ঊনকোটি সামার ক্যাম্প

চিরশ্রী দেবনাথ 

ঊনকোটি সামার ক্যাম্প  

ঊনকোটি সামার ক্যাম্পে, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে  অজস্র  ঘর থেকে মনোরম আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে, এই আলো গুলো কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে দেখা যায়, কিন্ত তবুও তীব্র নয়, চোখে ব্যাথা দেয় না। পুরো সামার ক্যাম্পের দায়িত্বে রয়েছেন, মিঃ মৌণপতি, চারহাজার একের প্রতিভাশালী বৈজ্ঞানিক। সামার ক্যাম্পের চারধারে বন জঙ্গল, পশু পাখি, সবার যথেচ্ছ বিচরণ। ঊনকোটি পর্বতগুচ্ছের নীচে দুরন্ত সমুদ্র, দ্য বে অব গ্রীন, সমুদ্রের জল এখানে সবুজাভ, প্রতিটি ঢেউ সবুজ জল নিয়ে ছুটে আসে। মাঝখানে ভেসে  রয়েছে অসংখ্য দ্বীপ। দ্বীপ গুলোতে বিভিন্ন রকম ফসলের চাষ হয়। যে মাটি যার উপযুক্ত। বহু আগে মানুষ ধান, গম, বাজরা, ভুট্টা, বিভিন্ন তৈলবীজ এসব ফসলের চাষ করতো। এখন বদলে গেছে খাদ্যশস্যের প্রকৃতি, স্বাদ, রঙ্, গন্ধ, গুণাগুণ। 

আসলে "সৃষ্টি 2"নামক ভয়াবহ গ্রহাণুটি যখন পৃথিবীতে আঘাত হানলো, ধ্বংস হয়ে গেলো, পৃথিবীর এক বিরাট অংশ। বদলে গেল ভূপ্রকৃতি, আবহাওয়া। গ্রহাণুটি যেসময় পৃথিবীর বুকে আঘাত হেনেছিল, তখন পৃথিবীতে চলছিল পঞ্চম পরমানু যুদ্ধ। পৃথিবী এমনিতেই সেসময় ক্ষতবিক্ষত। মানুষ ধুঁকছিল তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকারক প্রভাবে। বিকলাঙ্গ শিশুতে ভর্তি পৃথিবী  যেন অসংখ্য  প্রেতাত্মার বিচরণভূমি। জলে, হাওয়া শস্যক্ষেত্র সব  বিষাক্ত । ঠিক সেই সময় এই গ্রহাণুটি আছড়ে পড়ে পৃথিবীর ওপর। মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ তলিয়ে যায় কালের গর্ভে, যেখানে ছিল জনপদ, সেখানে হয়ে যায় সমুদ্র, সমুদ্র জেগে ওঠে পাহাড় হয়ে, নদী, গিরিখাত,  উপত্যকা সবকিছু বদলে যায়। মৃত আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠে, লাভায় ঢেকে যেতে থাকে শহরের পর শহর।  কিছু কিছু জায়গা চরম ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়। সমস্ত পৃথিবীতে সব মিলিয়ে বেঁচে থাকে এক মিলিয়নের মতো মানুষ আর পশুপাখি,  বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বনজঙ্গল। কিন্তু পৃথিবী টিকে যায় ভালোভাবে। এই গ্রহাণুটির মধ্যে এমনসব মহাজাগতিক রাসায়নিক পদার্থ ছিল, যা পরিবেশের সঙ্গে মিশে পৃথিবীর আবহাওয়াকে পরিশুদ্ধ করতে থাকে। মানুষ নিজেদের ভুলগুলো বুঝতে পারে।  পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষেরা  পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বেঁচে যাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদ, নদী, পশুপাখির প্রতি তারা অসীম যত্নশীল হয়ে ওঠে। শুরু হয় বিজ্ঞানের সেই সাধনা যা শুধুমাত্র মানুষের কল্যানে ব্যবহার করা হবে। ঠিক করা হলো যেকোন প্রকার  উদ্ভিদ ও পশুপাখিকে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে যদি কিছু ব্যবহার করতে হয় প্রকৃতি থেকে, তবে আগে আবার তা পুনর্গঠন করতে হবে।

সেই বিপুল প্রলয়ের বহুবছর পর আজকের এই স্বপ্নের পৃথিবী। পৃথিবীতে ধীরে ধীরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জনসংখ্যা ভীষণ নিয়ন্ত্রিত। প্রতিটি মানুষ ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত যত্নের সাথে বড়ো হয়। বড়ো হতে হতে তাকে নিজস্ব চিন্তার বিকাশের জন্য স্বাধীনতা দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে তার  চিন্তার জগৎ গড়ে ওঠে, সে কাজ করার জন্য একটি বিশেষ ক্ষেত্র বেছে নেয়, এবং এইভাবে পৃথিবীকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শারীরিক বা মানসিক শ্রম দান করে। কিন্তু মানুষের যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি লোভ, মোহ, হিংসা এগুলো মানুষের মধ্যে থেকে কোনভাবেই দূর করা যাচ্ছিল না, এই জিনিস গুলো মানুষের মন থেকে না সরালে ভবিষ্যৎ পৃথিবী আবার বহু যুগ আগের পৃথিবীর মতোই বিষাক্ত হয়ে উঠবে। তাই এখন সারা পৃথিবী জুড়ে বিজ্ঞানীরা এই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন।

মিঃ মৌণপতি এরকম একটি মিশনেরই হেড। তার আন্ডারে সারা পৃথিবীতে চল্লিশজন তরুন বিজ্ঞানী এ নিয়ে কাজ করছে। তিনি থাকেন ঊনকোটি সামার ক্যাম্পে। সৌম্যদর্শন রোদে পোড়া, টানটান চেহারা তার। পোশাকে বিশেষ কোন বৈচিত্র্য নেই। খুবই হালকা ধরনের পোশাক, এয়ার কন্ডিশন্ড , গরমকালে এই পোশাকে ঠান্ডা লাগে, শীতকালে গরম। পৃথিবীর  সব মানুষই এই ধরনের পোশাক পরেন এখন। উজ্জ্বল, কিন্তু কোমল রঙ। বহুযুগ আগে মানুষ নাকি বিদ্যুৎচালিত  পাখা, ঘর ঠান্ডা গরম রাখার যন্ত্র ইত্যাদি ব্যবহার করতো। এখন এসব কিছুই নেই। যে বিশেষ মেটেরিয়েল দিয়ে পোশাক তৈরী করা হয়, তা সবরকম

প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষকে আরাম দেয়। ঘরবাড়ি তৈরীতেও ব্যবহার করা হয় স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী একধরনের বিশেষ হাইব্রিড উদ্ভিদ। যা সারা পৃথিবীর বিশাল সমুদ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপগুলোতে নিয়মিত যত্ন সহকারে চাষ করা হয়। পাঠানো হয় পৃথিবীর নানা প্রান্তে। 

এখন রাত গভীর। 

সামার ক্যাম্পের  সারিবদ্ধ  ঘরগুলোতে উজ্জ্বল যে আলোর বলগুলো জ্বলছে, তা হলো মৃত মানুষের চিন্তাগুচ্ছ। মানুষ মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাশক্তিরও মৃত্যু ঘটে। তিনি হয়তো সারাজীবন অনেককিছু পড়াশোনা করেছিলেন, কিংবা

শিল্পের কোনও একটি মাধ্যম তার মধ্য দিয়ে উৎকর্ষতার চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্ত মৃত্যু মানেই সব শেষ, সৃষ্টি কর্মগুলোর সযত্ন সংরক্ষণ করা হয়, বা সেসব থেকে গবেষণাও করা যায়, কিন্তু মানুষ তার সৃষ্টি কর্মে খুব সামান্য জিনিসেরই প্রতিফলন ঘটায়, ট্রিলিয়ন সূক্ষ্ম চিন্তার জাল মস্তিস্কে ছড়ানো থাকে, যার হদিশ পাওয়া যায় না।

কিন্তু এখন সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানী মৌনপতি মনে করেন তিনি সফল। এই ধাপে আসার আগে একটি কাজ তাকে করতে হয়েছে, তা হলো সম্ভাব্য মৃত্যুসময় বের করা। যেটা আংশিক সফল। কারণ কোন মানুষ ঠিক কখন মারা যাবে, এটা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে পৃথিবীতে।কিন্তু অমূল্য চিন্তাশক্তির ধ্বংস হয়ে যাওয়া মানে একধাপ পেছন দিকে যাওয়া! তাই এক্ষেত্রে তিনি অসুস্থ বা বৃদ্ধ  প্রতিভাবান ব্যক্তিদের বেছে নিয়েছেন।  প্রতিভাবান মানুষের অনুমতিরও প্রয়োজন রয়েছে। মৃত্যুর আগে দেহদান বাধ্যতামূলক এখন।  কিন্তু মেধা বা চিন্তা দান নয়।তখনি ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে পৃথিবীর স্বার্থের কথা চিন্তা করতে হয়। সুখের কথা এই যে, বেশীরভাগ. মানুষ এখন ভালো হয়ে গেছে, সাধারণ মানুষও তার চিন্তাশক্তি দান করে যায়, খুব সামান্য কিছু মানুষ ছাড়া।

এই চিন্তাশক্তি সংগ্রহের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হচ্ছে মৃত্যুর সময়টিতে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। 

বিশেষ মেডিকেল টিম অসুস্থ বা বৃদ্ধ মানুষটিকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একটি সম্ভাব্য মৃত্যুসময় মৌণপতিকে জানান। মৌনপতি, নির্দিষ্ট ব্যক্তিটির কাছে উপস্থিত হন। প্ল্যাটিনাম এবং নতুন আবিস্কৃত একটি মৌল গ্যারোবিয়াম এই দুইয়ের মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি সংকর ধাতু প্রস্তুত করা হয়েছে, সেটা দিয়ে ভীষণ সূক্ষ্ম এবং বিশেষ কিছু ধর্মবিশিষ্ট   জালিকা বানানো হয়, সেই সঙ্গে এক্সরে তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে মৌণপতি একটি পদ্ধতি আবিস্কার করেছেন, যার মাধ্যমে মস্তিকের প্রতিটি কোষ থেকে, শোষিত হয় চিন্তার স্হাবর রূপ, আলোকরশ্মির মতো বেরিয়ে আসে,সূক্ষ্ম জালিকায় আটকে যায়। তাঁর ছাত্ররাও ক্রমাগত একাজে দক্ষ হয়ে উঠছে।

পরে তাকে গোলাকৃতি বলের মতো আকৃতি দেওয়া হয়, সংরক্ষণ করা হয়  স্বচ্ছ ধাতুর পাত্রে গবেষণাগারে।  

এভাবে সাহিত্য, সঙ্গীত, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ইত্যাদিতে মানুষ খুব দ্রুত এডভান্স হচ্ছে, পৃথিবীতে মানুষ এখন আর আবদ্ধ নয়, ঘুরে বেড়াচ্ছে মহাকাশের বিভিন্ন গ্রহে। কয়েকটি ছোট ছোট গ্রহ, যেগুলোর বায়ুমণ্ডল মোটামুটি ভাবে জীবন সৃষ্টির পক্ষে সহায়ক, সেগুলোতে পৃথিবীর মানুষেরা গিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছে, মানুষ থাকার মতো কোন পরিবেশ গড়ে তোলা যায় কিনা, কি ধরনের খাদ্য তৈরী করা যাবে সেসমস্ত জায়গায় ইত্যাদি। 

ঠিক এই মুহূর্তে মৌণপতি ভীষণ চিন্তামগ্ন। কিছুদিন আগে তিনি পৃথিবীর অন্য একটি অংশে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানকার বহু প্রাচীন একটি গিরিখাতে ঘুরতে ঘুরতে তিনি তিনটি মানুষের মাথার খুলি পান, ব্যাগে করে নিয়ে আসেন। পরে সামারক্যাম্পে এসে নিজের ব্যক্তিগত পরীক্ষাগারে বসে খুলি তিনটির উপর অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেন এবং আশ্চর্যরকম ভাবে  এই খুলি তিনটি থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন চিন্তা সংগ্রহ করতে পারেন। যা অনুবাদ করলে তিনি বুঝতে পারেন, এই তিন ব্যক্তি প্রতিভাবান পরমানু  বিজ্ঞানী ছিলেন এবং বিপুল ধ্বংসের সময় তাঁরা গবেষণাগারে পরমানু অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি যা সংগ্রহ করতে পেরেছেন, তাতে একটু  মাথা খাটালে তিনিও পরমানু বোম তৈরী করতে পারবেন। কিন্তু বর্তমানের পৃথিবীতে কোন রকম অস্ত্র তৈরী করা নিষেধ। বনজ পশুর কাছ থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য একধরনের স্প্রে ব্যবহার করা হয়, যা তাদের অজ্ঞান করে শুধু। তারপর বনকর্মীদের খবর দেওয়া হয়। কোন রাষ্ট্র নেই পৃথিবীতে। সব মানুষ সমান সুযোগ সুবিধা পায়। সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দিক দেখার জন্য বিভিন্ন দপ্তর রয়েছে শুধু। কেউ কোন হিংসার আশ্রয় নেয় না। তাই বিজ্ঞানের সব গবেষণা শুধু কল্যানকামী।  অস্ত্র তৈরীর নিয়মকানুন মানুষ জানে না, জানার চেষ্টা করলেও ধরা পড়ে যাবে পিস্ ওয়ার্রকারদের হাতে।

এখন মৌণপতি একটি মুশকিলে পড়েছেন, এই চিন্তাগোলকের রঙ্ হলুদ। এখনের পৃথিবীতে প্রায় সব চিন্তাগোলকের রঙ্ হালকা গোলাপী, ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে এখানে। মৌণব্রতের প্রিয় ছাত্র, অর্কপ্রভের  চোখ কিন্তু এড়ায়নি। সে জিজ্ঞেসও করেছে দু একবার। তিনি এড়িয়ে গেছেন। চিন্তাগোলক কোনভাবেই ধ্বংস করা যায় না জেনেও তিনি সমুদ্রের কাছে গোপনে চেষ্টা করেছেন, হয়নি, হবে না বুঝে গেছেন যা হবার। আবার গবেষণাগারে নিয়ে এসে রেখেছেন। তাকিয়ে আছেন নির্নিমেষ। অত্যন্ত মেধাবী তার ছাত্রটিম। যে কারো হাতে পড়লে পুনরায় পৃথিবী, পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্য গ্রহে জ্বলে উঠবে রণদামামা। ক্ষমতা আর আগ্রাসনের লড়াই। কি করবেন তিনি। সামনের কম্পিউটার স্ক্রিণে লাল আলো জ্বলে উঠল, মানে দরজার বাইরে কেউ। তিনি টাচ্ করে দেখলেন অর্কপ্রভ, খুব অবাক হলেন, ওর তো আজ পৃথিবীর একমাত্র মরুভূমি হট্গ্রীণে যাওয়ার কথা, যেখানে খুব সামান্য অংশ মরুভূমি আর অবশিষ্ট রয়েছে, যা সংরক্ষিত, মানুষকে দেখাবার জন্য। তিনি অবাক হয়ে রিমোটে হাত রাখলেন। দরজা খুলে গেল, অর্কপ্রভ ঢুকলো এবং মৌণব্রতকে কিছু বলার সুযোগ

না দিয়ে হলুদ চিন্তা গোলকের বাক্সটি নিয়ে দৌড়ে ঘরের বাইরে, মৌণব্রত এ ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তিনিও ছুটে বাইরে এলেন, ততক্ষণে অর্কপ্রভ ছোট প্লেনে করে অনেক উঁচুতে আকাশে। কিন্তু তিনি অর্কর গুরু, প্রখর মেধা,  গবেষণাগারে এসে ধ্যানস্থ হলেন। প্রবল আকর্ষণ ক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারেন তিনি, এটা তাঁর বিশেষ ক্ষমতা, সাধনায় অর্জিত, প্রয়োগ করলেন হলুদ চিন্তা গোলকের উপর এবং সেই অবিনশ্বর বস্তুটি ভেসে চলে আসল তার দিকে, অর্ক শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো।

এখন কি হবে? একঘন্টা গভীর আত্মমগ্ন রইলেন প্রাজ্ঞ বিজ্ঞানী। তারপর পৃথিবীর সমস্ত জায়গা থেকে  তাঁর আন্ডারে কাজ করা সব তরুন বিজ্ঞানীকে দ্রুত আসতে বললেন সামার ক্যাম্পে। পরদিন সকাল ছটা। বিশাল হলঘরে পিনড্রপ সাইলেন্স। মৌণব্রত বললেন, তিনি আজ বিকেলে ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করবেন। কিন্তু তার দেহ তিনি দান করবেন না, আর মৃত্যুর সময় তাঁর চিন্তাও তিনি দান করবেন না। পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরের গ্রহ সবকিছুর চরম স্বার্থের কথা চিন্তা করে তার এই ডিসিশন। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাকে যেন ইলেকট্রিক পদ্ধতিতে ছাই করে দেওয়া হয়। আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ দিলেন না।

দ্রুত চলে এলেন গবেষণাগারে। হলুদ চিন্তাগোলক জ্বলজ্বল করছে, তীব্র আলোতে চোখ যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে। আবার ধ্যানস্থ হলেন মৌণপতি। হলুদ গোলক

এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে তাঁর দিকে আসতে লাগল। মৌণপতির মাথার ওপর চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মৌণব্রতের দেহে লীন হয়ে গেল।  বিকেল বেলা নিজ গৃহে নিজের তৈরী প্রাণঘাতী ইনজেকশন শরীরে বিঁধলেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী ঠিক কুড়িমিনিট পর দরজা খোলা হলো। বিশেষ কক্ষে, মৌণব্রতর দেহ ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে পুড়ে ছাই হয়ে গেল সবার চোখের সামনে। না কোন চিন্তাশক্তি সংগৃহীত হলো না এই প্রখর প্রতিভার। আপন প্রতিভার তীব্র আগুনে ধ্বংস করে ফেললেন নিজেকেই। বাইরে শান্তির পৃথিবীতে, দ্য বে অব গ্রীণের উত্তাল ঢেউ। এখন জোয়ার আসার সময় হয়েছে। 

আপনাকে কবি

আপনাকে কবি 

........................

...........চিরশ্রী দেবনাথ 

কবি অনিল সরকার...

মাত্র কিছুদিন হলো আপনি নেই  

অথবা প্রবলভাবে আছেন 

পূর্ণশ্রী ত্রিপুরার সঙ্গে দেখা হয় আমার 

ছায়াময় দেহ এখন তার

শিকড় নেমেছে কপোল বেয়ে

হাতের চুড়িতে গভীর বন আরো গাঢ়তম

গল্পে গল্পে তার ঠোঁট থেকে ঝরে পরে তামাক গন্ধ

শ্লোগানের সুর চুপ করে শোনে ফিসফাস, হিসহিস 

কিছু কিছু দলিত পশুর দল নদীচরে জ্যোৎস্না পোহায় 

অমাবস্যা  আসার প্রাকসন্ধ্যায়

হাতের মুঠোতে একফোঁটা

গনতন্ত্র নিয়ে হাঁটতে থাকে, হাঁটতেই থাকে...

শব্দহীন ছড়াকারের চোখের মতো

দূরে দূরে জ্বলে উঠে কুঁড়েঘর

ছেঁয়ে যায় শুকনো মাছের গন্ধ

এইসব রাতেরা আপনার বুকে

ছড়িয়ে দিয়েছিলো এক শীতল পাটি, আগ্নেয় ঘুম

এখনো কি সেই পাহাড়ি বিকেল নেমে আসে, 

নাস্তিকের মতো...আপনার কন্ঠে?

কই?  কোথায়? সেই গমগমে ধারাপাত?

তীব্র অশরীরী হয়ে এই ভারতে তুলে দিন না একটা দলিত ঝড়!!

তারপর শুধু গ্রাস গ্রাস ভাত আর নরম স্বাধীনতা ...


দিরাং

   

অরুনাচল প্রদেশের মানুষেরা

 কামেঙ নদীর উচ্ছাস মেখে বলে

আমরা ইন্ডিয়া যাই মাঝে  মাঝে, দিল্লীও দেখেছি একবার

গৃহদেবতার কাছে ফিরে এসে প্রেয়ারের ঘন্টাটি বাজিয়ে দেয়, " ওঁ মণি পদ্মে হুম "

নিরাপদে এসেছি দিনের শেষে, হাতে তুলে নেয় উষ্ণ "রকশী "।

কাঠকুটো জ্বলে, উষ্ণতা তার গলায় গান আনে,  ভাষাটি ঈশ্বরের

শামিয়ানার মতো বরফ পড়ে ম্যাকমোহন লাইনে

"তাওয়াং "মঠে , আনি কন্যারা দেবগৃহ পরিস্কার করে
ঠান্ডা বাক্সে হাসিমুখে রাখা চিতল হরিণের ক্ষিপ্রতা

সেনা বাহিনীর ট্রাক চলে যায়,

"দিরাং "নদীই পথ দেখায়

ত্রস্ত করে জড়িয়ে রাখে বাহুডোরে সাহসী ছেলেকে

নদীর পাশ দিয়ে বয়ে যায়  সাবধানী রাস্তা

ইন্ডিয়া চেনায় গুম্ফাবাসীটিকে

এই বিশাল ভূখন্ডটির দিনরাত কি স্পর্শ করে

ঐ আধো অন্ধকার ঘরে থাকা

 পূর্বজন্ম মনে রাখা লামাকে

স্বাধীনতার কাছে তার কি দাবি বড়ো জানতে ইচ্ছে করে

যুদ্ধ তো সেও দেখে, নীরব পুঁথির প্রহরী

নোনতা চা গলার নীচে নামে,সমুদ্র দূরে...

তেরঙ্গা উড়ে কোথাও, সভ্রান্ত অজানা।

মনে মনে হয়তো বলে এ উচ্চতায় বড়ো শূন্যতা

" না পাখিডাকা সকাল ",যেন ম়ৃত্যু অপেক্ষায় সাদা

দেহচিন্হ ক্ষতের মতো, পুষে রাখা পুন্য

কর্পূর বৃক্ষের তলে জন্ম হবে, আবার স্তোত্র পাঠ

ঝরনায় আচ্ছন্ন এই আশ্চর্য গ্রামগুলোতে রঙীন হেমন্তযুবকদের ঘরবাড়ি ,

পাতা ঝরার আগে যেমন গাছে গাছে উৎসবের পোশাক

 তারা ইন্ডিয়াকে ভালোবেসে

টগবগে রক্ত দিয়ে আসে ঝকঝকে পেয়ালায়,  

বর্ডার কে শুধু সভ্যতার অসুখ বলে মনে হয়

 

     

পুষ্করে

পুষ্করে

....চিরশ্রী দেবনাথ 

রবি ঠাকুর "পুষ্কর "দেখতে গিয়েছিলেন

পারেননি,পরিযায়ী পাখির মৃত্যুগল্প তাকে ফিরিয়ে এনেছিল

আজ যখন হাওয়া থরথর "পুষ্কর ",দেখতে গেলাম

মনে হলো সারা ভারতের গায়ে মৃত্যুগন্ধ

রূপোর নথ পরা এক শুস্ক তরুণী হেসে হেসে মরুজল তুলে দিলো হাতে

তাকিয়ে রইলাম, কি গান হবে কবিগুরু একে নিয়ে

"প্রাণ চায় চক্ষু না চায় "সুর কেটে কেটে যেন সমূহ নোনা অক্ষর,

বসে যাচ্ছে খিদের থালায়, ক্লান্ত কর্কটক্রান্তির সীমন্তে

দেবমন্ত্র বলি,

"সাবিত্রী বামপার্শস্থা দক্ষিণস্থা সরস্বতী

সর্বে চ ঋষয়োহ্যগ্রে কুর্যাদেভিশ্চ চিন্তনম "

মৃদু হাসুন দেবতা, পুজো দিতে আসিনি,

দেখে যাবো হ্রদের গভীরতা, গা থেকে না মুছুক কালো দাগ

 বর্ষা এসেছে,  রাজভূমির ধুলো ধুয়ে  নিচ্ছে পর্যটকের ফেলে যাওয়া সংসারী মন

সাবিত্রীপাহাড়ে যখন রাত নামে,

বধূদের দিয়ে যাওয়া পুজো, বানজারার গলায় গান হয়ে ফিরে যায়

এখানে ছমছমে অশ্বখুড়, মীরাভজন, আবির,

তারা কেউ গৃহীদের বিশ্বাস করে না ...

নেভার এগেইন

নেভার এগেইন

.....চিরশ্রী দেবনাথ

হিরোশিমার মিউজিয়ামটি

থরে থরে সাজিয়ে রেখেছে  মৃত্যুচিহ্নের  হৃদয়  

সিঁড়ির ওপর বসে থাকা সেই মানুষটি মরে গেছে সকাল আটটা পঁয়তাল্লিশে,

তেজস্ক্রিয়তা ছায়াখানি তুলে রেখেছে তাঁর সিঁড়িতে, পাথরের ধাপে,

রেলিং ধরে  দাঁড়ানো দুজন  মিশে গেছে মুহূর্তে

  ছায়াঘন সামান্য  প্রাচ্য সময়, লেপ্টে আছে আজো সেতুর মেঝেতে,

যেন নরনারীর একটু সবুজ চাহিদা, ভুল করে গিলে ফেলেছিল কসমিক রে

কি অদ্ভুত এই পারমানবিকতা

কি লিখছে মানুষ, কি গাইছে, কি আঁকছে কোথায় দাঁড়িয়ে, এই সময়ে?

গভীরে জমা হাজার সাদা সূর্য  আর নির্ধারিত ব্ল্যাকরেইন

থাকবে না  কোন চিহ্ন ,কোন  ধারক, কোনও অনাগত  মানবশিশু ...

Burning souls never forgive

গোল্ডেন ডাক

 চিরশ্রী দেবনাথ

গোল্ডেন ডাক 

অজিতেশ দেব বড়ো বুদ্ধিমান মানুষ এবং ক্রিকেট তার প্রিয় খেলা। অবশ্য বুদ্ধিমান হলেই ক্রিকেট প্রিয় খেলা হবে এমন কোন কথা নেই, কিন্তু অজিতেশ বাবু যখন থেকে ক্রিকেট খেলা দেখছেন তখন থেকে মনে হয়েছে, জীবন একটি ক্রিকেট খেলার মাঠ এবং তিনি একজন উইকেট কিপার। ব্যাটসম্যান বা বোলার না হয়ে উইকেট কিপার কেন সেটারও একটি কারণ আছে, তার মতে উইকেট কিপারই, টিমের প্রধান রক্ষক, তার সতর্কতা এবং পারদর্শিতা টিমকে টিকিয়ে রাখে, টিম অর্থে এখানে তার পরিবার। জনসংখ্যা বৃদ্ধির নিয়মকানুনকে তুড়ি মেরে তার চারখানা ছেলেমেয়ে। দুজন পুত্র এবং দুজন কন্যা ও একজন সুন্দরী, রন্ধনশিল্পে নিপুণা, পরচর্চা ও পরনিন্দায় পারঙ্গম পত্নী নিয়ে তার ছয়জনের টিম। আয়কর দপ্তরের অফিসার হওয়ার এতজন সদস্য নিয়েও তিনি দারুণ বুদ্ধিমত্তায় সচ্ছলভাবে সংসার পরিচালনা করেন। দুই কন্যাকে উচ্চশিক্ষার পরপরই, তার দপ্তরে সদ্য চাকুরিপ্রাপ্ত দুজন তরুন অফিসারের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন এ হলো তার টিমের দুটো শ্রেষ্ঠ ওভার বাউন্ডারী। 

অবসর নিয়েছেন। এখন  নিজেকে ভাবছেন ওপেনার ব্যাটসম্যান। সারা জীবন ঘর রক্ষা করেছেন, এবার রান তুলবেন, সোনালী ফসলে গোলা ভরবেন, আর হাততালি কুড়োবেন।  

ছেলেরা একজন ডাক্তার এবং একজন প্রোফেসর। প্রোফেসর হয়েছে ছোট ছেলে এবং সে বিয়ে করেছে সদ্য। অজিতেশ বাবুর স্ত্রী অনুপ্রভা দেবী বিস্তর আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ পাত্রী পুত্রের স্বনির্বাচিত, সুন্দরী কোনভাবেই বলা যায় না, কালো, মোটা এবং কর্কশ কন্ঠ, শুধু বিদ্যেধরী, পি এইচ ডি করেও আবার পড়ছে, ছেলের চাইতেও বেশী পড়াশুনো, একই কলেজে চাকরী করে তারা। এক্ষেত্রে অজিতেশবাবু স্ত্রীর তীক্ষ্ণ বোলিং এর জন্য  এল বি ডাব্লিউ হলেন।  ছোট ছেলে বিপক্ষের ব্যাটসম্যানের মতো ছক্কা হাঁকালো  এবং বিয়ে করে বাড়ি থেকে আলাদা হয়ে গেলো । দূরদর্শী কোচের মতো তিনি স্ত্রীকে লুকিয়ে ছোট ছেলের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন এবং বুঝেছেন, বউমার মতো গুণী মেয়ে পাওয়া দুর্লভ, যেমন সুন্দর ব্যবহার তেমনি সংসারী, শুধু তার স্ত্রী প্রথম থেকেই এতো বিরোধিতা করেছে যে, ওদের বড়ো আত্মসম্মানে লেগেছে। তাই আলাদা। অথচ এই বউ বাড়িতে থাকলে লক্ষ্মী এবং লক্ষ্মীশ্রী দুটোই বজায় থাকতো। এতো টাকা বেতন, সংসারে সুসার দিতো, কিন্তু তা আর সম্ভব নয়। তবুও তিনি ছোট ছেলের আশা একেবারে ছাড়েননি, বয়স হচ্ছে, আস্তে আস্তে ছেলেদের ওপর নির্ভর করতে হবে, এখন খামোখা এতো রাগ দেখালে চলে  ! 

আজ সকালে অজিতেশবাবু চা খাচ্ছেন, গভীর চিন্তামগ্ন, বড়ো ছেলের ব্যাপারে। চাকরী করছে ডাক্তারীর। প্রচুর মেয়ের বাবারা   রীতিমতো পেছনে লেগে আছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। বড়ছেলের বিয়ের সাকসেসফুল মিশনে অনুপ্রভা দেবীই প্রধান  নির্বাচক।   অজিতেশ বাবু বাধ্য হয়ে মিডল অর্ডারে আছেন  আপাতত।  প্রতিদিন বেশ কয়েকটি করে মেয়ের ছবি দেখা হচ্ছে এবং বাতিল করা হচ্ছে। দিনরাত ফোন আসছে ডাক্তারের মার কাছে এবং নির্বাচকের কঠোর মনোভাবের কারণে কোন অলরাউন্ডার কন্যা পাওয়া যাচ্ছে না।

এভাবে প্রায় একমাস কেটে গেলো। হঠাৎ একদিন মাঝরাতে অজিতেশ বাবুর মোবাইলে টুং করে মেসেজ এলো। ইদানীং ঘুম ভালো না হওয়ায় তিনি আধা জাগ্রতই ছিলেন।  বড়ছেলে পাশের ঘর থেকে মেসেজ করেছে, "বাবা একটু এ ঘরে এসো, জরুরী কথা আছে, মা যাতে কোনমতেই না জাগে ", ওহ্ এই না হলে ডিজিটাল ইন্ডিয়া। অতএব অজিতেশ বাবু উঠলেন এবং পা টিপে টিপে বড়ো ছেলের ঘরে এলেন। ছেলে ল্যাপটপ খুলে বসে আছে এবং সেখানে এক উচ্ছল জিনস পরিহিতা বয়কাট চুলের ভারী লেন্সের চশমা পরা তরুণীর ছবি। অজিতেশ বাবু যা বোঝার বুঝে গেলেন, বুঝলেন তাকে এখন পিচে টিকে থাকতে হবে, শুধু  টুক টুক রান তোলা, নো বাউন্ডারী, নো ওভার বাউন্ডারী, কোন রিস্ক নেওয়া চলবে না।  আস্তে আস্তে ম্যাচকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনতে হবে। এই কন্যাটি আবার পাঞ্জাবী, বড়ো ছেলের সঙ্গে দিল্লীতে একই হসপিটালে ইন্টারশিপ  করেছে, তখন থেকেই "বোল্লে বোল্লে ",  অজিতেশবাবু চোখ বন্ধ করে দম নিলেন,  তিনি বড়ো ছেলেকে কিছু বলবেন না,খুব বাধ্য ছেলে তার, দারুণ ছবি আঁকতো, গান করতো ,কিন্তু সবকিছুর শখ  ছেড়ে  সারা জীবন বাবার কথা শুনে ঘাড় গুঁজে পড়াশুনো করে ডাক্তার হয়েছে, একটু প্রেম ট্রেম তো করতেই পারে, মেয়েটিও  ডাক্তার, তায় আবার পাঞ্জাবী, তিনি নিজে কপিল দেব রামপাল নিখাঞ্জকে জীবনের প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করেন।  এখন অবশ্য  শচীন ভাবছেন নিজেকে , সামনে শ্যেন ওয়ার্নে হলেও কুছ পরোয়া নেহী।  তবে নির্ভুল  ছক সাজাতে হবে ।  মেয়ের বাবার  ফোন নাম্বার নিয়ে, কথা বলে নিলেন, বুঝলেন মেয়ের বাবাও একজন রানার্স টিমের ক্যাপটেন ।

অনুপ্রভা দেবী দীর্ঘদিন ধরে নার্ভের যন্ত্রণায় ভুগছেন। ছেলে ছুটিতে বাড়ি এসেছিল, এখন দিল্লীতে কর্মস্থলে ফিরে যাচ্ছে। বড়োছেলে মাকে বলল, মা চলো দিল্লীতে কিছুদিন থেকে ট্রিটমেন্ট করাবে, অনুপ্রভা বললেন আগে তোর বিয়ে হোক তারপর যাবো, অজিতেশ বাবু বললেন, ছেলের বিয়েতে খুব খাটাখাটনি হবে, চলো আগে ডাক্তার দেখিয়ে আসি। অনুপ্রভা অবশেষে নিমরাজি হলেন।  অতঃপর দুজনে মিলে ছেলের সঙ্গে দিল্লী গেলেন। ছেলে অর্থোপেডিস্ক, দিল্লীতে ফ্ল্যাটে থাকে।  একটি বিশাল  বেসরকারী হসপিটালে আপাতত কাজ করছে, মাকে সে নিয়ে গেলো সেখানকার নিউরোলজিক্যাল বিভাগে, খুব সহজ সরল দেখতে একজন দীর্ঘাঙ্গী জুনিয়র লেডী ডাক্তার  অনুপ্রভা দেবীকে প্রথমে পরীক্ষা নিরীক্ষা করলো, এতো সুন্দর হিন্দিতে কথা বলে মেয়েটি, অনুপ্রভা দেবীও বাংলা হিন্দি, ইংরেজী সব মিলিয়ে দারুণ ভাবে নিজের প্রবলেম গুলো বললেন। তারপর বিভিন্ন টেষ্টিং চলতে লাগলো, এই হাসিখুশি জুনিয়র ডাক্তারটি তাকে দিব্যি মম্  বলে ডাকে, কাছে এসে হাসিমুখে সব জিজ্ঞেস করে, একদিন অনুপ্রভা আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, তুম কোনসা কাস্ট কা হো বেটী, অজিতেশ বাবু চমকে উঠলেন, প্রথম বাউন্ডারী এতো অনায়াসে আসবে ভাবতেই পারেননি। মেয়েটি শান্ত ভাবে বলল, " আই এম্ ফ্রম পাঞ্জাব মা,  এন্ড আই এম এ পাঞ্জাবি গার্ল ", অনুপ্রভা কিন্তু চমকালেন না, দিব্যি হাসিমুখে চেয়ে রইলেন এক জোড়া ভারী চশমার নীচে একটি মায়াবী চোখের দিকে। বাড়ি এসে, অজিতেশ বাবুকে হিন্দিতে বললেন বাত্ চালাও, মুঝে ইস ডাক্তার বেটীকো পুত্রবধূ করনা হে।

রেলের অবসর প্রাপ্ত অফিসার জগজ্জীবন কাউর  তার ধর্মপত্নী মনোপ্রীত কাউরকে নিয়ে এসেছেন দিল্লী, স্থুলকায়া মনোপ্রীত হাঁটুর যন্ত্রণায় কাতর, অথচ সার্জারীতে ভীষণ ভয়। মেয়ে প্রীতম সদ্য ডাক্তার হয়ে কাজ করছে দিল্লীর একটি বড়োসড়ো হসপিটালে, সেখানেই এসেছেন দুজন, নরমসরম দেখতে, একটি লম্বা শ্যামলা বাঙালী জুনিয়র ডাক্তার মনোপ্রীতকে পরীক্ষানিরীক্ষা করে খুব ভালোভাবে বোঝালো কেন হাঁটু অপারেশন করতে হবে, না করলে কি হবে ইত্যাদি, মনোপ্রীতের ছেলে নেই, এই বাঙালী ছেলেটিকে দেখে শুধু মনে হতে লাগল এ যেন তরুন কৃষ্ণ ভগবান , মনোপ্রীত রাজী হয়ে গেলেন। পাঁচজন ডাক্তারের একটি টিম তার হাঁটুর সফল অস্ত্রোপচার করল।

একমাস পর, মনোপ্রীত কাউর আর অনুপ্রভা দেবী একসঙ্গে বসে, চা খাচ্ছেন অনুময়ের ফ্ল্যাটে বসে। সামনের মাসে দিল্লীতেই বিয়ে হচ্ছে, অর্থোপেডিস্ক অনুময় দেব এবং নিউরোজিস্ট প্রীতম কাউরের। পরে  যে যার বাড়িতে গিয়ে পার্টি দেবে। দু পরিবারই আর দেরী করতে রাজি হন। বিশেষ করে অজিতেশ বাবু একটু ক্লান্ত বোধ করছেন , মনে হচ্ছে ক্রমাগত চার মেরে মেরে তিনি হাঁফিয়ে উঠছেন এখন দরকার লাঞ্চ ব্রেক।

দুটো টিকেট কেটেছেন, সিঙ্গাপুরের,  ছেলে আর ছেলের বউকে হানিমুনে পাঠাবেন, টিকিট দুটো ফুলশয্যার দিন অনুপ্রভা দেবীকে দিয়ে ছেলের বউকে উপহার দেবেন। এটা অজিতেশ বাবুর স্পেশাল ছক্কা, এখান থেকেই যেন, নতুন ব্যাটিং বাকি ম্যাচ টেনে নিয়ে যেতে পারে। বিয়ে হয়ে গেলো ধুমধাম করে।  বিয়েতে অজিতেশ বাবুর দুইমেয়ে জামাই, ছোট ছেলে আর বউ এসেছে। প্রীতমদেরও ঘনিষ্ঠ কিছু আত্মীয় স্বজন এবং  প্রীতমের ছোট বোন অমৃতা এলো। বাঙালী আর পাঞ্জাবী মিলেমিশে একাকার।

অনুষ্ঠান শেষে, অজিতেশ বাবু  স্ত্রীকে যখন একথাটি বললেন, অনুপ্রভা হঠাৎ পুরনো মেজাজে ফিরলেন, মাত্র বিয়ে হলো, এখন একটু ঘরকন্না করুক, বাঙালীর আদবকায়দা শিখুক, এখনই পঁচিশদিনের এই লম্বা ট্যুরের কি প্রয়োজন? ছেলেকে পটিয়ে ফেলবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অজিতেশ বাবু বুঝলেন খেলা আবার শুরু, আর ব্যাটিং পারছেন না, এখন ফিল্ডিং, যথা সময়ে ক্যাচ তুলে ফেলতে হবে হাতে, স্ত্রী কে বোঝালেন সে তো সারাজীবনই করবে, কিন্তু এসময়টি তো আর আসবে না ওদের জীবনে, অবশেষে মনে ক্ষোভ আর মুখে চওড়া হাসি নিয়ে অনুপ্রভা ছেলের বউয়ের হাতে টিকিট দুটো তুলে দিলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে প্রীতম আই লাভ ইউ মম, ইউ আর সো গ্রেট বলেই অনুপ্রভাকে জড়িয়ে ধরলো, অনুপ্রভার মনে হলো তিনি কি যেন একটা পেয়েছেন মনের মাঝে,  যা কখনো হারাবে না।

অনুময় আর প্রীতম হানিমুন থেকে ফিরে এসেছে, মা বাবাদের জন্য প্রচুর উপহার। বিশেষ করে, অনুপ্রভা দেবীর জন্য প্রীতম এনেছে মুক্তোর চোখ ধাঁধানো সেট, আরো এটা সেটা। অজিতেশ বাবু মিটিমিটি হাসছেন স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আর নিঃশব্দে ক্যাচ তুলছেন।

প্রীতম রান্নাবান্না  কিছুই জানে না, তবে বুঝিয়ে দিলে সিরিয়াস স্টুডেন্টের মতো খুব তাড়াতাড়ি সব  শিখে নেয়। অনুপ্রভা মনে মনে ভাবলেন বেশ ভালোই হলো, নিজের মতো করে নেওয়া যাবে। দিন দিন শাশুড়ী বউ বন্ধুর মতো হয়ে যেতে লাগলেন, প্রীতমের সারল্য অনুপ্রভাকে আস্তে আস্তে দখল করতে লাগলো।

মাস চারেক হয়ে গেলো।   এবার, বাড়িতে গিয়ে একটি পার্টি দিতে হবে ধুমধাম করে, দিন ঠিক হলো, আগামীকালের ফ্লাইটে সবাই মিলে রওনা দেবেন বাড়িতে। রাতে হঠাৎ অজিতেশ বাবু প্রচন্ড বুকে ব্যথা অনুভব করলেন, সঙ্গে সঙ্গে নার্সিংহোম, আই সি ইউ ,  , নাহ্, অলরাউন্ডার অজিতেশ বাবু এই ইনিংসের শুরুতেই গোল্ডেন ডাক মারলেন এবং আউট। শুধু যেতে যেতে দেখলেন প্রীতম দুহাত দিয়ে আগলে রেখেছে অনুপ্রভা দেবীকে।