সংখ্যার শরীরে মৌমাছি পর্ব নয়

৩:২২ PM চিরশ্রী দেবনাথ 0 Comments

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 


পর্ব নয়


গান ভালোবাসো ? স্লো মিউজিক চালালেন তিনি।

ঈরার এখন মনে হচ্ছে সে কেন এসেছে এই নির্জন বাংলোয় অচেনা একজন পুরুষের সঙ্গে।

আরষ্ট হয়ে বসে আছে। কিছু বলার নেই। আগে মনে হয়েছিল খুব ভালো লাগবে । উন্মুখ কোন মুহূর্ত তার জন্য অপেক্ষা করছে। 

স্যার আপনার মিসেস আর ছেলেমেয়ে?

আমি কখন থেকে অপেক্ষা করছি হোয়েন ই্যয়ু আস্কড দ্য কোয়েশ্চন। ফাইনেলি জিজ্ঞেস করলে তুমি, যা থেকে বুঝলাম তুমিও গড়পড়তা বাঙালি মেয়ের মতো , যার মধ্যে কোন অ্যাডভেঞ্চার নেই।

করো । ভালো করে পি এইচ ডি করো। মা বাবার গুড গার্ল মেয়ে ।

কি অ্যাডভেঞ্চার?  

তুমি কি কিছুই বোঝ না ঈরা  ?  কেন এলে এখানে?  তবে স্যান্ডুইচ ইজ গুড। খেতে পারো।

জল খাও। চাইলে হালকা ড্রিংকও নিতে পারো। আমি নেবো একটা।

ঈরা উঠে গিয়ে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালো, পাহাড়গুলোর ওপর জনবসতি রয়েছে।  জায়গাটায় কেন জানি  এখনো কুয়াশা জাঁকিয়ে পড়েনি, এই পর্বতশ্রেণি গ্রেটার হিমালয় পর্বতমালারই অংশ। বাড়িঘরগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। পাইনগাছগুলোর মাথায় মাথায় সূর্যাস্তের প্রস্তুতি।  গোধূলির হালকা হালকা আলো লেগে আছে। চারদিক অপূর্ব সুন্দর।

ঈরা যে এই মানুষটাকে কিছু না ভেবে ভালোবেসে ফেলল,  ভালোবাসা তো কিছু না ভেবেই হয়,   এখন কি তার একটি ব্যক্তিগত সেতার হবে যা  শুধু ব্যথার সুর বাজাবে । 

কেয়ারটেকার ট্রেতে করে কিছু একটা নিয়ে এসেছে,  ঈরা পেছন ফিরে তাকালো না,  খুব সম্ভবত ড্রিংক ।

 নিজেকে অদ্ভুত লাগছে , একজন আদর্শ শিক্ষক পরিবারের মেয়ে হয়ে সে এরকম ভুলভাল প্রেমে কেন পড়ল ? শিক্ষককে তো শ্রদ্ধা করতে হয় ,  এটাই ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছে সে। অবশ্য স্যার তো জানেন না যে ঈরা ওনাকে অন্যচোখে দেখে , ভাগ্যিস মনের ভেতরটা কেউ দেখতে পায় না।

কি দেখছ?  কী সুন্দর না এই সন্ধ্যার সময়টা,  আস্তে করে আমাদের জীবন থেকে একটি দিন চলে যায়,  আর ফিরে আসে না,  তুমি এতো চুপচাপ কেন ঈরা ? ভয় পাচ্ছো আমাকে?

না,  না স্যার ভয় পাবো কেনো?  খুব ভালো লাগছে ।

তোমার একটুও ভালো লাগছে না,  আমি জানি।

তোমাকে দুটো প্রশ্ন করি,  শুধু সত্য কথাটাই বলবে ।


করুন। 


তুমি  আমাকে ভালোবাসো ? যদি ভালোবাসো তবে কেন? উত্তর দিতে হবে।

ঈরা থমকে গেলো। এভাবে ধরা পরে যাবে এটা সে আগে ভাবেনি ।

দাও উত্তর দাও এবার। মৌনতা আমি পছন্দ করি না।

তিনি দুহাত দিয়ে ঈরাকে নিজের দিকে ফেরালেন।

ঈরার সামনে এখন বছর চুয়াল্লিশ পঁয়তাল্লিশের একজন ঝকঝকে মেধাবী দীর্ঘকায় তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। তাকে ভালো না বাসলে ঈরার মতো মেয়ে আর কাকে ভালোবাসবে  ?

চোখ বন্ধ করে অস্ফুট স্বরে ঈরা বলে ফেলল ,

হ্যাঁ বাসি ।খুব ভালোবাসি ।

তাই?

বহুদিন আগে আমি যখন তোমার মতো বয়সী ছিলাম,  আরো একটি মেয়ে এই কথা বলেছিল আমাকে। তারপর … সেই মেয়েটাকে আমি আজো হারাতে পারিনি, কিন্তু ভালোবাসা হারিয়ে

গেছে। 

আচ্ছা পি এইচ ডির সুবিধার জন্য ভালোবাসো নাতো?

না স্যার,  আমি এমনি ভালোবাসি । শুধু ভালোবাসি , আমাকে কিছু দিতে হবে না।

তাহলে কেমন করে হলো?  ভালোবাসা মানে দেওয়া আর নেওয়া। শুষ্ক নদীতে যদি জলই না এনে দিতে পারলে তবে ভালোবাসব কেন তোমাকে?

আসলে জানো ঈরা , আমি খুব সেলফিস আমার প্রফেসনে। নিজের চেয়ে মেধাবী কাউকে আমি সহ্য করতে পারি না।

বহুকাল আগের সেই মেয়েটিও কি আপনার চেয়ে মেধাবী ছিল?

এই মেয়ে , তুমি প্রশ্ন করলেই আমি উত্তর দেবো নাকি?  হু ? 

চলো তোমাকে বাংলোটা দেখাই। মাঝে মাঝে আসবে তো? কথা বলব । রাজি তো? 

কিন্তু স্যার!

যা ভেবেছিলাম , আসলে তুমি ভালোবাসা কি জানো না। সময় দিতে হয়,  একজন আর একজনকে সময় দিয়ে কিছুক্ষণ হাত ধরে বসতে হয়। ভালোবাসা শুরু হওয়া মানে কাছে আসা। আমার ইমোশন খুব তীব্র। লঘু আবেগ  পছন্দ নয়। আর তার চাইতেও অপছন্দ করি ন্যাকামি।

তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম,  তুমি হ্যাঁ বলেছো । না বললেই তো ল্যাঠা চুকে যেতো তোমার। হোক মিথ্যে , আমি কিছু বলতাম না। কিন্তু তুমি হ্যাঁ বলেছো ,তার মানে শুরু,  এগিয়ে যাওয়া কোন একটা পথে। 

চলুন বাংলোটা দেখি।

কথা ঘোরাচ্ছো। তোমার মতো বুদ্ধিমতী মেয়েদের এইজন্য আমি পছন্দ করিনা। তোমরা দাবার ছকের মতো ভাবো । এই অঞ্চলের 

পাহাড়ি মেয়েদের দেখেছো?  উৎসবের রাতে তারা উদ্দাম মানবমানবী। পরের দিন সকালে কেউ এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করে না।

তোমাদের মধ্যে এতো দ্বিধা কেন। একদিনের জন্য হলেও তো আলাদা কোন সত্তা হতে পারো!


সেটা তো ভোগ হলো তাই না?


তাই বুঝি ?


হ্যাঁ, এতো দ্রুত কি সব হয়?


 কি হয়?  কি হয় বলো ঈরা , বলো ঈরা ! 

আমাকে কি তুমি এইমাত্র ভলোবাসলে ? 

অনেকটা দিন ধরে তোমার মনের মধ্যে এটা চলছিল,   আজ সুন্দর একটা মুহূর্তে বের হলো,  তাহলে কম্প্লিট প্রসেসটা তো  ছোট নয়?

ঈরার মনে হলো সে এখন একটা খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে, না বলার শক্তি নেই,  হ্যাঁ বলার সাহস নেই। আজকের দিনটা তাকে একটা

অনাবিষ্কৃত ওয়েবলেংথে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।


চলো ঈরা , তোমাকে ক্যাম্পাসে নিয়ে যাই। এখন না রওনা দিলে রাত হয়ে যাবে। আমি চাইনা আমার সঙ্গে তোমার নাম জড়িয়ে কিছু একটা প্রচার হোক। আমি তোমাকে বাজারে নামিয়ে দেবো। তুমি সেখান থেকে হেঁটে চলে যাবে।

অন্য কোন সময় আমরা আবার আসব এখানে।

আসবে তো তুমি? 


হ্যাঁ।


তিনি হাসলেন। দেখা যাক। 


বাংলোর সীমানা ছাড়িয়ে গাড়ি অনেক দূরে চলে এসেছে। রাস্তা নির্জন। পাহাড়ি বাঁকগুলোকে লক্ষ্য রেখে খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে মিঃ অনিকেত মুখার্জিকে । এখন দূর থেকে নিচের পাহাড়ে বাজারের দোকানপাটের আলো দেখা যাচ্ছে। আর অনেকগুলো ফ্লাড লাইটের আলোয় যেন ঝলমল করছে  EIMS এর ক্যাম্পাস।


 তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরি ?

চমকে উঠল ঈরা ।

হঠাৎই গাড়ি ব্রেক কষল।

 

ঈরা কিছু বলার সুযোগ পেল না । তিনি জড়িয়ে ধরলেন ঈরাকে । অজস্র চুম্বনে ঈরা যেন হারিয়ে গেলো মুহূর্তে । একসময় দুটো পেলব হাত আস্তে করে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিলো অনিকেতকে। একটি নরম কবুতরের মতো ঈরা দুটো শক্ত বাহুতে নিজেকে সমর্পন করে দিলো।

প্রবল আশ্লেষে ঈরার বুকে নাভিতে চুমু খেতে লাগলেন তিনি। কতক্ষণ এভাবে কেটেছে জানে না ঈরা । চরাচর কি এইসময় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোন গাড়ি আসেনি এই পথে  কিংবা দু একজন পথচারী ?

আধঘন্টা , পৌনে এক ঘন্টা ,  এটা কি কোনও সৌরঝড়? 

ঈরার উন্মুক্ত স্তনাগ্রে মাথা রেখে একসময় অনিকেত মৃদুকন্ঠে  বললেন তোমার মেধার মতোই তুমি সুন্দর , আমাকে এরপর থেকে কি তুমি শুধুই ঘৃণা করবে ঈরা ?


হোস্টেলে নিজের রুমে এসে ঈরা দেখল কুহু রুম সিফ্ট করে নিয়েছে। ওর দুটো সুটকেস আর বইপত্রগুলো নেই। মেট্রনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল ঈরা । কুহু জয়ীর রুমে সিফ্ট হয়েছে,  জয়ী প্রথম থেকেই একা থাকত। আপাতত সে কুহুর সঙ্গে রুম শেয়ার করতে রাজি।

ঈরা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল । কাউকে সঙ্গে নিয়ে থাকতে তার দমবন্ধ হয়ে আসছিল আজকাল।

দরজা লক করে বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল সে। আজকের দিনটি তাকে ঈশ্বর দিয়েছেন । এরপর আর কিছু চাওয়ার নেই। একটিমাত্র স্পর্শ লেগে থাক এই দেহ চরাচরে।

পৃথিবীর কাউকে সে বলবে না কিছু , অচেনা পথের বাঁকে নির্জন পাহাড় জানে শুধু কিছু উন্মত্ততা , আর পাহাড় তো চিরকালই মৌন ।





0 মন্তব্য(গুলি):