কবিতার দিনে

কবিতার দিনে

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে।

মনে ও হাতে ময়লা লেগে আছে আমার। 

তাকে ছুঁতে পারছি না। 

আর একটু দাঁড়িয়ে সে চলে যাবে।

আমি সেই অপসৃয়মান অক্ষর মিছিলের দিকে তাকিয়ে থাকবো।

যতখানি ভালো হলে, তার সব খারাপকে আমি লিখে দিতে পারি, ততদিন সে এমনি করে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মিলিয়ে যাবে।

আমি তার জন্য অসুস্থ হচ্ছি, মরে যাচ্ছি, হিংসুটে, ফ্রড, চোর হয়ে যাচ্ছি, খুঁজছি শুধু চতুরতা, তখন সে মনে মনে হাসবে,

একশোটা আমি গনগনে কয়লার মতো বর্ণমালায় তাকে লিখে যাবো, এই আশায় সে তার লিঙ্গচিহ্ন বিসর্জন দিয়েছে, অথচ তার শরীর দুধে ভরে আছে,

 উপচানো সাদা পালের মতো কাঁপছে,

নাহ্ আমি গত সপ্তাহ এবং আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত তাকে  পেলাম না। 

জানালার পাশে একটি নদী এসেছে। দু তিনটে কাশের বন, পা ডুবে যাওয়ার মতো খানিকটা পলি ও কাঁদা,  একটি ভীষণ জোয়ার। 

বালুকাবেলার পাশে একরত্তি এই ঘর। 

আমাকে কেন সে এই ঘরে ঢুকিয়ে দিলো, আমি যে পারি না অক্ষরকে শাসন করতে ...

সেই তাকানো

 

সেই তাকানো 

আমি কালো মেয়ে।  এ কথাটি জানতাম না ছয় বছর বয়স পর্যন্ত। আমার বাবা আমাকে প্রিন্সেস বলতো আর মা প্রজাপতি। আমি শুধু আনন্দ জানতাম। কি সুন্দর পৃথিবী ছিলো আমার।  আমি স্কুলে ভর্তি হলাম। আমাকে প্রিন্সিপাল নতুন ক্লাসে নিয়ে এসে বসিয়ে  দিয়ে গেলেন। 

চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। 

একটি মেয়ে এগিয়ে এলো আমার দিকে, খুব অবাক হয়ে তাকালো, তারপর বলল তুমি এরকম কেন দেখতে? আমি ক্লাসের সবার দিকে তাকালাম, আমি তাদের মতো নই, কম কালোও নই। কালো খুব কালো আমি।

 

আমার প্রথম কান্না।  প্রথম মনখারাপ। প্রথম আয়নায় দাঁড়ানো।  প্রথম নিজেকে দেখা। লুকিয়ে থাকা। মা  বুঝতে পেরেছিলেন, যেন এটা তার জানা ছিল।

এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, 

 কেন মা, সেদিন একসঙ্গে  আমাকে প্রকান্ড বাস্তবে ঠেলে দিয়েছিলেন   ? 

একটু একটু মনখারাপের জমি তো আগে থেকেই তৈরী করতে পারতেন।

আসলে মা পারেননি। মা ধবধবে ফর্সা ছিলেন। 

সেই ছয় বছরের স্কুল থেকে ফিরে আসা বর্ষার দুপুরে

মা আমাকে বুকে জড়িয়ে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলেন।  

আমি মা কে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলাম। মাও কাঁদতে লাগলো। 

 সেই থেকে একজন ফর্সা আর একজন কালোর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নার শুরু। 

স্কুলের ফাউন্ডেশন ডে তে  নাটক হবে, "পরীর দেশে "।

আমাদের ক্লাশের সব মেয়েকে নেওয়া হলো, এমনকি শ্যামলা মেয়েকেও, কিন্তু আমি বাদ গেলাম, কারণ আমি নিখাদ কালো। কালো পরী কি হয় কখনো?

 

মা বাবার সঙ্গে বসে নাটক দেখলাম।

ভেতরে কাঁদলাম।

কিন্তু বাইরে ঝরলো না।

কারণ আমি তখন ক্লাশ এইট।

কান্না গেলা শিখে গেছি।

 

গান গাইলাম। ইংলিশ ব্যান্ডের গান। বাবা শেখাতো গান ও গিটার দুটোই। সারা স্কুল আমার সঙ্গে গাইলো। আমার কালো রঙে স্কুল ছেয়ে গেলো।

ক্লাস ইলেভেন।

প্রথম ভালো লাগা।

জানতাম আমাকে কেউ চিঠি লিখবে না গোলাপী চিরকুটে, শিউলির দিনে। 

নাম তার সাগরকেতু। অন্য স্কুলের। কোচিং ক্লাসে দেখা হতো। ভীষণ ব্রিলিয়ান্ট।  অগোছালো চুল। ভারী লেন্স। শুধু  মনে হয় দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে। 

আমার সঙ্গে  সব  ছেলেদের দারুণ বন্ধুত্ব। মেয়ে বন্ধুরা আমাকে খুব নিরাপদ ভাবতো। ভালোবাসা দ্বিখন্ডিত হওয়ার ভয় নেই। 

আমাকে ভুল করে ভালোবাসার ভুল কেউ করবে না। অতএব আমি বিশ্বাসী।

ততদিনে আমি মানিয়ে নিয়েছি। এক্সপেক্টটেশন নেই আমার।

তবু কিশোরীবেলা। 

অভ্রান্ত ভালোলাগা,  কালবৈশাখীর মতো আমাকে উড়িয়ে দিচ্ছে মুহূর্ত ভেঙে ভেঙে, পড়ার টেবিল উপচে উপচে।

একটি খুব অপমান পেতে সাধ হলো।

 

সেই ছেলেকে বলে ফেললাম, চোখ বন্ধ করে। একটি হাসি, একটি অট্টহাসি শুনলাম। আর তাকালাম না।

কোচিং ছেড়ে দিলাম।

বাড়ি, আমার গভীর পড়ার টেবিল, এন্ট্রান্স পরীক্ষা। মেডিকেল। ডাক্তার হলাম।

বদলে দেওয়া যায় না  মানুষের গায়ের রঙ। জানি সব বায়োলজিক্যাল মিথোস্ক্রিয়া। তবুও....। জয়েন

করেছি আজ এক সাঁওতাল গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সবাই কালো এই গ্রামের। আমি তাদের কালো ডাক্তার। যেতে পারি ইচ্ছে করলেই ঝাঁ চকচকে শহরের নার্সিংহোমে। আমার ফর্সা,  সুদর্শন ডাক্তার বন্ধুরা জয়েন করেছে অনেকেই এখানে ওখানে।

যাবো না।

 

এটাকেই বলে পালানো। নিজের থেকে, ফর্সা রঙ্  থেকে।

 

সব অর্জিত হলো শুধু সেই তাকানোটা সহ্য করতে পারি না। সেই যে চেম্বারে যেকোন পেশেন্ট ঢুকলেই

প্রথমেই আমার অসম্ভব কালো রঙের দিকে তাকায়। যেন মেলাতে পারে না, পারে না কিছুতেই। তাই আমি কালো মানুষদের সঙ্গে থাকি, একটি তাকানো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে।

ন্যাশনাল কনফারেন্সে এসেছি। এপ্রিলের  দিল্লী। গনগনে দুপুর। ফিনফিনে লু । 

লাল শাড়ি পরেছি।

টকটকে লাল।

একমাত্র লাল কালোতেই যে দুলে ওঠে পৃথিবী।

প্রতিবাদ।

জেদ।

যেন রোদে দ্রবীভূত হবো। 

হোটেলের পাঁচফুট বাই তিনফুট বিশাল আয়নায় দেখছি আমাকে।  একদম আগুনের মতো লাগছে।

 

বলবো ।পুরো দেড়ঘণ্টা সময় বরাদ্দ আমার প্রেজেন্টেশনের জন্য। 

 পুরস্কারও আছে। WHO এর প্রতিনিধি তুলে দেবেন হাতে।

  পলাশবন সাঁওতাল পরগণার গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার আশ্চর্য উন্নতি হয়েছে। সব বাঁধা ভেঙে আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামে গ্রামে। স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির ভোলও বদলে গেছে। এসবই সম্ভব হয়েছে এক তরুণী ডাক্তারের আন্তরিকতায় আর পরিশ্রমে। 

আজ তাই ডা: শাল্মলী রায়  বিশেষ ভাবে আমন্ত্রিত। 

তাকাচ্ছে আমার দিকে সবাই  খুব বেশী করে।

ভেতরে একটি কান্না ,  ঠান্ডা  বিষ ছুটছে যেন!  

কোনদিন কি মেরে ফেলা যাবে  এই তাকানোকে? 

মনখারাপের বিজ্ঞানী

 মনখারাপের বিজ্ঞানী 

...................চিরশ্রী 

 

একটি দিন। দীর্ঘ দীর্ঘ গাছ।

গোধূলি বয়ে যাচ্ছে। লাল রঙের আকাশ।

 রাস্তা। মিছিল হচ্ছে। কিছু মানুষ হেঁটে যাচ্ছে নীরবে। সবাই এক উচ্চতার। হলুদ রঙের পোশাক।

এটাই এখন শোকের পোশাক।

নয়শো বছর আগে শোকের রঙ কালো ছিল। এখন মানুষ শোকের দিন হলুদ পরে।

সবার হাতে ছোট ছোট পাতার পতাকা। একজন বিজ্ঞানী মারা গেছেন। তার জন্য সবার মনখারাপ।

এই মনখারাপটাকে চোখের তলায় রেখে তাই একদল মানুষ হেঁটে যাচ্ছে।

মনখারাপ খুব মূল্যবান একটি জিনিস। 

কয়েকশো বছর আগে পৃথিবী থেকে মনখারাপ হারিয়ে গিয়েছিল।

তখন একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের অভালোবাসাবাসি হলেই, পট করে খুন করে ফেলতো। কিন্তু তারপর সে কাঁদতো না।

রক্তটক্ত মুছে, হাসতে হাসতে জল খেতো।

খুব মুশকিল হয়ে গেলো। রোবটেরা অনেক মাথা খাটিয়েও মন বস্তুটার সন্ধান পেলো না।

মানুষ তখন খুব অলস ।  যন্ত্ররাই চালাচ্ছে পৃথিবী। 

আবার রোবট নষ্ট হলে মানুষ ছাড়া তাদের ঠিক করা যায় না, তাই রোবটরা চায় মানুষ বাঁচুক।

ঝগড়া আর মারামারি না চলুক। 

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করতে সব মানুষের উচ্চতা আর গায়ের রঙ এক করে দেয়া হলো।

পৃথিবী তখন দীর্ঘ ছায়াবৃক্ষে ভরা। বৃক্ষকাতর  পৃথিবী বলা যায়। তার তীরে তীরে হিংসা দীর্ন মেধাবী মানুষের ভীর।

তাদের কোন মনখারাপ নেই।

তাই কান্না নেই।

হাসিও নেই।

বিষাদও নেই। 

ভালোবাসার বিপন্নতাও নেই। 

সেইসময় একজন বিজ্ঞানী এলেন। তিনি বললেন মানুষকে দুটো ভাগে ভাগ করতে হবে।

যাদের মধ্যে একটু আবেগ আছে তারা নীল গ্রহে থাকুক।

যাদের মধ্যে আবেগ এক্কেবারে জিরোতে ঠেকেছে, তাদের অন্য গ্রহদুটোতে পাঠানো হোক। 

 হোয়াইট ড্রিম A তে এইসব মনখারাপ হারিয়ে যাওয়া মানুষদের পাঠিয়ে দেয়া হলো। মিল্কি ওয়ে পেরিয়ে হোয়াইট ড্রিম A, সেখানে যেতে সময় লাগলো ঠিক  একশো বছর, ঠিক পাশেই হোয়াইট ড্রিম B, যাদের জায়গা হলো না, তারা B তে।

তারপর সেই বিজ্ঞানী মন খারাপের চাষাবাদ আরম্ভ করলেন।

তিনি মাথায় রাখলেন সিঙ্গুলারিটি।

একজন পুরুষ এবং একজন নারী।

মুখোমুখি বসবে।

মাঝখানে একটি ব্ল্যাকবস্ক।

বাতাসবিহীন।

নিঃসীম অন্ধকার।

তারা নির্বাক থাকবে।

এই ব্ল্যাকবস্কটিতে টেনে নেওয়া হবে তাদের মন।

একশ ভোল্টের ঠান্ডা তরিৎ প্রবাহ

ফ্রিজড হয়ে যাবে দুটো মন 

সমস্ত বিচ্ছিন্নতা মিশে চরম সিঙ্গুলার

সেখান থেকে ঝরতে আরম্ভ করবে বিন্দু বিন্দু মেদ 

এরই নাম অশ্রু, এরই নাম মনখারাপ, 

এরই নাম না ফেরার ব্ল্যাকহোল। 

...এরই নাম বিজ্ঞানও ক্রমাগত ভুল।

এভাবে আস্তে আস্তে পৃথিবীর বুকে জোড়া জোড়া মনখারাপ ফিরে এসেছিল।

শোকের রঙ ফিকে হতে হতে হলুদ হয়ে গেলো।

সেই বিজ্ঞানী আজ মারা গেছেন।

আর মনখারাপের জাতকেরা হলুদ পোশাকে পাতার পতাকা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, বৃক্ষ সঙ্কুল পৃথিবীতে। 

দীর্ঘ কবিতা...এক

দীর্ঘ কবিতা ...এক

এক প্রবল আলো এসেছিল, অবিশ্বাসী, ধুলোময়
আমাকে বলতে এসেছিল, আমি আছি, বিস্ফোরণে
আলোর মধ্যে দিয়ে গেলাম, লতানো নাগরিক সত্ত্বা
কেঁদেছিল করাতের বুক, তবে কি তারো আছে হৃদয়
থমকে দাঁড়ালো মিছিল, মুখ নীচু করা অবয়ব
পাথর ভেঙেছে যারা, তাদের হাতে ফুটেছে জীর্ণগ্রন্থ
একটি পৃষ্ঠায় ঋতু ঝরে, অপর পৃষ্ঠায় বিকৃতি
প্রতিপালিত দাম্পত্যের মতো অভ্যস্ত রাতচূর্ণ
কখনো নির্নিমেষ তাকানো হয় না, গ্রীবাতেই পতন

সব ফিরে আসা যদি ভুলপথে ঘুরিয়ে দেওয়া যেতো
যেমন করে আকাশভর্তি নিম্নচাপ ভুলে যায়
নির্দিষ্ট সীমান্ত,
উচ্ছিষ্ট বস্তি হাসি ছড়ায় সাগর কিনারে,
অন্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াচ টাওয়ার
একবার যে চলে যায়, সে পায় বিরহের ঠিকানা
কত দুরন্ত বৃষ্টিতে লেখা হয়  ছাতা ভাগ করার গল্প

পুরোনো কথারা বেড়াতে আসে ঝিনুকের দোকানে
নিঃশব্দ বসবাস তাদেরও ছিল শক্ত ডানার নীচে
যেদিন থেকে ছড়ালো তারা অভিমানের বাজারদর
কেমন অনভিজাত ময়লা রঙ, গ্রাস করছে শ্বেত মুখ তার

আত্মগত হবার আগে ছেয়ে  যায় ধূপগাছে ভরা পাহাড়ী জনপদ
আগুনের গল্প শোনেনি তারা শুধু ভাঁপে জ্বেলেছে নবান্ন
পিঠে পাতে ভুলে যায় চাঁদশিশু , তার হাতে আছে পূর্বজন্মের নারী ও অস্ত্র
এতটা সরল জলও কখনো হয়নি, অন্তরে রেখেছে শৈবাল ষড়যন্ত্র

এখানে হাজার হাজার মিথ্যার বারংবার চাষাবাদ
মেঘলা দিনে কালো ফসল জাগিয়ে রাখে
প্রতিহিংসার গুচ্ছ গুচ্ছ শীষ
হৃদয়ের কথা লিখতে পারা দেবদূত রেখে দেয় কলম
ঝকঝকে সবুজ ছুরিতে সে অগ্রন্থিত সময় কাটে
সাদা পাতায় অবিশ্রান্ত বিরোধ আঁকে
মৃত্যুুর কাছে থেমে থাকা তরুণী হাসতে থাকে
কত অপমানে অবশেষে সে সোনা হচ্ছে, জ্বলছে প্রদীপের মতো

অসমাপ্ত দীর্ঘ স্তবকের সেগুনবাগিচার ছায়াঘন আশ্রয়
যে সুরে বিউগল বাজে, তার কাছে চেয়েছে নীরব প্রতিবাদ
বিন্দু বিন্দু ত্রাস জমিয়েছে অদৃশ্য সাগর ঝড়
অভ্রান্ত দিকনির্দেশনায় সেও জানে এসব কিছু নিতান্তই সস্তা
মুক্তো ব্যথা নিয়ে যে ঝিনুক তুলে দেয় আপনপ্রাণ ডুবুরীর কাছে
কন্ঠ জড়িয়ে থাকা মুক্তাসমূহ জানে শুধু  বিষাদ আর   নীল উল্লাস

প্রতি অপমানে স্নিগ্ধ হই, জ্বেলে দিই হোমের আলো
জ্বলতে জ্বলতে প্রলম্বিত অগ্নিকে দেখি কলমের মতো
ফিরে আসি, ফিরে আসি, অক্ষরের কাছে,
আরো কাছে, বার বার, বার বার, প্রত্যেক বার।

মরুভূমির দিকে

মরুভূমির দিকে (প্রকাশিত, "সাগ্নিক ")

লিখবো বলে শরতের দুপুরে বসেছি, কোথা থেকে ঝাঁক ঝাঁক পরিযায়ী পাখির দল, যেন ঘরময় উড়ছে ছেঁড়া ঠিকানা , শিশু নদী... খুঁজে পাচ্ছে না সাগর, এভাবে লেখা যায় ! আবেগ এলো অঝোর অঝোর, কলম গলে জল, বইতে লাগলো চোখ নাক চিবুক ছাপিয়ে কাঁপিয়ে ভাসিয়ে, ওরে অশ্বারোহী ক্ষণকাল দাঁড়াও, তবু রাঙাচ্ছি নিজেকে, কত জোড়ে ছুটতে পারো দেখবো,  অট্টহাসি, কালীর মতো, কি রকম পাগল হচ্ছি, হয়েই যাচ্ছি বলতো, কোন অক্ষরের দিগ্বিদিক নেই, যেন অন্ধকার, ঝড় জমছে, বলে দিচ্ছে এই পৃথিবীকে মরে যেতে হবে, শিশুরা ভালো নেই, গাছেরা ভালো নেই, নদীরা ভালো নেই, সমুদ্র ভালো নেই,  মরুভূমি আদিগন্ত ...

ঘুম


ঘুম

মা বাবারা মরে গেলে চেনা ঘরবাড়ি /

রূপকথার হয়ে যায়/

শেষ রাতে সবাই আসে যাবতীয় বেঁচে থাকা নিয়ে /

এক সকাতর ভৈরবী রাগ আমার গভীরে /

সমাধান হয় না,  হিম সকালে ডুবে যায় পথঘাট/

চাঁদা চাওয়া চেনা মাস্তান যেন ভালো হয়ে গেছে/

 বন্ধ চিঠির মতো দ্রিমি দ্রিমি শহর /

খাম খুলে দিই , ছড়িয়ে পড়ি  রাস্তাময়  /

এখান থেকেই হাত বাড়াই/

রাতশেষে কুকুর বাড়ি ফিরে/

তারা যদি সঙ্গে নেয় আমাকে/

ঠিকঠাক তাঁবুতে ফেরা হয় তাহলে/

ব্যাগে ঘুম,  সোনালি কুয়াশায় কেনা /

ঘুমুলে মা আসে, বাবা আসে,/

পাশে জেগে থাকে, হাত ধরে। /

ঋতুক্ষরণের রোদচশমায়

ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় 

চিরশ্রী দেবনাথ

স্রোত প্রকাশনা

মূল্য একশ টাকা

পাঠকথা :মিলনকান্তি দত্ত 

কবি চিরশ্রীর দ্বিতীয় সংখ্যক কবিতার বই। কবি স্ব বচনে লিখেছেন '...একটি ভীষণভাবে মেয়েলিভাবনা নিয়ে বড়ো হয়ে ওঠা এই আমি এবং আমার কাছে কবিতা আমার সেই স্বপ্নের পুরুষ, তাই তাকে নিয়ে যতো ভাবি ততোই ভালো লাগে, ততোই স্নান করতে ইচ্ছে হয় ...",স্বাভাবিকতা এটাই, কবিপুরুষ যখন তার কবিতাকে 'বণিতা চৈব 'ভাবতে ভালোবাসেন, সে এক কল্পনালতা ও মানসসুন্দরী, সে এক রাণীর ঘাড়,  জ্যোস্না রাতে বেবিলনের... তখন ভীষনভাবে মেয়েলিভাবনা নিয়ে বড়ো হয়ে ওঠা কবি তরুনীর কাছে কবিতাকে একটি স্বপ্নের পুরুষের মতোই মনে হবে। স্নান করার অবচেতনাময় ইচ্ছেমালায় গ্রন্থিত বালিবর্ষা, দেবী শরৎ, হেমন্ত ধান, চন্দনশীত, বসন্ত ধুলো, চুর্ণগ্রীষ্ম সিরিজে ঋতুময় একাশিটি কবিতা। অসাধারণ ভাবনা, অনুভূতি এবং প্রকল্পনা। কবির উচ্চারনে নারী আছে, বাদ নেই। দেহগন্ধ তুমুলভাবে উপনীত কিন্তু কবিতার আদ্রর্তা লঙ্ঘন করে নয়। ভালো লাগে কবির চিত্রকল্প, শব্দনির্মিতি ...হৃদয় অলকানন্দা থেকে উৎসারিত অমোঘতরঙ্গগুলোর কবিতা রূপান্তর। আলাদারকম কোনো কবিতার উল্লেখ না করে কবিতাপাঠকের কাছে প্রত্যাশা রাখছি কাব্যটি পড়ে দেখার জন্য। কেন না চিরশ্রীর কবিতা কি  অনায়াসে বলতে পারে

"গনসঙ্গীতের সুরেও বর্ষা নামে

রবীন্দ্রগানের মতো আকুল কদম হয়তো নয় "...এমন নিযুত গন্ধরেনু, নারীময়, অথবা পৃথিবী জুড়ে পড়ে থাকা মাংসকাটার গান।

প্রচ্ছদ তার মতো করে কবি নিজেই এঁকেছেন, অকপট সারল্যের ছোঁয়া লেগে আছে রেখাপাতে। কবির দুটো ছবিসহ দু  'মলাটে বিস্তর কথালাপের দরকার ছিল না হয়তো, কবিতাই তো কবির বক্তব্য। মুদ্রনভ্রান্তি আছে, এই প্রকাশনা থেকে যেমনটা হয়, শেষপৃষ্ঠায় শুদ্ধিতালিকা সংযোজিত ...এসব প্রকাশকের অনবধানতা বা প্রযত্নমেধার অভাবকে স্পষ্ট করেছে।