কীর্ণকাল ---সহিতসৃষ্টির প্রবহমানতা

৬:০৮ PM চিরশ্রী দেবনাথ 0 Comments



‘কীর্ণকাল’ –সহিতসৃষ্টির প্রবহমানতা 


চিরশ্রী দেবনাথ


পৃথিবী এখন কবিতার জন্য থমকে আছে। এসময় কবিতার। স্বাগত এই ক্রান্তিকাল, স্বাগত  কবিতা বসন্ত,আজ যে কবি আর লিখবেন না বলে শূন্যচোখে তাকিয়ে আছেন, তার সামনে দুরন্ত সময় প্রেমিকার মতো বসে আছে। বাহুডোরে বাঁধো তাকে, বিলীন হয়ে যাক সকল অপারগতা।  কবিতা কখনও স্লোগান, কখনও সোজাসাপটা বিবৃতি, কেউ বলবেন কবিতা কেন চিৎকার হবে , সে তো ছায়াচ্ছন্ন আত্মপরিক্রমা যা একসময় মহাকালের সঙ্গে লীন হয়ে যায়, আবার

কখনও মনে হয়, পৃথিবীর সকল দেশের কবি যেন একটি কবিতাকেই দীর্ঘ করছেন, তবে কি  ফুরিয়েছে কবিতাবোধ, তখনই হৃদয়ের আর্তি বলে দেয় থামলে চলবে না, খারাপ হোক, ভালো হোক রুদ্ধ সময়ের বাহক হতে, ঘাতক হতে কবিতার কাছেই নতজানু হতে হবে বার বার। " কীর্ণকাল " এই কবিতাবসন্তের একটি সবুজপত্র, সূর্যাক্ষরে লেখা তার প্রতিটি নিঃশ্বাস। 


এরকমই একটি ইচ্ছে নিয়ে  আমরা চার বন্ধু 

 মৌলিক মজুমদার, রাহুল সিনহা, চিত্তরঞ্জন দেবনাথ এবং আমি  একটি 

সাহিত্যপত্রিকা  কীর্ণকাল প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেই ।  

চিত্তরঞ্জন দেবনাথ পত্রিকাটির সহ সম্পাদক।

মৌলিক মজুমদার এবং রাহুল সিনহা মুখ্য উপদেষ্টা। আমি সম্পাদকের দায়িত্বে। লেখা চারজনে মিলেই সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। কারো সময় কম থাকলে সে করে না।

পত্রিকাটির ব্যয়ভার আমরা চারজন মিলে সমানভাবে শেয়ার করি। একটি সংখ্যা ছাড়া প্রতিটি সংখ্যাই মুদ্রিত হয়েছে ধর্মনগরের জয়শ্রী অফসেটে। হরিহরদা শুধু এই প্রিন্টিং প্রেসটির মালিকই নন তিনি লিটল ম্যাগাজিনের একজন একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। যতদূর পারা যায় কম টাকায় তিনি লিটল ম্যাগাজিন ছাপানোয় সাহায্য করেন।

এই বিষয়ে একটি ছোট্ট মজার কথা রয়েছে,  আমিও অপটু অনভিজ্ঞ সম্পাদিকা, প্রুফ রিডিং এর পরও প্রচুর ভুল থেকে যায়।  প্রথমবার পত্রিকা ছাপা হবার পর দেখা গেলো কোন মূল্যই ধার্য করা হয়নি পত্রিকাটির। তারপর কিছু কপিতে মূল্য কুড়িটাকা হাতে লিখে দেওয়া হলো। একমাত্র প্রথম সংখ্যাটিরই হার্ড কভার করা হয়। বাকি সংখ্যাগুলো আর হার্ড কভার হয়নি।

কীর্ণকালের একটি সংখ্যার প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন কবি ও চিত্রশিল্পী বাপ্পা চক্রবর্তী।

যাইহোক, কীর্ণকালের হোয়াটস এপ গ্রুপে আমাদের চারজনের অনেক তর্ক বিতর্কের পর অবশেষে, পনের ফেব্রুয়ারি, দুইহাজার সতেরো, সন্ধ্যা ছয়টায়, আগরতলা বইমেলায়, লিটিল ম্যাগাজিন স্টলে, "কীর্ণকাল "প্রথম বর্ষ, প্রথমসংখ্যার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হয় । 

সেদিন সেখানে ত্রিপুরার অনেক লেখকলেখিকাই উপস্থিত থেকে ছোট্ট এই পত্রিকাটির জন্মসময়কে গৌরবান্বিত করে তুলেছিলেন। 

পরবর্তীতে সহ সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দেবনাথের অনুরোধে কীর্ণকালের জন্য একটি লোগো ও নামলিপি  তৈরি করে দেন চিত্রশিল্পী কৃষ্ণধন আচার্য। পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত একেবারেই পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। হঠাৎ এক দুপুরবেলা প্রথমে আমাদের তিনজনের  কনফারেন্স কলে ঠিক হয় পত্রিকা বের হবে।

সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হলো কীর্ণকাল হোয়াটস এপ্ গ্রুপ। চিত্তরঞ্জন সবার ছোট কিন্তু খুব ভালো কবি এবং লেখালেখি বিষয়ে সিরিয়াস, তাকে আমন্ত্রণ করে আমাদের গ্রুপে এড করি,  যে হোয়াটস এপ গ্রুপটি এখনো  আমাদের একে অন্যের লেখা পড়াবার এবং দেশ ,জাতি, সমাজ বিষয়ে নানা মতামত দেবার একটি ভার্চুয়েল খোলা জানলা,  আড্ডার সামান্য প্রাণখোলা বাতাস যা পত্রিকাটি প্রকাশ করার দু তিনমাস আগে থেকে উজ্জীবিত হয় তারপর আবার শীতঘুমে চলে যায়। 

নামকরণ নিয়ে বিস্তর ঝামেলা হলো । যে নামই ঠিক করা হয় দেখা যায় কোন না কোন লিটল ম্যাগের সেই নাম আছে। 

 আমরা প্রথম সম্পাদকীয়তে  লিখি ,

 "কীর্ণকাল " একটি সময়কে তুলে ধরার সাময়িক চেষ্টা। কবিতা একটি অহংকারী অভিমান। সেই অভিমানকে বুকে লালন করে যারা, তারা কীর্ণকালের পথিক। আমরা আমাদের চলার পথে কুড়িয়ে নিতে চাই তাদের কলমের মণিমুক্তোকে। বাংলা কবিতা, সব সময় আধুনিক, নানাভাবে হয়তো বা অজান্তেই হয়ে ওঠে বর্তমান সময়ের মুখ, তাকে গাঢ়ভাবে ছুঁয়ে থাকে অতীত, আর সামনে থাকে একটি উজ্জ্বল বর্তমান। "কীর্ণকাল "এভাবেই যাতে সময়ের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারে, এই  চেষ্টা রইলো। শ্রদ্ধেয় কবি নকুল রায়, আমাদের লিটিল ম্যাগাজিনটির নামকরণ করেছেন।  

কীর্ণকাল পত্রিকাটির ট্যাগ লাইন –”সহিতসৃষ্টির প্রবহমানতা “ এটিও কবি নকুল রায়েরই দেওয়া। 


অভিজ্ঞতায় আস্তে আস্তে সমৃদ্ধ হোক "কীর্ণকাল "। সমস্ত লেখক এবং লেখিকাকে আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ, যারা লিটিল ম্যাগাজিনটির  ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত জেনেও, তাদের মূল্যবান লেখাটি প্রথম সংখ্যার জন্য দিয়েছেন। প্রচ্ছদটি করেছেন শিল্পী মিতালী দেবনাথ। 

প্রথম সংখ্যায় অনেক ত্রুটি রয়ে  গেলো। আগামী সংখ্যায় আশা করবো " কীর্ণকাল " আরো সমৃদ্ধ হবে। একটি ক্ষেত্রে, আমরা এবার ভীষণভাবে আঞ্চলিক রয়ে গেলাম, কারণ, কবি প্রবুদ্ধসুন্দর কর কৃত অনুবাদ কবিতাটি ছাড়া,  প্রথম সংখ্যায় শুধুমাত্র ত্রিপুরার লেখক লেখিকাদের লেখাই থাকছে, পরবর্তীতে "কীর্ণকাল " আপন গতিতে বিস্তৃত হবে।”

তাই বছরে একটি সংখ্যাই প্রকাশিত হবে এরকমই সিদ্ধান্ত নেই ।

তারপর থেকে আটবছরে আটটি সংখ্যা প্রকাশ করে কীর্ণকাল। পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে আমি কাজ করলেও এটা একা আমার পত্রিকা নয়। আমরা চারজনই প্রায় এক বয়সী । মৌলিক মজুমদার আর আমি কৈলাসহরের ,  স্কুল সময়ের বন্ধু । রাহুল সিনহাও আমাদের দুজনের ইয়ারমেট এবং পরবর্কীতে বিবাহসূত্রে সে আমার পারিবারিক ঘনিষ্ঠ জন।  চিত্তরঞ্জন আমাদের চেয়ে দু তিনবছরের ছোট হলেও সমসাময়িক কবিতা লিখিয়ে বলে বন্ধুস্থানীয় ।

আটবছরে আটটি সংখ্যার মধ্যে একটি সংখ্যা কীর্ণকাল প্রকাশ করেছে শুধুমাত্র ত্রিপুরার অনুর্দ্ধ চল্লিশ কবিদের কবিতা নিয়ে।

কবিতার কাগজ হলেও কীর্ণকালের অষ্টম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে ত্রিপুরার গল্পকারদের ছোট গল্প নিয়ে। আমরা প্রথম থেকেই ভীষণভাবে আঞ্চলিক হতে চেয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল শুধুমাত্র ত্রিপুরার লেখকদের লেখা   নিয়েই কীর্ণকাল  প্রকাশিত হবে। তবে নিয়ম যেহেতু নিয়ম ভাঙার জন্যই তৈরি হয়,আমরাও আসাম , পশ্চিমবঙ্গ,  বাংলাদেশ বিভিন্ন জায়গার লেখা নিয়েছি। তবে ধীরে ধীরে দেখলাম খ্যাতিমান কবিদের কাছে যখন নেহাতই শীর্ণ এবং অখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন লেখা চাইত তখন তিনি হয় পূর্বপ্রকাশিত না হয় ওনার লেখা খুব সাধারণ মানের কবিতাটি হয়তো দিতেন। তাই সম্পাদক হিসেবে আমার তখন মনে হতে লাগল আমি বড় লেখকদের লেখা নেব না এবং চেষ্টা করব শুধুমাত্র ত্রিপুরার লেখা নিতে। 

কবিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি অত্যন্ত খুঁতখুঁতে হয়ে উঠতে লাগলাম ।ধীরে ধীরে মনে হতে লাগল এইসব কবিতা প্রকাশ করে কি হবে। কী- ই বা আছে কবিতাগুলোতে।

একজন কবিকে লেখার আমন্ত্রণ পাঠিয়ে কবিতা সংগ্রহ করার পর সেই লেখা পছন্দ হচ্ছে না বলে বার বার লেখা পাল্টে দিতে বলাটা অসম্মানজনক। তারপর তো আর লেখাই পাওয়া যাবে না।

এইরকম পরিস্থিতিতে আমরা চার বন্ধুই এখন মধ্যবয়সে ।এই বয়সে সন্তানদের উঁচু ক্লাসে ওঠাজনিত ব্যস্ততা , বৃদ্ধ মা বাবা ,শ্বশুরশাশুড়ির অসুস্থতা ও মৃত্যু  সব মিলিয়ে 

আমরা পত্রিকাটি দু বছর ধরে বের করতে পারছি না।

তাছাড়াও আমার বড় ভয় , কবিতা চাইব কবির কাছে। তারপর সেই কবিতা পছন্দ হলো না তখন কি করব। এখন নানা দোলাচালে আছি। তবে কীর্ণকাল নিশ্চয়ই আবার প্রকাশিত হবে । ভালো লেখার সন্ধানে কীর্ণকাল ত্রিপুরার প্রকৃত কবিতার মুখ হয়ে উঠতে চায়। তাই ঘন ঘন সংখ্যা নয়,খুব কম সংখ্যাই হোক, কিন্তু তাতে যেন কবিতা থাকে। লিটল ম্যাগাজিনের অহংকারটুকুই তার অস্তিত্বের কারিগর। এতোটুকু আত্মমর্যাদা তো রাখতেই হয়। আমরা আজপর্যন্ত একটিও লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে পারিনি নিজেদের পারিবারিক নানা অসুবিধেয় এবং অনীহা ও  আলস্যের কারণে। তবুও সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনেই আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়,  এজন্য আয়োজক কমিটিদের প্রতি  অসীম  কৃতজ্ঞতা । 


কীর্ণকালের ষষ্ঠ সংখ্যাটি নিয়ে কয়েকটি কথা বলি ।এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ত্রিপুরার চল্লিশ বছর বয়সের নিচের কবিদের কবিতা নিয়ে।  সংখ্যাটির প্রচ্ছদ করে দেন ত্রিপুরার উজ্জ্বলতম তরুণী কবি আম্রপালী দে। তীক্ষ্ণ কবিতা লেখার পাশাপাশি কবি আম্রপালী দে একজন দক্ষ প্রচ্ছদশিল্পী, যার আঁকায় প্রচ্ছদ হয়ে ওঠে বাঙ্ময় । 

এই সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, 

“কবিতা লেখা খুব কঠিন। আবার খুব ঘেমে নেয়ে লেখার জিনিসও নয় বটে। তবে অনেকেই খুব সহজে কবি হওয়ার জন্য আসেন, তারপরেই দেখা যায় আত্মপ্রবঞ্চনার গোলকধাঁধা। কবি কখনো হওয়া যায় না, কবিতা লেখার প্রত্যাশাকে জিইয়ে রেখে যিনি বেঁচে থাকেন তিনিই কবি। একজন তরুণ যখন হাতে তুলে নেন কবিতার পাণ্ডুলিপি, তিনি অবধারিত ভুল সুরে বাজাবেন, সবাই যে পথ চিনে ফেলেছে, পথের ধারে ধারে প্রতিটি সরাইখানা, জঙ্গল, গণিকালয়, পানশালা সবকিছুর নাম যে পথে বিস্তৃত হয়ে বিস্মৃত হয়ে আছে রাতের অন্ধকারে, তরুণ কবিকে প্রথমেই সেই পথের বাইরে অন্য একটি নির্জন পথ খুঁজে নিতে হবে।

কবিতার মতো নান্দনিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আমি ভাবব, তাই আমাকে হতে হবে সুস্থ, শুদ্ধ, আমার মধ্যে পাগলামো থাকলেও আমার লেখা যেন পাগলামো না হয়, শেষপর্যন্ত অস্থির সংলাপ শুধু ব্যর্থ চিৎকার করেই নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলে।  কোন কথাস্বরের কথা বলছি, সময়কে চিহ্নিত করার স্বর?

কবিতার প্রতিটি লাইনই কোন না কোন সময়কে চিহ্নিত করে, কবিকে বোধহয় খুব সচেতন হয়ে সময়ের চিহ্নক না হলেও হয়, যে দুর্বিষহ বিষ, দুঃসহ অনুভূতি মিলে আছে জীবনযাপনে, তাকে আলাদা করে তুলে আনতে হলে বড় মেকি হয়ে যায়, তরুণ কবির প্রথম উত্তরীয়  দীর্ঘ ঘাসের মতো , গরিবখানায় হঠাৎ বেড়াতে আসা

সুলতানের মতো প্রখর রাজনৈতিক, সেই মুহূর্তে তাকে ভুলে যেতে হবে কবিতার কণ্ঠ সর্বদাই  ধাপে ধাপে আসা ডিপ্রেশনের মাইলস্টোনগুলোকে পেরিয়ে যেতে হবে, যেভাবেই হোক।

প্রথম কাব্যগ্রন্থের মতো শ্রেষ্ঠ উপহার আর কিছু হয় না, এই শামুক, পিঁপড়ে, আর ডাহুকের জীবনকে সে কোন ভঙ্গিমায় লিখেছে, সেই মেধাকে ঈর্ষা করবো  বলেই তো দিনের পর দিন কবিতার জন্য বেঁচে থাকা…”

আলোচ্য সংখ্যাটিতে ত্রিপুরার এই সময়ের তরুণ কবি ও  গবেষক অভিজিৎ চক্রবর্তী শূন্য দশকে ত্রিপুরার বাংলা কবিতা নিয়ে একটি সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন যা একটি অমূল্য সম্পদ  হয়ে রইল কীর্ণকাল এবং আবহমান বাংলা কবিতার ইতিহাসের জন্য । 




আপাতত ছোট গল্প নিয়ে প্রকাশিত অষ্টম সংখ্যাই কীর্ণকালের সর্বশেষ সংখ্যা। সেখানেও আমাদের বক্তব্য ছিল, 

“গল্প না গদ্য? যুক্তিতর্ককেই কি আমরা এখন গল্প বলে চালিয়ে দিচ্ছি না গল্প হারিয়েছে তার পুরোনো বিন্যাস?

শ্লথ হয়ে নেমে আসা তারপর চৌম্বকীয়  আকর্ষণে  গল্পের মধ্যে পাঠককে ঢুকিয়ে দেওয়া।

তবে যদি হয় একটি কথোপকথন? হয়তো বা ভেতর থেকে আসল গল্পটি সামান্য উঁকি  দিয়েই চলে গেল।

সাধারণ পাঠকরা নাকি এখন ধৈর্যহীন। তবে এখন কি গল্প আমরা অর্ধেক পাঠকের জন্য লিখব? যার কাছে বৃহত্তর পাঠপ্রবাহের কোনো মূল্য নেই সে চায় খুব ছোট একটি পরিসরের টুকরো টুকরো বিন্দুর মতো কিছু একটা অথবা সেই বিন্দুর—

মধ্যেই রয়ে গেছে বৃহত্তর পটভূমিকা যার জন্য কেবল ইঙ্গিতই যথেষ্ট?

আসলে এই সময়ের পাঠক ঠিক কি ধরনের গল্প ভালোবাসেন? পাঠকের উপযোগী করে গল্প লিখবেন না সময়ের কথা না ভেবে নিজেদের মতো করে লিখবেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লেখক নিজেকে ভাববেন, ভাষা বদলাবে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে, ঘটনা বদলাবে, একজন লেখক হতে গেলে এভাবেই নিজেকে তৈরি করার চেষ্টা তিনি করে থাকেন। কোথাও ভাবের ঋণ শোধ করতে গিয়েও পড়তে পারেন। কিন্তু হৃদয়ে একবার নতুন বীজ বুনে দিতে পারলে সেটাই আবার গল্প হয়ে ফিরে আসবে। সাহিত্যে তো শেষ পর্যন্ত মানুষের বুকের কথাই বলে তাই না?

এই সংখ্যায় যে সমস্ত লেখকরা আমাদের গল্প দিয়েছিলেন তারা হলেন 

 মিলনকান্তি দত্ত, অভিজিৎ চক্রবর্তী ,পারিজাত দত্ত,সুমন পাটারী, অনিন্দিতা চক্রবর্তী,শুভদীপ দেব, মুনমুন দেব ,সন্তোষ রায়, অর্পিতা আচার্য, নন্দিতা দত্ত,দেবাশ্রিতা  চৌধুরী,সুমিতা দেবনাথ,মৌলিক মজুমদার

এবং সম্পাদক নিজে।

কীর্ণকাল সবসময় নিজের উদ্দেশ্য ও বক্তব্য নিয়ে স্পষ্ট থেকেছে। সম্পাদকীয়তে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে কীর্ণকালের দৃশ্যমান,  অনুভবময় অবয়বকে,

“​কবিতা একটি স্বতন্ত্র সত্তা, জন্মমাত্রই সে স্বাধীন। কবিতা খুব বিরক্ত হয়, যখন তাকে নিয়ে পাতার পর পাতা গদ্য লেখা হয়। কবিতাকে ভেঙে গদ্য তৈরি করার নাম হলো গণতান্ত্রিক অসহায়তা বা নির্জন ব্যালটবাক্সে সাপের খোলস ঢুকিয়ে দেওয়া। কবিদের অভিমান হয়, যখন কারো কবিতা নিয়ে আলোচনা হয় না, তার কবিতার কোনো লাইন নিয়ে কেউ যখন নানাদিক তুলে লাইনটির বহুমুখিতাকে আরো ব্যাপ্ত করেন না। খোলাপাতায় ছড়িয়ে থাকা সেইসব শ্বাস প্রশ্বাস তো আসলে অর্ধেক রাত্রির পর জেগে ওঠা নির্ঘুম কামনার পদছাপ। কামনাকে কে কবে সাদা আলোর মতো স্পষ্ট করে দেখতে পেয়েছে।

​দু একটি  সংখ্যায় কবিতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও এই সংখ্যায় কবিতা নিয়ে কোনো আলোচনা থাকছে  না। ভালো লাগছে না কবিতাকে কেটেকুটে প্লেটে সাজিয়ে কাঁটা চামচ দিয়ে খেতে। মনে হচ্ছে তাকে শুধু পান করি মাটির ভাঁড়ে, পোড়া দেহের আগ্নেয় যন্ত্রণাসহ।

​আমরা যারা কবিতা লিখছি বা গল্প, উপন্যাস যাই লিখছি সবাই আবহমান বাংলা সাহিত্যের ধারক ও বাহক, কিন্তু কয়েক বছর বাংলা লেখালেখির ভুবনকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, প্রথম ভুবন, দ্বিতীয় ভুবন এবং তৃতীয় ভুবন হিসেবে এবং এই ধারণাটি শুরু হয়েছে আসামের সাহিত্যজগৎ থেকে। এমনকি তৃতীয়ভুবনের কবিতা নামে তারা কবিতা সংকলনও প্রকাশ করছেন। আমার মনে হয়, এই শব্দবন্ধটি আর ব্যবহার করা উচিত নয়। বাংলা ভাষা যতরকম ভাবেই বলা হোক না কেন, তা শেষপর্যন্ত বাংলাই। তাই পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে বাংলা ভাষায় লেখা সমস্ত সাহিত্যই বাংলাভাষাকেই প্রতিনিধিত্ব করে, শুধু প্রথম ও শেষ কথা হলো তা যেন সাহিত্য পদবাচ্য হয়, হৃদয়মথিত করা রস যেন থাকে, তাহলে স্থান কাল পাত্রভেদে তা জ্বলজ্বল করে উঠবেই। এটি একটি ব্যক্তিগত মতামত। মনে হলো কথাটি বলা দরকার, তাই বললাম।

​মাঝে মাঝে মনে হয় কবিতাহীন বিশ্ব কীরকম হতে পারে? বেঁচে থাকার জন্য কবিতা দরকার নেই, কিন্তু পুনরায় বেঁচে ওঠার জন্য কবিতার প্রয়োজন হয়, অন্যভাবে, অন্যরূপে, তাই হয়তো অন্ন বস্ত্রের সংস্থান হলেই মানুষ সৃজনের কাছে ফিরে আসে, খুঁজতে থাকে হারিয়ে যাওয়া রূপোর কাঠি অথবা সোনার কাঠি, সেই কাঠিটি দিয়ে সে নিজের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা রাজকন্যা কিংবা রাজকুমারকে জাগিয়ে তোলে, শিশিরে ভেজা যে পথ জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, সেই পথে হাঁটতে শুরু করে, ঝুলিতে থাকে মধুকরের অদৃশ্য মহল। “

‘কীর্ণকাল ‘ আবার প্রকাশ করব এই বিশ্বাসটুকু নিয়ে আজ এখানেই কীর্ণকালের কথা শেষ করি। ছোট্ট একটি সাহিত্যপত্রিকা,  বলা যায় সে এখনো শিশু। তার অনেক পরিচর্যা দরকার তবেই হয়তো একদিন কীর্ণকাল লাভ করবে দৃঢ় সবুজ শিরদাঁড়া।  



 





0 মন্তব্য(গুলি):