চন্দন শীত


চিরশ্রী দেবনাথ 

চন্দন শীত 

.................

এক

গ্রহান্তরে কোটি বছরের শীত

আমার পৃথিবীতে নরম শিক কাবাব,

আমি "না "বলায়,

সব পাতা থেমে আছে মাঝপথে

মুঠো থেকে খুলে দেবো শৈত্য প্রবাহ

বলবো সব পাতা ঝরে পরো এখুনি

এখন কি তবে বিশ্রামে গ্রহনারীরা,

এ বিশ্রাম, অপেক্ষা নয়, এ হলো মগ্নতা।

শুধু গাঢ়তম বর়ফপাত।

সূর্য যেদিন শীতঘুমে যাবে,

তাদের শরীরে  জমানো তেলের খনিতে, 

একটি আকুল বিস্ফোরণ, দিও সান্তা,

ছিটকে পড়ুক ঘুমের টুকরো, বিশ্রামের শ্বাস,

এতো গহীন জলে বেশীক্ষণ থাকতে পারি না

দম আটকে আসে, শৈবাল হলেও ...


দুই

আশেপাশে কোন বিমূর্ত প্রেমিক

একটি পক্ষীরাজ ঘোড়া পা ঠুকে ঠুকে কেন যে ক্লান্ত 

গ্রহ তো এখনো সবুজ, ধুলোর প্রাসাদে নতুন ধান

রাতকে ঘিরে হাঁটু ভেঙে বসে শরীরী  গ্রন্থ 

উড়ে উড়ে জমে উঠে ঝকঝকে ছুঁড়ি বরফ

এসবই প্রলাপ, আত্মরতি, বিড়াল লোভ

কয়েকদিনের  এই লেখা আসলে কল্পিত সত্ত্বা 

ছিঁড়ে, খুঁজে, খুঁটে দলিলের মুহুরী হিসেব

এভাবেই মিথ্যে যাপন.... নত হয়ে থাকা এক মানবী মুখ ...


তিন

26/11/2015 

হোটেল তাজমহলের সামনে 

ভারতদেশের মেয়ে এক

বাঁধভাঙা কাজলে

ছেলেমানুষ চোখের জল

উন্মুক্ত নাভিতে রুপোর নথ

ঢালা আছে তাতে, 

কারো কারো  একফোঁটা 

অশ্লীল ভারত

খালি দীঘল পা বেয়ে 

মুম্বাই সন্ধ্যার ফেনিল আলো, 

খোলাপিঠে খুনখারাপি 

লাল কালো ট্যাটু

নির্লজ্জ সন্ত্রাস চুঁয়ে পড়ছে রঙে রঙে, 

চাপা ঠোঁটে মোমবাতি চেপে

মেয়েটি উষ্ণ হচ্ছে,

26/11/2012 তে এখানে কেউ এসেছিল,

তারপর শুধু ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে এ গোধূলি ...

চার

.......................

সব সময় আমার পুড়ে যাচ্ছে  

ঋতুতে ঋতুতে শীতের মাঠে মাঠে,

মানুষীর গন্ধ  যেন  মুছে 

ফেলতে চায় ধূ ধূ সন্ন্যাসী জমি ....

অস্মিত শৈত্য শরীরে মেলেছে রোদ আলোয়ান

কুয়াশার প্রথম বিন্দুটি পৃথিবী ছোঁয়ার আগে

ঘুমিয়ে নেয়,  একফোঁটা,  নিবিড় শূন্যতায় 

আমি কিন্তু  জেগে থাকি মাটির রসে

হেমন্তের সব শষ্য কেটে নেবার পর উদ্ভিদের ডুবন্ত শিকড়ে 

এতো অহংকার কেন লেখক

দেখো চেয়ে

পৃথিবী বেজে বেজে উঠছে অনার্য মাদলে

আর

অন্ধকারের স্তবকে বসা ঈশ্বর, 

নদীপাত্রে ভরে নিচ্ছে আমার প্রবল মানুষী রাত....



পাঁচ

.............

গুহাস্নানে ক্লান্ত শুধু ক্লান্ত

কেন এই উদ্বাস্তুতা,  ধ্যান আর তন্ত্রময়তা! 

আমার শস্যস্বাদ  তোমার শীতভোর কেড়ে নেয়

এ ঘুম আমি কখনো দিতে চাই নি

তুমিই  ভেবেছ নিজের

মরনের কাছাকাছি একটি মাত্র গন্ডুষে

পান করে নেবো কর্ষনের সব স্বাদ

কীট, ফসল আর শিশিরের এই আলপথ

ব্রাত্য করে গেলো দুজনকেই।

তবু মনে হয় যদি ফিরতে এখনই, এইমাত্র ....


ছয়

...........

ঝাউ বন ধীরে বহো

শ্বাসাঘাতে জেগে যেতে পারে প্রবাল প্রাচীর

রাতশেষে এখনি ঘুমোল সে...

কখনো কি শুনেছো ঝিনুকের গান?

দুই খোলের মাঝে রক্ত হয়ে ঝরে পরে বালি সুর 

নিবিড় মুক্তোটি ক্ষত মেখে মেখে নিটোল হয়

লবনস্বাদে তার কোন বিতৃষ্ণা নেই,ক্ষয় নেই

শুশুকের আঘাতে সে ঢেউয়ের কাছে সঁপে নিজেকে

দেবতার তুলিতে ক্রমাগত  অসাবধান  রঙীন হওয়া

মৎসপুরুষেরা চায় তার অকালবার্ধক্য.....

তবু এই অবিরাম শ্যাওলা শৃঙ্গার কেন যে

তাকে প্রতি রাতে নতুন করে  শুধু .....



সাত

17/11/2015

বাতাক্লাঁ কনসার্ট হল, ক্যাফে দ্যঁ বিরে 

লা বেল একি পে, এসবই খুব চেনা এখন

নোতরদম গির্জার সামনে ভারী বুটের শব্দ

কতদিন ধরে শুনছি

তৃতীয় বিশ্বের কিছু ছিটকে পড়া লাল রঙ্

ছবির শহরে কয়েকটি মৃত্যু এঁকেছে, এই তো !

তেরঙায় ছেঁয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সৌধ সব

আমাদেরও তিন রঙ্, মাঝে মাঝেই লালে লাল

প্রথম বিশ্বের নীলাভ পার়ফিউম

কখনো কি সে রঙের মাংশাসী গন্ধ মেখেছে গায়?

তবু বলি ভালো থেকো আইফেল টাওয়ার

তোমার সঙ্গে কথা আছে আমার

শীতার্ত রাজপথে সব উষ্ণ রক্তে মিশে আছে

তৃতীয় পৃথিবীর  জেহাদী চুম্বন

তারা কোন বসন্তের অপেক্ষায় নেই

রক্তের ছবি বার বার মুছে দিতে 

তাদের যে একটাই  পতাকা .....

আট

.....................

আসরাফ ফায়াদ

প্যালেস্টাইনের কবি বা পৃথিবীর

জেলের গরাদে ছুঁয়ে থাকা

আরোও একটি অসহায়তা

মৃত সমুদ্র ও শীতকাতর মাটির গন্ধ

শুষে নিয়েছিল, কিছু শব্দ বা পংক্তি।

তারা তোমাকে এনে দিল মৃত্যুদণ্ড

কবির মৃত্যু, কবিতার মতো সুন্দর নয়

মৃত্যুর আগে এখানেও প্রিয়জনের মুখ থাকবে

যন্ত্রণা ও এক পেয়ালা উষ্ণ না চেনা, ধোঁয়া ওঠা

রক্তারক্তি অনুভব কামড়ে ধরবে স্বাদগ্রন্হী

যন্ত্রণা, কষ্ট তোমাকে ছিঁড়ে দেবে

সত্ত্বা ছুঁয়ে নামবে বীভৎসতার ফুটেজ

এ অনিবার্য, হয়তো আজ বা  কাল

অথবা কিছুদিন পর একটি তাজা খবর

হবে তুমি কবি ....

তবু কেউ কেউ লিখে, বেঁচে থাকতে চায় না তারা,

মৃত্যুদন্ড কবিতাকে অমর করে ...

নরকের যন্ত্রণা দিয়ে ঝলসে ঝলসে বলে দেখো, দেখো ...

নয়

............................

পাঠানকোট (29/11/2015)

উবু হয়ে বসে থাকা যেন  অসুস্থ অশ্বখানি

পাঠানকোটের রক্ত

কুয়াশা ভেজা মাটিতে মিশছে একটু একটু, 

পাকিস্তানের মাটি আবারো লালে লাল, 

লাজুক পৃথিবীর প্রিয় রক্তারক্তি লাল গোলাপ,

পাপড়ির কোলে সাঁতার কাটছে দেবশিশুরা

তাদের হামাগুড়িতে ম্যাপ ওলটপালট

পাহাড়, মরুভূমি, দীর্ঘ মালভূমি

অপেক্ষা করে

 ঋতু প্রত্যাবর্তনের, আত্মসমর্পণের 

তবুও শুধু অস্ত্র চাষ

অবিশ্বাসী বরফপাতে ঢাকা কারখানার পর কারখানা 

এই চাষে  কোন তরফদারি নেই ......


দশ

............................

এভাবে বলো কেন তুমি? 

জানো না ! 

এখানে একই সঙ্গে

মশলারাত,  নিহত কাশবন, 

আমায় গিলে খায়,

আমি তাদের ভিতরে শুয়ে থাকা সঙ্গীন শীত,

বিপদসীমায় আচ্ছন্ন এক নদী হতে , 

এখনো বহু দূর যেতে হবে আমায়.......

এগারো

.............................

কখনো কখনো ঘরে ফিরি, 

মাঘজোৎস্নায় ভিজে থাকি সারাদিন।

দহনের আগে অথবা পড়ে, 

তখন অবেলায় চোখ জ্বলে ওঠে

কি তোমার?

এ বনাঞ্চল উপদ্রুত, অনেক আগেই ঘোষণা করেছে

মন্দমেঘ

বনজ  স্তব্ধতা দিও তবু

ধোঁয়ার স্তবকে আকাশের স্বাদ 

কিছুদিন, আরো কিছুদিন ঘন হয়ে থাকো

তোমার ব্যর্থতা আমার মাদক, নেশাদুঃখ

ডুবতে তবু এতো সময় নিচ্ছি কেন ...


বারো

বসন্তের আগেই প্রবল ভূকম্প হবে...

রিখটার স্কেলে মাত্রা ছাড়াবে অভিমানী ভূগর্ভ,

তার আগে না হয় বয়ে যাক কবিতা ঝড়, 

উড়ন্ত, ফুটন্ত, ডুবন্ত ...

আমার চাই সলিলসমাধি

আজন্ম পিয়াসী যে....

মাটির স্তরে স্তরে তোমার অভ্র অহংকার, 

গলে গলে  জল হবে সেদিন ...

পৃথিবী আমার বুকময় শুধু দীর্ঘ রাত্রিকাল যাপন করে,

রেখে যায় এক  নিষিক্ত ফুলবন,

তারা রূপান্তরিতা স্বপ্নদুহিতা,

সুগন্ধি ভাসিয়েছে মাটির কলসে

আমি শরীরী মৃত্তিকায় মিশাই সেই গন্ধরেনু

এসময় নারীময়, দহনে গলনে মিশ্রণে নারীবিন্দু,

এই শতক, তারো পরের শতকে, আরো সহস্রমুহূর্তে,

এইসব গন্ধরেনু যোনিতে জননে  পরিচয় রেখে যাবে...




তিনটি পাপ


রিনরিনে বিকেল। ফিঙে পাখির মতো একটি মেয়ে। কলেজ,  থার্ড ইয়ার। ফিজিস্ক অনার্স। নাম  ওড়না। ওড়নার আজ একটু মনখারাপ। রেলিং দেওয়া  লম্বা বারান্দায় দাঁড়ানো। বিকেলের গ্রীবায় হাত রেখে সন্ধ্যা নামছে। ওড়নার দাদু ইজি চেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে চশমার কাচ মুছছেন।

 আমার কিছু কথা ছিল। দাদু শুনছেন না। তিনি এ মুহূর্তে

পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করছেন। সেটি হলো চশমার কাচ মোছা। এখন সাত দশমিক আট রিখটার স্কেলে প্রচন্ড ভূমিকম্প হলেও তিনি নড়বেন না। চশমার কাচ মুছে যাবেন, মুছেই যাবেন। আসলে রৌনকবাবু জানেন, ওড়না এখন কিছু বলবে না।  ভেতরে দারুণ নিম্নচাপ। রাতে ঝরবে অঝোরে এই বৃদ্ধ মানুষটির কাছেই। কারণ মা বাবার কাছে ওড়না ততটা ফ্রি নয়, যতটা দাদুর কাছে।  এ বিষয়ে অবশ্য ওড়না একদিন নিজস্ব একটি মতামত দিয়েছিল, যে,  পৃথিবীতে কাঁদতে হয় কেবল বিশেষ কোন মানুষের কাছেই, সবার কাছে কান্নাকাটি করাটা দুর্বল পার্সোনেলিটির লক্ষণ। এখন যদি তিনি মরে যান, তবে ওড়না কার কাছে কাঁদবে? সে কি পেয়েছে সেরকম বিশেষ কেউ?  না বুকে জমিয়ে জমিয়ে নিজে একদিন পাথর হয়ে যাবে ! যেমন অনেকেই হয়। 

 তীব্র অনুভূতির, তীক্ষ্ণ মেধার ভোরের মতো সরল মেয়েটিকে তিনি বড়ো ভালোবাসেন। কি হয়েছে, কি সমস্যা, পঁচাত্তর বছরের রৌনক দত্ত বড়ো চিন্তায় পড়েছেন। রাত বারোটা। ওড়নার ঘরে লাইট জ্বলছে, চুপচাপ পর্দা সরালেন। বসে আছে । কাঁদছে বলে তো মনে হলো না। 

ল্যাপটপ খোলা, বিছানাময় বই ছড়ানো।

দাদুকে দেখেই গম্ভীর হয়ে  বলল, দাদুভাই সমস্যাটা হৃদয়ঘটিত  নয়। উঃ যাক। তবে?

ওড়না গম্ভীর হয়ে বলল ব্যাপারটা রাজনৈতিক।

এই রে সেরেছে ! 

আচ্ছা দাদু তুমি জীবনে কি কি পাপ করেছো?

সর্বনাশ ! রৌনকবাবু সচেতন  হয়ে বললেন, সে হবে অনেকগুলো পাপ। 

সবগুলো তো মনে নেই, এই অল্পকিছু মিথ্যে কথা বলা, অসুস্থতা ইত্যাদি অজুহাত দেখিয়ে বিপদের দিনের বন্ধুকে দুঃসময়ে না দেখতে যাওয়া, ধার চাইলে না করে দেওয়া, বিবাহিত জীবনে কয়েকবার হালকা প্রেমে পড়া ইত্যাদি।

 

ওড়না বললো, ঠকিয়েছো কাউকে? কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা? রৌনকবাবু মাথা দুলিয়ে বললেন, নাহ্, জ্ঞানত না।

তুমি কি জানো দাদু আমি তিনটে পাপ করতে যাচ্ছি।

যেগুলো একই সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং ঠকানো। 

রৌনকবাবু ভেতরে ভেতরে চমকালেন, বাইরে স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করলেন তা শুনি কি কি পাপ?

ওড়না একটু চুপ করে থেকে উত্তর দিলো, আমি আমার বন্ধুর কাছ থেকে ওর গার্লফ্রেন্ডকে ছিনিয়ে আনছি।

আরে ছিনিয়ে আনছিস মানে, তুই কি হোমো সেক্সুয়াল হয়ে গেলি নাকি?

উঃ দাদু, তুমিও না ! জানো তো আমার একজন রোগা সোগা, ইনটেলেকচুয়েল ছেলে বন্ধু আছে। 

হুম্। রৌনকবাবু সরু চোখে তাকিয়ে আছেন নাতনীর দিকে।

তারপর বললেন, তুই তো বললি সমস্যাটা রাজনৈতিক? এখন তো তা মনে হচ্ছে না।

কেন দাদু প্রেম তো এক বিরাট  রাজনীতি ! মহাভারত যত মন দিয়ে পড়ছি ততই আরো বেশী করে বুঝতে পারছি।

রৌনকবাবু মনে মনে ভাবলেন ওকে মহাভারত পড়তে দিয়ে কি ভুল করলেন, মুখে বললেন, বুুঝলাম।  ঝেড়ে কাশ তো, অনেক হয়েছে। 

দাদু সামনেই কলেজ ইলেকশন। আমাদের চন্দ্রকেতু লোভে পড়েছে এবং এমন একটি দলের হয়ে তার যাবতীয় বুদ্ধিদীপ্ত বাচনক্ষমতা উগরে দিচ্ছে যা আমি জাস্ট সহ্য করতে পারছি না। আর পরী, এতো ব্রিলিয়ান্ট মেয়েটা, যে তাকে ভুল পথে  যাওয়া থেকে আটকাবে, সে কিনা পেছন পেছন ঘুরছে, ওকে ইনস্পায়ার করছে।

এখন পরীকে যদি ওর পাশ থেকে সরিয়ে আনি , তাহলে চন্দ্রকেতু অনেকটাই দুর্বল হয়ে যাবে, মানসিক অবস্থা খারাপ হবে, অমনোযোগী হবে, ফলত সে তার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।

এটা হলো আমার প্রথম পাপ।

রৌনকবাবু চমকে গেলেন। এই সুন্দর ভালো মেয়েটি কবে থেকে এরকম ধুরন্ধর হয়ে উঠেছে। এ কি তার চোখের সামনে বড়ো হওয়া সেই পাখিটি , যার পাখায়  আচমকাই আঁকা হচ্ছে যেন এক অন্ধকার প্রাসাদের পথ।

কিন্তু ! কিন্তু নয় দাদু, আমি এটা করবো। স্কুল থেকে আমাদের মনে একটা বিশেষ বোধ জন্ম নিয়েছে, এই বোধের অপমান আমি সহ্য করতে পারবো না।

কিন্তু, পরীকে কি করে সরিয়ে আনবি?

আমার আকাশকে দিয়ে দেবো।

হোয়াট? রিলেশন কি জিনিসপত্র নাকি যে, ছিনিয়ে আনবি, দিয়ে দিবি। এভাবে খেলা করে না ওড়না। তুই এরকম কবে থেকে হয়ে গেলি, এতো নির্মম প্র্যাকটিকেল ! আশ্চর্য !

হ্যাঁ, দাদু, তাই হয়েছি। সব মেয়েরাই কি নরম নরম,  ন্যাকা ন্যাকা,  দুখী দুখী হবে নাকি ? আমার আইডিয়ালিজমকে যেভাবেই হোক রক্ষা করতে হবে। আর পরী আসলে মনে মনে আকাশকেই ভালোবাসত। কিন্তু আকাশ লাইকস্ মি। 

আকাশকে যদি আমি এখন রিজেক্ট করি, আকাশ খুব কষ্ট পাবে, কিন্তু  সেই মুহূর্তে পরীকে পেলে আকাশ আঁকড়ে ধরবে।

ব্যস।

আকাশ পলিটিক্স করে না।  খুব অপছন্দ করে। মেধাবী ছাত্র, ভবিষ্যতে  পি এইচ ডি করবে, বিদেশ যাবে, পরী হ্যাপিই হবে আখেরে।

আর বুঝতেই পারছো এ হলো আমার দ্বিতীয় পাপ।

রৌনকবাবু স্তম্ভিত হয়ে ওড়নার মুখের দিকে দেখছিলেন, ঠোঁট দুটোর মধ্যে কি শুষ্কতা !

আকাশের টিন এজ চুমুগুলোও কি ফিরিয়ে দেবে কঠিন মেয়েটি ...হেমন্তের পাতা ঝরা অরণ্য হয়ে গেছে ওড়না,  কিছু দূূূর গেলেই যেন শুরু হবে বরফের  ঠান্ডা মরুভূমি।

ওড়না একটু হেসে বললো, আর তৃতীয় পাপের কথা জানতে চাইবে না দাদু?

রৌনকবাবুর মাথা ঝুঁকে আছে, মনে মনে  তীব্র  চীৎকার করছেন, বলছেন, "না, না, না, এ হয় না ", কিন্তু কেউ শুনছে না।

ওড়না বললো, আমি চন্দ্রকেতুর কাছে যাবো।

ওকে ভালোবাসি বলবো। আস্তে আস্তে ফিরিয়ে আনবো। আমাদের পথ এক, মনের দূরত্ব অনেক হলোই বা। 

পলিটিক্স আর আইডিয়ালিজম, খুব ইম্পপরট্যান্ট এই সময়ে।

সামান্য ভালোবাসাবাসির অদলবদল ঘটিয়ে  যদি চন্দ্রকেতুকে ফিরিয়ে আনতে পারি, তবে পরবর্তীতে বড়ো রাজনৈতিক পরিসরে অনেক সুবিধে হবে, আর আমি তো রাজনীতিটাকেই বেছে নিতে চাইছি। 

হয়তো চন্দ্রকেতুকে আপাতত এই ভালোবাসার অভিনয় দেখাতে দেখাতে, ভালোবেসে ফেলতেও পারি। 

তবে অভিনয়টা করবো তো এখন, সেজন্য এটা আমার তৃতীয় পাপ, কি বলো দাদু? 

নাহ্ ওড়না পেছন ফিরে আর দাদুকে দেখতে পেলো না। 

রাত প্রায় দুটো, দাদু  বিষণ্ণমনে নিজের ঘরের দিকে চলে যাচ্ছেন,  তিনি হতভম্ব হয়ে গেছেন।

ওড়না দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো, বারান্দার কম আলোয় মেঝের ওপর চৌকো চৌকো ছায়া পড়েছে, গ্রীলের ফাঁক দিয়ে আসা অন্ধকারগুলো সেই চৌকোর মধ্যে ঢুকে আছে।  যেন দাবার ছক।

একুশ বছরের ওড়না পা মেপে মেপে অনিশ্চিত দাবাখেলায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলো, দেখা যাক ! 

মনিপুর পদাবলী

মণিপুর পদাবলী

   © চিরশ্রী দেবনাথ

মাইমুখ তলে রাসবালিকা, রত্নবিধুরা পলয় গোধূলি
রাজনিয়ম তুলহ কন্যা, কন্ঠে এনে বলিছ  আজো
মানি নি, মানি নি, মানবো না
বসন্ত রাত জানে শুধু লাইহরোওবা, সাদা ধুতি একাকী
মণিপুর তো আসলে নৃত্যজাত,
মিশমি পাহাড় ক্রমাগত বৃক্ষসম্ভবা,
উর্বরা করেছে তাকে লাইনুরাদের সবুজাভ রজঃ, স্বেদপ্রবাহ

রাসলীলা আসলে বহুদূর
উদ্ধত কোকতুম্বি ইশারা দিয়েছে

শুদ্ধ যোনি মেয়েরা করে তির অভ্যাস,
ভোজনের থালায় ঢেলে দেয় নীরব ধোঁয়াপুঞ্জ, পদাবলী নাম্নী সে

জানি শিকার করতে পারোনি সাংগ্রাই, আঁখিমেঘদূত যে তাদের নির্ভুল বজ্রজাত

শৃঙ্গের অহংকারে শুধু ঝলসেছে নীল উপবীত
তাতেই তাকায়েছে ভারতদেশ,  একবার নয়, অনেকবার...

( প্রকাশিত, শারদীয় কবি সম্মেলন, ২০১৮ )

প্রেমে সন্ত্রাসে, আলোচনা, কবি সেলিম মুস্তাফা

০২.০৭.২০১৮

“...কৃষ্ণবরণ মেয়ে বসে থাকি আঙিনায়
সত্তায় শুধু নারীর গন্ধ...”

এ পংক্তিগুলো তাঁর, যিনি ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞান-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-প্রেম-পরিহাস-নারীবাদ নিয়ে স্মৃতিমেদুর ও গভীরসঞ্চারী কবিসত্তার এক নারী-কম্যাণ্ডো । কবি চিরশ্রী দেবনাথ । কবিতার জগতে পদার্পণের মাত্র দুই-তিন বৎসরের মধ্যে তাঁর আগ্রহ আর গতি চোখে পড়ার মতো ।

এ পর্যন্ত তাঁর তিনখানা গ্রন্থ প্রকাশিত । “জলবিকেলে মেঘের ছায়া” (ফেব্রুয়ারী ২০১৬), “ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায়” (ডিসেম্বর ২০১৬) এবং “প্রেমে সন্ত্রাসে” (ডিসেম্বর ২০১৭) । আমি আজ “প্রেমে সন্ত্রাসে” পড়ব । তবে তিনখানা বই-ই আমি পড়েছি । প্রথম বইটি কবি নকুল রায়ের নজরদারীতে বেরিয়েছে “স্বতন্ত্র মেধা” থেকে, তাই এতে বানানের ত্রুটি থাকাটা ভালো লাগেনি । দ্বিতীয়টি বেরিয়েছে  “স্রোত” প্রকাশনা থেকে । এতে এতোবেশি বানানের ত্রুটি রয়েছে যে একখানা শুদ্ধিপত্রও জুড়তে হয়েছে শেষ পৃষ্ঠায়, এবং সেটাও নির্ভুল নয় ! তৃতীয়টিতেও রয়ে গেছে দুয়েকখানা ত্রুটি । এটা প্রকাশ করেছেন “নীহারিকা” ।
আশ্চর্য !! কবিতার বইয়ে কটা শব্দ আর থাকে ?
এই কথাগুলো আমি না-বললেও পারতাম ।

  

তবু বলা এজন্য যে, লেখক স্বয়ং ভুল করলেও প্রকাশকের তা মেনে নেয়া উচিত নয়, কারণ বইটা তার সংস্থার একটা সম্মান ও বিশ্বাসবাহী একটি প্রকাশ । নির্ভুল বই প্রকাশ করেন এমন প্রকাশক যে ত্রিপুরাতে নেই, এমন নয় । বানান ভুল থাকতেই পারে যেকোন কারোর অনবধানবশত, কিন্তু সেটা পাঠকরা ঠিকই বুঝে নিতে পারেন । টক-দই আর পোকায় কাটা বেগুনের বিশেষ কিছু খরিদ্দার আছেন বটে, কিন্তু বইয়ের বেলায় তা খাটে না ।

আমরা কবিতায় ফিরে আসি । কবিতা ছাড়া কে আর মলম লাগাবে ? কবিতা আশ্রয় । কবিতা পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্ম ।

“...যারা মানুষ খুন করবে বলে নেমেছিল
তাদের প্রেমেরা ঘাতকের হাসির মতোই শীতল
মাটির রঙ খুঁজে পেতে, এইসব মানুষেরা
রক্ত দিয়ে ধুয়ে দেয় ভুল প্রেম, ভুল সন্ত্রাস
জমাট বাঁধা নারীর মতো হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকে সময়...”  (প্রেমে সন্ত্রাসে / পাঁচ)

একজন কবি নাকি সারাজীবন একই কবিতা লিখে যান । খণ্ডে খণ্ডে রঙে রঙে । তাই হয়তো প্রকৃত কবিতা কখনো সাজানো চমকের ডালি বা শেষ পংক্তিতে কোন বিস্ময়ের সাজানো হোঁচট নিয়ে আসে না । চিরশ্রীর কবিতার কোন নাটকীয় ‘সমাপ্তি’ তেমন একটা লক্ষ করা যায় না । এটা অত্যন্ত শক্তিশালী আত্মবিশ্বাসের নজির তো বটেই । কবির স্বাতন্ত্র্য তাঁর ‘দেখা’-কে নিজের মতো করে রূপদান করাতেই । আর এই কাজটায় এই কবি যথেষ্ট আন্তরিক । এই কবি একজন নারী, কিন্তু তাঁর নারীবাদ চিরন্তন ‘নারী’কে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত রেখে এবং মুষ্টি-তোলা সস্তা ও উগ্র প্রতিবাদের অসারতাকে মনে রেখেই আঁকা বা বলা, যাকে ডিঙানো অসম্ভব । “জমাট বাঁধা নারীর মতো হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকে সময়...”  এই পংক্তিতে সময় ও নারীকে একাকার  করে দিয়ে তিনি যেন ছুঁড়ে দিলেন তাঁর প্রথম তাস ।

“ভীষণ গভীর রাতে
মধ্যবিত্ত শহরের খোলা ছাদগুলোতে
জমা হয় শহরের সব বিশ্রী মেয়ের প্রেম

তারা রঙ মাখে, চুল বাঁধে, চুলে দেয় গুলঞ্চ ফুল
সেইসব প্রেমেরা গুছিয়ে বসে ফিসফিস করে

শহর জেগে গেলেই আবার তারা
ঢুকে যায় ঘুপচি মনের গহবরে
প্রতিরাতে এভাবে তারা বুড়ো হয়
তারপর এক গরীব দুপুরে
মেয়েরা তাদের প্রেম বেচে দেয়
সমাপ্তি সঙ্গীত গায় একটি মেয়ে
বাকি মেয়েরা দেখে দিনে দিনে
শেষ হয়ে আসছে গুলঞ্চ ফুলের ঝোঁপ”  (গুলঞ্চবেলা)

কোন তীব্রতা ছাড়াই, সমাজের ব্যাকগ্রাউণ্ডে ক্ষয়ে যাওয়া নারীত্বের এই উপস্থিতি ঘোষণাই এক গম্ভীর প্রতিবাদ, যা মোটেই নালিশ নয় । নালিশ দিয়ে কবিতা হয় না । নালিশ আর প্রতিবাদ যে এক জিনিষ নয় এটা অনেক ‘বিগ’ কবিরও মাথায় ঢোকে না, এমন আমরা প্রায়শই লক্ষ করি । কবির কাছে কেউ অন্ধতা  চায় না ।

আমার কখনো মনে হয়েছে কবি চিরশ্রী দেবনাথ একটু কথাপ্রবণ । মনে হয়েছে প্রথম দুটি গ্রন্থের সেই ঝর্ণা পাহাড় কন্দরের আড়ষ্টতা কাটিয়ে এখন সমতলের জনপদ ঘেঁষে পূর্ণ মাত্রায় কল্লোলিনী, যা ক্রমে আরও গাম্ভীর্যে আরও এলাকা নিয়ে ছড়িয়ে যাবে ।

কাঠের বাংলোয় নবদম্পতির হানিমুন রাত কাটানো, বৃক্ষের জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে যাবার অভূতপূর্ব অনুভূতি...
“...কেয়ারটেকার বলে যায়
এই পুরো ঘর কেবল দুটো সেগুন গাছের
পাশাপাশি ছিল বহুকাল, বাংলোটি এ জায়গাতেই
তাদেরই দেহে সাজানো আসবাব...
...খণ্ডিত আসবাবের শরীরে জেগে ওঠে অসমাপ্ত
ফিসফাস...”      (হানিমুন বাংলো)

নারীসত্তাকে যেকোন অবস্থায় মহত্ব প্রদান করতে তাঁর অসংকোচ কলম বিন্দুমাত্র কাঁপেনি কোথাও । এর প্রমাণ আমরা আগেও পেয়েছি ।

“মেয়েরা বড়ো অস্পষ্ট হয় নিজের কাছে
তার ইচ্ছা, গোপন গোলাপ, সোনালি চুমু
উল্টানো সঙ্গম, হাত ছুঁয়ে রাখা ডিনামাইট
কোনটাই তার নিজস্ব নয়...
...তার চোখে, ঠোঁট, জিহ্বা
পোড়া কফির গন্ধ মেখে মেখে
লম্বা দীঘল পা ফেলে, পুরুষের চোখে মুগ্ধতা খোঁজে
মৌমাছির আঠালো রসের সৌখিন রসকলি যেন
একটা চোখ, কিছুটা মন, অসংলগ্ন কাম
তার নিজের হওয়া দরকার...”       (মথগন্ধা)

আরও পড়া যাক—

“যুদ্ধক্ষেত্রে আমি বেট রাখি
গভীর হয়ে আলিঙ্গন করি অস্ত্র সম্ভার
কেমন ঠাণ্ডা অস্ত্রের ত্বক, স্তব্ধ হৃদয়, আগুনে ভরা
আমার হৃদয়ে জমানো ত্রাস
জলবিহীন মৃত্যুতে আমি হারাব একান্ত সেই যোদ্ধাকে”  (বেট / চার)

কিংবা

“... এই বেটে নিজেকে রেখেছি গুহাচিত্রে, ভেষজ রঙে
জিতেছি আমি বেহাগে, শ্রাবণে, নিঃশেষে”           (বেট / পাঁচ)

এই জয় দাঁড়িয়ে আছে  “নিঃশেষে” শব্দটির দারুণ ব্যবহারে ।

“আমার শাড়ি বালিকারা” কবিতায় কবি বলেন—

“আমার শাড়িগুলো সব বেলাভূমির মতো
প্রত্যাখ্যান মেলে দিয়ে ছড়িয়ে যায় আধবুড়ো জ্যোৎস্নায়...”

এখানে ‘প্রত্যাখ্যান’ শব্দের প্রয়োগ অত্যন্ত সুন্দর এবং যথাযথ ।

একসময়, যখন থেকে কবিতা শ্লেষ বিদ্রুপের তির্যক কথায় ক্রমশ জটিল, সংক্ষেপ ও তীব্র হয়ে ওঠার প্রবণতা নিল, তা আশ্রয় করলো বিশেষ ভাষাপদ্ধতি, যাতে প্রবলভাবে দেখা দিল সমাসবদ্ধ (সমস্ত)পদের ব্যবহার । হাংরি আন্দোলনের বিশিষ্ট কবিদের একজন শৈলেশ্বর ঘোষ । তাঁর কবিতায়, আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার পাঠে, প্রথম লক্ষ করলাম তাঁর নবীন বয়সের কবিতায় সমাসবদ্ধ পদের বাহুল্য । পরবর্তীতে তিনি এই ব্যবহার কমিয়ে আনেন । বর্তমানে ত্রিপুরাতে অন্তত দু-জন কবির মধ্যে এই প্রবণতা এখনো বর্তমান রয়েছে খুবই তীব্রভাবে ।
জীবনানন্দের বহুব্যবহৃত “মতো” শব্দটি সকল কবিই খুব সচেতনভাবে এড়য়ে চলতে চান, তাঁর প্রভাব এড়ানোর জন্য । এটা বালখিল্য যুক্তি, এতে কোন সন্দেহ নেই । সমাসবদ্ধ পদ ব্যবহার করলে  এই “মতো”-টাকে কমবেশি এড়িয়ে যাওয়া যায় । সম্ভবত এ কারণেই একসময় কবিতায় এর প্রাদুর্ভাব দেখা যায় । দুটো শব্দ জুড়ে দিলেই হলো, এতে কবির সপ্রতিভতা, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, তীক্ষ্ণ কটুবাক্য ইত্যাদির রেসিপি খুব সুন্দর হয়, ফলে অটোমেটিক-কাব্যও হয়ে যায় । অবশ্যই সীমিতভাবে এর ব্যবহার কবিতার দিগন্ত প্রসারিত করে ।
কবি চিরশ্রীর প্রথম ও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে এই প্রবণতা লক্ষ করেছি খুবই বেশি মাত্রায়, যা আলোচ্য গ্রন্থে প্রায় নেই বললেই চলে । তাঁর এই পরিবর্তন তাঁর ভাষাচর্চার অগ্রগতিকেই সূচিত করে । আমার বলার উদ্দেশ্য এটাই যে, আমার বিশ্বাস অনুযায়ী ভাষার পরিণতি ক্রম-সরলতার দিকেই যায় । একজন সাহিত্যিকের, বিশেষ করে একজন কবির পক্ষে তাঁর ভাষার নিজস্বতা অর্জনই সবচেয়ে বড় কথা, অর্থাৎ নিজের ভাষা আবিষ্কার । কারণ আমি বিশ্বাস করি, একজন কবি তাঁর সমস্ত রচনার মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে নিজেকেই রচনা করেন, নিজেকেই আবিষ্কার করেন, তা তিনি যা-ই লিখে যান না কেন । কবির সততা, অর্থাৎ রচনায় তাঁর উপস্থিতি, তাঁর অস্তিত্বময়তাই তাঁর নিষ্ঠার প্রমাণ । চিরশ্রী ক্রমশ গড়ে তুলছেন তার নিজস্ব ভাষার ইমারত আর পাঠককে দিচ্ছেন সেখানে প্রবেশের অবারিত দ্বার । অর্ধেক আকাশের পুরোটাই তাঁর, এক চুলও কম নয় ।

“দু’কাপ চা তোমার আমার
খানিকটা চিনি...প্রথম বৃষ্টিপাত
উষ্ণ গাভীরস,
একটিই চামচ সেখানে
নাড়তে থাকে তোমাকে আমাকে ।”  (চা)

একটি অসাধারণ জৈব কবিতা, জীবনবাদী কবির কবিতা, জীবনের কবিতা, যেখানে অর্ধেক বলে কিছু নেই, পূর্ণতায় ঈশ্বর হয়ে আছে ।

তাঁর “বয়ঃসন্ধির ত্রিপুরা” নামক কবিতা থেকে কিছু কিছু অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি যা তাঁর বাস্তবতাকে কল্পনার রসায়নে জারিত করার নমুনা—

“বেতলিং শিবের চূড়োয় দাঁড়িয়ে
আমার পুরুষ ধনুকে ছুঁড়েছিল তির
এ তির বর্ষণোন্মাদ, অভ্রখাদক
ঝরে ঝরে পড়ছে কাচঝর্ণা, শামুকবাহার
ক্ষীণতনু শরীরী আহ্বানে জেগে যাওয়া জুমপ্রেম
সঙ্গমে সঙ্গমে মুছে দিতে চায় জাতির আগে ‘উপ’...  ( বয়ঃসন্ধির ত্রিপুরা )

কিংবা

“...একটি মনখারাপ পরিযায়ী পাখি
বাস্তু খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে আনে
ডম্বুরের মেঘমন্দ্র ডুবন্ত কান্না......

আমায় দিও তুমি চূর্ণ খারচি মন্ত্র, একটু দেবী-রঙ
পৌষের ব্রহ্মচারী সকালে
কিছু রোদ রেখো শিবকুণ্ডলে
পিতলের পাত্রে জমুক
তোমার আমার পবিত্র তীর্থমুখ......

স্তনভারে ফুটে আছে জম্পুই-র কমলা ভোর
মনু নদীর শীতচরে, পা মেলাচ্ছে মামিতাং দুপুর
উষ্ণ ঝর্ণায় গা ভিজিয়ে মা গো আমিই তোমার
বয়ঃসন্ধির গণতান্ত্রিক জুমিয়া মেয়েটি ।”        (ঐ)

কোন কোন কবির মতে কবিতায় স্থানিকতার প্রকাশ নিষ্প্রয়োজন । কিন্তু বিশ্বসাহিত্য ঘাটলে লক্ষ করা যায়, তাদের বেশির ভাগই স্থানিকতা-সমৃদ্ধ, যা সকলের আপন হতে কোনই বাধা ঘটেনি । উপরন্তু, একজন লেখক, তা তিনি কবি হোন আর ঔপন্যাসিক বা গল্পকারই হোন, স্থানিকতা তিনি এড়াবেন কী করে, আর কেনই-বা এড়াবেন ? তাহলে তো তাঁকে তাঁর মাতৃভাষাও এড়িয়ে যেতে হয় ! যা নিয়ে একজন কবি/লেখকের লেখক বা কবি হয়ে ওঠা, সেই মানুষ, সমাজ, সেই প্রতিবেশ যদি তিনি এড়িয়েই যান, তাহলে লিখবেন যা, তা তো অশ্বডিম্ব বা সোনার পাথরবাটি ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না ! অধিকন্তু, লেখক স্বয়ং একটি স্থানিক অস্তিত্ব ছাড়া আর কী ? যাক, প্রসঙ্গান্তরে আর না যাওয়াই ভাল । পাঠক অবশ্যই লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন আর অনুভূতিশীল । এ বিতর্ক আর ভালোলাগা না-লাগার ব্যাপারটা তাদেরই এক্তিয়ারে থাকুক । আবার কবিতায়, আমার ভালোলাগায় আসছি ।

নির্ভয়াকে নিয়ে অন্য ধরণের প্রতিবাদ, বা দেখনধারী প্রতিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, এবং সেই সঙ্গে এক নারীর প্রতি আরেক নারীর বা নিজেরই নারীসত্তার প্রতি সুগভীর মমতা আর সম্মান, যা  কবি প্রকাশ করেন ক্ষোভের মোড়কে—

“...নিষ্ঠুরতার গাঢ়তায় পৃথিবী
যোনি ছেঁড়া রক্ত মেখে নেয়,
শুধু সবার পাশে নির্ভয়ার মতো প্রেমিক থাকে না
এ পৃথিবী যেন ভরে যায় শুধু নির্ভয়ার প্রেমিকে
কতোকাল বাঁজা হয়ে আছে আছে এ মাটি
ধর্ষণ হয়তো তাকে এনে দেবে জলভরা সম্মান ।”   (নির্ভয়ার প্রেমিক)

এমনি অনেক কবিতার কথাই বলা যায় । আমার কথা বেশি হয়ে গেলে পাঠক বিরক্ত হবেন, তাই আপাতত থামছি । অনুমান করছি কবি শীঘ্রই নেবেন আরেকটি বাঁক । কারণ কোথাও কোথাও বিষয়ের ভারে কবিতার মেরুদণ্ড ন্যূব্জ হয়ে পড়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা । কবির রচনাশৈলীতে এখন পর্যন্ত শুধু বিষয়েরই পদচারণা, যা চেপে রেখেছে তাঁর আঙ্গিকগত সিগনেচার টোন । বিষয়কে গুছিয়ে অন্তরালে রাখার যে কাব্যিক কৌশল বা দক্ষতা তা হয়তো খানিকটা এখনো অনুজ্জ্বলই রয়ে গেল বিষয়েরই প্রবল তাড়নায় । অবশ্য তাঁর বেশিরভাগ কবিতায় দীর্ঘকবিতার একটি ব্যাপ্তি খুবই প্রবলভাবে উপস্থিত । মিতায়তন কবিতা রচনায়ও যে তিনি  কম পারদর্শী নন, এটার প্রমাণ তাঁর “চা” কবিতাটি । তবু, যে কথা বলার, তা বলতে না-পারলে লেখালেখি করারই-বা অর্থ কী ?
শেষ করার আগে কয়েকটি বিশেষ পংক্তি উল্লেখ না করে পারছি না—

“...রুদ্রসাগরের বুকে নরম কুয়াশা কেমন বেদুইন হয়ে ওঠে...”   (নীরমহল)

“...পৈত্রিক ভিটেয় আকাশ থাকে হলুদ রঙে ভরা
নীল আঁচলের মতো নেমে আসে ঘরের দেয়াল...”   (পূর্বজা)

“...ধর্ষণের পর থেকে এক ছবি মেয়ে
শুধু সঙ্গমের ছবি আঁকে
মোহ, সাপ, কলা, রস, ছোঁয়াচে অসুখ
ছড়িয়ে ছড়িয়ে আঁকতে থাকে বাৎসায়ন...”   (ছবি মেয়ে)

“আমি তোমার শার্টের বোতাম ঘরগুলো পুনর্নির্মাণ করি
ফাঁকে ফাঁকে ভরে দিই আমার দ্বীপ ও সমুদ্র...”   (বোতাম ঘর)

“...প্রবল জ্বরের দিনে
যেন হারিয়ে যায় থার্মোমিটার
তোমার হাত রেখো আমার বাহুবলয়ে...”   (থার্মোমিটার)

“...শিলং-এ খুব ঠাণ্ডা নয় এখন, তবুও রাস্তা খুব ভেজা ভেজা
ভিজে থাকে তোমার হাতের তালু যেমন সারাক্ষণ...”   (শিলং পাহাড়ে)

“...একটি প্রেমের কবিতা লিখতে বড় ভালো লাগে
মনে হয়  প্রান্তরে বসে আছি ধানের মতো
আমার থুতনিতে লেগে আছে কয়েক ফোঁটা সন্ধ্যা...”   (এসো হত্যা)

কবি তাঁর রচনায় কোথাও কোন উপদেশ বা দার্শনিকতার অবতারণা করেননি । যা তাঁর মনোবাঞ্ছা, তা অন্তঃসলিলাই রয়েছে । এটাও তার ‘কবি’-সত্তার আত্মবিশ্বাসকেই সূচিত করে ।

কবির উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি । তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রতীক্ষা থাকবে । ধন্যবাদ “নীহারিকা”-কে কবিতার অন্যমুখ দেখাবার জন্য । প্রচ্ছদ করেছেন ধর্মনগরের আরেক সুকন্যা মিতালী দেবনাথ । তাঁকে আমার অভিনন্দন ।