সংখ্যার শরীরে মৌমাছি
চিরশ্রী দেবনাথ
সংখ্যার শরীরে মৌমাছি
পর্ব আট
ঈরা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল। মন প্রাণ দিয়ে সে এরকমই কিছুসময় চাইছিল। যে স্বপ্ন এবং কল্পনার জগত তৈরি হয়েছে তার মনের মধ্যে সেখানে অংক ছাড়াও রয়েছে অন্য একজন মানুয ।এই চব্বিশ বছরের জীবনে ঈরার প্রথম অবাস্তব ভালোলাগা । যার সঙ্গে তার বয়সের পার্থক্য কম করেও কুড়ি থেকে পঁচিশ বছর । কী অদ্ভুত তাই না। আজ যদি ঈরার সঙ্গে আবির বা সৌমিতাভ কারো ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠত স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু এমন একতরফা ভালোবাসায় ঈরা ডুবে আছে যেখান থেকে কেউ তাকে টেনে তুলতে পারবে না, যার কোনো পরিনতি নেই, তবুও তো ভালোবাসা মানেই সুন্দর।
তোমাকে যে কাজগুলো দিয়েছিলাম সেসব কতদূর এগোচ্ছে?
করিনি স্যার।
করোনি মানে ? তোমাকে অন্যমনস্ক দেখছি আজকাল ?
হ্যাঁ স্যার অন্যমনস্ক। খুব যেন অন্যমনস্ক হয়েই উত্তর দিল ঈরা ।
এভাবে তো চলবে না। সিরিয়াস ছিলে এখন কি এসব আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ছ নাকি?
না স্যার। ঈরা ভেতরের ঝড়কে চাপা দিচ্ছিল। ঈরার চারপাশে এখন কোন আন্দোলন নেই, একটি লাল সতর্কতা জারি শুধু , মনসুনের বারিধারা ।
গাড়ির গতি একটু ধীর হয় , পাহাড়ের ছায়া পড়েছে , সেইসঙ্গে একটুকরো রোদ স্যারের চশমার কাচে ঝলসে উঠল । তিনি ঈরার দিকে তাকালেন ,
আচ্ছা, কাজের কথায় আসি। তুমি বলেছিলে, তুমি Kyber নিয়ে কাজ করছ, ঠিক? এর মধ্যে কীভাবে IND-CCA2 security নিশ্চিত করো?
ঈরা চোখ ফেরায় জানালা থেকে, গলা একটু গম্ভীর , সে তো আপনি জানেন।
সবকিছু জানিনা, আমি তো টপিকটা শুধু ধরিয়ে দিই, বাকি কাজ তোমাদের।
হঠাৎ ঈরার মনে হলো, টপিকটা রেডি হতে ওর এখনো অনেক বাকি বিক্ষিপ্তভাবে দেখছিল শুধু পৃথিবীর কোথায় কোথায় এই বিষয় নিয়ে কাজ হয়েছে।
তুমি কি জানো ঈরা, তোমার থিসিসের এখন পর্যন্ত প্রগ্রেসটা আমি দু’বার পড়ে ফেলেছি। একবার একজন সুপারভাইজার হিসেবে, আর একবার একজন সাধারণ পাঠকের চোখ দিয়ে। খুব ভালো হয়েছে, কিন্তু আমি চাই তুমি একটা জিনিস একটু সহজ করে বলো—Kyber আর Fujisaki–Okamoto নিয়ে তুমি যা লিখেছো, সেটা যারা এই পেশায় থাকবে বুঝবে কিন্তু জটিল অংকের মানুষ নয় তারাও যেন অনুভব করতে পারে ।
স্যার, আমি সবসময় ভাবি—ক্রিপ্টোগ্রাফি আসলে একটা বিশ্বাসের গল্প। আপনি কাউকে এমন কিছু দিচ্ছেন, যেটা সে খুলতে পারবে, কিন্তু মাঝপথে কেউ যেন সেটা না খুলে ফেলে।
হুম বুঝলাম , আর Kyber?
Kyber একটা তালা। খুব শক্তপোক্ত। এমন একটি তালা, যেটা এমনকি কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়েও খোলা কঠিন। সাধারণ তালা যেমন এক চাবি দিয়ে খোলা যায়, এটাও তেমনি কিন্তু চাবিটা একটা জাদু চাবি। একবার কেউ সেটি ঠিকভাবে ব্যবহার করলেই, একটা সুরক্ষিত যোগাযোগ তৈরি হয়।
আর Fujisaki–Okamoto?
ঈরার চোখেমুখে আলো জ্বলে উঠল, এসব সে জানে। গড়গড় করে বলতে লাগল ,
—Fujisaki–Okamoto হলো অতিরিক্ত নিরাপত্তা বলয়। ধরুন কেউ চিঠি চুরি করল, বা এমন একটা ভুয়া চিঠি পাঠাল যাতে আমি বিভ্রান্ত হই—Fujisaki–Okamoto সেই প্রতারণার সুযোগটাই বন্ধ করে দেবে ,
এটা Kyber-কে এমন একটা ঢাল দেয়, যেন কেউ বুঝতেই না পারে ভেতরে আসল কী আছে, এমনকি আসল আছে কিনা সেটাও না।
—তাহলে তুমি বলছো, এটি শুধু প্রযুক্তি নয়, এটা যেন আমাদের তথ্যের উপর মানুষের আস্থা রক্ষার নতুন কোন পথ।
—ঠিক তাই স্যার। আমি চাই, এমন একটা পদ্ধতি তৈরি হোক যেখানে তথ্য শুধু গোপন নয়, বিশ্বাসকেও রক্ষা করা যায় ।
—একটা জিনিস খুব ভালো লাগে , তুমি এই জায়গাগুলো খুব lucidly ধরতে পারো। নিজের কাজের প্রতি এই clarity টা রেখো কিন্তু ঈরা ।
কি রাখবে তো?
—মিঃ মুখার্জি সোজা তাকালেন ঈরার দিকে।
এক মুহূর্তের জন্য সেই দৃষ্টির সামনে থমকে গেলেও , ঈরা সামলে নিল নিজেকে, তারপর একটু ধীরে ধীরে বলল ,
“স্যার, এই কাজটা আমি শুধু থিসিস হিসেবে দেখছি না… এটা অনেকটা যুদ্ধের মতো । মেশিন আর মানুষের মধ্যে, তথ্যের মালিকানা আর নিরাপত্তার মধ্যে ।
—তোমার কথায় একটা অতিরিক্ত মাত্রা থাকে,ঈরা । যা আমি পছন্দ করিনা। coding-এর মধ্যে কবিতা লুকিয়ে আছে নাকি? গলে যাও কেন এতো। আবেগ রাখবে না, ভাবো শুধু।
“হয়তো তাই হওয়া উচিত। আসলে কিছু ই্যকুয়েশন যেন জীবন্ত মনে হয় আমার, তারা শুধু ম্যাথস নয় , অন্য কিছু ..
—তাই? তরুণ বয়সে আমারো তাই মনে হতো ।
বাই দ্য ওয়ে ,আমার কাছে এতো কম আসো কেন তুমি?
মুখার্জি স্যার ঈরার দিকে তাকিয়ে বললেন ।
ঈরা চমকে উঠল একটু।
—তুমি এখনো অনেকটাই অপরিনত, পড়ার দিকে নয়, তোমার আবেগের কথা বলছি ।
কিন্তু এটা মানছি ঈরা , তুমি বিপজ্জনক মেধাবী , সামলে রেখো নিজেকে। ভুল দিকের আকর্ষণে যেন হেলে না যাও।
ঈরা মনে মনে বলল ,
—আমি যতটা নিজের মধ্যে, স্যার… ততটাই কারও ছায়ায়। এটাও একটা asymmetry , কাকে বোঝাই ?
গাড়ির ভেতরে আবারো নিস্তব্ধতা। শুধু ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে কি অল্প অল্প ?
বাইরে আলো আর ছায়ার খেলা। কোথাও কোথাও নিচের উপত্যকায় জোনাকির মতো আলো জ্বলে উঠছে। পাহাড়ে কুয়াশা নামতে শুরু করলেই সন্ধ্যার আবহ তৈরি হয়ে যায়।
—আজ যে আমার আরো কিছু সময় তোমার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছে, থাকবে তুমি?
ঈরা অবাক হলো, আশ্চর্য আনন্দ যেন ওকে খেয়ে ফেলছে। শেষ বিকেলের এই সূর্যটা তবে তারই। কিন্তু ঝটপট রাজি হয়ে গেলে স্যার যদি ভাবেন সে তরল মেয়ে , অথচ মন বলছে আমি যে আরো বহু সময় আপনার সঙ্গে থাকতে চাই।
কিছুদূর গেলে একটি চার্চ আর বাংলো আছে, ওখানে সন্ধ্যায় প্রার্থনা হয়, আর বাংলোটি আমার আংশিক ব্যক্তিগত । ক্লান্ত হয়ে যাই যখন
এখানে এসে থাকি কয়েক ঘন্টা কখনো সারা রাত। তোমাদের মিছিলের দিনও সারাদিন ওখানে ছিলাম, বিকেলে ফিরেছি। কেন জানি ইচ্ছে করছে তুমি কিছু সময়ের জন্য আসো ওখানে । আসবে কি?
ঈরার ভেতরের সব হিসেবনিকেশ এখন বিপর্যস্ত । যদি কেউ দেখে ফেলে, স্যারের স্ত্রী বা ছেলেমেয়ে? নিশ্চয়ই তারা এ পৃথিবীতে আছে কোথাও অথবা স্যার কি বিয়ে করেননি?
জানেনা কিছুই সে। তবুও চুপ করে রইল।
ধরে নিচ্ছি তোমার নীরবতা সম্মতি, জানি দ্বিধা আছে, তবুও আমরা এখন সেখানে যাচ্ছি।
গাড়ি বাঁক নেয়, মেইন রোড থেকে অন্য একটি রাস্তায় যায়, কিছুদূর যাওয়ার পর সামনে খোলা পথের পাশে একটি পাহাড়ি বাংলো ছবির মতো ফুটে ওঠে যেন । লাল নীল আলো জ্বলা চার্চ। কয়েকটি বাচ্চা খেলা করছে।
ঈরা জানালায় ভর দিয়ে তাকিয়ে থাকে । তবে যে অন্বেষা ম্যাডাম কি একটা ইঙ্গিত করেছিলেন স্যারকে নিয়ে। সে কি ভুল পথে যাচ্ছে? কিন্তু এখন তো ফেরা যাবে না।
কই এসো। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নাও। গাড়ির বাইরে খুব ঠান্ডা।
এই কেয়ারটুকু ঈরার ভীষণ ভালো লাগল ।
তিনি চার্চের দিকে গেলেন না। বাংলোর গেট ঠেলে ঢুকলেন। একজন কেয়ারটেকার জাতীয় লোক বেরিয়ে এলো।
—আমাদের কফি আর স্যান্ডুইচ দাও। ডিম সেদ্ধ দিও কিন্তু।
তোমার পছন্দ না জেনে অনেকটা ব্রেকফাস্ট টাইপ অর্ডার দিলাম , তুমি কি পকোড়া জাতীয় কিছু খাবে? তাহলে আনিয়ে দিতে বলব চার্চের পাশে একটা ছোট্ট দোকান বসে এইসময়।
নাহ্।
জানি তুমি কিছুই বলবে না। স্যার একটু হাসলেন।
এসো।
পা দুটো যেন ভারী হয়ে আসছে ঈরার । এমন সময় ফোন বেজে উঠল , বাবা , আশ্চর্য ঠিক এসময়ই!
“হ্যালো বাবা , গলাটা কেমন কেঁপে উঠল ঈরার ।
তুই ভালো আছিস তো? হোস্টেলে নাকি? বেরিয়েছিস একটু? আজ ওখানে বৃষ্টি আছে?”
—না বাবা বৃষ্টি এখনো নামেনি।
আমি একটু বাইরে বেরিয়েছি বাবা । হোস্টেলে গিয়ে ফোন করব তোমাকে।
ঈরা পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
একটা পুরনো দিনের সাহেবি প্যাটার্নের নির্জন বাংলোয় একজন অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে কেন চলে এলো ঈরা ?
বড় সোফা। পাশে কাঠের ফুলদানিতে শুকনো ফুলের স্টিক।
বসো এখানে। কালচে কাঠের বড়ো বড়ো দুটো
বইয়ের আলমারিতে বহু বই রাখা।
একমাত্র এই বইগুলোই আশ্বস্ত করল ঈরাকে , বইপড়া মানুষেরা ভালো হয় । ভয় নেই এখানে।
পছন্দের একজন মানুষের গা ঘেঁষে বসতে পারার নির্দোষ লোভ আছে শুধু , মিথ্যে কথা বলা তো এর চেয়েও বড়ো পাপ তাই না?
#বাংলাউপন্যাস
#নভেল
#SerialNovel
#BengaliNovel
#ModernBengaliNovel
#মনস্তাত্ত্বিকউপন্যাস
#PsychologicalNovel
#অসমপ্রেম
#নিষিদ্ধভালোবাসা
#MathAndLove
#CryptographyStory
#চিরশ্রীদেবনাথ
#ChirasreeDebnath

0 মন্তব্য(গুলি):