নিঃস্বরের করতলে, দীর্ঘ কবিতা, চিরশ্রী দেবনাথ
বইয়ের নাম
নিঃস্বরের করতলে
চিরশ্রী দেবনাথ
লেখকের কথা
দীর্ঘ কবিতা প্রলাপের মতো । প্রবল জ্বরে মানুষ প্রলাপ বলে । ঘোরের কথা মানুষের মনে থাকে না। কিন্তু দেহঘরে আলো জ্বালায় মানুষের এই আকুতি । বীজধানের মতো তাকে তুলে রাখি নিঃস্বরের করতলে।
উৎসর্গ
যেদিন কবিতা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে সেই লেখাহীন , কবিতাহীন সময়ের কোন এক আশ্বিনের বিকেলকে…
সূচীপত্র
শোক
আশ্বিনের বিকেল
নিঃস্বরের করতলে
মনুনদীর উপাখ্যান
এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই
কাব্যগ্রন্থ
1. জলবিকেলে মেঘের ছায়া (২০১৬)
2. ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় (২০১৬)
3. প্রেমে সন্ত্রাসে (২০১৭)
4. শুভ দ্বিপ্রহর (২০১৮)
5. ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স (২০১৮)
6. উড়িয়ে দিও (২০১৯)
7. বিশ্বাসের কাছে নতজানু (২০১৯)
8. পাঠ করো নিভৃতে (২০২২)
9. তারা মেঘের মতো (২০২২)
---
গল্পগ্রন্থ
1. মায়ারাণী — কুড়িটি ছোটগল্পের সংকলন (২০১৯)
2. অণুগল্প সংকলন — একান্নটি অণুগল্প (২০২০)
3. নিকটবর্তী রূপকথা — ছাব্বিশটি ছোটগল্পের সংকলন (২০২৩ )
---
সংলাপ কবিতা
1. সোমবার সন্ধ্যায় (২০২১)
—
কবিতা বিষয়ক আলোচনামূলক বই
( অভিজিৎ চক্রবর্তী ও চিরশ্রী দেবনাথ)
1. যে জীবন কবিতাগামী (২০২১)
---
উপন্যাস
1. সূর্যছক (২০২১)
2. মারমেডের শহর থেকে (২০২২)
3. ঝিলমারির কাণ্ড কারখানা — কিশোর উপন্যাস (২০২২)
4. সংখ্যার শরীরে মৌমাছি (২০২৫)( প্রকাশিতব্য)
শোক
দীর্ঘ লেখা আসার আগে হাঁটু গেড়ে বসি
শরীর থেকে ক্রোধ নেমে যায়,
নেমে যায় অশ্রুকাম ,মলিন জীবন
থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মধুশ্বাস
পাখি হারিয়ে ফেলা অরণ্য যেন
তোমার প্রতীক ।এই লঘু স্তন ও
বিরামচিহ্ন দিয়ে অঙ্কিত চরাচর
দ্রোণফুলের সুগন্ধ বয়ে আনা ভোর, মৃত্যুর শ্বাস
প্রত্যেকে নিশাচর, সকরুণ বিরোধে
অবহেলা সয়ে যায় শীতের আয়ুর মতো ;
এখানে আমি আছি অথবা নেই ;
আছে শুধু রেখে যাওয়া শরীরের
নিঃসীম পচন ।নদীর ঢালে অপুষ্টিতে
বেড়ে ওঠা চিনার ফলের ফ্যাকাশে
বীজের দানায় দানায় আত্মহত্যাসম প্রাণ,
ছেঁড়া পতাকা পড়ে আছে,
ধূসর সংগ্রামের দগ্ধ চিহ্ন।
দেবী আসছে, পথে জ্বেলে রাখো
আলো, সশস্ত্র জওয়ান !
মা...ঢেকে রাখো বুক, পাহাড়ি কোমর,
পৃথিবীতে ভয়, ছিঁড়ে ফেলে শরীর,
চারদিকে শুধু মেয়েদের শরীর,
আমাদের লেখায় তারা মেধাবী উষ্ণ!
দেবীকন্যারা কামদুনি, মণিপুর হয়ে
এসো, ওদের বারান্দায় বসে পুজো নিও, বেলপাতা, যজ্ঞের ধোঁয়া,
রক্ত মাখা ফুল নিয়ে পায়ে পায়ে এসো,
এখানে এখন পুজোর আয়োজন, চন্দন ধূপ...
যুদ্ধ ছেড়ে চলে যাওয়া পরাজিত
সৈনিক সুন্দর! গৃহমুখী প্রাণ,
দরজায় মায়ের অপেক্ষা হলুদ
সম্বরার ঘ্রাণ ।নারীর কোলে মাথা
রাখবে সে যুবক পুন্য হীন,
ফিরে এসেছে যেন অচেনা হাওয়া
কিংশুকের শব নিয়ে উদাস বসন্তে,
তারপর, কবিয়াল হৃদয় খুলে দাহ
দেখাও, দেখো এই আবাহন,
বাঁশের বনে কেন নিঃশব্দে হেঁটে
যাচ্ছে শান্ত চোখের ডাহুক !
ধান কাটার পর যে মাঠ পড়ে থাকে
তার কাছে গিয়েছি ,জলে ভেজা
দুর্বল মেরুদণ্ড, হাতের পাতায় মগ্ন ভোর
আমার পায়ের শব্দে ঘুম থেকে উঠেছে
মাটির কীট, চোরা ঘাসে কেটেছে পা,
নির্জন সূর্যের ছেঁড়া আলো
হেঁটে যেতে যেতে শরীর থেকে
ঝরে গেছে আবরণ , দীর্ঘতম মাঠ,
জলশূন্য চোখে উপল মাছের
কোলাহল, পৃথিবী দ্বিধা হতে
গিয়ে হয়ে গিয়েছে আমার মতো,
সোনালি ঘরে রাখা ভেজা ধান,
পচন ধরেছে এইমাত্র
কুয়াশা নামেনি এখনও, বর্ষার দুখি
ধারা চরাচরে ,আনাজের নরম শিকড়
গলে গেছে, নষ্ট হয়েছে ফসল
পুজো যেন অভিঘাত, ভয়ঙ্কর
নদীস্রোত, কান্না। কিশোরীর
দু বেণি বেয়ে সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত
এই সুখ মৃত্তিকার মতো,
মুঠো থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে গাছ,
এসো পাখি, সবুজ তাপে
পুড়ে যাক স্মৃতিস্মারক
হলুদ সর্ষের খেত নেই,
জলে ভরা শস্যহীন মাঠ
আগাছা আর বেগুনি ফুলের ঝোপ,
গোধূলির আসনে ম্লান ফুলের দল,
অসুস্থ মানুষের চোখে তবু
ভিড় করে আসে উৎসবের
হারানো দিন, পায়ে পায়ে
জড়িয়ে আছে এই দংশন,
শ্যামাপোকা, কোজাগরীর মোহ,
নিবেদন করি মাঝে মাঝে,
কোথায় লোভহীন দেবতার থান,
উজ্জ্বল রশ্মি দিও, চোখ ছিন্ন
করে চলে যাবে ভেতরে,
অনেক নিচে হাওয়ার মতো
শোক, মৃদু সুখ ...
ভালোবাসি বলে, করতলে তিল
হরিতকী, শুশ্রূষা। মৃত্যুশোক ভুলে
যেতে চাই তাই, তর্পণ মানি না
বাসক গাছের পাতা তুলে আনি,
নীলকণ্ঠের মধুবিষ
পাত্র ভরে রাখা অদৃশ্য ধোঁয়া,
চোখ জ্বালা করা।
যখন অবিশ্বাস করি এই
মোহকান্তার, কন্ঠে ঢালি
নেশার মতন, দেখি ঘুঘু
ডেকে যাচ্ছে চরাচরে,
রোপিত হচ্ছে যেন শুধু
কালো দ্রাক্ষার বীজ ...
এখানে এসেছি বলে মহুয়ার
গাছ ছায়া মেলে দিল
বনের গন্ধ যেন যুবতীর ঘোর,
কৈশোরের মফসসলের চৌরাস্তা
থেকে আরো ঘন হয়ে সর নামে
জ্যোৎস্নার! গুল্মপথে নির্বিকার
আজ সেই নারী, শুনশান আকাশ,
বোবা নক্ষত্র বাড়িয়েছে হাত,
এই তবে মৃত পূর্ব পুরুষ,
সময় হয়ে গেলে চিনে নিও ইশারা,
গলে গেছে পাপতাপ, সকরুণ
আলো শুধু ভেসে বেড়ায় অস্মিত প্রান্তরে।
বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে শহরে
ভেসে আসে জুরি নদীর দীর্ঘশ্বাস
শুষ্কতা এতো জলীয় কেন?
কেন দিকচিহ্ন আগলে রাখে
মন্দিরের দরজা। পথিক ফিরে যেও !
এখানে ইতিহাস নেই,
স্তব্ধ ধানের তুষ আছে
গড়ে ওঠা এক মিশ্রবসতির
সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ।কার্তিকের
সংকীর্তন থেকে প্রসাদ কুড়িও ,
শোক ছিঁড়ে যেন নিরাকার ব্রহ্ম জেগে ওঠে।
ব্যর্থ জীবন দ্রুত আগুনের কাছে
যেতে চায় ,আগুন পেরোলে যেন
কিছু না থাকে আর
স্বর্গের রতিচিহ্ন অথবা
নরকের সহবাস
শূন্য থেকে এসে শুধু বিলীন ,
চিহ্নমাত্র ভুল জেগে নেই কোথাও
নারী ফিরে গেলে মৌ দাগ পড়ে থাকে
পুরুষ ফিরে গেলে দিকচক্রবাল
ফিরে যেতে যেতে অভ্যাস হয়ে
যায় সমস্ত বিরহবিন্দু
উদাসীনতার বৈভবে মেতে উঠছি ,
হয়তো ঝরে যাচ্ছে আত্মরতি
ভাঙা সঙ্গীতে ভেসে আসছে
আমারই কন্ঠ অকাতর
আগে শুনিনি, কেঁপে উঠছি,
হাত ডুবিয়ে তুলে আনছি পাহাড়ি বাদল
শূন্যমাত্র জানি, ফিরে দেখা
বকুলের খুধা ,জলবায়ুর উষ্ণ
বার্তা পেলে কেঁদে উঠি
খুলে দেখি অবারিত বায়ুসম্ভার ,
গরিব মেধা ,শীতের করুণ পাতার
ওপর শিশিরের দাগ , যত্নে গড়া
মাকরসার ঘরবাড়ি আর অস্থায়ী
আমি, এখান থেকে চলে যেতে যেতে
খুৃৃঁজে পেয়েছি কড়ির মালা ,
জৈব গন্ধে ভরা ।
একদিন উচ্ছাসের কামনা
করেছিলাম ,বসন্তের নরম ধুলো
মাখা সন্ধ্যায় হেঁটে বেড়ানো ।
তারপর জেনেছি খুব কঠিন
দুইজন একসঙ্গে হওয়া কোনো এক
গোধূলিতে। সেই থেকে বহে বায়ু ,
ক্রমাগত ব্যক্তিগত পদ্ম সম্ভারে
জমানো হয়ে গেছে না হওয়া দিনলিপি।
দুঃখযাত্রা শেষে আবারও জেগেছে পৃথিবী
মৃত্যুভার , শোক সন্তাপ নিয়ে ব্যথিত
শঙ্খের মতো যেন ভোরের আকাশ ।
এসো ' সন্তর্পন ' তোমাকে ছুঁয়ে দিই
দমকলের সাইরেনের মতো কি
কোথাও সংকেত দিল অশুভ !
ছিন্নধারাপাতে গলে গেছে তুঁতফলের রঙ
ফ্যাকাশে বিস্ময়ে কাঁটাভরা চোখে দেখে
মন্বন্তরের মাঠেও কেউ বলে ওঠে
" আহা চলো তো "
সোনালি খাবারের মতোই মেয়েরা
ছেলেদের খেয়ে ফেলে
এই অভিশাপ পেতে পেতে ছেয়ে
গেছে শুধু গ্রহণ আর পাপ
অনন্ত কাম হয়ে ওঠো
চোখে কাম , চোরা থুতনিতে কাম
তোমাকে দেখে দ্রবীভূত হয়ে গেছে অন্ধকার
তোমারই কামে আগুন জ্বেলে
পুড়িয়ে দিচ্ছো নরম শঙ্খের মুখ
অবারিত কাম শেষে
শরীরে এখন শান্ত নগ্ন জল
হে ক্ষণিক এসো , লৌহপাত্র নিয়ে ।
স্বচ্ছতোয়ায় হাত রাখি,
পৃথিবীর অজানা গহ্বর যেন,
লেখা আছে সেখানে কোনো
এক জন্মান্তরের ইতিহাস ,
অশ্লেষা নক্ষত্রের অভিশাপ,
অভিশপ্তরা সুন্দর হয়
জনারণ্যে তারা বিদ্যুতের
মতো আঘাত দেয়,
কাঙালের মতো কাঁদে।
অনন্ত আলোর মতো জেগে
উঠেছে পৃথিবী ,ছড়ানো নৃশংসতা,
ডানা ভাঙা আকুতি
ডিনামাইট আর বোমারুর গর্জন
তারই ফাঁকে নতুন কান্না জেগেছে
দুহাত মেলে যে চারাগাছ
জন্ম নিয়েছে ,সে কি শোক
ভুলে যাবে দ্রুত, মৃত্যুর ওপর
দাঁড়িয়ে বাক্স খুলে বের করবে
পান্না রঙের যোনি !
প্রতি ঋতুতে কবিতা লিখি ,
ঋতুর পর ঋতু কবিতা
লিখতে লিখতে
ঋতুহীন দিনে বসবাস ঘনিয়ে
আসছে ক্রমাগত
দুধঘাসে ছাওয়া নদীতীর
আমাকে জীবনের লোভ দিও,
প্রথম স্নানের চিহ্ন
তুলে এনে বলো এসব
এক মানুষীর অবহেলা
ভুলতে পারিনা ঐ সন্ধ্যা ,
ফিরে আসা ধূপগন্ধ
শেষশয্যায় আমার শরীরে
সব ক্ষত জেনে রেখো
বিস্মৃত প্রেমের দারুচিনি গাছ
আধা শহরে বাস করি, পাগলের সংখ্যা কম
প্লাস্টিকের চেয়ার ও গোল টেবিলে
সন্ধ্যার আড্ডা হয় ,কুকুরেরা শোনে,
কিছু মানুষও । আড্ডা শেষে রাস্তায়
একা ঘুরে বেড়ায় অরিজিৎ সিং এর
গানের কলি, গেয়ে গেছে বখাটে ছেলে,
নেশা আর গান, হোলির দিনে
তাকে ডেকে এনো, ধর্মগ্রন্থ ছিঁড়ে
যজ্ঞের ধুনো দিও, শহরে ছেড়ে দিলে
সে তখন পাখির মতো হয়ে যাবে ,
মিহি সুর, তর্জনীহীন, অন্ধকার চোখ
পৃথিবীর বুকে এখন শৈত্য ঝড়
যুদ্ধের কারবারিতে জিডিপির
ওঠানামা ,পাহাড়ের ভেতরে
ইন্টারনেট সংকেত নেই
তবুও গোপন যুদ্ধ আছে,
মশাল জ্বালানো হয় না
ক্রমবর্ধমান জ্বালানীর দাম,
নেভানো আগুন।
অন্ধকারে বিবশ কিছু মানুষের দল,
পরস্পরের কাঁধ খুঁজে বেড়ায়,
ধারালো অস্ত্র হারিয়ে গেছে শুনেছি
হয়তো বন্ধুত্ব চায় সংকেতহীন
জঙ্গলে... মধুর শিস।
ভারতবর্ষ এতো ধার্মিক ছিল না ,
এখন হয়েছে।
যখন তখন আকাশবাণী শুনি,
দধিচির হাড় শপিংমলে বিক্রি হয়.
চড়া জি এস টি ।
কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির
অনেকক্ষণ হলো টয়লেট পেয়েছে ।
সে হাসছে,বসতে নিষেধ আছে।
বাইশো টাকার কালো ব্লেজারের নিচে
ভাত আর আলুসেদ্ধ হজম হয়ে গেছে কবেই।
তারও গার্লফ্রেন্ড আছে, অস্থায়ী চাকরি করে।
এখন সবাই অস্থায়ী, বেতন অনিশ্চিত।
নীল কাজল আর ন্যুড লিপস্টিকের নিচে
অবারিত কামনার ছলছল ।
শহরে মিছিল,অটোওয়ালারা
পতাকা লাগিয়েছে ,রামমন্দিরের ছবি।
বাড়িতে হলুদ চাল এসেছে, পরমান্ন রাঁধব। মহাকাব্য তৈরি করছি আমরাই।
মহাকাব্যে রাবণ নেই,
আশ্চর্য এক রামায়ন শুষে নিচ্ছে জলজ অক্ষর।
হে মেধাবী দেশ ছেড়ে যেও না।
রাজনীতিতে এসো,
বশিষ্ঠের মতো শিকড় ছড়ানো শেখো।
কবি তৈরি হচ্ছে,
পোশাকের নিচে শূন্য হৃদয়।
ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ে সরু গলায়।
শীতার্ত জোঁক ধীরে ধীরে কামড়ে ধরে ধমনী
রক্তপাতেও থেমে থাকে না বসন্তের বিবরণ
সামনের লোকগুলো ঘুমিয়ে গেছে ।
উত্তরীয় আর স্মারকের দোকানে
বাকি পড়ে আছে টাকা।
রক্তখাওয়া জোঁকের মুখে নুন ছেড়ে দিই,
আরো একটি কবিতার জন্ম
দিতে গিয়ে যেন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে কেউ।
জনহীন রাস্তায় নিঃসঙ্গ পি. সি.ও আর
জয়পুরি দোপাট্টার মেয়েটি ,
শ্যামলা মুখখানি হারিয়ে গেছে কোথাও
ছায়া দিয়ে সাজানো এক অদ্ভুত বাতিঘর ,
ক্যাশবাক্সে প্রেমিকার নাম্বার রেখে গেছে দোহারা যুবক
জেরক্স মেশিনখানি নষ্ট হয়েছে কবে
আশিকির গান বাজছে আজো,
শুধু শেষ হয়ে গেছে নব্বইয়ের দশক
কবিতা লিখি,
যেমন লেখে প্রেমহীন মানুষ,
ভালোবাসাগুলো শরীরের কাছে গিয়ে
ফেরার পথ খুঁজে, শয্যায় শায়িত সেই ধ্রুব
অভিমান নিয়ে বনমহোৎসবে সামিল হই
গাছেদের মিলন নেই, অথচ বসন্ত আছে
ফুলসম্ভার, সুগন্ধি আর প্রবল ঝড়ের দিনে
নম্র উচ্ছাস, হাওরার মাতন, কেবল স্পর্শ নেই।
শান্তি এসেছে,
খয়েরি খামে পাইন গাছের বীজ
সমান্তরাল পথরেখা, শুকনো মাছের গন্ধ,
অনার্য নারী মাটির পাত্রে রেখেছে ভাতের মণ্ড,
টিউবওয়েলের জল ঢেলে, হেসে ওঠে চিকন,
গর্বিত চোখ। হোক চোলাই !
দেহে তো নতুন জোশ।
ঢুঁপি ছরার জল ছেঁকে পাওয়া কাংলা মাছ,
কালোকৃষ্ণ পাতার গন্ধ নিয়ে
ফুটে উঠেছে হলুদ ঝোল।
সন্ধ্যা বড়ো মরমী হয়,
পিচ রাস্তা ছেড়ে দিয়ে
ধীরে ধীরে মিশে যায় রুগ্ন গ্রামের শরীরে।
যে পথে পৌষ ঢোকে আমি তার সঙ্গী বাউল
পরনে কুসুম রঙের পালক, নীল তিলক
শূন্যতা তুলে নিয়ে যেতে, ধানের খেতে এলাম
অগ্রহায়নের বৃষ্টিতে নরম হয়ে গেছে পাকা ধান
বিষণ্ণতার রোদ ছুঁয়ে মগ্নতা এসেছে তার।
অসময়ে বৃষ্টি হলে আমিও লক্ষ্যহীনতায় ভুগি
ভেতরে ভেতরে সুগন্ধি পচন, পোকা, ব্যর্থ
কবিতা মাদুলি, আভূমি প্রণাম করে ক্ষমা
তুলে নিয়ে যাচ্ছি, মুখ ফসকে অঙ্গার বেরিয়ে
যায় যখন তখন, ঠান্ডা ধার,
ডিসেম্বরেই আমার ভেতর যতো
অকারণ প্রপাত।
চাকার আওয়াজ যেন রাত্রির অভিঘাত
এতো দ্রুতগামী ট্রেন দিয়ে কি করব?
যদি ছায়া না দেখতে দেখতে যেতে পারি
পুরনো দিনের মতো অলস হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়
ফোন নং হারিয়ে গিয়ে যেখানে আমি অবান্তর
ঘাসের ওপর দিয়ে চলে গেছে কিছু মানুষের পায়ে হাঁটা পথ ....
সৌরভ ছড়ানো এই বেঁচে থাকা শেষ হবে
না যেন কোনোদিন, কখনো শাকের আঁটির মতো সংসার আর ছলনার মায়াময় জাজিম, ডুবে গেছি । যে স্তর ছেড়ে আসি সেখানে অমৃতের জন্ম হয় , প্রেতিনীর মতো এগিয়ে এসেছি পদচিহ্ন নেই, বাসভূমিতে মন্ত্র জেগেছে,
ধোঁয়ার জলসা । চারপাশে ভিড় হোক,
শান্ত মলিন জল ,মাছজন্ম ভালো ,
জলহীন সমাধিতেই শেষ
আমি যে লেখা লিখি ,সে আমার ফাঁদ
ফাঁদে পা দিয়েই কামড়ে ধরি কন্ঠ
তারপর ফোঁটা ফোঁটা করে পড়তে থাকে
অম্ল ও ক্ষার ...এক একটি আত্মহত্যার খবর
নাড়িয়ে দিয়ে যায় ছাইয়ের মতো রাতে , বেঁচে থাকা মানুষেরা স্তব্ধ সাদা পাথরগুলো নিয়ে আলোচনা করে,আমাদের নিঃশ্বাসে তাদের
দীর্ঘ শ্বাস হারায় ,আত্মহত্যার কারণ শোনা যায় ,
কিন্তু সে কারণ একটি ফুলের মৃত্যুর মিথ্যে গুজব
পুরস্কার প্রাপ্তি , ধর্ষণ আর হত্যার খবর
একসঙ্গে পড়ি , কেমন যেন নিস্পৃহ হয়ে বসে থাকি,জলাভূমিতে বেড়ে ওঠা কলমি লতার
মায়াবী তুচ্ছতাগুলোই শুধু আমার হোক
...জ্যোৎস্নার মতো পরিকল্পনাহীন ,
এরকম বেঁচে থাকি আরো কিছুদিন
কোনোদিন ভোরবেলায় ভুল করে উঠি
দেখি লাইট পোস্ট ঢেকে আছে স্বর্গীয় আলোয়
মনে হয় এল ই ডি বাল্ব নয় , না দেখা মেসেজ।
সকাল হতে হতে বিস্মৃত মায়াবীলোক
রান্নাঘরে ধোঁয়া ওঠে , তরুণ শাকসব্জি স্পর্শ করতে গিয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে আঙুল ।
অস্বীকার করতে ভালো লাগে যেমন তুমিও করো
একে অপরকে অস্বীকার করতে করতে
চোরা কুঠুরিই সম্বল,
হতাশ হওয়াও নেশার মতন
তবুও আমরা অস্বীকার করি
এই মাঠ ,শ্বেতফলে ভরা গাছ ,
বহু নিচে ছড়ানো শেকড়
কেন জানি রোজ মৃত্যুর কথা ভাবি
কীভাবে মরব কে জানে
হয়তো আমার মায়ের মতন
শুষ্ক গলায় চলে গেছে জলহীন
আমিও যাবো এভাবে যাহোক একটা
জলহীন, কবিতাহীন, গানহীন
মুখর ছিলাম ,এখন পুরনো বাড়ির মতো ।
যেসমস্ত উদ্ভাস কবিতা ছিল
ছত্রাকের স্থবিরতায় জমেছে ফ্যাকাশে চর্বি,
আত্মার ক্ষয় নেই,
এই বিশ্বাস আছে কোথাও এখনো ,
তাই আবারও উঠে যাবো
অক্ষরে ছড়ানো আবেগে ভেসে বেড়াবে ক্রৌঞ্চমিথুন ।
শহরের একটিমাত্র মৃতপ্রায় নদীকে নিয়ে
আমরা স্রোতের স্বপ্ন দেখি
আমাদের জল কমে যাচ্ছে
মেশিন দিয়ে নদীর আরো গভীরে যাই
দগদগে ক্ষত থেকে দমকে দমকে ওঠে কিছু জলের বেদনা,
স্নানঘরে সেইসব জলবিন্দু থেকে অনিশ্চিত ফেনা
ছড়িয়ে পড়ে শরীর থেকে শরীরে
এই জল তাই ভালোবাসা জানেনা,
আসলে ভালোবাসা বলে কিছু নেই,
আছে শুধু দেহ ও ক্ষত উন্মোচন ।
আশ্বিনের বিকেল
এমন বৃষ্টিদিন এসেছে
কয়েক ঋতু পর, উন্মুক্ত !
স্নানযাত্রায় গোঠের ঠাকুর
যেন আমাদের পাহাড়ে,
শটিবন, বাঁশঝাড়, ধলাই নদী,
পোড়া আলুর প্রসাদ,
গহন ছেড়ে এই মাত্র
সন্ধ্যা পথপ্রান্তে সমাগত,
অন্ধত্ব প্রবাহিত হয়ে ধুয়ে
নিয়ে যাচ্ছে ক্লেদ, ছিন্ন বল্কল,
এখানে সমাধিক্ষেত্র, মনসার থান,
দরগার সীমানা, ধূপবাতি, মোম,
আগাছার ফুল নিয়ে চলে যাচ্ছে,
তমসা সুন্দরী, গতবছর মরেছে সে
সাপের কামড়ে, দু 'হাতে কুয়াশার
ঠোঙা, নীলকণ্ঠ ফুলের রস,
ক্ষীণ হাসি, জ্যোৎস্নার প্রেতিনী যেন,
বর্ষা ধুয়ে দিতে চায় যত
তাঁর দুঃখ সমারোহ,
হেলেঞ্চার জঙ্গলে ভরে গেছে পথ,
গোধূলির ভাঙা আলো পড়ে
যেন স্বর্ণসম রূপ, তাম্রবর্ণ যুবা,
প্রবল জীবন, সাদাটে সন্ধ্যায়
আলোড়ন তুলে গেছে গ্রামে,
দাঁড়াও ক্ষণিক, শান্ত বারিধারায়,
ধুয়ে যাক অশুভ বচন,
মাটি পেয়েছে জননের ক্ষমতা,
কাদামাটি জলে মিশে যায়
শুধু প্রসবের সুখ... বেদনা।
কাঁঠালের হলুদ শাঁসের মতো
আঠালো লেখা কী করে
লিখবে গ্রাম্য কবি,
যদি তাকে উপেক্ষা করে
যায় গভীর সেই প্রেম,
উদাস স্তনের মতো খালি
হয়ে গেছে মৃৎ পাত্র,
ধানের শিকড় থেকে
আনো বংশধারা, জিন।
ব্যক্তিগত ছিল যে নারী,
আর জন্ম দিতে চায় না,
ভুলে গেছে মিলন মুহূর্ত,
তার গাভীর নাম শশী,
উঠোনে ঝরছে নতুন দুগ্ধ,
আঠারোমুড়ার জঙ্গল থেকে
সোজা চলে গেছে উৎরাই পথ,
রোমশ ছাগল শিশু আর
পাহাড়ি ছরার জলে,
নীরবে নামছে কায়াহীন
সংসার, এখানে মরে গেলে
যেন জন্ম হয় আবার,
রিফিউজি লতা ঘেরা
বাসুকির খোপে লাল জবা,
কালো তাগা, তাবিজের বন্ধন,
পাঠ শেষ , ফিরে এসো বধূ,
এই অনিহা ছেড়ে,
সংসার সংসার খেলা
হোক পুনর্বার, হিম চাঁপার
সৌরভ খুঁজে পাক মৌমাছির
আস্তানা, ধূপগাছে ছাওয়া
দেবদেউলে ধরা পড়ি
জৈষ্ঠ্যের চন্দ্রগ্রহণে।
এই যে বিস্তৃত মনু নদীর অববাহিকা
ঘোলা জলের অন্তর্লীন স্রোতধারা,
পাহাড় ধুয়ে আসা সেগুন, শিমুলের
শিকড়স্নাত জল, নিশিন্দা আর কালো
ওঝা গাছ, দু একটি শ্মশানঘাট,
পোড়া কাঠ, মাটির কলসী, কাল রাতের
ঘন বর্ষা নিয়ে গেছে লোভ আর দংশনে মৃত
দেহের ছাই, তারে মেলে দেওয়া হলুদ লাল
শাড়ি, বাড়ির উঠোন ঘেঁষে চলে যাওয়া
মাটির রাস্তা, যেতে যেতে শশা, কুমড়ো,
গন্ধরাজ লেবু, কাঁঠাল কিনে নেওয়া,
শ্মশান দেখে ফেরার সময়, সংসারের
কথা ভাবা, চোরা স্রোত, জলের ঘূর্ণি
দেখতে দেখতে আবার স্থবিরতায় আসা,
পায়ের পাতায় মোরগের নরম পালক,
ভাট ফুলের ঝোপের কাছে দুটো বক
নির্নিমেষ আর তাদের গলার কাছে
পিছলে যাচ্ছে মেঘভাঙা রোদ, কেমন
যেন মিলেমিশে আছি, হয়তো আমার
আর ভাবার কিছু নেই, তর্ক মরে গেলে
মানুষ এমনই খোলা হাওয়ার মতো হয়ে যায় ।
কোনো লেখাই আসল নয়,
আগুন থেকে জন্ম নিয়ে আসেনি
সেই ঢেউ, জ্যোৎস্না থেকে চুরি
করেছি আলো ,জোনাকি থেকে
গোপন আলোর অভিসার,
পল্লবিত গাছ থেকে
ছায়ার নরম কৃষ্ণ ইতিহাস
রৌদ্র দগ্ধ দুপুরের হলকা
মুখে মেখে যাকে চলে যেতে
দেখেছি অভিমানে, তার মুখ থেকে
কুড়িয়ে এনেছি দু একটি অঙ্গার
গরিব হয়েছি , হৃদয়ে ধারণ
করেছি গৈরিক, নির্বাণের স্তুতি
দীর্ঘ রাস্তা …স্বর্ণচোরা
ঘাসে ঢাকা, শস্যের খেতের পাশে,
ঝড়ের আকাশের নিচে যেদিন মাটি
গেয়ে উঠবে দাহ গান, বল্কল
খুলে দেখবো অস্তিত্ব বলতে ছিল
খানিকটা বর্ণমালা, শঙ্খমুখের পাতা।
ছোট গ্রাম, নদী নেই তার,
ছরা আছে ,উঠোনের পাশ
দিয়ে বয়ে চলা,
কিশোরীর তরুণ হাতের মতো,
মুঠোতে নাগচম্পার দাম,
অর্জুন বৃক্ষের মুকুল,
বাড়িতে বাড়িতে সুপুরি
গাছের দেহ দিয়ে তৈরি
ব্যক্তিগত ঘাটখানা,
দু একখানি বড়শি রাখা,
টিলার পাশ দিয়ে চলে
গেছে যেন সে এক গ্রামীণ ভৈরবী,
গোপনে নিয়েছে শুঁকে
গর্জন গাছের পাতায় মোরা
পান্তা ভাত, ধানি লঙ্কার গোছ,
শুঁটকির ভর্তা, রান্নাঘরের ছনের
চাল থেকে ঝরে পরে রাতের শিশির,
শব্দহীন ! নৌকো নেই কোথাও,
সাঁকো আছে, বড়ো আপন,
এখানে জন্ম নিয়ে মেয়েটি
রয়ে গেছে এখানেই,
বাপের ভিটে ছেড়ে গেছে
কেবল দু'ঘর, একই রয়ে
গেছে জলের উৎস, ছায়ার পতন,
মনখারাপ হলে পা দুলিয়ে
জলে তুলেছে ঢেউ,
দুধ জ্যোৎস্নায় ভেজা
বাঁশপাতা পড়েছে ঘাটের কোণে,
ভাসতে ভাসতে পাশের ঘাট
থেকে ডেকে এনেছে মাকে,
শীর্ণ শরীর, মায়া ভরা চোখ,
পাথরের থানে তার যাবতীয়
বিশ্বাস কমলা সিঁদুরে লেখা,
মেয়ের বাড়ি যেতে হবে বলে
নিয়েছে, কচুর লতি, কাঁঠালের
বীজ, দিব্য গন্ধ স্বর্ণমুসুরি চাল।
মনুনদীর তীরে যে সন্ধ্যা নেমে
আসে ,তা নিমের ছায়ার মতো ,
পারের কাছে শ্মশান বলেই
মনু স্ত্রী হতে পারেনি
ভুলবশতঃ আমরা তাকে
নদী বলি ।শূন্য বক্ষে বর্ষার
ঘোলা জল ভরে দিয়ে
শোকাতুর মানুষকে বাড়ি
পাঠিয়ে দেয় ,ফিরে আসতে
আসতে দেখি কুশের বনে ,
জেগে উঠছে কাশের চারা
ত্রিপুরার কিছু দুঃখ ও মোহ,
সিঁদলের গন্ধ থেকে আসা,
পোড়ানোর সময় গলতে থাকে
আঁশের নিচে থাকা নুন, চর্বি,
ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে খাদ্যনালী,
পুঁটিমাছ আর মরিচের ঝাঁঝে,
খালি হয়ে যায় পূর্ববঙ্গের জমিদার
রিফিউজিদের পাত, নির্দ্বিধায়
দুহাজার টাকা কেজি, ইলিশের
গল্প ওঠে আজকাল, আর কবে
কোন কালে সতের টাকা দিয়ে
কিনে আনা হতো নববর্ষার স্বাদ,
ছিল এক কাটাতারহীন নির্দোষ
চোরা কারবারি,আমাদের গরিব
জিহ্বা এখনো এসব, আঁশটে
দুর্বল অনভিজাত খুচরো গল্প
উগড়ে দিয়ে মৃত্যুবাসরে সন্ধ্যার
কীর্তন গেয়ে, খোল করতাল
বাজিয়ে,বিড়ি ফুঁকতে ফুৃঁকতে
বাড়ি ফেরে রোমশ অন্ধকারে।
খাং বাঁশের বেড়া, শিল বরুয়ার খুঁটি
বেতুয়ার টুকরি করে এনেছে পাহাড়ের মাটি
ঘর উঠছে ঘর, নয়নতারার অঙ্গন,
ঈশান দিয়েছে পুরোহিত, পুজো হয়েছে,
মুরগি আর কবুতরের মাংসল প্রসাদ
রক্তের শুভ্রতা দিয়ে তৈরি ঘর মনোরম
সুন্দি গাছের নতুন খাটে শুরু হয়
চোখে চোখ রাখা, ঠোঁটে মাকড়সার
পবিত্র জাল, ঘর বেঁচে থাকে ততদিন,
যতদিন ইঁদুর, বেড়াল, আদার ঝোপ,
হলুদ গাছ, চাঁদের আলো পারস্পরিক
গান গাইতে জানি না, জন্ম থেকেই
বেসুরো। এটা অভিশাপ।
আমার কাছে লুকোনো আছে
কিছু ঝর্ণা ও পাথর।
পাথর বসিয়ে বসিয়ে পথ
বানিয়ে দিই, বাঁকাচোরা, পিছল।
তাতে ঝর্ণার কষ্ট হয়, রক্তক্ষরণে
ভেসে যায় সে, কোনোদিন
এই রক্তস্রোত নিয়ে আসবে সুর,
নিষ্ঠুরতা মুছে যাবে আমার,
অপেক্ষা করছি,
দুর্বল ঠিকানা রইল এখানে,
" পূর্ব হিমালয়ের নিম্নভাবর
অঞ্চলের বাসিন্দা,
কালবৈশাখীর বিকেল থেকে
কবিতা লিখে আসছি “
একটি সন্ধ্যা হচ্ছে, যেন সব
সন্তান দূরে চলে গেছে,
একা কোনো মা শাঁখ বাজাচ্ছে,
ঘরের আলোয়, ফুটে ফুটে উঠছে
চলে যাওয়া মেয়েদের পা,
শ্যামলা সবুজ তরল মুখের
ছায়াগুলো পালং শাকের মতো
নরম, তারা রয়ে গেছে মায়ের চোখে,
সন্ধ্যার সর নেমে আসছে মফস্বলের
লাইটপোস্টে ভাঙা পিচ রাস্তায়,
ছুটি হয়ে যাওয়া নিচু অফিসবাড়িতে,
পৃথিবীর সব শহরে এমনি সন্ধ্যা আসে,
চুপচাপ। স্মৃতির শহরে জাহাজডুবির
খবর ছাপা হয়, আবহে হারমোনিয়ামের
সুর, প্রত্যেকটি সন্ধ্যা প্রিয় অতীত,
নীরব আততায়ী, খেয়ে ফেলে
মেয়েদের কলিজা, নরম জরায়ু।
অজস্র গাছ কেটে নিলে,
পাহাড়ে ভাঙন নামে,
শালিক পাখি সন্তানহারা,
পুত্রঞ্জীব গাছ গিয়েছে মরে,
দেহ জাগো, ভিড় করো অরণ্যের
মতো, প্রখর মিলন, বিশ্বস্ত মেঘে
ঢাকা সেদিনের চরাচর, গড়িয়া
পুজোর মাস, গাছের সঙ্গে গাছ
মিশে যাচ্ছে, ধনেশের পালক
পড়ে গেছে নিচে, হাজার রঙের
জখম, সেইদিন সব গাছ হয়েছিল
মানুষের মতো চন্দ্রকামুক,
তাদের আশ্লেষে ঝড় হয়েছিল,
বোঝেনি কেউ, ধ্রুব ভেঙে
জেগে উঠেছিল ভাস্কর্য,
ভোরের বেলায়, নিভে গেছে সব,
চিহ্নমাত্র নেই, শুধু সবুজ লতার
চর উদ্ভিন্ন সৌরভ
যেন সে অনেকদিন পর এলো,
বহু সকালের পর, নিশিডাক
ফিরে গেছে কত, দ্বাদশীর আকাশ
চূর্ণ মেঘের মতো নেমেছে উঠোনে,
সভ্রান্ত লয়ে এসেছে সে,
হলুদ গোলাপের স্তবকে রহস্য
ছড়িয়ে যায় কুবু পাখির ডাক,
খাসিয়া পানের বাটা রেখো,
ভেজানো সুপুরি কুচি,
যাদের ভালোবেসেছিলাম,
নীরবে এসেছি ছেড়ে, সেইসব
রূপোলি ভালোবাসা দিয়ে
অঙ্কিত এই চরাচর
সেগুন, শিমুল, গর্জন, জারুল,
মেহগনি ,গামাই, অর্জুন, অগরু
চিরহরিৎ পুরুষ গাছ, বর্ষার গায়ক।
এখন গাছ নয় কাঠ শুধু কাঠ,
চামড়া নেই, ভেতরের মাংসগুলো
খাঁ খাঁ করছে ।
হেমন্ত ঋতুর বিষাদ আঁকা,
শরতের সুখ ,বুড়াছা দেবতার
পুজো হয়েছিল কোনোদিন
হয়তো লেগে আছে মাঘ মাসের বলির দাগ
বনজামের হারানো রঙে এখন কেঁদে ওঠে
ভৃঙ্গরাজ, উদাল ঝোপের ছায়ায় ছায়ায়
সে ছিল এক বনভূমি, ফেনি থেকে মনু,
শাকানের চুড়ো, এখন গাছ নয়,
কাঠ শুধু কাঠ,চামড়া নেই,
খাঁ খাঁ করছে মাংস, রক্তময় নিস্তব্ধতা
.
বড়ো বড়ো সড়ক হচ্ছে আমাদের,
পাহাড় ফেটে যাচ্ছে, কালচে ঝর্ণার ধারা
মসৃণ রাস্তায় এখন দ্রুত চলে যায় গাড়ি
আমার হাত থেকে হারিয়ে গেছে কবিতা
অশরীরী ছায়া নিয়ে মৃত বনে ঘুরে বেড়ায়
গাছের শিশুরা, কোথায় গেল হাজার পাখি
আমি প্রতিদিন এই একটি লেখাই লিখছি
গাছ কাটা হয়েছে, বৃষ্টি কমে গেছে
ঝড়ের নামকরণ হওয়ার পর হিসহিসে
গলায় শহুরে লোকজন বলে ' চিয়ার্স '।
এখন গাছগুলো আবার লাগিয়ে
দিয়ে যান মাননীয় কর্তৃপক্ষ,
রেইন ট্রি বড়ো হতে দীর্ঘ সময় লাগে ...
ততদিন শুষ্ক হাত, মরু হৃদয়,
বিপুল কাতরতা, হয়তো আমৃত্যু !
পুনরায় এসেছে আশ্বিনের শেষ
গাড়ই ব্রত করে ফিরে যাচ্ছে বধূ,
কোলে কাঁখে নীরব মধ্যাহ্ন,
খালি বাড়ি পূর্ণ হোক সন্তান সন্ততিতে,
বৃষ্টি বৃষ্টি খেলা নামবে হয়তো
কাল সকালে, অতসী ফুলে
ভরে যাবে পশ্চিমের পুকুরের ঘাট,
পায়েস পাতা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে
মেয়েটি, গ্রীষ্মের গন্ধমাখা
কালোজিরা চাল জোগাড় হয়েছে,
আলো মরে আসছে, দিন চলে
গেল...একটি দিন।
উপবাস, আর দুর্বল শরীর
ফেলে যায় ঋণ, অনুতাপে লবনাক্ত।
আসাম আগরতলা জাতীয় সড়কে
এখন বাঁক কমে গেছে
সরল হতে হতে দ্রুত হচ্ছে গতি
কোথায় রহস্য ঘেরা এক পশলা অন্ধকার
আর ঋজু নাগার্জ্জুন গাছ?
ত্রিপুরার রাস্তা তবে কি হারিয়ে ফেলেছে
তার শরীরের মায়াবী ধার
বাঁক হারিয়ে গেলে অজানাও হারিয়ে যায়
অজ্ঞাত বাঁকেই সব মৌতাত
সংকীর্তনের মতো সহজ হয়ে যেও না তুমি
লোভ জাগিয়ে রেখো শ্মশানের ডোমের মতো
মৃত্যু এসে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে
বলে যাবো একাদশ বাঁকে আমি ছিলাম
নিঃস্বরের করতলে
—------------------
স্তব্ধরমণ থেকে উঠে আসা কোন ধ্রুবতারা
আহুতি দিয়েছে জন্মরহস্য, বিষণ্ণ কালপুরুষ।
বুক থেকে চলে গেছে বোধ , অন্ধ পদ্মযোনি ।
এখন তবে মগ্ন রাত, স্থানীয় গ্রামে
চন্দ্রগ্রহণের সংস্কার, বকের পাখায়
লেগে থাকা চাঁদের বেদনা ।
……
এসো তবে যেকোন নারী, পুড়িয়ে দেওয়া দেহ
তারো আগে ধর্ষণের ক্ষতচিহ্ন, আর্তনাদ,
তার শরীর থেকে জন্ম নেবে হয়তো অসুর
পাপ ছড়িয়ে যাবে আরো, বৃক্ষে রক্তফুল,
এ তবে পৃথিবী, রুগ্ন মাংস , তেজস্ক্রিয়তায়
নষ্ট হৃদয়,
…..
ছেড়ে যাওয়া মানুষ প্রত্যেকদিন
নিবিড় হয়ে আসে, যেন ঘিরে আছে স্বর্গদূত।
সুস্থ হয়ে গেছে তারা, দগ্ধ শিশুদের
গায়ে সেখানে ফুটেছে পারিজাত।
……
মধ্যবয়স ভুলে যেতে চায় শান্ত বিকেল
চেনা রাস্তা, কৈশোরের বিদ্যুৎ বিনিময়
মৃত মানুষের হাহাকার তাকে শূন্য করে দেয় ।
বাঁচো , বাঁচো বলে দেয় অপঠিত উপনিষদ।
কুড়োই ধুলোমাটি, ঈশানকোণে রাখা হলুদের শিকড়, নাড়কেল গাছে ছাওয়া বাড়ি,
ক্ষুধাহীন, কষ্টহীন, সুখী মানবমানবী ,
ছুঁয়ে দেখি, চলে গেছে যারা ।
ভুলে যাও মৃত্যুশোক।
আনন্দকে ডাকো সখাসম ।
……
ফিরতে ফিরতে জানি অসংলগ্ন হয়ে আছি
শুনিনি শ্লোক, অজানা থেকে আসা ওম্
সামবেদে কিছু সমাপতন , নিরোগ প্রাণবায়ু
বুনে নিচ্ছি রম্য জাল, সুলভ আশ্রয়
অশ্রুহীন একা থাকার ঘনঘোর অভ্যাস।
…..
জেগে ওঠা প্রশান্ত মহাসাগর ,
ঢেউয়ের ভেতর আগুন , তোলপাড়।
লাভা কিছু জানে আমাদের কথা,
ঘন হয়ে তাই চেপে ধরে কন্ঠ
যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেশ,
অধিবাসী হঠাৎ রিফিউজি ,
তাদের পায়ে পায়ে পোকাদের একটানা গুঞ্জন , যেন ওরা আগাছা,
দেশ পেরিয়ে তাঁবুর ভেতর গুটিসুটি রাত।
আঙুরের খেত, শস্যের উঠোন, গ্রীষ্মের চেনা দাবদাহ,
আলো জ্বেলো রোজ, ভুলে গেলে
ধ্বংসস্তুপ থেকে তুলে এনো যুবকযুবতীর
শেষ কথোপকথন , মুছে যাওয়া অধরস্পর্শ।
…..
মৃত বিশ্ব– কিন্তু জেগে আছে পৃথিবী
জ্যোৎস্না বয়ে আনে আদরের গান
রূপকথার ভেতরে কোন এক রাক্ষসী
গিলতে থাকে বর্ণমালা হারানো হাত !
….
ভেতর থেকে খুঁড়ে আনি বেঁচে থাকার উৎসাহ
কড়ির ভেতর যেমন সমুদ্রের বোধ
ছায়াময় উপত্যকা , লৌকিক ব্যথা
বালুকণা মুঠোতে নিয়ে বাঁচে নুলিয়ার ছেলে
প্রতিদিন ঝরে আলো তবু সে স্বপ্ন অভিসারী
সুনামির বুক থেকে তুলে আনে সমুদ্রঝড়ে হারানো নৌকো।
…..
মানুষ ভেঙে পড়েছে, মিনারের কান্না।
পরাজিত দম্ভের মধ্যে দাঁড়িয়ে
পুড়ছে গ্রন্থ, শিল্পকলা, আমাদের সূক্ষ্ম
অসীম দৃষ্টিপাত।
বিদূষী চলে গেছে অগ্নিস্নানে,
শ্বেতদাহে জ্বলে উঠে গৈরিক বেশ , চকিত ইশারার বিনিময়ে নীলপাত্রে ধীরে জমছে
বিষাক্ত স্নেহ।
……..
মফস্বল শহরের ছোট নদীর মতো
বাঁচতে চাই, গরিব চায়ের দোকান
গাজনের গান গেয়ে জেগে থাকা দুপুর
শিব গৌরী জল খেতে চাইলে
ব্রোঞ্জরঙ মাখা হাতে তুলে দিই অরেঞ্জ স্কোয়াশ,
কোথাও যাবো না, আমি।
অন্য শহরে চলে যাওয়া মানুষদের
অসুখী বারান্দায় দেখি ,
ডানা ভেঙে পড়ে আছে শুধু হারানো দিনের
উচ্ছ্বাস ।
…..
জড়িয়ে মড়িয়ে বেড়ে উঠেছে কোন বটগাছ
তুলশীতলায় শ্যাওলার আস্তরণ
বর্ষার জলে ভিজে আছে দু একটি সিঁড়ি
গ্রিল ধরে দাঁড়ানো এক অনন্ত কিশোরী–
তাকে ছেড়ে এসেছি।
তাকে ধরে রেখেছি।
যেতে দিইনি আজো, শাঁখ বাজানো শেষ হলে
ঝোপঝাড়ে আস্তে চলে যায় বাস্তুসাপ
এ শ্রাবণ তোমার স্পর্শ না পাওয়া হাতের
মতো আমাকে ছুঁয়ে থাকে,
জমিয়ে রাখা কাঞ্চনফুলের বীজ ছড়িয়ে
দিয়েছি বিগত আষাঢ়ে , প্রখর সূর্যে
এখন তাদের নিবিড় সালোকসংশ্লেষ ।
কিছু বছর নাহয় অপেক্ষা করি ,
সমুদ্র সঙ্গে নিয়ে হয়তো জেগে উঠবে
নবীন ভঙ্গুর যৌথ স্বদেশ।
মনুনদীর উপাখ্যান
নদী প্রাণ, নদীরে করি প্রণাম
বন্দনা করি পাহাড় আর মাটি
বুকে নিয়ে জল আর জল
মনুনদীর কথা বলব এখন
শুক্রেশ্বর বাণেশ্বর রচে রাজমালা
মনু ঋষি করেছিল তপস্যা
আদি সত্যযুগে বৃক্ষ ও পর্বতমাঝে
বয়ে যাওয়া এই নদীতীরে ,
সে থেকে নদীর নাম হলো মনু
চর্যাপদ নামে আছে আমাদের
গ্রন্থরাজি, সান্ধ্যভাষায় বলে কথা
মনখেমর নামে ছিল এক জাতি
দ্রাবিড় সংস্কৃতির বাহক তারা
ঊনকোটির পাহাড় কুঁদে
নির্মাণ করেছে শিব-পার্বতী
শিব যদি হয় দ্রাবিড় পুরুষ,
পার্বতী বনদেবী।মনখেমর
করে বাস,অদূরে নদী
বর্ষাকালে খরস্রোতা,শীতকালে
চরা,শাক,সব্জী,ধানে ভরা
তাদের কূলবধূ শঙ্খে দেয় ফুঃ
দু ধারে বাঁশবন আর বৃক্ষরাজি
মধ্য দিয়ে মনু নদী বহে ছলছল
জনপদ জ্বালে প্রদীপের আলো,
মাঝিদের গান আর খেয়াঘাটে
বাঁধা নৌকো চান্দের আলোয়
যেন স্বপনের মতো, ক্রমে ক্রমে
নাম হয়, ছাম্বুলনগর । মনুর
অববাহিকায় মাটির প্রাসাদ
গড়ে ধর্মমাণিক্য, রাঙাউটি
স্থানের নাম আর চতুর্দশ দেবতার
মন্দির , ক্ষণকাল ইন্দ্রমানিক্য
ছিলেন সেথায়, জিতু দিঘি
নামে এক জলাশয় আজো
আছে ধীর শান্ত কালো টলমল।
সুবরাইখুঙ্গ নামে আছে শিবমন্দির
‘রাজরত্নাকর গ্রন্থ ‘ করে বর্ণন
কিরাতরাজ্যে স নৃপশ্ছাম্বুল
নগরান্তরে শিবলিঙ্গ সমদ্রাক্ষিৎ
সুবড়াইকৃতে মঠে। এই রূপে
মনুনদী করে বহন,কত প্রাচীন
কথা আর মানুষের জীবন।
ঊনকোটি পাহাড়ের কথা
সর্বজনে জানে, কৈলাসপতি
করে বাস হরিষে বিষাদ
সেই থেকে নাম কৈলাসহর
আষাঢ়ে নদী ভরা জল ,
দুকূলে প্লাবন, শরতে সাদা
কাশের বন, উড়ায় পবন।
আর এক রূপকথা আছে,
শুনো দিয়া মন । মনুনদীর কথা
না হয় শেষ, করি আরো বর্ণন
হালাম নামে আছে আদিবাসী
তাদের যে সর্দার মহাপরাক্রম হয়
মনু নামে ছিল তার কন্যা গুণবতী
চুল ঘন মেঘ ,আষাড়ের ছায়া
ডহররূপি চোখ, ঘূর্ণির নাচন
সুমিষ্ট বুলি তার দোয়েলের মতন
কাঁঠগুলাচের খোঁজে সব যুবক যায়,
মনুর চুলেতে দেবে,এমন ইচ্ছা হয়
চোরা চাহনি, ফুলের নুপুর পায়।
যেন বৃষ্টির চলন, ফণা নামিয়ে
পথ করে দেয় যত কালনাগিনীর দল
লঙ্গাই ও দেও নামে ছিল দুই ছেলে
মনু বাসিত দুজনে প্রাণেরও অধিক
তাদের কুজনে ও গীতে পাহাড় ঝর্ণা
হয় মুখরিত । দিনে দিনে মনু যুবতী
হয়, ধানের গোছা যেন শরতকালের ।
বিবাহযোগ্যা সর্দারকন্যা অতি সুন্দরী ।
হালাম সর্দার রাগী ও অহংকারী,
লঙ্গাই ও দেও তার নাহয় মনের
মতো।ধলাই নামে এক ছেলে ছিল,
পিতার মনোনীত। মনু তাতে না
দেয় মত।এমন দ্বন্দ্ব চলে প্রতিদিন
কাঁদতে কাঁদতে মনু বন্ধুদের কাছে যায়।
লঙ্গাই-দেও পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে
এক নারী দুই পুরুষ কেমনে সম্ভব
মনু কেঁদে বলে ভালোবাসি দুজনে
সন্ধ্যার বাতাস বহে,বনফুলের ঘ্রাণ
মশাল নিয়ে আসে সর্দারের মানুষ
খুৃঁজে ফিরে মনুরে বনের প্রান্তরে
জোনাক জ্বলে আর জ্যোৎস্নার ধূপ
বনদেবীর থানে কাঁদে যুবতী ।
ঘরেতে এসে মনু স্তব্ধ হলো
পিতার আদেশে মাথা করে
নিচু। গোপন শর্ত এক রেখে
এসেছে আজ আঁধারে। কাল
ভোরে যার সঙ্গে দেখা হবে
প্রথম, সেই হবে মনুর দোসর,
কাটবে জীবন। দীন বাসে নীরবে,
মনু ঘর ছাড়ে,রাতের আকাশ
আস্তে আস্তে ফিকে রঙ ধরে।
সময় ধরতে দেও দ্রুত ছুটে বনপথে।
ডুবন্ত ধ্রুবতারার সঙ্গে রৌদ্রের
প্রথম কিরণে দোহা’র কোমল
মুখ জাগে। পরস্পরের কন্ঠে
ফুলের মালা দোলে, বহুদূরে
জলগান বাজে। এদিকে ধীরে সুস্থে
লঙ্গাই,মনু সঙ্গে মিলন স্বপ্ন নিয়ে
হাঁটে,পথ মাঝে কোয়েল ডেকে কয়
যার কাছে যাও তুমি সে আর
তোমার নয়। প্রথমে এসে দেও
মনুকে করেছে বধূ।তার কথা
শুনে লঙ্গাই মনে ব্যথা পায় ,
নিজের ভুলের কারণে মনুকে
হারায়। মনু-দেও একসঙ্গে
তৃপ্তিতে যায়। কুঁড়েঘর বাঁধবে
এই রূপকথা হবে সত্য ,ভাবে
আনন্দিত মনে, এমনসময় ধলাই
আসে দলবল নিয়ে। সর্দারের
আদেশ সে না পারল করতে
পালন। দেও সঙ্গে মনু বিবাহ
দেখে ছাম্বুলবাসীগণ। রাগে
কাঁদে সর্দার, দেয় অভিশাপ
সব তোরা নদী হবি,মানবশরীর
গলে হইবি পলির মতন,নদী
হয়ে বয়ে যাবি তোরা চারজন।
শাপে বর হলো ,তাই আজ
আমরা পেয়েছি চার নদী,
একদিকে বয়ে যায় লঙ্গাই।
কৃষিহেতু খ্যাত,লঙ্গাইয়ের
বেগুন ব্যঞ্জন,রসিক জনে জানে ।
আরো জনপদ হলো ধীরে
ধলাই আর দেও নদীর তীরে।
সর্বোপরি মনু এক মায়াবিনী
জলের আরক। নদী জীবন,
নদী প্রাণ, নদী সর্বংসহা ।
নদীতীরে গ্রামে গ্রামে বিনিদ্র
শস্যের ঘরে লক্ষ্মী সর্বক্ষণ।
শাখান পর্বতে অরণ্যে বাস করে
আমাদের বিরহী যক্ষ একা ।
মেঘের সঙ্গে বলে দুঃখকথা
ইথারে ইথারে, বহুদূরে সাগরে
গভীর নিম্নচাপ হয়, বৃষ্টি হয়ে ঝরে ,
মনুর বক্ষ ভরে ওঠে জলভারে
পাথরের গায়ে গায়ে উঠে তার ধ্বনি
পার ভেঙে নিয়ে যায় মানুষের ঘর
উন্মাদিনী সম ছোটে বর্ষার দিনে
শাখাং হতে বয়ে চলে উত্তরের দিকে
কৈলাসহরকে রেখে এক ধারে
মাতাল জলঢেউ নিয়ে চলে
বাংলাদেশের দিকে, কুশিয়ারা
ছুঁয়ে সুরমানদীর হাত ধরে সে
মেঘনাতে যায়, মনুর জলে তাই
মাছের আগমন হয়। বোয়াল ,
শোল, আড় আর বাঁশপাতা মাছ
ঝালে ঝোলে কৈলাসহরের পাতে
বারোমাস । বন্যার দুঃখ ভোলাতে
বিলাসপুরের হাওরে শীতকালে
ঝলমল করে সব্জির খেত, নবান্নের গান।
মনু সঙ্গে দেও নদীর দেখা হয় কুমারঘাটে
দুজনে মিলে প্রবাহিত হয় কৈলাসহরে।
আরো এক শহর, নাম ফটিকরায়,
মনুর অববাহিকায়। এককালে
পাট, তিল, কার্পাস আদি বহু
দ্রব্য হতো পরিবহন, নদী ছিল
নাব্য আর বিস্তৃত নিম্নাঞ্চল ,
মনুনদীর পারে আছে এক বাজার,
পানিচৌকি নাম তার, বহু পুরাতন।
অতীতকালে সেথা চৌকি বসিত।
কৃষকগণ লয়ে পণ্য বণিকে দিত ,
রাজস্ব উঠিত কোষাগারে , অর্থ
নিয়ে রাজকর্মচারী প্রফুল্ল চিত্তে
চলে যেত হাতির পিঠে চড়ি ।
বেলকম টিলার পেছনে সূর্য
ডোবার পালা, রঘুনন্দন পাহাড়
দিত হাতছানি,উনকোটির আরো
এক নাম রঘুনন্দন, বিস্মৃত এখন ।
নদীর বুকে হাজার কথা, ফাগুন
মাসে লয়ে চলে কইন্যার ক্রন্দন।
দুইধারে ধামাইল গান আর রাত্রি
জাগরণ। চায়ের বাগানে ধ্বনি
দেয় কুলির সর্দার, ঝুমুর গান
যেন মনুর পায়ে পরায় রুপার
অলঙ্কার , একটি কুঁড়ি দুইটি পাতা
দোলে বাতাসে ,উর্বরা মাটি
মা গো তোমার , রত্নসমা পলি।
মনুর এক তীরে আমাদের শ্মশান
জেগে থাকে রাত্রিদিন, আগুনকাঠের
ঘর আর শ্মশানকালীর নিবাস
ধোঁয়া উঠলে যেন সে সাগরকে ডাকে
মনুনদীর জলে মিশে অনন্ততে যায়
এ জীবন নশ্বর মনে করাতে মনু
বয়ে যায়, মনুর মাটি লয়ে কারিগর
উৎসবের মূর্তি গড়ে । এইভাবে
মনুনদীর তীরে শঙ্খ বাজে সন্ধ্যায়।
বধূগণ আঁচল পেতে আশীর্বাণী চায় ।
রামকৃষ্ণ আশ্রমে ভোরের আহির ভৈরব
আর প্রার্থনার গান নদী শোনে রোজ ,
ত্যাগ আর জীবনের সুরে,বালক সাধুর
মায়ায় নদীর গর্ভে একটি দিন শেষে
রাতের জন্ম হয় । কপোলে চন্দন
আর শিশিরের মায়া,ঘামে মুছে যায় ।
মনুনদীর আখ্যান খুব বেশি দীর্ঘ নয়
ধৈর্য ধরে পড়তে হবে, কৈলাসহরবাসী কয়।
লেখক পরিচিতি
চিরশ্রী দেবনাথের জন্ম ত্রিপুরার কৈলাসহরে , ১৯৭৯ এর ১২ ফেব্রুয়ারী। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার, মা মায়ারানি মজুমদার। গণিতে স্নাতকোত্তর এবং শিক্ষিকা।ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির শুরু বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ নয়টি, তিনটি উপন্যাস, একটি কিশোর উপন্যাস, দুটো ছোট গল্প সংকলন, একটি অণুগল্প সংকলন, কবিতা সংক্রান্ত যৌথ বই একটি । ‘ কীর্ণকাল ‘ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন যৌথভাবে আটবছর ধরে প্রকাশ করে চলেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন
কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না।

0 মন্তব্য(গুলি):