কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

“নিষিদ্ধ নয়, নন্দন: যৌনতার সাহিত্যিক ভাষ্য” , চিরশ্রী দেবনাথ

 “নিষিদ্ধ নয়, নন্দন: যৌনতার সাহিত্যিক ভাষ্য”



চিরশ্রী দেবনাথ




পৃথিবীতে প্রত্যেকদিন হাজার হাজার মানুষের জন্ম হয় তারপরও আমরা লেখক  লেখিকার কাছে জানতে চাই , লেখায় যৌনতা কেন এসেছে বা কিরকম ভাবে এসেছে তখন ব্যাপারটা খুব আশ্চর্যের মনে হয়। 


অথচ তাদেরকে আমরা জিজ্ঞেস করিনা আপনি খুনের দৃশ্য কেন লিখেছেন ? বা ধর্ষণ?  এগুলো তো অস্বাভাবিক কষ্টের বিষয় । ভয়ানক অশ্লীল জিনিস।


কিন্তু একই গল্প বা উপন্যাসে ভালোবাসার , প্রেমের  ঘনিষ্ঠদৃশ্যের বর্ণনাকে কেন যেন মানুষ মেনে নিতে পারেনা। যেন জীবনপাত্র উছলিয়ে ওঠা কামনা একটি বড়ো মিছে কথা। 


। অথচ, মনোবিজ্ঞানে, বিশেষ করে Sigmund Freud-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, লিবিডো শুধু শারীরিক কামনা নয়; এটি মানুষের ভেতরের এক ধরনের জীবনীশক্তি, যা ভালোবাসা, আকর্ষণ, সৃজনশীলতা এবং সম্পর্ক গঠনের শক্তির সঙ্গেও যুক্ত।



গল্পে উপন্যাসে খাওয়ার দৃশ্যের যেমন বর্ণনা থাকে তেমনি খুব সাধারণভাবেই একটি যৌনতাবিষয়ক দৃশ্যের বর্ণনা থাকতে পারে।  পার্থক্যটা হচ্ছে উপভোগ বা বিনোদনের । উপন্যাস বা সিনেমায় মানুষ এই সহজ স্বাভাবিক সুন্দর দৃশ্যটাকে উপভোগ করতে চায় বা যাদের জীবনযাত্রায় সেটা যথেষ্ট সহজলভ্য নয় তারা সেটার পাঠসুখ বা দৃশ্যসুখ অনুভব করতে চায়। কিন্তু সিনেমায় বিনোদন যতটা আগ্রাসীভাবে বা বাণিজ্যিক কারণে আসে সাহিত্যে ততটা নয়। এখানে সাহিত্যকে নিছকই পর্ণোগ্রাফির সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা ভালো । এটারও অবশ্য সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি কেউ যে এতোটুকু বর্ণনা করা যাবে তার বাইরে নয়,  কারণ ভারতবর্ষের মন্দিরগাত্র আমাদের সকল প্রশ্নকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে যৌনতার উন্মুখ সৌন্দর্যের কাছে দাঁড় করিয়ে দেয়।


আমার কবিতা,  গল্প ও উপন্যাসে মানুষ আছে, তাই যৌনতাও আছে । মানুষ থাকবে আর সে মানবজীবনের উৎসমুখের কাছে দাঁড়িয়ে অমৃতের অনুভব নেবেনা তা কি হয় নাকি?  তাই সমকাম এসেছে, এসেছে নরনারীর ভালোবাসার উদযাপন। আমি যেহেতু ভাষার সৌন্দর্যায়নে বিশ্বাস করি তাই কখনও রূপক, কখনও দৃশ্যের আড়ালে দৃশ্য,  এভাবে পাঠককে গভীর মননের দিকে আকর্যণ করার একটা চেষ্টা আমার মধ্যে আছে। যৌনতা যেন তার বিকৃতরূপ নিয়ে নর-নারীর মধ্যে এসে না দাঁড়ায় , সবচেয়ে সুন্দর রূপক যেন তার আধার হয়।


আমার দু একটি ছোট্ট কবিতা এখানে রইল।





চা



দু'কাপ চা তোমার আমার


খানিকটা চিনি... প্রথম বৃষ্টিপাত


উষ্ণ গাভী রস,


একটিই চামচ সেখানে


নাড়তে থাকে তোমাকে আমাকে। ( কাব্যগ্রন্থ ‘ প্রেমে সন্ত্রাসে ‘ )







উন্মোচন 


পাগল দম্পতি দেখেছি, যুগ্ম নক্ষত্র , সহাস্য পঞ্চাশ 

একটি ছেলেও আছে, সুস্থ, সুন্দর শালতরু

কী বিশুদ্ধ মিলনে জন্ম হয়েছিল তার, কত প্রবল ভালোবাসাবাসিতে

আগুনের ঘরবাড়ি, ভেতরে গুহা, নদী, অন্ধকার, 

ধরেছে হাত, জ্বলেছে মনের গহন

অথচ মস্তিস্কে জট, খাদের গভীর, নেমেছে কুয়াশা, সূর্যের আলো দিকচিহ্ন হীন

এই সময়ে রোপিত বীজ, পত্রপুষ্প দিয়েছে ঢেলে কোন্ শ্বেতপ্রপাত ? 



( কাব্যগ্রন্থ ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স ) 





বিভাজিত মেঘ


.........................


দুজন সমকামী মেয়ের অর্ধেক আকাশ নেই


দেহতত্ত্বের অন্ন সুবাসে


তাদের শরীরে জারিত পূর্ণ আকাশ


এই ভূমিকায় একটি  গ্রহণ ছেয়ে যাবে


সে গ্রহণের দায় কোন সন্তানের নয়



ক্যাকটাসে যে ফুল ফুটে চল্লিশটি বছর পর


একমেয়ে অন্য মেয়ের চুলে গুঁজে দিয়েছে সেই গন্ধ



" বাহারোঁ ফুল বরষাও "



বৃষ্টি জ্বলছে আঁধারে, ডুবছে পরিধি 


 এখানে পতন হোক দিগন্তের 


পাতাল ছুঁয়ে দেখুক কেউ কেউ …




( কাব্যগ্রন্থ “ প্রেমে সন্ত্রাসে “)





“অনন্ত কাম হয়ে ওঠো


চোখে কাম , চোরা থুতনিতে কাম


তোমাকে দেখে দ্রবীভূত হয়ে গেছে অন্ধকার


তোমারই কামে আগুন জ্বেলে


পুড়িয়ে দিচ্ছো নরম শঙ্খের মুখ


অবারিত কাম শেষে


শরীরে এখন শান্ত নগ্ন জল” ( কাব্যগ্রন্থ ‘ নিঃস্বরের করতলে ‘) 





নিজের কবিতার ব্যাখ্যা নিজে নাই বা করলাম ।




প্রত্যেকটি মানুষের জীবন একটি উপন্যাস । আমার লেখা তিনটে উপন্যাস ‘ সূর্যছক ‘,


 “ মারমেডের শহর থেকে “, এবং “ সংখ্যার শরীরে মৌমাছি “ , সবগুলোতেই রয়েছে নরনারী । তাই উপন্যাসের নরনারীকে জীবন্ত রূপ দিতে যৌনতার নন্দনভাষ্য এসেছে ।


তবে আমার লেখায় অতিরিক্ত  সচেতন হয়ে যৌনতার প্রয়োগ নেই । সবগুলো উপন্যাসেই 


বর্ষায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মতো যৌনতা রয়েছে  এবং কোথাও কোথাও রয়েছে নিজেকে ভালোবেসে নিজেকে যাপন করার স্বাভাবিকতা , এটাও তো একপ্রকার  যৌনতা ।

গলনাঙ্ক নির্ধারিত হয়নি

গলনাঙ্ক নির্ধারিত হয়নি 

***************

সৌন্দর্যের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়

মেয়েরা তাদের মুখের ত্বকে জোঁক বসিয়ে রাখত। 

 ওরা টেনে নিত রক্ত, ফ্যাকাশে মুখে ছেয়ে যেতো নিরক্ত জ্যোৎস্নার ভৌতিক আভা,

সেই জ্যোৎস্নার মুখোশ নিয়ে পারিজাত বনে ঘুরে বেড়াত ললনারা, তাদের নখের শ্রী বৃদ্ধি করত

মৃত প্রজাপতির পাখার গুঁড়ো, 

 মসৃণ নখশিরায় তাই বিগত জন্মের শুঁয়োপোকার বক্র চলন,    

মিলনোদ্যত সমুদ্র জীবকে হত্যা করলে যে মহামূল্য 

জৈব রস পাওয়া যায়, তার মোক্ষম লেহনে দেহ বল্লরী উদ্ধত শিখার মতো লকলকে হয়ে ওঠে, 

পারদ কণিকা মিশ্রণে ঢাকা ঠোঁটের নিচে, 

উত্তর গোলার্ধ জুড়ে আসন্ন বসন্তের ষড়যন্ত্র, 

কুমিরের রক্তে যেন মিশরীয় ভালোবাসার ফেনিল দ্যোতনা 

প্রত্যেকটি সৌন্দর্যই শেষপর্যন্ত পুরুষগমন করে না, 

দ্যুতি, তীক্ষ্ণতা, কেশদামের পুষ্পশোভা, শয্যায় খুলে রেখে, কিছু কিছু মেয়ে হেঁটে যায় ধূসর প্রান্তরে,

তাদের গ্রীবা থেকে নেমে আসা দুর্বোধ্য অ্যামাকো

কেউ পড়তে চায়নি কোনোদিন। 

দীর্ঘ কবিতা, চিরশ্রী দেবনাথ

প্রথম কবিতা



মধুপত্র 




দীর্ঘ লেখা আসার আগে হাঁটু গেড়ে  বসি

শরীর থেকে  ক্রোধ নেমে যায়, 

নেমে যায় অশ্রুকাম ,মলিন জীবন 

থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মধুশ্বাস

পাখি হারিয়ে ফেলা অরণ্য যেন 

তোমার প্রতীক ।এই লঘু  স্তন ও

 বিরামচিহ্ন দিয়ে অঙ্কিত চরাচর

দ্রোণফুলের সুগন্ধ বয়ে আনা ভোর, মৃত্যুর শ্বাস

 


প্রত্যেকে নিশাচর, সকরুণ বিরোধে 

অবহেলা সয়ে যায় শীতের আয়ুর মতো ;

 এখানে আমি আছি অথবা নেই ;

 আছে শুধু রেখে যাওয়া শরীরের 

নিঃসীম পচন ।নদীর ঢালে অপুষ্টিতে

 বেড়ে ওঠা চিনার ফলের  ফ্যাকাশে 

বীজের দানায় দানায় আত্মহত্যাসম প্রাণ, 

ছেঁড়া পতাকা পড়ে  আছে, 

ধূসর সংগ্রামের দগ্ধ চিহ্ন। 


দেবী আসছে, পথে জ্বেলে রাখো

 আলো, সশস্ত্র জওয়ান !

 মা...ঢেকে রাখো বুক, পাহাড়ি কোমড়,

পৃথিবীতে ভয়, ছিঁড়ে ফেলে শরীর, 

চারদিকে শুধু মেয়েদের শরীর, 

আমাদের লেখায় তারা মেধাবী উষ্ণ!

দেবীকন্যারা কামদুনি,  মণিপুর হয়ে 

এসো, ওদের বারান্দায় বসে পুজো নিও, বেলপাতা, যজ্ঞের ধোঁয়া, 

রক্ত মাখা ফুল নিয়ে পায়ে পায়ে এসো, 

এখানে এখন পুজোর আয়োজন, চন্দন ধূপ...


যুদ্ধ ছেড়ে চলে যাওয়া পরাজিত 

সৈনিক সুন্দর! গৃহমুখী প্রাণ,

 দরজায় মায়ের অপেক্ষা হলুদ 

সম্বরার ঘ্রাণ ।নারীর কোলে মাথা 

রাখবে সে যুবক পুন্য হীন, 

ফিরে এসেছে যেন অচেনা হাওয়া 

কিংশুকের শব নিয়ে উদাস বসন্তে, 

তারপর, কবিয়াল হৃদয় খুলে দাহ 

দেখাও, দেখো এই আবাহন, 

বাঁশের বনে কেন নিঃশব্দে হেঁটে 

যাচ্ছে শান্ত চোখের ডাহুক ! 


ধান কাটার পর যে মাঠ পড়ে থাকে

 তার কাছে গিয়েছি ,জলে ভেজা

 দুর্বল মেরুদণ্ড, হাতের পাতায় মগ্ন ভোর

আমার পায়ের শব্দে ঘুম থেকে উঠেছে

 মাটির কীট, চোরা ঘাসে কেটেছে পা, 

নির্জন সূর্যের ছেঁড়া আলো

হেঁটে যেতে যেতে শরীর থেকে 

ঝরে গেছে আবরণ , দীর্ঘতম মাঠ, 

জলশূন্য চোখে উপল মাছের 

কোলাহল, পৃথিবী দ্বিধা হতে 

গিয়ে হয়ে গিয়েছে আমার মতো, 

সোনালি ঘরে রাখা ভেজা ধান,  

পচন ধরেছে এইমাত্র


কুয়াশা নামেনি এখনও, বর্ষার দুখি 

ধারা চরাচরে ,আনাজের নরম শিকড় 

গলে গেছে, নষ্ট হয়েছে ফসল

পুজো যেন অভিঘাত, ভয়ঙ্কর 

নদীস্রোত, কান্না। কিশোরীর 

দু বেণি বেয়ে সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত

এই সুখ মৃত্তিকার মতো, 

মুঠো থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে গাছ, 

এসো পাখি, সবুজ তাপে 

পুড়ে যাক স্মৃতিস্মারক 


হলুদ সর্ষের খেত নেই, 

জলে ভরা শস্যহীন মাঠ

আগাছা আর বেগুনি ফুলের ঝোপ, 

গোধূলির আসনে ম্লান ফুলের দল, 

অসুস্থ মানুষের চোখে তবু

ভিড় করে আসে উৎসবের 

হারানো দিন, পায়ে পায়ে

 জড়িয়ে আছে এই দংশন, 

শ্যামাপোকা, কোজাগরীর মোহ, 

নিবেদন করি মাঝে মাঝে, 

কোথায় লোভহীন দেবতার থান, 

উজ্জ্বল রশ্মি দিও, চোখ ছিন্ন 

করে চলে যাবে ভেতরে, 

অনেক নিচে হাওয়ার মতো 

শোক, মৃদু সুখ ...



ভালোবাসি বলে, করতলে তিল 

হরিতকী, শুশ্রূষা। মৃত্যুশোক ভুলে 

যেতে চাই তাই তর্পণ মানি না

বাসক গাছের পাতা তুলে আনি, 

নীলকণ্ঠের মধুবিষ

পাত্র ভরে রাখা অদৃশ্য ধোঁয়া, 

চোখ জ্বালা করা। 

যখন অবিশ্বাস করি এই 

মোহকান্তার, কন্ঠে ঢালি 

নেশার মতন, দেখি ঘুঘু 

ডেকে যাচ্ছে চরাচরে,

রোপিত হচ্ছে যেন শুধু 

কালো দ্রাক্ষার বীজ ...



এখানে এসেছি বলে মহুয়ার 

গাছ ছায়া মেলে দিল

বনের গন্ধ যেন যুবতীর ঘোর, 

কৈশোরের মফসসলের চৌরাস্তা 

থেকে আরো ঘন হয়ে সর নামে 

জ্যোৎস্নার!  গুল্মপথে নির্বিকার 

আজ সেই নারী, শুনশান আকাশ, 

বোবা নক্ষত্র বাড়িয়েছে হাত, 

এই তবে মৃত পূর্ব পুরুষ, 

সময় হয়ে গেলে চিনে নিও ইশারা,

 গলে গেছে পাপতাপ, সকরুণ 

আলো শুধু ভেসে বেড়ায় অস্মিত প্রান্তরে।



বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে শহরে 

 ভেসে আসে জুরি নদীর দীর্ঘশ্বাস

শুষ্কতা এতো জলীয় কেন? 

কেন দিকচিহ্ন আগলে রাখে 

মন্দিরের দরজা।  পথিক ফিরে যেও !

এখানে ইতিহাস নেই,  

স্তব্ধ ধানের তুষ আছে

গড়ে ওঠা এক মিশ্রবসতির 

সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ।কার্তিকের 

সংকীর্তন থেকে প্রসাদ কুড়িও

শোক ছিঁড়ে যেন নিরাকার ব্রহ্ম জেগে ওঠে



ব্যর্থ জীবন দ্রুত আগুনের কাছে 

যেতে চায় ,আগুন পেরোলে যেন 

কিছু না থাকে আর 

স্বর্গের রতিচিহ্ন অথবা 

নরকের সহবাস

শূন্য থেকে এসে শুধু বিলীন , 

চিহ্নমাত্র ভুল জেগে নেই কোথাও



নারী ফিরে গেলে মৌ দাগ পড়ে থাকে

পুরুষ ফিরে গেলে দিকচক্রবাল

ফিরে যেতে যেতে অভ্যাস হয়ে 

যায় সমস্ত বিরহবিন্দু

উদাসীনতার বৈভবে মেতে উঠছি , 

হয়তো ঝরে যাচ্ছে  আত্মরতি

ভাঙা সঙ্গীতে ভেসে আসছে 

আমারই কন্ঠ অকাতর

আগে শুনিনি, কেঁপে উঠছি, 

হাত ডুবিয়ে তুলে আনছি পাহাড়ি বাদল



শূন্যমাত্র জানি, ফিরে দেখা 

বকুলের খুধা ,জলবায়ুর উষ্ন  

বার্তা পেলে কেঁদে উঠি

খুলে দেখি অবারিত বায়ুসম্ভার , 

গরিব মেধা ,শীতের করুণ পাতার 

 ,ওপর শিশিরের দাগ , যত্নে গড়া 

মাকরসার ঘরবাড়ি আর অস্থায়ী

আমি, এখান থেকে চলে যেতে যেতে

খুৃৃঁজে পেয়েছি কড়ির মালা , 

ঈশ্বরহীন । জৈব গন্ধে ভরা ।


একদিন উচ্ছাসের কামনা 

করেছিলাম ,বসন্তের নরম ধুলো 

মাখা সন্ধ্যায় হেঁটে বেড়ানো । 

তারপর জেনেছি খুব কঠিন

দুইজন একসঙ্গে হওয়া কোনো এক

গোধূলিতে। সেই থেকে বহে বায়ু ,

ক্রমাগত ব্যক্তিগত পদ্ম সম্ভারে

জমানো হয়ে গেছে না হওয়া দিনলিপি।


দুঃখযাত্রা শেষে আবারও জেগেছে পৃথিবী

মৃত্যুভার , শোক সন্তাপ নিয়ে ব্যথিত 

শঙ্খের মতো যেন ভোরের আকাশ ।

এসো ' সন্তর্পন ' তোমাকে ছুঁয়ে দিই

দমকলের সাইরেনের মতো কি 

কোথাও সংকেত দিল  অশুভ !

ছিন্নধারাপাতে গলে গেছে তুঁতফলের রঙ

ফ্যাকাশে বিস্ময়ে কাঁটাভরা চোখে দেখে

মন্বন্তরের মাঠেও কেউ বলে  ওঠে

 " আহা চলো তো "

 সোনালি খাবারের মতোই মেয়েরা

 ছেলেদের খেয়ে ফেলে 

এই অভিশাপ পেতে পেতে ছেয়ে 

গেছে শুধু গ্রহণ আর পাপ 


অনন্ত কাম হয়ে ওঠো

চোখে কাম , চোরা থুতনিতে কাম

তোমাকে দেখে দ্রবীভূত হয়ে গেছে অন্ধকার

তোমারই কামে আগুন জ্বেলে

পুড়িয়ে দিচ্ছো নরম শঙ্খের মুখ

অবারিত কাম শেষে

শরীরে এখন শান্ত নগ্ন জল


হে ক্ষণিক এসো , লৌহপাত্র নিয়ে ।

 স্বচ্ছতোয়ায় হাত রাখি,

পৃথিবীর অজানা গহ্বর যেন,

 লেখা আছে সেখানে কোনো

এক জন্মান্তরের ইতিহাস , 

অশ্লেষা নক্ষত্রের অভিশাপ, 

অভিশপ্তরা সুন্দর হয়

জনারণ্যে তারা বিদ্যুতের 

মতো আঘাত দেয়,

কাঙালের মতো কাঁদে।


অনন্ত আলোর মতো জেগে 

উঠেছে পৃথিবী ,ছড়ানো নৃশংসতা,  

ডানা ভাঙা আকুতি

ডিনামাইট আর বোমারুর গর্জন

তারই ফাঁকে নতুন কান্না জেগেছে

দুহাত মেলে যে চারাগাছ 

জন্ম নিয়েছে ,সে কি শোক 

ভুলে যাবে দ্রুত, মৃত্যুর ওপর 

দাঁড়িয়ে বাক্স খুলে বের করবে 

পান্না রঙের যোনি !


 

প্রতি ঋতুতে  কবিতা লিখি ,

ঋতুর পর ঋতু কবিতা

 লিখতে লিখতে

ঋতুহীন দিনে বসবাস ঘনিয়ে 

আসছে ক্রমাগত

দুধঘাসে ছাওয়া নদীতীর 

আমাকে জীবনের লোভ দিও, 

প্রথম স্নানের চিহ্ন

তুলে এনে বলো এসব 

এক মানুষীর অবহেলা

ভুলতে পারিনা ঐ সন্ধ্যা , 

ফিরে আসা ধূপগন্ধ

শেষশয্যায় আমার শরীরে 

সব ক্ষত জেনে রেখো

বিস্মৃত প্রেমের দারুচিনি গাছ



আধা শহরে বাস করি, পাগলের সংখ্যা কম

প্লাস্টিকের চেয়ার ও গোল টেবিলে 

সন্ধ্যার আড্ডা হয় ,কুকুরেরা শোনে, 

কিছু মানুষও । আড্ডা শেষে রাস্তায়

 একা ঘুরে বেড়ায় অরিজিৎ সিং এর 

গানের কলি, গেয়ে গেছে বখাটে ছেলে, 

নেশা আর গান, হোলির দিনে 

তাকে ডেকে এনো, ধর্মগ্রন্থ ছিঁড়ে 

যজ্ঞের ধুনো দিও, শহরে ছেড়ে দিলে

 সে তখন পাখির মতো হয়ে যাবে ,

 মিহি সুর, তর্জনীহীন, অন্ধকার চোখ



পৃথিবীর বুকে এখন শৈত্য ঝড়

যুদ্ধের কারবারিতে জিডিপির 

ওঠানামা ,পাহাড়ের ভেতরে

 ইন্টারনেট সংকেত নেই

তবুও গোপন যুদ্ধ আছে, 

মশাল জ্বালানো হয় না

ক্রমবর্ধমান জ্বালানীর দাম, 

নেভানো আগুন। 

অন্ধকারে বিবশ কিছু মানুষের দল, 

পরস্পরের কাঁধ খুঁজে বেড়ায়,

ধারালো অস্ত্র হারিয়ে গেছে শুনেছি

হয়তো বন্ধুত্ব চায় সংকেতহীন 

জঙ্গলে... মধুর শিস। 


ভারতবর্ষ এতো ধার্মিক ছিল না ,

এখন হয়েছে।

যখন তখন আকাশবাণী শুনি, 

দধিচির হাড় শপিংমলে বিক্রি হয়. 

 চড়া জি এস টি ।

কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির 

অনেকক্ষণ হলো টয়লেট পেয়েছে ।

সে হাসছে,বসতে নিষেধ আছে।

বাইশো টাকার কালো ব্লেজারের নিচে

ভাত আর আলুসেদ্ধ হজম হয়ে গেছে কবেই।

তারও গার্লফ্রেন্ড আছে, অস্থায়ী চাকরি করে।

এখন সবাই অস্থায়ী,  বেতন অনিশ্চিত।

নীল কাজল আর ন্যুড লিপস্টিকের নিচে

অবারিত কামনার ছলছল ।



শহরে মিছিল,অটোওয়ালারা 

পতাকা লাগিয়েছে ,রামমন্দিরের ছবি। 

বাড়িতে হলুদ চাল এসেছে, পরমান্ন রাঁধব। মহাকাব্য তৈরি করছি আমরাই। 

মহাকাব্যে রাবণ নেই, 

আশ্চর্য এক রামায়ন শুষে নিচ্ছে জলজ অক্ষর।

হে মেধাবী দেশ ছেড়ে যেও না। 

রাজনীতিতে এসো, 

বশিষ্ঠের মতো শিকড় ছড়ানো শেখো।





কবি তৈরি হচ্ছে, 

পোশাকের নিচে শূন্য হৃদয়।

ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ে সরু গলায়। 

শীতার্ত জোঁক ধীরে ধীরে কামড়ে ধরে ধমনী

রক্তপাতেও থেমে থাকে না বসন্তের বিবরণ

সামনের লোকগুলো ঘুমিয়ে গেছে ।

উত্তরীয় আর স্মারকের দোকানে 

বাকি  পড়ে আছে টাকা। 

রক্তখাওয়া জোঁকের মুখে নুন ছেড়ে দিই,  

আরো একটি কবিতার জন্ম

দিতে গিয়ে যেন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে কেউ।



জনহীন রাস্তায় নিঃসঙ্গ  পি. সি.ও আর

 জয়পুরি দোপাট্টার মেয়েটি , 

শ্যামলা মুখখানি হারিয়ে গেছে কোথাও 

 ছায়া দিয়ে সাজানো এক অদ্ভুত বাতিঘর ,

 ক্যাশবাক্সে প্রেমিকার নাম্বার রেখে গেছে দোহারা যুবক

জেরক্স মেশিনখানি নষ্ট হয়েছে কবে

আশিকির গান বাজছে আজো, 

শুধু শেষ হয়ে গেছে নব্বইয়ের দশক 



কবিতা লিখি,

 যেমন লেখে প্রেমহীন মানুষ, 

ভালোবাসাগুলো শরীরের কাছে গিয়ে

ফেরার পথ খুঁজে, শয্যায় শায়িত সেই ধ্রুব

অভিমান নিয়ে বনমহোৎসবে সামিল হই 

গাছেদের মিলন নেই, অথচ বসন্ত আছে

ফুলসম্ভার,  সুগন্ধি আর প্রবল ঝড়ের দিনে

নম্র উচ্ছাস, হাওরার মাতন, কেবল স্পর্শ নেই। 




শান্তি এসেছে, 

খয়েরি খামে পাইন গাছের বীজ

সমান্তরাল পথরেখা, শুকনো মাছের গন্ধ,

অনার্য নারী মাটির পাত্রে রেখেছে ভাতের মণ্ড, 

টিউবওয়েলের জল ঢেলে, হেসে ওঠে চিকন, 

গর্বিত চোখ। হোক চোলাই ! 

দেহে তো নতুন জোশ। 

ঢুঁপি ছরার জল ছেঁকে পাওয়া কাংলা মাছ, 

কালোকৃষ্ণ পাতার গন্ধ নিয়ে 

ফুটে উঠেছে হলুদ ঝোল।

সন্ধ্যা বড়ো মরমী হয়, 

পিচ রাস্তা ছেড়ে দিয়ে

ধীরে ধীরে  মিশে যায় রুগ্ন গ্রামের শরীরে।



যে পথে পৌষ ঢোকে আমি তার সঙ্গী বাউল

পরনে কুসুম রঙের পালক, নীল তিলক

শূন্যতা তুলে নিয়ে যেতে, ধানের খেতে এলাম

অগ্রহায়নের বৃষ্টিতে নরম হয়ে গেছে পাকা ধান

বিষণ্ণতার রোদ ছুঁয়ে মগ্নতা এসেছে তার

অসময়ে বৃষ্টি  হলে আমিও লক্ষ্যহীনতায় ভুগি

ভেতরে ভেতরে সুগন্ধি পচন, পোকা, ব্যর্থ 

কবিতা মাদুলি, আভূমি প্রণাম করে ক্ষমা

তুলে নিয়ে যাচ্ছি, মুখ ফসকে অঙ্গার বেরিয়ে

যায় যখন তখন, ঠান্ডা ধার, নিঃশব্দের ঝকঝকে

আভরণ পরে ডিসেম্বরেই আমার ভেতর যতো

অকারণ প্রপাত। 



চাকার আওয়াজ যেন রাত্রির অভিঘাত

এতো দ্রুতগামী ট্রেন দিয়ে কি করব?

যদি ছায়া না দেখতে দেখতে যেতে পারি

পুরনো দিনের মতো অলস হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়

ফোন নং হারিয়ে গিয়ে যেখানে আমি অবান্তর

ঘাসের ওপর দিয়ে চলে গেছে কিছু মানুষের পায়ে হাঁটা পথ ....





 সৌরভ ছড়ানো এই বেঁচে থাকা শেষ হবে 

না যেন কোনোদিন, কখনো শাকের আঁটির মতো সংসার আর ছলনার মায়াময় জাজিম, ডুবে গেছি । যে স্তর ছেড়ে আসি সেখানে অমৃতের জন্ম হয় , প্রেতিনীর মতো এগিয়ে এসেছি পদচিহ্ন নেই, বাসভূমিতে মন্ত্র জেগেছে, 

ধোঁয়ার জলসা । চারপাশে ভিড় হোক,

 শান্ত মলিন জল ,মাছজন্ম ভালো , 

জলহীন সমাধিতেই শেষ




আমি যে লেখা লিখি ,সে আমার ফাঁদ

ফাঁদে পা দিয়েই কামড়ে ধরি কন্ঠ

তারপর ফোঁটা ফোঁটা করে গড়তে থাকে

অম্ল ও ক্ষার ...এক একটি আত্মহত্যার খবর 

নাড়িয়ে দিয়ে যায় ছাইয়ের মতো রাতে , বেঁচে থাকা মানুষেরা স্তব্ধ সাদা পাথরগুলো নিয়ে আলোচনা করে,আমাদের নিঃশ্বাসে তাদের

দীর্ঘ শ্বাস হারায় ,আত্মহত্যার কারণ শোনা যায় ,

কিন্তু সে কারণ একটি ফুলের মৃত্যুর মিথ্যে গুজব



পুরস্কার প্রাপ্তি , ধর্ষণ আর হত্যার খবর 

একসঙ্গে পড়ি , কেমন যেন নিস্পৃহ হয়ে বসে থাকি,জলাভূমিতে বেড়ে ওঠা কলমি লতার

মায়াবী তুচ্ছতাগুলোই শুধু আমার হোক  

...জ্যোৎস্নার মতো পরিকল্পনাহীন ,

এরকম বেঁচে থাকি আরো কিছুদিন 



কোনোদিন ভোরবেলায় ভুল করে উঠি

দেখি লাইট পোস্ট ঢেকে আছে স্বর্গীয় আলোয়

মনে হয় এল ই ডি বাল্ব নয় , না দেখা মেসেজ

সকাল হতে হতে বিস্মৃত মায়াবীলোক 

রান্নাঘরে ধোঁয়া ওঠে , তরুণ শাকসব্জি স্পর্শ করতে গিয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে আঙুল 



অস্বীকার করতে ভালো লাগে যেমন তুমিও করো

একে অপরকে অস্বীকার করতে করতে

চোরা কুঠুরিই সম্বল,

হতাশ হওয়াও নেশার মতন

তবুও আমরা অস্বীকার করি

এই মাঠ ,শ্বেতফলে ভরা গাছ ,

 বহু নিচে ছড়ানো শেকড়



কেন জানি রোজ মৃত্যুর কথা ভাবি

কীভাবে মরব কে জানে

হয়তো আমার মায়ের মতন

শুষ্ক গলায় চলে গেছে জলহীন

আমিও যাবো এভাবে যাহোক একটা

জলহীন,  কবিতাহীন,  গানহীন



মুখর ছিলাম ,এখন পুরনো বাড়ির মতো উত্তাপহীন,যেসমস্ত উদ্ভাস কবিতা ছিল

ছত্রাকের স্থবিরতায় জমেছে  ফ্যাকাশে চর্বি

আত্মা ক্ষয়হীন এবং উজ্জ্বল ।

  এই বিশ্বাস আছে কোথাও এখনো ,

তাই আবারও উঠে যাবো 

অক্ষরে ছড়ানো আবেগে ভেসে বেড়াবে ক্রৌঞ্চমিথুন ।




শহরের একটিমাত্র মৃতপ্রায় নদীকে নিয়ে


আমরা স্রোতের স্বপ্ন দেখি    


আমাদের জল কমে যাচ্ছে


মেশিন দিয়ে নদীর আরো গভীরে যাই


দগদগে ক্ষত থেকে দমকে দমকে ওঠে কিছু জলের বেদনা, 


স্নানঘরে সেইসব জলবিন্দু থেকে অনিশ্চিত ফেনা 


ছড়িয়ে পড়ে শরীর থেকে শরীরে


এই জল তাই ভালোবাসা জানেনা, 


আসলে ভালোবাসা বলে কিছু নেই, 


আছে শুধু দেহ ও ক্ষত উন্মোচন । 
















দ্বিতীয় কবিতা


আশ্বিনের বিকেল

......


এমন  বৃষ্টিদিন এসেছে

 কয়েক ঋতু পর, উন্মুক্ত !

 স্নানযাত্রায় গোঠের ঠাকুর

 যেন আমাদের পাহাড়ে, 

শটিবন, বাঁশঝাড়, ধলাই নদী, 

পোড়া আলুর প্রসাদ, 

গহন ছেড়ে এই মাত্র 

সন্ধ্যা পথপ্রান্তে সমাগত,  

অন্ধত্ব প্রবাহিত হয়ে ধুয়ে 

নিয়ে যাচ্ছে ক্লেদ, ছিন্ন বল্কল,

 এখানে সমাধিক্ষেত্র, মনসার থান, 

দরগার সীমানা, ধূপবাতি, মোম,

 আগাছার ফুল নিয়ে চলে যাচ্ছে, 

তমসা সুন্দরী, গতবছর মরেছে সে

 সাপের কামড়ে, দু 'হাতে কুয়াশার

 ঠোঙা, নীলকণ্ঠ ফুলের রস,

 ক্ষীণ হাসি, জ্যোৎস্নার প্রেতিনী যেন, 

বর্ষা ধুয়ে দিতে চায় যত 

তাঁর দুঃখ সমারোহ, 

হেলেঞ্চার জঙ্গলে ভরে গেছে পথ, 

গোধূলির ভাঙা আলো পড়ে

 যেন স্বর্ণসম রূপ, তাম্রবর্ণ যুবা,

 প্রবল জীবন, সাদাটে সন্ধ্যায় 

আলোড়ন তুলে গেছে গ্রামে, 

দাঁড়াও ক্ষণিক, শান্ত বারিধারায়, 

ধুয়ে যাক অশুভ বচন,

 মাটি পেয়েছে জননের ক্ষমতা,

 কাদামাটি জলে মিশে যায় 

শুধু প্রসবের সুখ... বেদনা। 






কাঁঠালের হলুদ শাঁসের মতো 

আঠালো লেখা কী করে

 লিখবে গ্রাম্য কবি,

 যদি তাকে উপেক্ষা করে

 যায় গভীর সেই প্রেম, 

উদাস স্তনের মতো খালি 

হয়ে গেছে  মৃৎ পাত্র,

 ধানের শিকড় থেকে 

আনো বংশধারা, জিন। 

ব্যক্তিগত ছিল যে নারী,  

আর জন্ম দিতে চায় না, 

ভুলে গেছে মিলন মুহূর্ত, 

তার গাভীর নাম শশী,

 উঠোনে ঝরছে নতুন দুগ্ধ,

আঠারোমুড়ার জঙ্গল থেকে 

সোজা চলে গেছে উৎরাই পথ,

 রোমশ ছাগল শিশু আর 

পাহাড়ি ছরার জলে, 

নীরবে নামছে কায়াহীন 

সংসার, এখানে মরে গেলে 

যেন জন্ম হয় আবার, 

রিফিউজি লতা ঘেরা 

বাসুকির খোপে লাল জবা, 

কালো তাগা, তাবিজের বন্ধন, 

পাঠ শেষ , ফিরে এসো বধূ, 

এই অনিহা ছেড়ে,

 সংসার সংসার খেলা 

হোক পুনর্বার, হিম চাঁপার

 সৌরভ খুঁজে পাক মৌমাছির 

আস্তানা, ধূপগাছে ছাওয়া 

দেবদেউলে ধরা পড়ি

 জৈষ্ঠ্যের চন্দ্রগ্রহণে।






এই যে বিস্তৃত মনু নদীর অববাহিকা

ঘোলা জলের অন্তর্লীন স্রোতধারা, 

পাহাড় ধুয়ে আসা সেগুন, শিমুলের

 শিকড়স্নাত জল, নিশিন্দা আর কালো 

ওঝা গাছ,  দু একটি শ্মশানঘাট, 

পোড়া কাঠ, মাটির কলসী, কাল রাতের

 ঘন বর্ষা নিয়ে গেছে লোভ আর দংশনে মৃত

 দেহের ছাই, তারে মেলে দেওয়া হলুদ লাল 

শাড়ি, বাড়ির উঠোন ঘেঁষে চলে যাওয়া

মাটির রাস্তা, যেতে যেতে শশা, কুমড়ো,

গন্ধরাজ লেবু, কাঁঠাল কিনে নেওয়া,

 শ্মশান দেখে ফেরার সময়, সংসারের    

কথা ভাবা, চোরা স্রোত, জলের ঘূর্ণি 

দেখতে দেখতে আবার স্থবিরতায় আসা, 

পায়ের পাতায় মোরগের নরম পালক, 

ভাট ফুলের ঝোপের কাছে দুটো বক

 নির্নিমেষ আর তাদের গলার কাছে 

পিছলে যাচ্ছে মেঘভাঙা রোদ, কেমন

যেন মিলেমিশে আছি, হয়তো আমার

আর ভাবার কিছু নেই, তর্ক মরে গেলে 

মানুষ এমনই খোলা হাওয়ার মতো হয়ে যায় ।


 কোনো লেখাই আসল নয়, 

আগুন থেকে জন্ম নিয়ে আসেনি

 সেই ঢেউ, জ্যোৎস্না থেকে চুরি 

করেছি আলো ,জোনাকি থেকে

 গোপন আলোর অভিসার, 

পল্লবিত গাছ থেকে

ছায়ার নরম কৃষ্ণ ইতিহাস

রৌদ্র দগ্ধ দুপুরের হলকা

মুখে মেখে যাকে চলে যেতে

দেখেছি অভিমানে, তার মুখ থেকে

কুড়িয়ে এনেছি দু একটি অঙ্গার

গরিব হয়েছি , হৃদয়ে ধারণ

করেছি গৈরিক, নির্বাণের স্তুতি    

দীর্ঘ রাস্তা …স্বর্ণচোরা

ঘাসে ঢাকা, শস্যের খেতের পাশে, 

ঝড়ের আকাশের নিচে যেদিন মাটি 

গেয়ে উঠবে দাহ গান, বল্কল

খুলে দেখবো অস্তিত্ব বলতে ছিল

খানিকটা বর্ণমালা, শঙ্খমুখের পাতা।




ছোট গ্রাম, নদী নেই তার,

 ছরা আছে ,উঠোনের পাশ

 দিয়ে বয়ে চলা,

 কিশোরীর তরুণ হাতের মতো,

 মুঠোতে  নাগচম্পার দাম, 

অর্জুন বৃক্ষের মুকুল, 

বাড়িতে বাড়িতে সুপুরি 

গাছের দেহ দিয়ে তৈরি 

ব্যক্তিগত ঘাটখানা, 

দু একখানি বড়শি রাখা, 

টিলার পাশ দিয়ে চলে

 গেছে যেন সে এক গ্রামীণ ভৈরবী,

 গোপনে নিয়েছে শুঁকে 

গর্জন গাছের পাতায় মোরা 

পান্তা ভাত, ধানি লঙ্কার গোছ, 

শুঁটকির ভর্তা, রান্নাঘরের ছনের 

চাল থেকে ঝরে পরে রাতের শিশির, 

শব্দহীন !  নৌকো নেই কোথাও, 

সাঁকো আছে,  বড়ো আপন, 

এখানে জন্ম নিয়ে মেয়েটি 

রয়ে গেছে এখানেই, 

বাপের ভিটে ছেড়ে গেছে 

কেবল দু'ঘর, একই রয়ে

 গেছে জলের উৎস, ছায়ার পতন, 

মনখারাপ হলে পা দুলিয়ে  

জলে তুলেছে ঢেউ, 

দুধ জ্যোৎস্নায় ভেজা 

বাঁশপাতা পড়েছে ঘাটের কোণে,  

ভাসতে ভাসতে পাশের ঘাট 

থেকে ডেকে এনেছে মাকে, 

শীর্ণ শরীর, মায়া ভরা চোখ, 

পাথরের থানে তার যাবতীয় 

বিশ্বাস কমলা সিঁদুরে লেখা, 

মেয়ের বাড়ি যেতে  হবে বলে 

নিয়েছে, কচুর লতি, কাঁঠালের

 বীজ, দিব্য গন্ধ স্বর্ণমুসুরি চাল।




মনুনদীর তীরে যে সন্ধ্যা নেমে 

আসে ,তা নিমের ছায়ার মতো ,

পারের কাছে শ্মশান বলেই

 মনু স্ত্রী হতে পারেনি

ভুলবশতঃ আমরা তাকে

 নদী বলি ।শূন্য বক্ষে বর্ষার

 ঘোলা জল ভরে দিয়ে 

শোকাতুর মানুষকে বাড়ি 

পাঠিয়ে দেয় ,ফিরে আসতে 

আসতে দেখি কুশের বনে 

জেগে উঠছে কাশের চারা 




ত্রিপুরার কিছু দুঃখ ও মোহ, 

সিঁদলের গন্ধ থেকে আসা,

পোড়ানোর সময় গলতে থাকে 

আঁশের নিচে থাকা নুন, চর্বি, 

ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে খাদ্যনালী, 

পুঁটিমাছ আর মরিচের ঝাঁঝে, 

খালি হয়ে যায় পূর্ববঙ্গের জমিদার

 রিফিউজিদের পাত, নির্দ্বিধায় 

দুহাজার টাকা কেজি, ইলিশের 

গল্প ওঠে আজকাল, আর কবে 

কোন কালে সতের টাকা দিয়ে

 কিনে আনা হতো নববর্ষার স্বাদ, 

ছিল এক কাটাতারহীন নির্দোষ

 চোরা কারবারি,আমাদের গরিব

 জিহ্বা এখনো এসব, আঁশটে

 দুর্বল অনভিজাত খুচরো গল্প

 উগড়ে দিয়ে মৃত্যুবাসরে সন্ধ্যার 

কীর্তন গেয়ে, খোল করতাল 

বাজিয়ে,বিড়ি ফুঁকতে ফুৃঁকতে 

বাড়ি ফেরে রোমশ অন্ধকারে। 





খাং বাঁশের বেড়া, শিল বরুয়ার খুঁটি 

বেতুয়ার টুকরি করে এনেছে পাহাড়ের মাটি

ঘর উঠছে ঘর, নয়নতারার অঙ্গন, 

ঈশান দিয়েছে পুরোহিত, পুজো হয়েছে

মুরগি আর কবুতরের মাংসল প্রসাদ

রক্তের শুভ্রতা দিয়ে তৈরি ঘর মনোরম

সুন্দি গাছের নতুন খাটে শুরু হয় 

চোখে চোখ রাখা, ঠোঁটে মাকড়সার 

পবিত্র জাল, ঘর বেঁচে থাকে ততদিন,

যতদিন ইঁদুর, বেড়াল, আদার ঝোপ,

হলুদ গাছ, চাঁদের আলো পারস্পরিক 




 গান গাইতে জানি না, জন্ম থেকেই 

বেসুরো।  এটা অভিশাপ। 

আমার কাছে লুকোনো আছে

 কিছু ঝর্ণা ও পাথর। 

পাথর বসিয়ে বসিয়ে পথ 

বানিয়ে দিই, বাঁকাচোরা, পিছল। 

তাতে ঝর্ণার কষ্ট হয়, রক্তক্ষরণে 

ভেসে যায় সে, কোনোদিন 

এই রক্তস্রোত নিয়ে আসবে সুর, 

নিষ্ঠুরতা মুছে যাবে আমার, 

অপেক্ষা করছি, 

দুর্বল ঠিকানা রইল এখানে,


 " পূর্ব হিমালয়ের নিম্নভাবর 

অঞ্চলের বাসিন্দা,  

কালবৈশাখীর বিকেল থেকে 

কবিতা লিখে আসছি “







একটি সন্ধ্যা হচ্ছে, যেন সব 

সন্তান দূরে চলে গেছে, 

একা কোনো মা শাঁখ বাজাচ্ছে, 

ঘরের আলোয়, ফুটে ফুটে উঠছে

 চলে যাওয়া মেয়েদের পা,

 শ্যামলা সবুজ তরল মুখের 

ছায়াগুলো পালং শাকের মতো 

নরম, তারা রয়ে গেছে মায়ের চোখে, 

সন্ধ্যার সর নেমে আসছে মফস্বলের

 লাইটপোস্টে ভাঙা পিচ রাস্তায়,

 ছুটি হয়ে যাওয়া নিচু অফিসবাড়িতে,  

পৃথিবীর সব শহরে এমনি সন্ধ্যা আসে,

 চুপচাপ। স্মৃতির শহরে জাহাজডুবির 

খবর ছাপা হয়, আবহে হারমোনিয়ামের 

সুর, প্রত্যেকটি সন্ধ্যা প্রিয় অতীত, 

নীরব আততায়ী, খেয়ে ফেলে 

মেয়েদের কলিজা, নরম জরায়ু।



অজস্র গাছ কেটে নিলে, 

পাহাড়ে ভাঙন নামে,  

শালিক পাখি সন্তানহারা, 

পুত্রঞ্জীব গাছ গিয়েছে মরে, 

দেহ জাগো, ভিড় করো অরণ্যের 

মতো, প্রখর মিলন, বিশ্বস্ত মেঘে 

ঢাকা সেদিনের চরাচর, গড়িয়া 

পুজোর মাস, গাছের সঙ্গে গাছ 

মিশে যাচ্ছে, ধনেশের পালক 

পড়ে গেছে নিচে, হাজার রঙের 

জখম, সেইদিন সব গাছ হয়েছিল 

মানুষের মতো চন্দ্রকামুক, 

তাদের আশ্লেষে ঝড় হয়েছিল, 

বোঝেনি কেউ, ধ্রুব ভেঙে 

জেগে উঠেছিল ভাস্কর্য, 

ভোরের বেলায়, নিভে গেছে সব, 

চিহ্নমাত্র নেই, শুধু সবুজ লতার

 চর উদ্ভিন্ন সৌরভ




যেন সে অনেকদিন পর এলো,

 বহু সকালের পর, নিশিডাক 

ফিরে গেছে কত, দ্বাদশীর আকাশ

 চূর্ণ মেঘের মতো নেমেছে উঠোনে,

 সভ্রান্ত লয়ে এসেছে সে, 

হলুদ গোলাপের স্তবকে রহস্য 

ছড়িয়ে যায় কুবু পাখির ডাক, 

খাসিয়া পানের বাটা রেখো, 

ভেজানো সুপুরি কুচি, 

যাদের ভালোবেসেছিলাম, 

নীরবে এসেছি ছেড়ে, সেইসব  

রূপোলি ভালোবাসা দিয়ে 

অঙ্কিত এই চরাচর 



সেগুন,  শিমুল, গর্জন, জারুল, 

মেহগনি ,গামাই, অর্জুন, অগরু

  চিরহরিৎ পুরুষ গাছ, বর্ষার গায়ক।

এখন গাছ নয় কাঠ শুধু কাঠ, 

চামড়া নেই, ভেতরের মাংসগুলো 

খাঁ খাঁ করছে ।

হেমন্ত ঋতুর বিষাদ আঁকা, 

শরতের সুখ ,বুড়াছা দেবতার 

পুজো হয়েছিল কোনোদিন

হয়তো লেগে আছে মাঘ মাসের বলির দাগ

বনজামের হারানো রঙে এখন কেঁদে ওঠে

ভৃঙ্গরাজ, উদাল ঝোপের ছায়ায় ছায়ায়

সে ছিল এক বনভূমি, ফেনি থেকে মনু, 

শাকানের চুড়ো, এখন গাছ নয়,

 কাঠ শুধু কাঠ,চামড়া নেই, 

খাঁ খাঁ করছে মাংস, রক্তময় নিস্তব্ধতা


 .

বড়ো বড়ো সড়ক হচ্ছে আমাদের, 

পাহাড় ফেটে যাচ্ছে, কালচে ঝর্ণার ধারা

মসৃণ রাস্তায় এখন দ্রুত চলে যায় গাড়ি

আমার হাত থেকে হারিয়ে গেছে কবিতা

অশরীরী ছায়া নিয়ে মৃত বনে ঘুরে বেড়ায় 

গাছের শিশুরা, কোথায় গেল হাজার পাখি

আমি প্রতিদিন এই একটি লেখাই লিখছি

 গাছ কাটা হয়েছে, বৃষ্টি কমে গেছে

ঝড়ের নামকরণ হওয়ার পর হিসহিসে 

গলায় শহুরে লোকজন বলে ' চিয়ার্স '। 

এখন গাছগুলো আবার লাগিয়ে 

দিয়ে যান মাননীয় কর্তৃপক্ষ, 

রেইন ট্রি বড়ো হতে দীর্ঘ সময় লাগে ...

ততদিন  শুষ্ক  হাত, মরু হৃদয়, 

বিপুল কাতরতা, হয়তো আমৃত্যু ! 


পুনরায় এসেছে আশ্বিনের শেষ

গাড়ই ব্রত করে ফিরে যাচ্ছে বধূ,

কোলে কাঁখে নীরব মধ্যাহ্ন, 

খালি বাড়ি পূর্ণ হোক সন্তান সন্ততিতে, 

বৃষ্টি বৃষ্টি খেলা নামবে হয়তো 

কাল সকালে, অতসী ফুলে

ভরে যাবে পশ্চিমের পুকুরের ঘাট,

পায়েস পাতা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে 

মেয়েটি, গ্রীষ্মের গন্ধমাখা 

কালোজিরা চাল জোগাড় হয়েছে, 

আলো মরে আসছে, দিন চলে 

গেল...একটি দিন। 

উপবাস, আর দুর্বল শরীর 

ফেলে যায় ঋণ, অনুতাপে লবনাক্ত। 




আসাম আগরতলা জাতীয় সড়কে

এখন বাঁক কমে গেছে

সরল হতে হতে দ্রুত হচ্ছে গতি

কোথায় রহস্য ঘেরা এক পশলা অন্ধকার

আর ঋজু নাগার্জ্জুন গাছ?

ত্রিপুরার রাস্তা তবে কি হারিয়ে ফেলেছে

তার শরীরের মায়াবী ধার

বাঁক হারিয়ে গেলে অজানাও হারিয়ে যায়

অজ্ঞাত বাঁকেই সব মৌতাত

সংকীর্তনের মতো সহজ হয়ে যেও না তুমি

লোভ জাগিয়ে রেখো শ্মশানের ডোমের মতো

মৃত্যু এসে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে

বলে যাবো একাদশ বাঁকে আমি ছিলাম









লেখক পরিচিতি


চিরশ্রী দেবনাথের জন্ম ত্রিপুরার কৈলাসহরে , ১৯৭৯ এর ১২ ফেব্রুয়ারী।  বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার, মা মায়ারানি মজুমদার।  গণিতে স্নাতকোত্তর এবং শিক্ষিকা।ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির শুরু বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।  প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ নয়টি,  তিনটি উপন্যাস, দুটো ছোট গল্প সংকলন, একটি অণুগল্প সংকলন, কবিতা সংক্রান্ত যৌথ বই একটি । ‘ কীর্ণকাল ‘ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন যৌথভাবে আটবছর ধরে প্রকাশ করে চলেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন

 কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না। 

mobile phone : 9402143011
chirasree.debnath@gmail.com







এক গুচ্ছ কবিতা, চিরশ্রী দেবনাথ


চিরশ্রী দেবনাথ


দীন

….

ভালোবাসার মৃত্যু হয় না

তাই ভালোবাসা একটি নীরব সেতার

স্রোতহীন নদীর বুকে জেগে ওঠা অদ্ভুত

 মিনার

মিনারের ছায়ায় বাকি অর্ধেক জীবন

কেউ যদি বালি খুৃঁড়তে আসো

তবে তাকে জানতে চেয়ো না,  বুঝতে যেও না

আঙরাখা পুরনো হলে ওম হারিয়ে যায়

বাড়ি থেকে পথরেখা বিলুপ্ত হলে

সমাধির মতো হয়ে যায় উচ্ছলতা

দেহ থেকে ঝরে তমিস্রা , ভিক্ষুনীর মতো অপেক্ষা

উষ্ণতার হাত শীর্ণ হলে যেন আরো বেশি করে জড়িয়ে ধরি

এভাবেই রাখি যত্নে, মৌনতায় , স্তব্ধতায়





দর্শন

…..

 একটি মৃত্যু দেখেছিলাম

 বৃদ্ধ বলছিলেন 

আমাকে বাড়ির উঠোনে

তুলসী গাছের নিচে শুইয়ে দাও

প্রাচীন বাড়ি , দীর্ঘ দীর্ঘ গাছ

নাড়কেলের শিকড় ফাটিয়ে দিচ্ছে বসত ঘর

গভীর গহন গোধূলিবেলা

শীর্ণ বুক ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে

পরিবার  পরিজন , গরুর গোয়াল, পাখির বাসা

তিনি বলছেন মাটি আমাকে ধারণ করো

তারপর  সত্যিই চলে গেলেন

এই অদ্ভুত ছায়াপতনের আগাম বার্তা কি করে পেয়েছিলেন জানিনা

এতো শান্তির মৃত্যু আর কখনো দেখিনি






ঋতু

….


দহন মানেই গ্রীষ্ম নয়

অন্তরে বহতা নদী যদি ক্রমাগত উষ্ণ হতে থাকে

পলি জমতে জমতে ঘর ওঠে , খেত,  খামার

দুটো মানুষ আর তখন কাছে আসে না

মনে হয় অসহ্য গরমে ভেসে যাচ্ছে সব




গণতন্ত্র

…..


পাখির দোকানে বন্দি পাখি উড়িয়ে দিতে পারিনা


বিক্রির জন্যই জন্ম ওদের


মাংস কাটার দোকান থেকে

 পশুদের নিয়ে আসতে পারিনা


বিক্রির জন্যই জন্ম ওদের


অ্যাকোরিয়াম খ্যাত রঙিন মাছ

বাল্বের আলোয় ক্লান্ত সাঁতার

কাচের ঘরে আমিও তাকে দেখি  শুধু


গণতন্ত্রে প্রত্যেকটি পতাকাকে

সুনির্দিষ্ট দ্রোহে উড়তে দেখিনা 


তারপরও নখপ্রান্তে আঁচড় কাটে নীল কালি




রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে কবিতা


মঞ্চ

~~~

এ বছর রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে

যে ছেলে মেয়েরা বাদ পড়ে গেলো

নাচ গানের তালিকা থেকে,

তাদের কাছে বাটিকের উত্তরীয় মানে

আপশোস, হলুদ তিলকের বিষণ্ণতা,

অনেক বড়ো হয়ে একদিন কোনো

এক ক্ষয়াটে চাঁদের শামিয়ানার

নিচে শুধু ভুলে ভরা সেই মানুষদের

অনুষ্ঠান হবে, তাদের আঁচল থেকে,

চন্দনের ফোঁটা থেকে গড়িয়ে যাবে

কৈশোরের কয়েক দানা অশ্রু,

আজীবন রুদ্ধ থাকা দ্বারের

বালকোচিত আবেগ ...



#চিরশ্রীদেবনাথ





#পঁচিশেবৈশাখ@বৈদেহী


#চিরশ্রীদেবনাথ 


হ্যালো ! হ্যালো !  শোনা যাচ্ছে ?

মনে হয় নেট ডাউন। কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না। 

ওকে।

শুনতে হবে না।

 ভাবুন না হয় আমাকে ! 

অনুভব করুন, বিষে ও অমৃতে, 

নাগরিক কোলাহলে ও আদিবাসী গ্রামে। 

আমি এখন রক। 

আমি  এখন রহস্য হারিয়ে ফেলা মোড়কে মোরা দ্রিম দ্রিম। 

সমস্ত এশিয়া জুড়ে বইছে দাবদাহ !

হলদে শাড়ি পরে গ্রীষ্মকে প্রবল আহ্বান জানিয়েছিল

ললনারা। 

তাই এই দশা, এই কামনাদগ্ধ রূপ। 

মোট পঞ্চান্ন দিন বর্ষা আসেনি লাগাতর, 

শরীর থেকে যাপনের ছাল উঠে যাচ্ছে ক্রমাগত

হয়তো নতুন করে দেখতে পাবেন  একটি উদ্ভিন্ন 

সত্তাকে।

অতএব পেশ করে ফেলি অনুরোধ,

 নুনের দামও নির্ধারিত আজ প্রত্ন হরফে, 

বলছি যে একটা গান লিখতে হবে।

আপনার সব গান শেষ হয়ে গেছে, পড়ে আছে কঙ্কাল।

সুরকে বেঁধে রেখেছে যেন জমাট মেধা।

কিন্তু দিকে দিকে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি।

নতুন গান না হলে চলে বলুন? 

ঠিক তেমন একটি গান, যার

শব্দ খেয়ে ফেলেছে সুর,

সুরকে হজম করেছে প্রেম,

প্রেমকে দাহ করে নামছে বর্ষার জলধারা !


ওহো সার্ভার ডাউন, যোগাযোগ হচ্ছে না তাঁর সঙ্গে!

এদিকে সকাল গড়িয়ে যাচ্ছে গোধূলির রাঙাপথে...

 

কি করছো বৈদেহী? এখনও নতুন গান নামাতে

পারছো না?

মনে হচ্ছে আমি বাদ পড়ে যাবো?  তাই না স্যার?

হুম। আরো দুঘন্টা সময় দিচ্ছি, তারপর কী যেন

নাম ...ঐ যে নতুন মেয়েটা, এখনও যার খোলস

ছেঁড়া যায়নি।

ডোন্ট অ্যরি স্যার! আমার খোলসও অক্ষত।

একটু চেষ্টা করছি, ভাবতে দিন।

আহ্ কী হচ্ছে ঠাকুর? সাড়া দাও। অনুভব করো প্লিজ।

খোলস সহ কেমন? আমি আবার ওটার নিচেই

থাকতে ভালোবাসি। শ্যাওলার চাষ করি তো।

চোখ বন্ধ করে আছি।

ধুলোর কণা থেকে রশ্মি বেরুচ্ছে,  মাটির গান,

গুঞ্জরিত রূপময় বেদনা, মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে,

খুঁজে পাচ্ছি  নতুন কোনো বেদ, নিজস্ব স্পর্শ সমূহ। 

ইউরেকা ! 

এই তো পেয়েছি গান সবুজ অক্ষরে লেখা,  পান্না'র ক্ষত থেকে ঝরছে অশ্রুধারা ।

কিন্তু ...অসম্পূর্ণ!

দু ঘন্টা শেষ। 

কি বললেন স্যার? আমি বাদ পড়েছি!

তবে তাই হোক। আমি যে শেষ লাইন খুঁজে পাই না    কখনো ...কোনোদিন

 শাস্তি হোক আমার। 

ঠাকুর আর জ্বালাচ্ছি না আপনাকে।

 আপনি সমস্ত চিৎকার গিলে ফেলুন নীলকণ্ঠের মতো।

ঘুমিয়ে থাকুন কালপুরুষের বিছানায়। 

আর আমার খোঁজ চলতে থাকুক অনন্তের পথে ...










রবিপ্রণাম 

............


আমি ফিরে আসি প্রতিদিন তাঁর কাছে

যাবতীয় ভুল, অপমানসূত্রতা কাঁধে নিয়ে

সায়াহ্নে  রূপসাগরের জল ছুৃঁয়েছে ব্যর্থতা

যেন কিছু নয়, যেন কিছু নয়, যেন আকাশ আমার বিষয় নয়

রৌদ্র, শুষ্কপত্ররাজি ক্লান্ত বাতাস কোনটাই আমার ভাষ্য নয়

কোথাও জমছে খনি, জমছে বারুদ, তৈরি হচ্ছে বিরুদ্ধ প্রাচীর

আমি কি তবে লিখবো  বাতিল অসহায়তা

কোথা থেকে আনবো ঈশ্বর, চোখের জল, সুরাসুর সমাগম

এই যে লিখি অন্ধকারের সমাপতন

লিখতে লিখতে বার বার বদলে যাই

তোমাকে দেখি রবি... রবিকে দেখি

দীর্ঘ,  ঋষির মতো, বিনয়ের মতো, ঔদ্ধত্যের মতো

যেন রেখেছো হাত আমার সকল তুচ্ছতায়

তব প্রাণে মিশে যেতে যেতে ভাবি

অক্ষরে অক্ষরে ফুলশোভিত যুদ্ধক্ষেত্র, দৃপ্ত আলিঙ্গন, ঝড়ের জানালা সব রেখে গেছো

এখানেই দুটো ভাত বেড়ে খাই,

 একমুঠো বৃক্ষ জ্বলে, এক সহস্র জলে আমার ধৃষ্টতা মাথা নত করে রাখে।


#চিরশ্রী দেবনাথ


#########################


একা বিনোদিনী

......................


বিহারী, মহেন্দ্র কাহাকেও আশেপাশে /

দেখিতে পাইলাম না, তাহারা কেহই আমার নয়/


আমি একা বিনোদিণী/


সকালখানি দুইহাজার ষোল, /


প্রায় একশত ষোল বছর আগেকার বালি মেয়ে এই শ্রী/


ল্যাপটপ থেকে বেরোতে থাকে শুধু  নিখাদ মধ্যরাত /

বিষাদের মধু আমার শরীরে ফুটিয়ে দেয় /

রোজকার অবাধ ঘাসবন/

চারপাশে অশরীরী আমৃত্যু রবি/

কতবার প্ল্যাটচেটে ডেকেছি তোমায়/

ধূপের ধোঁয়া, ফুলসাজ, পাতা খোলা সঞ্চয়িতা /

কিশোরী মধ্যাহ্নের রবি বিলাস/

পেন্সিলের সরু আঁচড়ে অস্পষ্ট হয়ে যে নাম

লিখিয়ে যেতো আঙুল/

শিউরে ভাবি এ কি সত্যিই আমার রবি /


সব মূহূর্তে আমি শুধুই  বিনোদিনী/

বিরহস্বাদ কিছুতেই মেটে না /

প্রেম আমার বিলাসী শবগল্প, অহল্যা সময় ..../

কালো পাথুরে  মেয়ে /

ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায় তোমার শুস্ক খোয়াই/

গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে প্রবল পদাবলী হয়ে কেবলি

আমার জেগে থাকা, /

এতো সব অপূর্ণ হয়ে ভরে ওঠা রক্তের আনাচকানাচে/

তীব্র ভাবে তাকিয়ে থাকা এক জোড়া সমুদ্র../


শীর্ণ খসখসে আঙুলে আঁকতে থাকি ঝাউবন/

মাঝে মাঝে কেউ যেন বলে যেতে থাকে/

টপোলজির জটিল সূত্র প্রমাণ, মেলাতে চাই না আর .../


সাদা নোটবুকে তারা  এঁকে দিয়ে যাক /

অ্যামিবা বিভাজন, দুফোঁটা হাসনুহেনার বাতায়ন   /


আচ্ছন্ন ঘুমে অলিন্দ জুড়ে হাঁটতে থাকে

 ফ্যাকাশে বিনোদিনী  /

ঠোঁট কামড়ে থাকা কালবৈশাখীর গয়না মেয়ে ../


নাভি আর হৃদয়ের মাঝে যে জন্ম বেঁচে আছে

আমার সব স্নান সেখানেই ......

এ ঘোরের  মতো সুখ আর নাই রবিকবি ...../









#######



প্রিয় রবি, 

বহু কথা জমিয়া আছে। কোথা হইতে শুরু করিব বুঝিতে পারিতেছি না। ইত্যবসরে প্রকৃতির  কোন দোষ  নাই। সে সকল প্রকার ফুল প্রস্ফুটিত করিয়া, দিকবিদিক আমোদিত করিয়া আপনার জন্মদিবসের জন্য তাহাদের পরিপূর্ণ অর্ঘ্য সাজাইয়া বসিয়া আছে। বৈশাখ তাহার গর্ব অক্ষুণ্ণ রাখিয়া প্রায়শই বজ্র বিদ্যুৎ সহ বিরহকাতর প্রেমিকের ন্যায় ধরার বক্ষে আছড়াইয়া পড়িতেছে। কচি আম্র শাখা চ্যূত হইয়া গড়াগড়ি যাইতেছে। উহাকে তুলিয়া আনিয়া লবন সহযোগে খাইবার কথা মনে করিলেই অম্লস্বাদের কল্পনা করিয়া জিহ্বাগ্র অসুখ শেষে রুচি ফিরিয়া পাইতে আশা  করিতেছে। নিতান্তই নগন্য হইলেই    বলিয়া রাখি, এইক্ষণে বিদ্যুত চলিয়া গেছে। আমি সামান্য তরিৎআধান পুষ্ট মুঠোযন্ত্রটিকে  সম্বল করিয়া  একবিংশ শতকের একটি বৃষ্টিমুখর মধ্যাহ্নের ধারা বিবরণী লিখিতেছি যা আপনার সাধারণ মেয়েরা করিত। তাহাদের সুতোর কাজ করা  শাড়ির ফলসাবরণ অলস পারে লাগিয়া থাকিত পিতৃগৃহ ছাড়িয়া আসার এক দীর্ঘ বেদনা। পৃথিবীতে মহামারী চলিতেছে। আমি আপনাকে সঙ্গীতে স্মরণ করিতেছি। ইহাকেই সেই রবীন্দ্র সঙ্গীত  বলা হয়, যাহা আপনি তীব্র দাবদাহ ক্লান্ত বৈশাখী দুপুরে, উচ্ছসিত প্রনয়িনীর তীব্র অভিমানের মতো শ্রাবণ সন্ধ্যায়, নীলম্বরী শাড়ি পরিহিত অকাল বোধনে, হেমন্তের কামনা প্রিয় বৃদ্ধ জোৎস্নায়, শীতঋতুর ধুলো ধূসরিত পত্রবিতানে তেজবিহীন সূর্যালোকের অলস প্রত্যাগমনরত গোধূলিতে কিংবা বসন্তের শুষ্কতায় চরাচর প্লাবিত এক নিরন্তর অপেক্ষার কথা মনে করিয়া একান্তই আমার জন্য লিখিয়া ছিলেন। বহির্জগৎ হইতে একপ্রকার বিচ্ছেদ যখন আমাদিগের অন্তস্থলে সপ্তরঙ ঢালিয়া দেয়, তখনি নাকি প্রকৃত কবিতার জন্ম হয়, বিদ্বজ্জনে কহে আপনি পাশ্চাত্য কবি শেলির দ্বারা কোথাও কোথাও  প্রভাবিত। তাহার সমস্ত চিন্তাই আপনার মধ্যে পরিস্ফুট আর রঙের ওপর রঙ ঢালিয়া ক্রমশ সকল রেখাচিত্র বিলুপ্ত করিয়া অস্ফুট চিত্ররূপের আলোকময় বিস্তারের যে শিল্পরীতি শেলির মধ্যে ছিল আপনিও তাহার অনুসারী, এইসকল বিদগ্ধ অনুসরণকে অবলম্বন করিয়া আমার মনে হয় সকল প্রভাব,  প্রভাব বিস্তার করিতে সমর্থ হয় না, যাহা হয় তাহাই রবীন্দ্রনাথ নহে , বস্তুত এইসব তর্কাতর্কি পড়িতে ভালো লাগে, ইহা আমার সাধারণত্বকে আরোও তুচ্ছ করিয়া দেয়, তরুঘেরা গ্রাম হইতে উথ্থিত একাকী ধূমলেখার মতো আমার মনে হয়, পৃথিবীতে অহংকার শব্দটি বড়ই সরস ও কৌতুকময়। প্রকৃতপক্ষে আপনাকে আমার বলিবার কিছুই নাই, ইহা হলো নিতান্তই গল্প করিবার ছুতোমাত্র। যে গল্প করিবার জন্য দুজন প্রিয় মানুষের একটি আধার প্রয়োজন হয়, গল্প অমনি অশ্বথ্থ শাখার মতো ডালপালা বিস্তার করিয়া একটি আয়োজন গড়িয়া তোলে, ইহা অপেক্ষা সুখকর কিছু নাই। এই নিরন্তর অস্থিরতার মধ্যে একটি নিখাদ গল্প অবসর খুঁজিয়া লইতে মানুষের কত ছল করিতে হয় তাহাই মনে হইতেছে। মনে হইতেছে একটি কল্পিত ছায়ানুবাস খুঁজিয়া লইতে জগতের নারী পুরুষগন কাঞ্চনবর্ণ আগুন জ্বালাইয়া প্রমত্ত সন্ধ্যার অপেক্ষা করিতে করিতে মিশরীয় মমির মতো রাজকীয় হইয়া ওঠে, আর পৃথিবী বহিরঙ্গে স্খলিতকিংশুক সাথে উৎসবমুখরিত জনপদ রচনা করিতে মনপ্রাণ ঢালিয়া দেয়।  

আজ রাখিলাম এইখানেই , 

                                     ইতি চিরশ্রী। 


© চিরশ্রী দেবনাথ




###############




জিও রবি বিন্দাস্

 ................


এই রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন যেন কবে থেকে শুরু হয়? 


আরে শুরু হয়ে গেছে তো, পয়লা মে  থেকেই,  টিভিতে কিসব পক্ষ টক্ষ বলছিল 


নাইনথ  মে, নাইনথ মে, ওনার বার্থ ডে,  তার আগে ভ্যানতারা, তা না না না


সেদিন শাড়ি পরছি আমরা, তোরা?

গান গাইব   , আমি অঙ্কুশ, রেয়ন, সঞ্জনা, রেয়ন, মিঠিয়া 


ছেলেরা সব  সবুজ পাঞ্জাবি, 

রেয়নের গার্লফ্রেন্ড ওতে রবির কবিতা লিখেছে রে, হেব্বি ঘ্যাম ব্যাপার। 


সঞ্জনা কি গাইবি রে? ... রঞ্জনা আমি আর  আসব না !! 😄


ধ্যুস, ফোট্, এসব নয়, ক্ল্যাসিকেল বেইসড রবীন্দ্র সঙ্গীত, 

একটু কনটেম্পোরারি ভাব এনেছি ওতে, যা হিট করবে দেখিস


আমরা বলিব ওসাম, ওসাম, 


 এই শোন্,  কাল  গোলাপ আর রিমঝিমদের নাচ আছে না?


ওটাকে  নৃত্যনাট্য বলে রে গাধা।

 চিত্রাঙ্গদা। খুব ফেমাস। 

ঐ যে আমরা স্কুলে একবার করেছিলাম যে, সেটা।


মহাভারতের ক্যারেক্টার ট্যারেক্টার  নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 

মণিপুর ডিনেস্টির ব্যাপারস্যাপার ওতে  এড করেছিলেন। 

তবে শুনেছি মিক্সড করবে। আধা বেঙ্গলি আর আধা হিন্দি, ইংলিশেও কয়েকটা ভার্স করবে । না হলে নাকি ব্যাপারটা ঠিক জমে না।  নন্ বেঙ্গলী স্টুডেন্টস দের কথা ভেবে ...


সব শেষ হলে আমরা খাবো কিন্তু। নতুন রেস্টুরেন্ট খুলেছে না একটা, ওতে, ওখানে নাকি দারুণ দম বিরিয়ানি করে।


তিনটে বাটিকের টপ আনাচ্ছি রে, জিনসের ওপর পরার জন্য। 

সামান্য রাজস্থানি ফিউশন থাকছে ওগুলোতে। 

নববর্ষ,  লেখকটেখকদের  জন্মদিনে  ইদানিং পরলেই সবাই একটু টেরিয়ে তাকায়।


সঞ্জনা, চুলে ফুলের  মালা লাগাস,  নাহলে ব্যাপারটা ঠিক আসে না। 


রবীন্দ্রনাথ কিন্তু দারুণ দারুণ গান লিখেছেন রে, মাঝে মাঝে আমি ব্যান্ডের গানে মধ্যে সুরগুলো একটু আধটু ঝেঁপে দিই, একটা উদাস ভাব আসে ...বেশ লাগে 


ঠিক বলেছিস, তবে কবিতাগুলো একটু কেমন যেন, আই মিন, আসলে আমার তেমন পড়া হয়নি, ছোট্ট বেলায় শিখেছিলাম, তারপর তো বেঙ্গলি বাদ দিলাম 


ওনার নভেল পড়েছিস?


আরে সেদিন সিনেমায় দেখলাম তো, ইউটিউব থেকে।

ঋতুপর্ণের মৃত্যুদিনে ফেবুতে একজন লিঙ্ক দিয়েছিল, ওখান থেকে একটু দেখে, পরে পুরোটা দেখেছি 

চোখের বালি, ঋতুপর্ণ ঘোষ ডিরেক্টর, অ্যাশ্ কে যা ফাটাফাটি লাগছিল না, হোয়াইট শাড়িতে, ব্লাউজ ছাড়া 


সিনেমাটা দারুণ  কিন্তু 


রবীন্দ্রনাথ বেশ ব্রেভ রাইটার ছিলেন, ঠিক কিনা বল্?  


তা যা বলেছিস


ঐ দেখ তানিয়া যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছিস রে শেষ বিকেলে।


আরে তোরা ! রিহাসার্ল আছে রে, ড্রামা করবো, টেগোরের পয়েমের ওপর


কি নাম  পয়েমের?


বিদায় অভিশাপ,  কচ আর দেবযানী দুটো ক্যারেক্টার 


কি দেবযানী??


কচ ....    কচ 


দূর বাবা আমি ভাবলাম স্কচ্


তুই কি হয়েছিস ওতে


দেবযানীর পার্টে?


দুই একটা ডায়ালগ বল্ না, প্লিজ?


দাঁড়া শোনাচ্ছি,


"যেদিন প্রথম তুমি আসিলে হেথায়

কিশোর ব্রাহ্মণ, তরুণ অরুণ প্রায়

গৌরবর্ণ তনুখানি স্নিগ্ধদীপ্তি ঢালা,

পরিহিত পট্টবাস, অধরে নয়নে

প্রসন্ন সরল হাসি, হোথা পুষ্পবনে

দাঁড়ালে আসিয়া "


তনু মানে কি রে?


বডি বডি


অনেকগুলো শব্দের মানে বুঝলাম না, তবুও লাগল বেশ, বেস্ট অব লাক্ তানিয়া, কাল দেখতে যাবো, খুব একটা স্যাড স্যাড ব্যাপার আছে মনে হচ্ছে


আরে এটা তো সেপারেশনের পয়েম ই


মানে ডিভোর্স ইত্যাদি


দূর ওদের বিয়েই হয়নি


তাহলে? ব্রেক আপ্ বলছিস্? 


দেখিস গিয়ে কাল, অভিশাপ দেবো  আমি কচ কে , আর আমি কে জানিস?  দৈত্যগুরুর মেয়ে 


উনি ভালো আর্টিকল লিখতেন, সেদিন হোয়াটস্এপে কে যেন ঝেড়েছিল একটা অংশ  বই থেকে ছবি তুলে, 

পড়ে দেখলাম সত্যি কথাই বলছেন, সেকুলারিজম নিয়ে 

  

লোকটা স্যোশালিজম, সেকুলারিজম  নানান ফিলোসফি   নিয়ে খুব বলে গেছে 

পার্সোন্যালিটি টা দারুণ ছিল, আলখাল্লা টালখাল্লা, জাস্ট আলাদা সবার চাইতে ...


আরে জানিস 


কাল একটা ফানি জিনিস দেখলাম,   আমাদের কলেজে ঢোকার মুখে যে নাড়ুদার চায়ের দোকান, সে একটা কাগজ সেঁটেছে দেয়ালে,  লেখা,


"বাকি চাহিয়া লজ্জা দেবেন না "


      রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


© চিরশ্রী দেবনাথ


# আপশোস

আপশোস
.....

যারা মনসুন শেষে চেরাপুঞ্জি যাবে বলে ঠিক    
করেছিল,
তারা আজ শুকিয়ে গেছে, ছাতা দিয়ে দিয়েছে অন্য কাউকে
 ভেবেছিল, দাবদাহের পর মরুভূমি গেলে  কেমন হয়
এখন তাদের সান এলার্জি, চোখ বন্ধ করে রাখে আলোতে
অরণ্য দেখবে বলে, জঙ্গলের জুতো কিনেছিল
ঝর্ণায় হবে গতজন্মের অসমাপ্ত স্নান
এখন গোড়ালিতে ব্যথা, ঠান্ডায় কেঁপে ওঠে হাঁটু

তবু তারা জড়িয়ে ধরে পরস্পরকে    
দুটো ভয়ার্ত দেহের হাত কেটে যায় ঔষধের স্ট্রিপে
কোনোদিন সাবধানি ছিল না
কোনোদিন প্রেমিক ছিল না
....
তবুও পৃথিবী ডেকেছিল তাদের ঘুঘুডাকা ভোরে

#চিরশ্রীদেবনাথ

দেহাণু গুচ্ছ

দেহাণু গুচ্ছ ( প্রকাশিত, 'দৈনিক সংবাদ, ১৫/১০/২৩)

এক

দেবী আসছে, পথে জ্বেলে রাখো আলো, সশস্ত্র জওয়ান ! মা...ঢেকে রাখো বুক, পাহাড়ি কোমড়, 

পৃথিবীতে ভয়, ছিঁড়ে ফেলে শরীর, চারদিকে শুধু মেয়েদের শরীর, আমাদের লেখায় তারা মেধাবী উষ্ণ! 

দেবীকন্যারা কামদুনি, মণিপুর হয়ে এসো, ওদের বারান্দায় বসে পুজো নিও, বেলপাতা, যজ্ঞের ধোঁয়া, রক্ত মাখা ফুল নিয়ে পায়ে পায়ে এসো, এখানে এখন পুজোর আয়োজন, চন্দন ধূপ...

#####

দুই

যুদ্ধ ছেড়ে চলে যাওয়া পরাজিত সৈনিক সুন্দর! 

গৃহমুখী প্রাণ, দরজায় মায়ের অপেক্ষা হলুদ 

সম্বরার ঘ্রাণ

 নারীর কোলে মাথা রাখবে সে যুবক পুন্য হীন, 

ফিরে এসেছে যেন অচেনা হাওয়া কিংশুকের

 শব নিয়ে উদাস বসন্তে, 

তারপর,  কবিয়াল হৃদয় খুলে দাহ দেখাও, দেখো এই আবাহন, বাঁশের বনে কেন নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে শান্ত চোখের ডাহুক ! 

#######

তিন

ধান কাটার পর যে মাঠ পড়ে থাকে তার কাছে গিয়েছি

জলে ভেজা দুর্বল মেরুদণ্ড, হাতের পাতায় মগ্ন ভোর

আমার পায়ের শব্দে ঘুম থেকে উঠেছে মাটির কীট, 

চোরা ঘাসে কেটেছে পা, নির্জন সূর্যের ছেঁড়া আলো

হেঁটে যেতে যেতে শরীর থেকে ঝরে গেছে আবরণ

দীর্ঘতম মাঠ, জলশূন্য চোখে উপল মাছের কোলাহল, পৃথিবী দ্বিধা হতে গিয়ে হয়ে গিয়েছে আমার মতো, সোনালি ঘরে রাখা ভেজা ধান,  পচন ধরেছে এইমাত্র

########

চার

কুয়াশা নামেনি এখনও, বর্ষার দুখি ধারা চরাচরে

আনাজের নরম শিকড় গলে গেছে, নষ্ট হয়েছে ফসল

পুজো যেন অভিঘাত, ভয়ঙ্কর নদীস্রোত, কান্না। 

কিশোরীর দু বেণি বেয়ে সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত

এই সুখ মৃত্তিকার মতো, মুঠো থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে গাছ, এসো পাখি, সবুজ তাপে পুড়ে যাক স্মৃতিস্মারক 

#########

পাঁচ

হলুদ সর্ষের খেত নেই, জলে ভরা শস্যহীন মাঠ

আগাছা আর বেগুনি ফুলের ঝোপ, গোধূলির

আসনে ম্লান ফুলের দল, অসুস্থ মানুষের চোখে তবু

ভিড় করে আসে উৎসবের হারানো দিন, পায়ে পায়ে জড়িয়ে আছে এই দংশন, শ্যামাপোকা, কোজাগরীর মোহ, নিবেদন করি মাঝে মাঝে, কোথায় লোভহীন দেবতার থান, উজ্জ্বল রশ্মি দিও, চোখ ছিন্ন করে চলে যাবে ভেতরে, অনেক নিচে হাওয়ার মতো শোক, মৃদু সুখ ...

######

ছয় 

 

ভালোবাসি বলে, করতলে তিল হরিতকী, শুশ্রূষা

মৃত্যুশোক ভুলে যেতে চাই তাই তর্পণ মানি না

বাসক গাছের পাতা তুলে আনি, নীলকণ্ঠের মধুবিষ

পাত্র ভরে রাখা অদৃশ্য ধোঁয়া, চোখ জ্বালা করা। 

যখন অবিশ্বাস করি এই মোহকান্তার, কন্ঠে ঢালি 

নেশার মতন, দেখি ঘুঘু ডেকে যাচ্ছে চরাচরে,

রোপিত হচ্ছে যেন শুধু কালো দ্রাক্ষার বীজ ...

#চিরশ্রীদেবনাথ

এক গুচ্ছ কবিতা

চিরশ্রী দেবনাথ 


বেগুনি ফুলের ঝোপ 


এক

যে  কবিতা হয়নি লেখা 
সে আমাকে আসলে ছেড়ে যায়নি
যে পথে বারুদ জ্বলেছে,
 তাতে এখন ছায়া সুনিবিড় গাছ    
মৃতদেহের দাগ সরিয়ে আলোর আলপনা
যে গান গাওনি  তুমি
আমি আজ সেই গান  শুনছি


দুই

ভোরের পাখির ডাক বহুদিন শুনিনি
তখন আমি ঘুমোই    
ঘুম থেকে উঠে দেখি চারপাশে পড়ে আছে
নীড় ছাড়ার আগের ব্যস্ততা
সেসব মাড়িয়ে যেতে যেতে
আমার ভেতরে জেগে ওঠে অরণ্যের হাতছানি



তিন

পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে দেখলাম
আলো নেমে যাচ্ছে খাদের ভেতরে    
উন্মুখ অন্ধকারও তাহলে এতো আকুল 
আমাকে অগ্রাহ্য করেছে খাদের উজ্জ্বল চোখ
আচ্ছন্ন হয়ে আমি দেখছি তোমাদের পবিত্র রূপ 




চার

তাহলে বলো, 
দুজনে মিলেই বসন্ত দেখছি এবারো
যাওয়া আসার পথে কিছু পলাশ আর রুক্ষতা
অনেকটা তুমি যখন রেগে যাও তেমনি
একসঙ্গে দেখা বলতে ঠিক পাশাপাশি নয়
 দূর থেকে দূরে গিয়ে
বৃষ্টিছেঁচা জলের মতো তীক্ষ্ণ সুর
পরস্পরের ব্যথাকে উন্মুখ রাখে শুধু...


পাঁচ

একটি প্রতিবাদী কবিতা আশা করি আপনার কাছে! 
অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছি, 
তখন আমি বিরহের  মুডে, 
 প্রতিবাদ অথবা জনারণ্য, ঝাপসা হয়ে আসে 
যে কিংখাবের বসনে জড়িয়েছি নিজেকে,
বাহুল্য মনে করে তুমি সরে যাচ্ছো ক্রমাগত ...     


ইরাবতী উৎসব সংখ্যার কবিতা

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=pfbid034uJjb5VBamangGkd9ZP87jFsjXhk4BCXe7bfkJK9RG2zRW1aY5RZgJe3FcBbjLTYl&id=100004448500586

হিম

হিম
.....

আমার কবিতার পাঠক খুব কম
আমি চাই দিনে দিনে তা আরো কম হোক
কমতে
কমতে
কমতে
একদম শূন্য হোক
তখন নতুন কিছু ভাবব, আগে যা দেখিনি চোখে
 হাতের মধ্যে রাখব আগুন
পোড়াব
ছাই
উড়াব
এই ... এইমাত্র

কবিতার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে শুধু দুর্মূল্য ঔষধের 

কবির  উদ্দেশ্য  'বেঁচে থাকা '
 মৃত্যুর পর আবারও  'বেঁচে ওঠা  '

যেন সওদাগর 
 শুধু মথিত লোভ আর বিষাক্ত হিম

#চিরশ্রীদেবনাথ

সাংগ্রিলা

দ্য লস্ট হরাইজন
...........................

এভাবে যেতে যেতে একদিন 'সাংগ্রিলা ' যাওয়া যাবে, ওখানে জরা নেই, মৃত্যু নেই, অবারিত সুখপ্রান্তর, কিশোর ভগবানেরা খেলতে গিয়েছিল সেখানে, ফেরেনি,  আটকে গেছে তারুণ্যে ভেজা ফানুসগুলো চকিত  অরণ্যের গ্রিন হাউসে,  জরা আর অবারিত সুখপ্রান্তর এ আমার কামনা নেই, ঐসব নিষেধের ভরা জমিনে লাল ফলের জন্ম হয়, চমরি গাভীর পশম সোনালি চাহিদা হয়ে পাথরে পাথরে ঘুরে বেড়ায়, সৌম্যদর্শন এক তিব্বতি পুরুষ আছে, পৃথিবীর পোশাক তার গায়ে, তাকে ছুঁতে গেলে পৃথিবী থেকে দলছুট হতে হবে, একতারা হাতে নিতে হবে, দুধর্ষ পাগলামো, তবেই টুক করে পৃথিবীর পোশাক খুলে যাবে, এমনকি মহাসাগরের পর মহাসাগর রাশ রাশ ঢেউ নিয়ে যার যার মাটি চিনে নেবে, আমি তখন তার চেরা বুকে ঢুকবো, সব সীমারেখা মুছে টুছে গম্ভীর পাহাড়, অহংকারী গোবি, আমি ভেতরে, হারিয়ে গেছি সাংগ্রিলায় , অসুখ কিংবা সুখ নয় একটু হাঁটার ইচ্ছে সীমারেখা ছাড়িয়ে।

@ চিরশ্রী দেবনাথ

সমুদ্র গৃহ

সমুদ্র গৃহ 
...............

একজন বড়লোকের মেয়ে একজন গরিবের ছেলেকে ভালোবাসলো 

অতঃপর গাছে গাছে ফুল ও ফল 
একটি নিবিষ্ট বৈশাখে রেজিষ্টিও সমাপ্ত 

আকাশ থেকে আসন্ন বর্ষার আরক্ত জলধারা তাদের ভিজিয়ে দিলো খোলা রাস্তায়

মেয়েটি ছেলেটির বাড়ি এলো

তিনখানা ঘর, খোলা বারান্দা,

 একটি লেবু গাছ ও পাশের বাড়ির কাঠ গোলাপ গাছের ফুলে ছাওয়া অবাধ্য ডাল

সবকিছু মিলিয়ে মেয়েটি অপেক্ষা করতে লাগলো নির্জনতার 

অবশেষে রাত , মাঝখানের ঘর, তিনখানা দরজা , সারা রাত অন্যদের আসা যাওয়া।

রাগ, চলতে থাকা অভিমান ! 

গরিব ছেলেটি হয়তো এই দুরন্ত সমস্যাটির আশু সমাধান নিশ্চয়ই করবে

কিন্তু খুব বেশি  দেরি হওয়ার আগে

 এইসব  ভালোবাসা প্রবণ দম্পতিরা  
 পৃথিবীর কাছ থেকে কি একটি নির্জন সমুদ্রগৃহ উপহার পেতে পারে না !

( প্রকাশিত)