প্রেমে সন্ত্রাসে, আলোচনা, কবি সেলিম মুস্তাফা

০২.০৭.২০১৮

“...কৃষ্ণবরণ মেয়ে বসে থাকি আঙিনায়
সত্তায় শুধু নারীর গন্ধ...”

এ পংক্তিগুলো তাঁর, যিনি ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞান-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-প্রেম-পরিহাস-নারীবাদ নিয়ে স্মৃতিমেদুর ও গভীরসঞ্চারী কবিসত্তার এক নারী-কম্যাণ্ডো । কবি চিরশ্রী দেবনাথ । কবিতার জগতে পদার্পণের মাত্র দুই-তিন বৎসরের মধ্যে তাঁর আগ্রহ আর গতি চোখে পড়ার মতো ।

এ পর্যন্ত তাঁর তিনখানা গ্রন্থ প্রকাশিত । “জলবিকেলে মেঘের ছায়া” (ফেব্রুয়ারী ২০১৬), “ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায়” (ডিসেম্বর ২০১৬) এবং “প্রেমে সন্ত্রাসে” (ডিসেম্বর ২০১৭) । আমি আজ “প্রেমে সন্ত্রাসে” পড়ব । তবে তিনখানা বই-ই আমি পড়েছি । প্রথম বইটি কবি নকুল রায়ের নজরদারীতে বেরিয়েছে “স্বতন্ত্র মেধা” থেকে, তাই এতে বানানের ত্রুটি থাকাটা ভালো লাগেনি । দ্বিতীয়টি বেরিয়েছে  “স্রোত” প্রকাশনা থেকে । এতে এতোবেশি বানানের ত্রুটি রয়েছে যে একখানা শুদ্ধিপত্রও জুড়তে হয়েছে শেষ পৃষ্ঠায়, এবং সেটাও নির্ভুল নয় ! তৃতীয়টিতেও রয়ে গেছে দুয়েকখানা ত্রুটি । এটা প্রকাশ করেছেন “নীহারিকা” ।
আশ্চর্য !! কবিতার বইয়ে কটা শব্দ আর থাকে ?
এই কথাগুলো আমি না-বললেও পারতাম ।

  

তবু বলা এজন্য যে, লেখক স্বয়ং ভুল করলেও প্রকাশকের তা মেনে নেয়া উচিত নয়, কারণ বইটা তার সংস্থার একটা সম্মান ও বিশ্বাসবাহী একটি প্রকাশ । নির্ভুল বই প্রকাশ করেন এমন প্রকাশক যে ত্রিপুরাতে নেই, এমন নয় । বানান ভুল থাকতেই পারে যেকোন কারোর অনবধানবশত, কিন্তু সেটা পাঠকরা ঠিকই বুঝে নিতে পারেন । টক-দই আর পোকায় কাটা বেগুনের বিশেষ কিছু খরিদ্দার আছেন বটে, কিন্তু বইয়ের বেলায় তা খাটে না ।

আমরা কবিতায় ফিরে আসি । কবিতা ছাড়া কে আর মলম লাগাবে ? কবিতা আশ্রয় । কবিতা পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্ম ।

“...যারা মানুষ খুন করবে বলে নেমেছিল
তাদের প্রেমেরা ঘাতকের হাসির মতোই শীতল
মাটির রঙ খুঁজে পেতে, এইসব মানুষেরা
রক্ত দিয়ে ধুয়ে দেয় ভুল প্রেম, ভুল সন্ত্রাস
জমাট বাঁধা নারীর মতো হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকে সময়...”  (প্রেমে সন্ত্রাসে / পাঁচ)

একজন কবি নাকি সারাজীবন একই কবিতা লিখে যান । খণ্ডে খণ্ডে রঙে রঙে । তাই হয়তো প্রকৃত কবিতা কখনো সাজানো চমকের ডালি বা শেষ পংক্তিতে কোন বিস্ময়ের সাজানো হোঁচট নিয়ে আসে না । চিরশ্রীর কবিতার কোন নাটকীয় ‘সমাপ্তি’ তেমন একটা লক্ষ করা যায় না । এটা অত্যন্ত শক্তিশালী আত্মবিশ্বাসের নজির তো বটেই । কবির স্বাতন্ত্র্য তাঁর ‘দেখা’-কে নিজের মতো করে রূপদান করাতেই । আর এই কাজটায় এই কবি যথেষ্ট আন্তরিক । এই কবি একজন নারী, কিন্তু তাঁর নারীবাদ চিরন্তন ‘নারী’কে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত রেখে এবং মুষ্টি-তোলা সস্তা ও উগ্র প্রতিবাদের অসারতাকে মনে রেখেই আঁকা বা বলা, যাকে ডিঙানো অসম্ভব । “জমাট বাঁধা নারীর মতো হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকে সময়...”  এই পংক্তিতে সময় ও নারীকে একাকার  করে দিয়ে তিনি যেন ছুঁড়ে দিলেন তাঁর প্রথম তাস ।

“ভীষণ গভীর রাতে
মধ্যবিত্ত শহরের খোলা ছাদগুলোতে
জমা হয় শহরের সব বিশ্রী মেয়ের প্রেম

তারা রঙ মাখে, চুল বাঁধে, চুলে দেয় গুলঞ্চ ফুল
সেইসব প্রেমেরা গুছিয়ে বসে ফিসফিস করে

শহর জেগে গেলেই আবার তারা
ঢুকে যায় ঘুপচি মনের গহবরে
প্রতিরাতে এভাবে তারা বুড়ো হয়
তারপর এক গরীব দুপুরে
মেয়েরা তাদের প্রেম বেচে দেয়
সমাপ্তি সঙ্গীত গায় একটি মেয়ে
বাকি মেয়েরা দেখে দিনে দিনে
শেষ হয়ে আসছে গুলঞ্চ ফুলের ঝোঁপ”  (গুলঞ্চবেলা)

কোন তীব্রতা ছাড়াই, সমাজের ব্যাকগ্রাউণ্ডে ক্ষয়ে যাওয়া নারীত্বের এই উপস্থিতি ঘোষণাই এক গম্ভীর প্রতিবাদ, যা মোটেই নালিশ নয় । নালিশ দিয়ে কবিতা হয় না । নালিশ আর প্রতিবাদ যে এক জিনিষ নয় এটা অনেক ‘বিগ’ কবিরও মাথায় ঢোকে না, এমন আমরা প্রায়শই লক্ষ করি । কবির কাছে কেউ অন্ধতা  চায় না ।

আমার কখনো মনে হয়েছে কবি চিরশ্রী দেবনাথ একটু কথাপ্রবণ । মনে হয়েছে প্রথম দুটি গ্রন্থের সেই ঝর্ণা পাহাড় কন্দরের আড়ষ্টতা কাটিয়ে এখন সমতলের জনপদ ঘেঁষে পূর্ণ মাত্রায় কল্লোলিনী, যা ক্রমে আরও গাম্ভীর্যে আরও এলাকা নিয়ে ছড়িয়ে যাবে ।

কাঠের বাংলোয় নবদম্পতির হানিমুন রাত কাটানো, বৃক্ষের জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে যাবার অভূতপূর্ব অনুভূতি...
“...কেয়ারটেকার বলে যায়
এই পুরো ঘর কেবল দুটো সেগুন গাছের
পাশাপাশি ছিল বহুকাল, বাংলোটি এ জায়গাতেই
তাদেরই দেহে সাজানো আসবাব...
...খণ্ডিত আসবাবের শরীরে জেগে ওঠে অসমাপ্ত
ফিসফাস...”      (হানিমুন বাংলো)

নারীসত্তাকে যেকোন অবস্থায় মহত্ব প্রদান করতে তাঁর অসংকোচ কলম বিন্দুমাত্র কাঁপেনি কোথাও । এর প্রমাণ আমরা আগেও পেয়েছি ।

“মেয়েরা বড়ো অস্পষ্ট হয় নিজের কাছে
তার ইচ্ছা, গোপন গোলাপ, সোনালি চুমু
উল্টানো সঙ্গম, হাত ছুঁয়ে রাখা ডিনামাইট
কোনটাই তার নিজস্ব নয়...
...তার চোখে, ঠোঁট, জিহ্বা
পোড়া কফির গন্ধ মেখে মেখে
লম্বা দীঘল পা ফেলে, পুরুষের চোখে মুগ্ধতা খোঁজে
মৌমাছির আঠালো রসের সৌখিন রসকলি যেন
একটা চোখ, কিছুটা মন, অসংলগ্ন কাম
তার নিজের হওয়া দরকার...”       (মথগন্ধা)

আরও পড়া যাক—

“যুদ্ধক্ষেত্রে আমি বেট রাখি
গভীর হয়ে আলিঙ্গন করি অস্ত্র সম্ভার
কেমন ঠাণ্ডা অস্ত্রের ত্বক, স্তব্ধ হৃদয়, আগুনে ভরা
আমার হৃদয়ে জমানো ত্রাস
জলবিহীন মৃত্যুতে আমি হারাব একান্ত সেই যোদ্ধাকে”  (বেট / চার)

কিংবা

“... এই বেটে নিজেকে রেখেছি গুহাচিত্রে, ভেষজ রঙে
জিতেছি আমি বেহাগে, শ্রাবণে, নিঃশেষে”           (বেট / পাঁচ)

এই জয় দাঁড়িয়ে আছে  “নিঃশেষে” শব্দটির দারুণ ব্যবহারে ।

“আমার শাড়ি বালিকারা” কবিতায় কবি বলেন—

“আমার শাড়িগুলো সব বেলাভূমির মতো
প্রত্যাখ্যান মেলে দিয়ে ছড়িয়ে যায় আধবুড়ো জ্যোৎস্নায়...”

এখানে ‘প্রত্যাখ্যান’ শব্দের প্রয়োগ অত্যন্ত সুন্দর এবং যথাযথ ।

একসময়, যখন থেকে কবিতা শ্লেষ বিদ্রুপের তির্যক কথায় ক্রমশ জটিল, সংক্ষেপ ও তীব্র হয়ে ওঠার প্রবণতা নিল, তা আশ্রয় করলো বিশেষ ভাষাপদ্ধতি, যাতে প্রবলভাবে দেখা দিল সমাসবদ্ধ (সমস্ত)পদের ব্যবহার । হাংরি আন্দোলনের বিশিষ্ট কবিদের একজন শৈলেশ্বর ঘোষ । তাঁর কবিতায়, আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার পাঠে, প্রথম লক্ষ করলাম তাঁর নবীন বয়সের কবিতায় সমাসবদ্ধ পদের বাহুল্য । পরবর্তীতে তিনি এই ব্যবহার কমিয়ে আনেন । বর্তমানে ত্রিপুরাতে অন্তত দু-জন কবির মধ্যে এই প্রবণতা এখনো বর্তমান রয়েছে খুবই তীব্রভাবে ।
জীবনানন্দের বহুব্যবহৃত “মতো” শব্দটি সকল কবিই খুব সচেতনভাবে এড়য়ে চলতে চান, তাঁর প্রভাব এড়ানোর জন্য । এটা বালখিল্য যুক্তি, এতে কোন সন্দেহ নেই । সমাসবদ্ধ পদ ব্যবহার করলে  এই “মতো”-টাকে কমবেশি এড়িয়ে যাওয়া যায় । সম্ভবত এ কারণেই একসময় কবিতায় এর প্রাদুর্ভাব দেখা যায় । দুটো শব্দ জুড়ে দিলেই হলো, এতে কবির সপ্রতিভতা, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, তীক্ষ্ণ কটুবাক্য ইত্যাদির রেসিপি খুব সুন্দর হয়, ফলে অটোমেটিক-কাব্যও হয়ে যায় । অবশ্যই সীমিতভাবে এর ব্যবহার কবিতার দিগন্ত প্রসারিত করে ।
কবি চিরশ্রীর প্রথম ও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে এই প্রবণতা লক্ষ করেছি খুবই বেশি মাত্রায়, যা আলোচ্য গ্রন্থে প্রায় নেই বললেই চলে । তাঁর এই পরিবর্তন তাঁর ভাষাচর্চার অগ্রগতিকেই সূচিত করে । আমার বলার উদ্দেশ্য এটাই যে, আমার বিশ্বাস অনুযায়ী ভাষার পরিণতি ক্রম-সরলতার দিকেই যায় । একজন সাহিত্যিকের, বিশেষ করে একজন কবির পক্ষে তাঁর ভাষার নিজস্বতা অর্জনই সবচেয়ে বড় কথা, অর্থাৎ নিজের ভাষা আবিষ্কার । কারণ আমি বিশ্বাস করি, একজন কবি তাঁর সমস্ত রচনার মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে নিজেকেই রচনা করেন, নিজেকেই আবিষ্কার করেন, তা তিনি যা-ই লিখে যান না কেন । কবির সততা, অর্থাৎ রচনায় তাঁর উপস্থিতি, তাঁর অস্তিত্বময়তাই তাঁর নিষ্ঠার প্রমাণ । চিরশ্রী ক্রমশ গড়ে তুলছেন তার নিজস্ব ভাষার ইমারত আর পাঠককে দিচ্ছেন সেখানে প্রবেশের অবারিত দ্বার । অর্ধেক আকাশের পুরোটাই তাঁর, এক চুলও কম নয় ।

“দু’কাপ চা তোমার আমার
খানিকটা চিনি...প্রথম বৃষ্টিপাত
উষ্ণ গাভীরস,
একটিই চামচ সেখানে
নাড়তে থাকে তোমাকে আমাকে ।”  (চা)

একটি অসাধারণ জৈব কবিতা, জীবনবাদী কবির কবিতা, জীবনের কবিতা, যেখানে অর্ধেক বলে কিছু নেই, পূর্ণতায় ঈশ্বর হয়ে আছে ।

তাঁর “বয়ঃসন্ধির ত্রিপুরা” নামক কবিতা থেকে কিছু কিছু অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি যা তাঁর বাস্তবতাকে কল্পনার রসায়নে জারিত করার নমুনা—

“বেতলিং শিবের চূড়োয় দাঁড়িয়ে
আমার পুরুষ ধনুকে ছুঁড়েছিল তির
এ তির বর্ষণোন্মাদ, অভ্রখাদক
ঝরে ঝরে পড়ছে কাচঝর্ণা, শামুকবাহার
ক্ষীণতনু শরীরী আহ্বানে জেগে যাওয়া জুমপ্রেম
সঙ্গমে সঙ্গমে মুছে দিতে চায় জাতির আগে ‘উপ’...  ( বয়ঃসন্ধির ত্রিপুরা )

কিংবা

“...একটি মনখারাপ পরিযায়ী পাখি
বাস্তু খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে আনে
ডম্বুরের মেঘমন্দ্র ডুবন্ত কান্না......

আমায় দিও তুমি চূর্ণ খারচি মন্ত্র, একটু দেবী-রঙ
পৌষের ব্রহ্মচারী সকালে
কিছু রোদ রেখো শিবকুণ্ডলে
পিতলের পাত্রে জমুক
তোমার আমার পবিত্র তীর্থমুখ......

স্তনভারে ফুটে আছে জম্পুই-র কমলা ভোর
মনু নদীর শীতচরে, পা মেলাচ্ছে মামিতাং দুপুর
উষ্ণ ঝর্ণায় গা ভিজিয়ে মা গো আমিই তোমার
বয়ঃসন্ধির গণতান্ত্রিক জুমিয়া মেয়েটি ।”        (ঐ)

কোন কোন কবির মতে কবিতায় স্থানিকতার প্রকাশ নিষ্প্রয়োজন । কিন্তু বিশ্বসাহিত্য ঘাটলে লক্ষ করা যায়, তাদের বেশির ভাগই স্থানিকতা-সমৃদ্ধ, যা সকলের আপন হতে কোনই বাধা ঘটেনি । উপরন্তু, একজন লেখক, তা তিনি কবি হোন আর ঔপন্যাসিক বা গল্পকারই হোন, স্থানিকতা তিনি এড়াবেন কী করে, আর কেনই-বা এড়াবেন ? তাহলে তো তাঁকে তাঁর মাতৃভাষাও এড়িয়ে যেতে হয় ! যা নিয়ে একজন কবি/লেখকের লেখক বা কবি হয়ে ওঠা, সেই মানুষ, সমাজ, সেই প্রতিবেশ যদি তিনি এড়িয়েই যান, তাহলে লিখবেন যা, তা তো অশ্বডিম্ব বা সোনার পাথরবাটি ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না ! অধিকন্তু, লেখক স্বয়ং একটি স্থানিক অস্তিত্ব ছাড়া আর কী ? যাক, প্রসঙ্গান্তরে আর না যাওয়াই ভাল । পাঠক অবশ্যই লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন আর অনুভূতিশীল । এ বিতর্ক আর ভালোলাগা না-লাগার ব্যাপারটা তাদেরই এক্তিয়ারে থাকুক । আবার কবিতায়, আমার ভালোলাগায় আসছি ।

নির্ভয়াকে নিয়ে অন্য ধরণের প্রতিবাদ, বা দেখনধারী প্রতিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, এবং সেই সঙ্গে এক নারীর প্রতি আরেক নারীর বা নিজেরই নারীসত্তার প্রতি সুগভীর মমতা আর সম্মান, যা  কবি প্রকাশ করেন ক্ষোভের মোড়কে—

“...নিষ্ঠুরতার গাঢ়তায় পৃথিবী
যোনি ছেঁড়া রক্ত মেখে নেয়,
শুধু সবার পাশে নির্ভয়ার মতো প্রেমিক থাকে না
এ পৃথিবী যেন ভরে যায় শুধু নির্ভয়ার প্রেমিকে
কতোকাল বাঁজা হয়ে আছে আছে এ মাটি
ধর্ষণ হয়তো তাকে এনে দেবে জলভরা সম্মান ।”   (নির্ভয়ার প্রেমিক)

এমনি অনেক কবিতার কথাই বলা যায় । আমার কথা বেশি হয়ে গেলে পাঠক বিরক্ত হবেন, তাই আপাতত থামছি । অনুমান করছি কবি শীঘ্রই নেবেন আরেকটি বাঁক । কারণ কোথাও কোথাও বিষয়ের ভারে কবিতার মেরুদণ্ড ন্যূব্জ হয়ে পড়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা । কবির রচনাশৈলীতে এখন পর্যন্ত শুধু বিষয়েরই পদচারণা, যা চেপে রেখেছে তাঁর আঙ্গিকগত সিগনেচার টোন । বিষয়কে গুছিয়ে অন্তরালে রাখার যে কাব্যিক কৌশল বা দক্ষতা তা হয়তো খানিকটা এখনো অনুজ্জ্বলই রয়ে গেল বিষয়েরই প্রবল তাড়নায় । অবশ্য তাঁর বেশিরভাগ কবিতায় দীর্ঘকবিতার একটি ব্যাপ্তি খুবই প্রবলভাবে উপস্থিত । মিতায়তন কবিতা রচনায়ও যে তিনি  কম পারদর্শী নন, এটার প্রমাণ তাঁর “চা” কবিতাটি । তবু, যে কথা বলার, তা বলতে না-পারলে লেখালেখি করারই-বা অর্থ কী ?
শেষ করার আগে কয়েকটি বিশেষ পংক্তি উল্লেখ না করে পারছি না—

“...রুদ্রসাগরের বুকে নরম কুয়াশা কেমন বেদুইন হয়ে ওঠে...”   (নীরমহল)

“...পৈত্রিক ভিটেয় আকাশ থাকে হলুদ রঙে ভরা
নীল আঁচলের মতো নেমে আসে ঘরের দেয়াল...”   (পূর্বজা)

“...ধর্ষণের পর থেকে এক ছবি মেয়ে
শুধু সঙ্গমের ছবি আঁকে
মোহ, সাপ, কলা, রস, ছোঁয়াচে অসুখ
ছড়িয়ে ছড়িয়ে আঁকতে থাকে বাৎসায়ন...”   (ছবি মেয়ে)

“আমি তোমার শার্টের বোতাম ঘরগুলো পুনর্নির্মাণ করি
ফাঁকে ফাঁকে ভরে দিই আমার দ্বীপ ও সমুদ্র...”   (বোতাম ঘর)

“...প্রবল জ্বরের দিনে
যেন হারিয়ে যায় থার্মোমিটার
তোমার হাত রেখো আমার বাহুবলয়ে...”   (থার্মোমিটার)

“...শিলং-এ খুব ঠাণ্ডা নয় এখন, তবুও রাস্তা খুব ভেজা ভেজা
ভিজে থাকে তোমার হাতের তালু যেমন সারাক্ষণ...”   (শিলং পাহাড়ে)

“...একটি প্রেমের কবিতা লিখতে বড় ভালো লাগে
মনে হয়  প্রান্তরে বসে আছি ধানের মতো
আমার থুতনিতে লেগে আছে কয়েক ফোঁটা সন্ধ্যা...”   (এসো হত্যা)

কবি তাঁর রচনায় কোথাও কোন উপদেশ বা দার্শনিকতার অবতারণা করেননি । যা তাঁর মনোবাঞ্ছা, তা অন্তঃসলিলাই রয়েছে । এটাও তার ‘কবি’-সত্তার আত্মবিশ্বাসকেই সূচিত করে ।

কবির উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি । তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রতীক্ষা থাকবে । ধন্যবাদ “নীহারিকা”-কে কবিতার অন্যমুখ দেখাবার জন্য । প্রচ্ছদ করেছেন ধর্মনগরের আরেক সুকন্যা মিতালী দেবনাথ । তাঁকে আমার অভিনন্দন ।

ব্যারন ফিল্ড

আসন্ন বর্ষার দুপুর। রোদ উছলে পড়ছে চারপাশে। রোশনাইর ব্যাগ ভারী। ক্লান্ত পা। শুকনো মুখ। ক্ষিদেও পেটে অনেক অনেক। সেই সকাল দশটায় ফ্যাক্টরির অফিস থেকে বেরিয়েছে। আজ দুপুর তিনটের মধ্যে সব প্রোডাক্ট বেচে তবে কাগজ জমা দিতে হবে।
নাহলে কাল আর চাকরি থাকবে কিনা বলা শক্ত।
এই সামনের বাড়িটায় যাওয়া যাক। বাইরে  সায়া, চুড়িদার, শাড়ি ঝুলছে বেশ কয়েকটি। নিশ্চয়ই অনেক মহিলা আছেন এ বাড়িতে। অবশিষ্ট স্যানিটারি ন্যাপকিন আর কয়েকটি সাবান,  শ্যাম্পু এ বাড়িতেই বিক্রি হয়ে যাওয়ার কথা।
রোশনাই দরজার পাশে কলিং বেলে আঙুল রাখলো।
দরজা খুলে সামনে যিনি দাঁড়ালেন, তিনি  মহিলা।
দীর্ঘ ।  ঋজু। ফর্সা। হালকা রঙের শাড়ি, ব্লাউজ। সধবার চিহ্ন নেই।
রোশনাই বলল, সে সের্লসগার্ল।
স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রি করতে এসেছে।
ভদ্রমহিলা একটু গম্ভীর হলেন।
তারপর আবার হাসলেন।
ওকে যত্ন করে ভেতরে নিয়ে বসালেন। এই আদরটুকু রোশনাইর কাছে অপ্রত্যাশিত। কেউ করে না। খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ঘর। ভেতর দিকে একচিলতে রোদেলা বারান্দা দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি টব। তাতে সতেজ হয়ে আলো করে আছে বাহারি কচুপাতা। একটাতে আবার খুব ঘটা করে লঙ্কা লাগানো। লাল লাল লঙ্কা ঝুলে আছে, তীব্র অহংকারের মতো।
অহংকার কেমন হয়। রোশনাই ভাবতে লাগলো। তারও কি আছে এমন অহংবোধ। কই নাতো।
পোড় খাওয়া জীবনে অহংকারের চুমু থাকে না।
সেই মহিলা আবার ফিরে এলেন।
একটা প্লেটে খিচুরী, আলুভাজা, আর এক গ্লাস সরবত।
রোশনাই খুব অবাক হলো। তিনি বললেন খাও।
পেটে আগুন জ্বলছে। না খেয়ে হবে। সে খেতে লাগলো। একদম সিলেবাস মেনে রান্না করা খিচুরী। ভাজা মুগ, গোবিন্দভোগ চাল, পাঁচফোড়নের ভাজা গুঁড়ো, ঘি, তেজপাতা, গরমমশলা। আহা কতদিন এধরনের যত্নশীল রান্না  খাওয়া হয়নি।
খুব তৃপ্তি করে খেলো রোশনাই।
ঠিক এইসময় খোলা দরজা দিয়ে ঢুকলো দুজন মেয়ে।
নাহ্  মেয়ের মতো দেখতে দুজন ছেলে...আসলে ঠিক  ছেলেও নয়। যেন তারা অন্য কেউ।
ভীষণ সরল মুখমন্ডল। কোকরানো একটু লম্বা চুল। মসৃন গাল।
দুজোড়া তরুণ চোখ রোশনাইকে দেখছে। রোশনাইও তাদের দেখছে।
তারা কলকল করতে করতে ভেতরে চলে গেলো।
রোশনাই এবার মূলকাজে উদ্যোগী হলো।
ব্যাগ থেকে অবশিষ্ট ন্যাপকিনের প্যাকেট গুলো বের করে টেবিলে রাখলো। দুটো শ্যাম্পু আর দুটো সাবান।
ভদ্রমহিলা কাউকে নিধি বলে ডাকলেন। নিধি এলো, একজন বছর পঁয়তাল্লিশের দুর্বল স্বাস্থ্যের ফ্যাকাশে দেখতে মহিলা।
বয়স্কা ভদ্রমহিলা বললেন , সব জিনিসগুলো ঘরে নিয়ে যাও, আর টাকা দিয়ে দাও ওকে। আমরা কিনলাম সব।
নিধি সঙ্গে সঙ্গে বলল, কেন মা? সাবান শ্যাম্পু না হয় ঠিক আছে, কিন্তু ওসব।
ভদ্রমহিলা শুধু বললেন হোক না একটু বেহিসেব।
রোশনাই অবাক হয়ে সব দেখছিল। তার জিনিস বিক্রি হয়ে গেলো।
তবু  ইচ্ছে করছিল, একটু জিজ্ঞেস করে, যদিও এধরনের কৌতুহল ওর স্বভাবববিরুদ্ধ...।
তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে, সেই ভদ্রমহিলা বললেন, জানি তুমি একটু অবাক হয়েছো, তাই বলছি, আসলে আমার বয়স ষাট পেরিয়েছে কবেই, আমার আর ন্যাপকিনের  দরকার নেই। নিধি আমার একমাত্র  ছেলের বউ, বিধবা। জরায়ুতে ক্যান্সার হয়েছিল আমার ছেলে বেঁচে থাকতেই, কেটে বাদ দিতে হয়েছে, ওরও দরকার নেই। আর যে দুজনকে দেখলে, ঈশ্বরের অসীম পরিহাস, ওরা যমজ। ঈশ্বর তাদেরকে ছেলে না মেয়ে চিহ্নিত করেননি। তাই ওদেরও দরকার নেই।
রোশনাই স্তব্ধ হয়ে রইলো। তারপর বললো, তাহলে মাসিমা কেন শুধু শুধু টাকা খরচ করলেন। দিয়ে দিন, কিছু মনে করবো না।
ভদ্রমহিলা মাথা নীচু করলেন। বললেন, আসলে আমি এসব তোমার জন্য কিনেছি।
আমার জন্য? আরোও অবাক হলো রোশনাই।
হ্যাঁ তোমার জন্য।
এ বাড়ি থেকে মেয়ে গন্ধ হারিয়ে গেছে।  অনুর্বর হয়ে গেছে গর্ভধারণের মাটি। যাকে বলে ব্যারন ফিল্ড।
তুমি যখন রজঃস্বলা থাকবে, এ বাড়ির সামনে দিয়ে যাবে, একটু আসবে। থাকবে। যদি লাগে তখন।
আমি শিক্ষিকা ছিলাম। নিজের আর স্বামীর পেনশন পাই। টাকার জন্য ভেবো না।
এই দেখো কচু গাছও টবে লাগিয়ে রেখেছি। কচুগাছের নাকি বংশ শেষ হয় না।

মনে শুধু  আজকাল কুসংস্কার।
কিসের অভিশাপ  আমার ঘরে !
তাই তোমার পিরিয়ডসের দিনে তুমি আমার বাড়িতে আসবে।
আমি তোমাকে একটু খাওয়াবো। যদি  এ জন্মের অভিশাপ কাটাতে পারি।
রোশনাই দেখল ভদ্রমহিলার চোখ শালগ্রাম শিলার মতো কালো,  স্তব্ধ। তিনি  দাঁড়িয়ে আছেন মরুভূমির বুকে উটের মত।
সে শুধু অস্ফুটে বলল, আসব, অবশ্যই আসব।
মনে থাকবে ঠিকানা।
ধূসর রঙের বাড়ি। ব্যারন ফিল্ড।
সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে রোশনাই ভাবতে লাগলো...সংস্কার,  কুসংস্কার, ঈশ্বর এসবের কি সত্যিই কোন মানে আছে ।

এই ভদ্রমহিলা কি আলোর যাত্রী না অন্ধকারের?

স্মরণে উনিশে মে


আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল

লিখতে লাগলাম, লিখতে লিখতে

গলিতে সন্ধ্যা নামল, দিকচিহ্নহীন পাগলের চোখের মতো !

জ্বলে উঠল মোড়ের মাথার নিওনবাতি

আবছা আলোয় রাস্তার ধুলোতে অক্ষরের সবল শরীর,

তারা বলতে লাগল এক উদ্বাস্তু পুরুষের কথা

যাকে ছুঁয়ে ছিল নারী, শিশু, বৃদ্ধের দল

অদ্ভুত এক কীর্তনের সুর যেন পাখির ডুুুবন্ত শিষ

সেসব লেখায় মিশে যেতে লাগল নক্ষত্রের ভালোবাসাবাসি

পাশে বয়ে চলা দুগ্ধনদী, সফেন অন্ধকারে ধোঁঁয়া ওঠা অমৃত অথবা বিষের হাতছানি,

নিশিপাওয়া যুবক যুবতীরা বলছে, হেসে কেঁদে শুধু বলে যাচ্ছে,

...হৃদয়ের সকল ভাষা অশ্রুমতী  হও।

ভাষা কেড়ে নিলে কি হয়!

আগাছার মতো দুর্বল এক অনুচ্চ প্রজাতি জমি স্পর্শ করে থাকে

চাষ হয় না...আবাদ হয়,

হাজার কীটের দংশনে শুয়ে থাকে বাটুল সংস্কৃতি।

ভাষায় যেন না লিখি অক্ষমের  প্রতিবাদ, গালাগাল, খিস্তি।

শুধু ময়ূরীর রঙে আঁকা অভিমান পড়ে থাক, হলকা মেঘস্তুপ,

আমিও ঘুম থেকে ক্রমাগত আচ্ছন্নতা সরিয়ে নিচ্ছি,

অস্ফুট সকাল গাইছে  তাজা  মেঘমল্লার।

বিশ্বাসঘাতকতা দেহচরাচরে, অন্তরে এই মাত্র খুুুন হলো দুই এক বিন্দু আমি

তবে কি ক্ষমা চাইবো?

নিজের ভেতর হতাশায় ম্লান দুরন্ত সম্রাজ্ঞী।

অকাল বৃৃৃদ্ধা । হারিয়েছে মুক্তো হার।  সাহসের লকেট।

এবার ক্যানভাসে দীপালোক, জ্বলছে কালির দাগ।

গ্রীষ্ম অনাকাঙ্ক্ষিত । বর্ষা নিভছে।

হেমন্ত আমার প্রিয় যোদ্ধা।

মৃদু শীতে পাড়ি দেবো কয়েক ক্রোশ,  মুঠোতে কুয়াশা।

ছড়াবো না।

আগে ঝরে পড়ুক ভাষার সকল অভিমান।

উদ্ধত সিংহাসন হোক একটি একটি মাতৃভাষার।

নিরাপদ রাজ্যপাট, হাজার একর জমিতে সোনালী ধান।

কবিতা ...কবির দায়বদ্ধতা এবং স্বকীয়তা


এই সময়, অসময় কবির কাছে। কবি কি সবসময়েই সময়ের ধারক ও বাহক হবেন ! না কবি কেবল লিখে যাবেন নিজের কথা।

আসলেই কি একজন সচেতন কবি সবসময় ব্যক্তিগত কথা লিখেন?

তিনি কি শুধুই নিজেকে দোহন করেন, শোষণ করেন আর আত্মপাপ লিখেন?

এসমস্ত প্রশ্ন বহু চর্চিত, বহুরকম উত্তরে প্রমাণিত, বিতর্কিত এবং সমাধানহীন ভাবে রয়ে গেছে।

যা একজন নতুন লিখতে আসা তরুণের কাছে প্রথম চ্যালেঞ্জ। 

আমাদের  ক্ষুদ্র পুরোনো পৃথিবীর বক্ষে ঘটতে থাকা  সংগ্রাম, অত্যাচারী এবং অত্যাচারিত ব্যক্তিসত্তার রক্তপাত ও রক্তপাতহীন বিস্ফোরণ , ধ্বংস, বিশ্বাসহীনতা সবকিছু নিয়ে লেখা হয়ে গেছে,  হয়ে চলেছে অজস্র অজস্র কবিতা।

কবিতার পটভূমি সীমান্তহীন, ঝড়বিক্ষুুব্ধ।

এই ঝড় বাইরের এবং তার চাইতেও বেশী হৃদয়ের।

ঠিক এখনের সময়ে মানুষ কবিতা লিখতেও সাবধান হয়ে যাচ্ছে । যার অপর নাম কবিতার মৃত্যু। মানুষকে আঘাত দিয়ে, প্রকৃত অবস্থান চিহ্নিত করা সব কবির দায় না হতে পারে, তবে কোন কোন কবির অবশ্যই দায়। তিনি যখন তা লিখতে পারেন না, তখন তিনি মেষ হয়ে যান কবি থেকে। বহন করতে থাকেন ক্লেদ।

হতাশায় বার বার নিজেকে আঘাত করেন। তার কবিতা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত নেশাগ্রস্থতা।

একজন সচেতন লেখক রাজনৈতিক। রাজনৈতিকতা মানে অন্ধ সমর্থন নয়, একজন লেখকের রাজনৈতিকতা মানে অন্ধকারের বিরুদ্ধে, আলোর দিকে কলম চালনা করা।

তাই এ বিশ্ব লেখক বিশেষ করে কবিদের ভয় পায়। কারণ তিনি মূলে কুঠারাঘাত করেন।

বিশ্বের যেকোন প্রান্তে যখনই নিষ্ঠুরতা হয়েছে কবি কবিতা লিখেছেন, প্রশ্ন ওঠে তাতে কি কোন লাভ হয়েছে? মানুষ বিদ্রুপ করেছেন, কি লাভ এইসব ছাঁইপাশ লিখে, কিছুদিন পর এই ছাঁইপাশই হয়ে উঠেছে মানুষের ভাষা, আমরা এখনো আরো বহুকাল বার বার বলি এবং বলতে থাকবো,

"অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ

যারা অন্ধ, সবচেয়ে বেশি চোখে দেখে তারা ;"(জীবনানন্দ দাস)। 

যখন দুঃসময় এসেছে, কবিতার লাইন হয়ে উঠেছে সহজতম, কঠিনতম।

এ বছর যে কবির জন্মশতবর্ষ, সেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়,

"প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

ধ্বংসের  মুখোমুখি আমরা "

কবি চরম অনূভুতিশীল, পৃথিবীকে সবসময়ই কি নষ্টনীড় মনে হয় তার, কবি সমর সেনের তাই মনে হয়,

"নষ্টনীড় পাখি কাঁদে আমাদের গ্রামে

রক্তমাখা হাড় দেখি সাজানো বাগানে "

আমাদেরো তাই মনে হয়, সদ্য লিখতে আসা তরুণ কবিরও তাই মনে হয়। এসময় হতাশার। পাশাপাশি আশার। কিন্তু বর্তমানে  আধুনিক কবিতা হিসেবে যা পাঠ করছি, প্রায় সব কবিতাই মানব মনের ধ্বংস স্তুপটির উপর লিখিত।

মনে হয় সারা পৃথিবী জুড়ে দুঃখের রাগরাগিণী বাজছে, আনন্দধারা বহিছে ভুবনে, এ কথাটি একজন সময়ের বাহকও সোচ্চারে লিখতে পারছেন না।

 

সর্বসময়ে এটাই প্রবল সত্য যে, কবি যখন কবিতা লিখতে শুরু করেন, তার মনের নেতিবাচক দিকটির প্রাধান্য বেশী থাকে। সমস্ত বিতৃষ্ণা, বিক্ষোভ, অপমান তিনি কবিতায় ঢেলে দেন। তাই তো কবিতাই কবির মুক্তি।

 

আর পাঠকের? তার মুক্তি কিসে?

একজন কবিতাপ্রিয়  পাঠক ক্লান্ত শরীরে দিনশেষে , একখানি কবিতার বই নিয়ে বসেছেন, তিনি কি পড়লেন, শুধুই ব্যর্থতা, জীবনের গ্লাসে গ্লাসে একজন কমদুঃখী কবির ( মানুষের ), দুঃখচাষ।

তারপর বই বন্ধ। এবং সেই পাঠক তখন গান শুনছেন, ততোধিক দুঃসময়ে লেখা এক সুকবির দুঃখের উত্তরণ ঘটিয়ে নিজেকে সমাহিত করার গান। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাই বলে। হয়তো এ অভিজ্ঞতা ততটা ব্যক্তিগত নয়, তাই লিখতে সাহস করা।

কোন কবির কারো মতো লেখা উচিত নয়। জীবনের ভীষণ পুরনো কথাগুলোকে একটু নিজের মতো করে বলা, এমনভাবে বলা যাতে ব্যক্তিগত সত্তার সীমারেখা বিলীন হয়ে অন্তত আরেকজন পাঠকের অন্তরে বেজে ওঠা যায়।

"মানুষের ভাষা তবু অনুভূতিদেশ থেকে আলো

না পেলে নিছক ক্রিয়া ; বিশেষণ ; এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল "( জীবনানন্দ দাস)। 

কবি মাত্রই আধুনিক। তিনি আধুনিক মননে। তিনি যদি আধুনিক না হোন তবে তিনি কবি নন। তাকে আধুনিকোত্তর হতে হবে। আধুনিকতা মানে সুন্দর, আরো সুন্দর ,আরো অনেক বেশী খোলা হাওয়া।

কবিতায় নতুন কিছু আর বলার নেই ...সেই মানুষ, প্রেম, কাম, গাছ, ফুল, পাখি, নদী বারে বারে ব্যবহৃত হয়েছে, বলেছিলেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তাহলে কেনই বা অজস্র তরুণের হৃদয়ে নিরন্তর এই আকুতি? 

সবাই কি শুধু কিছু হতে চান, সবাই কি শুধু প্রকাশমুখী? সবাই কি পুরস্কার পেতে চান? হয়তো এই সহজ অভিযোগ সবার ক্ষেত্রে সত্য নয়।

কবিতা সুন্দর। মানুষ সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এটা মানুষের স্বাভাবিক জৈব প্রবৃত্তি। 

কবিতা একটি ধারাবাহিকতা।

সমস্ত ধারাবাহিক জিনিস উত্তরসূরী ছাড়া ব্যর্থ। তরুণ কবি নিজের অজান্তেই  কবিতার উত্তরসূরী।

তাই এতো কবি। 

তার যোগ্যতা অযোগ্যতার বিচার বাংলা কবিতার গবেষকরা যুগে যুগে করবেন। 

তবুও ভালো লাগে না কবিতার রহস্যকে ভেঙে দেবার সস্তা আয়োজনও।

"জল ফুরালে পাঁক নিতে হয় ",আধুনিক কবি ও কবিতা সম্পর্কে তিনের দশকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন।

কবিতারতিতে মগ্ন একজন আধুনিক কবির কাছে, এর চাইতে বেশী সতর্কবাণী আর কি হতে পারে। 

কবিতায় ইতর রসিকতা এবং অবান্তর অশ্লীলতার প্রয়োগ, ভাঁড়ামি বা ম্যানারিজম বার বারই ঘুরে ফিরে আসে এবং আসছে, এসবও কবিতার ইতিহাসের অন্তর্গত অবশ্যই, কিন্তু এ ধরনের সৃষ্টি কবিতার কোন ইতিহাস রচনা করেনি বলেই আমার মনে হয়।

স্মার্টনেস কবিতাকে আকর্ষণীয় করে, কিন্তু প্রকাশের ভঙ্গিটি শুধু আকর্ষণীয় হবার নেশাতে মগ্ন থাকলে সেইসব সৃষ্টির স্থায়িত্ব বা গভীরতা নিয়ে সংশয় জাগে। 

কবিতাকে অবশ্যই দৃশ্য ও স্পর্শময় হতে হবে। 

"তোমাদের কবিতায় কেন সেই আগুন দেখি না

নিঃশব্দে যা পোড়ায়, কিন্তু নষ্ট করে না? " (লেখক...অজ্ঞাত) 

কবিতা নেতৃত্ব দেয় না, জ্ঞান দেয় না, কবি মনের খুশিতে, মনের বিষাদে, অন্তরের প্রেরণায় লিখেন, সেইসব কথা সবসময় মান্য।

কিন্তু কোনো কবির খেয়ালখুশি বা প্রলাপোক্তি সবকিছুই কি মেনে নিতে হবে! নতুন রসায়ন আবিস্কারের তাগিদে কিম্ভূত সৃষ্টিকে কি কেউ কোনদিন মেনে নিয়েছে?

কবিতা যখন প্রকাশিত হয়,  তখন তাকে  পাঠকের দরবারেই দাঁড়াতে হয় । বিভিন্ন পাঠক নানাভাবে তাকে পড়েন বা সেটি নিতান্তই অপঠিত হয়ে আবর্জনার স্তুপে স্থান পায়।

যেকোন রকম  কবিতাই  পাঠকের উষ্ণতা ছাড়া ব্যর্থ।

কবিতার মানদন্ড হয়তো এটাই। 

এই প্রশ্নগুলো বা কথাগুলোও কবিতার মতোই পুরাতন। তবুও আমরা দিনরাত এসব নিয়ে নিয়ে তর্ক করি। কারণ কবিতার আলোচনায় অসীম আনন্দ। 

শুধুমাত্র কাল্পনিক সৌন্দর্যের বিস্তার, স্নিগ্ধতা, বন্দনা এ সবকিছু নিয়ে প্রাচীন কবিরা সার্থক কবিতা রচনা করে গেছেন, সার্থক কারণ আমরা এখনো তা পড়তে ভালোবাসি, কিন্তু কল্পনা সুন্দরী থেকে রক্তাক্ত পথে কবিতার যাত্রা শুরু হয়েছে সেও বহুকাল।

"আমার কবিতা করে বসবাস বস্তি ও শ্মশানে

চাঁড়ালের পাতে খায় সূর্যাস্তের রঙ লাগা ভাত "

...( কবি শামসুর রহমান )।

"কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর

ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান

         চতুর্দিকে হতবাক্ দাঙ্গার আগুনে

নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজদের কাতর বর্ণনা। "

কবিতার শক্তি তার মাধুর্যে, তা যতই ছোট কিংবা দীর্ঘ হোক না কেন। বাংলা কবিতা পাশ্চাত্য অভিঘাতে যেমন মুক্তি পেয়েছিল তেমনি বিস্তার ও গভীরতা পেয়েছে।

এখানে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ফরাসি কবি গিলভিকের কয়েকটি পংক্তির  অনুবাদ লিখতে খুব ইচ্ছে করছে। অনুবাদ করেছেন ফরাসী ভাষা ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম পরিচিত নাম চিন্ময় গুহ। তিনি

তার অনুবাদ সংকলনটির পূর্বকথায় বলেছেন, 

"চতুর্দিকের ধস ও স্থিতিহীনতার মধ্যে ফরাসি কবিতাকে আমার সবসময়ই মনে হয়েছে তীব্র ও অপরূপ এক প্রতিরোধ। " 

আধুনিক ফরাসি কবিতার মূল সুর হচ্ছে,

"চূড়ান্ত সংকটের মধ্যেও জীবনের অন্তহীন রহস্যকে অস্বীকার না করা ",এবং একই সঙ্গে ফরাসি কবিতা প্রতিবাদের এবং প্রতিরোধের হাতিয়ার।

ফরাসি কবি গিলভিকের,

এক

......

"গাছটি বেঁচে রয়েছে

কাঠের মতো,

পাখির মতো,

নড়ছে না।....(শীতের গাছ) 

দুই

.....

গোলাপগুলি, 

যেন ঠোঁট

যেন শরীর ....(গোলাপগুলি যেন ঠোঁট )

তিন

......

চলো, আর একবার আমরা নীচু হই। পৃথিবী পিঁপড়েদের জন্যেও। ...(চলো, আর একবার )

বাংলা কবিতার বিষয়, রীতি, সর্বদাই ভাঙচুর প্রিয়। সেখান থেকে প্রায়ই এই হাহাকার ভেসে আসে বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কোনো কোনো অগ্রজ কবি পরবর্তী প্রজন্মকে তুচ্ছ করতে চান। এগুলোরও কিছু না কিছু সারবত্তা আছে। যা বাস্তব। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এর থেকে অব্যাহতি নেই।

মঙ্গলকাব্যের যুগ থেকেই, আমরা লক্ষ করি যে, অহংতাড়িত কবি অন্যকে হেয় করেন। তাঁর লেখা ছাড়া অন্যের লেখায় ভবিষ্যতের আলো খুব একটা দেখেন না। 

"প্রথমে রচিল গীত কানা হরি দত্ত

মূর্খে রচিল গীত না জানে মাহাত্ম্য। "...(বিজয় গুপ্ত) 

কবিকে খুব পরিশ্রমী হতে হয়। কারণ কবি স্বনির্মিত গবেষক।

উপন্যাস হঠাৎ করে লেখা যায় না। একটা পরিকল্পনা, পড়াশোনা, সময়কাল ধরে নিয়ে তবে এগোতে হয়। প্রবন্ধ লিখতেও বিস্তর খাটুনি।  প্রবন্ধের পাঠক  লেখকের মৌলিকত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন  রেফারেন্স চায়।

গল্প মানেই একটি মজবুত ঘর। ভালো শক্তপোক্ত  কাঠামোর মধ্যে নরম সুখ গুঁজে দেওয়া।

আর কবিতা ...কোন নিয়ম নেই, তাই সবচাইতে কঠিন, সবচাইতে ব্যাপক, সবচাইতে সমৃদ্ধ।

হাজার বছরের মনিমানিক্যে ভরপুর সুবিশাল বাংলা কবিতার প্রাঙ্গনে যে নতুন কবি কবিতা লিখতে আসবেন, তাকে উদভ্রান্ত কিংবা দায়হীন হলে চলবে না। 

কবিতাটি লেখার পর তাকে সুন্দর করে পাঠ করতে হবে। সেই পাঠই অনেককিছু বলে দেয় একজন বুদ্ধিমান কবিকে। নিজের বিচারক হওয়া কবির প্রথম কাজ।

কবিরা কবিতা লিখবেন, কাব্যরসই যার প্রধান  শর্ত।

স্মরণীয় পংক্তি রচনার খন্ডসিদ্ধি, সার্থক কবিতা নয়।

সেখানেও বিতর্ক। একটি সুদীর্ঘ কবিতার তীক্ষ্ণ দুটো বা তিনটি লাইনই তো শেষ পর্যন্ত আমাদের উপজীব্য হয়। তাহলে?

আসলে কবিতা হবে আলোর ঝলক, আশার শিখা। কবিতা যোদ্ধার হাতের সেই অস্ত্র যা শস্যের চাষ করে,

যে  বিদ্রোহ আমাদের কাছে অবাস্তব, কঠিন  মনে হয়, কবির কলম বাহিত হয়ে তাই হয়ে উঠে বধির সমাজের ভাষা।