চিরশ্রী দেবনাথ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি পর্ব নয়

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 


পর্ব নয়


গান ভালোবাসো ? স্লো মিউজিক চালালেন তিনি।

ঈরার এখন মনে হচ্ছে সে কেন এসেছে এই নির্জন বাংলোয় অচেনা একজন পুরুষের সঙ্গে।

আরষ্ট হয়ে বসে আছে। কিছু বলার নেই। আগে মনে হয়েছিল খুব ভালো লাগবে । উন্মুখ কোন মুহূর্ত তার জন্য অপেক্ষা করছে। 

স্যার আপনার মিসেস আর ছেলেমেয়ে?

আমি কখন থেকে অপেক্ষা করছি হোয়েন ই্যয়ু আস্কড দ্য কোয়েশ্চন। ফাইনেলি জিজ্ঞেস করলে তুমি, যা থেকে বুঝলাম তুমিও গড়পড়তা বাঙালি মেয়ের মতো , যার মধ্যে কোন অ্যাডভেঞ্চার নেই।

করো । ভালো করে পি এইচ ডি করো। মা বাবার গুড গার্ল মেয়ে ।

কি অ্যাডভেঞ্চার?  

তুমি কি কিছুই বোঝ না ঈরা  ?  কেন এলে এখানে?  তবে স্যান্ডুইচ ইজ গুড। খেতে পারো।

জল খাও। চাইলে হালকা ড্রিংকও নিতে পারো। আমি নেবো একটা।

ঈরা উঠে গিয়ে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালো, পাহাড়গুলোর ওপর জনবসতি রয়েছে।  জায়গাটায় কেন জানি  এখনো কুয়াশা জাঁকিয়ে পড়েনি, এই পর্বতশ্রেণি গ্রেটার হিমালয় পর্বতমালারই অংশ। বাড়িঘরগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। পাইনগাছগুলোর মাথায় মাথায় সূর্যাস্তের প্রস্তুতি।  গোধূলির হালকা হালকা আলো লেগে আছে। চারদিক অপূর্ব সুন্দর।

ঈরা যে এই মানুষটাকে কিছু না ভেবে ভালোবেসে ফেলল,  ভালোবাসা তো কিছু না ভেবেই হয়,   এখন কি তার একটি ব্যক্তিগত সেতার হবে যা  শুধু ব্যথার সুর বাজাবে । 

কেয়ারটেকার ট্রেতে করে কিছু একটা নিয়ে এসেছে,  ঈরা পেছন ফিরে তাকালো না,  খুব সম্ভবত ড্রিংক ।

 নিজেকে অদ্ভুত লাগছে , একজন আদর্শ শিক্ষক পরিবারের মেয়ে হয়ে সে এরকম ভুলভাল প্রেমে কেন পড়ল ? শিক্ষককে তো শ্রদ্ধা করতে হয় ,  এটাই ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছে সে। অবশ্য স্যার তো জানেন না যে ঈরা ওনাকে অন্যচোখে দেখে , ভাগ্যিস মনের ভেতরটা কেউ দেখতে পায় না।

কি দেখছ?  কী সুন্দর না এই সন্ধ্যার সময়টা,  আস্তে করে আমাদের জীবন থেকে একটি দিন চলে যায়,  আর ফিরে আসে না,  তুমি এতো চুপচাপ কেন ঈরা ? ভয় পাচ্ছো আমাকে?

না,  না স্যার ভয় পাবো কেনো?  খুব ভালো লাগছে ।

তোমার একটুও ভালো লাগছে না,  আমি জানি।

তোমাকে দুটো প্রশ্ন করি,  শুধু সত্য কথাটাই বলবে ।


করুন। 


তুমি  আমাকে ভালোবাসো ? যদি ভালোবাসো তবে কেন? উত্তর দিতে হবে।

ঈরা থমকে গেলো। এভাবে ধরা পরে যাবে এটা সে আগে ভাবেনি ।

দাও উত্তর দাও এবার। মৌনতা আমি পছন্দ করি না।

তিনি দুহাত দিয়ে ঈরাকে নিজের দিকে ফেরালেন।

ঈরার সামনে এখন বছর চুয়াল্লিশ পঁয়তাল্লিশের একজন ঝকঝকে মেধাবী দীর্ঘকায় তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। তাকে ভালো না বাসলে ঈরার মতো মেয়ে আর কাকে ভালোবাসবে  ?

চোখ বন্ধ করে অস্ফুট স্বরে ঈরা বলে ফেলল ,

হ্যাঁ বাসি ।খুব ভালোবাসি ।

তাই?

বহুদিন আগে আমি যখন তোমার মতো বয়সী ছিলাম,  আরো একটি মেয়ে এই কথা বলেছিল আমাকে। তারপর … সেই মেয়েটাকে আমি আজো হারাতে পারিনি, কিন্তু ভালোবাসা হারিয়ে

গেছে। 

আচ্ছা পি এইচ ডির সুবিধার জন্য ভালোবাসো নাতো?

না স্যার,  আমি এমনি ভালোবাসি । শুধু ভালোবাসি , আমাকে কিছু দিতে হবে না।

তাহলে কেমন করে হলো?  ভালোবাসা মানে দেওয়া আর নেওয়া। শুষ্ক নদীতে যদি জলই না এনে দিতে পারলে তবে ভালোবাসব কেন তোমাকে?

আসলে জানো ঈরা , আমি খুব সেলফিস আমার প্রফেসনে। নিজের চেয়ে মেধাবী কাউকে আমি সহ্য করতে পারি না।

বহুকাল আগের সেই মেয়েটিও কি আপনার চেয়ে মেধাবী ছিল?

এই মেয়ে , তুমি প্রশ্ন করলেই আমি উত্তর দেবো নাকি?  হু ? 

চলো তোমাকে বাংলোটা দেখাই। মাঝে মাঝে আসবে তো? কথা বলব । রাজি তো? 

কিন্তু স্যার!

যা ভেবেছিলাম , আসলে তুমি ভালোবাসা কি জানো না। সময় দিতে হয়,  একজন আর একজনকে সময় দিয়ে কিছুক্ষণ হাত ধরে বসতে হয়। ভালোবাসা শুরু হওয়া মানে কাছে আসা। আমার ইমোশন খুব তীব্র। লঘু আবেগ  পছন্দ নয়। আর তার চাইতেও অপছন্দ করি ন্যাকামি।

তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম,  তুমি হ্যাঁ বলেছো । না বললেই তো ল্যাঠা চুকে যেতো তোমার। হোক মিথ্যে , আমি কিছু বলতাম না। কিন্তু তুমি হ্যাঁ বলেছো ,তার মানে শুরু,  এগিয়ে যাওয়া কোন একটা পথে। 

চলুন বাংলোটা দেখি।

কথা ঘোরাচ্ছো। তোমার মতো বুদ্ধিমতী মেয়েদের এইজন্য আমি পছন্দ করিনা। তোমরা দাবার ছকের মতো ভাবো । এই অঞ্চলের 

পাহাড়ি মেয়েদের দেখেছো?  উৎসবের রাতে তারা উদ্দাম মানবমানবী। পরের দিন সকালে কেউ এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করে না।

তোমাদের মধ্যে এতো দ্বিধা কেন। একদিনের জন্য হলেও তো আলাদা কোন সত্তা হতে পারো!


সেটা তো ভোগ হলো তাই না?


তাই বুঝি ?


হ্যাঁ, এতো দ্রুত কি সব হয়?


 কি হয়?  কি হয় বলো ঈরা , বলো ঈরা ! 

আমাকে কি তুমি এইমাত্র ভলোবাসলে ? 

অনেকটা দিন ধরে তোমার মনের মধ্যে এটা চলছিল,   আজ সুন্দর একটা মুহূর্তে বের হলো,  তাহলে কম্প্লিট প্রসেসটা তো  ছোট নয়?

ঈরার মনে হলো সে এখন একটা খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে, না বলার শক্তি নেই,  হ্যাঁ বলার সাহস নেই। আজকের দিনটা তাকে একটা

অনাবিষ্কৃত ওয়েবলেংথে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।


চলো ঈরা , তোমাকে ক্যাম্পাসে নিয়ে যাই। এখন না রওনা দিলে রাত হয়ে যাবে। আমি চাইনা আমার সঙ্গে তোমার নাম জড়িয়ে কিছু একটা প্রচার হোক। আমি তোমাকে বাজারে নামিয়ে দেবো। তুমি সেখান থেকে হেঁটে চলে যাবে।

অন্য কোন সময় আমরা আবার আসব এখানে।

আসবে তো তুমি? 


হ্যাঁ।


তিনি হাসলেন। দেখা যাক। 


বাংলোর সীমানা ছাড়িয়ে গাড়ি অনেক দূরে চলে এসেছে। রাস্তা নির্জন। পাহাড়ি বাঁকগুলোকে লক্ষ্য রেখে খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে মিঃ অনিকেত মুখার্জিকে । এখন দূর থেকে নিচের পাহাড়ে বাজারের দোকানপাটের আলো দেখা যাচ্ছে। আর অনেকগুলো ফ্লাড লাইটের আলোয় যেন ঝলমল করছে  EIMS এর ক্যাম্পাস।


 তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরি ?

চমকে উঠল ঈরা ।

হঠাৎই গাড়ি ব্রেক কষল।

 

ঈরা কিছু বলার সুযোগ পেল না । তিনি জড়িয়ে ধরলেন ঈরাকে । অজস্র চুম্বনে ঈরা যেন হারিয়ে গেলো মুহূর্তে । একসময় দুটো পেলব হাত আস্তে করে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিলো অনিকেতকে। একটি নরম কবুতরের মতো ঈরা দুটো শক্ত বাহুতে নিজেকে সমর্পন করে দিলো।

প্রবল আশ্লেষে ঈরার বুকে নাভিতে চুমু খেতে লাগলেন তিনি। কতক্ষণ এভাবে কেটেছে জানে না ঈরা । চরাচর কি এইসময় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোন গাড়ি আসেনি এই পথে  কিংবা দু একজন পথচারী ?

আধঘন্টা , পৌনে এক ঘন্টা ,  এটা কি কোনও সৌরঝড়? 

ঈরার উন্মুক্ত স্তনাগ্রে মাথা রেখে একসময় অনিকেত মৃদুকন্ঠে  বললেন তোমার মেধার মতোই তুমি সুন্দর , আমাকে এরপর থেকে কি তুমি শুধুই ঘৃণা করবে ঈরা ?


হোস্টেলে নিজের রুমে এসে ঈরা দেখল কুহু রুম সিফ্ট করে নিয়েছে। ওর দুটো সুটকেস আর বইপত্রগুলো নেই। মেট্রনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল ঈরা । কুহু জয়ীর রুমে সিফ্ট হয়েছে,  জয়ী প্রথম থেকেই একা থাকত। আপাতত সে কুহুর সঙ্গে রুম শেয়ার করতে রাজি।

ঈরা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল । কাউকে সঙ্গে নিয়ে থাকতে তার দমবন্ধ হয়ে আসছিল আজকাল।

দরজা লক করে বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল সে। আজকের দিনটি তাকে ঈশ্বর দিয়েছেন । এরপর আর কিছু চাওয়ার নেই। একটিমাত্র স্পর্শ লেগে থাক এই দেহ চরাচরে।

পৃথিবীর কাউকে সে বলবে না কিছু , অচেনা পথের বাঁকে নির্জন পাহাড় জানে শুধু কিছু উন্মত্ততা , আর পাহাড় তো চিরকালই মৌন ।





সংখ্যার শরীরে মৌমাছি


সংখ্যার শরীরে মৌমাছি

চিরশ্রী দেবনাথ

পর্ব সাত

কুহু ফিরে এসেছে। এতোদিন ঈরা ঘরটাতে আর রুমমেট নেয়নি। পুরো চার্জটাই নিজে শেয়ার করেছে। এই কুহু আগের কুহু নয়। ওর বিয়ে হয়ে গেছে,  তবে বর নিউইয়র্কে কোন একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করে,  ওখানেই  থাকে,  সেখানে এখনি কুহু যেতে পারবে না, বেশ কিছুদিন পর যেতে হবে,  পাসপোর্ট,  ভিসা এসব তৈরি করতেও সময় লাগবে ,  তাছাড়া বউকে নিয়ে যাওয়া আপাতত সম্ভব নয়। 

তবে বিয়ে করলে কেন?

কুহু বলল , উপায় ছিল না। বাবা রিটায়ার করেছে,  ছেলে উচ্চশিক্ষিত,  রোজগেরে,  মা বাবা দুজনেই বলল বিয়ে করে নিতে,  ওদের বাড়ি থেকেও খুব চাপ দিচ্ছিল।

এখন জোর করে এসেছি পড়তে,  জানো ঈরা আমি আমার হাজবেন্ডকে বিশ্বাস করতে পারছি না ঠিক,  তবে বলেছে মাসে মাসে টাকা পাঠাবে,  

আমি হ্যাঁ না কিছুই বললাম না,  আমার তো স্কলারশিপটা রয়েছে এখনো,  নষ্ট হতে দেবো না। লেগে পড়ি , তোমরা অনেকদূর এগিয়ে গেছো তাই না ঈরা ?

না কুহু,  আমি এগোতে পারছি না , আসলে,  নাহ্ থাক। ঈরা সাবধানি হলো, যে কল্পনায় ও বাস করে তার থেকে এক বিন্দুও যাতে না ছলকায়।

আমাকে একটু সাহায্য করো ঈরা , কিভাবে কোথা থেকে শুরু করব?

মিঃ কুলকার্নি তোমার স্যার ক্যালিফোর্নিয়া গেছেন,  আজ তো রবিবার। তুমি ফোন করোনি আসার আগে বা তুমি যে আবার আসছ?

করেছি ,  মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডামকে । বলেছেন আসতে । কাল ওনাদের সঙ্গে দেখা করব। আমাকে পারতেই হবে ঈরা । নাহলে এতোদিনের পরিশ্রমের কোনো দাম রইল না।


তাহলে, হুট করে বিয়েটা করে নিজেকে বেঁধে ফেললে কেন?

কোথায় বাঁধলাম , সায়ক নেয়নি আমাকে,  তাতে তো সুযোগও পেলাম পড়ার,  এখন দেখা যাক কি হয়,  মা বাবার টেনশনও দূর হলো  , সব কিছু কি জীবনে ইচ্ছেমতো হবে ঈরা ? আমার পরে আরো এক বোন ও ছোট ভাই আছে। এজন্য মা বাবার খুব টেনশন ছিল আমাকে নিয়ে।


টেনশন!!  তুমি কি সাধারণ গ্র্যাজুয়েট মেয়ে নাকি,  যার জন্য মা বাবা ছেলে খুৃৃঁজছে , তুমি এম এস সি করে নেট ক্লিয়ার করে এখানে পড়ার জন্য স্কলারশিপ পেয়েছো,  তারপর বিয়ের অজুহাত দিচ্ছো,  অনেকটা জাহানারা বশিরের মতো লাগছে কথাগুলো।  এখনই সরকারি কলেজ  না হোক বেসরকারি কলেজেই  চাকরি পেতে পারতে আর তোমার মা বাবা কিনা বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগে গেলেন , কুহু সমস্ত ব্যাপারটা কেমন যেন লাগছে । বাই দ্য ওয়ে , তোমার পার্সোনাল ম্যাটার । কিন্তু  এই কিছুদিন একা থাকতে থাকতে কমফোর্টেবল হয়ে গেছি , তাই আমি পুরো চার্জ দিয়ে একাই থাকতে চাইছি। এ ব্যাপারে মেট্রনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

ও মাই গড!  আজই এলাম আমি, আর তুমি একথা বলছ ! কেন ঈরা ? আমি কি রুম পেয়ে যাবো বললেই ?  থিতু হতে দাও. তো।

পাবে। রুম আছে,  এখানে ততটা ভিড় নেই। তুমি এখন ম্যারিড ওম্যান । হাজবেন্ডের সঙ্গে ফোনে কথা টথা বলবে , ভি ডি ও কল করবে,  আমার অসুবিধে আছে কুহু। আমি পারব না,  সরি। ধরে নাও কিছুটা স্বার্থপরও।

মেট্রন রুমে নেই। নিমা আন্টি  মেট্রনের ঘরের জিনিস পত্র মোছমুছি করছিলো , বলল মেট্রন নাকি বাড়িতে গেছে,  কাল সকালে আসবে।  যেতেই পারেন,  হয়তো কাছাকাছি কোন গ্রামে বাড়ি । নিমা আন্টির টাইটেল ভুটিয়া ,  নেপালি ও বাংলা দুই ভাষাতেই কথা বলতে পারে তাই একদিন জিজ্ঞেস করেছিল ঈরা । সকালে চা ব্রেকফাস্ট পরিবেশন করা  আরো নানা দেখভালের কাজে নিমা আন্টি ব্যস্ত থাকে,  কপালে বড় লাল টিপ পরে  , হাসিখুশি,  বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও খুব সুস্বাস্থ্য , ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে স্নেহমাখা সুরে কথা বলে , সবার দিকেই একটা খেয়াল আছে বোঝা যায় অবশ্য সে একা স্টাফ নয় আরো অনেক আছে  , প্রত্যেকেই ভালো বলে মনে হয় ঈরার ।


রবিবার হলেও ক্যাম্পাস একদম বন্ধ নেই। লাইব্রেরি আর সাইবার ক্যাফে খোলাই আছে , বেশ কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, অনেক স্টুডেন্টদেরই  নানা কাজে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে,  হয়তো লাইব্রেরিতে বা সাইবার ক্যাফেতেও  আছে কেউ কেউ।  

কী জানি হঠাৎ মনে হলো ঈরার , যাই আজ একটু ক্যাম্পাসের বাইরেটা ঘুরে আসি। শিব মন্দিরটাতে গেলে কেমন হয়?  কত দূর?  একা যাওয়া কি ঠিক হবে? দেখা যাক বাজারে গিয়ে,  নাহলে এমনিই খানিকটা ঘুরে আসবে। ব্যাগে এই হাজার খানেক টাকা আছে, গুগল পে কাজ না করলেও অসুবিধে নেই,  পাহাড়ি জায়গায় সবসময় হাতে কিছু নগদ টাকা রাখতে হয় , ক্যাম্পাসের বাইরে নেট দুর্লভ বস্তু ।   আর রুমে থাকতে ভালো লাগছে না। 

সেদিন মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা দূর এসেছিল আজ একা হাঁটছে। হাঁটা ম্যাটার না , আসলে সবার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইছে ঈরা , শান্ত মন নিয়ে পড়ার কাছে ফিরে আসবে , আগেও বড় পরীক্ষাগুলোর সময় সে এরকম অশান্ত হলে নিজের মতো করে কোন ব্রেক নিত। 


এ জায়গাটা বোধহয় এলাকার মোটরস্ট্যান্ড জাতীয়। একটি বাস ও কয়েকটি ছোট গাড়ি   দাঁড়িয়েছিল, পানের দোকানে বক্স বাজছে 

হাম তো ঠেহরে পরদেশি,  এখনও দালের মেহেন্দি শোনে মানুষ !  ঈরা  নাহয় পুরনো গানের ফ্যান। 

একটি গাড়িতে কয়েকজন লোক বসেছিল  । বোধহয় আরো প্যাসেঞ্জারের অপেক্ষা করছে, 

ঈরা একটু জোরেই বলল —

“শিব টেম্পল পে জানে বালা কউন সা গাড়ি হে?”

ঐ গাড়িটির ড্রাইভার চিল্লিয়ে বলল ,

“আইয়ে ম্যাডামজী, হম উধার হি যা রহে হ্যায়।”

  ঈরা এখন লক্ষ্য করল ঐ লোকগুলোর হাতে পুজো দেবার জন্য কিছু ফল,বেলপাতা ,ধূপকাঠি মোম ইত্যাদি মিলিয়ে ছোট ডালা রয়েছে। ঈরা উঠে পড়ল গাড়িতে।  সূর্য মধ্যগগনে । অনেকটা দিন এখনো বাকি , তাছাড়া আবহাওয়াও ভালো , বৃষ্টি নামেনি,  যদি নামে দেখা যাবে,  ছোট্ট একটা ছাতা আজ ঈরার ব্যাগে আছে। গাড়িটা দু তিনটে বাঁক নিতেই ঈরা দেখতে পেল ওদের পুরো ক্যাম্পাসটাকে। শ্রীনিবাস রামানুজন লাইব্রেরি , 

Gauss Hall, সবচেয়ে উঁচু জায়গায় ওদের সাইবার ক্যাফে Cybernode , গার্লস হোস্টেল,  বয়েজ হোস্টেল, ক্যাফেটেরিয়া,  আরো অন্যান্য হলগুলো,  কোয়ার্টার, শপিং মল  সবকিছুই সামান্যসময়ের জন্য চোখে পড়ল। এখন গাড়িটা ওপরে উঠছে, বেশ উঁচুতে আছে তো মন্দিরটা ! ঈরা ভেবেছিল ক্যাম্পাসের উচ্চতাতেই হবে,  শুধু বিপরীত দিকের  পাহাড়ে,  এখন বুঝতে পারছে তা নয়।  একটু ভয়ই লাগছে । গাড়িতে একটা ফ্যামিলি যাচ্ছে,   স্থানীয় ভাষায় কথা বলছে , একদম মশগুল । ঈরা ভাবছে গাড়িটা থামিয়ে এখানেই নামবে কিনা। ফিরে যাবে অন্য কিছুতে করে  । মন থেকে তৈরি হওয়া উৎসাহ ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে,  কী হবে শিবমন্দিরে গিয়ে,  পুজো তো কোনকালেই দেয়নি, ওখানে গিয়ে পুজো দেবার মতো ভক্তিও নেই,  কষ্ট করতেও ইচ্ছে করছে না। বলবে নাকি ড্রাইভারকে ? এসব ভাবতে ভাবতেই ব্রেক কষে গাড়িটা থেমে গেল। কি ব্যাপার?  

সবাই নেমে গেল,  ঈরাও নামল। গাড়ি আর যাবে না,  মন্দিরে যেতে অনেকটা পায়ে হাঁটা পথ, দর্শন করে আসা অব্দি গাড়ি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।

ঈরা দেখলো একটা সর্পিল পথ ,  মাটির সিঁড়ি কাটা, বেশ ওপরে উঠে গেছে,  পাহাড়ি ফ্যামিলিটি সেদিকেই যাচ্ছে।

ঈরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল । এখানে কিছু সময় দাঁড়িয়ে একটু নির্জনতা উপভোগ করে তারপর ওরা ঠাকুর পুজো দিয়ে ফিরে এলে চলে গেলেই হবে। 

. "ম্যাডামজী, আপ নেহি জাওগি কিয়া?"

ড্রাইভারটি জিজ্ঞেস করল। 


"নেহি, চক্কর আতা হ্যাঁ।"


"তো ফির বহুত দের রুকনা পরেগা “


 "রুকুঙ্গা, ইধর-উধর ঘুম লেঙ্গে থোড়া।"


“উধার এক ছাঁও হ্যাঁ, বেঠ ভি সক্তে হ্যাঁ।"


ঈরা দেখল রাস্তা থেকে একটু দূরে টিনের ছাউনি দেওয়া বসার জায়গা। আসলে পাহাড়ি এলাকায় উন্মত্ত বৃষ্টির জন্য রাস্তার ধারে এইসব ব্যবস্থা করে রাখা ।

বেশ ভালো তো,  বসা যাবে।

থেঙ্ক ইউ ভাইয়া ।

কিন্তু ঈরাকে বসতে হলো না।

ঈরার সামনে একটি গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়ালো।

দরজা খুলে নামলেন ডঃ মুখার্জি স্যার

আর ইউ ঈরা ? দ্য ব্রিলিয়ান্ট গার্ল,   ওয়ান অব মাই ফেভারিট স্টুডেন্টস !  কি করছ একা একা এই পাহাড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে? 

এসো আমার গাড়িতে ।

স্যার আমি এই ছোট গাড়িটাতে এসেছি,  একটু পরে ফিরে যাবো।

আমি বলছি এসো আমার সঙ্গে।

সম্মোহিতের মতো ঈরা স্যারের পাশে গিয়ে বসলো , তিনিই গাড়ি চালাচ্ছিলেন আজ ।















  




সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , চিরশ্রী দেবনাথ

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

চিরশ্রী দেবনাথ



পর্ব ছয়


সকালের ব্রেকফাস্টে ছিল উপমা, চা , একটি কমলা ও এক মুঠো ড্রাই ফ্রুটস । এতোটা একসঙ্গে খেতে পারে না ঈরা , ফল আর ড্রাই ফ্রুটসগুলো রেখে দেয়,  পরে খিদে পেলে খায়। 

হোস্টেলের খাওয়াদাওয়া খুব ভালো লাগে ঈরার ।মোটামুটি একটা ব্যালেন্সড ডায়েট মেন্টেন করে ওরা । শিলচরে নিজের বাড়িতেও ঈরা এতোটা সুন্দরভাবে খাওয়া দাওয়া করত না আর তারপর আরো হোস্টেল ও মেসে কেটেছে এতগুলো বছর , সেখানেও খাবারের তেমন নির্দিষ্ট মেনু ছিল না,  যাকে বলে হেলদি ফুড। আসলে হেলদি খাবার সুস্থভাবে পড়াশোনা করার জন্য খুব দরকার।

আর জি কর নিয়ে কয়েকদিন একটা চাপান উতোর থাকবে,   এড়িয়ে যাওয়া যাবেনা , সেটা চায়ও না ঈরা , কিন্তু খুব বেশি ঢুকবেও না এসবে।

কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি,  যে সব পেপারগুলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে জমা দিতে হবে,  যেগুলোর ওপর সেমিনার রয়েছে কোনটাই তো তেমন এগোচ্ছে না। স্যার তৈরি করতে বলেছেন , সে চেষ্টা করছে,  সংখ্যার জটিলতা বা কখনো কখনো আলোর ঝলকানির মতো সারল্য দুটোই ঈরাকে মুগ্ধ ও মগ্ন করে রাখে। 

মাসে একদিন বা দুদিন স্যার ডেট দেন ব্যক্তিগতভাবে বসার জন্য। সেই হিসেবে নেক্সট উইকে ঈরার ডেট তার টপিকের কাজ কতদুর এগিয়েছে এই নিয়ে কথা বলার বা প্রবলেমগুলো ডিসকাস করার।  রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের সারি দেখতে দেখতে  ঈরা খুব গভীরভাবে সারাদিনের কাজগুলো গোছাচ্ছিল মনে মনে । প্রথমেই লাইব্রেরি তারপর ক্লাশ আর সবশেষে সোজা হোস্টেল ।

রেডি?

চমকে উঠল ঈরা , দরজায় উঁকি দিয়ে যার মুখটি দেখা যাচ্ছে সে হলো জয়ী ঘোষ। কলকাতার,  পড়াশোনায় তুখোড় আবার খুব রাজনৈতিক কথাবার্তা বলে সবসময়,  অনেকেই এড়িয়ে চলে,  ঈরার খারাপ লাগে না,  বুদ্ধিমানদের পাশাপাশি চুপচাপ হাঁটলেও অনেককিছু জানা যায়। জয়ী কবিতা লেখে, গানও গায়, স্লোগানও ভালোই বানায় মনে হল।


এই তো রেডি,  চলো।

দরজা নক করে ঈরা জয়ীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। 

মাঝে মাঝে মতবিরোধ হলেও ঈরা জয়ীর আইডিয়াগুলোকে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেনা। 

কেমন চলছে পড়াশোনা?  জয়ী জিজ্ঞেস করল?

হু,  চলছে।

বলবে না,  আমি যদি জেনে ফেলি তাইতো?  হাসল জয়ী। 

না না,  সেরকম কিছু নয়,  কাল রাতের কথা ভাবছিলাম ।

কোনটা আর জি কর?


নাতো,  তোমার আর জি কর নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। ইনফ্যাক্ট কারোরই নেই,  সবই লোক দেখানো। না হলে বৃষ্টি এলো বলে এভাবে পালিয়ে আসতে?

পালিয়ে?  নাতো। আমার সাইনাসের দোষ আছে,  জ্বর এলে ভুগব তাই চলে এসেছি?

আর জাহানারা?  কাশ্মীরকি কলি?  সারাক্ষণ যার বিয়ের গল্প,  আর ফাইট করে এখানে আসার গল্প আমাদের শুনতে হয়।

গল্প থাকতেই পারে,  যার যার নিজস্ব গল্প। তোমার ভালো না লাগলে শোনো না। 

আর জয়ী পি এন পি সি আমার পছন্দ নয়,  তোমাকে একটু অন্যরকম ভাবতাম , এখন তো দেখছি আলাদা কিছু নও।

কে বলেছিল অন্যরকম ভাবতে ?.ওহ্ তোমরা তো আবার নর্থ ইস্ট, কথায় কথায় নিজেদের অনুন্নত জায়গার বলে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট নাও সরকার থেকে।

জয়ীর কথাগুলো ঈরাকে খোঁচাখুঁচি করার চেষ্টা হলেও ঈরা রাগ দেখালো না। সাতসকালে মুড খারাপ হলে সারাদিনের পড়াশোনা শেষ।


আচ্ছা আসি,  তোমার তো এখন ক্লাশ,  আমি লাইব্রেরি যাবো। 

জয়ীকে টা টা করে ঈরা লাইব্রেরির দিকে চলে গেল। 

ঈরা ভাবছিল এই সুন্দর দেশটা কেমন যেন হয়ে গেছে, সাধারনভাবে কারো সঙ্গে মেশা যায় না। প্রত্যেকের ভেতরে একটা চুল্লি,  গনগনে আগুনে নিজেরাই  নিজেদের পোড়াচ্ছে, কেন এরকম হলো?  


লাইব্রেরি যেন একটা নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপ। এখানে ঢুকলে ঈরার মনে হয়, সে এখন সব পারবে। স্যারের দেওয়া টপিকগুলোকে সে সংখ্যা দিয়ে সাজিয়ে তৈরি করে ফেলতে পারবে দুর্ভেদ্য  গাণিতিক কোড। তার পেপারটাই সেরা হবে। স্যারের চোখ থেকে ঈরার জন্য ঝরবে প্রশংসা ও গর্ব।

এখানে কেউ কারো তেমন বন্ধু হয়তো নেই,তবুও কীরকম করে যেন একটা গ্রুপ তৈরিই হয়ে যায়। মতানৈক্য বা একজন আর একজনকে পিন করলেও কেমন করে জড়িয়ে যায় অনুভবে ও মননে ।

আবির,  জাহানারা,  সৌমিতাভ,  ঈরা , সুহানি, জয়ী,   তারাও কোন এক অলিখিত নিয়মে জড়িয়ে গেছে হয়তো টপিকগুলোর মধ্যে মিল থাকায়। এখানে ঈর্ষা ও দ্বন্দের মাঝখানে দু একটি নিয়মভাঙা ভালোবাসাও গড়ে ওঠে যাদের

মিলতে হবে এরকম দিব্যি কেউ দেয়নি,  তবে ভেঙেচুড়ে দেবেনা এই নিশ্চয়তাও নেই।

ঈরা দূর থেকে দেখল একটি টেবিলে আবির আর সুহানিকে । ওরা পড়ছে , পড়ুক।

ঈরা সেদিকে গেলো না।

প্রয়োজনীয় সব বইপত্র নিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসে গেল।  লাইব্রেরির এই দিকটায় বড় বড় কাচের জানলা,  খোলা হয় না,  ওপরে ভেন্টিলেটার দিয়েই  বেশ বাতাস আসে  ,  রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে  কাচ ঠিকরে অবারিত আলোয় ঝলমল করে ভেতরটা আর কুয়াশার দিনের জন্য প্রচুর লাইট তো রয়েছেই,  পুরো ইনস্টিটিউশনটা সোলার সিস্টেমে চলে  ,  এখন রোদ  আসছে, সারি সারি টেবিল , আর জানলার ওপারে চোখ দিলেই পাহাড়ের গায়ে পাহাড়  , ছোট ছোট জনপদ, হরেক রঙের পতাকা পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় উড়ছে। এগুলো মানুষ কেন দেয় ঈরা এখনো জানে না। দূরের মন্দিরটাও দেখা যায় কুয়াশা না থাকলে। এটা শিবমন্দির,  এতোদিনে ঈরার জানা হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষদের কাছে খুব আদরের শিবজী ।

  ঈরা  বাইরের দিকে তাকালো, আকাশটা বেশ নীল আজ,  কী অপূর্ব লাগছে সব, এক অদ্ভুত কল্পনা ঈরাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল,  সেখানে অন্য কেউ স্বপ্নের মতো ।

অনেকক্ষণ পর হঠাৎ সুহানির ডাকে সম্বিৎ ফিরল ঈরার । ক্লাশে যাবে না?

হ্যাঁ,  তোমরা যাও,  আসছি আমি।

আমি তো যাব না,  এলিনর ম্যাডামের ক্লাশ তোমাদের,  একটা জিনিস খুবই কনফিউজড ছিলাম, আবির হেল্প করল,  আসি, তোমরা যাও। 

ভীষণ লজ্জা আর রাগ হলো ঈরার নিজের ওপর । কিছুই তো পড়া হলো না। সুহানি তো দিব্যি নিজের কাজ করে নিল, আসলে কি সুহানি ততটা ইমোশোনাল নয়? 

ব্যাগ গুছিয়ে,  বইশুলো যথাস্থানে রেখে ঈরাও বেরিয়ে এলো লাইব্রেরি থেকে ।


ঈরার গবেষণা আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফির একটি ট্র্যানজিশন পিরিয়ডে — Post-Quantum Cryptography (PQC)— গড়ে উঠছে , কোয়ান্টাম কম্পিউটার এসেছে,  RSA, ECC-র মতো প্রচলিত পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে না শুধু পড়ছে । তাই ভবিষ্যতের নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন অ্যালগরিদম নিয়ে গবেষণা চলছে সবজায়গায় ।

ঈরা কাজ করছে lattice-based cryptography নিয়ে, যা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় post-quantum approach বলে ধরা হয় ।


এখন  এলিনর ম্যাডামের ক্লাস । ওনার ক্লাসগুলো পর পর দেওয়া হচ্ছে,  মনে হয় উনি চলে যাবেন , হয়তো আরো কিছু মাস পর আবার আসবেন,  এমনও হতে পারে অনলাইন ক্লাস নিলেন। তবুও এতো উন্নত প্রযুক্তির মধ্যেও ঈরার কেন জানি মনে হয় স্যার ম্যাডামদের সঙ্গে সামনা সামনি ক্লাস করার মধ্যে যে উষ্ণতা ছড়িয়ে পরে, অনলাইনে তা পাওয়াই যায় না।


এলিনর ম্যাডামের ক্লাসও Gauss Lecture হলে। তিনি একটি নরম বাদামি রঙের ওভারকোট পরে এসেছেন,  হালকা নীল স্কার্ফ আর চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্বের মিশেলে খুব সুন্দর লাগছে ওনাকে ।

তিনি ধীরে কথা বলেন । এক্সপ্লেইন করার সময় একটু থামেন,  সামনে বসা ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকান। প্রায় সব ছাত্রছাত্রীই বিভিন্ন ভাষাভাষী ভারতীয় , তিনি জার্মানির,  একমাত্র অংকই দুইয়ের মধ্যকার সেতু ।

 প্রত্যেকদিনের মূল টপিক শুরু করার আগে  Post-Quantum Cryptography (PQC) এবং Public Key Cryptography-এর বিষয়টার জটিলতা ও সম্ভাবনা নিয়ে  একটু বলেন , আজও বলছেন । বোর্ডে লিখলেন ,

 “The Unseen War of Numbers” 

আজ বৃষ্টি নেই। উজ্জ্বল রোদ বাইরে আর ভেতরে পিন পড়লেও শোনা যাবে এমন নিস্তব্ধতা।


Before I start, let me ask—how many of you believe that your WhatsApp chats are safe?


আবির হাত তুলল,  কিন্তু ম্যাডাম ওর কাছে কিছু জানতে চাইলেন না , তিনি নিজেই বলতে লাগলেন, 

"Public Key Cryptography—RSA, Elliptic Curve—they've served us well for decades. The concept is elegant: one key to lock, one key to unlock. But..." একটু থেমে আবার বললেন "quantum computers are coming. And with them, everything you thought was secure might vanish like fog."


সামনের সারিতে ঈরা মাথা নিচু করে বসে আছে,   নোট খাতা খোলা । জাহানারা চোখ কুঁচকে বোর্ডের দিকে  তাকিয়ে আছে, যেন এখনি সে পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে। 


জয়ী মেধাবী , কিন্তু এতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসেও তার মাথায় অনাবশ্যক জিনিস ঘোরাফেরা করে। 

 সে  ফিসফিস করে কিছু বলল সৌমিতাভকে , একবার ঈরার দিকেও ইশারা করল। 


এলিনর  বোর্ডে লিখলেন 


Public Key Cryptography: Two keys – Public & Private


RSA/ECC Vulnerability: Shor’s Algorithm on Quantum Computer


Post-Quantum Cryptography: Lattice-based, Code-based, Hash-based schemes


তিনি হাত দিয়ে বোর্ডে ল্যাটিস আঁকলেন ,

"Imagine a multidimensional maze. Now hide a password inside. That’s the world of lattice-based encryption. It's complex, resistant, but not unbreakable. Just... not breakable yet."


ঈরা  হাত তোলে, জিজ্ঞেস করে,

"Ma’am, are we trying to hide the key better, or change the whole lock?"



এলিনরের চোখে একটু যেন প্রশংসা দেখতে পেল ঈরা,


"Very good question, Ira. We’re doing both. We are redesigning what a 'lock' means in a post-quantum world."


সৌমিতাভ ফিসফিস করে জয়ীকে বলল বুঝলি, লক তোদের WhatsApp-এর, চাবি এখন কিউবিটে ঢুকে যাবে , একটু হাসির প্রলেপ পড়ল  ক্লাসে।


এলিনরও হাসলেন ওদের হাসি দেখে,  তারপর  বললেন ,In this new war, the battlefield is invisible, the weapons are algorithms, and the soldiers—are researchers like you.


জাহানারা একটু গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল, 

Miss, does that mean even medical data can be hacked in future?


"Yes, my dear. That's why we need ethical cryptographers—minds with not just logic, but conscience."


পেছনে জানালার কাচে এখন  বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, কখন রোদের পাট চুকে বৃষ্টি নেমেছে কেউ লক্ষ্যই  করেনি। 

ক্লাসে নিঃশব্দতার প্রতিধ্বনি বাজছে যেন।  ঈরা মনে মনে ভাবে—এই সময়েই তাকে প্রস্তুত হতে হবে, আগামীতে হয়তো  নিঃশব্দ  যুদ্ধ

হবে  যেখানে অস্ত্র শুধুই  অংক আর  কোড । 









সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , চিরশ্রী দেবনাথ



সংখ্যার শরীরে মৌমাছি 

চিরশ্রী দেবনাথ

পর্ব পাঁচ



বিকেল থেকে শুরু হয়েছে টিপ টিপ বৃষ্টি , আকাশ মেঘলা , বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। রুমে বইপত্র , ল্যাপটপ আর গরম চা নিয়ে বসে থাকার উপযুক্ত সময় এটা। কিন্তু নিজেকে এভাবে আলাদা রাখাটাও ঠিক নয়। কান ও  মাথা একটা কালো স্টোল দিয়ে ঢেকে ঈরা রুম লক করে ক্যাম্পাস চত্বরে চলে এলো। ছেলে মেয়ে সবাই এসেছে,  শুধু তাই নয় প্রফেসর অন্বেষা চৌধুরী ছাড়াও আরো অন্যান্য প্রফেসররাও এসেছেন যারা যারা  কোয়ার্টারে রেসিডেন্ট হিসেবে থাকেন। এখানে কোনো মঞ্চ তৈরি হয়নি,  বিশাল  ফেস্টুন তৈরি হয়েছে যেখানে একটি মেয়ের চোখ বাঁধা , মেয়েটির দুই কাঁধে দুটো ডানা আঁকা , নিচের দিকে মুখ ,

মুষ্টিবদ্ধ দুটো হাত , সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে রক্ত । ঈরা  একজন সঙ্গী খুঁজছে যার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কিছুসময় কথা বলা যায়। বহুজনের মাঝখানে এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকাটা খুবই অড লুকিং । 

লোকাল নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকরাও এসেছেন,  ওরা সবকিছু ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত , এই প্রতিবাদের আওয়াজটা সবজায়গায় পৌঁছে যেতে হবে তো।

ঈরার হঠাৎ নিচের দিকে চোখ গেল,  স্ট্রিট লাইটের জোরালো আলোতে এই বিশাল ক্যাম্পাস এরিয়া আলোয় আলোকিত হয়েই থাকে সন্ধ্যার পর থেকে,  যে  পিচরাস্তাটি এঁকেবেঁকে উঠেছে , সেই পথে একটি কালো গাড়ি আসছে,  যে গাড়িটি ঈরার খুব চেনা,  মুখার্জি স্যারের গাড়ি। 


প্রথমে অভয়ার জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হল।  

তারপর বলার পালা,  ঈরা বুঝতে পারছিল না এরা কি বলবে ? এতোটা নৃশংসতাকে কি বর্ণনা করা যায় ?

যেহেতু এটা একটা সভার মতোই হচ্ছে এবং প্রথম থেকেই সুহানি পুরো ব্যাপারটা পরিচালনা করছে , তাই সুহানি অন্বেষা ম্যাডামকেই বলল কিছু বলতে ।

অন্বেষা ম্যাডাম কিন্তু ঘটনার বিবরণে গেলেন না,  

তিনি মূলত এই ঘটনাটিকেই ছুঁলেন না। খুব সোজা সাপটা কোথায় বললেন দেখুন ছেলেমেয়েরা,  অনেক পরিশ্রম করে তোমরা এতোটা অব্দি এসেছো,   তোমাদের আবেগকে কারো হাতে তুলে দিয়ে তাকে অস্ত্র বানাতে সাহায্য করো না। তোমরা সবাই বুদ্ধিমতী , আর এটা ঠিক জাতীয় স্তরের শিক্ষাকেন্দ্রও নয়,  আন্তর্জাতিক স্তরেরও বটে , কোথাও যেন এর নাম কোনভাবে অনুজ্জল না হয়। তোমাদের যেকোন সমস্যার কথা আমাকে বলতে পারো,  আমি নিশ্চয়ই তা সমাধান করার চেষ্টা করব।


আরো অনেকেই কথা বলছে , ঈরা ভাবছে এখানেও সমস্যা?  

মিঃ মুখার্জীর গাড়ি এসে থামল। তিনি নামলেন,   

মৃদু হাসলেন তারপর চিৎকার করে  বললেন বহু কষ্টে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সমস্তরকম রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি,  নষ্ট করে দিচ্ছো তুমি অন্বেষা ম্যাডাম । ছাত্রছাত্রীদের কে সাহস দিলো ওদের অমূল্য সময় অপচয় করে এইসব হাবিজাবি ব্যাপারে মাথা ঘামাতে ?

ডঃ অন্বেষা চৌধুরী কিন্তু চিৎকার করলেন না। তিনি থামলেন। এগিয়ে গেলেন মিঃ মুখার্জির কাছে,  তারপর যেভাবে বললেন সেটা অনেকের কানেই পৌঁছুলো না। 

 তাই নাকি মিঃ অনিকেত? পড়াশোনার সময় মাঝে মাঝে নষ্ট করতে হয় বৈকি ? নাহলে তো পড়াশোনা শেষ করাটাও একসময় কঠিন হয়ে পড়ে বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। আর প্রতিষ্ঠানের মালিক তুমি নও,  সেটা গড়েও তোলোনি। আমি আর তুমি এখানে পড়াই,  হয়তো আরো কিছু বাড়তি দায়িত্ব পালন করি। আর আজকের এই জমায়েত কিন্তু ততটা হেলার নয়,  একটি উচ্চশিক্ষিত মেয়ে তার নিজের কাজের জায়গায়  মেডিকেল কলেজের মধ্যে ধর্ষিতা ও খুন হয়েছে,  সবকিছু পচে গেলে সেখানে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করা যায় না।

অবশ্য তোমার সঙ্গে এসব কি বলছি , তুমি তো…

থামলে কেন?

থামিনি অনিকেত।

আমার লাইফস্টাইল আমার,  সেখানে আছে মেধা আর সাকসেস,  এই একটাই ছক,

ছকের বাইরে যে থাকতে চাইবে সেই তো আউট তাই না  , তুমি কিন্তু পারোনি,  আমিই তার প্রমাণ , অনিকেত। 


ছাত্রছাত্রীরা ঠিক বুঝতে পারছিল না মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডাম কি কথা বলছে , কারণ তারা একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল , আর চারদিকে নানা হইচই। 


ঈরা এখন এসে জাহানারার কাছে দাঁড়ালো। জাহানারা কাশ্মীরি মেয়ে । ঈরার মতোই একটু চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে,  আজকে সেও এখানে এসে যেন কি করবে বুঝতে পারছিল না,   একটু পরে আবির এলো,  ওদেরকে দেখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। এটা ঈরার  ভালো লাগল , সেদিন  বেশিই খারাপভাবে কথা বলেছিল সে,  সরি বলাটা দরকার। কিন্তু এখন বললে  খুব ড্রামাটিক হবে।  ঈরা কিছু বলল না। আপাতত তারা মুখার্জি স্যার আর অন্বেষা ম্যাডামের কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে ।কারণ স্যার প্রতিবাদ , জমায়েত এগুলোর বিপক্ষে বোঝাই যাচ্ছে। এমনসময় প্রফেসর এলিনর মরটিনকে ওদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখল ওরা ।  

এই মধ্যবয়সী জার্মান মহিলা, ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটেসনের গেস্ট লেকচারার হিসেবে এসেছেন।

খুব সুন্দর করে আস্তে আস্তে কথা বলেন , 

হঠাৎ তিনি সুহানির কাছ থেকে মাইক্রোফোন নিলেন,  তারপর বললেন


“Where I come from, we believe silence can be complicated. And today, I refuse to be complicit.”

“This isn't politics, Professor Mukherjee. This is mathematics of conscience. One wrong variable in a proof, and the theorem collapses.” 


মুখার্জি স্যার একটু চমকে উঠলেন, একটু হাসলেন এবং কেটে কেটে বললেন ওকে , গো এ হেড,  তবে রাত নটার সঙ্গে সঙ্গে ফেস্টুনসহ চত্বর খালি হওয়া চাই।  গাড়িতে করে তিনি নিজের কোয়ার্টারের দিকে চলে গেলেন। 

ঈরার  মনটা খারাপ হয়ে গেল,  দুর সবকিছুই  এখন যেন আলুনি লাগছে , তবে প্রফেসর এলিনরের কথাটাও খুব ভালো লেগেছে , সত্যিই তো তাই ।

প্রফেসর এলিনরের লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। ধূসর-নীল চোখ, হালকা বাদামি চুল সবসময় পিছনে জড়ানো থাকে। পরনে থাকে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা কুর্তা জাতীয় ঢিলেঢালা পোশাক—ভারতীয় পোশাকের সঙ্গে তিনি নিজের পোশাকের একটু মিল রাখেন সবসময়ই , তিনি স্পষ্টভাষী, অনুভবপ্রবণ কিন্তু আবেগপ্রবণ নন। ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের যুক্তিসম্মত প্রশ্ন করতে শেখান, 'blind memorization' একদম সহ্য করেন না , আজ তো  ঈরা ও সুহানি তাঁর কথায় মুগ্ধ ।


জাহানারা ঈরাকে বলছে ,

এই শোনো... ফির সে ছুটি পড়েগা না? ওয়াল্লাহ, মই না অ্যাবল টু গো ব্যাক কাশ্মীর রাইট নাও। ইট ওয়াজ হেল লাইক ফাইটিং উইথ মাই পেরেন্টস টু কম হিয়ার। জানো ঈরা, মাই বড়া চাচা তো অলরেডি মাই ম্যারেজ ফিক্স করচুকা থা... বাট মই বলি, 'নেহি, মই পড়েগি, দূর তাক পড়েগি!'

হামারে ফ্যামিলি মে কোই গার্ল এত দূর নাহি গেয়ি থি পড়নে, আর ইফ ইট ওয়াজ ফর এম.বি.বি.এস. না, দে উড হ্যাভ অ্যাক্সেপ্টেড। বাট ইটস ম্যাথস! আর ম্যাথস কে লিয়ে কে জিদ করনা, ইট ওয়াজ লাইক অ্যা রেবেলিয়ন।



অন্বেষা ম্যাডাম এগিয়ে আসছেন, ওদের জটলাটার দিকে তাকালেন মনে হলো, 

আবির হঠাৎ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল , 

আচ্ছা  কনটেক্সট না বুঝে থিওরেম দাঁড়ায় না , তাহলে এই ঘটনার প্রসঙ্গ থেকে নিজেকে আলাদা করাটা কি ঠিক? তোমরাই বলো ?


ম্যাডাম একটু হাসলেন। ওয়েল সেইড। আমাকে শুনিয়ে বলছ নাকি আবির?


না ম্যাডাম । এমনি বললাম ।


ভালোই বাংলা বলছ আজকাল , আবির বর ঠাকুর ! ম্যাডাম হাসলেন সামান্য। 


ভিড় ঠেলে তিনি একটু উঁচুতে দাঁড়িয়ে বললেন এটা কিন্তু মানতেই হবে , নটা পর্যন্ত সময়। চলো মিছিল শুরু হোক এবার। 


ঈরা মৃদু গলায় বলল, 

“এই ক্যাম্পাস আমাদের শেখায় প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিতে। তাহলে এইখানেই যদি কণ্ঠরোধ হয়, তাহলে আমরা কি সত্যিই গবেষক? কোথাও যেন অংক তৈরি হচ্ছে, তাই না? 


অন্বেষা ম্যাডাম বলছেন,


“তোমরা কেউ ভুল করছ না। যেটা ভুল, সেটা হলো—ভয় দেখিয়ে, চুপ করিয়ে রাখা। আমরা মেধাবী বলেই প্রতিবাদ করি। কারণ যে মানুষ যুক্তি জানে, সে অন্যায়কে চুপচাপ মেনে নিতে পারে না ,

আমাদের মিছিল ক্যাম্পাসের বাইরে সামনের ছোট বাজারটা পর্যন্ত যাবে এবং ঘুরে আবার এখানে এসে শেষ হবে,  সুহানির সঙ্গে স্লোগানে আমাদের সবার গলা যেন শোনা যায়, 

 we want justice. 


মিছিল শুরু হলো,  সেই সঙ্গে মেঘও ডাকতে লাগল আকাশে, ঠান্ডা হাওয়া বইছে । প্রত্যেকেই হালকা শীতের পোশাক পরে আছে,  কারণ এখানে সকাল এবং রাতে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডাই থাকে সারাবছর ধরে। 


সুহানি , ঈশা আর জয়ীর  কাছে তিনটে মাইক , প্রত্যেকটা স্লোগানের পর বলতে হবে we want justice , 


অনেকগুলো পোস্টার ছাত্রছাত্রীদের হাতে হাতে,  কোথাও লেখা 

"হসপিটাল নয় , মৃত্যুপুরী কেন?",  "যেখানে বিচার নেই, সেখানে বিদ্রোহ জন্মায়!",

 "Naari pe hinsa, bandh karo yeh tamasha!",  "Justice delayed is justice denied!", "হাম ন্যায় চাহতেঁ হ্যায়, রহম নয়!"

"Say her name – Avhaya! We won’t forget!"

 "চুপ করে বসে থাকলে, পরেরটা তুমিও হতে পারো!" এইসব।

ঈরার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে,  মেয়েটা তীব্র পাশবিক অত্যাচার সহ্য করেছে, এই কদিনে এটা স্পষ্ট সে কিছু একটার প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল,  তাই এভাবে চলে যেতে হয়েছে। ছেলে হলেও হতো এটা,  শুধু সেখানে ধর্ষণটা হয়তো থাকত না। মেয়ে মানেই শরীর , শরীরটাকে ছাড় দেওয়া যাবেনা।

পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে মিছিল এখন মেইন রাস্তায়,  দুপাশের বাড়িঘর থেকে কয়েকটি নিরুত্তাপ মুখ একটু উঁকিঝুৃঁকি দিচ্ছে,  রান্না বসিয়েছে লোকজন , ধোঁয়া বেরোচ্ছে , শুকনো মাছ রান্নার তীব্র গন্ধ নাকে এলো কয়েকবার। ছোট্ট বাজারটাতে এসে একটু সময় থামা হলো,  স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সেখানে উপস্থিত ছিলেন,  ঈরা অবাক হলো,  সুহানি , জয়ী , ঈশা এতোসব করার সময় পেলো কখন,  করেই বা কি হবে?  ঈশা , সৃজনী অবশ্য পি এইচ ডির স্টুডেন্ট নয় ওরা এম এস সি করছে। 

গ্রামপ্রধান স্থানীয় ভাষায় ভাষণ টাইপের কিছু বললেন , পঞ্চায়েতের লোকেরাও ছিল,  প্রায় জনা পঞ্চাশ এলাকার লোকজন  । এদিকে বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে, পাহাড়ি ঠান্ডা খুব ভয়ঙ্কর ব্যাপার , অসুস্থ হলে দেখতে হবেনা আর।

সবাই ছাতা আনেনি বলে যারা এনেছিল তারাও খুলতে পারছে না,   এই যাহ্ জোর বৃষ্টি ।

কোনরকমে দ্রুত হেঁটে হোস্টেলে চলে এলো ঈরা আর জাহানারা।

নটার আগেই সব শেষ। শান্ত রাত। গভীর কুয়াশা। বহুদূরে একটি মেয়েকে দুঃসহ যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে ।

In this time mathematics is unable to explain. 


ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স , চিরশ্রী দেবনাথ

বইয়ের নাম


ঝাউবন এবং জ্যামিতি বাক্স


চিরশ্রী দেবনাথ



জ্যামিতি বাক্স

কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয় না বলে
কেমন সস্তা হয়ে যাচ্ছে বিকেলগুলো
যেন ধুলো ঢেকে দিয়েছে বিকেলের গাল
একটি রাস্তা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে দুপুরে
আজ, কাল বা পড়শু বা আরো অনেকদিন
এ পথে যাবে না কেউ, তাই বুকজোড়া ঝোপ তার
কুবো পাখি দেখে এসেছে বারান্দায় কুয়াশার জুতো
যে দম্পতি হারিয়ে ফেলেছে পৌষের সকাল
তাদের মানিব্যাগে টুক করে ঢুকে যাবে বলে
ঘন আষাঢ়ের রামধনু স্নান সেরে বসে আছে



ছালমোচন

দুঃসহ সময়ে কবিতা থেকে উঠিয়ে নিলাম প্রতিবাদ,
আগুন থেকে যেমন সরে যাচ্ছে ক্রমাগত দহনের দাগ
প্রতিবাদ, দহন ছাড়া শুধু লেখা হোক প্রেমের কবিতা,
প্রেম কোন প্রতিবাদ নয়, রাজনৈতিক খুন কিংবা বক্তৃতা নয়
নিরবিচ্ছিন্ন রুগ্ন বসন্ত ছড়িয়ে...কবিতা লেখে প্রেমিকের হাত।
প্রেমের কবিতা খুব নিরাপদ,
অন্তরে ঘটতে দেওয়া অপরাধের মতো
তাই হোক, কেমন শব হয়ে গেছি সব
স্বেচ্ছাচারী কবি একটি বাকলহীন প্রেম লিখো,
সতৃষিত ধর্ষণের পংক্তি,
এ সবকিছুই খুব নিবিড়, নিরাপদ, গোপন, প্রতিবাদ।




অন্নদাতা

অনশন চলছে, কৃষকদের,
আদিগন্ত মাঠ পেতে তারা বসেছে
জল খাচ্ছে না, শস্যদানা খাচ্ছে না
যেন পৃথিবীর পাখি তারা, সন্ধ্যার আগে নীর ছোঁ মেরে নিয়েছে কেউ
তাদের এখন ধর্মঘট, বীজ বুনবে না, ট্রাক্টর চালাবে না, ভোরের কুয়াশা মেখে মাঠে আসবে না
হে শক্তিমান, তুমি কি হেনেছো সেই কুঠার
করো না এমন, করো না এমন
দেখো কেমন মায়া ভরে
পৃথিবী তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে সূর্যাস্তের মদিরা, সভ্যতার অনীহা ...




গোলাপি মুক্তো

আমার সবকিছু ব্যক্তিগত
যেমন একটি গ্রাম, শহর ও মহানগরী একান্ত
গ্রামের দেহাতি, রূঢ় যুবকটি আমার ভেতর
সে শহর দেখতে চায় না, কথা বলে না, জেদের পাহাড় তার ভেতরে
শহুরে যুবকটিও আমার, শুধু নির্জনে দরজা বন্ধ করতে জানে
মহানগরীতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে দেহাতি যুবক বদলে গেছে
কাঠের বাক্সে তার কাছে এখন গোলাপি মুক্তো,
যত্ন করে পাঠিয়েছে আমাকে
মিথ্যে শেখার পর থেকে সে একদম  নির্ভুল
ধানক্ষেতে ছড়িয়ে দিয়েছি মধ্য জোয়ারে আহৃত সেই গোলাপি সমুদ্রবীর্য


আমার কাছ থেকে সমুদ্র অনেক দূরে
তাই আগে মুক্তো চাষ করি, তারপর জল, তারপর ঢেউ, তারপর গর্জন, আস্তে আস্তে গোটা সমুদ্র 




 ঝাড়লন্ঠনের ছায়া 

আজকে বোধহয় আর লেখা হবে না
বড়ো মগ্নতা এসে গেলো, মনে হলো ভাবি একটু
এই ভাবনাগুলোকে রাজপ্রাসাদে রাখি তো !
সেখানে শুধু ঝাড়লন্ঠন আর  টানা পাখা...
পাখা আলো সরিয়ে দেয়, আলো বাতাসকে, কেমন বৈরীভাব দুজনে
আর তখন সব শোনা যায়
শিশিরপতনের শব্দ,কচুপাতায় নক্ষত্রের রঙ জমা হওয়ার শব্দ
আশ্চর্য গাছেরাও এতো জোরে কথা বলে জানতাম না
রাতের বেলা আকাশ যে আস্তে  আস্তে পৃথিবীর বুকে নেমে আসে, অন্ধ না হলে দেখা যায় না
সব সুর, সব কবিতার জন্য অন্ধ হয়ে যেতে হয়,
বাউলের একতারার কাছে হিংসে রেখে আসতে হয় ...






উদাসীন মাল্যগ্রন্থি


আজ এসেছি মুগ্ধ হতে, রঙ চটে নির্জন হয়েছে কিছু,
বাকি সব উদ্ভাস
কোথাও জমেছে পাথর আদর জমে জমে, শ্যাওলার মখমল
রাস্তা শেষে আঘাতেরা মেলেছে ডানা
সিন্দবাদের সমুদ্রদ্বীপে তারাই রূপপাখি
এখন গুটানো হাত, নিমগ্ন পা ঈশ্বরের কাছে
তবুও পেতেছি হাত, যা কিছু দিলাম অবিশ্বাস, অবিরত সংঘাত
কোনটাই স্বাধীনতাকামী যুদ্ধ ছিল না
ভেবে গেছো অপ্রেম, নির্বোধ এ জমি
জেনেছ হয়তো বুদ্ধের মতো নির্বান অস্তরাগ, ক্ষীণ পাকদন্ডী, দেয়ালে তারিখমালা, অশুদ্ধ তিথি
যদি এখন ফেরত দিতে বলি সমস্ত অগম্য গ্রহণ, খোলা জানলা, কিছু ব্যক্তিগত মাল্যগ্রন্থি
কী অসম্ভব দুর্বার হবে সেইসব রঙীন ফেলে আসা গেঁজে যাওয়া  ফেনা !



সোনার চুড়ি


ভালো হবো, ভালো হবো খুব!
এই খুলে ফেললাম দুর্বিনীত জিহ্বা, শ্লেষ শব্দ অস্ফুট
খরা তো ছিলো না কখনো, কী সে মরল কে জানে
এই কি সেই মসৃণ সেগুন, শিকড় ছড়াতে জানে না ভালো করে
এমনি সহজ, ভয়াবহ সরল
হঠাৎ বিদ্যুতচমকে খুঁজেছে মেঘের উৎস, হেমন্তে ও বাকি ঋতুতে
অবিরাম বক্ষ পেয়েছে সে, ঝরেছে প্রথমের মতো 







সূচকাঙ্ক

আজই তাদের দেখাদেখির শেষদিন,
তারপর মেয়েটি বিদেশ যাবে বরের সঙ্গে।
ঐ যেখানে মিসিসিপি বয়ে চলে, এলোমেলো উদ্বাস্তু ছাতা।

তাই সে ফিরিয়ে দিতে এসেছে সমস্ত মেসেজ, প্রাণপণে ডিলিট করছে ভাগ করা কথোপকথন ।

এক জোড়া চোখ সামনে। নির্বাক।

দীর্ঘ শুভেচ্ছাবার্তার লাল হলুদ রঙগুলো দ্রুত মরে যাচ্ছে।
উড়িয়ে দাও সব, এসমস্ত দিনরাত, বিহঙ্গের ছটফটানি।

এখন দ্বীপান্তর হবে। 

সঘন নির্বাসন। স্ব ইচ্ছায়। যুদ্ধে মন নেই।
ছেলেটির কিন্তু খুব যুদ্ধ করতে ইচ্ছে করছে।
যেন সে অর্জুন। গাণ্ডিবে এখনি দেবে টান।


আসলে এসব কিছুই হচ্ছে না, শুধু মেয়েটি চলে যাচ্ছে।
আর দিকচক্রবাল জুড়ে হেরে যাচ্ছে তৃৃতীয় বিশ্ব ...



ডাকটিকিটের মেয়ে


এখন কিছু কাগজ আসে নিজের নামে
একটি ঠিকানা রয়েছে যেন কোথাও আম্রপল্লবের স্বস্তিকাচিহ্নরচিত
আমার মার একটি বাড়ি ছিল, নিজেদের ঘাম রক্তে ঘেরা।
সেখানে বাবার নামে অজস্র চিঠি আসতো, বই পত্র ইত্যাদি।
মার নামে তেমন কিছু চিঠি আসেনি কোনোদিন, কিন্তু বাড়িটি প্রবলভাবে মাকে ঘিরেই হয়ে উঠেছিল।
এই যে, আজকাল কিছু পত্রিকা, বই ডাক যোগাযোগ !
এটাই বোধহয় সামান্য অতিক্রম করা মাকে,
বাড়ি, অস্তিত্ব বা কিছুই হয়তো ঠিকঠাক নেই, তবুও,খামের ওপর এইসব অদেখা জায়গাগুলোর নাম পড়ে পড়ে শুধু মনে হয়
অক্ষরগুলো নৌকার মত, মৃদুমন্দ বাতাসে তাদের বিবাহ দিয়েছি দূরদেশে,
পরিচয় আর ঠিকানা নিয়ে মায়ের হৃদয়ে ফিরে এসেছে সুখি মুখ দেখাতে।




বলপ্রিন্টের ঘর

তাদের বাজারে চড়া ঋণ
বাকি পড়ে আছে স্কুল ফি, দোকানের খরচ,
জমে আছে বেঁচে থাকার জন্য না কেনা ঔষধের প্রেসক্রিপশন ।
সবাই আজ বিকেলে মরে যাবে ঠিক করেছে
কেউ তাই ছাদ থেকে কাপড় আনছে না, বিকেলের ট্রেনের হুইশেল শুনছে না,
কাঁদছে, নিস্তব্ধ হয়ে কাঁদছে।
ছোট্ট মেয়েটি হঠাৎ দরজা খুলে দিলো
ওমনি ঝাঁক বেঁধে ঘরে ঢুকে গেলো একদল গৃহগামী পাখি
আজ রাতে তারা এখানেই থাকবে
সুতরাং রাঁধতে হলো, খেতে হলো, রাতের বাহুতে দীর্ঘায়ত হচ্ছে প্রহরকাল,
এই নিবিড় রসিকতা চলতে থাকুক। 







সমুদ্র গৃহ

একজন বড়লোকের মেয়ে একজন গরিবের ছেলেকে ভালোবাসলো
তারপর গাছে গাছে ফুল ও ফল
একটি নিবিষ্ট বৈশাখে রেজিষ্টিও সমাপ্ত
আকাশ থেকে আসন্ন বর্ষার আরক্ত জলধারা তাদের ভিজিয়ে দিলো খোলা রাস্তায়

মেয়েটি ছেলেটির বাড়ি এলো
তিনখানা ঘর, খোলা বারান্দা,
একটি লেবু গাছ ও পাশের বাড়ির কাঠগোলাপ গাছের ফুলে ছাওয়া অবাধ্য ডাল
সবকিছু মিলিয়ে মেয়েটি অপেক্ষা করতে লাগলো নির্জনতার
অবশেষে রাত,মাঝখানের ঘর, তিনখানা দরজা, সারা রাত অন্যদের আসা যাওয়া।
রাগ, চলতে থাকা অভিমান !

গরিব ছেলেটি হয়তো এই দুরন্ত সমস্যাটির আশু সমাধান নিশ্চয়ই করবে
কিন্তু খুব দেরি হওয়ার আগে
এইসব ভালোবাসা প্রবণ দম্পতিরা
পৃথিবীর কাছ থেকে কি একটি নির্জন সমুদ্রগৃহ উপহার পেতে পারে না !! 





সংলাপ ...ঝাউবন ও ধুনকর


তোমার বুঝি চার পাহাড় অভিমান হয়েছে !

আমি খবর দিয়েছি ধুনকরকে, খবর দিয়েছি তাঁতিকে

খবর পাঠালাম রঙিন ধুলোর কারিগরকে ...


কি হবে তাতে?


নিদাগ হবে, ধূসরিত হবে, তুলোর ফেঁসো জড়াবে নাকে মুখে,

মোটা কাপড় পরে কুড়িয়ে আনবে লম্বা মিছিল


তাতে কি অভিমান কমবে?


তাতে অভিমান লজ্জা পাবে, ডোরাকাটা দাগ, গর্জন শুনে মনে হবে সুখী মাওবাদি।


আমি তখন গুহা কিনতে বেরোব। তোমার হাতে গর্জন গাছের ডাল, মেঘ আটকে রেখেছো। দাঁড়িয়ে আছো পেছন ফিরে।

গুমগুম পাহাড় ভাঙছে, দিনদুপুরে... শুনতে পাচ্ছো? পাচ্ছো কি?


এসেছো তাহলে !


তবে  শোনো ..., কিছু ঝাউগাছ আর দু তিন টুকরো বেলাভূমিও এনো  সঙ্গে , বারান্দা সাজাবো আমি 







দস্যুরোগ

যে পথে চলে গিয়েছ সে পথে এখন নদী, দিক বদলে এসেছে
জটায়ূর আহত পাখা থেকে কুড়িয়ে এনেছি যুগ্ম আভরণ,
অভিমান আর অভিমানে লেখা
চা গ্রাম গুলোর ভোর জুড়ে আজও এই ভরা অন্নকুট উৎসবে, ক্ষুধা নামে
পচা ভাতের সোমরস গিলে গিলে বনমালীর দল সমূহ কুটিরে ঢেলে দেয় রাতজাগা নক্সা ,
তাদের কাছেই দিতে হলো ধান্যপল্লবে লেখা একটি মাত্র পংক্তি, " আমি যে নত হয়েছিলাম ", 


সে থেকে ডানা ভিজে ভিজে ওঠে , গায়ে ছড়িয়ে পড়ে ঘরকুনো শ্যাওলা, কচি বেড়ালশিশুর ভয়লাগা স্বর
লিখে  রাখি সব ... বিকেল করে আসা গৃহরোদে
একা একা পড়ি, বৈশাখমাস জাগে নিভৃত প্রদেশে
ঘেমে ঘেমে রক্তচন্দনের দস্যুরোগ বাঁধাই,
এ সুখদান, এ দুঃখদান, এ ভরা কলস দিয়েছো বলে আমি পথচারিণী …






উন্মোচন

পাগল দম্পতি দেখেছি, যুগ্ম নক্ষত্র , সহাস্য পঞ্চাশ
একটি ছেলেও আছে, সুস্থ, সুন্দর শালতরু
কী বিশুদ্ধ মিলনে জন্ম হয়েছিল তার, কত প্রবল ভালোবাসাবাসিতে
আগুনের ঘরবাড়ি, ভেতরে গুহা, নদী, অন্ধকার,
ধরেছে হাত, জ্বলেছে মনের গহন
অথচ মস্তিস্কে জট, খাদের গভীর, নেমেছে কুয়াশা, সূর্যের আলো দিকচিহ্ন হীন
এই সময়ে রোপিত বীজ, পত্রপুষ্প দিয়েছে ঢেলে কোন্ শ্বেতপ্রপাত ?





লেখক পরিচিতি

চিরশ্রী দেবনাথের জন্ম ত্রিপুরার কৈলাসহরে , ১৯৭৯ এর ১২ ফেব্রুয়ারী। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার, মা মায়ারাণী মজুমদার। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির শুরু বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হন। তার লেখা ত্রিপুরা ছাড়াও আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত লিখেন। কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না, এটাই বিশ্বাস করেন।


প্রকাশিত অন্যান্য কাব্য গ্রন্থ: জলবিকেলে মেঘের ছায়া, ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায়, প্রেমেসন্ত্রাসে, শুভ দ্বিপ্রহর ইত্যাদি


বিশ্বাসের কাছে নতজানু, চিরশ্রী দেবনাথ

বইের নাম 


বিশ্বাসের কাছে নতজানু


ভূমিকা




সময়টি  মাংসকালের। নির্মোহ মাংসাশী গ্রাম ও শহর।  অপরাহ্নের নিমন্ত্রনে ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে রাত, দিন, ধর্ম, ধ্বজা, পতাকা ও যোনি। অন্ধদের থালা বাটি গ্লাস ভরে উঠছে ভরপেট নৈবেদ্যে। যেদিন হেমন্তসময় প্রবাহিত হবে, মাঠের পাশে বসে থাকব আমরা  সার বেঁধে,   ... মাংসের কথা, পেটভরার কথা, শরীরসুখের কথা বলতে এতো অক্ষর লাগাও কেনো হে, 

কসাইের কাছে রক্ত জলের মতো, কৃষকের কাছে কাদা তো  মুঠ মুঠ পরমান্ন, আমাদের এই বোকা এবং অশ্লীল চেয়ে থাকা  পৃথিবীর আঁচে নিজস্ব  দহন জ্বালাবার  জন্য ...




 


চিরশ্রী দেবনাথ 




প্রিয় দোয়েল পাখি 


 বার বার পাসওয়ার্ড ভুলে যাই সবকিছুর

 কত জায়গায় লিখে লিখে রাখি তাদের, 

তারপর লিখে রাখা জায়গা গুলোও হারিয়ে যায়

গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিজ্ঞেস করলে, 

দোয়েল পাখির নাম মনে করার চেষ্টা করি, 

কালই দেখেছি পাখিটিকে, দিনের শেষে কথা হয়েছিল

তাদের বাসাও আজ নিলামে উঠেছে, 

কিচির মিচির আর উড়ান নিয়ে চলে যেতে চাইছে আশ্বিনের গ্রহ



যৌনতা নয়   

কোথাও খুব চিৎকার, যুক্তি তর্ক হলে

আমি সরে আসি, খুব বোগাস কোন সিনেমা দেখি

দেখি নায়িকার ব্লাউজ খুলছে নায়ক

কাছেই হয়তো ছিল ক্যামেরা  ম্যান 

মোট কতজন লোক দেখছিল সেই ব্লাউজ খোলার দৃশ্য,  আসলে আমি সহ তা পেরিয়ে গেছে হয়তো কয়েক লক্ষ    

এনামেলের হাঁড়িতে ভাত ফুটছে, 

কোথাও এভাবেই খুলে যাচ্ছে রাতপোশাক বুদ্ধের ভঙ্গিতে, 

তুমি যা ভাবছো, তা কিন্তু  নয়, 

হয়তো সব মিলিয়ে পৃথিবীতে এখন গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হয়েছে

ছেলেরা বাড়ি ফিরতে ফিরতে কিশোরীদের ঢেকে দিচ্ছে হৃদয় উপচানো রোদে

এতো স্বাভাবিক সবকিছু, যেন কোথাও কোন জন্ম নেই, শুধু বেঁচে থাকছে পুরনো মানুষেরা




কৃষিজমিন 


যে তরুণীর গোড়ালি খুব লাল আর মসৃণ, তার সঙ্গেই  বিয়ে হবে রাজার, 

প্রচারিত হয়েছিল রাজপথে ও গ্রামে গ্রামে। 

পিতা নিজের রক্ত দিয়ে মুছে দিয়েছিলেন মেয়ের গোড়ালি, 

মুখ ঢাকা মেয়েরা বসেছিল সারি সারি... গোড়ালি দেখিয়ে ।     

রাজা এলেন।  ধুলোমাখা, ঘাস লেগে থাকা এক মেয়েকে নিলেন ঘোড়ার পিঠে তুলে,

 সবাই সোজা উঠে দাঁড়ালো, মানে গোলাপি গোড়ালির  মেয়েরা !  

কি হলো এটা? 

রাজা কৃষকের মেয়েকে নিলেন ঘোড়ার পিঠে ! ছিঃ ছিঃ! 

 যদিও গল্প, তাও রূপকথার। 

তবু মনে হয়, আমাদের ছেলেরাও একদিন তুলে নিয়ে যাবে সব ফাটা গোড়ালির মেয়েদের,

আচ্ছন্ন শীতে সেই মেয়েরা বিবাহ তুলে দেবে ছেলেদের হাতে। 




ব্ল্যাকবোর্ড 


অবশেষে বর্ম খুলে ফেলেছিলাম

একেই বলে আকুল হওয়া, হয়তো ভরা কদম, চূর্ণ হওয়া, 

ফিরে আসতে গিয়ে দেখি... পারি না

শীতের রোদ সারসের মতো পা ফেলে ফেলে খুৃঁজে নিচ্ছে সন্ধিস্থল, 

বরফ পড়েছে সর্বত্র। হলুদ ঘাসেরা নিচে, উটের মতো বোরিং চাহনি বিকেলের। 

ছাত্রদের মুখগুলো দেখি।

একদিন বললাম, শোনো এই হলো " বিশ্বায়ন  "। 

"জেনে কী লাভ অর্থনীতি ! আমরা তো ব্যবসা করবো ম্যাডাম ",

কিছু ট্যাক্স ফাঁকি, কিছু জবানবন্দি মিথ্যা, ওতে কিছু হয় না।  

ওতে কিছু হয় না ! বলো কি? 

হঠাৎ কেউ চলে গেলে সত্যিই কি কিছু হয় না !  

 লেখা হচ্ছিল না, তিনদিন।

ভাবলাম তবে শেষ, মনে হলো আমার পাশে ব্রহ্মপুত্র নদ। সন্ন্যাসীর পোশাক, নির্বিকার।

দূর থেকে দেখেছিলাম কোনোদিন নীলাচল, ঠান্ডার ঝাপট।

শিরশির করছিল দাঁত, নখ, সাদা কার্ডিগান।

 বাইরে ছেয়ে আছে কাশ্মীরি শালের মতো ওম দেওয়া আড্ডা,

তারা কি নেবে আমাকে?  দু এক দানা আগুন জ্বলতে শুরু করেছে, 

আমি কি যাবো আসলে?

আসলে কি আমি যেতে চাই?

আমি কি কোন আড্ডার কথা তোমাকে ছাড়া ভাবতে পেরেছি?

তুমি কখনো ছিলে আমার সেসব ব্যক্তিগত, বোকা আড্ডায়? 

যেখানে মেধা পুড়েনি, ক্লাসিক্যালের সুর আসেনি? 

দৈনিক সংবাদ অযথা বকবক করে গেছে, 

রেগার টাকা, শীতের কম্বল, ধর্ষণ,  বি পি এল কার্ড, পেঁয়াজের দাম ইত্যাদি, ইত্যাদি।

টিভিতে ধীরে ধীরে পনেরহাজার কৃষকের মৃত্যু, কী অসাধারণ বিশ্লেষণ।

শুনেছি।

শুনিনি। 

আসলে কারো সঙ্গেই আমি কখনো ছিলাম না। 

একা একা।  অবাধ্য।  হিম জমা করাই আমার কাজ, উষ্ণতার দিনগুলোতেও কখনো বা সবসময়।  




একান্তে


একজন কবি ২০১৯ এর

ফেসবুকে নেই, একা গাছ... হেমন্তের

সমস্ত পাতা জড়ো করে রেখেছে বুকে

ঝরতে দেবে না, দেবে না কোনদিন

ঝরে গেলে, পুড়ে যায়

এভাবে নিজেকে কত পোড়াবে গাছ?

সে কিছু রাখেনি নিজের জন্য 

বই , মাইক , মঞ্চ , এমন কী  হাহাকার 

শুধু পাতা আঁকড়ে শীত সহ্য করে, 

নিঝুম রাতে জ্যোৎস্নার আরতি তাকে তান্ত্রিক করেছে ...



গজল    


কেউ অন্যকিছু লিখে দিতে বললে

আমি শুধু বলি, প্লিজ কবিতা ছাড়া কিছু লিখছি না,    

দেখাও কোথায় কবিতা


চোখ বন্ধ করি, মিথ্যে কল্পনা করছিলাম , সবল পংক্তিগুচ্ছ নেই

ধুলো মাটি আলতো মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছি  


ভালোবাসায় ছিলাম বলে কিছু লেখা হয়নি, লেখা যায়নি


সময় লাগবে, অনেক সময়, এই বিজন স্রোত বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে একা, কেন যে জানি না 




নীল স্পর্শক 


আমার  সমস্ত না পাওয়া, তিন চারটে ফোঁস ফোঁস, 

হরতাল, একা রাস্তা, ছেড়ে যাওয়া হাত

চিলের মতো গর্বিত ডানা তাদের

আগলে রাখে সবসময় ধূসরতার নিচে

মনে হয় পালাচ্ছো, মনে হয় ভুলে গেছো

আসলে শীতকাল আমার সব যাওয়া আসার ডাইরি,

লিখতে লিখতে নিজে থেকেই মুছে যায় লাইনগুলো

যদি দেখে ফেলে জলন্ত দেশ, প্রতিবাদী জনতা, অথবা স্বার্থপর আমাকে। 



হলুদ রঙের ঝুমঝুমি 


নতুন কিছু,লেখা হয়নি অনেকদিন

মনে হয় হয়তো পাড়া থেকে হারিয়ে গেছে সমস্ত কিশোর আর তাই আমিও হারিয়ে ফেলেছি রাধাভাব

সীমান্ত থেকে শহিদ হওয়ার খবর আসে ...ভালোবাসার দিনে

কিন্তু যে সংবাদ কোথাও পড়া হয়নি, তা হলো 

বসন্তে জন্ম নেওয়া সেদিনের সমস্ত পাখির দল বোবা ও জন্মান্ধ 

তাই খুব তাড়াতাড়ি  গ্রীষ্মকালীন নিস্তব্ধতা সমাগত,

 এই পলাশ, শিমুলের দিনে, ক্ষীণ মাঘিপূর্নিমায় 

 কয়েকটি বিষাদময় পর্বতশিখর,  বৃক্ষরাজি এখনও  মাথা নত করে আছে  

কিন্তু এতো মৃত্যু আর প্রতিবন্ধী সংবাদের  পরও

আমি রাতের বেলা মাংস কষিয়েছিলাম

পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা ছেঁচা গন্ধ, মাংসের গা থেকে চুঁইয়ে পড়া সর্ষে তেলে গমগম করছিল ভেতর

হৃদয়েও জব্বর  গোলাগুলি হয়, আর ডি এক্স বি়স্ফোরণ যখন তখন

এইসব শব্দ শুনতে পায় আমার প্রয়াত মা বাবা 

মৃত্যুর পর তাঁরা নিষ্ঠুর হয়ে গেছে, আদর করে না

অথচ আমি রোজদিন কিশোরী হয়ে যাচ্ছি একটু একটু করে

মনে হয়, আমার বয়ঃসন্ধিতে দাঁড়াবে এখন নতুন কেউ 

তার মুখে বিকেল ঘনিয়ে আসা জঙ্গলের নির্জন ছায়া  

মনে হয়, আমি  সেই পৃথিবীতে শ্বাস নিচ্ছি, যেখানে কোনোদিন যুদ্ধ হয়নি 

তারপর  আরো ছোট হবো, আমার হাতে ঝুমঝুমি ধরিয়ে দেবে কেউ,  রাজারাণীর গল্প শুনতে চাইবো

তখন সবাই বুঝে যাবে, যাক একে নিয়ে আর ভয় নেই ! 




বিশ্বাসের কাছে নতজানু


এখন রাত নেমে আসছে খুব সাধারণভাবে 

ঠিক যেমন ঈদের রাতে মুসলমানের বারান্দায় বেড়াতে আসে চাঁদ

ঠিক যেমন আমি হালকা করে বললাম

 'এসো '

অথচ কাকে বললাম আসতে জানি না ঠিক

সে হতে পারে  'চাঙ্গা অর্থনীতি ' কিংবা 'জাতীয় সংহতি'


আজকাল আমি প্রায়ই চুপচাপ করজোড়ে বলতে থাকি


"এসো এসো এসো "


বিশ্বাস করি তখন কিছু আসে, 


সে হতে পারে মরুভূমি অরণ্য হয়ে যাওয়ার খবর অথবা ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠা দুজন মানুষ ...




বৈভব


সত্যি বলো তো কি চেয়েছিলে ,

ডানা গুটিয়ে এনে অস্থায়ী কোন আশ্রয়? 

চুম্বন? 

ভালোবাসা?

একসঙ্গে কিছু কাল কথা বিনিময়?

আসলে কি সে সুখ?

জানো না !

আমি জানতাম।

আমি জানি মফস্বল শহরে কোথাও প্রবল স্নেহে শেষবিকেলে রান্না হয়,

 তখন একমুঠো সুখ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সে বাড়িতে ঢুকে পড়ে  ...












কৃষ্ণা


সব তোলপাড় হয়ে গেলে, 

 মানুষ কী করে নিজেকে গুছিয়ে নেয় আবার? 

জানা আছে তো নিশ্চয়ই কোন বিধ্বস্ত মানুষের?


তার কাছে যেতে চাই

হয়তো লোকটির মাথার চুলগুলো ধূপগাছের মতো জ্বলছে গ্রীষ্মের দুপুরে, 

ওর চোখ জ্বালা করা, বুকে মোচর দেওয়া, গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠা শক্ত ডেলা

সবকিছুই কি সে আমার মতো গিলে ফেলে

তার ছোট্ট মেয়ে কী তাকেও জিজ্ঞেস করে, 

তোমাকে কোনদিন কাঁদতে দেখিনি কেন?

আকাশে অনেক মেঘ, ছাতা নিয়ে যাও, 

বলতে বলতে আমি সবকিছুর  অনুবাদ করি

রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই শেখা এসব ফাঁকিবাজি। 



বড়দিন  


ধানসিড়ি নদীটি, সে জীবনানন্দের নয়, নাগাকন্যা, 

 পাহাড়ি বাঁক, লাইসাং থেকে চোখ  মেরেছে  ব্রহ্মপুত্রের  দিকে

দুপাশে  তরুণী হাত, অভয়া অরণ্য জাপটে আছে,  

তুমুল ক্যাটলিয়ার সমারোহ, 

রঙে রঙে খুন হয়ে গেছে ধানসিড়ির জল, ঘোলা জলে ডুবে গেছে ফুলের ছায়া

নদীপ্রবাহের পাশে কাঠ চেরাইের মিল, জলে গাছের শব    

পঁচিশে ডিসেম্বরের সপ্তাহে তিনটে স্টার সারারাত ধরে জ্বলতে থাকে  

শুয়োরের মাংস, কোয়াস সেদ্ধ, নাগা মরিচের ঝালে

বনের জিহ্বায়  স্বাদ ফিরে আসুক, বীজমন্ত, উর্বরা বৃক্ষমেয়ে...

প্রসব ক্ষমতা অনন্ত হোক তাদের, 

যীশুর কাছে বহতা নদীর আর কিছু চাওয়ার নেই, শুধু এই, এইমাত্র ...




( ধানসিড়ি, ভারতের নাগাল্যান্ডের একটি নদী, লাইসাং তার উৎপত্তিস্থল, ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে)  






বীতশোক


উদ্বৃত্ত তো হয়েছি কবেই

তাই চারপাশ থেকে অহংকার কুড়িয়ে এনে বালির পাহাড় বানিয়ে রাখি

সম্মান কমে গেলে যেমন ডেকে ডেকে উত্তরীয় দেখাই


কিন্তু ভালোবাসা সরে গেলে 

মানুষ শিল্পী হতে পারে অনায়াসে 


চলে যেও তুমি তাই নির্বিকারে,

 পাঁচটা বাজতে আর কত বাকি?



ভেন্টিলেটার দিয়ে ঢুকে পড়ছে একান্ত চোরাআলোগলি ! 


ধুলো ঝারার সময় কই,  ম্যাগাজিন থেকে পুরনো কবিদের কবিতা পড়ি 

আশ্চর্য দেখি তারা চেনা যুবকের মতোই, স্পর্ধা আছে, কাম, ক্রোধ সবই 

গভীর  হতাশার কথা রবিবার সকালে  লিখতে লিখতে, 

তারাও লিখেছেন বীতশ্রদ্ধ পৃথিবীবাসের লঘু দুঃখ, বিষাদ ইত্যাদি ইত্যাদি।




বেহালাবাদক 

...................

তাহলে মাঝখান থেকে শুরু করি

রোজা ভেঙে গেলে যেমন বরবাদ মনে হয় দিন 

ধর্মগ্রন্থ পড়া হয় না, অনেকেরই আজকাল

শুধু তার গন্ধটুকু নেয়, কখনো ধূপ, কখনো আতর

ছায়ায় ছায়ায় মারাত্মক যুদ্ধ

হিন্দুস্থান জিতে যাচ্ছে, আসমুদ্র হিমাচল গর্জমান...নতজানু

কী করে যেন বহতা নদী দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে বানানো গল্প,

অন্ধত্বের অক্ষর সুনির্বাচিত। 

 বসন্ত মরসুমে, 

কবিতায় প্রতিবাদ হারিয়ে গেলে, জেগে ওঠো শ্লোগান

শ্লোগান হারিয়ে গেলে, আগুনের কাছে জখম নাও 

তারপর বাকি থাকে চিৎকার, রুচিহীন চিৎকার ...

তবে কি তাই হবে আগুনওয়ালা, বাঁশীওয়ালা ?

... ও বেহালাবাদক বলো না? 











 



লেখক পরিচিতি


.... চিরশ্রী দেবনাথের, জন্ম1979 এর 12 ফেব্রুয়ারি উত্তরপূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার।  দুজনেই প্রয়াত।  তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করেন। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি।  বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন। পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প প্রথম পুরস্কার, স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার, ত্রিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ  প্রতিযোগিতায় প্রথম  পুরস্কার। তার লেখা  অনুগল্প, "আনন্দবাজার স্কুলে "তে প্রকাশিত হয়েছে। এখনো কোন গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়নি। ছয়টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। যথাক্রমে, "জলবিকেলে মেঘের ছায়া ", "ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় ", "প্রেমে সন্ত্রাসে ",  "শুভ দ্বিপ্রহর ", "ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স "    "উড়িয়ে দিও "। একটি গল্প সংকলন, "মায়ারাণী "।

২০১৯ এ, সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মান পেয়েছেন। 

 'কীর্ণকাল' নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন চার বছর ধরে। 

কবিতা ভালবাসেন তাই লিখে যেতে চান। কবিতায় নিজের কথা, মেয়েদের কথা বলতে ভালবাসেন।
















কীর্ণকাল ---সহিতসৃষ্টির প্রবহমানতা



‘কীর্ণকাল’ –সহিতসৃষ্টির প্রবহমানতা 


চিরশ্রী দেবনাথ


পৃথিবী এখন কবিতার জন্য থমকে আছে। এসময় কবিতার। স্বাগত এই ক্রান্তিকাল, স্বাগত  কবিতা বসন্ত,আজ যে কবি আর লিখবেন না বলে শূন্যচোখে তাকিয়ে আছেন, তার সামনে দুরন্ত সময় প্রেমিকার মতো বসে আছে। বাহুডোরে বাঁধো তাকে, বিলীন হয়ে যাক সকল অপারগতা।  কবিতা কখনও স্লোগান, কখনও সোজাসাপটা বিবৃতি, কেউ বলবেন কবিতা কেন চিৎকার হবে , সে তো ছায়াচ্ছন্ন আত্মপরিক্রমা যা একসময় মহাকালের সঙ্গে লীন হয়ে যায়, আবার

কখনও মনে হয়, পৃথিবীর সকল দেশের কবি যেন একটি কবিতাকেই দীর্ঘ করছেন, তবে কি  ফুরিয়েছে কবিতাবোধ, তখনই হৃদয়ের আর্তি বলে দেয় থামলে চলবে না, খারাপ হোক, ভালো হোক রুদ্ধ সময়ের বাহক হতে, ঘাতক হতে কবিতার কাছেই নতজানু হতে হবে বার বার। " কীর্ণকাল " এই কবিতাবসন্তের একটি সবুজপত্র, সূর্যাক্ষরে লেখা তার প্রতিটি নিঃশ্বাস। 


এরকমই একটি ইচ্ছে নিয়ে  আমরা চার বন্ধু 

 মৌলিক মজুমদার, রাহুল সিনহা, চিত্তরঞ্জন দেবনাথ এবং আমি  একটি 

সাহিত্যপত্রিকা  কীর্ণকাল প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেই ।  

চিত্তরঞ্জন দেবনাথ পত্রিকাটির সহ সম্পাদক।

মৌলিক মজুমদার এবং রাহুল সিনহা মুখ্য উপদেষ্টা। আমি সম্পাদকের দায়িত্বে। লেখা চারজনে মিলেই সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। কারো সময় কম থাকলে সে করে না।

পত্রিকাটির ব্যয়ভার আমরা চারজন মিলে সমানভাবে শেয়ার করি। একটি সংখ্যা ছাড়া প্রতিটি সংখ্যাই মুদ্রিত হয়েছে ধর্মনগরের জয়শ্রী অফসেটে। হরিহরদা শুধু এই প্রিন্টিং প্রেসটির মালিকই নন তিনি লিটল ম্যাগাজিনের একজন একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। যতদূর পারা যায় কম টাকায় তিনি লিটল ম্যাগাজিন ছাপানোয় সাহায্য করেন।

এই বিষয়ে একটি ছোট্ট মজার কথা রয়েছে,  আমিও অপটু অনভিজ্ঞ সম্পাদিকা, প্রুফ রিডিং এর পরও প্রচুর ভুল থেকে যায়।  প্রথমবার পত্রিকা ছাপা হবার পর দেখা গেলো কোন মূল্যই ধার্য করা হয়নি পত্রিকাটির। তারপর কিছু কপিতে মূল্য কুড়িটাকা হাতে লিখে দেওয়া হলো। একমাত্র প্রথম সংখ্যাটিরই হার্ড কভার করা হয়। বাকি সংখ্যাগুলো আর হার্ড কভার হয়নি।

কীর্ণকালের একটি সংখ্যার প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন কবি ও চিত্রশিল্পী বাপ্পা চক্রবর্তী।

যাইহোক, কীর্ণকালের হোয়াটস এপ গ্রুপে আমাদের চারজনের অনেক তর্ক বিতর্কের পর অবশেষে, পনের ফেব্রুয়ারি, দুইহাজার সতেরো, সন্ধ্যা ছয়টায়, আগরতলা বইমেলায়, লিটিল ম্যাগাজিন স্টলে, "কীর্ণকাল "প্রথম বর্ষ, প্রথমসংখ্যার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হয় । 

সেদিন সেখানে ত্রিপুরার অনেক লেখকলেখিকাই উপস্থিত থেকে ছোট্ট এই পত্রিকাটির জন্মসময়কে গৌরবান্বিত করে তুলেছিলেন। 

পরবর্তীতে সহ সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দেবনাথের অনুরোধে কীর্ণকালের জন্য একটি লোগো ও নামলিপি  তৈরি করে দেন চিত্রশিল্পী কৃষ্ণধন আচার্য। পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত একেবারেই পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। হঠাৎ এক দুপুরবেলা প্রথমে আমাদের তিনজনের  কনফারেন্স কলে ঠিক হয় পত্রিকা বের হবে।

সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হলো কীর্ণকাল হোয়াটস এপ্ গ্রুপ। চিত্তরঞ্জন সবার ছোট কিন্তু খুব ভালো কবি এবং লেখালেখি বিষয়ে সিরিয়াস, তাকে আমন্ত্রণ করে আমাদের গ্রুপে এড করি,  যে হোয়াটস এপ গ্রুপটি এখনো  আমাদের একে অন্যের লেখা পড়াবার এবং দেশ ,জাতি, সমাজ বিষয়ে নানা মতামত দেবার একটি ভার্চুয়েল খোলা জানলা,  আড্ডার সামান্য প্রাণখোলা বাতাস যা পত্রিকাটি প্রকাশ করার দু তিনমাস আগে থেকে উজ্জীবিত হয় তারপর আবার শীতঘুমে চলে যায়। 

নামকরণ নিয়ে বিস্তর ঝামেলা হলো । যে নামই ঠিক করা হয় দেখা যায় কোন না কোন লিটল ম্যাগের সেই নাম আছে। 

 আমরা প্রথম সম্পাদকীয়তে  লিখি ,

 "কীর্ণকাল " একটি সময়কে তুলে ধরার সাময়িক চেষ্টা। কবিতা একটি অহংকারী অভিমান। সেই অভিমানকে বুকে লালন করে যারা, তারা কীর্ণকালের পথিক। আমরা আমাদের চলার পথে কুড়িয়ে নিতে চাই তাদের কলমের মণিমুক্তোকে। বাংলা কবিতা, সব সময় আধুনিক, নানাভাবে হয়তো বা অজান্তেই হয়ে ওঠে বর্তমান সময়ের মুখ, তাকে গাঢ়ভাবে ছুঁয়ে থাকে অতীত, আর সামনে থাকে একটি উজ্জ্বল বর্তমান। "কীর্ণকাল "এভাবেই যাতে সময়ের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারে, এই  চেষ্টা রইলো। শ্রদ্ধেয় কবি নকুল রায়, আমাদের লিটিল ম্যাগাজিনটির নামকরণ করেছেন।  

কীর্ণকাল পত্রিকাটির ট্যাগ লাইন –”সহিতসৃষ্টির প্রবহমানতা “ এটিও কবি নকুল রায়েরই দেওয়া। 


অভিজ্ঞতায় আস্তে আস্তে সমৃদ্ধ হোক "কীর্ণকাল "। সমস্ত লেখক এবং লেখিকাকে আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ, যারা লিটিল ম্যাগাজিনটির  ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত জেনেও, তাদের মূল্যবান লেখাটি প্রথম সংখ্যার জন্য দিয়েছেন। প্রচ্ছদটি করেছেন শিল্পী মিতালী দেবনাথ। 

প্রথম সংখ্যায় অনেক ত্রুটি রয়ে  গেলো। আগামী সংখ্যায় আশা করবো " কীর্ণকাল " আরো সমৃদ্ধ হবে। একটি ক্ষেত্রে, আমরা এবার ভীষণভাবে আঞ্চলিক রয়ে গেলাম, কারণ, কবি প্রবুদ্ধসুন্দর কর কৃত অনুবাদ কবিতাটি ছাড়া,  প্রথম সংখ্যায় শুধুমাত্র ত্রিপুরার লেখক লেখিকাদের লেখাই থাকছে, পরবর্তীতে "কীর্ণকাল " আপন গতিতে বিস্তৃত হবে।”

তাই বছরে একটি সংখ্যাই প্রকাশিত হবে এরকমই সিদ্ধান্ত নেই ।

তারপর থেকে আটবছরে আটটি সংখ্যা প্রকাশ করে কীর্ণকাল। পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে আমি কাজ করলেও এটা একা আমার পত্রিকা নয়। আমরা চারজনই প্রায় এক বয়সী । মৌলিক মজুমদার আর আমি কৈলাসহরের ,  স্কুল সময়ের বন্ধু । রাহুল সিনহাও আমাদের দুজনের ইয়ারমেট এবং পরবর্কীতে বিবাহসূত্রে সে আমার পারিবারিক ঘনিষ্ঠ জন।  চিত্তরঞ্জন আমাদের চেয়ে দু তিনবছরের ছোট হলেও সমসাময়িক কবিতা লিখিয়ে বলে বন্ধুস্থানীয় ।

আটবছরে আটটি সংখ্যার মধ্যে একটি সংখ্যা কীর্ণকাল প্রকাশ করেছে শুধুমাত্র ত্রিপুরার অনুর্দ্ধ চল্লিশ কবিদের কবিতা নিয়ে।

কবিতার কাগজ হলেও কীর্ণকালের অষ্টম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে ত্রিপুরার গল্পকারদের ছোট গল্প নিয়ে। আমরা প্রথম থেকেই ভীষণভাবে আঞ্চলিক হতে চেয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল শুধুমাত্র ত্রিপুরার লেখকদের লেখা   নিয়েই কীর্ণকাল  প্রকাশিত হবে। তবে নিয়ম যেহেতু নিয়ম ভাঙার জন্যই তৈরি হয়,আমরাও আসাম , পশ্চিমবঙ্গ,  বাংলাদেশ বিভিন্ন জায়গার লেখা নিয়েছি। তবে ধীরে ধীরে দেখলাম খ্যাতিমান কবিদের কাছে যখন নেহাতই শীর্ণ এবং অখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন লেখা চাইত তখন তিনি হয় পূর্বপ্রকাশিত না হয় ওনার লেখা খুব সাধারণ মানের কবিতাটি হয়তো দিতেন। তাই সম্পাদক হিসেবে আমার তখন মনে হতে লাগল আমি বড় লেখকদের লেখা নেব না এবং চেষ্টা করব শুধুমাত্র ত্রিপুরার লেখা নিতে। 

কবিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি অত্যন্ত খুঁতখুঁতে হয়ে উঠতে লাগলাম ।ধীরে ধীরে মনে হতে লাগল এইসব কবিতা প্রকাশ করে কি হবে। কী- ই বা আছে কবিতাগুলোতে।

একজন কবিকে লেখার আমন্ত্রণ পাঠিয়ে কবিতা সংগ্রহ করার পর সেই লেখা পছন্দ হচ্ছে না বলে বার বার লেখা পাল্টে দিতে বলাটা অসম্মানজনক। তারপর তো আর লেখাই পাওয়া যাবে না।

এইরকম পরিস্থিতিতে আমরা চার বন্ধুই এখন মধ্যবয়সে ।এই বয়সে সন্তানদের উঁচু ক্লাসে ওঠাজনিত ব্যস্ততা , বৃদ্ধ মা বাবা ,শ্বশুরশাশুড়ির অসুস্থতা ও মৃত্যু  সব মিলিয়ে 

আমরা পত্রিকাটি দু বছর ধরে বের করতে পারছি না।

তাছাড়াও আমার বড় ভয় , কবিতা চাইব কবির কাছে। তারপর সেই কবিতা পছন্দ হলো না তখন কি করব। এখন নানা দোলাচালে আছি। তবে কীর্ণকাল নিশ্চয়ই আবার প্রকাশিত হবে । ভালো লেখার সন্ধানে কীর্ণকাল ত্রিপুরার প্রকৃত কবিতার মুখ হয়ে উঠতে চায়। তাই ঘন ঘন সংখ্যা নয়,খুব কম সংখ্যাই হোক, কিন্তু তাতে যেন কবিতা থাকে। লিটল ম্যাগাজিনের অহংকারটুকুই তার অস্তিত্বের কারিগর। এতোটুকু আত্মমর্যাদা তো রাখতেই হয়। আমরা আজপর্যন্ত একটিও লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে পারিনি নিজেদের পারিবারিক নানা অসুবিধেয় এবং অনীহা ও  আলস্যের কারণে। তবুও সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনেই আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়,  এজন্য আয়োজক কমিটিদের প্রতি  অসীম  কৃতজ্ঞতা । 


কীর্ণকালের ষষ্ঠ সংখ্যাটি নিয়ে কয়েকটি কথা বলি ।এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ত্রিপুরার চল্লিশ বছর বয়সের নিচের কবিদের কবিতা নিয়ে।  সংখ্যাটির প্রচ্ছদ করে দেন ত্রিপুরার উজ্জ্বলতম তরুণী কবি আম্রপালী দে। তীক্ষ্ণ কবিতা লেখার পাশাপাশি কবি আম্রপালী দে একজন দক্ষ প্রচ্ছদশিল্পী, যার আঁকায় প্রচ্ছদ হয়ে ওঠে বাঙ্ময় । 

এই সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, 

“কবিতা লেখা খুব কঠিন। আবার খুব ঘেমে নেয়ে লেখার জিনিসও নয় বটে। তবে অনেকেই খুব সহজে কবি হওয়ার জন্য আসেন, তারপরেই দেখা যায় আত্মপ্রবঞ্চনার গোলকধাঁধা। কবি কখনো হওয়া যায় না, কবিতা লেখার প্রত্যাশাকে জিইয়ে রেখে যিনি বেঁচে থাকেন তিনিই কবি। একজন তরুণ যখন হাতে তুলে নেন কবিতার পাণ্ডুলিপি, তিনি অবধারিত ভুল সুরে বাজাবেন, সবাই যে পথ চিনে ফেলেছে, পথের ধারে ধারে প্রতিটি সরাইখানা, জঙ্গল, গণিকালয়, পানশালা সবকিছুর নাম যে পথে বিস্তৃত হয়ে বিস্মৃত হয়ে আছে রাতের অন্ধকারে, তরুণ কবিকে প্রথমেই সেই পথের বাইরে অন্য একটি নির্জন পথ খুঁজে নিতে হবে।

কবিতার মতো নান্দনিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আমি ভাবব, তাই আমাকে হতে হবে সুস্থ, শুদ্ধ, আমার মধ্যে পাগলামো থাকলেও আমার লেখা যেন পাগলামো না হয়, শেষপর্যন্ত অস্থির সংলাপ শুধু ব্যর্থ চিৎকার করেই নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলে।  কোন কথাস্বরের কথা বলছি, সময়কে চিহ্নিত করার স্বর?

কবিতার প্রতিটি লাইনই কোন না কোন সময়কে চিহ্নিত করে, কবিকে বোধহয় খুব সচেতন হয়ে সময়ের চিহ্নক না হলেও হয়, যে দুর্বিষহ বিষ, দুঃসহ অনুভূতি মিলে আছে জীবনযাপনে, তাকে আলাদা করে তুলে আনতে হলে বড় মেকি হয়ে যায়, তরুণ কবির প্রথম উত্তরীয়  দীর্ঘ ঘাসের মতো , গরিবখানায় হঠাৎ বেড়াতে আসা

সুলতানের মতো প্রখর রাজনৈতিক, সেই মুহূর্তে তাকে ভুলে যেতে হবে কবিতার কণ্ঠ সর্বদাই  ধাপে ধাপে আসা ডিপ্রেশনের মাইলস্টোনগুলোকে পেরিয়ে যেতে হবে, যেভাবেই হোক।

প্রথম কাব্যগ্রন্থের মতো শ্রেষ্ঠ উপহার আর কিছু হয় না, এই শামুক, পিঁপড়ে, আর ডাহুকের জীবনকে সে কোন ভঙ্গিমায় লিখেছে, সেই মেধাকে ঈর্ষা করবো  বলেই তো দিনের পর দিন কবিতার জন্য বেঁচে থাকা…”

আলোচ্য সংখ্যাটিতে ত্রিপুরার এই সময়ের তরুণ কবি ও  গবেষক অভিজিৎ চক্রবর্তী শূন্য দশকে ত্রিপুরার বাংলা কবিতা নিয়ে একটি সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন যা একটি অমূল্য সম্পদ  হয়ে রইল কীর্ণকাল এবং আবহমান বাংলা কবিতার ইতিহাসের জন্য । 




আপাতত ছোট গল্প নিয়ে প্রকাশিত অষ্টম সংখ্যাই কীর্ণকালের সর্বশেষ সংখ্যা। সেখানেও আমাদের বক্তব্য ছিল, 

“গল্প না গদ্য? যুক্তিতর্ককেই কি আমরা এখন গল্প বলে চালিয়ে দিচ্ছি না গল্প হারিয়েছে তার পুরোনো বিন্যাস?

শ্লথ হয়ে নেমে আসা তারপর চৌম্বকীয়  আকর্ষণে  গল্পের মধ্যে পাঠককে ঢুকিয়ে দেওয়া।

তবে যদি হয় একটি কথোপকথন? হয়তো বা ভেতর থেকে আসল গল্পটি সামান্য উঁকি  দিয়েই চলে গেল।

সাধারণ পাঠকরা নাকি এখন ধৈর্যহীন। তবে এখন কি গল্প আমরা অর্ধেক পাঠকের জন্য লিখব? যার কাছে বৃহত্তর পাঠপ্রবাহের কোনো মূল্য নেই সে চায় খুব ছোট একটি পরিসরের টুকরো টুকরো বিন্দুর মতো কিছু একটা অথবা সেই বিন্দুর—

মধ্যেই রয়ে গেছে বৃহত্তর পটভূমিকা যার জন্য কেবল ইঙ্গিতই যথেষ্ট?

আসলে এই সময়ের পাঠক ঠিক কি ধরনের গল্প ভালোবাসেন? পাঠকের উপযোগী করে গল্প লিখবেন না সময়ের কথা না ভেবে নিজেদের মতো করে লিখবেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লেখক নিজেকে ভাববেন, ভাষা বদলাবে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে, ঘটনা বদলাবে, একজন লেখক হতে গেলে এভাবেই নিজেকে তৈরি করার চেষ্টা তিনি করে থাকেন। কোথাও ভাবের ঋণ শোধ করতে গিয়েও পড়তে পারেন। কিন্তু হৃদয়ে একবার নতুন বীজ বুনে দিতে পারলে সেটাই আবার গল্প হয়ে ফিরে আসবে। সাহিত্যে তো শেষ পর্যন্ত মানুষের বুকের কথাই বলে তাই না?

এই সংখ্যায় যে সমস্ত লেখকরা আমাদের গল্প দিয়েছিলেন তারা হলেন 

 মিলনকান্তি দত্ত, অভিজিৎ চক্রবর্তী ,পারিজাত দত্ত,সুমন পাটারী, অনিন্দিতা চক্রবর্তী,শুভদীপ দেব, মুনমুন দেব ,সন্তোষ রায়, অর্পিতা আচার্য, নন্দিতা দত্ত,দেবাশ্রিতা  চৌধুরী,সুমিতা দেবনাথ,মৌলিক মজুমদার

এবং সম্পাদক নিজে।

কীর্ণকাল সবসময় নিজের উদ্দেশ্য ও বক্তব্য নিয়ে স্পষ্ট থেকেছে। সম্পাদকীয়তে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে কীর্ণকালের দৃশ্যমান,  অনুভবময় অবয়বকে,

“​কবিতা একটি স্বতন্ত্র সত্তা, জন্মমাত্রই সে স্বাধীন। কবিতা খুব বিরক্ত হয়, যখন তাকে নিয়ে পাতার পর পাতা গদ্য লেখা হয়। কবিতাকে ভেঙে গদ্য তৈরি করার নাম হলো গণতান্ত্রিক অসহায়তা বা নির্জন ব্যালটবাক্সে সাপের খোলস ঢুকিয়ে দেওয়া। কবিদের অভিমান হয়, যখন কারো কবিতা নিয়ে আলোচনা হয় না, তার কবিতার কোনো লাইন নিয়ে কেউ যখন নানাদিক তুলে লাইনটির বহুমুখিতাকে আরো ব্যাপ্ত করেন না। খোলাপাতায় ছড়িয়ে থাকা সেইসব শ্বাস প্রশ্বাস তো আসলে অর্ধেক রাত্রির পর জেগে ওঠা নির্ঘুম কামনার পদছাপ। কামনাকে কে কবে সাদা আলোর মতো স্পষ্ট করে দেখতে পেয়েছে।

​দু একটি  সংখ্যায় কবিতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও এই সংখ্যায় কবিতা নিয়ে কোনো আলোচনা থাকছে  না। ভালো লাগছে না কবিতাকে কেটেকুটে প্লেটে সাজিয়ে কাঁটা চামচ দিয়ে খেতে। মনে হচ্ছে তাকে শুধু পান করি মাটির ভাঁড়ে, পোড়া দেহের আগ্নেয় যন্ত্রণাসহ।

​আমরা যারা কবিতা লিখছি বা গল্প, উপন্যাস যাই লিখছি সবাই আবহমান বাংলা সাহিত্যের ধারক ও বাহক, কিন্তু কয়েক বছর বাংলা লেখালেখির ভুবনকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, প্রথম ভুবন, দ্বিতীয় ভুবন এবং তৃতীয় ভুবন হিসেবে এবং এই ধারণাটি শুরু হয়েছে আসামের সাহিত্যজগৎ থেকে। এমনকি তৃতীয়ভুবনের কবিতা নামে তারা কবিতা সংকলনও প্রকাশ করছেন। আমার মনে হয়, এই শব্দবন্ধটি আর ব্যবহার করা উচিত নয়। বাংলা ভাষা যতরকম ভাবেই বলা হোক না কেন, তা শেষপর্যন্ত বাংলাই। তাই পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে বাংলা ভাষায় লেখা সমস্ত সাহিত্যই বাংলাভাষাকেই প্রতিনিধিত্ব করে, শুধু প্রথম ও শেষ কথা হলো তা যেন সাহিত্য পদবাচ্য হয়, হৃদয়মথিত করা রস যেন থাকে, তাহলে স্থান কাল পাত্রভেদে তা জ্বলজ্বল করে উঠবেই। এটি একটি ব্যক্তিগত মতামত। মনে হলো কথাটি বলা দরকার, তাই বললাম।

​মাঝে মাঝে মনে হয় কবিতাহীন বিশ্ব কীরকম হতে পারে? বেঁচে থাকার জন্য কবিতা দরকার নেই, কিন্তু পুনরায় বেঁচে ওঠার জন্য কবিতার প্রয়োজন হয়, অন্যভাবে, অন্যরূপে, তাই হয়তো অন্ন বস্ত্রের সংস্থান হলেই মানুষ সৃজনের কাছে ফিরে আসে, খুঁজতে থাকে হারিয়ে যাওয়া রূপোর কাঠি অথবা সোনার কাঠি, সেই কাঠিটি দিয়ে সে নিজের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা রাজকন্যা কিংবা রাজকুমারকে জাগিয়ে তোলে, শিশিরে ভেজা যে পথ জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, সেই পথে হাঁটতে শুরু করে, ঝুলিতে থাকে মধুকরের অদৃশ্য মহল। “

‘কীর্ণকাল ‘ আবার প্রকাশ করব এই বিশ্বাসটুকু নিয়ে আজ এখানেই কীর্ণকালের কথা শেষ করি। ছোট্ট একটি সাহিত্যপত্রিকা,  বলা যায় সে এখনো শিশু। তার অনেক পরিচর্যা দরকার তবেই হয়তো একদিন কীর্ণকাল লাভ করবে দৃঢ় সবুজ শিরদাঁড়া।  



 





পাঠ করো নিভৃতে, চিরশ্রী দেবনাথ

কাব্যগ্রন্থ    



'পাঠ করো নিভৃতে '



রচনাকাল ...২০১৯--২০২১





চিরশ্রী দেবনাথ











ভূমিকা 



এই বইয়ের লেখাগুলো পড়তেই হবে পাঠককে সে দাবি আমার নেই,  এগুলো লিখতে  আমার  ভালো  লাগছিল  তাই লিখছিলাম, লেখাগুলোর বিষয়বস্তুর মধ্যে পুনরাবৃত্তি রয়েছে,  পুনরাবৃত্তি সরাবার প্রচেষ্টাও নেই, যদি কারো ভালো লাগে, পাঠ করবেন নিভৃতে। 

















নির্জন নিমগাছ এবং ...





একজন অসফল মানুষ বলেই হয়তো, 

ব্যর্থ, বিষণ্ণ মানুষগুলোকে আমার খুব ভালো লাগে। 

আমার জন্য এবং তাদের জন্য আমি ভেবে রেখেছি, 

অলস নদী,  নির্জন নিমগাছ, কাঠের বাড়ি, টানা বারান্দা

সেখানে বসে আমরা সফল মানুষদের যাওয়া আসা দেখি। 

তাদের সুখ, ব্যস্ততা, ইগো প্রবলেম  ইত্যাদি।

আর দেখি আমাদের চেয়েও  দ্রুত তারা  চলে যাচ্ছে নিঝুম কোটরে...









 ঝিনুকের স্তব



কিছু মানুষ আছে, 

যারা কোনোদিন কাউকে ভালোবাসার কথা বলতে পারেনি

তারা খুব ভালো মানুষ,  গায়ে মেঘের জামা

অথচ সেখান থেকে বৃষ্টি গড়ায়নি ভুল করেও কোন মুহূর্তে

তাদের ভেতরে অসংখ্য স্তব জমে গেছে, পুড়ে গেছে

তারা কিভাবে ভালোবাসতে চেয়েছিল, কখনো জানেনি কেউ...









যত্নে রেখেছি



এই কান্নাটি আমার তোমার কাছেই  কাঁদতে হবে

আর কারো কাছে গেলে সে ঝরবে না অঝোরে

তা সম্ভব নয়।  চাই না। 

এই কান্নাটি দিয়ে  কি করবো আমি?

কেনো এলো সে আমার কাছে অযথা, অসময়ে? 

কীভাবে যত্ন করি, কোথায় রাখি, যাতে ভেঙেচুরে নষ্ট না হয়ে যায় ...













কবির হাত





অনেক ভিড়ের মধ্যে একখানি শীর্ণ হাত

দীর্ঘ দীর্ঘ  আঙুল, সাদা সরু নখ

 নীল শিরা শরীর বেয়ে  নখের গোড়ায়  থেমে গেছে

 সেখানে জমকালো সূর্যাস্ত হচ্ছে তখন

তির তির রক্তদানা  নিয়ে কাঁপছে পাতলা চামড়া। 



চিনেছো ঠিকই তুমি, এ যে কবির হাত। 

 জাপটে ধরে আছে কিছু প্রতিবাদ ও হারানো ভালোবাসা। 



 চিনবেই ।



 কারণ সেটা তোমারই সেই হারানো হাত,



গিয়েছিলে কোনো একদিন কবিতার কাছে 

নষ্ট হয়ে, রিক্ত হয়ে, এসেছো ফিরে অভিমানে













সায়াহ্নে



এটা হলো একটি বেলাভূমি

সমুদ্র শান্ত, কোন ঝড় আসবে না

তেমন কোন আবহাওয়া সংবাদ নেই

আমাদের মাথার রোদের ছাতা উড়ে গেছে

দীর্ঘ ঝাউগাছ ছায়া হয়ে নেমে আসছে

দূরে যে দু চারটি মানুষ দেখা যাচ্ছে`^

তারা আমাদের সম্পর্কে কৌতুহলী নয়

তাই আমরা নিশ্চিন্তে হাত রাখলাম, পায়ের পাতা ছড়িয়ে দিলাম

সমুদ্র চিল এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত বলে,

আমরা আরো একা হয়ে গেলাম

তারপর সূর্যাস্ত দেখলাম, যুগান্তর ঘটে যাচ্ছে

অথচ কত নির্বিকার ভাবে আমরা ভালোবেসে যাচ্ছি ক্রমাগত







খেয়া ঘাট



আমার কবিতায় কেবলি প্রেমিকের কথা

তারা কারা? আমি দেখেছি কখনো ভালো করে? 

কেমন তাদের চোখের পলক, নিজস্ব সংবাদ

আরো তো মানুষ আছে আমাদের 

দিদি, ছোটোবোন,  ভাই  কিংবা কোনও অতিথি

কিন্তু কবিতা মানেই যেন  শূন্যে ভাসা রেলিং, নীল সমুদ্র, 

যেখান থেকে শুধুই অগম্য ভালোবাসাদের কথা বলাবলি







নিঃসৃতময়



আমাদের একটি ঘর থাক দুজনের

চারটে দেয়াল, চারটে মহাসাগর 

দিনরাত ঢেউ, নীল বেলাভূমি বিছানায়

কিছু না, টুকটাক কথা দুজনের ব্যক্তিগত দিনশেষে

হতে পারে একশ টাকার  হিসেব বা শাহরুখ খানের বুড়ো হয়ে যাওয়া 

একটি টি ভি অকারণ, বাজে সিরিয়েল, 

বদলে দিয়ে খুব গাল দিলাম, ঘুরে ফিরে চ্যানেল বদলে চলে এলাম সেখানেই

ততক্ষণে চার দেয়ালের সমুদ্রে জোয়ার এসেছে, চাঁদ উঁকি দিচ্ছে প্রবলভাবে

নৌকোটৌকা গুলোকে সামাল দিয়ে তুমি ফিরে এলে

টিভির খবরে

আমার পা তখন তোমার পায়ে জড়িয়ে আছে ঝগড়া করবে বলে



আসলে তখন আমরা মিথ্যে মিথ্যে প্ল্যান করছিলাম কোথাও বেড়াতে যাওয়ার

জঙ্গলমহল, মহুয়া গাছ, গির অরণ্য, কেশরবান সিংহ



তারপরই হাসি, 

তুমি বললে এই ভালো 

আমি বললাম কি?

তুমি বললে এই তো চারদেয়াল। 

আমি বললাম কোথায় সেই চার দেয়াল? 



"একটি ব্যক্তিগত দিনের শেষে যেখানে দুজন পাশাপাশি "







চুম্বন



পাহাড়ের গায়ে ঠোঁট রাখলাম    

পাহাড় জানিয়ে দিলো ভেতরে আগ্নেয়গিরি



ঝর্ণার শরীরে ঠোঁট রাখলাম    

ঝর্ণা জানিয়ে দিলো জল নয় অম্লধারা



মাটিতে ঠোঁট রাখলাম

মাটি জানিয়ে দিলো ভেতরে ভূমিকম্পের ভাঙন



শুকনো ঠোঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছি

দুহাতে সরাচ্ছি ম্লান রাজনৈতিক অধিকার





 ঠোঁট রাখলাম পাথরে 

ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে যাবতীয় শুষ্কতা

সামুদ্রিক শোঁ শোঁ কোথায় যেন অন্দরমহলে ধীরে, 



ফিরে এসেছে মন্থর দান অতিক্রম শেষে, 

ফিরে এসেছি আমি ...





















ভাঙা রোদ



তুমি আমাকে ছাতা খুঁজে দিতে বলো

অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে থাকি দূরে, রোদে ভেসে যাচ্ছে সব, 

রঙীন ছাতায় চড়ে কবে চলে গেছে  আমাদের শৈশব

কোথা থেকে খুঁজে এনে দিই হারানো মার্বেল

পৃথিবীময় আরো কত হারিয়ে যাওয়া জিনিস

সেখানে  কি করছে যেন তোমার ছাতাটি, 

এসব আমাকে  বলে কী লাভ? 

আমার মুখে স্যাঁতসেঁতে রাস্তা, ছপছপে জল 

একটু সামলেসুমলে হেঁটে গেলেই তো পারো ! 













সুন্দর  এসে ফিরে যায়

       



তোমার অভিমান

আমার অসম্মতি





তোমার অসম্মতি

আমার অভিমান



পৃথিবীর হৃদয়ে এর চাইতে বেশি 

বেদনানির্ভর চলাচল আর নেই



আমাদের যৌথ বাহুতে যুদ্ধের ষড়যন্ত্রকে হারিয়ে, 

এভাবে কখনো কখনো সাদা ফুলের মতো জেগে ওঠে 

কিছু কিছু ক্ষয়িত সন্ধ্যা











অবিন্যস্ত 



যা যা বলছ সব  মেনে নিচ্ছি    

খাটাচ্ছি না জোর, যেন ছিল সুপ্ত ঋণ

এরমধ্যেই ঘটে যায় বিচ্ছেদ

পত্রপুষ্পপূর্ণ বৃক্ষতলে একদম একা কোনদিন



পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি

বড় জোর হাঁটতে পারে দু মাইল

গলা শুকিয়ে গেলে খেয়ে নেয় আপোষ

পেছন ফিরতে ফিরতে বিকেল

তুমুল হেরেছে আজ আকাশ

ঝলমলে হয়ে আছে ব্যস্ত নীল

যে কান্না ঝরে গেছে কোনোখানে

বালিশে বা বালুচরে, শক্তমুখে

তাকে বলি ' দাঁড়াও ',

 আমার কাছে গুমরে উঠছে ঝাপসা রুমাল  

শুধু ক্লান্তি না এলে অনায়াসে করে দিতে পারি পাটিগণিত

মধুপুরগামী ট্রেনকে বলি থামো, বেমানান গ্রাম্য চিৎকার

সময় শেষ হয়ে এলেও, কেউ তো দেবে পরীক্ষা? 

ঢং ঢং বাজবে বাকি থাকা পাঁচ মিনিট    

আমি যা লিখছি, মাঝে মাঝে

এঁফোড় ওঁফোড় করে দিচ্ছে দাবার বিব্রত অশ্বচাল

কখনো নিঃশেষ হতে হয়, আক্রোশ জমা দিয়েছি কার কাছে যেন...

সে তো রাজা নয়, রাজপাটহীন নক্ষত্র  

স্মৃতিশক্তি নিয়ে সব ঠাট্টা, অসুখ বলে জানি

গোপনে আমি অভিনয় জমা দিয়ে খালি ঠোঁটে

চেয়ে থাকি।





স্পর্শে যেন জাগো  



মানুষ যখন কথা থাকে না

তখন জিজ্ঞেস করে বৃষ্টির সংবাদ

আর কথা জমে গেলে তারা ভিজতে থাকে

আমাদের কথা জমে আছে

ঝরটর, শিলাবৃষ্টি, উপচানো জলাশয় হয়তো

এখন আমরা অভিযোগ করবো ইত্যাদি 

তারচাইতে আগে চলো আদর করে নিই

তারপর যা হবার হোক









নির্ভার  হতে চাই



যারা যারা লেখা দিতে বলেছিল

তারা চলে গেছে, পত্রিকা বেরিয়ে গেছে

আমি দিইনি, এরকম তো কখনো হয়নি  আগে

শুধু কথা বলেছি, এক অনন্ত পরিভ্রমণ

ভেবেছি লিখবো কোনদিন এই পূর্ণগ্রাস

স্তিমিত ঝড়কে ক্ষমা করে দিয়ে, খুলেছি সফেদ রঙ



পাত্র ভরে গেছে কাণায় কাণায়, তৃপ্তি অসীম

সেই আনন্দে মনে হয়, " এসো হে মৃত্যু "

ঘরবাড়ি হোক অন্য কারো, সাজাক তারা 



প্রতিটি প্রিয় ম়ৃত্যু আমাকে দিয়ে যাচ্ছে রুপোলি আঙরাখা,  

ভয়,  অস্থিরতা আর  বহুগামী রেখাপথ...ক্ষমা করো। 









দু বিন্দু দুর্যোগ



কয়েকটি সময় এমনি খালি  চলে যায়

জ্বর ছেড়ে গেলে যেমন কবিতা চলে যায়

নিরন্তর অসুখও তো তেমন ভালো কিছু নয়

 ভেষজ গাছ আনমনে দিয়েছে বল্কল ও  নিরাময়

পরিধেয় বস্ত্র হয়েছে, হৃদয়ের সমৃদ্ধি

আনাচ কানাচ থেকে পড়ে গিয়েছে রক্তবিন্দু দল 

এখন ক্লান্ত হয়ে বসে থাকি কিছুদিন তোমার পাশে

সময় দিতে হবে  না, এমন  কী  কথাবার্তাও

আরো দুখানা পর পর বৃষ্টির মাস, এমনই তো হয়

নির্জন দুর্যোগ শেষ হলে আবার মুখরতা কিছুকাল







দ্বিধা



পুতুলের দোকানে এখন ভিড় কম    

কয়েকটি বার্বি ডল, মিকিমাউস, টেডি বিয়ার সাজিয়ে 

লোকটি অপেক্ষা করছিল কারো জন্মদিনের

ভীষণ রাগ হয়, ভারতীয় পুতুল নেই?

দোকানি সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে এলো ছোটা ভীম   

বার  তিনেক তুলনা করে, বার্বি ডলই কিনলাম

জন্মদিনের বাচ্চাটির হয়তো ভীম আছে, 

তাকে বলা হয় ভীমের শরীরে খুব  জোর 

বার্বি ডলের শরীরে জোর নেই, সৌন্দর্য আছে

ছেলে বাচ্চাটি দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হোক, 

জোর ও সৌন্দর্য, নারী ও জোর, যুদ্ধ ও সৌন্দর্য

 







যেতে দাও বসন্তে     



সমস্ত শহর জুড়ে বইছে বসন্তের শান্ত চলে যাওয়া

মাটির গভীরে যেন জীবন্ত পতঙ্গের একটানা এস্রাজ

এ মধু অনুসঙ্গ  সাহায্য করেছে ছিঁড়ে দিতে বন্ধন

পাতায় পাতায়  সংঘর্ষের জেরে চালু থাক পতনের শব্দ

কোথা থেকে আলো কুড়িয়ে বলো জ্বেলে রাখি রঙঘর

পুকুরের পার থেকে গল্পগাঁছা নিয়ে চলে গেছে যে নারী

সন্ধ্যার গৃহে তার হৃদয়ে শান্ত মল্লিকাবন, ফুলসৌরভ

বসন্তে প্রত্যাখ্যাত হওয়া প্রস্তাব, অশরীরী সে চিরদিন

যত দূরে যাও, অনন্তে প্রোথিত যে, বৃন্দাবনধাম 

সহস্রসুখে তোমাকে ছেড়ে যাবে না সে, অনন্তনাগ

আমিও চিনেছি তাকে,অমৃতের পাত্র ঢেলে গোপন স্নান















বেড়ানো



যেসমস্ত জায়গা গুলো বেড়াবো বলে 

ঠিক করেছিলাম,

ঝিলম নদীর ধার বরাবর একটু খানি হাঁটা

তখন কি খুব হাওয়া দেবে, ঠান্ডা! 

আমাদের আবার ঠাণ্ডা লাগার দোষ



পাঞ্জাবের হলুদ সর্ষে ক্ষেতে ঝলসে দেবো চোখ

আমাদের আবার খুব রোদ সহ্য হয় না, মাথা ব্যথার দোষ,

তবুও না হয় চা খেতাম, ঝকঝকে স্টীলে চলকে যেতো ঠোঁট



" রাজার বাড়ি " নামে একটি গ্রাম আছে

সব গরিব লোক থাকে সেখানে, নীলচে রঙের গীর্জা

সুরকি দেওয়া রাস্তা গেছে অনেক দূর , সূর্য যেন নিশানা

ছোট্ট বেঞ্চ, সেখানে বসব বলেই আসা 



আমাদের আবার হতাশ হওয়ার খুব ঝোঁক

আগে থেকেই শতভাগ অনুমান মিলে যাওয়ার ক্ষোভ



তবুও বুকিং শেষ কবেই, 

আমরাই প্রথম নিসর্গ দূত সব সিজনে

কোনদিন কয়লা খাদান দেখবো, এও ভেবেছি কবে

আমাদের আবার  ভুলে যাওয়ার  দোষ  

নরম অন্ধকারে আঁকা আমাদের নির্জন নোটবুক 









'ক্লান্তি ' এসো না তুমি 





হঠাৎ করে খুব ক্লান্ত লাগছে

মনে হয় একজন আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে আরো ক্লান্ত হয়েছে 



তাকে ভালোবেসে এসব বলতে বলতে

আসল রহস্যময় দ্বীপ ছেড়ে এসেছি 



সামনে নিতান্তই নদীবারান্দা, নৌকাবাটি

এখানে আমার সকল অহংকার শেষ করেছি, এমনকি গন্তব্যও 

যা কিছু আড়ম্বরহীন, তাই দিচ্ছি, স্বঅভিমানে







 চৈত্র



তুমি যাকে ভালবাসলে

আর তাকে দিতে চাইলে তোমার ' না পাওয়া 

অবাক হয়ে দেখলে তার কাছে আছে শুধু 'হাহাকার '

বাধ্য হয়ে তুমিও কুড়িয়ে নিলে সেই  ' হাহাকার '

তারপর খাদের পাশে দাঁড়িয়ে দুজনে

কী ভয় ! কী ভয় ! 

যদি ফিরে আসে আরো বিকট শূন্যতা, 

ভীতু পাখির মতো নামানো চোখ শুধু বলে যাচ্ছে , "নিঃশর্ত, নিঃশর্ত "!











বৈশাখ 

......... 



বৈশাখ এসেছে, দ্বারে দাঁড়িয়েছে

রাস্তা গিলে এসেছে, গিলে এসেছে চৈত্রের প্রতিবাদ। 

মাংস রান্না হচ্ছে, চন্দন সুবাস। 

একটি মেঘকুঞ্জ জমছে, জমছে অনেক জায়গায়,

শহরে , গ্রামে  অক্ষম  হস্তীর বৃংহণে।



আষাঢ় মাসে বছরের গায়ে জল জমবে, কাদা, ক্লেদ, মাঠ ভরে প্রসূতির মেলা,

সব পেটে যাবে, গর্ভে লুটোপুটি খাবে, স্থুল তারা, অনাবৃষ্টির ছায়া কোলে দিয়ে যাবে! 

ভালোবাসো কী তারে? 

উদ্ধত বক্ষ কেটে ফেলেছে সে, 

শাণিত লুন্ঠন এক আগাপাশতলা। 



বৈশাখ এসেছে,

এসেছে বৈশাখ।  

দ্বারে দাঁড়িয়েছে,

রাস্তা ছুঁয়ে এসেছে, ছুঁয়ে এসেছে ঝড়, মেঘের দ্বৈরথ।



পেয়েছে একটি ঘর, অবেলার।  

ঐ যে সে, গালে হাত দিয়ে বসেছে, চূর্ণ ঠোঁটে রাগ দেখাচ্ছে। 

কারণ ছাড়া কাঁপছে কেউ, যেন পৃৃথিবী আমার যুগলবাহুতে।

এই অধিকার যেন কার, আরো কার কার?  

যার চোখে বন্ধক রাখা চক্ষুজোড়া, যার পকেটে খয়েরি চাবি,

সোনালি  জং  ধরা ...







আট মার্চ



 বসন্ত এসেছে, পলাশ জ্বলছে।  

কিছু উড়ন্ত পংক্তি মেঘ হয়ে নেমে আসছে

নীচে ধুলো ঝড় গিলতে থাকা কোনো মেয়ে

আগুন খেতে খেতে উজ্জ্বল হয়েছে ত্বক

নিঃসঙ্গ গোলাপের পাঁপড়ি তার জিনসের পকেটে

আলাদা দিবস হিসেবে সে কিনেছে

পি সি চন্দ্র জুয়েলার্সের সরু চুড়ি আর    

আপোষহীন একান্ত সময়।    

নিজের মৌতাতে মগ্ন হয়ে বিরহ ভুলেছে,

আরো দুটো জিনিস হেলায় উড়িয়েছে, 

' অপ্রাপ্তি ও অপেক্ষা '। 




চিরশ্রী দেবনাথ



বাংলা আমার ভাষা

...................



বাংলায় কথা বলি... তাই ,   

আমরা খুব সহজেই অন্যভাষায় কথা বলতে পারি

আমাদের লেখায় ছড়িয়ে পড়ে ভারতের রঙ

বাংলায় কথা বলি, তাই সবাইকে ডেকে আনি, 

আমাদের হিংসে হয় না, রাগ হয় না,

অন্যভাষার টুঁটি আমরা চেপে ধরতে জানি না

বাংলায় গান গাই, তাই অন্য ভাষার গান এতো ভালোবাসি

আমাদের রান্নায় ভাষার সুবাস

তাই বাংলার মতো নরম আমাদের ক্ষত

রক্তিম রেখায় সেখানে ফুটে ওঠে সকল মাতৃভাষার বিষাদ

 রুক্ষ পাহাড় যে বাংলাকে দিয়েছে প্রান্তিক সুর ...

সেই বাংলা আরো মিঠে, পোড়া আলুর নোনা স্বাদ

আর নির্জন অহংকার বলে যদি কিছু থাকে, 

তবে তা ভাঙাচোরা উদ্বাস্তুর দৃপ্ত বাংলা, বাউলের গড়া তাজা মাটির দেউল।





যাতায়াত





আবার অপেক্ষা করছি প্রেমের

আস্তে আস্তে কেমন করে সে হয়ে যায় অপ্রেম অপেক্ষা করছি তারও। 

মজা সেখানেই, ক্লান্তি সেখানেই, 

পাশে রাখা এক কিবোর্ড, চলাচল ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে শুধু। 

ক্যালেন্ডার থেকে নীচে পরে যাচ্ছে কিছু সরকারি ছুটির দিন, 

এইসকল ছুটির দিনে, 

আমরা কখনো সখনো আধখানা গান শুনেছি 

তারপর কেউ এসেছে, গল্প করেছে দেশের বেকার সমস্যা নিয়ে, 

আমি শুনতে শুনতে ভাবতে থাকি

এখনো কি কোথাও আছে সেই ডাকবাক্স,

যেখানে নিভৃতে শুয়ে আছে কিছু বিশেষ ঘোষণা, ব্যথা আর ব্যর্থতার   ... 







শঙ্খজল



একদিন আপনাকে হারিয়ে ফেলব আমি

একটি ভুলভাল সংলাপের খেসারত হয়তো দেবো

আপনি চলে যাবেন অভিমান করে



আমি কোনো কোনো কবিতা পাঠের আসরে যাবো

মেয়ে তখন অনেক বড় হয়ে গেছে

পুরীর সমুদ্রধার থেকে পুরাতন মায়ের জন্য কিনে এনেছে শঙ্খমালা,

সেটাই পরেছি আমি

কবিতা পড়ছি, চশমার বাড়তি পাওয়ারের নীচ থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে কবিতার রঙ

আমি অনেকদিন আগে আপনার সেই চলে যাওয়াকে বলছি ...

কবিতায় যুদ্ধ নেই, বিপ্লব নেই, অসহায় মানুষের কথা নেই

শুধু চলে যাওয়ার অস্ফুট কিছু কথা আছে ...









পুরোনো জানিয়া



একটি আশ্চর্য অনুভব  হলো আজ

ভেবেছিলাম আমরা পুরনো হয়ে গেছি



আমাদের সন্ধ্যাকাল আর অন্যান্য সময় নতুন  কিছু নয় আর 



কিন্তু যেই না এক  বিকেলে আমরা খুব কাজে বেরোলাম দুজনে

মোষের গায়ের রঙের মতো কিছু মেঘ তখন আকাশে

আশ্চর্য কি ভালোই না লাগছিল হাঁটতে

অথচ কথা হচ্ছিল করোনা ভাইরাস, জিনিসপত্রের দাম ইত্যাদি নিয়ে

তবুও অনেক ভালো লাগছিল ...রাতের চেয়েও যেন কিছু বেশি







মৈথুন



হঠাৎ করে বিকেল নেমে এলো

যেন বহুদিন এরকম বিকেল আসেনি তোমার কাছে

তুমি কী করবে ভেবে পাচ্ছো না তাকে নিয়ে

একটি পাহাড়ি পথ গোপনে রেখেছো আজো বিভাজিকায় 

সেখান দিয়ে সোজা হেঁটে গেলেই বন

না হয় একাই পথিক হলে, 

আরোহন শেষে খুলে রাখলে নির্মল স্বেদ...   







তরুণী কবির প্রতি



সমস্ত নিরাপদ লাইন থেকে নির্বাসিত

মেঠোপথে আছে তোমার অস্থিরতা

আলো আবছায়া হয়ে  হেঁটে যাওয়া

সংসারে থেকে অসংসারী মন, উদোম হাওয়া

মাছের মতো পিচ্ছিল সব বসন্তকাল 



হে নতুন কবিতা লিখতে আসা মেয়ে

মিলিয়ে নিও আমার সঙ্গে তোমার অবিকল ধারাপাত    









 জন্মান্তরে

................

ম্যাপ খুলে বসেছি দুজনে, 

একসঙ্গে আঙুলে আঙুল লাগিয়ে

খুঁজছি আজ , 

যেখানে হবে মধুযামিনী জন্মান্তরে, 

চোখ বন্ধ করে, আঙুল হাঁটতে থাকে,

কোথাও থামতে দিই না আমি ভয়ে, 

যদি হয় আগ্নেয়প্রপাত, সাগরখাদ,

 শ্বেতমরু, অথবা শ্বাপদ অরণ্য! 

  

একসময়, তুমি বলে ওঠো স্টপ ইট্ !

চোখ খুলে ফেলি দুজনেই ভাঙামুহুর্তে, 

দেখি এক ঝর্ণা ঘর! 

স্নান শেষের  গন্ধে ভরে আছে ধূসর দেয়াল,

 

সব সময় পুড়ে গেছে 

ঋতুতে ঋতুতে  শীতের মাঠে মাঠে,

তারা কোন জন্মান্তর রেখে যায়নি। 











হে কবি



আপনি খুব বড়ো কবি 

 ভীষণ বিখ্যাত, জলদ গম্ভীর

দূর থেকে বেশ লাগে দেখতে 

ঐ দীর্ঘ ঋজু দেহ এবং দেহাতীত সেই আঙুলগুলো ! 

আমি আঙুল দেখি, 

জানি এই আঙুলেই আপনি আঁকেন, 

যক্ষ নারীদের ছবি, ক্ষুধা, লোভ আর বালিহৃদয় 

অন্তস্থল থেকে সেই ফর্সা শীর্ণ আঙুলে জমে ওঠে একটু রক্তাভ অনার্য ইতিহাস

আপনাকে দেখি না, শুধু আপনার  বাক্যবন্ধগুলো   আমার চোখের চারপাশে দীর্ঘ পায়চারি করে, 

 এতটুকু পড়ে ভাবছেন 'কে তিনি '

ধরে নিন রবীন্দ্রনাথ, রাত বাড়লে তিনি নিবিড় কবি হোন, 

সকাল বেলায় আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলি...গার্হস্থ্যের । 









একাকী সুখে



একাতিত্ব আজকাল কোলাহলমুখর 

সব নিবেদন লেখা আছে গহনে, যেন হস্তীযূথ, মুখরিত অরণ্য 

একটি সংক্ষিপ্ত জীবন হোক মল্লিকা বনে

ভ্রমরের দংশন হোক আত্মার নিবিড় চরাচরে

এ পর্যন্ত লিখে, আমি চলে গেলাম স্নানে



স্নানঘর ঘিরে আছে পদ্মনাভি, সুরভিত কাম 

আজ আর ফিরবো না অন্য কোন মুহূর্তে 



কবি জয়দেব লিখে দিও, দু পংক্তি অসম সাহসী, 

আমার খোলা পাতায়,

আমি যে  তোমাকে দেখি পৃথিবীর পথে একাকী সুখে। 













প্রাণ 



দহন, দাহ, দগ্ধ ...কারা করে সেখানে বসবাস?

গভীরে নির্জনে সন্ধ্যার ব্যালকনিতে,

 তাদের দেহ ঠান্ডা হয়ে আসে, বহিরঙ্গে সংসার, ঢিঁমে আঁচে, 

আজন্ম কবিতায় তিনটি শ্বাস

 হোক আমার, হোক আমার,  বার বার 







তৃপ্তি



মনে হয় কুড়িয়ে আনি ডালপালা    

দুধর্ষ আগুন জ্বেলে দিই...রান্না হোক

পাট পাট করে গুছিয়ে রাখি আলোর ঘর

তোমাকে  নতুন করে খুব ভালোবাসি, 

যেমন করে বাসা হয়নি আগে

তাহলে কী তৃপ্তি আসবে ! পুড়ে যাবে অনুতপ্ত সময়? 

অস্থিরতাময় এইসব লাইন লিখতে লিখতে

আমার পিপাসা মরে যেতে লাগল, 

শান্ত পাখির মতো ঠোঁটে জমাতে লাগলাম ফলের বীজ, 

আসলে লেখা ছাড়া আর কোনো তৃপ্তি নেই    







  বাবা 



হাফ হাতা সাদা ঘেঁষা শার্ট, বগলে ব্যাগ, ছাতা

আমাদের কারো কারো  বাবা এমনিই  ছিলেন

কালো অথবা ফর্সার কাছ থেকে ফিরে আসা 

 বাবার খুলে রাখা চশমা খাপে মেলাতে গিয়ে দেখি

কাচে লেগে আছে আস্ত এক নদী অববাহিকা,

স্বপ্নের ঘরবাড়ি আঁকা সেখানে, আমার গন্ধে ভরা।









গরাদ 

........



কোথাও  যেতে যেতে দেখি

দেড়কাঠামতো এক টিনের বাড়ি, উঠোন সমেত,



 পেছনে কি আছে ছোট্ট কোন পুকুর, যার ঘাটের জলবালিতে একটি কড়াই রাখা 



দু এক আঁজলা ধোঁয়া বেরোচ্ছে পশ্চিমের একচালা থেকে,

শেষ বিকেলে আহা, কেউ এলো বোধহয় অতিথি হঠাৎ...

অথচ খাওয়া শেষ হলো কি বউটির?

 ভাবতে ভাবতে পেরিয়ে এসেছি কতদূর, একটানা খেজুর গাছ, এলানো রাস্তা, 

সন্ধ্যা হতে হতে এসবই কবিতা বলে তুলে রাখি আজকাল  ...









প্রধানমন্ত্রী 



ধরা যাক একটা লোক। খুব সাধারণ।

তাকে তার মাও ভালো বেসেছিল অভ্যাসের বশে,

একদিন তাকে কেউ জড়িয়ে ধরল

সত্যিকারের জড়িয়ে ধরা

মানে ভেঙে যাচ্ছে পাহাড়, সমুদ্রে ঢেউ উঠছে

আন্দামান বলছে বিপদসীমা পেরিয়ে গেছে, সুনামি নিশ্চিত

দু একটি আগ্নেয়গিরি কার্বন মনো অক্সাইডের  ভয় দেখাচ্ছে

আমি নিশ্চিত লোকটা তখনও নির্বিকার থাকবে। 

ভালোবাসা না পেতে পেতে তারা খুব পাথর হয়, নিষ্ঠুর হয়, 

অনেকটা ঠিক কোনো কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো। 















শীতলপাটি 



আমি বলি, আমাদের  বন্ধুত্বটা অসম

তাই বলেছি " কিছু চাই না "

যদি মনে হয় লাভ লোকসান, দেওয়া নেওয়া  ইত্যাদি 

আশ্রয় চাইনি বলে তুমিও হতাশ, আমিও বর্ষাহীন কদমগাছ 

ভুলভাল কিছু আবহাওয়া সংবাদ, হয়তো আমাকে বদলাতে পারে

তখন কিছু দিও না হয়, হোক না তার পাতালঘেঁষা দাম

এতটুকু তো গভীর হতেই হবে বলো   ! 

এ তো আর দৈনন্দিন নয়,

শখ করে খেলতে আসা বিপজ্জনক আদিম খেলা

সঙ্গীটিও মেধাবী, বহুকিছুই তার  রীতিমতো শেখা  অনেক আগেই





রেইনকোট



আসলে তো কেউ ফিরিয়ে দেয়নি

প্রতিটি মাঝপথ ওনাকে  দ্বিধায় ফেলেছে

অন্যরা বলেছিল তিনি নাকি বামপন্থায় বিশ্বাসী

মৃত্যুর কিছুদিন আগে বুঝেছিলেন

তিনিও আদর্শহীন আসলে, রক্তে মেশাতে পারেননি কিছুই

উপর থেকে ঘাম চেটে কিছু মিছিল করেছেন

শ্লোগানের কথা পরিবারেও ঢুকতে দেননি

তিনি আসলে চামচা হয়েছিলেন, কমিউনিজম এতটা সহজ নয়

তাই ব্যাপক দলবদলেও আজ তার আর নিন্দে করতে ইচ্ছে হয় না

কারণ প্রতিদিন মিছিল মিটিং সেরে ঘামে ভেজা জামা বাইরে রেখে তিনিও ঘরে ঢুকতেন

কাছে আসা মৃত্যুকেও তার তাই ঘোলা মনে হয় আজকাল।











ছায়াসেতু



ছোট ছোট ঘরবাড়ির জঙ্গল পেরিয়ে

এক সেতু, মাঝ বরাবর

আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকেও! 

পা ঝুলিয়ে বসে আছি পুরনো কাঠের ওপর

নীচে জল আর অজস্র ভুল



আমি আসলে বাসি না, বাসতে জানি না

জলের নীচে যেন বাস্তিলদুর্গ

কোন একদিন বিপ্লবী চিন্তাধারা ছিল বেশ

আজ নেতা দেখি না

এই দেখো কেমন করে চলে আসছি রাজনীতির দিকে

তুমি বলছো আমি সুবিধা বাদী



আমি আসলে একটা কিছু বিশ্বাস করতে চাই,

যা বদলে যায় না

সেটা ভালোবাসা বা আদর্শ জাতীয় কিছু হতে পারে



এই তো আবার কেমন নতুন কোন ঝড়বৃষ্টির সাজ,  ভাঙা নক্ষত্রের ঝকমকানি ...

তোমরা বোধহয় নতুন কোন পরিকল্পনা করছো তাই না!  

 এই    অসমাপ্ত বাদলা দিনের, খোলা জানালার? 











বৃত্ত



এগুলো লিখে কী লাভ

তার চাইতে যে লোকটা রাস্তা বানায়, সে অনেক দামি

মনখারাপের বাড়ির সঙ্গে কেমন করে 

জুড়ে দেয় নতুন কোনো বন্ধুর ব্যালকনি

তারা  জল আলো ফেরি করে, জনপদ বানায়

আমি দারুণ আলস্য নিয়ে  প্রলাপ লিখি

কী হয়, কী হয়?

কিছু না! কিছুই না।

তবুও কে যেন বলল সেদিন

এইসব লেখায় পৃথিবীর উষ্ণতা আধাআধি হয়, 

  শীতকাল খুলে ফেলে সামরিক সাজ, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা থেমে যায়

অথচ আমি জানি কবিতা সবসময় লেখা হয় যুদ্ধ লাগার পরে,

লাশ, ধ্বংস, আগুন দেখে দেখে দূরের শহরের সেই ব্যালকনিতে বসে ...













শিল্পী



খুব দ্রুতলয়ে যখন রাগিণী বাজে 

উচ্চাঙ্গসংগীতের শিল্পী ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যান

এই তান, ঝংকার, যন্ত্রানুসঙ্গতা আসলে তার নয় 

সুরের শরীরে শুয়ে থাকা কঠিন স্তম্ভ,

 মাঝে মাঝে, তারা দেখে যায় হলের ভিড়

সুর বয়ে যায় অনেক নীচ দিয়ে, ক্ষীণ জলধারা...

শেষরাতের মতো 











নির্বাসিত লেখকদের জন্য 

...........

আমি সেসব নির্বাসিত লেখকদের জানি

যাদের হৃদয়ে মাটি  সীমান্তহীন

মধ্যরাতে তাদের খোলা চশমার কাচে দু ফোঁটা জন্মভূমি। 

যে ফুলদান রাখা, চুরুটের পাশে,

চলে যাওয়া নারীর দস্তানার মতো বিগত সুগন্ধে ভরা। 

কোন দেশ নেই তার, আছে শুধু  লেখার চোরাবালি, 

ডুবন্ত সুখ।

সব বই  সবুজাভ ঈর্ষায় তুমুল জনপ্রিয়, 

তবে কী উড়ে বেড়ায় কোন অনিকেত শঙ্খচিল, 

বিদেশি জানালায় ভোরের বেলায়? 

সংঘাতে জ্বলেছিল শব্দ, বিয়ারের বুদবুদ, রাতপোশাকে ফসফরাসের ঢেউ, 

আসলে তারা লেখার শরীর, 

আমরণ পাপ ... সেখানে নিরন্তর ফসলের শিষ। 









মনসা 



পাঁচশ টাকা দিয়ে মনসা মূর্তি কিনে এনেছে যূথিকাবালা

তার পনের বছরের মেয়ে বলে, মা, মূর্তির দেখি দুই চোখ ভালা? 

অথচ পদ্মপুরাণে কয় মনসা বলে কানা  ...

মা কয়,  চুপ চুপ,  দেবতা ! দেবতা ! 

রাতের বেলা মাইয়াটা কালি দিয়া করল এক চোখ কানা, 

মনসা হাসে, ঘুমায়

কত আন্দোলন করছে, এখন তাঁর শরীরভরা ক্লান্তি

আসলে তো ছোবলেরও শক্তি নেই, চক্ষুতে নাই বিষ

শ্রাবণের ভরা নদীর মতো খোলা মন আজকাল 

কী যেন নাম তাঁর... অনার্য দেবী... চ্যাং মুড়ি কানি। 









সানন্দা 



 অবসাদ একটি গভীর অসুখ

বলে যায় সানন্দার দশ নম্বর পাতা

পরের পাতায় স্বাদু খাবার, ব্রণ ওঠা কিশোরী 

তারপর ঝড় আসে, উড়ে যায় পাতার পর পাতা। 

শুকিয়ে গেছে পুরো পরিবার চরম বিষাদে জনবহুল

শহরের ফ্ল্যাটে

জীবন্ত কোমায় চোখের নীচে জমেছিল তাদের নোনা পাথর

কী হয়েছিল তারপর, দেখিনি নিউজ, রাখিনি আর খবর। 

শেষ পাতায় কাটাকুটি ছক, ইচ্ছে করে হারিয়েছি পথ ...পাখার রঙ ধূসর















সোনালি টিকেটঘর 





কৈলাসহরে একদিন ছোট্ট একটি রেলস্টেশন হবে

তার নাম হবে  'ঊনকোটি '  

শহরের অস্থির মানুষগুলো বসন্তের বিকেলে, 

স্টেশনের দিকে হাঁটতে চলে যাবে।

রাস্তার দুধারে নবীন গাছের সারি, 

হাওয়ায় ভাসছে ভালোবাসার গুঞ্জন,

প্ল্যাটফর্মের সিমেন্টের চেয়ারে বসে 

কোনো দম্পতি অপেক্ষা করবে প্রবাসী সন্তানের 

রেলস্টেশন মানে  জীবনের মৌতাত

ভারতবর্ষের রেল মানচিত্রে এ কোনো জংশন নয়, 

অল্প তেল দিয়ে মাখা সামান্য ঝালমুড়ি,

ধূসর শাল গায়ে, একদিন শেষবিকেলে আমিও পৌঁছে যাবো সেখানে, 

ঝরা ফুল কুড়িয়ে ভাবব, স্টেশন মানে হোক শুধু ফিরে আসার গল্প।  

 







উড়ান



মাঝে মাঝে  নিজের কাছে পরিযায়ী হই 

দূর থেকে দেখি আমার  ভেতর

 দূষিত মাংস প্রাচীর এবং  রূপনারায়ণ নদী পাশাপাশি মাখামাখি 

একা ধমণী বয়ে নিয়ে যায় সব ফাঁকি এবং সুধা, 

অসুস্থতা, দুঃস্বপ্ন, বিপন্ন ভোর, সুগন্ধি সকাল ছড়িয়ে পড়েছে কেমন করে মধ্যবেলায়

কোথা থেকে উড়ে আসে  কৌশুলী বিহঙ্গ এক ,

 অবাধ্য মাধবীলতার গুচ্ছ লাল, সংকেত মিথ্যার

তারপর ঋতু বদলে যায়, শীতকাল চারিদিকে, 

উড়ান শেষ হয়, দেহের ভেতর ফিরে আসি। 







শেষ 



নিজেকে লিখি

দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনে উদ্বাস্তু আমি

ফুটনোটে সতেজ ব্যর্থতা, ভুল সারি সারি

এ জমি অনাবাদী, ব্যর্থ শ্রমের চাষ 

দীর্ঘ পথে দুরন্ত কর্কট ছুঁয়ে দিও দ্বিপ্রহরেই, 

সন্ধ্যাকাল শুধু মনখারাপ আনে, শঙ্খ বাজানো শিখিনি...ভজনে অনীহা, সুরহীন। 





















ঘৃণা পাওয়ার পর 



খুব কষ্ট  হলে, মানুষ কী করে

কেউ  কাঁদে, কেউ জ্বলে, কেউ মরে, কেউ পাথর

তখন... তারপর,  কত ঢেউ এসে ফিরে যায়

কষ্ট আর মুখ ফিরিয়েও দেখে না

তার কাছে অকিঞ্চিৎকর দুই একটি খড়কুটো সবসময়ই থাকে...বেঁচে থাকার জন্য।







যখন সময় বৃষ্টিহীন



কোনো একদিন আমি এসব লেখালেখি ছেড়ে দেবো

একটি কবিতা বা তার মতো কিছু আমার আর লিখতে ইচ্ছে হবে না

কালো কালো অক্ষরগুলোকে মনে হবে মেথি দানার মতো তেঁতো

আমি তখন ছোট ছোট টবে হালকা ফুল গাছ লাগাবো, 

নরম পাতা বাহার

আজ দুপুরে যেমন বৃষ্টির বাতাস বইছিলো, তেমনই বইবে তখন

ছোট ছোট কাঠি গাছগুলোর পাশে লাগিয়ে দিতে দিতে বলবো,

জড়িয়ে থাকো তোমরা

আমার কাছে তখন না লেখার সুখ, চেয়ে চেয়ে দেখার আনন্দ

মনে মনে ভাবছি , 

অনেক আগে দিনরাত আমি লিখতাম  যাবতীয় সমারোহ ...









নোনাবালি



 ভালোবাসায় তুমুল থাকতে থাকতে

আমি ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা লিখতে থাকি

আমার শূন্যতা গুলো কীভাবে বাড়বে 

সেই ভয়গুলো আমাকে একটু একটু গিলে ফেলতে থাকে

আমি যা লিখি তখন তা দুরন্ত প্রলাপ, ধ্বংস লেগে থাকে গায়ে 

যা রঙ টঙ করি ধুয়ে মুছে ক্ষীণ বিষাদের মতো সুন্দর হয়ে ওঠে, 

তখন মনে হয়, কেউ যেন তার পরিত্যক্ত নির্জনতা আমাকে  দিয়ে যাচ্ছে সেতারের মতো...









জলের ধারে ডাহুকির পদছাপ 



 ভালোবাসা  খুব স্বার্থপর

সে স্পর্শ চায় না, চায় না ধ্বনির গুঞ্জন,

কেবল শর্ত এবং আরো কিছু শর্ত

হয়তো তবুও ভালোবাসা কখনো চায়

 বৃষ্টির মত স্বচ্ছ আলিঙ্গন

এই কল্পনাকে আমি মধুরঙ দিই একাই

মনে মনে বলি হে মধুকর ভাসাও, ভাসাও    

 

ভালোবাসলে যা যা হয় সব আছে

নীরবতা, শূন্যতা, ভয়, আশংকা, পূর্বাভাস ইত্যাদি

শুধু সন্দেহ রাখিনি, সে আমার বিষয় নয়

এভাবে প্রতিধ্বনির মতো আমি আছি তোমার কাছে

আমাদের মুকুট নেই, ঝরাপাতার পোশাক, ধুলো মন। 

তোমাকে  কষ্ট দিই আড়ম্বরে,  

সেখানে কখনো পেনডেমিকের কথা, 

কখনো ত্রিপুরার লুপ্তপ্রায় বন জঙ্গল, ডাহুকির ডাক 

মৃতপ্রায় পূর্ণিমা রাতে রাবার গাছের ফোঁটা ফোঁটা সাদা রক্ত... যেন বিরহ ঝরছে মন্দ মন্থরে।





তব পাশে 



কবির হাত পুড়ে যাচ্ছে

পা পুড়ে যাচ্ছে

তার সমস্ত হৃদয়ে ছেয়ে যাচ্ছে... আগুন আগুন

চিৎকার হচ্ছে, কী যন্ত্রণা! আহ্!

কবিতা হচ্ছে, কবিতা চলছে নিরন্তর অশ্রু বিনিময়ে। 





কান্না



যখন কাঁদতে চেয়েছি

তখন কাঁদতে দিও হে পুরনো মন্দির 

তোমার সঙ্গে দেখা হলে মনে হয় চরণামৃতের বাটি ভরে গেছে জ্যোৎস্নার কান্নায় 

এখনি তো কাঁদার সময়, 

বৃষ্টি ক্রমাগত ছুঁয়ে যাচ্ছে ফুলের দেহে প্রজাপতির সংঘাত

এই পৃথিবীতে এতো কান্না বয়ে বয়ে যায়

কত বিরহ, মৃত্যু, যন্ত্রণা আর পাপ, কান্না হয়ে গলে গলে যায়

অন্ধকার গভীর হয়ে শ্মশানের পাশ থেকে নিয়ে যায় ঘৃত পোড়া গন্ধ, মৃতের দেহের বাঁশরীর সুর

পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ে কান্না,

 গলাজলে ডুবে গেছে গৃহস্থালি, 

দু এক খন্ড চন্দনকাঠ, গৃহদেবতার আশ্বাস

তবুও নতুন করে যেন কান্নাকে খুঁজে নিতে আসি 

এই কান্নার কাছে হাঁটু মুড়ে না বসলে, অহং এর কাছ থেকে ফেরা যায় না 







জলাভূমি 



মানসভ্রমণে যাচ্ছি পৃথিবীর প্রিয় জায়গা গুলোতে

কথা বলছি অনর্গল, মুক্তহাসি, চোরা টান প্রথম বেলার মতো

যদিও আমাদের জানা জানি শেষ, 

 সব জায়গায় মহামারীর ফেলে যাওয়া ভয়    

তবুও আমি খোস মেজাজে, এ জীবন আমার এরকমই

মেনে নিয়েছি, পাহাড়ের খোঁজ আর করি না অনেকদিন ...    

কিন্তু এইসব ভ্রমণে কার সঙ্গে যাচ্ছি, কে আমার পাশে

বুঝতে পারি না, তার সঙ্গে কথা বলছি শুধু

আমার সকল কথার শেষে কিছু ভালো লাগা জন্ম নিচ্ছে

হয়তো একাই আছি অথবা কারো সাথে নয় 







মেয়েরা যেভাবে কবিতা লিখে

……………


মেয়েরা একটু অন্যরকমভাবে কবিতা লেখে

এ আমার অনুমান

যখন তারা মশলার গুঁড়ো নেয়

খুব ধীরলয়ে ঢুকে পরে হলুদ মরিচের ক্ষেতে

সন্ধ্যা হওয়া দেখে নরম পায়ে  ফিরে আসে

এই ফিরে আসাটাই তাদের কবিতা,

স্নান করতে করতে মুঠোতে ফেনা নিয়ে  চলে যায় সমুদ্রে

ভাসাভাসি আর ঝিনুকদানা কলের জলেই উপচে পড়ে

তখন দেহ জুড়ে যে কাটাকাটি হয়

সেটাকেই তারা পরবর্তীতে কবিতা বলে চালিয়ে দেয়

ঘর গোছাতে গোছাতে  অরণ্যে চলে যায়

শাল সেগুন ইত্যাদি পর্ণমোচী বৃক্ষকে সাবধান করে দিয়ে আসে দাবানল থেকে

হরিণকে সখা করে উপহার চায় মৃগনাভি লকেট

রাতের বেলা এইসব অরণ্য পদছাপ কুড়িয়ে লিখে ফেলে সমূহ উষ্ণ অক্ষর

এজন্য অনেক সময় মেয়েদের কবিতা ঠিক কবিতার মতো হয় না

অন্যমনস্ক ভাঁজ থেকে বালির মতো ঝরে যায় শুধু আবেগ

ঠিকঠাক কবিতা খুঁজতে হয়তো ততক্ষণে সে আবার আগুন জ্বালাতে বসেছে

ফিনকি দিয়ে ছুটছে রুটি পোড়া গন্ধ, নাহ্ এবারও কবিতা হলো না 

কলমকে শান দিতে গিয়ে দু এক দাগ কম হিমোগ্লোবিনে, 

আস্তে আস্তে সে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে,

ঘরের আনাচ কানাচে রোগা রোগা মেধা ধুলোর মতো জমে উঠছে ...













আলোকযানে করে





আলোর  মতো সেজে উঠল দেহ

চন্দনগন্ধে ভরে যাচ্ছে রাতের সমূহ ছিদ্র

আলো ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে জঙ্গমে

নাচ উঠেছে কোথাও, কে গান গায়? এখন বাউলের সুর ! 

মেতেছে জন্মতিল, সুডোল রূপবাক্সে, হুলের মতো আঘাত, লয়হীন পাগলের মতো 

দুটো আলো মিশে যাচ্ছে রাতের জংশনে

শব্দ হলো না, নিঃসাড়ে, নিস্তব্ধে আলো জ্বলেছে এক পাত্র 















পুনর্বার    


যত সব দুঃখদুয়ারী মেয়েরা 

আমি তাদের মধ্যে নেই

কত হাজার সংগ্রামে যাদের কেটেছে পা

আমি তাদের মধ্যে নেই

পুরুষ হাত রাখেনি হাতে

বলে যাদের অভিমান

আমি তাদের মধ্যে নেই

ভালোবাসা নিংড়ে যারা 

পুড়ে গেছে কোনো এক সকালে

আমি তাদের মধ্যে নেই 



সব শর্ত নিজের কাছে বাজি রেখে

একে একে হেরে গেছি সবখানে

কেউ দেখে ফেলার আগে

উন্মুক্ত হৃদয় ভরে গেছে পরাজয়ের সুখে

দোপাট্টা উড়িয়ে পেতেছি হাত আবারো নিখাদ

হে খোদা... হে ঈশ্বর ইনতেজার ফরমাও, আতশ জ্বালাও,

আসমান... এই খোলা আসমান আমার, 

ভুলে গেছি বাকি সব অগ্নিভ প্রতিবাদ



মিছিলে হেঁটে যারা কেড়ে নিয়েছে

অধিকার, আমি তাদের ক্লান্ত পা

ঘরে ফিরে হেঁটে গেছি আধখানা রাত 

বিছানায় যেতে যেতে মেখেছি ক্রিম

 বলিরেখার নীচে আঙুল চালিয়ে

কেড়ে নিতে চেয়েছি দুপুরের রোদ

তারপর বলেছি এই দুরন্ত ভ্রমণে,

 আবারো মেয়ে হতে চাই 

তোমাদের তৃষ্ণার্ত মুখে এঁকে দিতে অরণ্য, 

মেয়ে হয়ে বার বার ডুবে যেতে চাই। 











মোহনায়



দুজন দুদিক থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেললে

আঁচ কমে আসে, নিভন্ত সকাল বিকেল দুপুর

একসময় ঝড়ের পূর্বাভাস আসাও বন্ধ  হয়ে যায়

মনে হয় জড়িয়ে ধরতে হবে প্রাণপনে এই সায়াহ্ন,

দু এক বিন্দু কান্নাকাটি, একটা সময় সব থেমে যায়

তখন দোষারোপ করে, আবার নতুন সিরিজ শুরু করা যায় কিন্তু ! 







 

কৃষ্ণপক্ষ



মনে হয় হাজার হাজার পাখি বসেছিল একদিন আমার শরীরে

অজস্র কথা লিখিয়েছে তারা অবান্তর, 

অনাগ্রহ এসেছে যখন, উড়ে গেছে তারা

খুব কিচিরমিচির দরকার আমার এইমাত্র    

সেই তো নিঃশব্দে খুন করলাম সেদিনও

চিৎকার উঠেছিল , গাছের যেমন হয়

অশ্রান্ত ঢেউয়ের ডাকে আমার অস্থিরতা শুধু বেড়ে যাচ্ছে, ভাসাচ্ছে, পাগল পাগল !

হোক অসম্পূর্ণ, এপর্যন্তই থাক এটা।  দু একটি ঘোর কৃষ্ণপক্ষ নিজস্ব। 





বদল



আমি কোথাও যাইনি, সে এসেছিল, চলেও গেছে কবে কোনসময় যেন,

মুহূর্তকিছু পেয়েছি, বিশ্বাস ভরেছি খোলা বাতাসে

তারপর থেকে অনেককিছু বদলে গেছে

কিছু কিছু থাকা হয়ে গেছে, না থাকার মতো







অনুপস্থিতে



ডেকে গেলাম। 

ছিলেন না।

ফিরে এসে এসব লিখলাম। 

ভালো হয়নি।

গাঢ় হয়ে দাগ পড়ছে না।

 মুন্ডমালা থেকে রক্তপাত ক্ষীণ হয়ে আসছে।

অমাবস্যা হারাচ্ছে নিকষ,

ফ্যাকাশে সূর্যভূমি আমাকে ডাকছে। কী হবে জানি না।





শ্বেতপত্র



মাঝে মাঝে রাত কাতর নাছোড়

ঘৃণা থেকে ঘুরে এসে শরীরে মেখেছে আতর

মনে হয় কিছু ছেঁড়া পাতা , পরে আছে ধুলো মাখা 

মনে হয় নেড়েচেড়ে দেখি আধখানা তরবারি



আকাশ থেকে পড়ছে  বৃষ্টি আচমকা,

 এ কেমন অগ্নিরথ বাইছি একা

এ কেমন জলসা ঘর, সরস্বতী নিবিড় একা

এ কেমন ফেব্রুয়ারি শ্বেতপত্র দেয়নি জমা



আরো যদি বলো দিতে পারি লিখে

পারমানবিক যুদ্ধ শেষে অন্তহীন তেজস্ক্রিয়তা

যখন আঠারো উঠছে কেঁপে দিগন্তে ডুবছে ভয়

আমার হাতে নীলাভ সময়,  নামানো মুখ উরুসন্ধিতে, 

আবহ গোত্রান্তরের,

একই গোধূলি ফেলে রাখা ঠোঁটে

মেলাতে হবে এমন কোন কথা নেই

অমিল যার নক্ষত্রের নক্সা, যক্ষ্মাহূতি অনিবার 













রূপসাগরে 



ভালোবাসা যখন মানুষকে ছেড়ে চলে যায়

তার মনে খুব দুঃখ আর শান্তি আসে

অস্থিরতা ও তাগিদ চলে যায়

নিশ্চিন্ত হয়ে বহুদিন পর ফিরে আসে পৃথিবীর কাছে

খুব গরম পড়েছে হয়তো, 

রাত বারোটায় ভাত ভিজে উঠেছে,

তরকারিতে একটু টক টক ভাব 

খেতে খেতে সেই শান্ত মানুষটা ভাবে 

এক টুকরো গন্ধরাজ লেবু হলেই হয়ে যেতো খাওয়াটা,

নির্বিকারতম মানুষ সে তখন, 

বিষণ্ণতার খোলসে হয়তো ফাটল  ধরেছে তার  







শ্লাঘা



কবিদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি যাবতীয় আস্কারা

আমাদের দহনের ভাষ্য 

আমাদের ক্ষরণের নদী

রিরংসার উপপাদ্য

বিরহের স্তুতি

প্রেমের শ্লাঘা

যৌনতার সৌন্দর্য্যায়ন

ক্ষমা চেয়ো নিভৃতে তার অপমানের কাছে  









অভিমান নেই



যে কথা গুলো বলা হয়েছে, সেগুলো না বললেও চলত

আমি যা বলেছি, গিলে ফেলা ভালো ছিল

তবুও বলেছি কম, সাহস ছেড়ে গেছে কবে আমাকে

এখন ভঙ্গুর সময়, সব সংঘর্ষ থাক অপঠিত,

ধুলোমাখা বিকেলের ভীতু ইতিবৃত্ত 

হয়তো কিছু গুমরাহ, কিছু মাথা নীচু

আত্মসম্মানই তো শেষপর্যন্ত সবচেয়ে বড়

আর যা কিছু পোড়ামাটির মন্দির, অনাদৃতা কেউ

কখনো মুছে দিয়েছি পর পর সেতারের শব্দ

তারপর আর মুছিনি, ছড়ে যাওয়ার কষ্ট ভালো লাগে

যাবতীয় লিংক, কপিরাইট দু এক টুকরো অঙ্গারের মতো

কোনো হিংসে হয় না আমার, 

চলে যাওয়ার সময় হলে নীরব থাকা ভালো 

গ্রামের পাশের নিরীহ ধানক্ষেত এমনই হয়

দূর থেকে দেখে... একান্ন পীঠের অভিমান তার জন্মগত, 

যজ্ঞসমিধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর, উন্মুক্ত হয়েছে ঠোঁট, 

 জ্বালিয়ে  রেখেছি কিছু  ক্ষুধা আর আলো ...ভেবে নিতে পারো এটাই দীর্ঘতম







ভোরে 



খুব ভোরে তোমার ঘুমন্ত মুখের সঙ্গে দেখা হয়

তখন রাত নিভে গেছে, ভোর ছড়ানো চারপাশে

এই সময়টি পৃথিবীর বাইরে,

প্রতিদিন অজান্তে ছুটে আসে আমার কাছে 

তাই তাকে পেতে হলে, রাত জাগতে হয়,

প্লেটে দুচামচ গ্রীষ্ম রেখে, বলি,  আমি অচেনা কেউ,

আজ দরজায় বাজুক কলিং বেল, পাখির সুর, 

এখানে এখন থেমে আছে সময়। 







অজানা 



গভীরে তোমাকে আমি সাঁওতাল তরুণ ভাবি

দীর্ঘ এক শাল্মলী তরু, পাহাড় চুড়োতে দাঁড়িয়ে

আছো একা,

আমিও সেজেছি বনজ্যোৎস্নায়

কালো রঙে ছেয়ে আছি, কী রূপ আমার!

তোমার কাছে যাবো বলে,

ধূসর হরিণ শিশুর সাথে সারা রাত পথ হারালাম

দেখেছিলাম তোমাকে, তবুও ফিরে এলাম একা একা,

ঠিক কতটা ভালোবাসলে, যেতে হয় কাছে, জানা নেই এখনো ...। 









সোনালি নেউল 





এখানে চুম্বিত হবার কথা ছিল    

তাই বিষণ্ণ ফ্যাকাশে সবুজ ঘাসে একটি প্রজাপতি

ভালোবাসা হবার কথা ছিল দুজন জীর্ণ মানুষের   

সাগর থেকে এসেছিল নোনা হাওয়া

এতো আয়োজন শেষে, গভীর অন্ধকার হলো

মানুষ ও মানুষী জেগে উঠল ধীরে, উদ্ধত তাদের ডানা    

অনেকদিন পর, কেউ কুড়িয়ে পেল সেই সোনালি মাটি

ভালোবাসার চিহ্নে ভরা, ছুঁতে গেলেই কেঁপে ওঠে শরীর 

ভয় জাগে, বলে শুদ্ধ হও আগে, আকাশে জ্বলুক ধ্রুবতারা











      একাকী মধুর 



এখুনি আমার জন্ম হলো

সেগুন বৃক্ষের মেয়ে, মা বহু দূর থেকে আসা চেরিগাছের বীজ, 

লতিয়ে উঠেছিল কাণ্ড, ভাদ্রের রাতে

ধৈবতে ভাসছিল লাল রশ্মি

জন্মমাত্র, হাঁটতে শিখেছি

কচি চারা, আস্তে মেলেছি ডালপালা 

সবুজ শরীর হয়েছে, নীল চোখ, কেন কে জানে? 

তাতে সন্দেহ হয় পড়শী গাছের

তাদের গুঞ্জন হেলায় উড়িয়ে আমি তরুণী হলাম, মধুর ভৈরবী, অন্য গাছের সৌরভ  পেতে...বৃষ্টিকে আহ্বান করি,

 জঠরে বীজের দহন শুরু হলে গিলে ফেলি

মাটির জঙ্ঘা ছিঁড়ে বেরুতে চাইলে,  চাপা দিই শিকড়, 

এই বনে একাকী অপরূপা আমি, নীল আঁখি, 

পর পর ঝড়  আসে ক্রমাগত,

 স্থির করে দিয়ে যায় আমার মসৃণ কোমরের মায়াবী  মাপ। 









খন্ডিত মুহূর্তে



পৃথিবীর বুকে প্রত্যেকদিন একটি সময়ের জন্ম  হয়। 

খুন , বন্ধুত্বের ভাঙন কিংবা ক্ষুধার মিছিলেও,  তার শরীরে  সুগন্ধির পবিত্র আকুতি

যে পায়নি,  সে পায়নি।  

যে পেয়েছে সে শাহজাদা, আলোর তাজ। 

আমি তাকে দেখতে চাই, সে কী তখন ভুলেছিল গালাগাল দেওয়া

তারপর, "ভালোবাসা হওয়ার" মুহূর্ত থেকে আস্তে করে গড়িয়ে গেছে অপাপবিদ্ধতা। 

রক্তনালী থেকে জন্ম নিয়েছে বিসর্জন,  দুঃখের সম্ভার

ফিরে আসার পথে, দোকান থেকে কিনেছে দাবদাহ

নিজের কাছে ফিরতে চেয়ে, আজ চুপ করে বসে আছে 

শরতের নীল মেঘ, তাকে ঢেকে দিচ্ছে ... ফিরে এসো মুশাফির। 









স্মৃতি 



পুজো এলে মা বাবার কথা মনে হয়

পুজো এলে মনে হয় ভেতরে খুলে গেছে হাট

যারা ছেড়ে চলে গেছে, তাদের শরীরে আমার হাত

জনহীন রাস্তায় মৌন ঢাকিদের আস্তে পথচলা

ঝরে পড়ছে শিউলি, বোঁটা ছেঁড়া কমলা রঙ

বাড়ি ফেরা, বাড়ি থেকে যাওয়া,  গুলিয়ে গেছে সব

কবিতা পড়তে পড়তে, মুগ্ধতা হারিয়েছে হৃদয়ের মাঠ

গান গাইছে অচেনা লোক, যেন পাখা মেলেছে মুগ্ধ শ্লোক

গোটা রাস্তা ও কিছু গর্ত বুকের ভেতর ঢুকে গেছে, 

গাছের ছায়া, নিবিড় নক্ষত্র, কুয়াশাভেজা তৃণদল। 

পতঙ্গের মতো আহুতি শিখতে হবে, উর্ণনাভ ধৈর্য 

 তাই জ্বেলেছি শেষরাতের আগুন পর্বতপদপ্রান্তে

পরিক্রমা শেষে ফিরে যাচ্ছি সুখবিমুখ গাজন সন্ন্যাসী। 









আবাহন





প্রতিদিন ব্যথা নিয়ে যে আনন্দ জেগে ওঠে তাকে প্রণাম। 

ছেড়ে আসতে আসতে প্রলম্বিত হয়েছে প্রেম 

অন্ধকারে নির্ভীক হয়ে ছুঁয়ে এসেছি পরিক্রমা ও পুজো

প্রসাদের মতো কেটে রাখা আছে আত্মরঙ, অগুরু ছড়ানো। 

ঘর থেকে প্রণত আহ্বানে, পুরুষ ফিরিয়ে দিয়েছে যুদ্ধের তরবারি ! 

পাখির ছায়া কুড়িয়ে অবশেষে জেগে উঠেছে চেনা গৃহস্থালি। 









শহরের বিষাদ



  

এইমাত্র শহরটির গায়ে জ্বর এলো, একশ ডিগ্রি তার বিষণ্ণতা, 

কোথাও কেউ কেঁদে মরছে, দুঃখে পুড়ে যাচ্ছে অহংকার, 

ছবিওলা আঁকতে পারছে না, কবি লিখতে পারছে না, 

স্তব্ধ হয়ে গেছে আগুনের নিমন্ত্রণ, অপমানের গাঢ় দাগ 

 পাথর থেকে ঠান্ডা কুড়িয়ে কপালে রেখেছি অভিমান  

রসদ খুঁজতে বেরিয়েছি,স্বপ্নসম্ভবা অন্ধকার , স্রোত ও শব্দ 

উন্মাদের কাছ থেকে ধার নিয়েছি অবাস্তব, পকেট ভর্তি নুড়ি। 

হারিয়ে ফেলেছি কবির বাড়ি, পথ ডুবে গেছে মৃত লেখায়...







মা



মা মরে গেলে 

মেয়েরা খুব একা হয়ে যায়

গরম ভাতে মেয়েটি কি ভালোবাসত

সেটা মনে রাখার শেষ মানুষটি তখন নক্ষত্রের পাশে

তারপর থেকে মেয়েরা একা একা ভাত খায় 

অনেক খাবারের সামনেও তারা একাই থাকে বাকি জীবন



























সমৃদ্ধি 

..................



এটা কিন্তু আলাদা সিরিজ

আগেরটার  সঙ্গে এটাকে মিলিও না

আলাদা বারান্দা, আলাদা রান্নাঘর। 

রোদের চাষ করছি, রাত এখন দেড়টা, শুক্রবার। 

প্রবল বৃষ্টিতে ফলন নষ্ট হয়ে গেছে, 

শিশুর মতো ধান হোক, হাতে রূপোর কৌটা নিয়ে কেউ আসুক

আলপথে, নদীর পাশ দিয়ে দিয়ে। 











হৃদয়ে 

.........

মেয়েরা রোগা মোটা হলে সহজেই বোঝা যায় 

ব্লাউজের হাতা ছোটবড়ো হয় 

তখন সেলাই করি ক্ষয়ে যাওয়া মেদ অথবা জমে ওঠা

সোহাগ 

যেন তারা নিশ্চিত প্রতিবেদন লিখে দেয় বাস্তুগন্ধে  ভরা এই পুরনো ক্ষেতের 

আমি কি জানতাম তখন এখানেই  গুলমার্গ, 

 রেইনট্রি বারোমাস ও দখিনা বাতাস 

 গভীরতম ফ্রিজে গোপনে জমা করি  সুস্বাদু নরম ভ্যানিলা আইসক্রিম,  স্বাদহীন বরফও থাকে পাশাপাশি,

হঠাৎ পাওয়া ব্যথায় চেপে ধরে তার ঠান্ডা অথচ সবল হাত ...













৯১.২৭ দ্রাঘিমাংশকে 

....................



নেট সার্চ করে এবং যারা জম্পুই ঘুরে এসে ফটো দিয়েছে, 

সবকিছু ভালো করে দেখে,

একটি নিঃসঙ্গ অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশে বসলাম



কুয়াশা, পাহাড় আর লুসাই সুন্দরীদের সঙ্গে মিলেমিশে 

দিব্য এক গন্ধ পেলাম, লালাভ পরমান্নসুলভ 

ঘাম ঝরানো জৈবিক, হলদে তরকারির রসা

ভেতরে বুনো সঙ্গীত আছে, গিটারের ছররা



ছেচল্লিশ কিলোমিটার দূরে বসে আমি জম্পুইের লিঙ্গ নির্ধারণ করি

মনে হয় নারী হলে বেশি খুশি হতাম

নির্দ্বিধায় বাহুলগ্না হতাম, খুমপুই ফুলের সই আমরা, 

ভাগ করে  এসেছি হরিদ্রাভ আঙরাখা গত একশ বছর 



কিন্তু  পুরুষালি মেঘ এমনভাবে নেমে আসে চার্চের রাস্তায়

মনে হয় আর না গেলেও চলে সেখানে, 

যদি হয় ভাইরাল ফিভার, জ্বরো বাতাস বেপরোয়া !



শুনেছি, জম্পুই হিলে এক সোনালি স্কার্টের মেয়ে ক্যাকটাসের বাগান করেছে,

সেখানেই উদ্ধত হচ্ছে নাকি পাহাড়ি পশম ...

ঐ ঠিকানাটাই শুধু আমার গোপন প্যাপিরাস, বাকি সব অলিগলি সহজ রহস্যে ভরা ...









জুলাই  মাস

..........

জুলাই মাসের শহর, মন ভেঙে ডুবছে আজ,  

 উন্মুক্ত পায়ের মতো  দুই রাস্তা, নদীর দিকে, দগদগে ঘা

ঝরে পড়ে আছে কৃষ্ণচূড়া থোকা থোকা 

 মুখ ঢেকে আছে শহর,  খুুব কান্না পেয়েছে তার, ভীষণ কান্না

তিনটি মেয়ে গিয়েছে একটু আগে, জীবিত নয় মৃত ...

একদল লোক কাঁধে করে নিয়ে গেছে শ্মশানের দিকে













ফেরারি 

..........

বহুকাল হলো আমার কোন ফেরা নেই

ফিরতে চাইছি,

ডানে সমুদ্র বাঁয়ে পাহাড়, ঝাউয়ের  বসত 

পদচিহ্ন  নেই,  আঙুলের নির্দেশনা নেই

অমাবস্যা জমেছে বালির শরীরে

হাত পা মুখ আর হৃদয় গুঁজে  

আমি সকল " ফিরে আসা " হারিয়ে ফেলেছি

আমাকে কেউ  গালি দাও

চিৎকার করে বলো, এদিকে পথ, এখানে অবসর

যাতে আমি খুলে ফেলতে পারি চিবুকের সকল দ্যোতনা

এই ফিরে আসার পর আমার মুখে শক্ত মাটি দিও, 

প্রাসাদ উঠবে সেখানে,

আমি ফিরে এসেছি, থাকছো কিন্তু তুমিও, 

আয়ুধহীন গৃহযূথ যেন মিশে যাচ্ছি শর্তহীন  আত্মসমর্পণে। 









যাত্রা

......



স্বনির্ভর।

ছোট দোকান ছিল মেয়েটির।

সেদিন দেখলাম শাঁখা সিঁদুর হঠাৎই !

হেসে বললাম, আরে!  কবে, কোথায়? 

বহুদিন আগে কচি ছাপ পেরিয়ে যাওয়া মুখে উত্তর এলো

"দশদা, কাঞ্চনপুর ",দোকান ছেড়ে দেবো

এই শহর থেকে চলে যাবো।

কেউ নেই এখানে ... মা.. বাবা, 

 আর ভাইয়েরা গনগনে ।

বললাম, "ভালো থেকো "

চোখ না উঠিয়ে হাসলো

সে হাসির, তিন চার রকম অর্থ হয়

এই হাসি মাঘের শীত মুঠোতে নিয়ে উষ্ণতা দিতে জানে

অথবা, 

এই হাসি আমাদের মধ্যে চলতে থাকা অপপ্রচারিত উদাসীন হেমন্ত











দ্বৈত শীত

...............

আজকাল যখন আমি দুজন হই 

একমাত্র তখনই লিখতে পারি 

এভাবে ক্রমাগত আত্মপ্রতারক হয়ে যাচ্ছি

জল মেশাচ্ছি দুহাতে সব সন্ধিগভীরে

ফেনা লেগে থাকা দুহাতে আরেকজনকে ছুঁয়ে দেখি

তার চোখ নেই, বুকভরা খনি নেই, খননশিল্পী নেই

দুরন্ত সকাল.. লেখার অন্ধকার দেয় না, দেয় না সঘন কামপ্রভা

 

তাহলে সেই আরেকজন কে সে? 

কেন তাঁর কাছে বন্ধক রেখেছি সুখের অসুস্থতা

আছি আছি নেই নেই, হাতে হাত রাখে কৃত্তিকা রোহিণী     

খুব কাছে যেন অন্যমনস্ক কৃষ্ণদেহ, ক্ষতহীন, গোলাপি রক্ত 

দাহ হয় অন্য কেউ কোথাও কোনখানে , আমি লিখি ধর্মান্তর,  তরুণী শীত,  রূপসী পাহাড়   । 













পৌষ সংক্রান্তির সকালে 

.......................

ট্রেনে যেতে যেতে মানুষের উঠোন দেখি

অস্থির এক নিমগাছ ফেলেছে ছায়া

ছায়াটুকু কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে তুলে রাখছে অবিবাহিতা মেয়েটি 

তেতো লেগে আছে তার মুখে ও দেহে

মনে তার হিংসে খুব, মিথ্যেও বলতে পারে বেশ

শুধু ভালোবাসা পেলেই সে বদলে যাবে

পৌষের হিম তুলে নিয়ে আসবে মাঠ থেকে

জানলা খুলে পিঠে বানাতে বসবে, 

ধিকি ধিকি রোদ ঢুকছে তখন আগুনের বেশে, 

তার পাশে  বসে খেয়ে নিচ্ছে নরম আঙুল

খোল করতাল বেজে উঠল অসময়ে

পরিচ্ছন্ন রাস্তায় পৌষ বিদায় নিল এইমাত্র...ই। 



















নিষাদের কাছাকাছি 

.........



মৃত্যু আসার আগে 

 বলব আসতে, বলব দেখে যেতে হবে

ততদিনে হেরে গেছে যশইচ্ছা, কুটোকাটা মনখারাপ 

নিঃশর্ত হয়েছি  সব শর্তে

বৃষ্টির মতো নেমে আসা সেইসব লাইন 

পুনর্লিখিত হোক, চুরি হোক খুব

গ্রীবার কাছ থেকে চুল সরিয়ে

লিখে ফেলুক অন্য কেউ

আত্মার আচ্ছন্নকাল দিয়ে দিতে চাই তাকে নির্জনে, 

তেমন প্রসারিত হাতই খুঁজেছি জাঁহাপনা

আজানের সময় শুকতারাকে  বিদেয় দিয়ে

ভোরের রঙে লোভ করেছি  

আড়ম্বর দেখে সরেছে কলম, 

নিষাদের মতো নিষ্ঠুর হয়েছে সে, ক্ষতের কাছে ফেলে গেছে তির ধনুক  ...











ডোম    



জ্যোৎস্নাবন্ধু দেবকান্ত, বি এস সি পাশ

ডোমের চাকরি পেয়েছে।  অস্থায়ী।  এপ্লিকেশন দিয়েছিল। 

ইলেকট্রিক চুল্লি হলে আর ডোমেরও দরকার নেই

বিদ্যুৎ ছোবলে চিরবির করে জ্বলে যাবে দেহসৌধ প্রত্নময়

আপাতত জ্যোৎস্নাবন্ধু দেবকান্ত, কাঠ ঠেলে ঠেলে দেয়

মৃতদেহ পোড়া গন্ধ খুব প্রিয় তার 

চর্বিসহ অম্লবিধুর শরীরের দহন দেখতে দেখতে 

তার মধ্যে বায়োলজিক্যাল মিথোস্ক্রিয়া হয়,

সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ডোমের ডিগ্রীর নাম 'আগুন '...







বোধন

...........



কবি মারা গেছেন। 

তিনি বেঁচে উঠছেন। 

লোহা গলে গলে মিশে যাচ্ছে আগুনের সঙ্গে

একমুঠো শিশির এখনো তার হাতের মুঠোয়, 

...বাস্প হচ্ছে না, প্রিয় মানুষের ছায়া নিয়ে

টলটল করছে ছেড়ে যাওয়া পৃথিবীর মুখ

একদিন সে ভালোবেসেছিল

একদিন সে অপমান সয়েছিল

একদিন সে চুপ হয়ে গিয়েছিল

তারপরও যেতে পারেনি, সরাতে পারেনি নিঃশ্বাস

কবি চলে যেতে যেতে  না লেখা শ্রেষ্ঠ কবিতাটি  

ছিঁড়ে ছিঁড়ে দিচ্ছেন তাকে

শীতের বনে তারা ছড়িয়ে পড়ছে ট্রাম লাইনের মতো, 

আর  বিকল হৃদযন্ত্র শেষবার চুমু খাবার লোভে

আটকে রাখছে ঘন বাতাস। 











সকল ক্ষতিতে এসো 

...........

চুলগুলো শনের মতো, 

ছবির গায়ে শীত মেঘ , তুষারপাতের সম্ভাবনাও  আছে 

অথচ বিখ্যাত শিল্পী হাঁটুমুড়ে বসে, চোখ নামিয়ে 

 সাধারণ ছবি আঁকতে মন চায়

সন্ধ্যা নামের একটি নদী, সূর্য , বাঁশের ঘর, বেড়া, রাস্তা 

তুলিতে কবেই হারিয়ে গেছে এইসব সাধারণীরা

ঘুরে ঘুরে বিমূর্ততা আসে

আলাদা আলাদা হয়ে ছড়িয়ে পরে কারোর শরীর 

হৃদয় খুঁজে পাওয়া যায় না

ওটাকেই আঁকতে হবে,  মনে হয় সব রঙ শেষ

এতো কথা বলতে বলতে তারা উবে গেছে 

 মনোরমের সমাবেশ কই,  যক্ষিণী বলে " আমাকে আঁকো "

তাকেও  তো রুক্ষ  চুলের আবহে , গালে আদর করে,  ঠোঁটে হিংস্রতা এঁকে প্রাণ দিতে হবে

আজ থেকে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত এই তবে অন্ধকার, এই তবে শেষ ছবি 

ফিরে যেতে হবে, ফিরে যেতে হবে মূলে, সকল ক্ষতিতে

বাগানের  সাদা গোলাপ  নিয়ে একক মিছিল, শবের কাছে কোলাহলে 

যাবতীয় পদচিহ্ন মুছে দিতে  মেঘেরা এসো তখন  মাটিতে,

প্রস্তাব ও প্রত্যাখ্যানচূর্ণের ধূপে বিদ্যুৎ স্পর্শ দিও   । 

     











ইলিশ 



রুপোলি  ইলিশ এক মহালয়ার সকালে

একটুখানি রক্ত কানকো ছুঁয়ে ভাসছে 

শরীর জোড়া পদ্মা, আর এক বুক মেঘনা ...চর্বি ও মাংসে 

উঠোনে শিউলি পড়ে আছে,

তেলে ইলিশ কমলা আর লালে, বাইরে পাতলা কুয়াশা মরছে

অজস্র জল সাঁতরে, নদীর গভীরে চাঁদের ভেঙে পড়া দেখতে দেখতে,

কত নিমগ্ন অভিসার হয়েছে, আঁশ ছোঁয়া কথোপকথন

ঝাঁকে ঝাঁকে জালে উঠেছিল তারা, মৃত্যুও তৎক্ষণাৎ 

রাঁধুনি ভাজছে, মনে মনে ভাবছে সে একজন যমদূতি

নরকের কড়াইতে নাকি পাপীদের এরকম সাজা হয় ! 

কি পাপ করেছিল এই  মাছ তবে?

গভীর জলে ছিল ডুবে যাওয়া জাহাজ,  ভাঙা মাস্তুল

সেখানেই খেলেছে তারা শৈশব, 

মাছেদের ঘরবাড়ি।  শৈবাল ও ঝিনুকে জড়িয়ে।  ভালোবেসে। 

মাছেদের বহুগামী ভালোবাসা পাপ হয়ে উঠে এসেছে

মানুষের ঘরে, এইসব গৃহরচিত দিনে। 









ট্র্যাপিজের মেয়ে

..............

ট্র্যাপিজের খেলায় 

মেয়েটি ঠিক যে মুহূর্তে শূন্যে ভাসছিল

নীচে ঠিক তখুনি অগুনতি নক্ষত্র, বৃষ্টি মেঘ। 

বেঁচে থাকার যাবতীয় হাততালি জড়ো করে, একটি নির্লিপ্ত হাসি

দুহাত বাড়িয়ে দেয় সঙ্গী যুবক

দড়ির ওঠানামায় গাঢ়তম জীবন

 মধু, মাংস আর ভাতের চকিত বিস্ময়

কোনোদিন হাত ছেড়ে দিও বন্ধু

নীচের অবারিত জীবনে  পিচ্ছিল হয়ে উড়বো আমি 

নেশার মতো হাসি ঢাকতে থাকে মেয়েটিকে

 গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সাহসী স্বেদ

...সবুজ আলো আর হাততালিতে

শীতের সকালে  কুয়াশার  দড়ি বেয়ে এভাবেই 

হেঁটে যায় পৃথিবীর শুদ্ধতম তরুণীরা ...









জলমাটি



মনে হলো চার লাইন লিখি 

দেখি বৃষ্টিতে চুপসে গেছে দারি, কমা 

বিরতি মুহূর্ত খুঁজতে গিয়ে আমি কোন হ্রদের ধারে এসে পৌঁছেছি

এক চা ওয়ালা হাত বাড়িয়ে এক গ্লাস দিল, ধূসর গরম ভাঁপ

দেশি হ্রদ, পাটগাছে ভরে আছে জল জল মাটি

দু কথা ভেবেছি মাত্র,  কালো মেঘ থরথর

চারপাশের গ্রাম থেকে চলে যাচ্ছে সেই " নব বিবাহিতা "

আশ্চর্য ! 

নৌকো করে আজও কত পারাপার হয় অনিচ্ছুক জনপদে, 

ছইয়ের ভেতর থেকে একটু হলুদ লাল আঁচল জলদস্যুর মতো বেপরোয়া চাহনি দেয় ...









গুলবাহার

..........

একটা কার্পেট কেনা হলো আজ সকালে, হঠাৎই !

নীল হলুদ রঙ, ডিপ ব্রাউন কারুকার্য অনেকটা ঠিক অভিমানী মানুষের মতো । 

দীর্ঘকায় লোকটি নিয়ে এসেছিল,  গলার স্বর খুব  ভারী,

আমি মনে মনে বলি ' কাশ্মীর ... কাশ্মীর '

 বাড়ি তার বানিহালের কাছে, লাল সূর্য গলছে যেখানে 

যাবার সময় হেসেছে সে, সাদা কালো দাড়ির ফাঁকে

একটি ঠিকানাও দিয়েছে, বলেছে যেতে

তিন সারি রেইনট্রি, দুখানা আপেল বাগান

তারপরই রোজউড কাঠের ঘর তার, ঠিক চিনে নেওয়া যায় 

যদি থাকে ইচ্ছা, খুবসুরত দিল ওউর শান্ত নিগাহ্ 

কার্পেটটি পেতেছি বিকেলে

তখন থেকে বরফ পড়ছে ঘরে    

সার সার গ্রাম, দূরে দূরে সেনা কনভয় যাচ্ছে যাচ্ছে আর যাচ্ছে

অনেক খানি সময় নিয়ে নিয়ে ফিরে ফিরে আসে গুলির শব্দ 

কত দূরে যুদ্ধ হচ্ছে, জানি না ঠিক কতই বা রাত এখন ! 

আমরা তো চিরকাল নিঃশব্দ। 

দু পা হাঁটি, কার্পেটের শরীরে শরীরে 

মনে হলো ডাললেক চুপ করে আছে এ সিজনে

জাফরান ফুলগুলো সাবধানে মাথা তুলছে ... তুলতে হয়

না হলে কাঁদে জাফরানচাষীর মেয়ে 

রোজিনা নাম তার, গরমকাল এলেই নিকাহ্

ভিনদেশি জওয়ান, তাকেই পছন্দ অবশেষে স্নিগ্ধ রোদের দিনে

এতো যুদ্ধময়, এতো বারুদক্লান্ত ভূমি

এতো যে ফোটে টিউলিপ, এতো কান্না তার, 

সবকিছু কন্ঠে নিয়ে,

কাশ্মীরী কবি কবিতা পড়তে এসেছে দিল্লি

বলেছে সে দেশকে ভালোবাসি,

বলেছে সে কাশ্মীরে গরীব খুব

পর্যটক কাবাব খেলে, তাদের খুশি হয়    

বাড়িতে আমাদের  শাক আর মোটা রুটি, 

অল্পস্বল্প প্যায়ার এরমধ্যেই গুটিশুটি। 

আর জানালায়  ক্ষুধা নিয়ে  চেয়ে থাকা বহুদশকের ক্ষিপ্র রাত, এই তো মোটামুটি। 

অথচ জানো কি? 

মরে যাচ্ছে শালের দোকান, ক্ষীণ সূচ ফুল তুলতে পারে না আর। 

নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে শিকারা ঘর, একা একা নির্জনে মাউথ অর্গান বাজাচ্ছে গাইড, 

পৃথিবীর মানুষেরা এসো,

এই গুলবাহার, গুলচিস্তান খুঁশিয়ো কা ভিখ্ মাঙতে আয়ে হে সঁদিও সে। 

পড়তে পড়তে কাশ্মীরী কবি কেঁদে ফেলে

ভুলে যায় হলঘর, হাসিন রাত, আর মেহমান    

ফিসফিস করে বলে, 

তোমাদের শহর এতো শান্ত কেন? 

গুমগুম করে  বলে, 

তোমাদের স্কুল কি বন্ধ হয় না যুদ্ধের জন্য?

হিস হিস করে বলে, 

তোমাদের বিবাহমাস মুবারক   !

হামকো ভি জন্নত দিলাও ! 

এক খিলতি হুঁয়ি শ্যাম, এক গভীর ঘুমে শুয়ে থাকা রাত   । 

পেরিয়ে এসেছি কার্পেটের শরীর, ভয়ে ভয়ে, 

কী জানি কী হয়, যদি কাশ্মীর এসে যায় আমার ঘরে ! 

মার্জিনের বাইরে এসে দেখছি দূর থেকে, নিরাপদে, 

'কাশ্মীর... কাশ্মীর '। 









আছি

.........

আজ কত তারিখ? 

রঙখেলা নাকি, চৈত্রমাস ! দোলপুজো? 

শুনেছি আবির শেষ হয়ে গেছে দোকানে দোকানে

কাল রাতেই কিনে নিয়ে গেছে রাজনীতির লোকেরা 

কিছু কিশোর কিশোরী মুখে নেশার গন্ধ নিয়ে

চষে ফেলছে শহরের মাতাল বাতাস, মনে প্রেম নেই, কেমন হিংস্রতা জেগে উঠেছে তাদের শরীরে। 

এদিকে নহবত বসিয়েছে কোকিলের দল, 

আমের মুকুল, লেবুর ফুল হারিয়ে দিচ্ছে মনখারাপের গন্ধ, 

এতো জোড়ে মাইক বাজছিল সরস্বতী পুজোয় ফেব্রুয়ারি মাসে ! 

পুজোর বেদীতে কেঁপে উঠছিল কলমের হৃদয় , ভীতু ভীতু কালির বিন্দু, 

এইসব রঙখেলা, সরস্বতী পুজো, ভালোবাসার দিন সব মিলেমিশে আমি তোমাকে ভাবি ...

অবয়ব নয়, হৃদয় নয়,

 আমার বেঁচে থাকার মুদিখানায় ভীষণ অনিবার্য, দুজন পাশাপাশি আছি, চলে যাচ্ছে,  এই ভাবনাটুকু।











কন্ঠীবদল

.............

শ্যামলীরাই বোষ্টমী। জেলা উত্তর ত্রিপুরা। গ্রাম "পলাশকুঞ্জ "।

সাড়ে কুড়ি বছরে কন্ঠীবদল।

তখন ফাগুনমাস। বেহায়া বাতাস। দুজোড়া ধুতি চাদর।

পলাশফুল পড়ে পড়ে পিছল হয়ে থাকে আখড়ার প্রাঙ্গন।

তিলক মুছে তিনবার মাছ খাওয়া হয়েছে।

দুবার মুরগীর ঝোল। তিনখানা হিন্দি ফিল্ম। নাচ গান।

এটুকুই অবৈধ বসন্ত। বাকি সব কীর্তন। সপ্তমীর জ্যোৎস্না।

শিউলি, কাঞ্চন, রঙহীন জবা তুলে তুলে নারায়ণের চরণে।

দোলের দিন সবুজ রঙ, গোলাপি আবির, সঙ্গীর পুরাতন মুখে 

ভিক্ষাকষ্ট  শুধু। 

পুন্যের মাস। কার্তিকের কুয়াশা মেখে মেখে শহরের অলিগলি ঘোরা হয়। 

একজন মরল, দ্বিতীয়জনের লগে কন্ঠীবদল। 

শ্যামলীরাই হাসে না। নামগান করে।

তৃতীয়জন এলেই বা কী। বয়স তার এখন সাঁইত্রিশ। 

ভরা হাতে মাছ কাটতে ইচ্ছা হয়। রক্ত ধুয়ে তেলে হলুদে জমিয়ে গন্ধ ছাড়তে ইচ্ছা হয়।

না হয় সন্ধ্যাবেলা একটু তুলসীতলা। বাকি মাছভাত আর রমণ।

সে হবার জো নেই।

 অথচ ভক্তি নেই। 

ঘোর সংসার বুকের ভেতর। 

ঘরবাড়ি উঠোন চুলা আর পুকুরঘাট সমেত।

গাছভর্তি আমের বোল। কষা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে ফাগুন চৈত্র মাসে, আর পুকুরের জলে গা ধুতে ধুতে লাক্স সাবানের ফেনায় ফেনায় ধুয়ে যাচ্ছে বোষ্টমী রঙ। 

তিলকের মারপ্যাঁচ,  তুলসীমালার বৈরাগ্য।

ট্রেনে কইরা আসাম যাওয়ার সময় দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা।

ভরা যৌবন।

 বিবাহের রঙ নাই কপালে। কিন্তু বোঝা যায় মাংস ছুঁয়েছে তারা। কই কন্ঠীবদল তো হয় নাই।

জীবন্ত স্বাধীন। শ্যামলীরাই কীর্তনের সুর তোলে। দশটাকা, দশটাকা দেয় দুজনে।

কয় আশীর্বাদ করো যেন  আজ রোজগার হয়, আমরাও বোষ্টমী, ঘর আছে,  ঘর নাই। বাইরে বেরুলেই  টাকা।

বাড়ি ফিরলে জিগায় টাকা আনছো নি?

তবুও তোমাদের  তো ভণিতা নাই, শ্যামলীরাই তর্ক করে।

হি হি ! ভণিতা ! ছুরির মতো হাসি। নাহ্ ভণিতা নাই, রঙখেলার দিন কৃষ্ণ আসে খেলতে।

তার চোখে দেখা যায় এই  বসন্তকাল।

গোপী মেয়েদের ব্যথা।

কত কত রঙ নিয়ে আমরা পদাবলী লিখে যাই।

`মানুষ ভুল করে ভাবে ধর্মের গান, অথচ এসব

আসলে নাড়ি ছেঁড়া অশৌচ কাল। 













বসন্ত এলো বলে



ফুলকপির কেজি কুড়িটাকা, বাঁধাকপি দশটাকা। 

আরো কুড়ি বছর পর কেউ যদি এই লেখাটি পড়েন,

দামটা আরো একটু বাড়িয়ে দেবেন অনুগ্রহ করে। 

এইভাবে ফাল্গুনমাস প্রবেশ করে কৃষকের ঘরে

শিশির তখন ঝরে যাচ্ছে অভিমানের মতো 

বসন্তকাল তাই শুধু কৃষকবধূর ভাঙা নথ, ধূসর স্বপ্ন।    

 এইসময়  বিবাহের  চিঠি এলে মনখারাপ হয়

সানাই বাজলে, মনে হয়  পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিষাদ

বসন্তের দুহাতে কে যেন দিয়ে গেছে শুধু বিদায়ের অভিশাপ

তার সারা শরীরে পলাশের জমাট বাঁধা কালো রক্ত

প্রেম চলে গেলে মানুষ যেমন ম্লান হয়ে যায়

বসন্ত সেই হেরে যাওয়া বিরহী প্রেমিক, 

গাঢ় ধুলো  যার শরীরে সহস্র শতাব্দী ধরে

মিথ্যে বললাম বোধহয়, বসন্ত এলে মনে হয়, 

পৃথিবী কোথায় লুকিয়ে রাখে তার বিচ্ছেদ, 

আজন্ম  আনন্দ কেনো এই ঋতুর দোহারে, 

অবিরাম পরাগসংযোগে তার ক্লান্তি নেই 

মৃতশরীরের রন্ধ্র থেকে বেজে ওঠে  পৃথিবীর সুর ,   

 শুকনো পাতা ঝরে পরে মাটির দুরন্ত আলিঙ্গনে    

বসন্ত এলো ...তাই তোমার পুরনো চোখে হারিয়ে গেছে

আমার পুরনো চোখ।









ভারবাহী

......

রাজিয়া সুলতানা , নূরজাহান, লক্ষ্মীবাঈ, আরোও কত সম্রাজ্ঞীরা 

আছেন, যুদ্ধে ও শাসনে, তখনও এবং এই সায়াহ্নেও

উড়ছে আতর, রঙের গুঁড়ো তাদের প্রাসাদে

ভগ্নপ্রায় আলোর তলায় আমার কৌতুক রাখি 

 সেইসব স্তিমিত অধরগুচ্ছে যেন বিদ্যুৎ চমকালো 

প্রত্যেকেই ক্ষমতায়নের পর  ভালোবাসার অপেক্ষায় বসে আছে









মুজিবকে বাদশাহি গোলাপ 

....................

একটি  স্বাধীন হওয়া দেশ কে আবার জেগে উঠতে হলে, স্বপ্ন বদলাতে হয়।

হে মুজিব ...

আপনার মতো সরল স্বপ্ন দেখা, 

আমরা বাংলাদেশের যুবক রা ছেড়ে দিয়েছি। 

মুক্তিযুদ্ধের নামে আমরা দিন দিন পরাধীন হয়ে যাচ্ছিলাম

তাঁহাদের কথা, তাঁহাদের গান, তাঁহাদের স্মারকগ্রন্থ

একটি একা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আজকাল যুবকেরা ঘুমোয়

তাদের বুকের মাঝে একটি বাংলাদেশ, ভারতসীমান্ত আর কিছু বিদ্বেষ।

তথাপি মধ্যাহ্নে ভারতীয় যুবকের সঙ্গে দেখা হয়

দুজনের করমর্দন হয়, তারা রকেট বানায়, নতুন গ্রহে যায়, 

যেখানে বেকারত্ব নাই ...বাদশাহি গোলাপের বিলাসিতা আছে। 





২৯/০৬/২০২০, সোমবার, রাত ৯: ৪৫









ভালোবাসার বাড়িতে

.......

ভালোবাসা খুব একা হয়,

যারা ভালোবাসা ভেবে গোলাপ দিচ্ছে    

তারা এখনো জানে না, গোলাপের নীচে নীরবতার সাম্রাজ্য

আগামীতে তারা একা হেঁটে যাবে বলে

তৈরি হচ্ছে শহর, পার্ক, ফুলের দোকান    

এ পথে আমি যখন যাবো, তখন তুমি হেলায় ওড়াচ্ছ স্মৃতি

শীতের ধুলোলাগা পাতার মতো সেসব স্মৃতিস্মারক আমার অসুস্থতা, 

তবুও আমি এখন খুব নিশ্চিন্ত,

হারিয়ে ফেলার পর আর ভালোবাসা হারানোর ভয় থাকে না

আমরা আর একে অপরকে দিব্যি দিই না

আমাদের কল্পনার বাতাসবাড়িতে 

এখন অজস্র দোয়েলপাখির মেলা বসেছে, গানের জলসা

 গোলকধাঁধায় পড়ে, সেই বাড়ি ছেড়ে এসেছি দুজনেই

তাতে হিমেল বাতাস বইছে , রোদের আহ্লাদ

তুমি বন্ধুর কাছে গল্প করছো, প্রেম হলো 'ন্যাকামো '

তাই এসবে হাসি পায়, তার চাইতে অনেক ভালো আছো এখন। 

আমি বন্ধুর কাছে গল্প করছি, ভালোবাসা বলে কিছু হয় না

পুরোটাই  ' ইগোসেন্টার্ড '। 

আসলে ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাচ্ছি দুজনে

সেই ভাঙন ঢাকতে, আমরা আত্মহত্যার ঘটনাকে হেরে যাওয়ার গল্প বলে ঘেন্না করি, 

পৃথিবীতে কেউ চলে গেলে, তাকে ছাড়াও আছে বেঁচে থাকার অজস্র জলঠিকানা,

একথা আমি কোথায় যেন এইমাত্র বলে এলাম উল্লাসে। 

আমাকে ঢাকতে আমি উজ্জ্বল পোশাক পরছি

তোমাকে বিস্মৃত হতে ভ্রমণে যাচ্ছি পাহাড়ে সমুদ্রে

আমার  আংটির নীলাভ পাথর থেকে গড়িয়ে যাচ্ছে তোমার রঙ

তাতে চুম্বন নেই, শ্রাবণ নেই, নেই চোখের ওপর চোখ রাখার অমোঘ তুর্যনাদ

কিন্তু গোপনে খোঁজ রাখছি তোমার

তোমার দেহে কী তেমনি ধাতব ঔজ্জ্বল্য 

চশমার পাওয়ার বেড়ে, চোখ হয়েছে আরোও আবেদনময়

কারা কারা তোমার জন্য মুগ্ধ হয়? সেইসব শুকনো নদীতে কী তবে আমার ছেড়ে আসা জোয়ার?

একসময় আমরা ক্লান্ত হই

প্রতিটি দিনের মধ্যে যে গভীর একটি দিন আছে, সেখানে এসে দাঁড়াই।

কোথাও কেউ নেই, আমাদের ছেড়ে চলে গেছে পৃথিবী। 

আমরা মৌন বিষাদের মতো নিজেদের গিলছি

অথচ আমাদের বাতাসবাড়িতে ভালোবাসার উৎসব হচ্ছে ...

সেখানে তোমার ও আমার নামে আসেনি কোনো আমন্ত্রণ। 









অকিঞ্চিৎকর 

..........

আমাদের কথাবার্তা রইল এখানেই

কাগজকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার এইসব দুঃসময়ে

তারা আর বই হবে না

শুধু আমরা চলে গেলে,

 আলতো করে উঠিয়ে নিয়ে যাবে কোনো লোক এই সমস্ত অতীত, 

হয়তো   "নিন্দে" হবে,  হয়তো নিতান্তই  " অকিঞ্চিৎ "

তবু তারা বই হবে না, বৃক্ষের ছালে আমরা কোনকালেই কিছু লিখবো না

এইটুকু প্রতিশ্রুতি, বাকিটা মহামান্য সরকার জানে। 









পেট্রোল 



ছোট শহরের ছোটখাটো কবিতা পাঠের আসর শেষ হয়,

 মনে হল আমার জন্যেই দাঁড়িয়ে তারা  

 দুইটি তরুণ... 'যুবক' হবে বলে ' অপেক্ষা'

 রেখেছে যেন  রোমশ সন্ধিতে, 

আমি দাঁড়ালাম,

রুক্ষ পাহাড়ের প্রতিধ্বনি তরুণের গলায় 

"আপনাকে শুনবো বলে শেষ পর্যন্ত বসেছিলাম "

ফিরছি, পথের ধুলোর কাছে খুব কষ্টে অহংকারটুকু দিয়ে দিলাম

   ডেনিমের শার্ট আর ছেঁড়া জিনসের  ফাঁক দিয়ে 

বেড়িয়ে আছে সাদা সাদা প্রজাপতির পাখা 

পেট্রোলের দাম শুধু  বাড়ছে জেনেও 

এই সব দেবদূতেরা গন্তব্যহীন ভেজা রাস্তায়  বাইক 

নিয়ে  হারিয়ে যায় যখন তখন ...





দ্বাদশশ্রেণী 

..................

জয়েন্টর  রেজাল্ট বেরুলে

কিছু তরুণের মাথা ঝুঁকে যায়

ঘর অন্ধকার করে তাদের বাবারা বসে থাকে

 বিপর্যস্ত মার্কশীট অজস্র রিংকলস্ এঁকে দেয় মার চোখে একরাতেই

ছেলেটি কিন্তু জানতো কেমিস্ট্রি তার নয়, সে তো 

অন্য ফুলের মালী

কিংবা ফিজিক্স, তার কাছে রেখে গেছে মৃত পাখির শব

ম্যাথমেটিক্স  ডুবিয়েছে তাকে, আসলে বাজতে চেয়েছিলো অন্য সেতার হৃদয় কেটে

এই  তরুণেরা অসময়ে নির্ভুল ভালোবেসেছিল কাউকে

হারিয়েছে সময় বাই সাইকেলে আর খাতার পেছনে, 

দ্বাদশশ্রেণী বড়ো ভুল করে, প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে আনমনে শুধু অ্যাসিড ঢালে ...

কেয়া দিদিমণি তুমি সবুজ শাড়ি আর পরে এসো না। 













দোলযাত্রা



দোলযাত্রায় বসন্ত নিয়ে আসে রাত নাম্নী মেয়েকে 

 দিনশেষে রাত একটু বিশ্রাম, বিনিময় ভালোবাসার

দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে চায়ের দোকানি উনুনে জ্বেলেছে  ঘুমহীন রাত

অন্ধকার সরে গেলে পাতলা কুয়াশায় দুধ গুলবে, গোলাপি দিন

মিছিল শেষ করে যুবকেরা ফিরে গেছে, হাত ভর্তি  গুলাল

রাতের আড়ালে তারা  হাতে তোলেনি নেশার গ্লাস, 

কৃষকের প্রলাপ আর অম্লজল জমা করেছে  বুকে 

জন্ম নিচ্ছে শরীরে তাদের দূরাগত খারিফ শস্যের খেত , 

খেলার মাঠ থেকে পকেটভর্তি ধুলো নিয়ে বাড়ি গেছে এক তরুণ, 

কাল আবির মিশবে ধুলোতে,

 ঘামে চিনে নেবে তাকে একান্ত তরুণী...এই বিশ্বাস তার 

গভীরে ভিজবো বলে, 

মৃত মানুষদের  দাঁড়াতে বলেছি স্নানঘরের দরজায় 

আমার আসতে একটু দেরি, দুপুরের রোদ এইমাত্র দিয়ে গেলো দুধওয়ালা

 পুড়ছে ভেতরে কিছু , রক্তহীন ঠোঁট,

 দৈন্য ধুতে দীর্ঘ স্নান হবে ...দীর্ঘতম জলপ্রপাত

আমি কী চিনেছি রঙ, চিনেছি রঙের তফাৎ, মিশ্রণের অসহায়তা 

বন নেই বলে হৃদয়ে, কাঠুরিয়া হেঁটে গেছে, সৈকতে ধূপের গাছ 













শর্ত রেখেছি বসন্তে 



পলাশ একটি  রাজনৈতিক ফুল  , 

পলাশ ফুটলে মনে  হয় গনতান্ত্রিক এই দেশ। 

পলাশ ফুটলে মনে হয়, 

আমিও চিৎকার করি, স্লোগান বলা শিখি

পলাশের সঙ্গে মিশে যায় মিছিলের রুক্ষ পথ    

 তোমার গলায় আজ নকল পলাশের মালা ,

অথচ তুমি কোনোদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে ! 

আরে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি নয়, 

অথবা প্রেম ট্রেম, চুমু টুমু

প্রতিশ্রুতি মানে আমার সকল মৌলিক অধিকার,

তুমি বা তোমরা, কে হও আসলে জানি না

শুধু জানি, প্রতিশ্রুতি মানে, আমার দেশকে ভালো রাখা । 









দীপা...দ্য অলিম্পিয়ান 

.............................



দীপা... একটি গভীর আশার নাম

নাগেশ্বর ফুলের গন্ধে ডুবিয়ে রাখা শস্যনীড় 

 প্রদুনোভা ভল্টে হয়ত ঝলসাবে স্বর্ণশোভা হয়তো বা না

থাকবে একটি অক্লান্ত পেরিয়ে যাওয়া 

থাকবে স্রোতের মুখে জ্বালিয়ে রাখা সবুজাভ আগুন

সেখানে পা রাখবে কচি গাছের দল

একটি পদক, স্বার্থপরের মতো চাওয়া,

ঘাম জেদে মাখামাখি,  এখানে নেই ধাতবস্পর্শ

জেগে জেগে ওঠে  শেষপর্যন্ত শুধু একটি মেয়েরই ঘুমহীন রাত

পদকের পথে গড়িয়ে পড়েছে  কত অপমানের অভিধান

বিলিয়ন ভারতের চোখে মরুজ্যোস্না 

উত্তরপূর্ব ভারতের এই একফোঁটা বৃষ্টি ঝরবে কি?

দীপা ...যদি না ওড়ে ত্রিবর্ণ রঙীন ,

 যদি না বাজে সিন্ধুসঙ্গীত...রিও র আকাশে 

আমরা শুধু জানবো, 

তুমি সেদিন  ঝরেছিলে সবটুকু দিয়ে। 





( রচনাকাল -- 6/12/2016)















কাল্পনিক





ইংরেজী সে জানে ভালো

তুখোড় একদম, যেন সহজাত

শুধু কাঁদতে এলেই, বাংলায় কাঁদে

আমাকে সে বাংলায় ভালোবাসে



হিন্দিতে তার খিস্তি খুব

শুধু অভিমান হলে নীচের দিকে চোখ    

আমাকে দেয় হলদেটে লাইন

ঋতুময় বিষাদ আর শান্ত চোখ 





তার সঙ্গে সংঘাত হয়, ইংরেজিতে গালি,

তারপরই মুখ চেপে ধরা আর নীলচে জামদানি,

চোরাগলিতে ঢুকে পড়ে রাঙা ধুলো বালি    

আমরা বাংলায় মুছে দিই আমাদের জেদ 

ঘনিয়ে আসে বিকেলবেলা, গোধূলির ছাই

তার সঙ্গে পাগলামো হয়, বিষাক্ত শর্তাবলী

সবকিছুই লেখা হয় যেন অন্য ভাষায়

যে ভাষায় তাকে চিনি না আমি

তারপর জল কাদায় মাখামাখি 

বাজে বর্ষা, গরম, মশা মাছি

পলাশের মতো আলো জ্বলে ওঠে

বাংলায় আলপনা দিতে বসি, 

ঠারেঠোরে অপরাধ ভুলি

জানান দিই আমি তাকে

 বাংলায় ভালোবাসি, বাংলাতেই এই মাখামাখি। 













ঝুলন পূর্ণিমা

...............

এই দেখো কেমন আঘাত? 

আমরা তো নিতেই পারি আঘাত। 

এই দেখো কেমন শোক? 

আমরা তো নিতেই পারি ছিন্ন বিজুরি, 

ঘোর যামিনী, নিশীথ নূপুর, কালো ওড়নি 

চলে এসো সখী, বিরহ মন্দ্রিত হোক ধীরে

তারপরে চলে যাবো গেহে, সম্ভ্রান্ত শয়নে

 এ উচ্ছলতা ছাড়া সবই পবিত্র আছে, ছুঁয়ে দেখেছি নিজেকে















রবিপ্রণাম 

............



আমি ফিরে আসি প্রতিদিন তাঁর কাছে

যাবতীয় ভুল, অপমানসূত্রতা কাঁধে নিয়ে

সায়াহ্নে  রূপসাগরের জল ছুৃঁয়েছে ব্যর্থতা

যেন কিছু নয়, যেন কিছু নয়, যেন আকাশ আমার বিষয় নয়

রৌদ্র, শুষ্কপত্ররাজি ক্লান্ত বাতাস কোনটাই আমার  ভাষ্য নয়, 

 কোথাও জমছে খনি, জমছে বারুদ, তৈরি হচ্ছে বিরুদ্ধ প্রাচীর

আমি কী তবে লিখবো  বাতিল অসহায়তা

কোথা থেকে আনবো ঈশ্বর, চোখের জল, সুরাসুর সমাগম

এই যে লিখি অন্ধকারের সমাপতন

লিখতে লিখতে বার বার বদলে যাই

তোমাকে দেখি রবি... রবিকে দেখি

দীর্ঘ,  দীর্ঘতর, ঋষির মতো, বিনয়ের মতো, ঔদ্ধত্যের মতো

যেন রেখেছো হাত আমার সকল তুচ্ছতায়

তব প্রাণে মিশে যেতে যেতে ভাবি

অক্ষরে অক্ষরে ফুলশোভিত যুদ্ধক্ষেত্র, দৃপ্ত আলিঙ্গন, ঝড়ের জানালা সব রেখে গেছো

এখানেই দুটো ভাত বেড়ে খাই, একমুঠো বৃক্ষ জ্বলে, এক সহস্র জলে আমার ধৃষ্টতা মাথা নত করে থাকে।









অসমাপ্ত মেয়েটি



ঠিকঠাক সংসারী হওয়া গেলো না 

মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাই করার অক্ষমতা জন্মগত দূর্বলতা

গ্রীষ্মের কাঁচাফলে হলুদ লবন লাগিয়ে সঠিক রোদে মাপতে পারি না 

খুব গরমের নেশাগ্রস্ত দুপুরে প্রায় বিলুপ্ত ঘুঘু পাখির অপেক্ষা করি

এই পাখিটির ডাক নষ্টালজিক কৈশোরের মতো, 

আজীবন পুরনোকেই সুন্দর বলে, যেন আমি রুদ্ধদুয়ার নবাবের মেয়ে

এ পাড়ার ক্ষণজন্মা বউটিকে ভুলতে পারি না,

আমাদের গায়ে কি এখন সে গুল্মলতা হবে! 

মেখে নেবে অসমাপ্ত, হাবিজাবি সাংসারিক পথ্য, ফাঁক

দিয়ে গলে পড়া ঝুলনের জ্যোৎস্না ...









হেমন্তের পাখি

..............



বিবাহের চিঠিরা একটি একটি হেমন্তের পাখি

শীতের বেলায় তারা নাম ও গোত্রের বাহক

গৃহস্থের ঘরে নিয়ে আসে আমৃত্যু নিমন্ত্রণের সম্ভাবনা

এ পথে কিছু ভুল লেখা থাকে সোনালি অক্ষরে

সামুদ্রিক সানাই যেন আনমনে ফেলে গেছে 

 অচেনা উদ্ভিদের বীজ, 

উচ্ছ্বাস আছে বটে চিঠিতে, মাঘের বৃষ্টি, খনার বচন

আর হিম কেটে নিয়ে আসা একটুখানি যৌথ অরণ্য। 

বিকেলবেলায় অজস্র পাখির কিচিরমিচির শুনেছিলাম    

রেকর্ড করিনি, ছবি তুলিনি, তাই বোধহয় এখনও কানে বাজছে

'হেমন্তগোধূলিবিহঙ্গ ',অবাক হয়ো না ...















লাভা 



যে মেয়েটির সঙ্গে আমার বেশ ভাব,  নামটাও ঠিক জানি না তার। পান খায় খুব।

ব্রাউন রঙের লিপস্টিক লাগায়, একটু ধেবড়ে থাকে।

 চুল সামান্য একটু কোঁকড়ানো, ঘড়ি পরে, গোল্ডেন চেন। 

খসখসে আঙুল, রঙ লাগানো নখ, দ্রুত ফলস লাগায় আমার শাড়ির।  

নাম দিয়েছি তার দ্রাঘিমা, বিয়ে করেনি বা হয়নি। 

চালাক। বুদ্ধি খুব   ।

তাকে আমি পছন্দ করি না ।

 কিন্তু ভাব আছে, কথাও বলি না, কিন্তু ভাব আছে। 

কারণ, ওর ভেতর জমে আছে স্বর্ণাভ লাভা ,  

আগ্নেয়গিরিটিও চেনা আমার, একই লাভায় হাত দিই,

 সুপ্ত, কী ভীষণ ভয়ঙ্কর এই নীরবতা ! 

মেয়েটিকে আমি পছন্দ করি না।

যদিও তার সঙ্গে খুব আধাআধি আমার।

আগ্নেয়গিরি দিয়েই আমাদের পরিচয় আর সর্বশান্ত হওয়া।











প্লাবন, ২০১৮





কাঁচির মতো চাঁদ যেদিন উঠবে বলে  নিশ্চিত ছিল আকাশ, 

সেদিন কোন কারণে তা ওঠেনি    

প্রচুর বৃষ্টিপাত  এবং  মেঘপ্রবাহে    

কেরালায় শুরু হলো বন্যা, অসীম তার শক্তি, ভগবানকে খুন  করে দেয়ার ক্ষমতা 

তবুও তার পরের দিন  ঝকঝকে ধারালো

একটি বাঁকানো চাঁদ উঠেছিল পশ্চিমঘাট পর্বতমালার আকাশে

তাই দেখে ইমাম ঘোষণা  দিলেন আজ 'ঈদ '

এবং জলমগ্ন সেদিন মসজিদ। 

মন্দিরপ্রাঙ্গনটি একটু উঁচু হওয়ায়, হিন্দুরা বলল

আজ এখানেই তবে হোক "ঈদের নামাজ "

এমন ভালো নিউজ হেডলাইন পেয়ে,

তরুণী সাংবাদিক বন্যার ভুল খবর পড়তে থাকে বার বার।    

তরুণ আবহাওয়াবিদ দেয় ক্রমাগত নিম্নচাপের ভুল সংবাদ 

দুজনেরই  চাকরি গেছে    আজ ...তা যাক্

তাঁরা এখন দুরন্ত বাজ, ভারত মহাসাগরের তীরে ঝড় গিলে খায় ...

















 কাঠের গোলাপ 



লক্ষ্মী ছড়ার ব্রিজ থেকে কাল রাতে কেউ ঝাঁপ দিয়েছিল, 

নীচে পড়েনি,

দুজন পরী কাছেই ছিল,  একা  অভিসারে 

যুবকের দুপাশে জুড়ে দিলো ডানা, নাম বদলে গেলো তার মেঘের নিয়মে। 

এখন  সে সূর্যকেতু গন্ধর্ব

যে দু একজন মদখোর এই দৃশ্য দেখেছিল

তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি

পালকের মতো শরীর নিয়ে সূর্যকেতু উড়ে বেড়ায়

চাকরির আর দরকার নেই তার

আকাশ থেকে নক্ষত্রের জল পান করে, পরীদের হাত থেকে ফুলের পাপড়ি খায়  

কিন্তু কারো গলার স্বর শুনতে পায় না , নেশাগ্রস্তদের একান্ত সুর, অথচ  যুবকটি ছিল সঙ্গীতপ্রিয় । 

কোন চাহিদা নেই এখন, শুধু  একদিন শুনতে চায় শেষবারের মতো... মরু বেহাগ...ওস্তাদ  রশিদ  খান। 



তারপর উড়বে না, ডানা ভেঙে দেবে , মরবে, যাতে দেহ ভেসে  ওঠে  আষাঢ়ের জলে 



মর্গে তার মৃতদেহ সনাক্ত করতে আসবে বন্ধুর ছেড়ে দেওয়া  প্রেমিকা ,  মেয়েটি প্রিয় ছিল তাঁর,  তিন পূর্ণ চাঁদ আগে। 

অথচ দেখো সুগন্ধা কাঠগোলাপ  ফুল এনেছে এখন... কেমন  শোকহীন চোখে   ?

খুব বেশি দেরি হয়ে গেলো নাতো আরেক বার বাঁচার কাছ থেকে ফিরে আসতে !  









মায়াবী রাস



নেমেছে দুপুর, আজ জন্মাষ্টমীর পর চতুর্থ দিন

রাস্তা শুনশান, নির্মোহ  ক্ষয়িত ভাদ্র

একটু আগে এ পথে হেঁটে গেছেন মদনমোহন 

কোনো কোনো জানালায় ছেয়ে আছে বিষণ্ণমুখ, দিব্য দৃষ্টি হেনেছেন তিনি বেশ

অথচ নতুন সময়ের মেয়েরা বিষাদ দিয়ে বাঁশি চায় না,

 চায় অন্যকিছু এ পৃথিবীর থেকে, এই জন্ম থেকে, এ শয্যা এবং বাকি সবকিছু থেকে

 তাই কেবল অসুখ আর অসুখ 

চিৎকার করে করে আমরা সমস্ত অসুস্থতা নিজেদের করে নিচ্ছি ...

কিন্তু কিছু ঝরে সত্যি সত্যিই, যুক্তিহীন, তর্কহীন, 

সেসবে করতল ভরে গেলে আমি খুব শান্ত হয়ে যাই অনেক আগের মতো







পৃথিবীর হৃদয় 



আমাজনের আশি শতাংশ অরণ্য পুড়ে গেছে আর

দেড় লক্ষ পশুপাখি, 

গবাদি পশুর খামার হবে  সেখানে। 

বেশ !  বেশ ! 

এখন নাকি বৃষ্টি নেমেছে, জলীয়বাস্প আর গরম ধোঁয়া, 

স্মোকড্ মাটন খেতে খেতে নিজেকে ভাবছি আমাজনের আদিবাসী

মৃত্যু উপত্যকার কাছাকাছি চলে এসেছি,

এ আগুনের পাশে দাঁড়াও বন্ধু , কদিনই আর বাঁচবো বলো?

ত্বক পুড়ে গেছে তো !   লাগছে দেখি এক আমাদের ! 

কী হে তুমি ইন্ডিয়া আর আমি কিন্তু ব্রাজিল 

আমরা বিজ্ঞান শিখে ডিগ্রী নিয়ে বনের পাশে রান্নার দোকান খুলেছি

জঙ্গলের স্যুপ, পাখির কান্না আর বৃংহনে বৃংহনে ভালোবাসার জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করছি 













 

বাড়ি



বাড়ি এক অনারোগ্য রোগ

ফেলে আসা অনেকদিনের থাকা সেই ঘর, বারান্দা, ঘাট, জল ...ক্ষতচিহ্নের মতো মনে হয়

একটি একটি ইট জড়ো করে মানুষ, 

শরীর আর মনের গুটিবসন্তের যন্ত্রণা তাতে, শখ পুড়ে পুড়ে রঙ লাগানো 

সমস্ত  মলম মেখে , রোমান্টিকতা খেয়ে নিয়ে

 নির্বাক, নিথর হয়ে দাঁড়ায় অবশেষে একটি বাড়ি,

লবন ভেসে ভেসে ওঠে সস্তার সিমেন্ট প্রলেপের ওপর 

একজোড়া মানুষ মানুষী তখন সেই সমুদ্রদ্বীপে

বাটিতে জমা হয়েছে সমস্ত অমিল আর বিশ্রামমুখর কিছু সন্ধ্যা

আগে ঘরের দেয়ালে রঙ না  আলমারি ! 

কত তর্ক গেছে দিনভর, রাগারাগি

এখন পুরনো কড়িকাঠ, শ্মশানযাত্রীদের মতো। 

অন্য মানুষেরা সন্ধ্যা দেয়, হঠাৎ বৃষ্টিতে নিভে যায় তাদের শেষ মোমবাতি, 

তবু বেঁচে থাকা শেষ হয় না,

 কোচিং ফেরত একটি ছেলে ক্লান্তমুখে আসে হঠাৎ,  

হাতে জামের ডাল, ভিজে উঠেছে তার শস্যক্ষেতের মতো বুক, ঘন আঁখিপল্লব ...













ভাদ্রপদী 



কেন লিখে দিতে বলো গদ্যের হাত পা, চুরান্ত মৃদঙ্গ বোল

আমি ঘুরে ফিরে প্রিয় কিশোরকে নিয়ে দুই এক অক্ষরের কাছে বসি, ক্লান্ত কবিতা তোমাকেই ভালোবাসি

এখানেই রেখে দিতে পারি নীরব মাধুর্য, অস্পষ্ট গোপনে 

এক অসময়ের বিকেল আমার আত্মার কাছে,   

বিপুল বৈভব তার, তবু দীনহীন, শিখর চ্যুত ব্যসন যেন অজ্ঞাত ভাদ্র রাতে

মনে হয় তাকে রাখি নীরবে কাঠের বাড়িতে, জানা জতুগৃহে

বাইরে সবল বর্ষা বহুক, ডাহুক ডাকুক

কোনদিন বলব না তো, বুঝে নিতে হবে, না হলে মুছে মুছে যাক সকল অসময়ের বৃন্দ ছন্দ,

কাল থেকে ভেবেছি শুধু উন্মোচন, স্বপ্নের মধ্যে ছুঁয়ে গেছে আমাকে,

স্পর্শ করে এসেছি, জানতেও পারোনি, এমনি বোকা এক সময়খন্ড ভরে ফেলেছি  ঝিনুকে

পাঠাবো ! যে ঠিকানায় কখনো কোন কিছু যায়নি সেখানে। 






বিনীত


পৃথিবী শান্ত হয়ে যাক, বাজুক মুগ্ধ দোতারা

তুমিও চিনেছো আমাকে, আমিও তোমাকে

জেগে উঠেছে বিস্ময়, সবুজ সন্ধ্যা ও শহর

তুমিও কি বিশ্বাসপ্রবণ... ভালোবাসার মতো? 

যারা ঠকে গেছে বলে আফসোস করে

তাদের দিলাম বাগান, আগাছা আর জলের কুঠার

রক্ত থেকে উষ্ণতা চলে গেলে মানুষ নীচু হয়

কুড়োতে শেখে, দেখে পথে পড়ে রয়েছে তার ঔদ্ধত্য

যারা যারা চলে গেছে ধুলোপথে, রেখে গেছে ঝিনুক

তাতে পা কেটে গেলে, ভেতরে সূর্যাস্ত শুধু নীরব, কাতর
















কবিতা তোমার জন্য 



অযত্নের গাছেও ফুটেছে ফুল, আমিও জাগছি নির্নিমেষ

বিরহী ধানের ক্ষেত ছেড়ে চলে যাচ্ছে পলাতক জ্যোৎস্না

যা কিছু নিঃশব্দ মনে হয়, হয়তো সুরহীন পাখির মৌনতা

বন্ধুর ছেড়ে দেওয়া হাতের মতো দুঃখ নেই    

অশনিসংকেতে বুঝতে পারি অনাগত নিঃসঙ্গতা 

যারা গভীর আনন্দে ভ্রমণে বেরিয়েছে মরুপথে

শ্রমহীন ক্লান্তিতে তাদের দেখি আধবোজা চোখে

তুমিও কি ভাবো কবিতা মানেই তোমার কথা বলছি, 

যেখানে আমার মনখারাপ, সেখানেই তার ভাঙা শরীর 









লেখক পরিচিতি



.... চিরশ্রী দেবনাথের, জন্ম 1979 এর 12 ফেব্রুয়ারি উত্তরপূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার।  দুজনেই প্রয়াত।  তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করেন। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি।  বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন। পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প

প্রথম পুরস্কার, স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার, ত্রিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ  প্রতিযোগিতায় প্রথম  পুরস্কার।  

২০১৯ এ, সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মান পেয়েছেন। তার লেখা, ছোটগল্প, "ব্যারনফিল্ড " অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সর্ট ফিল্ম। তৈরি করেছেন কলকাতার  রত্নদীপ রায়। যা নাইজেরিয়ার  ইন শর্ট চলচিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।

এছাড়া  "কীর্ণকাল "নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন চারবছর ধরে। তিনি বিশ্বাস করেন কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না। 



এখন পর্যন্ত প্রকাশিত  বইগুলোর নাম, 



কাব্যগ্রন্থ .........

 "জলবিকেলে মেঘের ছায়া "( ২০১৬), 

"ঋতুক্ষরণের রোদচশমায় "(২০১৬),

 "প্রেমে সন্ত্রাসে "(২০১৭), 

 "শুভ দ্বিপ্রহর " (২০১৮), 

"ঝাউবন ও জ্যামিতি বাক্স "(২০১৮)  , 

 "উড়িয়ে দিও "(২০১৯),  

"বিশ্বাসের কাছে  নতজানু "( ২০১৯  ),

 কুুুুুড়িটি ছোটগল্প নিয়ে একটি গল্প সংকলন,  "মায়ারাণী "(২০১৯), 

একান্নটি অণুগল্প নিয়ে, অণুগল্প সংকলন ( ২০২০), 

"সোমবার সন্ধ্যায় " (কথোপকথন) 

 "যে জীবন কবিতাগামী "( কবিতাবিষয়ক যৌথ গ্রন্থ )।


নিকটবর্তী রূপকথা ( ছাব্বিশটি ছোট গল্প )

সূর্যছক, উপন্যাস 

মারমেডের শহর থেকে , উপন্যাস

ঝিলমারির কাণ্ডকারখানা ,  কিশোর উপন্যাস 

সংখ্যার শরীরে মৌমাছি , উপন্যাস

নিঃস্বরের করতলে,  ( দীর্ঘ কবিতা) 



মুঠোভাষ : 9402143011

ই মেইল : chirasree.debbath@gmail.com