ছোট গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ছোট গল্প চিরশ্রী দেবনাথ



চিরশ্রী দেবনাথ



হস্তান্তর 


 ব্যালকনিতে বসে আছি। রাত নটা বাজে।  

রাত খুব একা হয়, জিনিসটি ফিল করছি 

নতুন করে, যদিও বরাবর একাই রেখে ছিলাম নিজেকে, এটা আমার স্বভাব। 

মা না ফেরার দেশে চলে গেলেন বি এস সি পড়ার সময়। ভালোই ছিলেন মা আমার, ছোটবেলা থেকে আমি একরোখা আবেগহীন মানুষ। শিশুবয়স থেকেই আমার মধ্যে রয়েছে আশ্চর্য এক নিরাসক্ত মনোভাব। বুঝলাম টিকে থাকতে হলে পড়াশোনা করতে হবে। মনোযোগ দিয়ে তাই করতাম । এতে মা বাবার মনে হলো, আমি তাদের বাধ্য ছেলে। মা সাধ্যানুসারে ভালো মন্দ রেঁধে খাওয়াতেন। ছেলেকে যত্ন করার চেষ্টা, তবে আমার মনে হতো টাকা রোজগার করলে এসব খাবার কিনেই খাওয়া যায়, আরো ভালো মানের, তাই তেমন কোনো আহ্লাদ আসতো না মনে। মা মারা যাবার পর বাবা আরো বেশ কিছু বছর বেঁচেছিলেন, আমাকে  কয়েকটি কোর্স করালেন, চাকরির পরীক্ষায় সামিল করলেন, একটি বাইক কিনে দিলেন এবং চাকরি পাওয়ার পর আমার জন্য মেয়ে ঠিক করে বিয়ে দিয়ে দিলেন। তারপর বোধহয় কিছুদিন অপেক্ষা করেছিলেন নাতি নাতনির মুখ দেখার জন্য, কিন্তু এই ব্যাপারে আমি ওনার সাধ পূর্ণ করতে পারলাম না। যদিও আমরা, মানে আমি আর আমার বউ খুব সাবলীল ভাবেই একটি সন্তান উৎপাদনের চেষ্টা করে ছিলাম, কিন্তু হলো না। পুরনো বাড়িকে আমি নতুন করে রঙ টঙ করে নিলাম । বউয়ের নাম চিঠি, এরকম নাম কেনো ওর মা বাবা রেখেছিলেন,জানিনা। ডাকতে খুব অসুবিধে হতো, আমার আবার নাম ধরে ডাকার অভ্যেস, হ্যাঁ গো, তুমি গো বলতে পারি না, যাই হোক আস্তে আস্তে মানিয়ে নিলাম। তারপর বংশধর না পাওয়ার দুঃখ নিয়েই বাবা মারা গেলেন, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক। এখন শুধু চিঠি ও আমি। আমি অফিসে যাই, চিঠি রান্নাবান্না করে, ঘর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে, মাঝে মধ্যে বেড়াতেও যাই এখানে সেখানে। আনন্দে আছি কী দুঃখে আছি আমি আলাদা করে কিছু ফিল করতে পারতাম না। তবে চিঠির মনে খুব আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি সন্তানের জন্য। আমি এসবে বিশেষ পাত্তা দিতাম না, সন্তান থাকলেই বা কী, না থাকলেই তা কতটা দুঃসহ, তা আমার ব্যক্তিগত ইস্যু হয়ে কখনোই ওঠেনি। আস্তে আস্তে মহামারীর দিন এলো। আমাদের  শহরেও  ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত, এ বিষয়ে অবশ্য খুব সাবধানতা অবলম্বন করেছিলাম। এই প্রথম  অনুভব  করলাম  নিজেকে  ভালোবাসি । এই যে রেস্তোরাঁয়  খাওয়াদাওয়ার সুখ, কাজ থেকে ফিরে এ সি চালিয়ে আরামসে টিভিতে খেলা দেখার সুখ, নিশ্চিন্তে তোফা ঘুম দেবার সুখ, মরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব শেষ হয়ে যাবে ! তাই টিভির খবরে, হোয়াটস্ এপে আসা নানারকম কোভিড সতর্কতা,  মেনে চলার চেষ্টা করতাম। চিঠিকেও তটস্থ রাখতাম এই ব্যাপারে, কারণ রোগটা একা আসে না, স্পর্শবাহিত। 

  ফলটল খেতে লাগলাম খুব বেশি করে, অ্যালকোহল ও সামান্য ধূপপানের অভ্যাস বাদ দিয়ে যোগাসন, প্রাণায়াম, হাঁটা এসবে মন দিলাম। তবুও রক্ষা হলো না, কোভিড  আক্রমণ করল চিঠিকে। প্রথমে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতেই চিকিৎসা চলল, কিন্তু কমল না, জ্বর বাড়তে লাগল, শ্বাসকষ্ট শুরু হলো, আসলে ওর ভেতর প্রবল ডিপ্রেশন ছিল, বেঁচে ওঠার ইচ্ছেটাই চিঠির মধ্যে মরে গিয়েছিল। হাসপাতালে এডমিট করতে হলো ওকে। 

ফ্রিজ খুলে দেখলাম, প্রচুর খাবার নষ্ট হচ্ছে, সে কিছুই খেতো না তেমন।  চিঠি বাঁচল না।

কোভিড আক্রান্ত ডেডবডি বাড়িতেও  আনা হলো না। সবকিছু হাসপাতালের দায়িত্বেই শেষ হয়ে গেলো। 

আমার মনে হতে লাগল, মা বাবার পর স্ত্রীও চলে গেলো, এই প্রথম সম্পূর্ণ একা থাকার অনূভূতি । আসলে মা বাবাকেও আমার তেমন অত্যাবশ্যক মনে হয়নি। চিঠিকেও প্রথম প্রথম মনে হলো না। এখন রোজ অফিসে যেতে হয় না, রোস্টার ডিউটি চলছে। আস্তে আস্তে ঘরের কাজ করার অভ্যাস করছি। কিছুদিন যাবার পর ভাবলাম কাজ  কমিয়ে ফেলতে হবে। অধিকাংশ বাসনকোসন ও কাপড়চোপড় তুলে রাখলাম । তিনটে ঘর বন্ধ করে দিলাম । কোনোদিন রাঁধি, কখনো  হোম ডেলিভারি, যেদিন অফিস নেই ঘর পরিষ্কার করি। তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে চিঠি থাকলে একটি কমিউনিকেশন চলত বাড়িতে,এখন তা নেই। একদম নিরুদ্রপ। ব্যালকনিতে অনেকক্ষণ বসে থাকলেও কোনো ডাকাডাকি নেই।  

আমার শারীরিক সুস্থতা এবং ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের জন্য খুব নিশ্চিন্ত বোধ করি। কিন্তু আজকাল আমাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে প্রচুর সময়, পৃথিবীর অসুস্থতা শেষ হতে হয়তো আরো কিছুদিন লাগবে, তারপরই আমি  বেরিয়ে পড়ব ঘুরতে। কয়েকদিন ধরে   মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়, রাতের অবশিষ্ট সময়টুকু কাটানো মুশকিল। আগে দিনরাত খেলার  চ্যানেল নিয়ে পড়ে থাকতাম। আজকাল  টানছে না তেমন। একটি পুলিশের গাড়ি গেলো,  টহল দিচ্ছে।  আমার বাড়িতে কতকাল কেউ আসে না। মা থাকতে পাড়ার কয়েকজন মহিলা আসত, মা  মারা যাওয়ার পর তারা আর আসেনি, বাবার  কিছু বন্ধু ছিল, একসময় এসে গল্প গুজব করত, চিঠির তেমন কোন পরিচিত জন ছিল না বোধহয়,  তবে চিঠি বিষয়ে আমার কোনো স্বচ্ছ ধারণা গড়ে ওঠেনি, ওর বন্ধুবান্ধব, ব্যক্তিগত ভালোলাগা সেও কখনো বলেনি, আর আমিও জানতে চাইনি। 

 আচ্ছা আমার কি কোনো বন্ধু স্কুলের পর দীর্ঘদিনের মধ্যে এসেছে এ বাড়িতে? 

কয়েকজন ক্লাসমেটের  নাম্বার সেইভ  করা ছিল, মনে মনে ভাবলাম, কাল দিনের বেলা একটু ফোন করে দেখব তো। ভোরের দিকে ঘুম এলো,  কিন্তু গভীর ঘুম হলো না, সকালবেলা নিজের কাজকর্ম গুছোচ্ছি, চা টোস্ট খেলাম, ভাত করলাম রাইসকুকারে, ফ্রিজে মাছ ছিল, আলু পেঁয়াজ কেটে ঝোল করে নিলাম আর ডিমসেদ্ধ, যথেষ্ট রান্নাবান্না হলো, এখন ক্লিনিং।  কলিং বেলের শব্দে একটু আশ্চর্য হলাম, দরজা খুুুলে দেখি ডেলিভারি বয়, একটি প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, প্যাকেটটি চিঠির নামে, বেশ কিছুদিন আগের অর্ডার, লকডাউনের জন্য পৌঁছুতে দেরি, টাকাও দেওয়া আছে। একবার ভাবলাম রিটার্ন করে দিই, যে দিয়েছে সেতো আর এই জগতে নেই।  তারপর মনে হলো থাক,  রেখে দিই।  প্যাকেটের ওপরে স্প্রে করে, বাইরে রোদে রাখলাম।   বিকেলে অফিস থেকে ফিরে খেয়াল  হলো প্যাকেটটি সম্পর্কে , কাচি দিয়ে সন্তর্পণে কাটলাম,  একটি সিল্কের শাড়ি, ভায়োলেট  কালারের।  চিঠি ছিল শ্যামবর্ণা, কী মনে করে এই রঙ অর্ডার দিয়েছিল কে জানে, যাক গে। রিটার্ন করে দেবো। এইসময় হঠাৎ ফোন এলো,  অফিস থেকে, কথা বলতে বলতে ভুলে গিয়েছি, সেদিন আর রিটার্ন  দেওয়া হলো না, তাছাড়া এজন্য আমাকে চিঠির মোবাইল ঘাঁটতে হবে , দূর, তখনই কী জিনিস জিজ্ঞেস করে ফেরত দিয়ে দিলে হতো। টাকা ফেরত না পেলেও হতো আমার। পরদিনও নানা কাজে কেবলি ভুলে যাচ্ছি। বিকেলের দিকে গেটে শুনলাম কেউ শব্দ করছে, গ্রিলটা ঝাঁকাচ্ছে ।  সন্ধ্যা ছ'টা থেকেই কার্ফু শুরু হয়ে যায়, তাই আমি অফিস থেকে ফিরেই লক করে রাখি সব।

 সোয়া পাঁচটা বাজে। 

 একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে, চিঠির মতোই বয়স হবে বা আরো কম, কী ব্যাপার? মেয়েটি গেটের বাইরে থেকে সংক্ষেপে যা বলল, তা হলো, এ পাড়াতেই ওদের বাড়ি , চিঠির সঙ্গে দেখা করতে আমার বাড়িতে দুপুরের দিকে মাঝে মাঝে আসত, চিঠিও যেতো, চিঠি ওর হয়ে একটি শাড়ির অর্ডার দিয়েছিল, টাকাও চিঠি দিয়েছিল, যদি শাড়িটি এসে থাকে, তবে সে আমার কাছে টাকা দিয়ে শাড়িটি নিয়ে যেতে চায়। চিঠির মৃত্যুতে সে এবং তার পরিবারের সবাই খুব দুঃখিত, তাদের কাছে আমার বউ ছিল একজন ভীষণ প্রিয় মানুষ, আর শাড়িটির রঙ হল, ভায়োলেট। 

আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে শাড়িটি এনে ওকে দিয়ে দিলাম, মেয়েটি কিন্তু গেলো না, আমার দিকে টাকা এগিয়ে দিল, আমার কেনো যেন মনে হলো, টাকাটা নেওয়া উচিত হবে না, তাই আমি না করলাম, ও শুনল না, জোর করে হাতে গুঁজে দিলো, আমার নাম্বার নিলো, ওর নাম্বারও দিলো,  বার বার বলল ওদের বাড়িতে যেতে, কোনো অসুবিধে হলে বলতে। আমি এসব বিশেষ পাত্তা দিলাম না।

দু তিনদিন পর আবারও আর একজন, এক বৃদ্ধা, তাকে নাকি চিঠি প্রায়ই খাওয়াতো, পুরনো কাপড় দিতো। সে'ও এসে খুব দুঃখ করতে লাগল। এই আসা কিন্তু শেষ হলো না, একমাসের মধ্যে বহু লোক এলো, তারা  খুব আহামরি কেউ নয়, পাড়া এবং আশেপাশের নানান লোক, প্রত্যেকের সঙ্গেই চিঠি কোনো না কোনোভাবে নিজেকে জুড়ে রেখেছিল, সবাই যেন তার বন্ধু, আমার বিরক্ত লাগলেও কথা বলতে হলো, তবে এই ব্যাপারটিতে আমিও আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হলাম, সবাই যে সাহায্যপ্রার্থী, তা নয়, কেউ কেউ আমার জন্য শাক সব্জিও নিয়ে এলেন, আমি অবশ্য এগুলো প্রত্যাখ্যান করলাম, তবে চিঠির সূত্রে এখন আমার বাড়ির কলিং বেল প্রায়ই বেজে ওঠে, আমি তাদের সবাইকেই মাঝে মাঝে আসতে বললাম। তারমধ্যে একদিন রান্নাঘরের জানলায় দেখলাম, দুটো বুলবুলি পাখি, কী মনে হতে জানলার বাইরে উঁকি দিয়ে দেখি দুটো বাটি রাখা।  

বুঝে গেলাম, কিছু চাল আর জল রাখলাম দুই বাটিতে। আজকাল মনে হতে লাগল, আমি যেন চিঠির পরিবারে বাস করছি। একদিন ভাবলাম ঐ মেয়েটির বাড়ি যাই, যে শাড়ি নিতে এসেছিল, দেখি গিয়ে ।  রিং করলাম। মেয়েটি জানালো ওর নাম  চুমকি, খুব খুশি হলো। জীবনে প্রথম আমি আমার পাড়ার কারো বাড়িতে গেলাম। ওরা চা, মিষ্টি  খেতে দিলো, আসতে বলল। চুমকির  মা বাবা খুবই স্নেহপ্রবণ, আমার মা বাবাকেও চিনতেন,  আর চিঠি বিষয়ে তারা এতো বললেন, আমার কেনো জানি খুব লজ্জা করতে লাগল । ফিরে এলাম  চিঠির সংসারে,  দীর্ঘ দীর্ঘ সময়গুলো  কীভাবে  কাটাবো  আমি ? আবার নতুন করে  শুরু করবো? কিন্তু কেমন করে জীবন শুরু করে ?  

দেখলাম রান্নাঘরের জানলায় দুটো বুলবুলি নিশ্চিন্ত মনে আমার দেওয়া চাল খাচ্ছে, আসলে আমার না, অভ্যাস করিয়েছিল অন্য কেউ, তাকে চিনিনি আমি।

খুব জোরে চিৎকার করলাম, বাইরে আওয়াজ এলো না, ভেতরেই রইল, প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আমার অস্থিমজ্জায়।

 বলতে পারেন আমার মতো মানুষগুলোকে কেন পৃথিবীতে পাঠানো হয়, যারা আমাকে বড় করেছিল, তারা কোথায়? খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলি, কিন্তু খোলসটা রেখে  আজ তারা অনেক দূরে।

দিনগুলো কাটছে যেমন তেমন ভাবে। 

একদিন কয়েকটি ছেলে এলো আমার কাছে, কোভিড  রিলিফ ফান্ড, শ্রমজীবীদের সাহায্য করার জন্য এবং অসহায় কোভিড পেশেন্টদের জন্য। টাকা নেওয়ার ফন্দি নয়তো?  তবুও এড়িয়ে গেলাম না, কেমন করে যেন জুড়ে গেলাম ওদের সঙ্গে,  প্রাণ বাঁচানোর ভয়টা আর আমার নেই। 

দুদিন ধরে  খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, রাতে বুঝলাম  জ্বর আসছে প্রবল, চুমকিকে ফোনে কী বলেছিলাম জানিনা, তারপর জ্ঞান হারালাম। 

যখন আবছা চোখে আবার দেখতে শুরু করলাম সবকিছু, মনে হলো নিজের বাড়িই, কিছু ছেলে মেয়ে আমার চারপাশে, অবশ্যই সবার মুখে মাস্ক, একজন পি পি ই কিট পরা, সে আমাকে ফলের রস জাতীয় কিছু খাওয়াচ্ছে। তার মানে বেঁচে গেছি।

পনের কুড়িদিন ধরে দুর্বলতার বিভিন্ন ধাপ পেরোচ্ছি, নানা জনের বাড়ি থেকে খাবার আসছে। 

আজ প্রখর গ্রীষ্মের এক বিকেলে চুমকিকে বললাম, ভায়োলেট কালারের সিল্কের শাড়িটা একদিন পরে আসবে?

চুমকি হাসতে হাসতে বলল, কাকে দেখতে চান, আমাকে না চিঠি দিদিকে?

আমি আস্তে আস্তে বললাম, বলতে পারো চুমকি এটা কি কোনও প্র্যাকটিকেল গেম ছিল?   যার মধ্যে আমাকে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে চিঠি !




Chirasree Debnath