অসমাপ্ত অভিধান

অসমাপ্ত অভিধান ( প্রকাশিত "অন্য নিষাদ ")
........©চিরশ্রী দেবনাথ

অামার ভাষা এখন নাগরিক, উঁচু বাড়ির সারি
মধ্যযামে বাতাস আসে গরীবলোক থেকে
খিস্তি, গালি, নেশার আম্রচুড়ে মাতোয়ারা
রাশি রাশি মেঘটাওয়ারে আটকে যায়
অভিধান চ্যুত শব্দ গ্রন্থি, মেছো সুর,
বৃষ্টি নামে তুমুল অজস্র,
ভাসতে থাকে ছেলের দলের দঁড়ি ছেড়া বিকেল,
এতো উঁচু থেকে কিছু বোঝা যায় না অথবা অনেক নীচু থেকেও।

খোলা অভিধান পাতা আসনের মতো, প্রসূতি লগ্ন এখন।
ভীড় হয়ে আছে উত্তর পূর্ব ভারত
কাঁঠালের গন্ধ লাগা অনুন্নত শব্দের মিছিল
তারা শ্লোগান দেয়নি কখনো, করেনি আসন পাকা,
শুধু পরিশীলিত শব্দরাজির কন্ঠ জড়িয়ে আজ তারা সবুজ পলি।
একটি বাংলা অভিধান কোনদিন সম্পূর্ণ হয় না, এ গৌরব নিয়ে বইছে ঊনিশ,
তরুণ ছাত্রটি গবেষণা পত্র জমা দেওয়ার আগে লিখে দেয়,
" সবে শুরু, সবসময় যেন হয় মধ্যরাত,
ছুটে যাক দুরন্ত পাহাড় লাইন, আর
নক্ষত্রের মতো জেগে থাক সমূহ শব্দ "।

গ্রহান্তরে

গ্রহান্তরে
..........

মঙ্গল গ্রহের মানব মানবী
পৃথিবী থেকে নিয়ে যেতে এসেছে ক্ষুধার সুগন্ধি,
ইর্ষার কারুকাজ, প্রেমের নিঃসঙ্গতা, সঙ্গমের দৃশ্যান্তর,
তারা দেখতে এসেছে,
ভরা কোটালের দিন শরীরে কি জেগে ওঠে ফসলের মাঠ
ধূপ জ্বালা করা চোখে কিভাবে ভেসে আসে ঈশ্বরের জল,
পশুর লোম ঝরা আলপথে কি থাকে নারীর আদর
এসবই সাজাতে হবে লালগ্রহের শূন্যতায়
পৃথিবীর খামে খামে আজ সাজানো ইন্দ্রিয় সুখ, তমোগুণ, অস্থির ঋতুর ঝড়ো দিন,
সবকিছু নিতে চায় ভিনগ্রহ
নিঃশর্ত মৈথুনে তারা জন্ম দেবে নিখাদ কালো মানুষের...

(প্রকাশিত "ভাষাসাহিত্য "এপ্রিল দুই হাজার সতেরো)

তিন তালাক

তিন তালাক

............

হঠাৎ যেন গুঁড়ি মেরে সামনে দাঁড়ালো তীব্র হয়ে 

বাদে প্রতিবাদে চলছিল বহু যুগ, পঁচন নিয়ে, ক্লেদ মেখে, ভয়ের ফোয়ারা ছুটিয়ে, পুরুষ সেজে, 

 

 "তিন তালাক "

শুধু সামাজিক নিরাপত্তা, অন্ন, বস্ত্র। 

ভালোবাসা  কোনও কিছু নয় এখানে, কিংবা সংযোগের সেতু! 

মেয়েটি অন্ধকারে ঢাকা, 

জোড় করে নিতে চায়, মিলিত দিনযাপন, ফুলের বিছানা

এ পৃথিবীতে আজও তাকে বেঁচে থাকতে, ভিজে উঠতে, ফল পেতে,

একটি "খালি "সম্পর্কের জন্য, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতে হয়। 

মৃত পাখিরা ...চিরশ্রী দেবনাথ

মৃত পাখিরা
.........©চিরশ্রী দেবনাথ

একটি হিজাব এবং ওড়নার মধ্যে খানিকটা পার্থক্য, ...প্রেমের
হিজাব নিয়ে কোনও গান নেই, চুপ!
ওড়না উড়িয়ে, দোপাট্টা ভিজিয়ে যখন তখন বৃষ্টি ঝরে,
মেঘ জমে ওঠে অকাল ঋতুতে, রামধনু অসময়ের।

এই ছোট্ট শহরের ছোট্টবেলা থেকে আসা দোকানে,
আগে কোনো হিজাব বিক্রি হতো না,এখন প্রচুর!

ঝলমলে হিজাবগুলো সার দিয়ে ঝোলানো, মৃত পাখিদের মতো।

যাদের ভালো লাগে তারা পরুন।

আমার মনে হয়,
তাদের চুলে, গলায়, কাঁধে একটু কি হলকা বাতাস
বয়ে যেতে পারে না, একটি অনাবৃত বনাঞ্চল।
এ পৃথিবীর ধুলোটিও তো, নরম,  তারও একটু
ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে,
বন্দী ঋতুটির বড়ই ছটফটে স্বভাব।

বাংলাদেশ / চিরশ্রী দেবনাথ

বাংলাদেশ (স্বাধীনতা দিবসে, উৎসর্গ )
.....©চিরশ্রী দেবনাথ

দুই ফোঁটা রক্ত বাংলাদেশের
বাসা বেঁধে আছে আমার পঙ্খনীলে
উড়তে পারিনি তবু কোনদিন

আমার মাথায় একটি বালিশ শিমুল তুলোর
দুরন্ত ঝড়ের দিনে যে  তুলো ফুল পথ হারিয়েছিল
তারাই আমাকে কিছু স্বপ্নচূর্ণ এনে দিতে চায় বার বার ঘুমের ছলে

একথা ভীষণ সত্যি
কোনদিন স্বপ্নে তোমাকে দেখি না  আমি  "বাংলাদেশ "
আশ্চর্য সব নদী আছে তোমার
শুকিয়ে গেছে তাদের সানুদেশ, জঙ্ঘা
আমার কোন স্পর্শ নেই সেই জলভরা অতীতে

বৃষ্টির সন্ধ্যায় এই যে আমি চোখ ডুবিয়ে পড়ছি বই
মনে হয় চারপাশে জমে উঠেছে আমার প্রিয় বাবা গন্ধ
একটি দাঙ্গা, যাকে দিয়েছে এক ভুল সাম্প্রদায়িক জীবন
যার ভিড়ে আমার ছোটবেলা ঘুরেছে    
কখনো নেমেছে অন্ধকার
এখন রাস্তা আলো করে হেঁটে যায় আমার  চোখ
মনে হয় আসলে বাবার মনে ছিল এক নির্দোষ মেঘ
কতটা ভুলে গেলে এখনো প্রতিদিন সীমান্তের ওপারেই বাবার বর্ষা নামে অঝোরে

চৌষট্টিতে বাবা মা সে দেশ ছেড়ে এসেছিল
ঊনআশিতে আমি, ততদিনে তাদের শরীরে
জমেছে সীমান্তের এ পারের বাস্তুচিহ্ন, পাথরের অভিঘাত

মাঝে মাঝে শিউরে উঠি তবু শাপলার রক্তক্ষরণে

কারা সে মানুষ, দাদুর রক্ত, ঠাকুমার বহ্নি বেলা?
কতো কতো নদীর বাহুতে প্রবাহিত কবেকার প্রেমের গল্প, পাতানো সই, ঝুরো মাটির বিকেল

শুধু জেনো মনে হয়
কাঁটাতারের বেড়া  পেরিয়ে ফুটছে কোথাও অবেলার পায়েসান্ন

জন্ম দেওয়া ভুলে গেছো বাংলাদেশ?

একটি একটি সন্তান চাই তোমার, বারুদের হৃদয়, মোমের শরীর, তলোয়ারের মতো শাণিত গ্রীবায় পলাশের  স্থলিত পায়ের ছাপ
হেমন্তের শেষবেলায় ঘরে ফেরা কৃষকের চোখে ফুটে ওঠে
যাবতীয় ঋণের যন্ত্রণার সেতার
সেই অনাগত সন্তানের ডহর গলায় ঐ কষ্ট যেন চীৎকার হয়ে ফেটে পড়ে দমকে দমকে
ধুলোমাখা আদিগন্ত চুল ঐ ছেলের
পুড়ছে সেখানে  সীমান্তের বৈধ যতিচিহ্ন
গন্ধে  মাতাল  এ দেশের মেয়ে, বাস্তুসাপ তার বিশ্বস্ত বন্ধু
পাড়ি দেবে জিরো বর্ডার, হৃদয়ে নোনা হেমন্ত
আগুনে ভাঁপে লাল হয়ে গলছে পিঠেপুলির মায়াবী সকাল
মাটির আড়ালে তালশাঁসের অগভীর জলজ প্রাণ
এমন বেঁচে থাকায় শুধু মেয়েরা হেঁটে যেতে পারে
অপেক্ষা প্রেমের, টগবগে এক তরুণের,

কখনো ভুলে যায় সে মেয়ে, যেন হয়ে ওঠে কুমারী মা
কাঁখে ও পিঠে তার  দুই  দেশ
ক্ষুধা নিয়ে জেগে আছে,
আকাশে একই সূর্য, কোনদিন  সূর্যগ্রহন, সন্ত্রাস কালো
কোনদিন গনতান্ত্রিক ...ঘন সবুজ, লালে লাল

আমার দেশ

আমার দেশ
........©চিরশ্রী দেবনাথ

ভারতের বুকে আজ জ্বলছে আলো, রঙীন প্রতিবাদ
এ আর নতুন কি, কি এমন অঙ্গক্ষত, কি এমন রক্তচাপ।

দেশ এই, ভরে ওঠা ধানের ক্ষেত, ইক্ষু সমারোহ
তার পাশে একটি রোগ, ক্রমাগত
স্বাধীনতার আগেও ছিল,  এখনো সে  অক্ষত।

পুড়ছে কৃষক, কন্নড় কিংবা বাঙালী,
নামছে রাত, আত্মঘাতী, এই তো হরিয়ালী।

ধর্ম হলো,
বাঁশির সুর,  পোঁয়াতী গাভী, শিশির ভেজা ঘাসের জমি
সাত সকালে পান্তাবাসি কিংবা রুটি,
কারখানাতে যাব বলে বউয়ের গালে ভোরের  আদর
একপ্রহরের একটু বিশ্বাস, নীরব মন্ত্র, খোলা আজান, নির্বিকার।

তোমার হাতে আছে  কলম কিংবা দামি অস্ত্র
তাই দিয়ে নজর ঘোরাও... থাক সবাই ব্যস্ত

একটুখানি লেলিয়ে দাও, লাগুক দাঙ্গা, পুড়ুক ঘরবাড়ি
নাহয় মুখ ঢাকলে নারী, হাতের শঙ্খে এ কোন সুনামী?

মুছলো খানিক মেহেন্দী রঙ, হাত ছাড়লো হাতের ছোঁয়া,
খানিক আগেই ছিল বসন্ত, দেশ আমার এমনি বোকা।

আস্তে আস্তে,  দেশটি আমার, যাচ্ছে নাকি সেইদিকে,
নাম তার কর্পোরেট, বিলের পর বিল সংসদে।

একটি ব্যবসা নিজের আমার,
হয়তো তোমার একটু ক্ষেত সোনার মতো,
বিশ্বায়ন নিচ্ছে তুলে ছোঁ মেরে,
এই সেই বাজপাখী, চোখ পেতেছে থার্ড ওয়ার্ল্ডে।

আমরা জানি তুচ্ছ বিষয়,
হর হর মহাদেও, আল্লাহ আকবর
উৎস পেলেই চলকে উঠি,  মার মার, কাট কাট,
সে ছিল বন্ধু আমার।

নিভে আসে সন্ধ্যা, ছেলেমেয়ের পড়া, গানের রেওয়াজ
আসছে ধেয়ে কালো মশাল, রাস্তা গলি শুনশান।

কাপের লাল চা, খেলছে এখন  রক্তহোলি,
মৃত শাবকের পাখায় ঢাকা , এ কোন অচেনা  গোধূলি।

এখন একটিই রাজনীতি...প্রতিরক্ষা এবং উদারনীতি,
আমিও তাই বিশ্বাস করি, শ্লোগানের গলায় ঢালছি জল।
 
জোনাক ভেজা মাঠগুলোতে নামছে পণ্য হাজার হাজার,
মেধার স্রোত,  নীল আন্টলান্টিক, আসছি মা,  মাত্র  কয়েকদিন।

দেয়াল জোড়া চোরা  ঘুলঘুলি,  সাজানো সংঘাত, দেশনেতা একটু কান্না শেখো, প্রতিবাদে দিও না হাত।

একুশে ফেব্রুয়ারি

একুশে ফেব্রুয়ারি 

*******চিরশ্রী দেবনাথ

ভাষার কাছে আসি উপযাচকের মতো, 

ভালোবাসার কাছে যেমন মানুষ যায়। 

ভাষা সেই রুদ্র রোদ, কাল বৈশাখী, ঘাসফড়িঙের শখ,

আকাশের নক্ষত্র নিভে যাওয়া ভোরের মতো অভিমান

তার কাছে আমার অঙ্গ, অঙ্ক, রোমের শিহরণ সূক্ষ্মতায় বাঁধা

এই শহরসময়েও পাখিরা ঘরে ফেরে রোজ,

ঝাঁকবাঁধা মনোমালিন্যের মতো। 

কোটরে ঝমঝম করে অগরু গন্ধ অমলিন, 

পাখির ভাষায় শষ্যের আদানপ্রদান, চঞ্চুতে মায়াবী সন্ধ্যা

নিবিড় পাহাড়ি গ্রামে অস্পষ্ট লন্ঠনে তখন জ্বলে ওঠে

শিশুর প্রথম পাঠ, সাতটি তারার কোলাহল

থাকো তুমি ভিনদেশী ভাষা জঠরের উদ্বাস্তু যাপনে 

 ক্ষিদে পেলে, আকন্ঠ শিশির জমে ওঠে গলায়

 প্রান্তরে  আমার ভাষায়, সোনালী ভাত,  লাল সূর্য

ঢেকে দিয়ে যায় আমাকে, ক্ষুধায়, প্রেমে, আদরে, অক্ষরের অভিমানে ।