সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , চিরশ্রী দেবনাথ
সংখ্যার শরীরে মৌমাছি
চিরশ্রী দেবনাথ
পর্ব পাঁচ
বিকেল থেকে শুরু হয়েছে টিপ টিপ বৃষ্টি , আকাশ মেঘলা , বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। রুমে বইপত্র , ল্যাপটপ আর গরম চা নিয়ে বসে থাকার উপযুক্ত সময় এটা। কিন্তু নিজেকে এভাবে আলাদা রাখাটাও ঠিক নয়। কান ও মাথা একটা কালো স্টোল দিয়ে ঢেকে ঈরা রুম লক করে ক্যাম্পাস চত্বরে চলে এলো। ছেলে মেয়ে সবাই এসেছে, শুধু তাই নয় প্রফেসর অন্বেষা চৌধুরী ছাড়াও আরো অন্যান্য প্রফেসররাও এসেছেন যারা যারা কোয়ার্টারে রেসিডেন্ট হিসেবে থাকেন। এখানে কোনো মঞ্চ তৈরি হয়নি, বিশাল ফেস্টুন তৈরি হয়েছে যেখানে একটি মেয়ের চোখ বাঁধা , মেয়েটির দুই কাঁধে দুটো ডানা আঁকা , নিচের দিকে মুখ ,
মুষ্টিবদ্ধ দুটো হাত , সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে রক্ত । ঈরা একজন সঙ্গী খুঁজছে যার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কিছুসময় কথা বলা যায়। বহুজনের মাঝখানে এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকাটা খুবই অড লুকিং ।
লোকাল নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকরাও এসেছেন, ওরা সবকিছু ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত , এই প্রতিবাদের আওয়াজটা সবজায়গায় পৌঁছে যেতে হবে তো।
ঈরার হঠাৎ নিচের দিকে চোখ গেল, স্ট্রিট লাইটের জোরালো আলোতে এই বিশাল ক্যাম্পাস এরিয়া আলোয় আলোকিত হয়েই থাকে সন্ধ্যার পর থেকে, যে পিচরাস্তাটি এঁকেবেঁকে উঠেছে , সেই পথে একটি কালো গাড়ি আসছে, যে গাড়িটি ঈরার খুব চেনা, মুখার্জি স্যারের গাড়ি।
প্রথমে অভয়ার জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হল।
তারপর বলার পালা, ঈরা বুঝতে পারছিল না এরা কি বলবে ? এতোটা নৃশংসতাকে কি বর্ণনা করা যায় ?
যেহেতু এটা একটা সভার মতোই হচ্ছে এবং প্রথম থেকেই সুহানি পুরো ব্যাপারটা পরিচালনা করছে , তাই সুহানি অন্বেষা ম্যাডামকেই বলল কিছু বলতে ।
অন্বেষা ম্যাডাম কিন্তু ঘটনার বিবরণে গেলেন না,
তিনি মূলত এই ঘটনাটিকেই ছুঁলেন না। খুব সোজা সাপটা কোথায় বললেন দেখুন ছেলেমেয়েরা, অনেক পরিশ্রম করে তোমরা এতোটা অব্দি এসেছো, তোমাদের আবেগকে কারো হাতে তুলে দিয়ে তাকে অস্ত্র বানাতে সাহায্য করো না। তোমরা সবাই বুদ্ধিমতী , আর এটা ঠিক জাতীয় স্তরের শিক্ষাকেন্দ্রও নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেরও বটে , কোথাও যেন এর নাম কোনভাবে অনুজ্জল না হয়। তোমাদের যেকোন সমস্যার কথা আমাকে বলতে পারো, আমি নিশ্চয়ই তা সমাধান করার চেষ্টা করব।
আরো অনেকেই কথা বলছে , ঈরা ভাবছে এখানেও সমস্যা?
মিঃ মুখার্জীর গাড়ি এসে থামল। তিনি নামলেন,
মৃদু হাসলেন তারপর চিৎকার করে বললেন বহু কষ্টে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সমস্তরকম রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি, নষ্ট করে দিচ্ছো তুমি অন্বেষা ম্যাডাম । ছাত্রছাত্রীদের কে সাহস দিলো ওদের অমূল্য সময় অপচয় করে এইসব হাবিজাবি ব্যাপারে মাথা ঘামাতে ?
ডঃ অন্বেষা চৌধুরী কিন্তু চিৎকার করলেন না। তিনি থামলেন। এগিয়ে গেলেন মিঃ মুখার্জির কাছে, তারপর যেভাবে বললেন সেটা অনেকের কানেই পৌঁছুলো না।
তাই নাকি মিঃ অনিকেত? পড়াশোনার সময় মাঝে মাঝে নষ্ট করতে হয় বৈকি ? নাহলে তো পড়াশোনা শেষ করাটাও একসময় কঠিন হয়ে পড়ে বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। আর প্রতিষ্ঠানের মালিক তুমি নও, সেটা গড়েও তোলোনি। আমি আর তুমি এখানে পড়াই, হয়তো আরো কিছু বাড়তি দায়িত্ব পালন করি। আর আজকের এই জমায়েত কিন্তু ততটা হেলার নয়, একটি উচ্চশিক্ষিত মেয়ে তার নিজের কাজের জায়গায় মেডিকেল কলেজের মধ্যে ধর্ষিতা ও খুন হয়েছে, সবকিছু পচে গেলে সেখানে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করা যায় না।
অবশ্য তোমার সঙ্গে এসব কি বলছি , তুমি তো…
থামলে কেন?
থামিনি অনিকেত।
আমার লাইফস্টাইল আমার, সেখানে আছে মেধা আর সাকসেস, এই একটাই ছক,
ছকের বাইরে যে থাকতে চাইবে সেই তো আউট তাই না , তুমি কিন্তু পারোনি, আমিই তার প্রমাণ , অনিকেত।
ছাত্রছাত্রীরা ঠিক বুঝতে পারছিল না মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডাম কি কথা বলছে , কারণ তারা একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল , আর চারদিকে নানা হইচই।
ঈরা এখন এসে জাহানারার কাছে দাঁড়ালো। জাহানারা কাশ্মীরি মেয়ে । ঈরার মতোই একটু চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে, আজকে সেও এখানে এসে যেন কি করবে বুঝতে পারছিল না, একটু পরে আবির এলো, ওদেরকে দেখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। এটা ঈরার ভালো লাগল , সেদিন বেশিই খারাপভাবে কথা বলেছিল সে, সরি বলাটা দরকার। কিন্তু এখন বললে খুব ড্রামাটিক হবে। ঈরা কিছু বলল না। আপাতত তারা মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডামের কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে ।কারণ স্যার প্রতিবাদ , জমায়েত এগুলোর বিপক্ষে বোঝাই যাচ্ছে। এমনসময় প্রফেসর এলিনর মরটিনকে ওদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখল ওরা ।
এই মধ্যবয়সী জার্মান মহিলা, ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটেসনের গেস্ট লেকচারার হিসেবে এসেছেন।
খুব সুন্দর করে আস্তে আস্তে কথা বলেন ,
হঠাৎ তিনি সুহানির কাছ থেকে মাইক্রোফোন নিলেন, তারপর বললেন
“Where I come from, we believe silence can be complicated. And today, I refuse to be complicit.”
“This isn't politics, Professor Mukherjee. This is mathematics of conscience. One wrong variable in a proof, and the theorem collapses.”
মুখার্জি স্যার একটু চমকে উঠলেন, একটু হাসলেন এবং কেটে কেটে বললেন ওকে , গো এ হেড, তবে রাত নটার সঙ্গে সঙ্গে ফেস্টুনসহ চত্বর খালি হওয়া চাই। গাড়িতে করে তিনি নিজের কোয়ার্টারের দিকে চলে গেলেন।
ঈরার মনটা খারাপ হয়ে গেল, দুর সবকিছুই এখন যেন আলুনি লাগছে , তবে প্রফেসর এলিনরের কথাটাও খুব ভালো লেগেছে , সত্যিই তো তাই ।
প্রফেসর এলিনরের লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। ধূসর-নীল চোখ, হালকা বাদামি চুল সবসময় পিছনে জড়ানো থাকে। পরনে থাকে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা কুর্তা জাতীয় ঢিলেঢালা পোশাক—ভারতীয় পোশাকের সঙ্গে তিনি নিজের পোশাকের একটু মিল রাখেন সবসময়ই , তিনি স্পষ্টভাষী, অনুভবপ্রবণ কিন্তু আবেগপ্রবণ নন। ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের যুক্তিসম্মত প্রশ্ন করতে শেখান, 'blind memorization' একদম সহ্য করেন না , আজ তো ঈরা ও সুহানি তাঁর কথায় মুগ্ধ ।
জাহানারা ঈরাকে বলছে ,
এই শোনো... ফির সে ছুটি পড়েগা না? ওয়াল্লাহ, মই না অ্যাবল টু গো ব্যাক কাশ্মীর রাইট নাও। ইট ওয়াজ হেল লাইক ফাইটিং উইথ মাই পেরেন্টস টু কম হিয়ার। জানো ঈরা, মাই বড়া চাচা তো অলরেডি মাই ম্যারেজ ফিক্স করচুকা থা... বাট মই বলি, 'নেহি, মই পড়েগি, দূর তাক পড়েগি!'
হামারে ফ্যামিলি মে কোই গার্ল এত দূর নাহি গেয়ি থি পড়নে, আর ইফ ইট ওয়াজ ফর এম.বি.বি.এস. না, দে উড হ্যাভ অ্যাক্সেপ্টেড। বাট ইটস ম্যাথস! আর ম্যাথস কে লিয়ে কে জিদ করনা, ইট ওয়াজ লাইক অ্যা রেবেলিয়ন।
অন্বেষা ম্যাডাম এগিয়ে আসছেন, ওদের জটলাটার দিকে তাকালেন মনে হলো,
আবির হঠাৎ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল ,
আচ্ছা কনটেক্সট না বুঝে থিওরেম দাঁড়ায় না , তাহলে এই ঘটনার প্রসঙ্গ থেকে নিজেকে আলাদা করাটা কি ঠিক? তোমরাই বলো ?
ম্যাডাম একটু হাসলেন। ওয়েল সেইড। আমাকে শুনিয়ে বলছ নাকি আবির?
না ম্যাডাম । এমনি বললাম ।
ভালোই বাংলা বলছ আজকাল , আবির বর ঠাকুর ! ম্যাডাম হাসলেন সামান্য।
ভিড় ঠেলে তিনি একটু উঁচুতে দাঁড়িয়ে বললেন এটা কিন্তু মানতেই হবে , নটা পর্যন্ত সময়। চলো মিছিল শুরু হোক এবার।
ঈরা মৃদু গলায় বলল,
“এই ক্যাম্পাস আমাদের শেখায় প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিতে। তাহলে এইখানেই যদি কণ্ঠরোধ হয়, তাহলে আমরা কি সত্যিই গবেষক? কোথাও যেন অংক তৈরি হচ্ছে, তাই না?
অন্বেষা ম্যাডাম বলছেন,
“তোমরা কেউ ভুল করছ না। যেটা ভুল, সেটা হলো—ভয় দেখিয়ে, চুপ করিয়ে রাখা। আমরা মেধাবী বলেই প্রতিবাদ করি। কারণ যে মানুষ যুক্তি জানে, সে অন্যায়কে চুপচাপ মেনে নিতে পারে না ,
আমাদের মিছিল ক্যাম্পাসের বাইরে সামনের ছোট বাজারটা পর্যন্ত যাবে এবং ঘুরে আবার এখানে এসে শেষ হবে, সুহানির সঙ্গে স্লোগানে আমাদের সবার গলা যেন শোনা যায়,
we want justice.
মিছিল শুরু হলো, সেই সঙ্গে মেঘও ডাকতে লাগল আকাশে, ঠান্ডা হাওয়া বইছে । প্রত্যেকেই হালকা শীতের পোশাক পরে আছে, কারণ এখানে সকাল এবং রাতে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডাই থাকে সারাবছর ধরে।
সুহানি , ঈশা আর জয়ীর কাছে তিনটে মাইক , প্রত্যেকটা স্লোগানের পর বলতে হবে we want justice ,
অনেকগুলো পোস্টার ছাত্রছাত্রীদের হাতে হাতে, কোথাও লেখা
"হসপিটাল নয় , মৃত্যুপুরী কেন?", "যেখানে বিচার নেই, সেখানে বিদ্রোহ জন্মায়!",
"Naari pe hinsa, bandh karo yeh tamasha!", "Justice delayed is justice denied!", "হাম ন্যায় চাহতেঁ হ্যায়, রহম নয়!"
"Say her name – Avhaya! We won’t forget!"
"চুপ করে বসে থাকলে, পরেরটা তুমিও হতে পারো!" এইসব।
ঈরার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, মেয়েটা তীব্র পাশবিক অত্যাচার সহ্য করেছে, এই কদিনে এটা স্পষ্ট সে কিছু একটার প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল, তাই এভাবে চলে যেতে হয়েছে। ছেলে হলেও হতো এটা, শুধু সেখানে ধর্ষণটা হয়তো থাকত না। মেয়ে মানেই শরীর , শরীরটাকে ছাড় দেওয়া যাবেনা।
পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে মিছিল এখন মেইন রাস্তায়, দুপাশের বাড়িঘর থেকে কয়েকটি নিরুত্তাপ মুখ একটু উঁকিঝুৃঁকি দিচ্ছে, রান্না বসিয়েছে লোকজন , ধোঁয়া বেরোচ্ছে , শুকনো মাছ রান্নার তীব্র গন্ধ নাকে এলো কয়েকবার। ছোট্ট বাজারটাতে এসে একটু সময় থামা হলো, স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সেখানে উপস্থিত ছিলেন, ঈরা অবাক হলো, সুহানি , জয়ী , ঈশা এতোসব করার সময় পেলো কখন, করেই বা কি হবে? ঈশা , সৃজনী অবশ্য পি এইচ ডির স্টুডেন্ট নয় ওরা এম এস সি করছে।
গ্রামপ্রধান স্থানীয় ভাষায় ভাষণ টাইপের কিছু বললেন , পঞ্চায়েতের লোকেরাও ছিল, প্রায় জনা পঞ্চাশ এলাকার লোকজন । এদিকে বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে, পাহাড়ি ঠান্ডা খুব ভয়ঙ্কর ব্যাপার , অসুস্থ হলে দেখতে হবেনা আর।
সবাই ছাতা আনেনি বলে যারা এনেছিল তারাও খুলতে পারছে না, এই যাহ্ জোর বৃষ্টি ।
কোনরকমে দ্রুত হেঁটে হোস্টেলে চলে এলো ঈরা আর জাহানারা।
নটার আগেই সব শেষ। শান্ত রাত। গভীর কুয়াশা। বহুদূরে একটি মেয়েকে দুঃসহ যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে ।
In this time mathematics is unable to explain.

0 মন্তব্য(গুলি):