আত্মকথন, চিরশ্রী দেবনাথ

১২:৩৭ PM চিরশ্রী দেবনাথ 0 Comments

আত্মকথন

 চিরশ্রী দেবনাথ


 অকবিতায় বিশ্বাস করি। অকবিতা কবিতার প্রাণবিন্দু, স্বার্থহীন প্রেম।  অকবিতার নগ্ন ডানায় ভর করে আমার নিঃসঙ্গ ভ্রমণকে আমি প্রণাম করি।

কৈলাসহরে জন্ম। বাবা  রাধাগোবিন্দ মজুমদার দিনরাত লেখালেখি বইপত্রে ডুবে থাকতেন। অধ্যাপক মহাশয়ের দীন ঘরে সমস্তদিন ছাত্রছাত্রীদের ভিড় । সংস্কৃত সাহিত্য , নাটক , বেদ বেদান্ত গীতা উপনিষদ আর দর্শনের  অবিরাম চর্চা সেখানে। সেজন্যই বোধহয় অকালপক্ক অনুভবের একটি অবৈধ অনুপ্রবেশ আমার ভেতরে ঘটে গিয়েছিল। 

দুষ্মন্ত, শকুন্তলা আর দুর্ব্বাশা মুণির নিরন্তর আনাগোনা সেখানে। 

মনুনদীর চোরা ঘুর্ণির মতো এই  ফাঁদ আমাকে শেষপর্যন্ত লেখালেখির জগতে টেনে এনেছে।

 আমি  বাবুর ছোট মেয়ে পড়ার বইয়ের চাইতে  গল্পের বই  অনেক বেশি  পড়ি। কলেজ লাইব্রেরি আর শহরের পাবলিক লাইব্রেরি থেকে প্রচুর বইয়ের নিয়মিত জোগান পেতাম। তবে কবিতা বলতে তখনও রবীন্দ্র নজরুল সুকান্ত আর ইস্কুলের পাঠ্যবই।

দৈনিক সংবাদের ছোটদের পাতায় গল্পও লিখে

ফেলতাম মাঝে মধ্যে । মনের মধ্যে তখন থেকেই অমসৃণ দুর্বিনীত কথাবার্তার ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বাসা বেঁধেছে অজান্তে ।



সেইসময় হেমন্ত ঋতু মানে দীর্ঘ আর গভীর এক শীতকালের সূচনা মাত্র । মফসসল শহরের শান্ত সন্ধ্যায়  চরাচর ঢেকে যেত কুয়াশায়। 

সন্ধ্যাবাতির কাঁসর আর উলুধ্বনিতে পাড়ার এই বাড়ি ও বাড়ি মুখর হয়ে উঠত। সাইকেল চালিয়ে বিরহকাতর যুবকেরা মহম্মদ রফির দু কলি গান গেয়ে বাড়ির পথে যাচ্ছে। নেশাগ্রস্ত  রিক্সাওয়ালারাও  জোড়সে এবং সুরেলা গলায় গান গাইত “ দেখা এক খোয়াব তো, ইয়ে সিলসিলা হুয়ে “

গ্যাসের সিলিন্ডার তখনো হানা দেয়নি আমাদের বাঁশের বেড়ার রান্নাঘরে। রাতের বেলা শ্রীমতি মায়ারানি মজুমদার ,বরিশাল কন্যা এবং আমার মা ভাত রান্না করছেন। উনুনে ঠেলে দিচ্ছেন শুকনো লাকড়ির টুকরো। গনগনিয়ে উঠছে আগুন। আমি  স্কুলে পড়ি,  রান্নাঘরেই চাটাই পেতে মার পাশে বসেই পড়ছি।

বহুদিন পর হলেও এই লাইনটি এখনও ভুলি না।

মাকে বলেছিলাম , “আগুনের পাশে তোমাকে আগুনগাছের মতো লাগছে মা” । এইরকম একটি নিভন্ত আগুন বুকের পাশে সবসময়ই জ্বলে রইল। কখনও নিভে যায়, মৃত গাছ ঠেলে দিই। সামান্য দাউ দাউ করে ওঠে ।



১৯৯৭ ,কলেজজীবন শুরু হলো করিমগঞ্জে ( বর্তমান নাম শ্রীভূমি)  । করিমগঞ্জ কলেজে এসে বন্ধুদের সঙ্গে দেয়াল পত্রিকার মাধ্যমে অপরিনত উচ্ছ্বাসকেই বলতাম কবিতা। সেখানেই পরিচয় হয় প্রাণজয় সিনহা  এবং অমিত দেব পুরকায়স্থের সঙ্গে। আমি ম্যাথমেটিক্সে অনার্স নিয়েছি। প্রাণজয় কেমিস্ট্রিতে আর অমিত পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছিল। ফিজিস্ক অনার্স। আর এক বন্ধু সমীর। তেলিয়ামুড়ার। সেও ছিল ফিজিস্কের। আমরা সাহিত্যচর্চা ভালোবাসতাম । প্রাণজয় তখন থেকেই ভালো কবি , তার খাতা ভর্তি কঠিন কঠিন প্রাজ্ঞ কবিতা । অমিত , কলকাতা থেকে এসেছে, সেই  আমাদের মধ্যে তখনো একমাত্র,  যে জয় গোস্বামীর “ যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল “ পড়েছে  এবং এর একটি জেরক্স কপি সে আমাদের  দিয়েছিল। টুয়েলভে পড়ার সময় আমি জয় গোস্বামীর উপন্যাস  “ সেইসব শেয়ালেরা “ পড়েছিলাম। কবিতা শুধু রেডিওতে ব্রততী বন্দোপাধ্যায়ের গলায় “বেণিমাধব “ শুনেছি। 

 সেইসব শেয়ালেরা আমাকে একটা ঘোরে ফেলেছিল আর যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল সেটা ছিল সত্যিই বেশ ঘোর বাদলদিন । জয় গোস্বামীর  কবিতার সঙ্গে এর মাধ্যমেই আমার  পরিচয় ঘটল নিবিড়ভাবে । তারপর থেকে কখনও তার কবিতায় ভিজেছি কখনও ভালো লাগেনি , আবার ফিরে ফিরে জয় গোস্বামীর কবিতা পড়ি । পরবর্তীতে এবং এখনো জয় গোস্বামীর  “গোঁসাইবাগান” প্রথম দুই খণ্ড” আমার কাছে অভিধানের মতো ।

 বহু কবিতা পড়া ছেলে অমিত । অকাতরে জ্ঞান দিত কবিতা নিয়ে। জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, শক্তি,  সুনীল,  সুভাষ,  মন্দাক্রান্তা  সবার কবিতা আস্তে আস্তে পড়ছি। ভাবছি পৃথিবীতে গল্প ছাড়াও কবিতা ছিল, যার শরীরে সৌন্দর্যের লোভনীয় খনি।

সেসময় অমিত আমাকে রাজাদা বলে একজনের কয়েকটি কবিতা পড়ায়। অনেকেই হয়তো চিনবেন রাজাদা হলো কবি সপ্তর্ষি বিশ্বাস । করিমগঞ্জেই তার পূর্ব বাড়ি ছিল এবং অমিতদের হয়তো বা পারিবারিক বন্ধু । আমি ওনার কিছু কিছু পংক্তি বার বার পড়তে থাকি। এই বুঝি কবিতা !!!

“ আমার একটি জাহাজ আছে বন্দর নেই

সঠিক বসতি নেই,  মুঠোভর্তি অযুত ঠিকানা “.

…সপ্তর্ষি বিশ্বাস ( রাজাদা)

এই দুটো লাইন কেন জানি এখনো স্মৃতিতে রয়ে গেছে। 

তবে কলেজ দেয়াল পত্রিকা পুনর্জ্জীবনের ক্ষীণ প্রচেষ্টা ও ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটি সাহিত্যপত্রিকা বের করার মাধ্যমেই আমার  কলেজস্তরের কবিজীবনের প্রাথমিক সমাপ্তি। বস্তুত অনার্সের অঙ্কের প্রভূত চাপ আর আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের  সেমিস্টার পদ্ধতির শুরুয়াৎ  আমাকে আর মাথা তুলতে দেয়নি। নিবিড় ও নীরস অসংখ্য সমীকরণের জালে আমি আটকা পড়ে যাই। 

 


২০০২ , শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ টিলায় ম্যাথস্ ডিপার্টমেন্ট । আর তার ঠিক নিচের টিলায় বাংলা ডিপার্টমেন্ট । ডঃ  তপোধীর ভট্টাচার্য তখন ভাষাতত্ত্ব বিভাগ ( linguistic Department )এর প্রধান ।

ইউনিভার্সিটি উইকে ওনার ভাষণ শোনার পর থেকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ওনার একটি ভাষণও মিস করিনি তা যে বিষয়ের ওপরই হোক না কেন। মাঝে মাঝে পেছনে বসে বাংলা ডিপার্টমেন্টে ক্লাশ করি , যা লেকচার চলছে তাই শুনি। লাস্ট বেঞ্চে বসে থাকলে স্যাররা তত লক্ষ্যও করেন না। আর করলেই বা কি।  আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অংক বইয়ের পাশাশাশি একটি করে বাংলা উপন্যাস আনি। দুটো বইই কেবলমাত্র নেওয়ার পারমিশন ছিল।  তখনো তো মোবাইল আসেনি আমাদের জীবনে, গল্পের বইই প্রধান আশ্রয় ছিল, দুপুরের দিকে ক্লাশ থাকলে সকালেই লাইব্রেরি চলে আসতাম , টুক করে একটা বাংলা গল্প বা উপন্যাস নিয়ে গণিত সেকশনে চলে যেতাম। কিছুক্ষণ চলত এম এস সির জন্য পড়া, সেমিনার টপিক বানানো তারপর গল্পের বই আর অজস্র ম্যাগাজিন ।  আমি দীর্ঘদিন দেবেশ রায় গল্প সমগ্র লাইব্রেরিতে বসে বসে পড়েছি।

উষশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো। বাংলা নিয়ে পড়ছে। আইরংমারার মেস বাড়ির রুমের দেয়ালে  কবিতার লাইন লিখে লিখে রাখে । উষষী ছিল ব্ল্যাক বিউটি । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে আমার প্রথম ভালোলাগা মানুষ যে বাংলা  কবিতার মাধ্যমে আমার কাছে এসেছিল। 

 বন্ধুত্বের পরিসর বাড়ল । ঠিক হলো হিজল নামে দেয়াল পত্রিকা বের করবো। শুধু বাংলা লেখাই থাকবে তাতে। 

আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের মুখেই ভাষা শহিদ বেদী । বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল এই মাটির সন্তানেরা।

ঊনিশে মে ভাষা শহিদ দিবসে শহিদ বেদিতে মাল্যদান ,  নাটক এবং ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে মৌন মিছিল শেষে প্রথম উন্মোচিত হলো ‘হিজল ‘ ।

 যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস, সমাজ সচেতনতা ইত্যাদি নিয়ে পাথরের মতো ভারী ভারী কবিতা লিখে হিজলের কাগজ আমিও কয়েকবার অলঙ্কৃত করেছি। সহসম্পাদকও হলাম তারপর। 

পৃথিবীর বুকে তখন তালিবান সন্ত্রাস। আফগানিস্থানে বানিয়ান বুদ্ধমূর্তি টুকরো টুকরো হয়েছে। এগারোই সেপ্টেম্বর নিউহয়র্কের টুইন টাওয়ার গুঁড়ো হয়েছে। ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ হয়েছে।

 বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর জুড়ে একদিন শান্তি মিছিল হলো।

ইউনিভার্সিটি উইকে রিসাইটেশন কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করলাম। আমি বাচিক শিল্পী নই ।অসুন্দর কন্ঠ। বহু ছেলেমেয়েরাই দারুণ সুন্দর পারফরমেন্স করল।

তখন আমার ধারণা ছিল কবিতাকে যত লম্বা করে লেখা যায় ততই নিজের জ্ঞান জাহির করা যায়। আমিও “ আফগানিস্তানের মেয়েরা “ এই শিরোনামে দীর্ঘ একটি কবিতা লিখলাম ।সেখানে সাম্প্রতিক বিশ্বের সব সমস্যাই তুলে ধরার ব্যাপক চেষ্টা করলাম। ভাষার গাম্ভীর্যে আর ঘটনার ঘনঘটায় আক্রান্ত সেই কবিতাই  রিসাইটেশন কম্পিটিশনে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে আবৃত্তি করলাম।

তখন লেখকরা বেশ স্বাধীন ছিলেন। ভেবে লিখতে হতো না কিছু।

চটপট বেশ হাততালি পড়ল। আমি তৃতীয় হলাম। 

সাহিত্যচর্চা মানেই যোগাযোগ। সহিত চর্চার ধারাবাহিকতা। তাই কয়েকদিনের মধ্যেই তখন শিলচর ও করিমগঞ্জের দু তিনটি লিটল ম্যাগে আমার অতি দুর্বল কিছু লেখা কবিতা নাম নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। কোনো এক কবিতা অনুরাগীর কল্যানে শিলচরের গান্ধীবাগে একটি কবিসম্মেলনে আমন্ত্রণপত্রও পেয়েছিলাম। যদিও জীবনের সেই প্রথম কবিসম্মেলনের মেদুর আমন্ত্রণে আমি যাইনি। 

চোখের পলকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে গেলো। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়কালীন কবিতাচর্চায় ইতি টানলাম।




তারপর কবিতাযাপন থেকে সুদীর্ঘতম বিরতি । কর্মলাভের প্রচেষ্টা, সাংসারিক জীবনে প্রবেশ,  সন্তানলাভ ইত্যাদি নিয়ে বহুদিন কেটে গেল।

 লেখালেখির জগতে ক্ষীণ একটি প্রবেশ ঘটল, পদ্য নয় গদ্য দিয়ে,  ২০০৯ সালে ত্রিপুরা তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প প্রতিযোগিতায় একটি গল্প প্রেরণ এবং প্রথম পুরস্কার লাভ । 

আমার শাশুড়ি মা সুনীতি দেবনাথ লেখালেখির সঙ্গে আজন্মকাল জড়িত। আর ধর্মনগরের একটি সুপ্রাচীন সাহিত্যপত্র হলো ‘ অনার্য ‘ ।

কিছুদিন বন্ধ থাকার পর কবিতা উপত্যকার কবিতাপ্রেমীরা সিদ্ধান্ত নেন আবার নিয়মিতভাবে

প্রকাশ করার। সেইসময় শ্রদ্ধেয় কবি রসরাজ নাথ,  রত্নময় দে,  সুজিত দেব এবং সেলিম মুস্তাফা সবার সঙ্গে পরিচিত হই। তারা সবাই আমাদের বাসায় নিয়মিত আসতেন,  কবিতাচর্চা হতো।  সেইসূত্রেই অনার্য পত্রিকায় আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। সেলিম মুস্তাফার নিজস্ব পত্রিকা “ পাখি সব করে রব “ এবং রত্নময় দে’ র “ঢিল “ পত্রিকা ও সুজিত দেবের “ অন্যধারা  “ পত্রিকায় আমি আস্তে আস্তে লিখতে শুরু করি। তখন সময়টা ২০১২–১৩,

২০১৪ সালে আমার স্বামী অরূপ আমাকে একটি স্মার্টফোন কিনে দেয়। এজন্য  আমি আজীবন কৃতজ্ঞ । পরবর্তীতে আরোও দুটো , যতবারই মোবাইল নষ্ট হয়েছে। তাই অরূপের এই সাহায্যটুকুছাড়া হয়তো আমার লেখক জীবনের শুরুই হতো না। 

 ফেসবুকে এলাম। ইভার নোট ,  গুগল ডক ইত্যাদি ডাউনলোড করলাম। তখন ফেসবুকে দিনের শেষে একটি লেখা পোস্ট করা ছিল আমার প্রতিদিনের কাজ। কবি সেলিম মুস্তাফা ফেসবুকে “ পাখি সব করে রবে “র একটি পেজ খুলেছিলেন। সেখানে কবিতা লিখতাম । সেইসব ধর্ষণ বিরোধী , নারীজাতির উন্নয়নপ্রকল্পে লেখা কবিতাগুলো কে পড়ত আমি জানিনা। তবে সেখানে একদিন একটি কমেন্ট পেলাম। আমার কবিতাজীবনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমেন্ট। কবি সমরজিৎ সিংহ বললেন , বক্তৃতার মতো লিখেন কেন?

আমি তখনও কবি সমরজিৎ সিংহকে চিনিনা। 

ফেসবুকে চিনলাম। ।

সেসময় ফেসবুক থেকেই চিনলাম কবি শ্বেতা চক্রবর্তীকে। জীবনের সেই পর্যায়ে শ্বেতা চক্রবর্তীর কবিতা আমাকে অত্যন্ত প্রভাবিত করেছিল। পেলাম “ মিলন সাগর “ বাংলা কবিতার আর্কাইভ এবং খুব অল্পদিনের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বহু কবির লেখা পড়ার সুযোগ । এখন সেই আর্কাইভে আমার কিছু কবিতাও স্থান পেয়েছে  ।

দেবারতি মিত্রের কবিতা পড়ে উপলব্ধি হলো নিজের দীনতার। 

 “পাখি সব করে রব” এর ফেসবুক পেজে গৌহাটি থেকে  সাংবাদিক ও কবিতাবোদ্ধা বাসব রায় মাঝে মাঝে আমার এক দুটি লেখায় মন্তব্য করতেন এবং তিনি বেশ কয়েকবার আমার কবিতা আসামের কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য নিয়েছিলেন। লেখালেখি শুরু করার সেই লগ্নে আমার জন্য এসব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 

বলতে গেলে তখন থেকেই ধীরে ধীরে কবিতাকে জড়িয়ে ধরি প্রাণপনে।

ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় ছিলেন  আইনবিদ শুভেন্দু ঘোষ। ওনার আগ্রহেই ২০১৬ তে আমার প্রথম বই “জলবিকেলে মেঘের ছায়া”

প্রকাশিত হয়। শ্রদ্ধেয় কবি নকুল রায় বইটি সম্পাদনা করে দেন। তখন কেউ কেউ বলেছিলেন কবিতার বইয়ের আবার সম্পাদনা কি। বই বের করা বা প্রকাশনা জগত সম্বন্ধে আমার কোনো ধারনা ছিল না। সেইসময় কেবল শুভেন্দু ঘোষ দাদার আগ্রহেই চিলড্রেনস পার্কে  আগরতলা বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন স্টলে খুব সম্ভবত ১৪ ই ফেব্রুয়ারি আমার বইটি প্রকাশিত হয়েছিল,  শুভেন্দু ঘোষদাদাই বইটির মোড়ক উন্মোচিত হয়েছিল। সেই সন্ধ্যায়  সেখানে ত্রিপুরার অনেক কবি সাহিত্যিকই ছিলেন যাদেরকে এতোদিন  শুধু ফেসবুকেই চিনতাম। তবে অনেক বই উপহার দিয়েছিলাম সেদিন, কবি শঙ্খ সেনগুপ্ত আমাকে তখন বলেছিলেন এইভাবে বই উপহার দিলে বইয়ের অমর্যাদা হয়। এই কথাটি  আজও মনে রাখি। তিনি আরও বলেছিলেন “জল বিকেলে মেঘের ছায়া” বইটির কবিতগুলোর সিলেকশন ভালো হয়নি। বইটির প্রচুর কপি এখনও আমার কাছে আছে। এই বইটির একটিমাত্র  কবিতা  ভালো লেখা বলে আমার মনে হয় ।

লেখাটি হলো


“এক হেমন্তসকালে

......

পৃথিবীর শেষতম স্টেশনে জ্বলে উঠে মাঝরাতে

স্বচ্ছ এক আলো, ধূসর এক স্টেশনমাস্টার কুয়াশাপাত্রে জমা করতে থাকে অতি সূক্ষ্ম জীবন্ত মেঘকণা,তারা আসলে সব মানুষ ঘুমিয়ে গেলে তার গহন থেকে বেরিয়ে আসা কষ্টগুলো, একটি কষ্টের গায়েও লেগে নেই  ময়লা, কী ভীষণ নরম প্রতিটি কষ্টবিন্দু, সার সার কুয়াশাপাত্র জমা হচ্ছে থেমে থাকা একটি ট্রেনের কামরায়, দূরতম কোনো  বর্তমানে রোবটেরা যখন ভালবাসা জাগানোর জন্য খেয়ে নেবে একচামচ অক্সিটসিন, তখন  এক হেমন্তসকালে সব কুয়াশাপাত্রের ঢাকনা খুলে যাবে, পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশুদ্ধ কষ্টবিন্দু আর তাকে জড়িয়ে থাকা  ভালবাসা স্পেকট্রাম …”


জানুয়ারি দুই হাজার ষোলতে, কবি শ্যামলেন্দু মজুমদার কলকাতা লিটিল ম্যাগ মেলায় প্রকাশিত  "রাত্রির কোরাস "এই লিটিল ম্যাগাজিনটিতে  চারটি কবিতা প্রকাশ করেছিলেন।  এটাই ছিল কলকাতার কোনো পত্রিকায় প্রথম কবিতা প্রকাশ। এছাড়া মধূসূদন দরিপা দাদা কর্তৃক প্রকাশিত আর্ষ পত্রিকার সঙ্গে তখনই আমার যোগাযোগ হয়, এখন পর্যন্ত আর্ষ পত্রিকা আমার প্রিয় একটি সাহিত্য পত্রিকা। 

 ঔপন্যাসিক শ্যামল বৈদ্য আগরতলার পূর্বমেঘ সাহিত্যপত্রিকার জন্য আমার কাছ থেকে একটি কবিতা নেন। উত্তর ত্রিপুরার বাইরে ত্রিপুরার অন্য জায়গার সাহিত্য পত্রিকায় সেই ছিল আমার প্রথম কবিতা প্রকাশ।

ফোটা মাটির সম্পাদক খোকন সাহা তার ফোটামাটি বিশেষ সংখ্যায় ত্রিপুরার দশজন কবিদের মধ্যে আমার কবিতাও রেখেছিলেন।

এসব স্মৃতি এখনো মনে হলে বেশ কবি কবি ভাব হয়। 

আমার প্রথম বইটির কাজ যখন চলছিল তখনই  ফেসবুকে বসন্ত ধুলো নাম দিয়ে  একটি কবিতা সিরিজ লিখতে শুরু করেছিলাম।

আস্তে আস্তে প্রত্যেকটি ঝতুকে নিয়েই লিখি ফেসবুকেই। এই সমগ্র ঋতুযাপনকে কাব্যগ্রন্থ বের করব বলে ডিসিশন নেই। আমি তখন খুব অস্থির। পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে জীবনের। পৃথিবীতেও লেখা হয়ে গেছে হাজার হাজার কবিতা। তবুও মনে হতে লাগল আমাকেও কবিতা লিখতে হবে। কুমারঘাটে  স্রোত প্রকাশনার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। প্রকাশক গোবিন্দ ধরকে বললাম একটি বই বের করতে চাই। 

স্রোত প্রকাশনার তরফে বইটি ছাপা হয়ে হাতে এলো। নাম রেখেছিলাম “ ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায় “ । প্রচ্ছদ নিজেই করেছিলাম। ছাপা হয়ে আসার পর দেখলাম তাতে অসংখ্য বানান ভুল । প্রকাশককে বললাম । তিনি বললেন বানানগুলো কারেকশন করে দিতে। কারেকশন করলাম,  পরবর্তী বইগুলোতে একটি পৃষ্ঠা যোগ করা হলো , যাতে ছিল ভুল বানানগুলোর সংশোধন পৃষ্ঠা নাম্বার সহ। এধরনের আজব জিনিস আর কখনো হয়েছে কিনা জানিনা। স্বপ্নের বইটির এরকম করুণ অবস্থার জন্য খুব মর্মাহত হলাম। তবে তিনি আমাকে স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত বেশ কিছু বই দিয়েছিলেন। যা আমাকে ত্রিপুরার সাহিত্য সম্পর্কে সেইমুহূর্তে জানতে বেশ সাহায্য করেছিল। হয়তো ভুল বানানে বই ছাপা হওয়াটাই আমার ভবিতব্য । 

কারণ আমার প্রত্যেকটা বইতেই একটা দুটো অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকেই যাচ্ছে। তার কারণ হলো সীমিত জ্ঞান ও তাড়াহুড়ো এবং যথোচিত যত্নের অভাব।  

 কবি এবং শাব্দিক পত্রিকার সম্পাদক সঞ্জীব বণিক শাব্দিকের একটি সংখ্যার জন্য আমার কাছে একবার একগুচ্ছ কবিতা চেয়েছিলেন । তখন  কোন কারণে আমার বাবার বাড়ি কৈলাসহরে গিয়েছিলাম। সেখানেই “প্রেমে সন্ত্রাসে “ নাম দিয়ে আটটি কবিতার একটি গুচ্ছ লিখে পাঠাই । কি করে যেন মনের মধ্যে আরো এক কবিতা রসায়ন সৃষ্টি হলো। নীহারিকা প্রকাশনা থেকে ২০১৮ সালে প্রকাশিত হলো তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “ প্রেমে সন্ত্রাসে “ । বইটি প্রকাশ করলেন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি এবং নানা গুণে গুণান্বিত ও সাহিত্য বোদ্ধা সকলের কাছে সুপরিচিত শুভাশিস  তলাপাত্র স্যার। বইটির প্রকাশ সন্ধ্যায় রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে তিনি “ প্রেমে সন্ত্রাসে “ বইটি নিয়ে কয়েকটি কথা বলেছিলেন যা আমার এই ক্ষণস্থায়ী, অস্থির কবিতাযাপনকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল এবং ওনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত সবসময়ই আমার ভুলগুলো দেখিয়ে দেয়।

“  আজকাল পত্রিকায় আরোও কয়েকজন তরুণ কবির কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করার সময়  কবি , সুসাহিত্যিক  ও অধ্যাপক সুমন গুণ “প্রেমে সন্ত্রাসে” বইটি নিয়েও কয়েক লাইন লিখেছিলেন ।হয়তো এর চাইতে বেশি আলোচনা পাবার অধিকারি তখনো আমি হয়ে উঠিনি।

তারপর থেকে নীহারিকা প্রকাশনার তীর্থঙ্কর দাশ আমার অন্যতম সুহৃদ। পরবর্তী প্রায় সবগুলো বইই নীহারিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালে  কবি অমিতাভ কর দাদা ত্রিপুরার কয়েকজন তরুণ কবির এক ফর্মা বই নীহারিকা থেকে প্রকাশ করার দায়িত্ব নেন। এবং তিনি আমাকেও আমন্ত্রণ জানান। সেইসময় ওনার আগ্রহেই  প্রকাশিত হয় এক ফর্মার বই “ ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স “ । তিনি তাঁর মায়ের নামে নীহারিকা প্রকাশনার মাধ্যমে  চালু করেন সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মাননা।   যার প্রথম প্রাপক হবার সৌভাগ্য অর্জন করি। সামান্য জীবনে কবিতাকে আশ্রয় করে এইসব প্রাপ্তি আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান ।

কলকাতার গুরুচণ্ডা৯ প্রকাশনা থেকে সায়ন কর ভৌমিক আমার কাছে একটি একফর্মার কবিতার পাণ্ডুলিপি চান। সেখান থেকে কলকাতা বইমেলায় ২০১৮-১৯ সালেই প্রকাশিত হয়

 কাব্যগ্রন্থ “ বিশ্বাসের কাছে নতজানু “ । এজন্য সায়ন কর ভৌমিক ও ঈপ্সিতা পাল দুজনের প্রতি আমার ভালোবাসা সবসময়  অক্ষুণ্ন ।  

কবি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় কাব্যগ্রন্থটির একটি ক্ষুদ্র পাঠ প্রতিক্রিয়াও দেন।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত একদা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত “ কৃত্তিবাস “ পত্রিকা তখনো বন্ধ হয়নি। এই সময় কালে কৃত্তিবাস পত্রিকায় আমার লেখা “ প্রাগজ্যোতিষপুরে “ কবিতাটি প্রকাশিত হয় এবং এইসময়ই আমার একটি ছোট গল্প “ ব্যারনফিল্ড “ অবলম্বনে তৈরি হয় একটি সর্ট ফিল্ম। আনন্দবাজার স্কুলে এ পত্রিকায় দুটো ছোট গল্পও প্রকাশিত হয়। একদম খুশির সীমা নেই তখন। বস্তুত এই সবকিছুই হয়েছিল স্যোসাল মিডিয়ায় লেখালেখির সুবাদে। তাই আমার কাছে এখন লেখালখির  সবচেয়ে বড় মাধ্যম স্যোসাল মিডিয়া ।

ত্রিপুরার বিদগ্ধ  কবি ও সাহিত্যিক মিলনকান্তি দত্ত “ ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায় “ এবং কাব্যগ্রন্থ “ শুভ দ্বিপ্রহর “ নিয়ে ফেসবুকের দেয়ালে দুটো পাঠ প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। নতুন লিখতে আসা যেকোন লেখক  এইসব   প্রাপ্তি আজীবন মনে রাখে এবং সেখানে পূর্বজ সাহিত্যিকের জন্য একটি চিরস্থায়ী শ্রদ্ধার আসন আঁকা হয়ে যায়।  

এখন আর বলতে বিশেষ লজ্জা পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে কবিতাই লিখছি । কবি সম্মেলনে গিয়ে কবিতাপাঠ করার জন্য মন তখন ব্যাকুল । মনে হতো কবি সম্মেলনে কবিতাপাঠ না করলে বোধহয় কবিত্বের স্বীকৃতি হয় না। এদিকে তখনো কোন আমন্ত্রণ পাচ্ছি না। যে সময়টার কথা বলছি সেটা হলো ২০১৫–১৬ । একুশে মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে ধর্মনগর পোয়েটস ইউনিটের পক্ষ থেকে বিশ্ব কবিতা দিবস পালন করা হয়। শ্রদ্ধেয় কবি হৃষিকেশ নাথ আমাকে ফোন করে কবিতা পাঠ করার আমন্ত্রণ জানান। সেটাই প্রথম কবি সম্মেলনে কবিতাপাঠ। প্রত্যেক বছর ধর্মনগর পোয়েটস ইউনিটের উদ্যোগে বিশ্ব কবিতা দিবসের এই অনুষ্ঠান আমার কাছে অন্য সব অনুষ্ঠানের থেকে দামি। কবি হৃষিকেশ নাথ সম্পাদিত “ শব্দনীল ‘ এবং  নিবারণ নাথ সম্পাদিত “ নীলকন্ঠ “ বিধানচন্দ্র দে সম্পাদিত “ সন্ধিক্ষণ “ পত্রিকায় লেখার সুযোগও পেয়েছি। কবিতা পাঠের আসরে কবিতা বিনিময় হয়। তবে কবি সম্মেলনে কবিতাপাঠ করা অপেক্ষা সবার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ্রহটাই আজকাল বেশি আকর্ষণ করে। কিন্তু কবি সম্মেলনে পাওয়া উত্তরীয়কে বড্ড ভারী মনে হয়, ফুলের তোড়া জলে ডুবিয়ে রাখি তবুও শুকিয়ে যায় কয়েকদিন পর, শুভেচ্ছা স্মারকগুলো ব্যাগে করে কোথায় রাখি আর মনে থাকেনা , কলমটা মেয়েকে দিয়ে দিই, রাইটিং  প্যাডে অবান্তর হিসেব লিখি । এর চাইতে দীর্ঘ কবিতা কি কোনো কবি লিখতে পারেন? 

ধর্মনগরে কবি সেলিম মুস্তাফা , সুবল চক্রবর্তী এবং এক ঝাঁক মেধাবী তরুণ কবিদের আগ্রহে প্রত্যেক রবিবারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে “ কথা ও কবিতার আসর “ ।  কবিতাপাঠের অন্য নাম 

‘আনন্দ ‘ ,  মধ্যবয়সে  এটাই অনুভব করি।

 সেলিম মুস্তাফা আমার “ প্রেমে সন্ত্রাসে “কবিতার বইটির একটি দীর্ঘ পাঠ প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। এখনও তিনি প্রশংসা ও সমালোচনা দুটোই খোলামনে করেন। 

ফেসবুকে এসে বহু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। তাদের মধ্যে অনেকই আছেন কবিতার সঠিক সমালোচনা করেছেন।  আছেন  সাহিত্য বোদ্ধা এবং বর্তমানে পারিবারিক বন্ধু 

 সজ্জন ভদ্রলোক কানুলাল দাশ , তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের আধিকারিক দেবাশিস নাথ,  দেবাশিস পাল ,  কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য , কবি তমেলশেখর দে,  কবি সত্যজিৎ দত্ত, গল্পকার দেবব্রত দেব,  সাহিত্যিক দেবব্রত দেবরায়, কবি বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী,   কলকাতার দৌড় পত্রিকার সম্পাদক মধুমঙ্গল বিশ্বাস , মধুমিতা নাথ, অর্পিতা আচার্য,  দেবাশ্রিতা চৌধুরী এবং আরোও অনেকে।

 যার কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তিনি হলেন কবি সম্মেলন পত্রিকার সম্পাদক  কবি শ্যামলকান্তি দাশ। আর যিনি আমাকে শ্যামলকান্তি দাশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি হলেন কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কবি সম্মেলন পত্রিকার সঙ্গে আমার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। কবি সম্মেলনে  গুচ্ছ কবিতা প্রকাশ সহ প্রায় প্রত্যেকটা বিশেষ সংখ্যাতেই কবিতা লেখার সুযোগ পেয়েছি। 

 কৃত্তিবাস চক্রবর্তী ত্রিপুরার অন্যতম প্রধান সাহিত্য পত্রিকা ভাষা সাহিত্যের জন্য  আমার একগুচ্ছ কবিতা নির্বাচন করেছিলেন । কবিতাগুচ্ছটির নাম ছিল “ রাজগৃহে “ । পরে আরো কয়েকবার ভাষাসাহিত্যে কবিতা ও গল্প বেরিয়েছে । কিন্তু প্রথম প্রকাশ অনেক বেশি গৌরবের । 

সদ্য প্রয়াত কবি ও সাংবাদিক জ্যোতির্ময় রায় কর্তৃক সম্পাদিত “ প্রজন্ম চত্বরে “  লেখার সুযোগ পেয়েছি বহুবার । ধর্মনগর বইমেলায় কবি সম্মেলন সঞ্চালনায় জ্যোতির্ময় রায়কে দেখেছি একজন সুযোগ্য রসিক সঞ্চালক হিসেবে। 

কবি সন্তোষ রায় কর্তৃক সম্পাদিত “ জলজ “ সাহিত্য পত্রিকায় যেদিন কবিতা পাঠানোর আমন্ত্রণ পেলাম,  বেশ আনন্দ হয়েছিল । কোন কোন পত্রিকা নিজ প্রসাদগুণে সতন্ত্র। তাই সেসব পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হলে ভালো লাগে । জলজ তেমনই একটি পত্রিকা।


বাচিক শিল্পীদের গলায় কবিতা পূর্ণতা পায়। এই সামান্য কবির কবিতা চেনা অচেনা অনেকেই আছে। ত্রিপুরার খ্যাতনামা বাচিক শিল্পী ইন্দ্রানী চক্রবর্তী তার আবৃত্তি সংস্থা শ্রুতিপুরমের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে অনেকবার আমার কবিতা আবৃত্তি করিয়েছেন। এছাড়া বাচিক শিল্পী সুনন্দা দেবনাথ, নির্ঝর পাল, সংহিতা সিনহা,  জয়ত্রী চক্রবর্তী , মধুমিতা ভট্টাচার্য , গৌহাটির  কবি ও বাচিক শিল্পী  দেবলীনা সেনগুপ্ত  এবং আরোও অনেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমার কবিতা পড়েছেন।  

 কাজী নজরুলের জন্মদিনে  আমার একটি কবিতার ভিডিয়োগ্রাফি করেছেন বাংলাদেশের

নিশাত শারমিন শান্তা। 

আট বছর ধরে আমরা চার বন্ধু মিলে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করি । চিত্তরঞ্জন নাথ,  মৌলিক মজুমদার এবং রাহুল সিনহা ও আমি। নাম “ কীর্ণকাল “ । কীর্ণকাল বিষয়ে আমাদের একটিই অহংকার  কীর্ণকালে বাজে কবিতা ছাপা হয়না।

যদিও বছরে একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় তবুও কীর্ণকাল কিছুটা হলেও বর্তমান কবিতাসময়কে ধারণ করে ।

করোনাকালে ভ্রাতৃসম কবি অভিজিৎ চক্রবর্তী ও আমি কবিতা নিয়ে একটি কথোপকথনধর্মী বই লিখেছিলাম ।  বইটি খুব কম লোক পড়েছেন।

কিন্তু নিরিবিলি এই বইটি আমার খুব প্রিয়, কেন যেন কম প্রচারিত ও কম জনপ্রিয় বই কবির অচেনা অভিমানকে ধারণ করে।

জল বিকেলে মেঘের ছায়া, ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায়,  প্রেমে সন্ত্রাসে, ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স , বিশ্বাসের কাছে নতজানু, শুভ দ্বিপ্রহর,  উড়িয়ে দিও, তারা মেঘের মতো , সংলাপ কাব্যগ্রন্থ “ সোমবার সন্ধ্যায় “ , দুটো দীর্ঘ কবিতা “শোক ও শিউলি “ আমার যাপনকালের এক একটি মুখ । তারা সবাই এক সঙ্গে থাক এটাই চেয়েছি শুধু। 

অনেক বেশি কথা বলে ফেললাম। এবার শেষ করি,  চিরশ্রী দেবনাথের একটি ক্ষীণ পরিচয় আছে , কেউ কেউ বলেন শুনেছি,  ঐ যে ফেসবুকে কবিতা টবিতা লেখে । আমরা এই সমাজে বাস করি যেখানে কবিতার সঙ্গে টবিতা যোগ করে কবির শিল্পসুষমাকে ব্যক্ত করা হয়। হাসি পায়,  দুঃখ তো হয়ই না , অপমানবোধও মরে গেছে। কবিতা এলে কবিতা লিখব , না এলে লিখব না , নাই বা থাকল তাতে বিশুদ্ধ ছন্দের কারিগরী, জীবনের যে সময়কে আশ্রয় করে কবিতা গড়ে ওঠে তার চেয়ে সৎ উচ্চারণ আর নেই,  উপনিষদের ভাষায় “আত্মানং বিদ্ধি “ ।  নিজেকে জানার এই যে বিচিত্র সুযোগ তাকে যত্ন করা আমার দায়িত্ব, বাকিটা পাঠক বলবেন ।










0 মন্তব্য(গুলি):