সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

৮:০০ PM চিরশ্রী দেবনাথ 0 Comments


সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

চিরশ্রী দেবনাথ

পর্ব সাত

কুহু ফিরে এসেছে। এতোদিন ঈরা ঘরটাতে আর রুমমেট নেয়নি। পুরো চার্জটাই নিজে শেয়ার করেছে। এই কুহু আগের কুহু নয়। ওর বিয়ে হয়ে গেছে,  তবে বর নিউইয়র্কে কোন একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করে,  ওখানেই  থাকে,  সেখানে এখনি কুহু যেতে পারবে না, বেশ কিছুদিন পর যেতে হবে,  পাসপোর্ট,  ভিসা এসব তৈরি করতেও সময় লাগবে ,  তাছাড়া বউকে নিয়ে যাওয়া আপাতত সম্ভব নয়। 

তবে বিয়ে করলে কেন?

কুহু বলল , উপায় ছিল না। বাবা রিটায়ার করেছে,  ছেলে উচ্চশিক্ষিত,  রোজগেরে,  মা বাবা দুজনেই বলল বিয়ে করে নিতে,  ওদের বাড়ি থেকেও খুব চাপ দিচ্ছিল।

এখন জোর করে এসেছি পড়তে,  জানো ঈরা আমি আমার হাজবেন্ডকে বিশ্বাস করতে পারছি না ঠিক,  তবে বলেছে মাসে মাসে টাকা পাঠাবে,  

আমি হ্যাঁ না কিছুই বললাম না,  আমার তো স্কলারশিপটা রয়েছে এখনো,  নষ্ট হতে দেবো না। লেগে পড়ি , তোমরা অনেকদূর এগিয়ে গেছো তাই না ঈরা ?

না কুহু,  আমি এগোতে পারছি না , আসলে,  নাহ্ থাক। ঈরা সাবধানি হলো, যে কল্পনায় ও বাস করে তার থেকে এক বিন্দুও যাতে না ছলকায়।

আমাকে একটু সাহায্য করো ঈরা , কিভাবে কোথা থেকে শুরু করব?

মিঃ কুলকার্নি তোমার স্যার ক্যালিফোর্নিয়া গেছেন,  আজ তো রবিবার। তুমি ফোন করোনি আসার আগে বা তুমি যে আবার আসছ?

করেছি ,  মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডামকে । বলেছেন আসতে । কাল ওনাদের সঙ্গে দেখা করব। আমাকে পারতেই হবে ঈরা । নাহলে এতোদিনের পরিশ্রমের কোনো দাম রইল না।


তাহলে, হুট করে বিয়েটা করে নিজেকে বেঁধে ফেললে কেন?

কোথায় বাঁধলাম , সায়ক নেয়নি আমাকে,  তাতে তো সুযোগও পেলাম পড়ার,  এখন দেখা যাক কি হয়,  মা বাবার টেনশনও দূর হলো  , সব কিছু কি জীবনে ইচ্ছেমতো হবে ঈরা ? আমার পরে আরো এক বোন ও ছোট ভাই আছে। এজন্য মা বাবার খুব টেনশন ছিল আমাকে নিয়ে।


টেনশন!!  তুমি কি সাধারণ গ্র্যাজুয়েট মেয়ে নাকি,  যার জন্য মা বাবা ছেলে খুৃৃঁজছে , তুমি এম এস সি করে নেট ক্লিয়ার করে এখানে পড়ার জন্য স্কলারশিপ পেয়েছো,  তারপর বিয়ের অজুহাত দিচ্ছো,  অনেকটা জাহানারা বশিরের মতো লাগছে কথাগুলো।  এখনই সরকারি কলেজ  না হোক বেসরকারি কলেজেই  চাকরি পেতে পারতে আর তোমার মা বাবা কিনা বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগে গেলেন , কুহু সমস্ত ব্যাপারটা কেমন যেন লাগছে । বাই দ্য ওয়ে , তোমার পার্সোনাল ম্যাটার । কিন্তু  এই কিছুদিন একা থাকতে থাকতে কমফোর্টেবল হয়ে গেছি , তাই আমি পুরো চার্জ দিয়ে একাই থাকতে চাইছি। এ ব্যাপারে মেট্রনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

ও মাই গড!  আজই এলাম আমি, আর তুমি একথা বলছ ! কেন ঈরা ? আমি কি রুম পেয়ে যাবো বললেই ?  থিতু হতে দাও. তো।

পাবে। রুম আছে,  এখানে ততটা ভিড় নেই। তুমি এখন ম্যারিড ওম্যান । হাজবেন্ডের সঙ্গে ফোনে কথা টথা বলবে , ভি ডি ও কল করবে,  আমার অসুবিধে আছে কুহু। আমি পারব না,  সরি। ধরে নাও কিছুটা স্বার্থপরও।

মেট্রন রুমে নেই। নিমা আন্টি  মেট্রনের ঘরের জিনিস পত্র মোছমুছি করছিলো , বলল মেট্রন নাকি বাড়িতে গেছে,  কাল সকালে আসবে।  যেতেই পারেন,  হয়তো কাছাকাছি কোন গ্রামে বাড়ি । নিমা আন্টির টাইটেল ভুটিয়া ,  নেপালি ও বাংলা দুই ভাষাতেই কথা বলতে পারে তাই একদিন জিজ্ঞেস করেছিল ঈরা । সকালে চা ব্রেকফাস্ট পরিবেশন করা  আরো নানা দেখভালের কাজে নিমা আন্টি ব্যস্ত থাকে,  কপালে বড় লাল টিপ পরে  , হাসিখুশি,  বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও খুব সুস্বাস্থ্য , ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে স্নেহমাখা সুরে কথা বলে , সবার দিকেই একটা খেয়াল আছে বোঝা যায় অবশ্য সে একা স্টাফ নয় আরো অনেক আছে  , প্রত্যেকেই ভালো বলে মনে হয় ঈরার ।


রবিবার হলেও ক্যাম্পাস একদম বন্ধ নেই। লাইব্রেরি আর সাইবার ক্যাফে খোলাই আছে , বেশ কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, অনেক স্টুডেন্টদেরই  নানা কাজে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে,  হয়তো লাইব্রেরিতে বা সাইবার ক্যাফেতেও  আছে কেউ কেউ।  

কী জানি হঠাৎ মনে হলো ঈরার , যাই আজ একটু ক্যাম্পাসের বাইরেটা ঘুরে আসি। শিব মন্দিরটাতে গেলে কেমন হয়?  কত দূর?  একা যাওয়া কি ঠিক হবে? দেখা যাক বাজারে গিয়ে,  নাহলে এমনিই খানিকটা ঘুরে আসবে। ব্যাগে এই হাজার খানেক টাকা আছে, গুগল পে কাজ না করলেও অসুবিধে নেই,  পাহাড়ি জায়গায় সবসময় হাতে কিছু নগদ টাকা রাখতে হয় , ক্যাম্পাসের বাইরে নেট দুর্লভ বস্তু ।   আর রুমে থাকতে ভালো লাগছে না। 

সেদিন মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা দূর এসেছিল আজ একা হাঁটছে। হাঁটা ম্যাটার না , আসলে সবার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইছে ঈরা , শান্ত মন নিয়ে পড়ার কাছে ফিরে আসবে , আগেও বড় পরীক্ষাগুলোর সময় সে এরকম অশান্ত হলে নিজের মতো করে কোন ব্রেক নিত। 


এ জায়গাটা বোধহয় এলাকার মোটরস্ট্যান্ড জাতীয়। একটি বাস ও কয়েকটি ছোট গাড়ি   দাঁড়িয়েছিল, পানের দোকানে বক্স বাজছে 

হাম তো ঠেহরে পরদেশি,  এখনও দালের মেহেন্দি শোনে মানুষ !  ঈরা  নাহয় পুরনো গানের ফ্যান। 

একটি গাড়িতে কয়েকজন লোক বসেছিল  । বোধহয় আরো প্যাসেঞ্জারের অপেক্ষা করছে, 

ঈরা একটু জোরেই বলল —

“শিব টেম্পল পে জানে বালা কউন সা গাড়ি হে?”

ঐ গাড়িটির ড্রাইভার চিল্লিয়ে বলল ,

“আইয়ে ম্যাডামজী, হম উধার হি যা রহে হ্যায়।”

  ঈরা এখন লক্ষ্য করল ঐ লোকগুলোর হাতে পুজো দেবার জন্য কিছু ফল,বেলপাতা ,ধূপকাঠি মোম ইত্যাদি মিলিয়ে ছোট ডালা রয়েছে। ঈরা উঠে পড়ল গাড়িতে।  সূর্য মধ্যগগনে । অনেকটা দিন এখনো বাকি , তাছাড়া আবহাওয়াও ভালো , বৃষ্টি নামেনি,  যদি নামে দেখা যাবে,  ছোট্ট একটা ছাতা আজ ঈরার ব্যাগে আছে। গাড়িটা দু তিনটে বাঁক নিতেই ঈরা দেখতে পেল ওদের পুরো ক্যাম্পাসটাকে। শ্রীনিবাস রামানুজন লাইব্রেরি , 

Gauss Hall, সবচেয়ে উঁচু জায়গায় ওদের সাইবার ক্যাফে Cybernode , গার্লস হোস্টেল,  বয়েজ হোস্টেল, ক্যাফেটেরিয়া,  আরো অন্যান্য হলগুলো,  কোয়ার্টার, শপিং মল  সবকিছুই সামান্যসময়ের জন্য চোখে পড়ল। এখন গাড়িটা ওপরে উঠছে, বেশ উঁচুতে আছে তো মন্দিরটা ! ঈরা ভেবেছিল ক্যাম্পাসের উচ্চতাতেই হবে,  শুধু বিপরীত দিকের  পাহাড়ে,  এখন বুঝতে পারছে তা নয়।  একটু ভয়ই লাগছে । গাড়িতে একটা ফ্যামিলি যাচ্ছে,   স্থানীয় ভাষায় কথা বলছে , একদম মশগুল । ঈরা ভাবছে গাড়িটা থামিয়ে এখানেই নামবে কিনা। ফিরে যাবে অন্য কিছুতে করে  । মন থেকে তৈরি হওয়া উৎসাহ ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে,  কী হবে শিবমন্দিরে গিয়ে,  পুজো তো কোনকালেই দেয়নি, ওখানে গিয়ে পুজো দেবার মতো ভক্তিও নেই,  কষ্ট করতেও ইচ্ছে করছে না। বলবে নাকি ড্রাইভারকে ? এসব ভাবতে ভাবতেই ব্রেক কষে গাড়িটা থেমে গেল। কি ব্যাপার?  

সবাই নেমে গেল,  ঈরাও নামল। গাড়ি আর যাবে না,  মন্দিরে যেতে অনেকটা পায়ে হাঁটা পথ, দর্শন করে আসা অব্দি গাড়ি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।

ঈরা দেখলো একটা সর্পিল পথ ,  মাটির সিঁড়ি কাটা, বেশ ওপরে উঠে গেছে,  পাহাড়ি ফ্যামিলিটি সেদিকেই যাচ্ছে।

ঈরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল । এখানে কিছু সময় দাঁড়িয়ে একটু নির্জনতা উপভোগ করে তারপর ওরা ঠাকুর পুজো দিয়ে ফিরে এলে চলে গেলেই হবে। 

. "ম্যাডামজী, আপ নেহি জাওগি কিয়া?"

ড্রাইভারটি জিজ্ঞেস করল। 


"নেহি, চক্কর আতা হ্যাঁ।"


"তো ফির বহুত দের রুকনা পরেগা “


 "রুকুঙ্গা, ইধর-উধর ঘুম লেঙ্গে থোড়া।"


“উধার এক ছাঁও হ্যাঁ, বেঠ ভি সক্তে হ্যাঁ।"


ঈরা দেখল রাস্তা থেকে একটু দূরে টিনের ছাউনি দেওয়া বসার জায়গা। আসলে পাহাড়ি এলাকায় উন্মত্ত বৃষ্টির জন্য রাস্তার ধারে এইসব ব্যবস্থা করে রাখা ।

বেশ ভালো তো,  বসা যাবে।

থেঙ্ক ইউ ভাইয়া ।

কিন্তু ঈরাকে বসতে হলো না।

ঈরার সামনে একটি গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়ালো।

দরজা খুলে নামলেন ডঃ মুখার্জি স্যার

আর ইউ ঈরা ? দ্য ব্রিলিয়ান্ট গার্ল,   ওয়ান অব মাই ফেভারিট স্টুডেন্টস !  কি করছ একা একা এই পাহাড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে? 

এসো আমার গাড়িতে ।

স্যার আমি এই ছোট গাড়িটাতে এসেছি,  একটু পরে ফিরে যাবো।

আমি বলছি এসো আমার সঙ্গে।

সম্মোহিতের মতো ঈরা স্যারের পাশে গিয়ে বসলো , তিনিই গাড়ি চালাচ্ছিলেন আজ ।















  




0 মন্তব্য(গুলি):