গোল্ডেন ডাক

 চিরশ্রী দেবনাথ

গোল্ডেন ডাক 

অজিতেশ দেব বড়ো বুদ্ধিমান মানুষ এবং ক্রিকেট তার প্রিয় খেলা। অবশ্য বুদ্ধিমান হলেই ক্রিকেট প্রিয় খেলা হবে এমন কোন কথা নেই, কিন্তু অজিতেশ বাবু যখন থেকে ক্রিকেট খেলা দেখছেন তখন থেকে মনে হয়েছে, জীবন একটি ক্রিকেট খেলার মাঠ এবং তিনি একজন উইকেট কিপার। ব্যাটসম্যান বা বোলার না হয়ে উইকেট কিপার কেন সেটারও একটি কারণ আছে, তার মতে উইকেট কিপারই, টিমের প্রধান রক্ষক, তার সতর্কতা এবং পারদর্শিতা টিমকে টিকিয়ে রাখে, টিম অর্থে এখানে তার পরিবার। জনসংখ্যা বৃদ্ধির নিয়মকানুনকে তুড়ি মেরে তার চারখানা ছেলেমেয়ে। দুজন পুত্র এবং দুজন কন্যা ও একজন সুন্দরী, রন্ধনশিল্পে নিপুণা, পরচর্চা ও পরনিন্দায় পারঙ্গম পত্নী নিয়ে তার ছয়জনের টিম। আয়কর দপ্তরের অফিসার হওয়ার এতজন সদস্য নিয়েও তিনি দারুণ বুদ্ধিমত্তায় সচ্ছলভাবে সংসার পরিচালনা করেন। দুই কন্যাকে উচ্চশিক্ষার পরপরই, তার দপ্তরে সদ্য চাকুরিপ্রাপ্ত দুজন তরুন অফিসারের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন এ হলো তার টিমের দুটো শ্রেষ্ঠ ওভার বাউন্ডারী। 

অবসর নিয়েছেন। এখন  নিজেকে ভাবছেন ওপেনার ব্যাটসম্যান। সারা জীবন ঘর রক্ষা করেছেন, এবার রান তুলবেন, সোনালী ফসলে গোলা ভরবেন, আর হাততালি কুড়োবেন।  

ছেলেরা একজন ডাক্তার এবং একজন প্রোফেসর। প্রোফেসর হয়েছে ছোট ছেলে এবং সে বিয়ে করেছে সদ্য। অজিতেশ বাবুর স্ত্রী অনুপ্রভা দেবী বিস্তর আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ পাত্রী পুত্রের স্বনির্বাচিত, সুন্দরী কোনভাবেই বলা যায় না, কালো, মোটা এবং কর্কশ কন্ঠ, শুধু বিদ্যেধরী, পি এইচ ডি করেও আবার পড়ছে, ছেলের চাইতেও বেশী পড়াশুনো, একই কলেজে চাকরী করে তারা। এক্ষেত্রে অজিতেশবাবু স্ত্রীর তীক্ষ্ণ বোলিং এর জন্য  এল বি ডাব্লিউ হলেন।  ছোট ছেলে বিপক্ষের ব্যাটসম্যানের মতো ছক্কা হাঁকালো  এবং বিয়ে করে বাড়ি থেকে আলাদা হয়ে গেলো । দূরদর্শী কোচের মতো তিনি স্ত্রীকে লুকিয়ে ছোট ছেলের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন এবং বুঝেছেন, বউমার মতো গুণী মেয়ে পাওয়া দুর্লভ, যেমন সুন্দর ব্যবহার তেমনি সংসারী, শুধু তার স্ত্রী প্রথম থেকেই এতো বিরোধিতা করেছে যে, ওদের বড়ো আত্মসম্মানে লেগেছে। তাই আলাদা। অথচ এই বউ বাড়িতে থাকলে লক্ষ্মী এবং লক্ষ্মীশ্রী দুটোই বজায় থাকতো। এতো টাকা বেতন, সংসারে সুসার দিতো, কিন্তু তা আর সম্ভব নয়। তবুও তিনি ছোট ছেলের আশা একেবারে ছাড়েননি, বয়স হচ্ছে, আস্তে আস্তে ছেলেদের ওপর নির্ভর করতে হবে, এখন খামোখা এতো রাগ দেখালে চলে  ! 

আজ সকালে অজিতেশবাবু চা খাচ্ছেন, গভীর চিন্তামগ্ন, বড়ো ছেলের ব্যাপারে। চাকরী করছে ডাক্তারীর। প্রচুর মেয়ের বাবারা   রীতিমতো পেছনে লেগে আছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। বড়ছেলের বিয়ের সাকসেসফুল মিশনে অনুপ্রভা দেবীই প্রধান  নির্বাচক।   অজিতেশ বাবু বাধ্য হয়ে মিডল অর্ডারে আছেন  আপাতত।  প্রতিদিন বেশ কয়েকটি করে মেয়ের ছবি দেখা হচ্ছে এবং বাতিল করা হচ্ছে। দিনরাত ফোন আসছে ডাক্তারের মার কাছে এবং নির্বাচকের কঠোর মনোভাবের কারণে কোন অলরাউন্ডার কন্যা পাওয়া যাচ্ছে না।

এভাবে প্রায় একমাস কেটে গেলো। হঠাৎ একদিন মাঝরাতে অজিতেশ বাবুর মোবাইলে টুং করে মেসেজ এলো। ইদানীং ঘুম ভালো না হওয়ায় তিনি আধা জাগ্রতই ছিলেন।  বড়ছেলে পাশের ঘর থেকে মেসেজ করেছে, "বাবা একটু এ ঘরে এসো, জরুরী কথা আছে, মা যাতে কোনমতেই না জাগে ", ওহ্ এই না হলে ডিজিটাল ইন্ডিয়া। অতএব অজিতেশ বাবু উঠলেন এবং পা টিপে টিপে বড়ো ছেলের ঘরে এলেন। ছেলে ল্যাপটপ খুলে বসে আছে এবং সেখানে এক উচ্ছল জিনস পরিহিতা বয়কাট চুলের ভারী লেন্সের চশমা পরা তরুণীর ছবি। অজিতেশ বাবু যা বোঝার বুঝে গেলেন, বুঝলেন তাকে এখন পিচে টিকে থাকতে হবে, শুধু  টুক টুক রান তোলা, নো বাউন্ডারী, নো ওভার বাউন্ডারী, কোন রিস্ক নেওয়া চলবে না।  আস্তে আস্তে ম্যাচকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনতে হবে। এই কন্যাটি আবার পাঞ্জাবী, বড়ো ছেলের সঙ্গে দিল্লীতে একই হসপিটালে ইন্টারশিপ  করেছে, তখন থেকেই "বোল্লে বোল্লে ",  অজিতেশবাবু চোখ বন্ধ করে দম নিলেন,  তিনি বড়ো ছেলেকে কিছু বলবেন না,খুব বাধ্য ছেলে তার, দারুণ ছবি আঁকতো, গান করতো ,কিন্তু সবকিছুর শখ  ছেড়ে  সারা জীবন বাবার কথা শুনে ঘাড় গুঁজে পড়াশুনো করে ডাক্তার হয়েছে, একটু প্রেম ট্রেম তো করতেই পারে, মেয়েটিও  ডাক্তার, তায় আবার পাঞ্জাবী, তিনি নিজে কপিল দেব রামপাল নিখাঞ্জকে জীবনের প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করেন।  এখন অবশ্য  শচীন ভাবছেন নিজেকে , সামনে শ্যেন ওয়ার্নে হলেও কুছ পরোয়া নেহী।  তবে নির্ভুল  ছক সাজাতে হবে ।  মেয়ের বাবার  ফোন নাম্বার নিয়ে, কথা বলে নিলেন, বুঝলেন মেয়ের বাবাও একজন রানার্স টিমের ক্যাপটেন ।

অনুপ্রভা দেবী দীর্ঘদিন ধরে নার্ভের যন্ত্রণায় ভুগছেন। ছেলে ছুটিতে বাড়ি এসেছিল, এখন দিল্লীতে কর্মস্থলে ফিরে যাচ্ছে। বড়োছেলে মাকে বলল, মা চলো দিল্লীতে কিছুদিন থেকে ট্রিটমেন্ট করাবে, অনুপ্রভা বললেন আগে তোর বিয়ে হোক তারপর যাবো, অজিতেশ বাবু বললেন, ছেলের বিয়েতে খুব খাটাখাটনি হবে, চলো আগে ডাক্তার দেখিয়ে আসি। অনুপ্রভা অবশেষে নিমরাজি হলেন।  অতঃপর দুজনে মিলে ছেলের সঙ্গে দিল্লী গেলেন। ছেলে অর্থোপেডিস্ক, দিল্লীতে ফ্ল্যাটে থাকে।  একটি বিশাল  বেসরকারী হসপিটালে আপাতত কাজ করছে, মাকে সে নিয়ে গেলো সেখানকার নিউরোলজিক্যাল বিভাগে, খুব সহজ সরল দেখতে একজন দীর্ঘাঙ্গী জুনিয়র লেডী ডাক্তার  অনুপ্রভা দেবীকে প্রথমে পরীক্ষা নিরীক্ষা করলো, এতো সুন্দর হিন্দিতে কথা বলে মেয়েটি, অনুপ্রভা দেবীও বাংলা হিন্দি, ইংরেজী সব মিলিয়ে দারুণ ভাবে নিজের প্রবলেম গুলো বললেন। তারপর বিভিন্ন টেষ্টিং চলতে লাগলো, এই হাসিখুশি জুনিয়র ডাক্তারটি তাকে দিব্যি মম্  বলে ডাকে, কাছে এসে হাসিমুখে সব জিজ্ঞেস করে, একদিন অনুপ্রভা আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, তুম কোনসা কাস্ট কা হো বেটী, অজিতেশ বাবু চমকে উঠলেন, প্রথম বাউন্ডারী এতো অনায়াসে আসবে ভাবতেই পারেননি। মেয়েটি শান্ত ভাবে বলল, " আই এম্ ফ্রম পাঞ্জাব মা,  এন্ড আই এম এ পাঞ্জাবি গার্ল ", অনুপ্রভা কিন্তু চমকালেন না, দিব্যি হাসিমুখে চেয়ে রইলেন এক জোড়া ভারী চশমার নীচে একটি মায়াবী চোখের দিকে। বাড়ি এসে, অজিতেশ বাবুকে হিন্দিতে বললেন বাত্ চালাও, মুঝে ইস ডাক্তার বেটীকো পুত্রবধূ করনা হে।

রেলের অবসর প্রাপ্ত অফিসার জগজ্জীবন কাউর  তার ধর্মপত্নী মনোপ্রীত কাউরকে নিয়ে এসেছেন দিল্লী, স্থুলকায়া মনোপ্রীত হাঁটুর যন্ত্রণায় কাতর, অথচ সার্জারীতে ভীষণ ভয়। মেয়ে প্রীতম সদ্য ডাক্তার হয়ে কাজ করছে দিল্লীর একটি বড়োসড়ো হসপিটালে, সেখানেই এসেছেন দুজন, নরমসরম দেখতে, একটি লম্বা শ্যামলা বাঙালী জুনিয়র ডাক্তার মনোপ্রীতকে পরীক্ষানিরীক্ষা করে খুব ভালোভাবে বোঝালো কেন হাঁটু অপারেশন করতে হবে, না করলে কি হবে ইত্যাদি, মনোপ্রীতের ছেলে নেই, এই বাঙালী ছেলেটিকে দেখে শুধু মনে হতে লাগল এ যেন তরুন কৃষ্ণ ভগবান , মনোপ্রীত রাজী হয়ে গেলেন। পাঁচজন ডাক্তারের একটি টিম তার হাঁটুর সফল অস্ত্রোপচার করল।

একমাস পর, মনোপ্রীত কাউর আর অনুপ্রভা দেবী একসঙ্গে বসে, চা খাচ্ছেন অনুময়ের ফ্ল্যাটে বসে। সামনের মাসে দিল্লীতেই বিয়ে হচ্ছে, অর্থোপেডিস্ক অনুময় দেব এবং নিউরোজিস্ট প্রীতম কাউরের। পরে  যে যার বাড়িতে গিয়ে পার্টি দেবে। দু পরিবারই আর দেরী করতে রাজি হন। বিশেষ করে অজিতেশ বাবু একটু ক্লান্ত বোধ করছেন , মনে হচ্ছে ক্রমাগত চার মেরে মেরে তিনি হাঁফিয়ে উঠছেন এখন দরকার লাঞ্চ ব্রেক।

দুটো টিকেট কেটেছেন, সিঙ্গাপুরের,  ছেলে আর ছেলের বউকে হানিমুনে পাঠাবেন, টিকিট দুটো ফুলশয্যার দিন অনুপ্রভা দেবীকে দিয়ে ছেলের বউকে উপহার দেবেন। এটা অজিতেশ বাবুর স্পেশাল ছক্কা, এখান থেকেই যেন, নতুন ব্যাটিং বাকি ম্যাচ টেনে নিয়ে যেতে পারে। বিয়ে হয়ে গেলো ধুমধাম করে।  বিয়েতে অজিতেশ বাবুর দুইমেয়ে জামাই, ছোট ছেলে আর বউ এসেছে। প্রীতমদেরও ঘনিষ্ঠ কিছু আত্মীয় স্বজন এবং  প্রীতমের ছোট বোন অমৃতা এলো। বাঙালী আর পাঞ্জাবী মিলেমিশে একাকার।

অনুষ্ঠান শেষে, অজিতেশ বাবু  স্ত্রীকে যখন একথাটি বললেন, অনুপ্রভা হঠাৎ পুরনো মেজাজে ফিরলেন, মাত্র বিয়ে হলো, এখন একটু ঘরকন্না করুক, বাঙালীর আদবকায়দা শিখুক, এখনই পঁচিশদিনের এই লম্বা ট্যুরের কি প্রয়োজন? ছেলেকে পটিয়ে ফেলবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অজিতেশ বাবু বুঝলেন খেলা আবার শুরু, আর ব্যাটিং পারছেন না, এখন ফিল্ডিং, যথা সময়ে ক্যাচ তুলে ফেলতে হবে হাতে, স্ত্রী কে বোঝালেন সে তো সারাজীবনই করবে, কিন্তু এসময়টি তো আর আসবে না ওদের জীবনে, অবশেষে মনে ক্ষোভ আর মুখে চওড়া হাসি নিয়ে অনুপ্রভা ছেলের বউয়ের হাতে টিকিট দুটো তুলে দিলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে প্রীতম আই লাভ ইউ মম, ইউ আর সো গ্রেট বলেই অনুপ্রভাকে জড়িয়ে ধরলো, অনুপ্রভার মনে হলো তিনি কি যেন একটা পেয়েছেন মনের মাঝে,  যা কখনো হারাবে না।

অনুময় আর প্রীতম হানিমুন থেকে ফিরে এসেছে, মা বাবাদের জন্য প্রচুর উপহার। বিশেষ করে, অনুপ্রভা দেবীর জন্য প্রীতম এনেছে মুক্তোর চোখ ধাঁধানো সেট, আরো এটা সেটা। অজিতেশ বাবু মিটিমিটি হাসছেন স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আর নিঃশব্দে ক্যাচ তুলছেন।

প্রীতম রান্নাবান্না  কিছুই জানে না, তবে বুঝিয়ে দিলে সিরিয়াস স্টুডেন্টের মতো খুব তাড়াতাড়ি সব  শিখে নেয়। অনুপ্রভা মনে মনে ভাবলেন বেশ ভালোই হলো, নিজের মতো করে নেওয়া যাবে। দিন দিন শাশুড়ী বউ বন্ধুর মতো হয়ে যেতে লাগলেন, প্রীতমের সারল্য অনুপ্রভাকে আস্তে আস্তে দখল করতে লাগলো।

মাস চারেক হয়ে গেলো।   এবার, বাড়িতে গিয়ে একটি পার্টি দিতে হবে ধুমধাম করে, দিন ঠিক হলো, আগামীকালের ফ্লাইটে সবাই মিলে রওনা দেবেন বাড়িতে। রাতে হঠাৎ অজিতেশ বাবু প্রচন্ড বুকে ব্যথা অনুভব করলেন, সঙ্গে সঙ্গে নার্সিংহোম, আই সি ইউ ,  , নাহ্, অলরাউন্ডার অজিতেশ বাবু এই ইনিংসের শুরুতেই গোল্ডেন ডাক মারলেন এবং আউট। শুধু যেতে যেতে দেখলেন প্রীতম দুহাত দিয়ে আগলে রেখেছে অনুপ্রভা দেবীকে। 





ত্রিপুরা

ত্রিপুরা 

.......চিরশ্রী

মনে হয় এই শ্রাবণী কান্না থেমে যাবে 

মাত্র কিছু সময়, ভুলের শেষ, আবার সোনালী ধান 

ওই তো জানকী ত্রিপুরা রেখেছে হাত অসুস্থ ভাইের কপালে

এখন আঠারোমুড়ায়  দুরন্ত রোদ, পাহাড় ফেটে নতুন দিগন্ত

কোথাও রক্ত নেই, শ্লোগানে উৎসবের সুর

কে জেনো বুনেছিল নিষেধের জানালা দরোজা

রাশি রাশি তরুন  এঁকেছে তাতে অক্ষরের পর অক্ষর

একটিই দেশ, তারই নিরালায় আমাদের আজন্ম

নিঃশ্বাস ভরে ভাতের গন্ধ নেই, মিছিলে মিছিলে কথা বলি  তোমার সঙ্গে

দু মুঠো রাত আগামী জ্যোৎস্নার,

চলো মিঠে মিঠে আঁশটে স্বাদে চাটি

আঙুলে জড়ানো আমাদের যৌথ ক্ষুধা আর স্বপ্ন 

সাক্ষাৎকার, কবি রণজিৎ দাসের সঙ্গে

উনিশে মে ভাষা শহীদ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠান, "মাতৃভাষা প্রণাম দিবস, দুইহাজার সতেরো " তে বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি রণজিৎ দাস। অনুষ্ঠান শেষে, তার একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার। 
কথোপকথনে চিরশ্রী দেবনাথ।

যিনি ভাবেন, "সমাজের কাছে কবির দায়বদ্ধতা একটিই ...ভাল কবিতা লেখা "।



প্রশ্ন :          কবি রণজিৎ দাস কেমন আছেন?

উত্তর :    ভালো আছি।

  প্রশ্ন :                আপনি যে সময় থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন এবং এখন পর্যন্ত লিখছেন, তার সঙ্গে, একদম এসময়ে যারা কবিতা লিখছেন, তাদের কবিতার ভাষা বা আঙ্গিকের কি কোন সুস্পষ্ট ফারাক আছে অথবা সেই ভাষাটি কি বদলেছে?

উত্তর :      কবিতার ভাষা খুব প্রচ্ছন্নভাবে প্রতিটি প্রজন্মেই পাল্টায়, কারণ পরিবর্তনই শিল্পের মৌলিকতার ধর্ম, সেই হিসেবে আমার সময়ের কবিতার ভাষা থেকে বর্তমান প্রজন্মের কবিতার ভাষায় যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটেছে।

প্রশ্ন :  আপনার কবিতা আমরা ভালোবাসি, আপনি যখন কবিতা লিখেন তখন ব্যক্তি রণজিৎ দাস এবং কবি রণজিৎ দাস কি এক হয়ে যান না আলাদা আলাদা? 

উত্তর :  আমি মনে করি, কাব্য রচনার সময় কবির ব্যক্তিসত্ত্বা ও কবিসত্ত্বায় কোন বিরোধ থাকে না, আসলে এ প্রশ্নটিই গোলমেলে, কারণ, কবিসত্ত্বা ও ব্যাক্তিসত্ত্বা যদি আলাদা হয়, তাহলে একটি সত্ত্বাতে কিছুটা ফাঁকি মিশে আছে বলে ধরে নিতে পারি। কবির ব্যাক্তিসত্ত্বার

অন্তর্গত হৃদয়টিই হলো তার কবি সত্ত্বা।


প্রশ্ন : কয়েকটি সংঘবদ্ধ লাইনকে আপনি কখন কবিতা বলবেন?

উত্তর : সেই লাইনগুলোতে যদি কবিতার ক্ল্যাসিক গুণাবলী বর্তায় তাহলেই আমি সেই স্তবককে কবিতা বলি। ক্ল্যাসিক গুণাবলী বলতে সংক্ষেপে বলা যায় কাব্যভাষার সৌন্দর্য কল্পনার চমৎকারিত্ব, গভীর হৃদয়বত্তা এবং কবির জীবনদৃষ্টির মৌলিকতা।

প্রশ্ন : সময়কে ধরে রাখার দায়বদ্ধতা কি কবির আছে?

উত্তর : সমাজের কাছে কবির দায়বদ্ধতা একটিই ..."ভালো কবিতা লেখা "। ভালো কবিতায় সময়ের ক্ষতচিন্হ পড়বেই। সুতরাং আলাদাভাবে সময়কে ধরে রাখার আরোপিত চেতনা কবির প্রয়োজন নেই।

প্রশ্ন : আপনার লেখা আপনার প্রিয় কবিতার দুটো লাইন...

উত্তর : হাসি, নীরব রইলেন।

প্রশ্ন : ত্রিপুরার বাংলা কবিতার চর্চা এবং সার্থকতা সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?

উত্তর : ত্রিপুরায় বাংলা কবিতার চর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের এবং সেই চর্চার বৈচিত্র্য ও উৎকর্ষ অনেক। সুতরাং বাংলা কবিতার সামগ্রিক প্রবাহের ভিতরে ত্রিপুরার কবিদের কাব্যচর্চা নিশ্চয়ই সমৃদ্ধির ফসল যোগ করে চলেছে। 

প্রশ্ন : রাজনীতি, শিক্ষাঙ্গন, সমাজ, অর্থনীতি, ধর্মাচরণ এইসমস্ত কিছু নিয়ে আমাদের দেশ এখন কেমন আছে? কবির অনুভব ...

উত্তর : মানুষের ইতিহাস আমাদের সেই শিক্ষাই দেয় যে যেকোন একটি যুগে একটি রাষ্ট্র এবং তার সামাজিক পরিস্থিতি কখনোই সার্বিকভাবে ভালো থাকে না, ভালো এবং মন্দের প্রবল দ্বৈরথ চলতেই থাকে, সেই হিসেবে বর্তমান সময়েও ভারতের সামাজিক পরিস্থিতি মোটেই সার্বিকভাবে আশাব্যঞ্জক না।

প্রশ্ন : কবি কি শুধুই বিমূর্ত কিছু লাইনের রচয়িতা হবেন না বর্তমানকে বিষয় হিসেবে নিয়ে, সময়ের ভাষ্যকার হবেন?

উত্তর : কবিতার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবন রহস্যের উদঘাটন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সময়ের ভাষ্যকার কথাটির আলাদা গুরুত্ব থাকে না।

প্রশ্ন : ত্রিপুরা এসে কেমন লাগলো?

উত্তর : খুব ভালো লাগলো। 

ঔষধি প্রেম

ঔষধি প্রেম

.................

আজ এই সময় অশান্ত

অবসন্ন তরুণের চোখে  ছেঁয়ে আছে নগ্নআকাশ

 জমছে কোথাও কথাহীন বসন্তের বিকেল, মুকুলসন্ধ্যা

পথে হাত বাড়িয়ে দেওয়া  নির্জন কফিঘর

 থমকে থাকা সময়ে পাখির পালক তুলে নিচ্ছে

ঘরফেরত কয়েকজন এবং অনেকজন বৃদ্ধ

তাতে নাকি মিশে আছে তরুণের অবসাদ, প্রেম এবং যৌনতা

শেষ চিঠি তারা কেউ লিখেনি

কালো অক্ষর ভেসে আছে ক্লান্ত শহরের জানালার ফ্রেমে

অবসাদ নিয়ে বৃদ্ধরা বানাবে ঔষধ /অনাস্বাদিত অযাপিত সময়ের

পান করবে  শ্রাবণী পূর্ণিমায়,  নিশিযাপনে

অবসাদে নারী আসে, লোভ ধুয়ে দেয় বেঁচে থাকার

পৃথিবীর ঘ্রাণে জেগে ওঠা এই সব নারীরা সেবিকা মাত্র

তাদের জন্যই তরুণ ও বৃদ্ধরা বিষাদের  প্রহর গুণে

মরে যেতে যেতে বেঁচে ওঠে...

রাজগৃহে

রাজগৃহে 

................

এক 

.......চিরশ্রী দেবনাথ

রাজগীর যত এগিয়ে আসছিল

আমি দেখছিলাম তুমি ক্রমাগত সাদা হয়ে যাচ্ছো 

তোমাকে মনে হচ্ছিল সন্ধ্যা এক, যেন বিপন্ন বৈশালী

 অজাতশত্রু এসেছে নগরপ্রান্তে, প্রভাতেই যুদ্ধ 

এই ধূসর শাড়ি তোমাকে আরো প্রাচীন করেছে

এখানেই সাম্রাজ্য, আমি আসি বার বার, মল্যযুদ্ধের মাটি দুগ্ধে ভেজা, কৃষ্ণছলে ভরা 

দুই 

......

গৃধ্রকূট পাহাড়ে বহুদিন পর অকালবর্ষা নেমেছে

আমাদেরই আগমনে, অহম্ মাল্যবান তুমি জয়শীলা

এরকম নাম মনে হয়, তোমার কাছ থেকেই স্বপ্নে শোনা,

এ স্তব্ধতা তোমার বুদ্ধজাত, শ্রমণ বিষাদে জারিত

বিম্বিসারের কালে রাজগৃহে শ্রেষ্ঠীগৃহে রবাহুত এক কন্যা ছিলে

এ জন্মে আমার কাছে, অপঠিত প্রত্নলিপি, আতশকাচে পড়া অশ্রু ও হাসি 

তিন

........

নগরীর দ্বার খুলে গেল, উষ্ণ প্রস্রবনের খনিজ ধোঁয়া

বর্তমান আমাদের নয় এখন, কুশাগ্রপুরীতে বসবাস,

ছুঁয়ে আছে দেড়হাজার বছর আগের ষোড়শ জনপদ,

চম্পানদী তীরে প্রাচীন গ্রীষ্ম কলহ। 

ডাইরীর পাতায় মগধের রাজকলম, আমি চৈনিক  পরিব্রাজক, তোমার মধ্যেই ইতিহাস সভ্যতার। 

কাষায় বস্ত্র পরিধানে,

তবুও চুরি করি চূর্ণ চুলে গাঁথা পত্র পুষ্প, পারস্য দেশের সুগন্ধি ও সন্দেহ।

চার

.......

বেদান্ত ঘটেছে যেন পঞ্চপর্বত বলয়ে, জেগে উঠছে

"ঈশাবাস্যমিদং সর্বম্ "

সব ভার লঘু হোক, হৃদয়ে জমছে  ছায়াহীন দেবগৃহ

গুহামুখ মন্ত্রময়, ঈশ্বরের সঙ্গে জাগছ তুমি

কোনদিন সাধক হবো না, পথচারী রবো আমি প্রিয় গহনে 



পাঁচ

.......

শাক্যপুত্র, প্রশ্ন ছিল! শান্তি কেন চাই? অশান্ত থাক সব, 

সমৃদ্ধির জন্ম হোক রাজদন্ডে, সৌধের গায়ে থাক ইর্ষার ক্ষুধা 

কালশিলা, স্বপ্তপর্ণী, চৌরপ্রপাত ঘুরছি,

ধুলোতে যেন পাচ্ছি  রাজভক্তি, বিচ্ছিন্ন মন্ত্র উপনিষদের 

সম্বোধি লাভের সন্ধিক্ষণে দেহ ছেড়ে বেড়িয়ে যায় অন্ধকার, আলোকিত তুমি, আমিও ছিলাম তোমার পাশে। 

মগধের কলরবে শ্রমণের মিছিল,

জয়শীলা বলেছিল তার দেহে অসুখ ছিল তখন  খুব

ঔষধি উপচার এনেছিল শ্রেষ্ঠী পিতা জীবকের গৃহ থেকে

তারপরে আর বলে না, যেনো এক ধর্মান্তর, ক্ষয়িত ব্রহ্মচারীণি,

এই সময়ে, সোন নদীতীরে, জরাসন্ধীয় বিভাজন মেনে

চলো আমরা  মিশে যেতে থাকি বিস্তীর্ণ মগধভূমিতে। 

নির্জনে

নির্জনে 

..............চিরশ্রী দেবনাথ 

এখানে নির্জন নয়, তাই কথা হবে না 

চলো আরো ঘর, আরো বারান্দা পেরোই এবং উঠোন 

একসময় বসবো পাশাপাশি, রামধনু পড়ে থাকা মাঠে, 

আশ্চর্য! কি অশান্ত নির্জন হয়ে গেছি আমরা ...

একটি কথাও ভেসে আসছে না,

দখিন দুয়ার বন্ধ হয়ে গেছে কবে কোন বেলায়। 

হিসেব


হিসেব

.........

আমাদের হাত কখনো কাউকে ছোঁয় না 

একটি স্বর্গ মাঝখানে অনতিক্রম্য 

আমরা আলো জ্বালি, হাতগুলো আলোতে আলাদা হয়ে যায়

এসব প্রাপ্তি অপার্থিব, ভেসে আসে জরাহীন মূহুু্ু্র্তে

নির্বাক ঔষধ গিলে যাওয়া সময়ে

তারা বালকবালিকার মতো কোলাহল করবে।