“নিষিদ্ধ নয়, নন্দন: যৌনতার সাহিত্যিক ভাষ্য” , চিরশ্রী দেবনাথ

৫:২৬ PM চিরশ্রী দেবনাথ 0 Comments

 “নিষিদ্ধ নয়, নন্দন: যৌনতার সাহিত্যিক ভাষ্য”



চিরশ্রী দেবনাথ




পৃথিবীতে প্রত্যেকদিন হাজার হাজার মানুষের জন্ম হয় তারপরও আমরা লেখক  লেখিকার কাছে জানতে চাই , লেখায় যৌনতা কেন এসেছে বা কিরকম ভাবে এসেছে তখন ব্যাপারটা খুব আশ্চর্যের মনে হয়। 


অথচ তাদেরকে আমরা জিজ্ঞেস করিনা আপনি খুনের দৃশ্য কেন লিখেছেন ? বা ধর্ষণ?  এগুলো তো অস্বাভাবিক কষ্টের বিষয় । ভয়ানক অশ্লীল জিনিস।


কিন্তু একই গল্প বা উপন্যাসে ভালোবাসার , প্রেমের  ঘনিষ্ঠদৃশ্যের বর্ণনাকে কেন যেন মানুষ মেনে নিতে পারেনা। যেন জীবনপাত্র উছলিয়ে ওঠা কামনা একটি বড়ো মিছে কথা। 


। অথচ, মনোবিজ্ঞানে, বিশেষ করে Sigmund Freud-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, লিবিডো শুধু শারীরিক কামনা নয়; এটি মানুষের ভেতরের এক ধরনের জীবনীশক্তি, যা ভালোবাসা, আকর্ষণ, সৃজনশীলতা এবং সম্পর্ক গঠনের শক্তির সঙ্গেও যুক্ত।



গল্পে উপন্যাসে খাওয়ার দৃশ্যের যেমন বর্ণনা থাকে তেমনি খুব সাধারণভাবেই একটি যৌনতাবিষয়ক দৃশ্যের বর্ণনা থাকতে পারে।  পার্থক্যটা হচ্ছে উপভোগ বা বিনোদনের । উপন্যাস বা সিনেমায় মানুষ এই সহজ স্বাভাবিক সুন্দর দৃশ্যটাকে উপভোগ করতে চায় বা যাদের জীবনযাত্রায় সেটা যথেষ্ট সহজলভ্য নয় তারা সেটার পাঠসুখ বা দৃশ্যসুখ অনুভব করতে চায়। কিন্তু সিনেমায় বিনোদন যতটা আগ্রাসীভাবে বা বাণিজ্যিক কারণে আসে সাহিত্যে ততটা নয়। এখানে সাহিত্যকে নিছকই পর্ণোগ্রাফির সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা ভালো । এটারও অবশ্য সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি কেউ যে এতোটুকু বর্ণনা করা যাবে তার বাইরে নয়,  কারণ ভারতবর্ষের মন্দিরগাত্র আমাদের সকল প্রশ্নকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে যৌনতার উন্মুখ সৌন্দর্যের কাছে দাঁড় করিয়ে দেয়।


আমার কবিতা,  গল্প ও উপন্যাসে মানুষ আছে, তাই যৌনতাও আছে । মানুষ থাকবে আর সে মানবজীবনের উৎসমুখের কাছে দাঁড়িয়ে অমৃতের অনুভব নেবেনা তা কি হয় নাকি?  তাই সমকাম এসেছে, এসেছে নরনারীর ভালোবাসার উদযাপন। আমি যেহেতু ভাষার সৌন্দর্যায়নে বিশ্বাস করি তাই কখনও রূপক, কখনও দৃশ্যের আড়ালে দৃশ্য,  এভাবে পাঠককে গভীর মননের দিকে আকর্যণ করার একটা চেষ্টা আমার মধ্যে আছে। যৌনতা যেন তার বিকৃতরূপ নিয়ে নর-নারীর মধ্যে এসে না দাঁড়ায় , সবচেয়ে সুন্দর রূপক যেন তার আধার হয়।


আমার দু একটি ছোট্ট কবিতা এখানে রইল।





চা



দু'কাপ চা তোমার আমার


খানিকটা চিনি... প্রথম বৃষ্টিপাত


উষ্ণ গাভী রস,


একটিই চামচ সেখানে


নাড়তে থাকে তোমাকে আমাকে। ( কাব্যগ্রন্থ ‘ প্রেমে সন্ত্রাসে ‘ )







উন্মোচন 


পাগল দম্পতি দেখেছি, যুগ্ম নক্ষত্র , সহাস্য পঞ্চাশ 

একটি ছেলেও আছে, সুস্থ, সুন্দর শালতরু

কী বিশুদ্ধ মিলনে জন্ম হয়েছিল তার, কত প্রবল ভালোবাসাবাসিতে

আগুনের ঘরবাড়ি, ভেতরে গুহা, নদী, অন্ধকার, 

ধরেছে হাত, জ্বলেছে মনের গহন

অথচ মস্তিস্কে জট, খাদের গভীর, নেমেছে কুয়াশা, সূর্যের আলো দিকচিহ্ন হীন

এই সময়ে রোপিত বীজ, পত্রপুষ্প দিয়েছে ঢেলে কোন্ শ্বেতপ্রপাত ? 



( কাব্যগ্রন্থ ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স ) 





বিভাজিত মেঘ


.........................


দুজন সমকামী মেয়ের অর্ধেক আকাশ নেই


দেহতত্ত্বের অন্ন সুবাসে


তাদের শরীরে জারিত পূর্ণ আকাশ


এই ভূমিকায় একটি  গ্রহণ ছেয়ে যাবে


সে গ্রহণের দায় কোন সন্তানের নয়



ক্যাকটাসে যে ফুল ফুটে চল্লিশটি বছর পর


একমেয়ে অন্য মেয়ের চুলে গুঁজে দিয়েছে সেই গন্ধ



" বাহারোঁ ফুল বরষাও "



বৃষ্টি জ্বলছে আঁধারে, ডুবছে পরিধি 


 এখানে পতন হোক দিগন্তের 


পাতাল ছুঁয়ে দেখুক কেউ কেউ …




( কাব্যগ্রন্থ “ প্রেমে সন্ত্রাসে “)





“অনন্ত কাম হয়ে ওঠো


চোখে কাম , চোরা থুতনিতে কাম


তোমাকে দেখে দ্রবীভূত হয়ে গেছে অন্ধকার


তোমারই কামে আগুন জ্বেলে


পুড়িয়ে দিচ্ছো নরম শঙ্খের মুখ


অবারিত কাম শেষে


শরীরে এখন শান্ত নগ্ন জল” ( কাব্যগ্রন্থ ‘ নিঃস্বরের করতলে ‘) 





নিজের কবিতার ব্যাখ্যা নিজে নাই বা করলাম ।




প্রত্যেকটি মানুষের জীবন একটি উপন্যাস । আমার লেখা তিনটে উপন্যাস ‘ সূর্যছক ‘,


 “ মারমেডের শহর থেকে “, এবং “ সংখ্যার শরীরে মৌমাছি “ , সবগুলোতেই রয়েছে নরনারী । তাই উপন্যাসের নরনারীকে জীবন্ত রূপ দিতে যৌনতার নন্দনভাষ্য এসেছে ।


তবে আমার লেখায় অতিরিক্ত  সচেতন হয়ে যৌনতার প্রয়োগ নেই । সবগুলো উপন্যাসেই 


বর্ষায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মতো যৌনতা রয়েছে  এবং কোথাও কোথাও রয়েছে নিজেকে ভালোবেসে নিজেকে যাপন করার স্বাভাবিকতা , এটাও তো একপ্রকার  যৌনতা ।

0 মন্তব্য(গুলি):