সাধারণী


চিরশ্রী দেবনাথ 

সাধারণী

নারীর কথা লিখতে গেলেই, আমার একটি, দুটি বা তিনটি বা আরো অনেক  মেয়ের কথা মনে হয়। তারা কেউ চাবুক নয়, শানিত নয়, তেজী নয়, মেধাবী নয়, কেউ আহামরি বিশ্রীও নয়, আকুল সুন্দরীও নয়। তারা বধূ। শুধু মুধু বধূ। আহার বানায়। ঘর গোছায়। টিভি দেখে। সন্তানকে পড়ায়। প্রিয় মানুষের জন্য সাজে। তাদের ঘাম লাগানো জামাকাপড় খুঁজে খুঁজে জড়ো করে। কাচে। হাতে বা মেশিনে। কোনটা কি ভাবে ভালো হবে নিজে নিজে ভাবে। যেন নিঁখুত থাকে কাপড়ের রঙ, সুতোর বাঁধন । 

 গানও শুনে নিজের মনে গুনগুন অথবা একটু জোড়ে। এই মেয়েরা অনেকেই গভীর নয়। হৃদয়ে বাসা বাঁধেনি শিকড় ছড়ানো অবাধ্য অশ্বথ। সন্ধ্যার আবাহন শেষে অনেক অনেক ঘরে সুগন্ধা ধূপের মতো তারা বিকশিতা হয়।

তাদের একটি গোপন মানি ব্যাগ থাকে। টাকা জমায়। এই টাকার কথা কেউ জানে না। এখান থেকে একটু খরচ হলে কড়ায় গন্ডায় হাজব্যান্ডের কাছে হিসেব চায়। ঝানু ক্যাশিয়ার, একেকজন, হু, বললাম তো।

 

আর পরিবারের বিপদে, প্রিয়জনের প্রয়োজনে,  এই মাঝারি নরম মেয়েগুলো নিজেদের সর্বস্ব এমনকি শরীর থেকে চোখ, ধমণী , ত্বক , কিডনী খুলে দেয়, একবারও না ভেবে, হ্যাঁ এমনি শক্ত তাদের ডিসিশন। বিনিময়ে চায় কি কিছু? মহৎ হওয়ার সোনালি সার্টিফিকেট। মনে করে আরে এতো কিছুই না। এ জীবনটাই তো দেবার। কি সাধারণ এই অসাধারণতা।

 

তাদের বর্ষার দিন আছে। পেঁয়াজি মুড়ি আছে। রান্নার বই দেখে অপরিনত দক্ষতায় কেক বানানোর বহুবারের প্রচেষ্টা আছে।

বিয়েবাড়ির তত্ত্ব সাজানোর তৎপরতা আছে।

হ্যাঁ গো, তুমি গো প্রচুর ন্যাকামো, ঢলে পড়া আছে।

 

সারারাত ঠাঁয় বসে থেকে জ্বরে ভোগা প্রিয়জনের নিমগ্ন সেবা আছে। পড়ের বা তারো পড়ের বহুদিন না ঘুমিয়ে কাটানোর অভ্যাস আছে। সারাদিন ঠাঁয় কাজ চালিয়ে দেবার সাধারণ ক্ষমতা আছে। হাসি হাসি মুখ আছে। অল্প আদরে গলে গলে জল হয়ে যাওয়ার জলপ্রপাত আছে। 

বাজার থেকে ঝুটমুট জাঙ্ক জুয়েলারি, সস্তার রঙচঙে জিনিস কেনার অপরিসীম ট্যালেন্ট আছে। সব্জিওয়ালার সঙ্গে ভীষণ তর্ক করার বাগ্মিতা আছে।

তাদের স্নানঘরে দীর্ঘ স্নান আছে, নিজেকে খুলে দেখার কিশোরী অশ্লীলতা ।  

 দুপুরে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। 

পাশে থাকে মাঝারি মানের ম্যাগাজিন, বই, এখন অনেকেরই ফেসবুক। 

তারা স্বপ্ন দেখে, ঝকঝকে একটি ডিনার সেট কিনবে, আর একটু পয়সা জমে গেলে বাহারী ক্রিস্টালের হরিণ।

সেই হরিণ থাকবে বসার ঘর আলো করে।

ঢুকলে মনেই হবে না  মধ্যবিত্ত জীবন ।

মনে হবে রাজ্যের পাশে একটি বন।

মেয়েটা সেই রাজ্যের রাণী। শিকারে বেরিয়েছে।

হাতের তালুতে মুঠো মুঠো আলো। হাসির আলো, "তোমার সঙ্গে মিশে আছি " এই কথাটি বলার আলো। যা দিয়ে সে তার বনের সব নির্ভৃত সুখ শিকার করে।

যোদ্ধা মেয়ে বটে তারা, সাধারণ সাধারণ খুব সাধারণ, তারা কিছু করে না, কিছু পারে না, একদম শুধু শুধু। 

কালী

একটি প্রণাম
..........................

এই ছবিটি দেখলেই মনে হয় ধুন্ধুমার কিছু লিখি,
নিজেকে চুরমার করি,  যেন এই আভূষন তাঁর নয়, তিনি গোধুলি, পর্বতমালা আর সমুদ্র পরিধান করে আছেন, এই সমূহ লাল আমার কলমে, আমার আধারে ঝরে যাক, ইত্যাদি ইত্যাদি, বাট হয় না।

কান্না আসে।

সেই কান্না,  যার উৎসে কোন দুঃখ নেই, অতৃপ্তি, অভালোবাসা, অপ্রেম, অপ্রাপ্তি, বিষাদ, অপমান, মৃত্যু--  নাহ্, কিছুই নেই, তোলপাড় জিজ্ঞাসা করেছি নিজেকে, পাইনি ! একটি ভীষণ পিওর জাফরান রঙের টিনএজ কান্না।

এই নারীকে দেখলে আমার আর শ্মশান, শবদেহ, মুন্ডমালা, রক্তপান, সুরা, শিব, কাপালিক, নগ্নতা, দেবীভাব, হেমন্তকাল, নদীতীর, জবার আহুতি, অট্টহাস্য কোনকিছুই মনে হয় না।

মনখারাপ লাগে শুধু।

এই সেই মেয়ে , যার কোন পারাপার নেই, এর মধ্যে দিয়ে আমি বয়ে যাব, মোক্ষভাব গচ্ছিত রেখেছি পদতলে, দরকার মতো চেয়ে নেবো, এখন তোমাকে দেখি, এ সৃষ্টির স্রষ্টা যিনি , দুরন্ত মেধা তার, সেই মেধায় আলো ছড়ায়, প্রণাম আসে মন থেকে ।

তাই তো?

একটি প্রণামের জন্য মন কাঁদছে, খুঁজে পেয়েছি কারণ।

একজন মানবী চাই, যার পায়ে লুটাবো তৃণদল, যাকে আভূমি প্রণাম করবো, তিনি সর্বাংশে রিক্ত হবেন, অসীমে পূর্ণ হবেন, পিওর হবেন...

....চিরশ্রী

প্রকাশিত, "কবি সম্মেলন ",অগাস্ট সংখ্যা, 2017

বন ও মরুভূমি

.......চিরশ্রী দেবনাথ 

এক 

ঠিকঠাক সংসারী হওয়া গেলো না 

মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাই করার অক্ষমতা জন্মগত দূর্বলতা

গ্রীষ্মের কাঁচাফলে হলুদ লবন লাগিয়ে সঠিক রোদে মাপতে পারি না 

খুব গরমের নেশাগ্রস্ত দুপুরে প্রায় বিলুপ্ত ঘুঘু পাখির অপেক্ষা করি

এই পাখিটির ডাক নষ্টালজিক কৈশোরের মতো, আজীবন পুরনোকেই সুন্দর বলে, যেন আমি রুদ্ধদুয়ার নবাবের মেয়ে 

এ পাড়ার ক্ষণজন্মা বউটিকে ভুলতে পারি না,

আমাদের গায়ে কি এখন সে গুল্মলতা হবে

মেখে নেবে অসমাপ্ত, হাবিজাবি সাংসারিক পথ্য, ফাঁক

দিয়ে গলে পড়া ঝুলনের জ্যোৎস্না! 

দুই

এসব নোনাধরা কাজের মধ্যে আমরা দন্ডকারণ্য দেখতে গিয়েছিলাম 

ঠিক কি ধরনের সংসার থাকে বনের আদরে ও অন্ধকারের নিবিড়ে

চোরাশিকারীর দলের কাছে বুক পেতে দেওয়া পুরনো সেই মেহগনী নারী

গাছ নত হওয়া শিখেনি, শেষ  হতে হতে মরুভুমি করে যায়...দেখে এলাম এসবই, 

সুবাসিত বসন্তের দিন সমাগত, জঙ্গলের স্মৃতি লিখছি 

নিহত পশুর দাঁত, চামড়া, রক্ত আমার শরীর জুড়ে, 

বনজ ফুলে লেখা এপিটাফে মৌমাছির গান। 

কাছাকাছি কোন অরণ্যে আবার  যাবো আসন্ন বুদ্ধপূর্ণিমায়, 

সেখানে বোধহয় কোন মৃতগন্ধ নেই। 


তিন

বৃষ্টির  একটি আলাদা গন্ধ আছে, "পেট্রিকোর "

এ গন্ধটি এখনো তৈরী করতে পারেনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুগন্ধি কারখানা

মনে হয় গন্ধটি পৃথিবীর নরনারীর নিরুচ্চারিত ভীতু ভালোবাসা

তার রঙ্ ও গন্ধ দুটোই চেনা গেলো না...

চার

...............

মরুভূমির অন্দরে

অসি চালনা শিখছে কিছু  ইরানী জেহাদী মেয়ে 

আগুনরঙা গায়ে সন্ত্রাসীর উর্দি

তাদের মা বাবা কোথায় থাকে, কোন পাথরের ঘরে

উড়ন্ত বাজ পাখি যেন তারা, হাতে ঝকঝকে ছুরি

তাদের কি মাসিক হয় না, কিশোরীবয়সের পেটব্যথা! 

 যুবকেরা লিখে গেছে নাম বালির অক্ষরে অজান্তে ,  তারা কি খুলে দেখে না সেই নাম এক জলহীন  সন্ধ্যায়, 

যে ক্ষত থেকে বাহুতে রক্ত ঝরে ,

সেখানে দিলাম আমি মৌসুমী বায়ুর ঠিকানা, আঙুরের ঝোপ, চাতকপাখির দল,

হে মরু অশ্রুমতী হও ...


পাঁচ

যে সময় চলে যায় 

আমি আর একটু ফাঁকা হই, মনে হয় এই দিনটিও গেলো তবে

কয়েকটি মুহূর্ত, জমিয়ে রাখতাম, আগে

 ভাবতাম, এসব বলা হবে কখনো, কোনদিন

এখন আর ভাবি না, কোন কথা বলবো বলে রাখি না। 

রাত হলে সব উড়িয়ে দিই 

তারা রই রই করে জানালার ফাঁকফোঁকর দিয়ে বয়ে চলে যায়, 

কিছু বেলা থাকতে, আমাদের সামনে কোনদিন

একটি পাহাড় আসবে, ঝর্ণা অথবা বনানী

অনামী অর্কিডের দল দেখবো, খুব কি কঠিন ছিল কিছু ! 

এখন মনে হয়, আমার তোমার এসব অসঙ্গত, ভাবতে নেই কখনো। 

লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে

লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে 

আমি একটি মেয়েকে জানি, জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছিল সে, তাপহীন দুধ ঠোঁটে তার বড়ো হওয়া কেউ আটকাতে পারেনি তবু। মা মারা গেলো বয়ঃসন্ধিতে। মামার বাড়ি। সাধারণ স্কুলের কয়েকক্লাশ পড়াশোনা, দিনে দু তিনবার অলক্ষ্মী গালি তাকে অজান্তে শক্ত জমি বানাচ্ছিল, যেন এখানে শালবীথি হবে কোনদিন, কোনও ভরা পূর্নিমায়। বিয়ে হয়ে গেলো। খুব তাড়াতাড়ি। মামা মামী বাঁচলেন। বড়োসড়ো সংসারে, অনেক মানুষ, বাঁচার লড়াই। আবার মৃত্যু। এবার আরো সাদা, ফটফটে খটখটে রঙহীন কোজাগরী। থেকে যেতে হলো এখানেই, যাবার জায়গা নেই বলে। দুটো বলিষ্ঠ মেয়েলি হাত আঁকড়ে ধরল আরোও কিছু অসহায় মানুষকে, দুইখানা চুরি কবেই ভেঙেছে। এবার সমবায় সমিতি, রোদে পুড়তে পুড়তে মাছ চাষ। টগবগিয়ে মাছ ছোটে পুকুরে, আরোও মেয়ে,  প্রসাধনে কাদা, পাঁক, জলের ঘাস অমসৃণ চুলে আটকানো, ঝকঝকে পয়সা আসছে অবশেষে, বাঁচার রাস্তা, রূপোলী মাছ লক্ষ্মীপুজোর থালে, দাঁত ঠিকরে চাঁদের হাসি, পরিবার আরো বড়ো হয়েছে,আশেপাশের দু গ্রাম চার গ্রাম, সময় নেই, দৌড়ুতে হয় যখন তখন, কত মেয়ে ডালপালার মতো জড়িয়ে ধরছে রোদে পোড়া জলে ভেজা বটগাছের মতো মেয়েটিকে, কপাল চিড়ে বড় হওয়া জ্যোৎস্না সিঁথিতে সারি সারি লক্ষ্মীর পা, দুটো উন্মুক্ত খোলা হাত যেন চার ফসলী ক্ষেত, কি বড়ো ফাঁকা কপাল, গভীর দীঘি সারি সারি, ডুব দিয়ে মাছ আনছে তুলে ধোঁয়া ভাত, কটা চোখ জন্ম থেকেই, একদম অলক্ষুণে যাকে বলে,কি আশ্চর্য কটা চোখ যেন ভরা তাম্রপাত্র, শ্রমে, মাছে, স্নেহে, অন্নে ভরা, লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে নীল জলে দাঁড়িয়ো, দুধসাদা ঘন চাঁদে স্নান করাবো, তোমাকে পুজো দিতে রাতের পর রাত আলো জ্বেলে আছি ...

.

ঊনকোটি সামার ক্যাম্প

চিরশ্রী দেবনাথ 

ঊনকোটি সামার ক্যাম্প  

ঊনকোটি সামার ক্যাম্পে, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে  অজস্র  ঘর থেকে মনোরম আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে, এই আলো গুলো কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে দেখা যায়, কিন্ত তবুও তীব্র নয়, চোখে ব্যাথা দেয় না। পুরো সামার ক্যাম্পের দায়িত্বে রয়েছেন, মিঃ মৌণপতি, চারহাজার একের প্রতিভাশালী বৈজ্ঞানিক। সামার ক্যাম্পের চারধারে বন জঙ্গল, পশু পাখি, সবার যথেচ্ছ বিচরণ। ঊনকোটি পর্বতগুচ্ছের নীচে দুরন্ত সমুদ্র, দ্য বে অব গ্রীন, সমুদ্রের জল এখানে সবুজাভ, প্রতিটি ঢেউ সবুজ জল নিয়ে ছুটে আসে। মাঝখানে ভেসে  রয়েছে অসংখ্য দ্বীপ। দ্বীপ গুলোতে বিভিন্ন রকম ফসলের চাষ হয়। যে মাটি যার উপযুক্ত। বহু আগে মানুষ ধান, গম, বাজরা, ভুট্টা, বিভিন্ন তৈলবীজ এসব ফসলের চাষ করতো। এখন বদলে গেছে খাদ্যশস্যের প্রকৃতি, স্বাদ, রঙ্, গন্ধ, গুণাগুণ। 

আসলে "সৃষ্টি 2"নামক ভয়াবহ গ্রহাণুটি যখন পৃথিবীতে আঘাত হানলো, ধ্বংস হয়ে গেলো, পৃথিবীর এক বিরাট অংশ। বদলে গেল ভূপ্রকৃতি, আবহাওয়া। গ্রহাণুটি যেসময় পৃথিবীর বুকে আঘাত হেনেছিল, তখন পৃথিবীতে চলছিল পঞ্চম পরমানু যুদ্ধ। পৃথিবী এমনিতেই সেসময় ক্ষতবিক্ষত। মানুষ ধুঁকছিল তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকারক প্রভাবে। বিকলাঙ্গ শিশুতে ভর্তি পৃথিবী  যেন অসংখ্য  প্রেতাত্মার বিচরণভূমি। জলে, হাওয়া শস্যক্ষেত্র সব  বিষাক্ত । ঠিক সেই সময় এই গ্রহাণুটি আছড়ে পড়ে পৃথিবীর ওপর। মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ তলিয়ে যায় কালের গর্ভে, যেখানে ছিল জনপদ, সেখানে হয়ে যায় সমুদ্র, সমুদ্র জেগে ওঠে পাহাড় হয়ে, নদী, গিরিখাত,  উপত্যকা সবকিছু বদলে যায়। মৃত আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠে, লাভায় ঢেকে যেতে থাকে শহরের পর শহর।  কিছু কিছু জায়গা চরম ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়। সমস্ত পৃথিবীতে সব মিলিয়ে বেঁচে থাকে এক মিলিয়নের মতো মানুষ আর পশুপাখি,  বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বনজঙ্গল। কিন্তু পৃথিবী টিকে যায় ভালোভাবে। এই গ্রহাণুটির মধ্যে এমনসব মহাজাগতিক রাসায়নিক পদার্থ ছিল, যা পরিবেশের সঙ্গে মিশে পৃথিবীর আবহাওয়াকে পরিশুদ্ধ করতে থাকে। মানুষ নিজেদের ভুলগুলো বুঝতে পারে।  পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষেরা  পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বেঁচে যাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদ, নদী, পশুপাখির প্রতি তারা অসীম যত্নশীল হয়ে ওঠে। শুরু হয় বিজ্ঞানের সেই সাধনা যা শুধুমাত্র মানুষের কল্যানে ব্যবহার করা হবে। ঠিক করা হলো যেকোন প্রকার  উদ্ভিদ ও পশুপাখিকে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে যদি কিছু ব্যবহার করতে হয় প্রকৃতি থেকে, তবে আগে আবার তা পুনর্গঠন করতে হবে।

সেই বিপুল প্রলয়ের বহুবছর পর আজকের এই স্বপ্নের পৃথিবী। পৃথিবীতে ধীরে ধীরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জনসংখ্যা ভীষণ নিয়ন্ত্রিত। প্রতিটি মানুষ ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত যত্নের সাথে বড়ো হয়। বড়ো হতে হতে তাকে নিজস্ব চিন্তার বিকাশের জন্য স্বাধীনতা দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে তার  চিন্তার জগৎ গড়ে ওঠে, সে কাজ করার জন্য একটি বিশেষ ক্ষেত্র বেছে নেয়, এবং এইভাবে পৃথিবীকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শারীরিক বা মানসিক শ্রম দান করে। কিন্তু মানুষের যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি লোভ, মোহ, হিংসা এগুলো মানুষের মধ্যে থেকে কোনভাবেই দূর করা যাচ্ছিল না, এই জিনিস গুলো মানুষের মন থেকে না সরালে ভবিষ্যৎ পৃথিবী আবার বহু যুগ আগের পৃথিবীর মতোই বিষাক্ত হয়ে উঠবে। তাই এখন সারা পৃথিবী জুড়ে বিজ্ঞানীরা এই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন।

মিঃ মৌণপতি এরকম একটি মিশনেরই হেড। তার আন্ডারে সারা পৃথিবীতে চল্লিশজন তরুন বিজ্ঞানী এ নিয়ে কাজ করছে। তিনি থাকেন ঊনকোটি সামার ক্যাম্পে। সৌম্যদর্শন রোদে পোড়া, টানটান চেহারা তার। পোশাকে বিশেষ কোন বৈচিত্র্য নেই। খুবই হালকা ধরনের পোশাক, এয়ার কন্ডিশন্ড , গরমকালে এই পোশাকে ঠান্ডা লাগে, শীতকালে গরম। পৃথিবীর  সব মানুষই এই ধরনের পোশাক পরেন এখন। উজ্জ্বল, কিন্তু কোমল রঙ। বহুযুগ আগে মানুষ নাকি বিদ্যুৎচালিত  পাখা, ঘর ঠান্ডা গরম রাখার যন্ত্র ইত্যাদি ব্যবহার করতো। এখন এসব কিছুই নেই। যে বিশেষ মেটেরিয়েল দিয়ে পোশাক তৈরী করা হয়, তা সবরকম

প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষকে আরাম দেয়। ঘরবাড়ি তৈরীতেও ব্যবহার করা হয় স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী একধরনের বিশেষ হাইব্রিড উদ্ভিদ। যা সারা পৃথিবীর বিশাল সমুদ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপগুলোতে নিয়মিত যত্ন সহকারে চাষ করা হয়। পাঠানো হয় পৃথিবীর নানা প্রান্তে। 

এখন রাত গভীর। 

সামার ক্যাম্পের  সারিবদ্ধ  ঘরগুলোতে উজ্জ্বল যে আলোর বলগুলো জ্বলছে, তা হলো মৃত মানুষের চিন্তাগুচ্ছ। মানুষ মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাশক্তিরও মৃত্যু ঘটে। তিনি হয়তো সারাজীবন অনেককিছু পড়াশোনা করেছিলেন, কিংবা

শিল্পের কোনও একটি মাধ্যম তার মধ্য দিয়ে উৎকর্ষতার চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্ত মৃত্যু মানেই সব শেষ, সৃষ্টি কর্মগুলোর সযত্ন সংরক্ষণ করা হয়, বা সেসব থেকে গবেষণাও করা যায়, কিন্তু মানুষ তার সৃষ্টি কর্মে খুব সামান্য জিনিসেরই প্রতিফলন ঘটায়, ট্রিলিয়ন সূক্ষ্ম চিন্তার জাল মস্তিস্কে ছড়ানো থাকে, যার হদিশ পাওয়া যায় না।

কিন্তু এখন সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানী মৌনপতি মনে করেন তিনি সফল। এই ধাপে আসার আগে একটি কাজ তাকে করতে হয়েছে, তা হলো সম্ভাব্য মৃত্যুসময় বের করা। যেটা আংশিক সফল। কারণ কোন মানুষ ঠিক কখন মারা যাবে, এটা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে পৃথিবীতে।কিন্তু অমূল্য চিন্তাশক্তির ধ্বংস হয়ে যাওয়া মানে একধাপ পেছন দিকে যাওয়া! তাই এক্ষেত্রে তিনি অসুস্থ বা বৃদ্ধ  প্রতিভাবান ব্যক্তিদের বেছে নিয়েছেন।  প্রতিভাবান মানুষের অনুমতিরও প্রয়োজন রয়েছে। মৃত্যুর আগে দেহদান বাধ্যতামূলক এখন।  কিন্তু মেধা বা চিন্তা দান নয়।তখনি ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে পৃথিবীর স্বার্থের কথা চিন্তা করতে হয়। সুখের কথা এই যে, বেশীরভাগ. মানুষ এখন ভালো হয়ে গেছে, সাধারণ মানুষও তার চিন্তাশক্তি দান করে যায়, খুব সামান্য কিছু মানুষ ছাড়া।

এই চিন্তাশক্তি সংগ্রহের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হচ্ছে মৃত্যুর সময়টিতে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। 

বিশেষ মেডিকেল টিম অসুস্থ বা বৃদ্ধ মানুষটিকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একটি সম্ভাব্য মৃত্যুসময় মৌণপতিকে জানান। মৌনপতি, নির্দিষ্ট ব্যক্তিটির কাছে উপস্থিত হন। প্ল্যাটিনাম এবং নতুন আবিস্কৃত একটি মৌল গ্যারোবিয়াম এই দুইয়ের মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি সংকর ধাতু প্রস্তুত করা হয়েছে, সেটা দিয়ে ভীষণ সূক্ষ্ম এবং বিশেষ কিছু ধর্মবিশিষ্ট   জালিকা বানানো হয়, সেই সঙ্গে এক্সরে তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে মৌণপতি একটি পদ্ধতি আবিস্কার করেছেন, যার মাধ্যমে মস্তিকের প্রতিটি কোষ থেকে, শোষিত হয় চিন্তার স্হাবর রূপ, আলোকরশ্মির মতো বেরিয়ে আসে,সূক্ষ্ম জালিকায় আটকে যায়। তাঁর ছাত্ররাও ক্রমাগত একাজে দক্ষ হয়ে উঠছে।

পরে তাকে গোলাকৃতি বলের মতো আকৃতি দেওয়া হয়, সংরক্ষণ করা হয়  স্বচ্ছ ধাতুর পাত্রে গবেষণাগারে।  

এভাবে সাহিত্য, সঙ্গীত, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ইত্যাদিতে মানুষ খুব দ্রুত এডভান্স হচ্ছে, পৃথিবীতে মানুষ এখন আর আবদ্ধ নয়, ঘুরে বেড়াচ্ছে মহাকাশের বিভিন্ন গ্রহে। কয়েকটি ছোট ছোট গ্রহ, যেগুলোর বায়ুমণ্ডল মোটামুটি ভাবে জীবন সৃষ্টির পক্ষে সহায়ক, সেগুলোতে পৃথিবীর মানুষেরা গিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছে, মানুষ থাকার মতো কোন পরিবেশ গড়ে তোলা যায় কিনা, কি ধরনের খাদ্য তৈরী করা যাবে সেসমস্ত জায়গায় ইত্যাদি। 

ঠিক এই মুহূর্তে মৌণপতি ভীষণ চিন্তামগ্ন। কিছুদিন আগে তিনি পৃথিবীর অন্য একটি অংশে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানকার বহু প্রাচীন একটি গিরিখাতে ঘুরতে ঘুরতে তিনি তিনটি মানুষের মাথার খুলি পান, ব্যাগে করে নিয়ে আসেন। পরে সামারক্যাম্পে এসে নিজের ব্যক্তিগত পরীক্ষাগারে বসে খুলি তিনটির উপর অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেন এবং আশ্চর্যরকম ভাবে  এই খুলি তিনটি থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন চিন্তা সংগ্রহ করতে পারেন। যা অনুবাদ করলে তিনি বুঝতে পারেন, এই তিন ব্যক্তি প্রতিভাবান পরমানু  বিজ্ঞানী ছিলেন এবং বিপুল ধ্বংসের সময় তাঁরা গবেষণাগারে পরমানু অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি যা সংগ্রহ করতে পেরেছেন, তাতে একটু  মাথা খাটালে তিনিও পরমানু বোম তৈরী করতে পারবেন। কিন্তু বর্তমানের পৃথিবীতে কোন রকম অস্ত্র তৈরী করা নিষেধ। বনজ পশুর কাছ থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য একধরনের স্প্রে ব্যবহার করা হয়, যা তাদের অজ্ঞান করে শুধু। তারপর বনকর্মীদের খবর দেওয়া হয়। কোন রাষ্ট্র নেই পৃথিবীতে। সব মানুষ সমান সুযোগ সুবিধা পায়। সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দিক দেখার জন্য বিভিন্ন দপ্তর রয়েছে শুধু। কেউ কোন হিংসার আশ্রয় নেয় না। তাই বিজ্ঞানের সব গবেষণা শুধু কল্যানকামী।  অস্ত্র তৈরীর নিয়মকানুন মানুষ জানে না, জানার চেষ্টা করলেও ধরা পড়ে যাবে পিস্ ওয়ার্রকারদের হাতে।

এখন মৌণপতি একটি মুশকিলে পড়েছেন, এই চিন্তাগোলকের রঙ্ হলুদ। এখনের পৃথিবীতে প্রায় সব চিন্তাগোলকের রঙ্ হালকা গোলাপী, ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে এখানে। মৌণব্রতের প্রিয় ছাত্র, অর্কপ্রভের  চোখ কিন্তু এড়ায়নি। সে জিজ্ঞেসও করেছে দু একবার। তিনি এড়িয়ে গেছেন। চিন্তাগোলক কোনভাবেই ধ্বংস করা যায় না জেনেও তিনি সমুদ্রের কাছে গোপনে চেষ্টা করেছেন, হয়নি, হবে না বুঝে গেছেন যা হবার। আবার গবেষণাগারে নিয়ে এসে রেখেছেন। তাকিয়ে আছেন নির্নিমেষ। অত্যন্ত মেধাবী তার ছাত্রটিম। যে কারো হাতে পড়লে পুনরায় পৃথিবী, পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্য গ্রহে জ্বলে উঠবে রণদামামা। ক্ষমতা আর আগ্রাসনের লড়াই। কি করবেন তিনি। সামনের কম্পিউটার স্ক্রিণে লাল আলো জ্বলে উঠল, মানে দরজার বাইরে কেউ। তিনি টাচ্ করে দেখলেন অর্কপ্রভ, খুব অবাক হলেন, ওর তো আজ পৃথিবীর একমাত্র মরুভূমি হট্গ্রীণে যাওয়ার কথা, যেখানে খুব সামান্য অংশ মরুভূমি আর অবশিষ্ট রয়েছে, যা সংরক্ষিত, মানুষকে দেখাবার জন্য। তিনি অবাক হয়ে রিমোটে হাত রাখলেন। দরজা খুলে গেল, অর্কপ্রভ ঢুকলো এবং মৌণব্রতকে কিছু বলার সুযোগ

না দিয়ে হলুদ চিন্তা গোলকের বাক্সটি নিয়ে দৌড়ে ঘরের বাইরে, মৌণব্রত এ ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তিনিও ছুটে বাইরে এলেন, ততক্ষণে অর্কপ্রভ ছোট প্লেনে করে অনেক উঁচুতে আকাশে। কিন্তু তিনি অর্কর গুরু, প্রখর মেধা,  গবেষণাগারে এসে ধ্যানস্থ হলেন। প্রবল আকর্ষণ ক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারেন তিনি, এটা তাঁর বিশেষ ক্ষমতা, সাধনায় অর্জিত, প্রয়োগ করলেন হলুদ চিন্তা গোলকের উপর এবং সেই অবিনশ্বর বস্তুটি ভেসে চলে আসল তার দিকে, অর্ক শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো।

এখন কি হবে? একঘন্টা গভীর আত্মমগ্ন রইলেন প্রাজ্ঞ বিজ্ঞানী। তারপর পৃথিবীর সমস্ত জায়গা থেকে  তাঁর আন্ডারে কাজ করা সব তরুন বিজ্ঞানীকে দ্রুত আসতে বললেন সামার ক্যাম্পে। পরদিন সকাল ছটা। বিশাল হলঘরে পিনড্রপ সাইলেন্স। মৌণব্রত বললেন, তিনি আজ বিকেলে ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করবেন। কিন্তু তার দেহ তিনি দান করবেন না, আর মৃত্যুর সময় তাঁর চিন্তাও তিনি দান করবেন না। পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরের গ্রহ সবকিছুর চরম স্বার্থের কথা চিন্তা করে তার এই ডিসিশন। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাকে যেন ইলেকট্রিক পদ্ধতিতে ছাই করে দেওয়া হয়। আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ দিলেন না।

দ্রুত চলে এলেন গবেষণাগারে। হলুদ চিন্তাগোলক জ্বলজ্বল করছে, তীব্র আলোতে চোখ যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে। আবার ধ্যানস্থ হলেন মৌণপতি। হলুদ গোলক

এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে তাঁর দিকে আসতে লাগল। মৌণপতির মাথার ওপর চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মৌণব্রতের দেহে লীন হয়ে গেল।  বিকেল বেলা নিজ গৃহে নিজের তৈরী প্রাণঘাতী ইনজেকশন শরীরে বিঁধলেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী ঠিক কুড়িমিনিট পর দরজা খোলা হলো। বিশেষ কক্ষে, মৌণব্রতর দেহ ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে পুড়ে ছাই হয়ে গেল সবার চোখের সামনে। না কোন চিন্তাশক্তি সংগৃহীত হলো না এই প্রখর প্রতিভার। আপন প্রতিভার তীব্র আগুনে ধ্বংস করে ফেললেন নিজেকেই। বাইরে শান্তির পৃথিবীতে, দ্য বে অব গ্রীণের উত্তাল ঢেউ। এখন জোয়ার আসার সময় হয়েছে। 

আপনাকে কবি

আপনাকে কবি 

........................

...........চিরশ্রী দেবনাথ 

কবি অনিল সরকার...

মাত্র কিছুদিন হলো আপনি নেই  

অথবা প্রবলভাবে আছেন 

পূর্ণশ্রী ত্রিপুরার সঙ্গে দেখা হয় আমার 

ছায়াময় দেহ এখন তার

শিকড় নেমেছে কপোল বেয়ে

হাতের চুড়িতে গভীর বন আরো গাঢ়তম

গল্পে গল্পে তার ঠোঁট থেকে ঝরে পরে তামাক গন্ধ

শ্লোগানের সুর চুপ করে শোনে ফিসফাস, হিসহিস 

কিছু কিছু দলিত পশুর দল নদীচরে জ্যোৎস্না পোহায় 

অমাবস্যা  আসার প্রাকসন্ধ্যায়

হাতের মুঠোতে একফোঁটা

গনতন্ত্র নিয়ে হাঁটতে থাকে, হাঁটতেই থাকে...

শব্দহীন ছড়াকারের চোখের মতো

দূরে দূরে জ্বলে উঠে কুঁড়েঘর

ছেঁয়ে যায় শুকনো মাছের গন্ধ

এইসব রাতেরা আপনার বুকে

ছড়িয়ে দিয়েছিলো এক শীতল পাটি, আগ্নেয় ঘুম

এখনো কি সেই পাহাড়ি বিকেল নেমে আসে, 

নাস্তিকের মতো...আপনার কন্ঠে?

কই?  কোথায়? সেই গমগমে ধারাপাত?

তীব্র অশরীরী হয়ে এই ভারতে তুলে দিন না একটা দলিত ঝড়!!

তারপর শুধু গ্রাস গ্রাস ভাত আর নরম স্বাধীনতা ...