একমাত্র অংকই দুইয়ের মধ্যকার সেতু ।
প্রত্যেকদিনের মূল টপিক শুরু করার আগে Post-Quantum Cryptography (PQC) এবং Public Key Cryptography-এর বিষয়টার জটিলতা ও সম্ভাবনা নিয়ে একটু বলেন , আজও বলছেন । বোর্ডে লিখলেন ,
“The Unseen War of Numbers”
আজ বৃষ্টি নেই। উজ্জ্বল রোদ বাইরে আর ভেতরে পিন পড়লেও শোনা যাবে এমন নিস্তব্ধতা।
Before I start, let me ask—how many of you believe that your WhatsApp chats are safe?
আবির হাত তুলল, কিন্তু ম্যাডাম ওর কাছে কিছু জানতে চাইলেন না , তিনি নিজেই বলতে লাগলেন,
"Public Key Cryptography—RSA, Elliptic Curve—they've served us well for decades. The concept is elegant: one key to lock, one key to unlock. But..." একটু থেমে আবার বললেন "quantum computers are coming. And with them, everything you thought was secure might vanish like fog."
সামনের সারিতে ঈরা মাথা নিচু করে বসে আছে, নোট খাতা খোলা । জাহানারা চোখ কুঁচকে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এখনি সে পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে।
জয়ী মেধাবী , কিন্তু এতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসেও তার মাথায় অনাবশ্যক জিনিস ঘোরাফেরা করে।
সে ফিসফিস করে কিছু বলল সৌমিতাভকে , একবার ঈরার দিকেও ইশারা করল।
এলিনর বোর্ডে লিখলেন
Public Key Cryptography: Two keys – Public & Private
RSA/ECC Vulnerability: Shor’s Algorithm on Quantum Computer
Post-Quantum Cryptography: Lattice-based, Code-based, Hash-based schemes
তিনি হাত দিয়ে বোর্ডে ল্যাটিস আঁকলেন ,
"Imagine a multidimensional maze. Now hide a password inside. That’s the world of lattice-based encryption. It's complex, resistant, but not unbreakable. Just... not breakable yet."
ঈরা হাত তোলে, জিজ্ঞেস করে,
"Ma’am, are we trying to hide the key better, or change the whole lock?"
এলিনরের চোখে একটু যেন প্রশংসা দেখতে পেল ঈরা,
"Very good question, Ira. We’re doing both. We are redesigning what a 'lock' means in a post-quantum world."
সৌমিতাভ ফিসফিস করে জয়ীকে বলল বুঝলি, লক তোদের WhatsApp-এর, চাবি এখন কিউবিটে ঢুকে যাবে , একটু হাসির প্রলেপ পড়ল ক্লাসে।
এলিনরও হাসলেন ওদের হাসি দেখে, তারপর বললেন ,In this new war, the battlefield is invisible, the weapons are algorithms, and the soldiers—are researchers like you.
জাহানারা একটু গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,
Miss, does that mean even medical data can be hacked in future?
"Yes, my dear. That's why we need ethical cryptographers—minds with not just logic, but conscience."
পেছনে জানালার কাচে এখন বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, কখন রোদের পাট চুকে বৃষ্টি নেমেছে কেউ লক্ষ্যই করেনি।
ক্লাসে নিঃশব্দতার প্রতিধ্বনি বাজছে যেন। ঈরা মনে মনে ভাবে—এই সময়েই তাকে প্রস্তুত হতে হবে, আগামীতে হয়তো নিঃশব্দ যুদ্ধ
হবে যেখানে অস্ত্র শুধুই অংক আর কোড ।

0 মন্তব্য(গুলি):